একাত্তরে ভারতের বুকে ৯৮ লাখ বাংলাদেশী শরণার্থী - বাঙালির অশ্রুসিক্ত ইতিহাস
পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে প্রায় এক কোটি বাঙালি সীমান্ত পার হয়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল অবিশ্বাস্য ৯৮,৯৯,৩০৫ জন। এই সংখ্যা ইতিহাসের বৃহত্তম মানবপ্রবাহগুলোর অন্যতম।

TruthBangla
Dec 9, 2025
১৯৭১ সাল বাঙালির ইতিহাসে যেমন এক মহান মুক্তির বছর, তেমনি এটি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের অধ্যায়। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে প্রায় এক কোটি বাঙালি সীমান্ত পার হয়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল অবিশ্বাস্য ৯৮,৯৯,৩০৫ জন। এই সংখ্যা ইতিহাসের বৃহত্তম মানবপ্রবাহগুলোর অন্যতম।
এই শরণার্থী স্রোত শুধু সংখ্যায় বিশাল ছিল না; এর পেছনে ছিল এক জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, ছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই, ছিল স্বাধীনতার দাম রক্ত ও অশ্রুর মাধ্যমে পরিশোধের এক করুণ ইতিহাস। এই মানবিক বিপর্যয়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তিকে বুঝতে সাহায্য করে।
এক কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও বিশ্ব বিবেকের আহ্বান
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া গণহত্যা যখন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ উপলব্ধি করে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ হলো জন্মভূমি ত্যাগ করা। এই বিশাল শরণার্থী ঢল কেবল একটি পরিসংখ্যান ছিল না, এটি ছিল প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি মা, বোন ও শিশুর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সম্মিলিত প্রতিধ্বনি। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের মানবিক ভূমিকা এই অঞ্চলের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
গণহত্যার তাণ্ডব - কেন সীমান্ত পেরিয়ে বাঙালিরা ভারতে গেল?
শরণার্থী স্রোতের কারণ ছিল সুপরিকল্পিত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত নির্মম দমন-পীড়ন। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল।
অপারেশন সার্চলাইট ও পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রি থেকে শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সুপরিকল্পিত গণহত্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ, কেউই এই নির্বিচার হত্যা থেকে রেহাই পায়নি।
মানবাধিকার লঙ্ঘন: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ব্যাপক যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়।
নারীর প্রতি সহিংসতা: ২ লাখ থেকে ৪ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণায় উঠে এসেছে। এটি ছিল যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে নারীকে ব্যবহার করার এক জঘন্য কৌশল।
নিহত মানুষের সংখ্যা: বাংলাদেশ সরকারের দাবি অনুযায়ী, ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হন।
সম্পত্তি ধ্বংস: হাজারো গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়, কৃষিজমি ও অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়, যা ছিল বাঙালিদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা।
প্রাণ বাঁচাতে গণপলায়ন
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতেই লাখে–লাখে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের দিকে ছুটতে থাকে। টিলার ওপরে, নদীর তীরে, জঙ্গলের ভেতর, যে যেভাবে পারে মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে ভারতে পৌঁছায়। জীবনের নিরাপত্তা, সম্মান রক্ষা এবং নিছক বেঁচে থাকার তাগিদই ছিল এই গণপলায়নের মূল কারণ।
শরণার্থীর ঢল - রাজ্যভিত্তিক হিসাব ও চাপ
১৯৭১ সালে শরণার্থীরা বেশিরভাগই পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে ভারতে প্রবেশ করেন। সীমান্তের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম ও বিহার প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভার বহন করা ছিল ভারত সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
রাজ্য | সংখ্যা (১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত) | জনসংখ্যার অনুপাতে চাপ (আনুমানিক) |
পশ্চিমবঙ্গ | ৭৪,৯৩,৪৭৪ জন | রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ১৭% |
ত্রিপুরা | ১৪,১৬,৪৯১ জন | রাজ্যের স্বাভাবিক জনসংখ্যার সমান বা বেশি |
মেঘালয় | ৬,৬৭,৯৮৬ জন | রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৬০% |
আসাম | ৩,১২,৭১৩ জন | |
বিহার | ৮,৬৪১ জন | |
মোট শরণার্থী | ৯৮,৯৯,৩০৫ জন |
শরণার্থীদের প্রায় ৮০%–এরও বেশি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায়, যেখানে সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে শত-শত ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
শরণার্থী ক্যাম্পের বাস্তবতা - দুর্ভোগ, রোগ ও মৃত্যু
ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা সাময়িক নিরাপত্তা পেলেও তাঁদের সামনে অপেক্ষা করছিল আরও এক দুঃস্বপ্ন, ক্যাম্পজীবনের সীমাহীন দুর্ভোগ। ভারতের তৎকালীন সীমিত সম্পদ দিয়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও রোগব্যাধি
চিকিৎসা সংকট: বেশিরভাগ ক্যাম্পেই পর্যাপ্ত খাবার, পরিষ্কার পানি, স্যানিটেশন সুবিধা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। তাঁবু, ত্রিপল বা খোলা আকাশের নিচে গাদাগাদি করে থাকার কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সংক্রামক রোগ।
মৃত্যুর মিছিল: নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে, কলেরা, আমাশয়, অপুষ্টি ও নিউমোনিয়ায় হাজারো মানুষের মৃত্যু ঘটে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও পানিবাহিত রোগের কারণে শিশুমৃত্যুর হার ছিল ভয়াবহ।
স্বাস্থ্যসেবার চরম চাপ: চিকিৎসা সামগ্রীর স্বল্পতার কারণে হাসপাতালগুলো ভরে যেত অসহায় শরণার্থীতে। ভারতীয় চিকিৎসক দল, রেড ক্রস এবং আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো নিরলস কাজ করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল।
খাদ্য ও আর্থিক সংকট
বিশাল পরিমাণ মানুষের খাবারের চাহিদা মেটাতে ভারত সরকারকে প্রতিদিনই সংগ্রাম করতে হয়েছে। প্রতিটি রাজ্যের অর্থনীতিতে এই বিশাল জনস্রোত তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক সাহায্য ছাড়া এই মানবিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
ভারতের মানবিক ভূমিকা - বিশ্ব ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত
ভারত শুধু শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়নি, তাদের জীবিত রাখার জন্য বিশ্ব ইতিহাসে বিরল এক মানবিক উদ্যোগ নিয়েছিল। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের এক দৃঢ় নৈতিক অবস্থান।
ক্যাম্প স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা
ব্যাপক আয়োজন: পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয় মিলিয়ে সীমান্তজুড়ে হাজারো শরণার্থী শিবির স্থাপন করা হয়। এই শিবিরগুলো পরিচালনার জন্য ভারত সরকার বিশাল অঙ্কের অর্থ এবং প্রশাসনিক শক্তি নিয়োগ করেছিল।
আর্থিক ব্যয়: ভারত সরকার এই শরণার্থীদের ভরণ-পোষণে যে অর্থ ব্যয় করেছিল, তা তাদের নিজস্ব বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। একটি হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে ভারতের মোট জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছিল শরণার্থী সহায়তায়।
ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা
ভারত সরকার শরণার্থীদের জন্য প্রতিদিন টন–টন চাল, ডাল, গম ও প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করত।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: চিকিৎসক দল, নার্স, ওষুধ, এবং অস্থায়ী হাসপাতাল বেড, সবকিছু ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভারতীয় সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ, স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাদ্য, পোশাক ও অন্যান্য সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল।
মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা ও প্রশিক্ষণ
ভারতের পূর্বাঞ্চলে হাজারো মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে ওঠে। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিএসএফ (BSF) এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তা দিত। শরণার্থী ক্যাম্পগুলো ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি নিরাপদ পশ্চাৎভূমি (Rear Base) এবং তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্র।
রাজ্যগুলোর আত্মত্যাগ - মানবিকতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ
শরণার্থী সংকটের ভার বিভিন্ন রাজ্যের জনগণ যেভাবে বহন করেছিল, তা ছিল ভারতীয় সমাজের মানবিক সহানুভূতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
পশ্চিমবঙ্গ - সর্বাধিক ভারের কেন্দ্র
প্রায় ৭৫ লাখ শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেওয়ায় এটি হয়ে ওঠে শরণার্থী সংকটের কেন্দ্রস্থল।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন: কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে, স্কুল-কলেজের ক্লাসরুমে শরণার্থীদের রাখা হয়, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বাঙালির সংহতি: পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি শরণার্থীদের সঙ্গে এক, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। খাদ্য, পোশাক, আশ্রয়, চিকিৎসায় এগিয়ে আসে এই সাধারণ মানুষ, যা দুই বাংলার মানুষের ঐতিহাসিক সংহতিকে পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করে।
ত্রিপুরা - ছোট রাজ্য, বড় হৃদয়
ত্রিপুরার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। মাত্র ১৪ লাখ জনসংখ্যার এই ক্ষুদ্র রাজ্যকে আশ্রয় দিতে হয়েছিল ১৪,১৬,৪৯১ জন শরণার্থী, প্রায় স্বাভাবিক জনসংখ্যার সমান বা বেশি!
চাপের তীব্রতা: এই জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে গিয়ে ত্রিপুরার অর্থনীতি ও জনজীবন চরম সংকটে পড়েছিল।
আদিবাসী ও বাঙালি সংহতি: ত্রিপুরার সমাজ হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী সবাই এগিয়ে এসে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ত্রিপুরা ১৯৭১ সালের মানবিক সংকটে “ভারতের ছোট রাজ্য, বড় হৃদয়” হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
অন্যান্য অঞ্চলের ভূমিকা
মেঘালয় (৬,৬৭,৯৮৬ জন) এবং আসাম (৩,১২,৭১৩ জন) এর পাহাড়ি ও সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতেও বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়। বিশেষ করে মেঘালয়ের চিরাঞ্জীব পাহাড়ি রাজ্যে এবং আসামের বরাক উপত্যকায় শিবিরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও শরণার্থী সংকট
শরণার্থী স্রোত শুধু মানবিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। এই সংকট বিশ্বকে দুই শিবিরে বিভক্ত করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও বিশ্ব জনমত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার কৌশলগত কারণে পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছিলেন, এমনকি গণহত্যার তথ্য জানার পরেও।
কিন্তু আমেরিকান জনগণ ও মিডিয়া শরণার্থীদের দুর্দশা দেখে নিক্সন সরকারের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করে। পণ্ডিতেরা মনে করেন, এই জনমতের চাপ নিক্সন প্রশাসনকে কিছুটা হলেও মানবিক সহায়তা পাঠাতে বাধ্য করেছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন
সোভিয়েত ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতকে সমর্থন দেয়। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে, তারা জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনকারী প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে ভেটো দেয়, যা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া থেকে ভারতকে রক্ষা করে এবং সামরিক বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।
বিশ্বজুড়ে সহানুভূতি
শরণার্থী চাপ বিশ্বকে বুঝিয়ে দেয় পাকিস্তানের দমন-পীড়ন আর লুকানো নেই; এটি এক বড় মানবিক বিপর্যয়। পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং জর্জ হ্যারিসনের মতো শিল্পীরা 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জনমত ও তহবিল সংগ্রহে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।
শরণার্থী সংকট মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে ত্বরান্বিত করেছিল
শরণার্থী স্রোত ভারতের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং নিরাপত্তায় তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ঢল, যাদের বাঁচিয়ে রাখা এক কঠিন দায়িত্ব ছিল। এর ফলে:
কূটনৈতিক চাপ: ভারত আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে বাধ্য হয়, বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এই সংকট কেবল মানবিক নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও সামরিক কারণ।
সহায়তা বৃদ্ধি: শরণার্থী শিবিরগুলোর মাধ্যমে ভারত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা বৃদ্ধি করে এবং তাদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়।
সামরিক হস্তক্ষেপ: শরণার্থী সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় এবং ভারতের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায়, ভারত সরকার একসময় বুঝতে পারে, রাজনৈতিক সমাধানের চেয়ে সামরিক হস্তক্ষেপই দ্রুততম পথ। অবশেষে, ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ভারত যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
অর্থাৎ, শরণার্থী সংকট মুক্তিযুদ্ধের গতিকে অনিবার্যভাবে ত্বরান্বিত করেছিল এবং ভারতকে সামরিক পদক্ষেপে বাধ্য করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে প্রত্যাবর্তন - ঘরে ফেরার পথে চ্যালেঞ্জ
১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শরণার্থীরা নিজ দেশে ফিরতে শুরু করে। এটি ছিল আনন্দ ও কষ্টের এক মিশ্র অনুভূতি।
প্রত্যাবর্তনের চ্যালেঞ্জ: শরণার্থীরা যখন শূন্য ভিটেমাটিতে ফিরে আসে, তখন তাদের সামনে ছিল ভস্মীভূত ঘরবাড়ি, লুট হওয়া সম্পদ, এবং পরিবার হারানোর বেদনা।
নতুন জীবন শুরু: তবুও স্বাধীনতার আনন্দে হাজারো পরিবার নতুন করে জীবন শুরু করে। তাদের এই প্রত্যাবর্তন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ।
মানবতার জয়ে সজ্জিত এক বিরল উদাহরণ
১৯৭১ সালের শরণার্থী সংকট কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি বাঙালির বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সাক্ষ্য। এই ১ কোটি মানুষের দুর্ভোগ, ত্যাগ, চোখের পানি এবং লড়াই–ই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনের বাস্তব শক্তি। ভারতের সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক মানবিক উদ্যোগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, সব মিলিয়ে এই সংকট শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথে নতুন ভোর এনে দেয়।
১৯৭১-এর শরণার্থী স্রোত বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়: একটি জাতি স্বাধীনতার জন্য কী অসীম ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, এবং মানবিক সংকটে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া মহাদেশের ইতিহাসেও এক বড় মানবিক বিপর্যয় এবং মানবতার জয়ে সজ্জিত এক বিরল উদাহরণ।
আজও যখন আমরা ১৯৭১-এর শরণার্থীদের স্মরণ করি, তখন বুঝতে পারি, স্বাধীনতা কখনোই বিনা মূল্যে আসে না; এর পেছনে থাকে রক্তাক্ত ইতিহাস, কোটি মানুষের ত্যাগ ও অগণিত অশ্রু।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.














