মওলানা ভাসানীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন - মজলুম জননেতার ঘরে ফেরা
সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আবেগ। কারণ, আজ ঘরে ফিরছেন সেই মানুষটি, যিনি দশকের পর দশক ধরে এ দেশের কৃষক-শ্রমিক আর মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পূর্ণতা পাওয়ার পথে মওলানা ভাসানীর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল এক বিশাল মাইলফলক।

TruthBangla
Jan 22, 2026
১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি। শীতের সকাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সীমান্ত শহর হালুয়াঘাটে অপেক্ষমাণ হাজারো মানুষ। সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আবেগ। কারণ, আজ ঘরে ফিরছেন সেই মানুষটি, যিনি দশকের পর দশক ধরে এ দেশের কৃষক-শ্রমিক আর মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পূর্ণতা পাওয়ার পথে মওলানা ভাসানীর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল এক বিশাল মাইলফলক।
বাংলাদেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা, শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ। ১৯৭২ সালের এই দিনে দীর্ঘ নির্বাসন এবং অনিশ্চয়তা কাটিয়ে তিনি পা রেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। নিচে মওলানা ভাসানীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা নিয়ে একটি বিস্তারিত এবং তথ্যবহুল ব্লগ আর্টিকেল উপস্থাপন করা হলো।
স্বাধীনতার মহানায়ক ও এক অনন্য প্রত্যাবর্তন
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা শুরু হওয়ার পর মওলানা ভাসানী তাঁর জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ ছেড়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ভারতে অবস্থান করলেও তাঁর মন পড়ে ছিল এ দেশের মাটিতে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে ফিরে আসার পর ঢাকার পত্র-পত্রিকায় মওলানা ভাসানীকে নিয়ে নানা ধরনের কৌতূহলী প্রতিবেদন ও লেখালেখি শুরু হয়। জনমনে প্রশ্ন ছিল কোথায় আছেন মওলানা? তিনি কবে ফিরবেন?
ভারত সরকার তখন তাঁর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে তাঁকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন। ২১ জানুয়ারি, ফেরার ঠিক আগের দিন, তিনি আসামের ফরিদগঞ্জে এক ঐতিহাসিক জনসভায় ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা তুলে ধরেন, যা আজও ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
মেঘালয় থেকে হালুয়াঘাট
২২ জানুয়ারি সকালে ভারত সরকারের একটি বিশেষ জিপে করে মেঘালয় থেকে যাত্রা শুরু করেন মওলানা ভাসানী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন চিকিৎসক, কারণ মওলানার শরীর তখন বেশ দুর্বল ছিল। সীমান্তে যখন তিনি পৌঁছালেন, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীর প্রতি তাঁর বিনম্র শ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে তাঁর একজন বিশেষ দূতকে টাঙ্গাইলে পাঠিয়েছিলেন। সেখান থেকে এই জননেতাকে বরণ করে নেওয়া হয়। তাঁর প্রত্যাবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির ফিরে আসা ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বহুমাত্রিকতার এক প্রতীক।
মুক্তিযুদ্ধে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি দলের আন্দোলন নয়, বরং ‘সর্বদলীয়’ চরিত্র দেওয়ার পেছনে মওলানা ভাসানীর অবদান অনস্বীকার্য। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে গঠিত আট সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি।
উপদেষ্টা কমিটির গঠন ও সদস্যবৃন্দ
এই কমিটির লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ এবং বিশ্ববিবেকের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ সমর্থন আদায় করা। এই কমিটির উল্লেখযোগ্য সদস্যরা ছিলেন:
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (সভাপতি)
তাজউদ্দীন আহমদ (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী)
কমরেড মণি সিংহ (সিপিবি নেতা)
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ (ন্যাপ নেতা)
মনোরঞ্জন ধর প্রমুখ।
এই কমিটির প্রথম সভাতেই মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়: "পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বাধীনতা ব্যতিরেক অন্য কোনো প্রকার রাজনৈতিক সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে না।" তাঁর এই কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে আরও জোরালো করেছিল।
মওলানা ভাসানী ভারতে নজরবন্দি ছিলেন?
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কলকাতা, দেরাদুন এবং দিল্লীসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন। তবে তাঁর এই অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আজও বিতর্ক রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিক এবং সমসাময়িক রাজনীতিবিদ অভিযোগ করেন যে, ভারতে থাকাকালীন তিনি এক প্রকার ‘নজরবন্দি’ অবস্থায় ছিলেন।
আরো পড়ুন: মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কি ভারতে বন্দি ছিলেন?
ভারত সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে মর্যাদা দিলেও তাঁর চলাফেরা এবং যোগাযোগের ওপর ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ভারতে অবস্থানকালে তিনি দুইবার মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তাঁকে দিল্লীর ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস’ (AIIMS)-এ ভর্তি করা হয়েছিল। শারীরিক অসুস্থতা এবং রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি ইন্দিরা গান্ধীসহ বিশ্বনেতাদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নিয়মিত চিঠি লিখতেন।
কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন স্বাধীনতা বিরোধী মহল মওলানা ভাসানীর ভারতে অবস্থানকে ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও মিথ্যাচার ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত অপপ্রচার হলো - মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নাকি ভারত সরকারের দ্বারা 'বন্দি' ছিলেন। বস্তুত, যুদ্ধের সময় তিনি ভারতে ছিলেন আশ্রয়প্রার্থী, বন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সচেষ্ট একজন নেতা হিসেবে। ইন্দিরা গান্ধীকে মাওলানা ভাসানী ভারতে আশ্রয়ের জন্য চিঠিও দিয়েছিলেন। এসব স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী পরবর্তীতে মওলানা ভাসানীকে তার বামপন্থী রাজনীতির কারণে 'প্র-চাইনীজ' অপবাদও দিয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কেন মওলানা ভাসানী অপরিহার্য?
মওলানা ভাসানী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি দর্শন। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি যখন পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে বিদায় জানিয়েছিলেন, তখনই অঙ্কুরিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ।
তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবর্তক। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন সবখানেই মওলানা ভাসানী ছিলেন সামনের কাতারে। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে একে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করার মূল কারিগর ছিলেন।
মওলানা ভাসানী ছিলেন কৃষক ও মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর। হক-ভাসানী চুক্তির মাধ্যমে জমিদার প্রথা উচ্ছেদে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। সারাজীবন তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে এক কুঁড়েঘরে কাটিয়ে দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে ক্ষমতার মোহ তাঁকে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারেনি।
মওলানা ভাসানীর আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান অনেক স্পষ্ট ছিল। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরও মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। তিনি ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ‘লং মার্চ’ পরিচালনা করেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী পানিবণ্টন রাজনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ঐতিহ্যের দায়বদ্ধতা
মওলানা ভাসানীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশ কোনো একক গোষ্ঠীর রক্তে অর্জিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব আর মওলানা ভাসানীর মতো প্রবীণ নেতাদের আশীর্বাদ ও নির্দেশনাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি।
আজকের প্রজন্মের কাছে মওলানা ভাসানী এক বিস্মৃত অধ্যায় হতে পারেন না। তাঁর ত্যাগ, সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন চেতনা আমাদের আগামীর পথ দেখাবে। ২২ জানুয়ারি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়, এটি একজন ‘মজলুম জননেতার’ তাঁর আপন নীড়ে ফেরার দিন, যেখানে তিনি আমৃত্যু শোষিত মানুষের স্বপ্ন বুনে গেছেন।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















