জামায়াতে ইসলামীর যেসব নেতারা সুকৌশলে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল
প্রায় ৬৭২ জন গণহত্যায় সরাসরি সহায়তাকারী তথা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে বা অন্য দেশে পালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে যখন পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পারে, তখন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব পরিকল্পিতভাবে দেশ ছেড়ে পলায়নের পথ বেছে নেয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন এবং ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।

TruthBangla

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বাধিক গৌরবোজ্জ্বল অথচ চরম বেদনাবিধুর এক অধ্যায়। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হলেও এই অর্জনের পেছনে ছিল ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানির রক্তাতুর ইতিহাস। এটি ছিল একটি পরাশক্তি ও তার ঘৃন্য গোলামদের দ্বারা নিরস্ত্র বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা।
এই পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞে দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সরাসরি মাঠপর্যায়ে সহায়তা করেছিল এদেশীয় কতিপয় রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠন। এদের মধ্যে সর্বাগ্রে আসে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের অঙ্গসংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ (যা স্বাধীনতার পর নাম পরিবর্তন করে 'ইসলামী ছাত্রশিবির' রূপ ধারণ করে)। এছাড়া রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল হিসেবে গঠন করা হয়েছিল ‘শান্তি কমিটি’ (Peace Committee), এবং এর সশস্ত্র মিলিশিয়া কিলিং স্কোয়াড ‘আলবদর’ ও ‘আলশামস’।
পাকিস্তানি বাহিনী যখন ভূ-প্রকৃতি, স্থানীয় সমাজ এবং বাঙালি মুক্তিকামী মানুষের ভাষা ও অবস্থান সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ছিল, তখন এই এদেশীয় দোসররাই ঘাতকদের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করেছিল। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, মুক্তিকামী মানুষের তালিকা তৈরি করে হানাদারদের হাতে তুলে দেওয়া, নারীদের নির্যাতন ক্যাম্পে সোপর্দ করা এবং হিন্দু সম্প্রদায় ও বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করে নিঃশেষ করার মতো জঘন্য অপরাধগুলো এই বাহিনীগুলোর প্রত্যক্ষ তদারকিতেই সংঘটিত হয়।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষভাগে, যখন যৌথ বাহিনীর (মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী) যৌথ আক্রমণে পরাজয় সুনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন এই ঘৃণ্য অপরাধীরা তাদের অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত বিজয় অর্জনের প্রাক্কালে এবং বিজয়ের অব্যবহিত পর, জনরোষ ও আইনি বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচতে চিহ্নিত হাজার হাজার রাজাকারের সাথে শীর্ষস্থানীয় ঘাতকরা সুপরিকল্পিতভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তৎকালীন সরকারি ও গোয়েন্দা তথ্যানুসারে, প্রায় ৬৭২ জন চিহ্নিত শীর্ষ গণহত্যায় সহায়তাকারী সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী ভারত হয়ে, কিংবা পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
পরবর্তীকালে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের যে পটপরিবর্তন ঘটে, তা এই পরাভূত অপশক্তিকে পুনরায় দেশে ফিরে আসার এবং রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক কলঙ্কজনক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়।

গোলাম আযম: যুদ্ধাপরাধের মাস্টারমাইন্ড
গোলাম আযম নামটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঘৃনিত নাম। গোলাম আযম একাত্তরের নিষ্ঠুরতা এবং সুসংগঠিত অপরাধের একটি প্রতীক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি সুসংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশদাতা বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন তিনি।
দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় গোলাম আজমের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রবন্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের "দুষ্কৃতকারী", "ভারতের এজেন্ট" এবং "পাকিস্তানের শত্রু" বলে অভিহিত করতেন। তাঁর গঠিত শান্তি কমিটি ও সশস্ত্র মিলিশিয়া রাজাকার বাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দিতেন মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনচেতা বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের হত্যা ও নির্মুল করতে। জামায়াতের দলীয় প্রধান বা আমির হিসেবে তাদের সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘আল-বদর’ ও ‘আল-শামস’ বাহিনীকেও নিয়ন্ত্রণ ও দিকনির্দেশনা দিতেন গোলাম আজম।
শান্তি কমিটি ও গণহত্যার নীলনকশা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে যখন ঢাকা রক্তে ভেসে যায়, ঠিক তার পরদিনই গোলাম আযম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হলের ভয়াবহতার পর পাকিস্তানি বাহিনীর জেনারেল টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাত করে পূর্ণ সমর্থনের ওয়াদা করেন। তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও নেতৃত্বে গঠিত হয় সশস্ত্র ‘শান্তি কমিটি’ ও ‘রাজাকার মিলিশিয়া বাহিনী’। নাম শান্তি কমিটি হলেও, এদের কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা সম্পন্ন মানুষদের চিহ্নিত করা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য খাদ্য, বাসস্থান ও নারী সরবরাহের বন্দোবস্ত করা। এই শান্তি কমিটির মাধ্যমেই গ্রামগঞ্জে ঘুরে ঘুরে রাজাকার বাহিনীতে সদস্য নিয়োগ ও গণহত্যার উস্কানি দেওয়া হতো।
মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি একাধিকবার পাকিস্তান সফরে যান এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠক করে বিশ্বজুড়ে প্রচার করেন, “বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা হচ্ছে না, বরং ভারতের প্ররোচনায় কিছু দুষ্কৃতকারী গোলযোগ সৃষ্টি করছে।“ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ‘ভারতের ষড়যন্ত্র’ এবং ‘ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে প্রচার করেন। গোলাম আযমের মূল ভূমিকা ছিল পাকিস্তানের গণহত্যাকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া। তার সেই প্রচারণা আড়ালে পাকিস্তানি সেনারা আরো নৃশংস হয়ে উঠেছিল।
সুকৌশলে পলায়ন: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে যখন যৌথ বাহিনীর অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এবং ঢাকার পতন আসন্ন হয়ে পড়ে, তখন গোলাম আযম তার নিশ্চিত পরিণতির কথা বুঝতে পারেন। ২২শে নভেম্বর তিনি চতুরতার সাথে দেশত্যাগ করে করাচিতে পালিয়ে যান। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের পর তিনি লাহোরে অবস্থান করে 'পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি' গঠন করেন।
আরবে বাংলাদেশ বিরোধী চক্রান্ত: বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার পরও স্বাধীনতার বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও বিভিন্ন মুসলিম দেশ সফর করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানকে পুনরায় পাকিস্তানের অংশ করতে মধ্যপ্রাচ্যে লবিং করেন, প্রচুর ফান্ড সংগ্রহ করেন এবং বাংলাদেশকে সাহায্য না করতে অনুরোধ করতে থাকেন। তিনি সৌদির বাদশাকে সাতবার অনুরোধ করেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে এবং কোনো প্রকার সাহায্য না করতে। তিনি প্রচার করতেন যে, বাংলাদেশে ইসলাম বিপন্ন এবং এটি ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালে সরকার এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা বিবেচনা করে তার নাগরিকত্ব বাতিল করে। তিনি হয়ে পড়েন রাষ্ট্রহীন একজন ব্যক্তি।
১৯৭৫ পরবর্তী পুনর্বাসন: ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গোলাম আযম সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে একজন পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে ‘ট্যুরিস্ট ভিসা’ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি আর পাকিস্তান ফিরে যাননি। তৎকালীন সরকারের মদদে তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করে গোপনে জামায়াতে ইসলামীকে পুনর্গঠিত করতে থাকেন।
গোলাম আযমের নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে এবং তাতে জামায়াতের সমর্থন প্রয়োজন হলে গোলাম আযমের প্রভাব প্রকাশ্যে রূপ নেয়। ১৯৯১ সালের শেষভাগে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ঘোষণা করা হয়। একজন নাগরিকত্বহীন বিদেশী নাগরিক কীভাবে দেশের রাজনৈতিক দলের প্রধান হন এ নিয়ে ফুঁসে ওঠে দেশবাসী।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ এবং ১৯৯২ সালের ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে ‘গণআদালত’। এই গণআদালতে গোলাম আযমকে একাত্তরের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, যা দেশজুড়ে বিশাল সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয়।
শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে উচ্চ আদালতের এক বিতর্কিত রায়ে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পান। এই রায়ের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
যুদ্ধাপরাধের বিচার: দীর্ঘ ৩৯ বছরের প্রতীক্ষা শেষে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠিত হলে গোলাম আযমকে ২০১২ সালে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মোট ৫টি ক্যাটাগরিতে (নিয়ন্ত্রণমূলক দায়, ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি এবং অপরাধে বাধা না দেওয়া) ৬১টি মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
২০১৩ সালের ১৫ই জুলাই ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে গোলাম আযমকে একাত্তরের সমস্ত অপরাধের প্রধান নির্দেশদাতা ও সমন্বয়ক হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে। রায়ে বলা হয়, তার অপরাধ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য হলেও, তার বয়স (৯০ বছরের বেশি) ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড (যা কার্যত ৯০ বছরের কারাদণ্ড) প্রদান করা হয়।
অবশেষে ২০১৪ সালের ২৩শে অক্টোবর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে এই সাজাপ্রাপ্ত ঘৃন্য কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুতে একটি বড় কলঙ্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, তার কৃতকর্মের ক্ষত সর্বদা বয়ে বেড়াবে বাংলাদেশ।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ: ঢাকার ডেথ স্কোয়াড প্রধান ও বধ্যভূমির কসাই
গোলাম আযম যদি যুদ্ধের মস্তিষ্ক হয়ে থাকেন, তবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ছিলেন সেই যুদ্ধের ধারালো অস্ত্র। একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনীর সবচেয়ে হিংস্র সহায়ক বাহিনী ছিল ‘ঢাকা শহর আলবদর বাহিনী’, আর এর সার্বিক তদারকি ও পরিচালনায় ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।
আলবদর বাহিনী ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালে মুজাহিদ ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলার সভাপতি এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সভাপতি হন (নিজামীর পর)। একই সাথে তিনি ছিলেন ঢাকার আলবদর বাহিনীর প্রধান। আলবদর বাহিনীকে বলা হতো পাকিস্তানি বাহিনীর 'ডেথ স্কোয়াড'। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকদের হত্যা করে নবজাতক রাষ্ট্রটিকে মেধা শূন্য করে দেওয়া। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকা তৈরি করে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব দেন মুজাহিদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ড. সেলিনা পারভীন, শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরীসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে চোখ বেঁধে মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজের আলবদর ক্যাম্প ও টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্মম নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করে রায়েরবাজার ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমিতে ফেলে রাখা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের স্পটগুলোতে মুজাহিদ নিজে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনা দিতেন বলে আদালতে নিরপেক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত হয়।
পলায়ন ও পুনর্বাসন: পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথেই মুজাহিদ ঢাকার কাটাবন ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকেন। পরবর্তীতে কৌশলে তিনি সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন ইসলামিক চ্যারিটি সংস্থায় কাজ করার নামে জামায়াতের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন।
১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে জামায়াতের রাজনীতিতে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে এক পর্যায়ে তিনি দলের সেক্রেটারি জেনারেলের পদে উন্নীত হন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তিনি জোট সরকারের টেকনোক্র্যাট সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী থাকাকালে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে উদ্ধত কণ্ঠে দাবি করেছিলেন,
"বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই এবং একাত্তরে কোনো গৃহযুদ্ধ হয়েছিল মাত্র!"
বিচার ও ফাঁসি: ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ অসংখ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ২০১৫ সালের ২২শে নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমে ১৬ই ডিসেম্বরের ঠিক আগে যে হত্যার উৎসব তিনি শুরু করেছিলেন, তার চূড়ান্ত বিচারিক সমাপ্তি ঘটে।
তৎকালীন সময়ের প্রসিকিউশন টিমের ভাষ্য ছিল: "মুজাহিদ ছিলেন সেই ঘাতক, যার হাতে লেগে ছিল এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্ত।"

মতিউর রহমান নিজামী: বুদ্ধিজীবী হত্যার নকশাকার
একাত্তরে যে বুদ্ধিজীবী হত্যার ভয়াবহ নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, তার মূল কারিগর ও বাস্তবায়নকারী ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। তিনি ছিলেন কুখ্যাত ঘাতক মিলিশিয়া বাহিনী 'আলবদর' এর প্রধান সমন্বয়ক।
আলবদর বাহিনীর গঠন: ১৯৭১ সালে মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি। পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দমনে ইয়াহিয়া খান ও রাও ফরমান আলীর নির্দেশে তিনি ছাত্রসংঘের ক্যাডারদের নিয়ে গঠন করেন কুখ্যাত ‘আলবদর’ মিলিশিয়া বাহিনী। আলবদর ছিল মূলত একটি বিশেষায়িত 'কিলিং স্কোয়াড'।
দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় একাত্তরে নিজামীর বক্তব্য ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি খোলাখুলিভাবে মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর আক্রমণের নির্দেশ ও উসকানি দিতেন। তিনি আলবদরকে ‘আজরাইলের বাহিনী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বিচারে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল নকশা নিজামী তার সহযোগী ছাত্রসংঘের নেতাদের নিয়ে তৈরি করেছিলেন।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ মতিউর রহমান নিজামী এক ভাষণে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান সম্পর্কে বলেন,
“যে বিশ্বাসঘাতক বিগত ২০ শে আগস্ট একটি ট্রেনিংদাতা জেট বিমানকে ভারতে হাইজ্যাক করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় তার নাম হচ্ছে মতিউর রহমান। মতিউর রহমান ভারতের এজেন্ট ও দুস্কৃতিকারী, রশীদ মিনহাজ বীর শহীদ। পাকিস্তানি ছাত্রসমাজ তার এ মহান আত্মত্যাগে গর্বিত। ভারতীয় হানাদার ও এজেন্টদের মোকাবেলায় মহান শহীদ মিনহাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অক্ষুন্ন রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।” (দৈনিক সংগ্রাম)
পরাজয়ের মুহূর্তে পলায়ন: পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের খবর পাওয়ার পরপরই নিজামী আত্মগোপন করেন। অত্যন্ত চতুরতার সাথে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে ছদ্মবেশে পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় নেন। তিনি জানতেন, স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে আস্ত রাখবে না।
১৯৭১ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছর তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করেন। এসময় তিনি লাহোর ও করাচিতে বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশকে একটি ‘অনৈসলামিক বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল’ হিসেবে চিত্রায়িত করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আটকে দেওয়ার চক্রান্ত করেন।
রাজনৈতিক পুনর্বাসন: ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে দালাল আইন বাতিল হলে নিজামী স্বগর্বে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি প্রথমে ইসলামী ছাত্রশিবির এবং পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন।
সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায় রচিত হয় ২০০১ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে নিজামী প্রথমে কৃষি এবং পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। যে লাল-সবুজ পতাকাকে তিনি একাত্তরে ‘পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ চেষ্টা করেছিলেন, সেই পতাকাবাহী গাড়িতে চড়ে তিনি সচিবালয়ে গমনাগমন করতেন, যা ছিল ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে এক চরম বিদ্রূপ।
বিচার ও শেষ পরিণতি: ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ ও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশে পাবনার সাঁথিয়ায় ভয়াবহ গণহত্যার নির্দেশসহ ১৬টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয় যে, তিনি কেবল আলবদর প্রধানই ছিলেন না, বরং হত্যাকাণ্ডের সরাসরি উস্কানিদাতাও ছিলেন।
২০১৪ সালের ২৯শে অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। অবশেষে ২০১৬ সালের ১১ই মে দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমে ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং জাতি কিছুটা হলেও দায়মুক্ত হয়।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: ‘দেইল্লা’ রাজাকার থেকে ওয়াজের বক্তা
একাত্তরে পিরোজপুর অঞ্চলে সাঈদী গঠন করেছিলেন কুখ্যাত ‘জহুরুল হক বাহিনী’। এটি ছিল মূলত রাজাকার ও শান্তি কমিটির একটি সমন্বিত আঞ্চলিক ক্যাডার গ্রুপ। সাঈদী পাকিস্তানি সৈন্যদের পথ দেখিয়ে পিরোজপুর শহর, পাড়েরহাট বন্দর এবং আশেপাশের হিন্দুপ্রধান গ্রামগুলোতে নিয়ে যেতেন।
পিরোজপুরের বিভীষিকা: একাত্তরে সাঈদী পরিচিত ছিলেন 'দেইল্লা' নামে। ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের বয়ানে উঠে এসেছিল কীভাবে তিনি বহু হিন্দু পরিবারকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেছিলেন, শত শত বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে মালামাল লুট করেছিলেন এবং পাড়েরহাটের লুণ্ঠিত মালামাল দিয়ে নিজে চাল-ডালের ব্যবসা খুলেছিলেন। একাধিক নারীকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে তুলে দেওয়ার পেছনে তার সরাসরি ভূমিকা ছিল। পাড়েরহাট বন্দরে লুণ্ঠন ও ধর্ষণের সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল সরাসরি।
আত্মগোপন ও মধ্যপ্রাচ্যে পলায়ন: দেশ স্বাধীনের পর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাঈদী পিরোজপুরের দুর্গম এলাকায় এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ছদ্মবেশে আত্মগোপন করেন। ১৯৭৪ সালের দিকে তিনি গোপনে ছদ্মবেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি মূলত নিজেকে একজন খাঁটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন মহলের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
ধর্মীয় ছদ্মবেশে প্রত্যাবর্তন: ১৯৭৮-৭৯ সালের দিকে সাঈদী বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি এক নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি চমৎকার বাচনভঙ্গি ও সুর দিয়ে ওয়াজ মাহফিল করা শুরু করেন। বাংলাদেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও সরলতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তার এই ধর্মীয় বক্তা বা ‘আল্লামা’ ভাবমূর্তি ব্যবহার করে তিনি নিজের একাত্তরের ভয়াবহ অপরাধমূলক অতীত সম্পূর্ণ চেপে যেতে সক্ষম হন। ধীরে ধীরে তিনি বিপুল সংখ্যক অন্ধ অনুসারী তৈরি করতে সক্ষম হন, যারা তার একাত্তরের অপকর্ম সম্পর্কে জানত না বা জেনেও ধর্মীয় আবেগের কারণে তা এড়িয়ে যেত। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর ব্যানারে পিরোজপুর থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বিচার ও আমৃত্যু কারাদণ্ড: ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে গ্রেফতার করে। ২০১৩ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীকে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টিতে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। এই রায়ের পর জামায়াত-শিবির সারাদেশে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়, যাতে বহু পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান।
পরবর্তীকালে ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সাঈদীর বয়স ও আপিলের সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে সাজা কমিয়ে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ প্রদান করে। কারাবন্দী অবস্থায় ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (BSMMU) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

আব্বাস আলী খান: দখলদার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী
আব্বাস আলী খান ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় প্রবীণ নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে দখলদার খুনী বাহিনীর অন্যতম দোসর।
আব্বাস আলী খান স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে যখন যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তান কোণঠাসা, তখন বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করতে এবং একটি ‘বেসামরিক শাসন’ দেখানোর জন্য ১৯৭১ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ড. এ এম মালিকের নেতৃত্বে এক পুতুল মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। আব্বাস আলী খান এই মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাকিস্তানি ভাবধারা টিকিয়ে রাখা এবং শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করা এবং মুক্তিকামী বাঙালির ওপর দমন-নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।
গ্রেফতার, মুক্তি ও পাকিস্তানে পলায়ন: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পর যে কয়জন শীর্ষ দালাল গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, আব্বাস আলী খান ছিলেন তাদের একজন। ১৯৭২ সালের দালাল আইনে তার বিচার শুরু হয়। তবে ১৯৭৩ সালে সাধারণ ক্ষমার সুযোগে ও আইনি ফাঁকফোকরে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। জেল থেকে বের হয়েই তিনি সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে চলে যান।
প্রত্যাবর্তন ও জামায়াত পরিচালনা: ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালে যখন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে পুনরায় তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে, তখন আব্বাস আলী খান দলটির মূল সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
যেহেতু গোলাম আযম তখন নাগরিকত্বহীন একজন বিদেশী হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন, তাই আইনের চোখ বাঁচাতে আব্বাস আলী খান দীর্ঘ সময় জামায়াতে ইসলামীর ‘ভারপ্রাপ্ত আমীর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জামায়াতকে পুনর্গঠন করতে মূল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৯ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে এই নেতার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পূর্বে বিচার প্রক্রিয়া শুরু না হলেও ইতিহাসের পাতায় তিনি একজন চিহ্নিত ঘাতক দালাল হিসেবেই নথিভুক্ত আছেন।

চৌধুরী মুঈনউদ্দিন: ১৪ই ডিসেম্বরের ‘অপারেশন ইন-চার্জ’
বুদ্ধিজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার যে নীল নকশা বাস্তবায়িত হয়েছিল, তার প্রত্যক্ষ অপারেশনাল ফিল্ড কমান্ডার ছিলেন চৌধুরী মুঈনউদ্দিন। চৌধুরী মুঈনউদ্দিন ছিলেন জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা এবং তৎকালীন 'দৈনিক পূর্বদেশ' পত্রিকার সাংবাদিক। সাংবাদিকতার সুবাদে তিনি শহরের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাহিত্যিক ও চিকিৎসকদের চিনতেন এবং তাদের বাসা-বাড়ির অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন।
আলবদর বাহিনীর 'অপারেশন ইন-চার্জ': তিনি আলবদর বাহিনীর ‘অপারেশন ইন-চার্জ’ (Operation In-Charge) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, ডা. ফজল রাব্বী, ডা. আলিম চৌধুরীর মতো ১৮ জন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে কাদাজল মাখা গাড়ি দিয়ে রাতে বাসা থেকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
যুক্তরাজ্যে পলায়ন: দেশ স্বাধীনের ঠিক আগ মুহূর্তে পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয় দেখে চৌধুরী মুঈনউদ্দিন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নেপাল যান এবং সেখান থেকে দ্রুত যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) পালিয়ে যান। লন্ডনে গিয়ে তিনি তার পরিচয় গোপন রেখে সেখানকার মুসলিম কমিউনিটিতে প্রভার বিস্তার করতে শুরু করেন। তিনি ‘মুসলিম এইড’ (Muslim Aid) নামক আন্তর্জাতিক চ্যারিটি সংস্থার চেয়ারম্যান হন এবং ‘ইসলামিক ফোরাম ইউরোপ’ গঠন করেন। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করে তিনি সেখানে একজন সম্মানিত নাগরিক ও সমাজসেবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তিনি দেশে ফিরে না আসায় তার অনুপস্থিতিতেই (In Absentia) বিচার কাজ সম্পন্ন হয়। ২০১৩ সালের ৩রা নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চৌধুরী মুঈনউদ্দিনকে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।
বাংলাদেশ সরকার ও ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করলেও যুক্তরাজ্য সরকার তাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। ব্রিটিশ আইনি ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে প্রত্যর্পণ (Extradition) না করার যে ধারা রয়েছে, তা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মুঈনউদ্দিন আজও লন্ডনে বহাল তবিয়তে বাস করছেন। এমনকি ২০২৪ সালে তিনি ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে নিজের ইমেজের ক্ষতি করার অভিযোগে মানহানির মামলা ঠুকে দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেন।

আশরাফুজ্জামান খান: রায়েরবাজারের ঘৃন্য জল্লাদ
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে চৌধুরী মুঈনউদ্দিন যদি থাকেন নির্দেশক হিসেবে, তবে আশরাফুজ্জামান খান ছিলেন সরাসরি নিজ হাতে ট্রিগার টানা হত্যাকারী। অর্থাৎ চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের সহযোগী এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার আরেক অন্যতম কুখ্যাত হত্যাকারী ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। আশরাফুজ্জামান খান ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য এবং আলবদর বাহিনীর চিফ এক্সিকিউটর বা প্রধান জল্লাদ।
আদালতে সাক্ষীদের বয়ান অনুযায়ী, “আশরাফুজ্জামান খান একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছিলেন। তিনি আলবদর বাহিনীর একজন মাঠ পর্যায়ের নেতা ছিলেন এবং জল্লাদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।”
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন শিক্ষককে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেছিলেন।”
বিজয়ের পর তার ঢাকা শহরের বাসা থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছিল, যেখানে ২০ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নাম, তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কোয়ার্টারের নম্বর এবং গাড়ি নম্বর নিজ হাতে লেখা ছিল। এই ডায়েরিই পরবর্তীতে তার অপরাধের সবচেয়ে বড় প্রামাণ্য দলিল হিসেবে আদালতে উপস্থাপিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে পলায়ন ও অবস্থান: পরাজয়ের সাথে সাথে আশরাফুজ্জামান খান প্রথমে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। সেখানে কিছুকাল অবস্থানের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে গিয়ে তিনি 'ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা' (ICNA)-এর শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন।
২০১৩ সালের ৩রা নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকেও অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। বাংলাদেশ সরকার বহুবার যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে চিঠি দিলেও তাকে আজ পর্যন্ত ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। নিউ ইয়র্কের কুইন্সে তিনি মুক্তভাবে জীবনযাপন করছেন, যা শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের জন্য এক গভীর ক্ষোভের কারণ।
ঘসিয়াতুল হক মজনু: ছদ্মবেশে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত আলবদর
ঘসিয়াতুল হক মজনু নামটি অনেকের কাছে অপরিচিত মনে হতে পারে, কিন্তু একাত্তরে আলবদর বাহিনীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থেকে যেসব অপরাধী নিজেদের আড়াল করতে পেরেছিল, তাদের মধ্যে ঘসিয়াতুল হক মজনু অন্যতম।
পাকিস্তানি বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তা: ঘসিয়াতুল হক মজনু ১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং আলবদর বাহিনী গঠিত হলে তিনি এতে যোগ দেন। ঢাকা ও আশেপাশের অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের খবরাখবর সরবরাহ করা এবং স্থানীয় রাজাকার ক্যাম্প তদারকি করাই ছিল তার মূল কাজ।
পাকিস্তানে পলায়ন ও দেশে ফেরা: স্বাধীনতার পর জনরোষের হাত থেকে বাঁচতে তিনি ভারতে আত্মগোপন করেন এবং পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে পাকিস্তানে চলে যান। তিনি ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে অবস্থান করেন। বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের আমলে যখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত হয়, তখন মজনু রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সুকৌশলে দেশে ফেরেন।
জামায়াতে অবস্থান ও পুনর্বাসন: বাংলাদেশে ফিরে তিনি জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনে যুক্ত হয়ে গোপনে কাজ চালিয়ে যান। তিনি নিজের অতীত ঢাকতে ব্যবসায়ী ও সমাজসেবকের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। যারা একাত্তরের অপরাধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, মজনু তাদের মধ্যে অন্যতম। তার মতো অনেক ব্যক্তিই স্বাধীনতার পর ছদ্মনামে বা আড়ালে থেকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পাকাপোক্ত করেছিলেন। তার মতো শত শত মধ্যম সারির অপরাধী একাত্তরের দায় এড়িয়ে বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক: জামায়াত ত্যাগী আইন ঢাল
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সরাসরি ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি ছিলেন না, কিন্তু বাংলাদেশে একাত্তরের বিচার প্রক্রিয়ার ইতিহাসে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিতর্কিত।
ট্রাইব্যুনাল ও প্রস্থান: লন্ডন থেকে উচ্চতর আইনি ডিগ্রিধারী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। ২০১০ সালে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় এবং গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদীসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়, তখন বিবাদী পক্ষের প্রধান কৌঁসুলি (Chief Defense Counsel) হিসেবে দায়িত্ব নেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক।
তখন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন বিবাদী পক্ষের প্রধান আইনজীবী। তার আইনি দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মহলে যোগাযোগ জামায়াতের জন্য বড় ভরসা ছিল। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের নিয়ে একটি আইনি টিম গঠন করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে (বিশেষ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও বিভিন্ন ব্রিটিশ আইনি ফোরামে) দাবি করতে থাকেন যে, এই ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানের নয় এবং এটি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক’।
২০১৩ সালের শেষের দিকে, যখন একের পর এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় আসতে শুরু করে এবং রাজপথে আন্দোলন জোরদার হয়, তখন ব্যারিস্টার রাজ্জাক হঠাৎ করেই আইনি লড়াই অসম্পূর্ণ রেখে যুক্তরাজ্যে চলে যান। অনেকেই মনে করেন, সরকারের সম্ভাব্য আইনি চাপ ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ এড়াতেই তিনি লন্ডন পাড়ি জমিয়েছিলেন।
জামায়াত থেকে পদত্যাগ: লন্ডনে প্রবাস জীবনযাপনকালে ২০১৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জামায়াতে ইসলামী থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করে এক নজিরবিহীন তোলপাড় সৃষ্টি করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লেখেন:
"জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করে যে ঐতিহাসিক ভুল করেছিল, তার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে ব্যর্থ হয়েছে। একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়া এবং দলীয় সংস্কার না করার কারণে আমি পদত্যাগ করছি।"
তিনি লন্ডনে অবস্থানকালে আম জনতা (AB) পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তবে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন এবং ২০২৫ সালের ৪ মে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে এই প্রভাবশালী আইনজীবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু জামায়াতের রাজনীতির এক বড় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটায়।
একনজরে পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত ঘাতকদের তালিকা
নাম | একাত্তরে প্রধান ভূমিকা | পলায়ন ও পুনর্বাসন | বিচার ও শেষ পরিণতি |
গোলাম আযম | শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা; যুদ্ধের 'মাস্টারমাইন্ড' ও রাজনৈতিক বৈধতা দানকারী। | ১৯৭১-এর নভেম্বরে পাকিস্তানে পলায়ন। ১৯৭৮-এ পাকিস্তানি পাসপোর্টে পর্যটক হিসেবে প্রত্যাবর্তন। | ২০১৩ সালে ৯০ বছরের কারাদণ্ড; ২০১৪ সালে কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যু। |
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ | ঢাকা শহর আলবদর প্রধান; বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সরাসরি তদারককারী। | স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানে পলায়ন; ১৯৮০-তে ফিরে এসে ২০০১-এ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন। | ২০১৩ সালে মৃত্যুদণ্ড; ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর ফাঁসি কার্যকর। |
মতিউর রহমান নিজামী | আলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় প্রধান; বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্লু-প্রিন্ট প্রণয়নকারী। | ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানে পলায়ন। ১৯৭৮-এ দেশে ফিরে কৃষি ও শিল্প মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন। | ২০১৬ সালের ১১ মে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ফাঁসি কার্যকর। |
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী | পিরোজপুরের 'জহুরুল হক বাহিনী'র সদস্য; লুণ্ঠন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরে অভিযুক্ত। | যুদ্ধের পর আত্মগোপন ও সৌদি আরব পাড়ি। ১৯৭৮-৭৯ সালে ফিরে 'ওয়াজ' এর মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া। | আমৃত্যু কারাদণ্ড; ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু। |
আব্বাস আলী খান | পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ড. মালিক মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী। | ১৯৭৩ সালে সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে পাকিস্তানে পলায়ন। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে ফিরে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর। | বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বেই ১৯৯৯ সালে মৃত্যু। |
চৌধুরী মুঈনউদ্দিন | আলবদর বাহিনীর 'অপারেশন ইন-চার্জ'; ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। | যুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যে পলায়ন ও সেখানে মুসলিম কমিউনিটি নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা। | ২০১৩ সালে অনুপস্থিতিতে (In Absentia) মৃত্যুদণ্ড; বর্তমানে লন্ডনে পলাতক। |
আশরাফুজ্জামান খান | আলবদর বাহিনীর জল্লাদ; সাতজন শিক্ষককে নিজ হাতে হত্যার অভিযোগ। | যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে পলায়ন; সেখানে 'ICNA'-র সাথে যুক্ত হওয়া। | ২০১৩ সালে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড; বর্তমানে নিউইয়র্কে পলাতক। |
ঘসিয়াতুল হক মজনু | আলবদর বাহিনীর সক্রিয় সদস্য। | ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে অবস্থান। পরে জিয়ার শাসনামলে দেশে ফিরে জামায়াতের রাজনীতিতে যুক্ত। | সরাসরি বিচারিক তথ্য না থাকলেও জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। |
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক | যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান আইনি পরামর্শক ও জামায়াতের শীর্ষ নেতা। | ২০১৩ সালে বিচার চলাকালীন যুক্তরাজ্যে প্রস্থান। ২০১৯ সালে জামায়াত থেকে পদত্যাগ। | ২০২৪-এ দেশে প্রত্যাবর্তন; ২০২৫ সালের ৪ মে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু। |
কেন এই পলায়ন এবং ফিরে আসা?
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে গণহত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা ছিল এক পরম ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা। এই লক্ষ্যেই ১৯৭২ সালে 'দালাল আইন (The Bangladesh Collaborators Order, 1972)' প্রণয়ন করা হয় এবং সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত ট্রাইব্যুনালে ঘাতক-দালালদের বিচার শুরু হয়েছিল।
তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডির পর দেশের রাজনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। পঁচাত্তর-পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী কেবল এই বিচার প্রক্রিয়াকেই রুদ্ধ করেনি, বরং ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে জারি করা 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' এবং ক্ষমতার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। স্বৈরশাসন ও সুবিধাবাদী রাজনীতির সুযোগ নিয়ে এসব চিহ্নিত ঘাতকদের দেশে ফেরার রাস্তা সুগম করা হয়, তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করা হয় যা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিষাদময় অধ্যায়।
"ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। যারা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে কিংবা ক্ষমতার ছত্রছায়ায় পার পেতে চেয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তাদের অধিকাংশই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে এবং দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।"
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, অপরাধী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে সত্যকে কখনো ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না।
১৯৭১ সালের সেই ৬৭২ জন পলাতক যুদ্ধাপরাধীর ঐতিহাসিক তালিকা আমাদের সবসময় মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলেও সত্য ও ন্যায়ের জয় অনিবার্য। একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের দেশত্যাগ, বিদেশে গিয়ে স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করার চক্রান্ত এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পুনরুত্থান ছিল জাতীয় চেতনার ওপর বড় আঘাত।
বর্তমান প্রজন্মের মূল দায়িত্ব হলো এই ইতিহাসকে কোনো বিকৃতি ছাড়া সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা। অতীতের ভুল ও চক্রান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সর্বদা আপসহীন থাকাই হোক তরুণ সমাজের অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১ম-১৫শ খণ্ড) - তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার (১৯৮২)।
২. একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় - একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (১৯৯২)।
৩. একাত্তরের দালালরা - ড. কাজী নূর-উজ্জামান (সম্পাদিত)।
৪. মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যা ও আলবদর বাহিনী - বিভিন্ন গবেষণা ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃক প্রকাশিত ঐতিহাসিক ডকুমেন্টেশন।
৫. দ্য বাংলাদেশ কোলাবোরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার, ১৯৭২ (The Bangladesh Collaborators Order, 1972) - বাংলাদেশ গেজেট।
৬. স্বাধীনতার সময়কাল ও পঁচাত্তর-পরবর্তী আর্কাইভ: দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পূর্বদেশ (১৯৭১, ১৯৭২ ও ১৯৭৮ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদন ও তালিকা)।
৭. বিচার প্রক্রিয়া ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলী: প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দৈনিক সমকাল ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) (২০১০-২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও মৃত্যু সংক্রান্ত সংবাদ রিপোর্ট)।















