মওলানা ভাসানীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন - কালজয়ী মজলুম জননেতার ঘরে ফেরা
শোষিত, পীড়িত ও নিপীড়িত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা, কাগমারীর ইতিহাসস্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসন-শোষণ এবং ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি বাকপরিবর্তনে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও আপসহীন নেতৃত্ব বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে জুগিয়েছে অপরাজেয় প্রেরণা। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশের পলিবিধৌত সীমান্ত শহর হালুয়াঘাটের এক কনকনে শীতের সকাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের পলিমাটিতে সেদিন পা রেখেছিলেন আশি পেরোনো এই সিংহপুরুষ।

TruthBangla

বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে নামটি ধ্রুবতারার মতো জ্বাজ্বল্যমান হয়ে ওঠে, তিনি হলেন শোষিত, পীড়িত ও নিপীড়িত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা, কাগমারীর ইতিহাসস্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসন-শোষণ এবং ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি বাকপরিবর্তনে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও আপসহীন নেতৃত্ব বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে জুগিয়েছে অপরাজেয় প্রেরণা।
১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশের পলিবিধৌত সীমান্ত শহর হালুয়াঘাটের এক কনকনে শীতের সকাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের পলিমাটিতে সেদিন পা রেখেছিলেন আশি পেরোনো এই সিংহপুরুষ। ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বহুমাত্রিকতা পূর্ণতা পাওয়ার ক্ষেত্রে ২২ জানুয়ারিতে মওলানা ভাসানীর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।
বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে মওলানা ভাসানীর অবদান, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে তাঁর অবস্থান সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির নেতৃত্ব এবং ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি তাঁর দেশে ফেরার রোমহর্ষক ঘটনাপ্রবাহের এক পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক পুনর্পাঠ নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
মওলানা ভাসানী: কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল কাণ্ডারি
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিসত্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন নিজেই এক দীর্ঘ রাজনৈতিক দর্শন ও বিপ্লবের নাম। ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়ান নেতা আসামের লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সারাজীবন কাটিয়েছেন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে।
জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ ও কৃষক-মজুরের অধিকার
আসাম ও পূর্ব বাংলার জমিদারদের অন্যায় কর ও শোষণের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানীর লড়াই ছিল নজিরবিহীন। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সাথে 'হক-ভাসানী' সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি প্রান্তিক কৃষকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে অবদান রাখেন। সারাজীবন আড়ম্বরহীন পোশাক, সাধারণ জীবনযাপন এবং টাঙ্গাইলের সন্তোষের এক কুঁড়েঘরে বসবাস করে তিনি নিজেকে ক্ষমতার রাজনীতির অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন।
আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবর্তন
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলির কেএম দাস লেনের ঐতিহাসিক বশির মিঞার রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী এবং তরুণ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের রসায়ন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর বলিষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই দলীয় নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে 'আওয়ামী লীগ' নামকরণ করা হয়, যা দলটিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অমুসলিম নাগরিক সহ সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সর্বজনীন রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করে।
১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলন: স্বাধীনতার সুদূরপ্রসারী সংকেত
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ঐতিহাসিক সম্মেলনে মওলানা ভাসানী তৎকালীন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারণ করেছিলেন সেই কালজয়ী হুঁশিয়ারি:
"তোমরা যদি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর শাসন-শোষণ ও বৈষম্য বন্ধ না করো, তবে অচিরেই আমাদের বলতে হবে আসসালামু আলাইকুম (আল্লাহ হাফেজ)।"
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ১৯৭১ সালের ১৫ বছর আগেই মওলানা ভাসানী তাঁর প্র রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলার ঐক্য টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কাগমারী সম্মেলনের সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যই পরবর্তীতে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার মূল প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৭১ সালের রক্তঝরা রণাঙ্গন: ২৫ মার্চের কালোরাত থেকে ভারতে যাত্রা
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন সমগ্র দেশ উত্তাল, তখন মওলানা ভাসানী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে চূড়ান্ত সংগ্রামের আহ্বান জানাচ্ছিলেন। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে তিনি শতভাগ একমত এবং বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নামতে হবে।
২৫শে মার্চের ভয়াল কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন মওলানা ভাসানী তাঁর জন্মভূমি সিরাজগঞ্জে অবস্থান করছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান টার্গেটগুলোর মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। স্থানীয় তরুণ ও দলীয় কর্মীদের সহায়তায় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থান নেন।
অবশেষে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং বয়সের বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ববিবেকের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায় করা এবং প্রবাসী সরকারের পাশে থেকে যুদ্ধের নতুন কূটনৈতিক ফ্রন্ট খুলে দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে মওলানা ভাসানীর চিঠি
ভারতে পৌঁছানোর পরপরই মওলানা ভাসানী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন:
"মেহেরবানি করে বাংলাদেশ সরকারের গঠিত অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দিন এবং এই মুহূর্তে আমাদের মুক্তিকামী বীর সন্তানদের সর্বাত্মক অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা প্রদান করুন। ৯ মাসের মধ্যে যদি আমরা এই ভূখণ্ডকে শত্রুমুক্ত করতে না পারি, তবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করবে।"
তাঁর এই চিঠি এবং বিশ্বনেতাদের কাছে আকুল আবেদন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে রাতারাতি এক আলাদা ভূ-রাজনৈতিক ওজন এনে দেয়।
সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি: একাত্তরের জাতীয় ঐক্যের সর্বউচ্চ প্রতীক
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল নির্দিষ্ট কোনো দলীয় সংগ্রাম ছিল না; বরং তা ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির এক সর্বজনীন গণযুদ্ধ। এই যুদ্ধকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বদলীয় মাত্রা দেওয়ার জন্য এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে একক লক্ষ্যে কাজ করার সুবিধার্থে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অধীনে গঠিত হয় আট সদস্যের 'সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি'।
কমিটির গঠন ও সর্বসম্মত নেতৃত্ব
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের উদ্যোগে গঠিত এই সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি মনোনীত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সামরিক, কৌশলগত এবং রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণে এই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কমিটির মূল সদস্যবৃন্দ ছিলেন:
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (সভাপতি, প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)
তাজউদ্দীন আহমদ (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, মুজিবনগর সরকার)
কমরেড মণি সিংহ (বিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক নেতা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি - CPB)
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ (সভাপতি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি - NAP)
মনোরঞ্জন ধর (প্রবীণ জননেতা ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধি)
খন্দকার মোশতাক আহমেদ (পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরবর্তীতে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত)
পূর্ণ স্বাধীনতার ঐতিহাসিক সংকল্প
এই সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির প্রথম আ আনুষ্ঠানিক বৈঠকেই সভাপতি মওলানা ভাসানীর দৃঢ় পরিচালনায় একটি কালজয়ী প্রস্তাব গৃহীত হয়:
"পূর্ববঙ্গের 'পূর্ণ স্বাধীনতা' ব্যতিরেকে অন্য কোনো রাজনৈতিক সমাধান, সমঝোতা কিংবা কনফেডারেশন গ্রহণযোগ্য হবে না।"
তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং জাতিসংঘের একটি বড় গোষ্ঠী যখন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মাঝে একটা মধ্যবর্তী 'স্বায়ত্তশাসন' বা 'কনফেডারেশন'-এর মাধ্যমে যুদ্ধ বিরতির পাঁয়তারা করছিল, তখন মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে বাঙালি জাতি জীবন দিয়েছে কেবল স্বাধীনতা অর্জনের জন্য, কোনো উপরি পাওনা বা আপসের জন্য নয়।
মওলানা ভাসানী ভারতে নজরবন্দি ছিলেন?
একাত্তরে ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানীর দিনগুলো কেমন কেটেছিল তা নিয়ে স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রচুর বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। এক দল ইতিহাসবিদ মনে করেন তিনি ভারত সরকারের নিকট 'নজরবন্দি' বা এক প্রকার অন্তরীণ অবস্থায় ছিলেন; অন্যদিকে অন্য দলটি দাবি করে যে, নিরাপত্তাজনিত এবং স্বাস্থ্যের কারণেই তাঁকে বিশেষ তদারকিতে রাখা হয়েছিল।
নজরবন্দি তত্ত্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কয়েকজন সমসাময়িক রাজনীতিবিদ ও গবেষকের (যেমন: আহমদ ছফা, ড. সালাহউদ্দীন আহমেদ প্রমুখ) লেখনিতে উঠে এসেছে যে, মওলানা ভাসানীকে ভারতে অবস্থানের পুরোটা সময় কলকাতা, দেরাদুন, শিলং এবং দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (AIIMS)-এ এক প্রকার কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়:
চীনপন্থী (Pro-Peking) তকমা: মওলানা ভাসানী দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার প্রগতিশীল সম্পর্কের সমর্থক ছিলেন। ১৯৭১ সালে গণচীন যখন কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছিল, তখন ভারত সরকার শঙ্কিত ছিল যে মওলানা ভাসানী মুক্তভাবে কোনো অবস্থান নিলে ভারত-সোভিয়েত-বাংলাদেশ অক্ষের কৌশলগত ক্ষতি হতে পারে।
আরো পড়ুন: মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কি ভারতে বন্দি ছিলেন?
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব: ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (RAW) ভাসানীর সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তাঁর সাথে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সরাসরি সাক্ষাৎ সীমিত করে দিয়েছিল, যাতে মুজিবনগর সরকারের বাইরে কোনো বিকল্প রাজনৈতিক সুর তৈরি না হয়।
নিরাপত্তা ও বন্ধুত্বের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
অপরপক্ষে, বহু প্রবীণ ইতিহাসবিদ মনে করেন মওলানা ভাসানীকে 'বন্দি' বলাটা একটি ঐতিহাসিক অতিসরলীকরণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। বাস্তব চিত্র ছিল নিম্নরূপ:
শারীরিক অসুস্থতা: মওলানা ভাসানী সে সময় ৯১ বছর বয়সে পা দিয়েছিলেন। মারাত্মক উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি এবং বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত নির্দেশেই তাঁকে দিল্লিতে 'AIIMS'-এ ভর্তি করে বিশ্বমানের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
নিরাপত্তা ঝুঁকি: পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) এবং স্থানীয় দোসররা ভারতীয় ভূখণ্ডে মওলানা ভাসানীর ক্ষতি করার পাঁয়তারা করছিল। তাঁকে রক্ষা করা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল।
ইন্দিরা গান্ধীর গভীর শ্রদ্ধা: ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে মওলানা ভাসানীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং ভাসানীর চিঠির আলোকেই ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশের পক্ষে জোর সওয়াল করা সহজ হয়েছিল।
ফলে তিনি বন্দি ছিলেন না; বরং কৌশলগত রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা, শারীরিক অসুস্থতা এবং কঠোর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার এক মিশ্র বাস্তবের মুখোমুখি ছিলেন।
২২ জানুয়ারি ১৯৭২: হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের রোমহর্ষক বিবরণ
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ৯ মাসের কারাবাস শেষে মুক্ত হয়ে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার পরপরই গোটা বাংলাদেশে প্রশ্ন ওঠে "আমাদের প্রবীণ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী কোথায়? তিনি কবে স্বদেশের মুক্ত মাটিতে ফিরবেন?"
এই প্রশ্নের উত্তর মেলে ২২ জানুয়ারি সকালে। ভারত সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় মওলানা ভাসানীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের চূড়ান্ত দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়।
ফেরার আগের দিন: আসামের ফরিদগঞ্জে বিদায়ী ভাষণ
ফেরার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানী ভারতের আসামের ফরিদগঞ্জে একটি ঐতিহাসিক গণসমাবেশে ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি ভারত ও আসামের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ৯ মাস বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে বীরত্ব দেখিয়েছে, তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের যুদ্ধ মাত্র শুরু হলো।"

হালুয়াঘাট সীমান্তে আবেগঘন প্রত্যাবর্তন
২২ জানুয়ারির কনকনে শীতের সকালে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি নিরাপত্তা জিপে করে রওনা হন মওলানা ভাসানী। তাঁর সাথে ছিলেন একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে গাড়িটি যখন তৎকালীন ময়মনসিংহের সীমান্ত শহর হালুয়াঘাটের কড়ইতলী আন্তর্জাতিক সীমানায় এসে পৌঁছায়, তখন ঘড়ির কাঁটায় সকালের রোদ ফুটে উঠেছে।
সীমান্তের ওপারে তখন হাজার হাজার উৎসুক মানুষ। কৃষক, মজুর, রাজনৈতিক কর্মী আর সাধারণ মানুষ ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁদের প্রিয় 'হুজুর ভাসানী'কে একনজর দেখার জন্য।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বিনম্র শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক সৌজন্যের পরিচয় দিয়ে মওলানা ভাসানীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলে একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ও সরকারি দূত পাঠান। সীমান্তে পা রাখার সাথে সাথে মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের মাটিতে মাথা নত করে সিজদা লুটিয়ে পড়েন এবং স্বাধীনতার জন্য শহীদ হওয়া ৩০ লাখ মানুষের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
সেখান থেকে গাড়ি বহর নিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় টাঙ্গাইলের প্রিয় স্থান সন্তোষে। তাঁর এই ফিরে আসা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বহুমাত্রিকতার নিশ্চিত বার্তা যেখানে সব রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ মতামত প্রকাশ করতে পারবে।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উত্তর রাজনীতি: স্বাধীন বাংলাদেশের অভিভাবক ও ফারাক্কা লং মার্চ
স্বদেশে ফিরে এসে মওলানা ভাসানী বিশ্রামে যাননি। ৯২ বছর বয়সে পা রেখেও তিনি সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, খাদ্য সংকট মোকাবেলা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
সরকারের ভুলত্রুটির অকুতোভয় সমালোচক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি মওলানা ভাসানীর স্নেহের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতো। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে যখন খাদ্য সংকট, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন মওলানা ভাসানী প্রবীণ অভিভাবক হিসেবে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পিছপা হননি। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে যেন কোনো অবস্থাতেই আমলাতান্ত্রিক শোষণ কিংবা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ না হয়।
১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক ফারাক্কা 'লং মার্চ'
মওলানা ভাসানীর জীবনের শেষভাগের সবচেয়ে বড় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে পরিচালিত ঐতিহাসিক 'ফারাক্কা লং মার্চ'।
১৯৭৬ সালের ১৬ মে ৯৬ বছর বয়সে অশীতিপর শরীরে লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে ফারাক্কা অভিমুখে লাখো মানুষকে নিয়ে পদযাত্রা শুরু করেন। ভারত কর্তৃক একতরফা গঙ্গা নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে তৎকালীন বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল যেভাবে মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তা তুলে ধরতে এই লং মার্চ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস রচনা করে। এটি আজ পর্যন্ত বৈশ্বিক পরিবেশ ও পানিবণ্টন রাজনীতিতে এক অনন্য নজির।
এক নজরে মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও একাত্তরের ভূমিকা
পাঠকদের সুবিধার জন্য মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ঘটনা ও ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ নিচে একটি একক সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:
বিষয় বা ঘটনা | সময়কাল / তারিখ | স্থান / মূল ক্ষেত্র | রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা | ২৩ জুন ১৯৪৯ | রোজ গার্ডেন, ঢাকা | প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ; বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংগঠনিক ভিত্তি। |
অসাম্প্রদায়িক রূপান্তর | ১৯৫৫ | ঢাকা | 'মুসলিম' শব্দ ছাঁটাই করে আওয়ামী লীগ নামকরণ; সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িকতার শুরু। |
ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন | ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭ | কাগমারী, টাঙ্গাইল | পশ্চিম পাকিস্তানকে 'আসসালামু আলাইকুম' জানিয়ে বিচ্ছিন্নতার বার্তা প্রদান। |
ভারতে গমন ও ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি | এপ্রিল ১৯৭১ | ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত | প্রবাসী সরকারকে স্বীকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক সামরিক সহায়তার আকুল আবেদন। |
সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির গঠন | সেপ্টেম্বর ১৯৭১ | মুজিবনগর / কলকাতা | সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত; 'পূর্ণ স্বাধীনতা' ব্যতিরেকে সব আপস প্রত্যাখ্যান। |
আসামের ফরিদগঞ্জে ঐতিহাসিক ভাষণ | ২১ জানুয়ারি ১৯৭২ | ফরিদগঞ্জ, আসাম (ভারত) | ২৩ বছরের পাকি শোষণ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়ে ঐতিহাসিক বক্তব্য। |
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস | ২২ জানুয়ারি ১৯৭২ | হালুয়াঘাট সীমান্ত, ময়মনসিংহ | দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বাংলাদেশে প্রবেশ; বহুমাত্রিক গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের সূচনা। |
ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ | ১৬ মে ১৯৭৬ | রাজশাহী থেকে ফারাক্কা | একতরফা গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে লাখো জনতার ঐতিহাসিক ভূ-রাজনৈতিক পদযাত্রা। |
কেন ভাসানী চির অম্লান
আজকের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা বিগত পাঁচ দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তখন দেখা যায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি আমাদের স্বাধিকার, সার্বভৌমত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি হন স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্থপতি, তবে মওলানা ভাসানী ছিলেন সেই স্বপ্নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী প্রবীণ প্রবক্তা। তিনি ক্ষমতার পেছনে ছোটেননি, মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন চিরকাল রাজপথের, মেহনতি কৃষকের, মেহনতি শ্রমিকের এবং প্রান্তিক মানুষের 'মজলুম জননেতা'।
২২ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের অর্জন নয়; বরং এটি শত বছরের স্বাধিকার আন্দোলন, লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং ভাসানীর মতো মহামানবদের নিঃস্বার্থ ত্যাগের সমষ্টি।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে মওলানা ভাসানীর নীতি, আপসহীন মনোভাব এবং ফারাক্কা লং মার্চের মতো জাতীয় স্বার্থে সোচ্চার হওয়ার শিক্ষা অপরিহার্য। মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। তাঁর দেখানো পথ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সাধারণ মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন থাকা আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার প্রধান নিয়ামক হয়ে থাকবে।















