১৯৭২-৭৫ শেখ মুজিব – ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান বাংলাদেশ
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।

TruthBangla

"ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর, আবার ইতিহাসই বড় সত্যবাদী। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে কখনো কখনো সত্যকে ধুলোচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সময় নিজেই সেই ধুলো সরিয়ে সত্যকে প্রখর সূর্যের আলোর মতো উন্মোচিত করে।"
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল হলো ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।
বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধোত্তর দেশ গড়ার জন্য সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিন। ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২-এ পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর প্রিয় স্বদেশে ফেরা থেকে শুরু করে ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫-এর সেই বেদনাবিধুর রাত পর্যন্ত এই অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি যা করেছিলেন, তা কি কেবল আবেগ ছিল, নাকি ছিল এক অসম্ভবের পথে যাত্রা?
আজ আমরা নির্মোহভাবে, তথ্য ও যুক্তির নিরিখে সেই সময়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করব। ১৫ই আগস্টের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড কি কোনো রাজনৈতিক সমাধান ছিল, নাকি এটি ছিল দেশীয় গাদ্দারদের সহায়তায় একটি নবজাতক রাষ্ট্রের গলা টিপে ধরার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র? নাকি এটি ছিল একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের প্রতিশোধ?
শূন্য থেকে শুরু: একটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র গল্প
১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি। রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। সেই অশ্রু কেবল বিজয়ের আনন্দের ছিল না; তা ছিল এক রিক্ত, সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং রক্তাক্ত স্বদেশের কঙ্কাল দেখার বুকফাটা হাহাকার।
ঠিক সেই মুহূর্তেই তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন ‘বটমলেস বাস্কেট’ (Bottomless Basket) বা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। আজ যখন আমরা একটি উন্নয়নশীল ও অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান বাংলাদেশের গর্ব করি, তখন আমাদের পেছনে ফিরে দেখা প্রয়োজন কেমন ছিল সেই শূন্য থেকে শুরু করার দিনগুলো।
পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ, শূন্য রিজার্ভ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ (Bottomless Basket) কটাক্ষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনগণের আত্মশক্তির ওপর ভরসা রেখেছিলেন।
১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের আশা পূর্ণ হয়েছে... কিন্তু আমার বাংলাদেশ আজ এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। তবে আমার মাটি আছে, আমার মানুষ আছে। যদি আমার মানুষ থাকে, তবে আবার আমরা শূন্য থেকেই সোনার বাংলা গড়ে তুলব।"
মার্কিন সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ এ বাংলাদেশ সফরকালে লিখেছেন, "বাঙালি জাতির এই সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ আধুনিক মানব ইতিহাসের অন্যতম মহান অধ্যায়। যে জাতি শূন্য থেকে নিজের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করেছে, তাদের কোনো অর্থনৈতিক সংকট দিয়ে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়।"
অর্থনীতির ধ্বংসলীলা, শূন্য রিজার্ভ ও রিক্ত হাত
একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাথমিক শর্ত হলো তার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক সংগতি। কিন্তু ১৯৭২ সালের সেই শুরুর দিনগুলোতে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল মরুভূমির মতো শুষ্ক।
লুণ্ঠিত কোষাগার: পাকিস্তানি শাসকেরা এদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় ব্যাংকে গচ্ছিত সমস্ত বৈদেশিক মুদ্রা, সোনা এবং সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে নিয়ে যায়। ফলে যখন বঙ্গবন্ধু ব্যাংকের দায়িত্ব নিলেন, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল আক্ষরিক অর্থেই শূন্য।
শিল্পের পঙ্গুত্ব: স্বাধীনতার আগে এদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল পাট, চামড়া ও বস্ত্র শিল্প। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, ২৩৭টি বড় শিল্পকারখানার মধ্যে ১৯৫টিই সম্পূর্ণ ধ্বংস বা অচল করে দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু, কারখানার দক্ষ ব্যবস্থাপক ও কারিগরি কর্মকর্তারা (যাদের বড় অংশই ছিল অ-বাঙালি বা পাকিস্তানি) দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি থমকে গিয়েছিল।
মুদ্রাস্ফীতির করাল গ্রাস: পাকিস্তানি ব্যাংকের নোট বাতিল করা এবং বাজারে নতুন মুদ্রা চালু করার মধ্যবর্তী সময়ে মুদ্রার চরম অবমূল্যায়ন ঘটে। জোগান ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল।
কৃষি ও খাদ্য সংকট: এক আসন্ন মানবিক বিপর্যয়
বাঙালি চিরকালই কৃষিনির্ভর জাতি। কিন্তু ১৯৭১ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী এদেশে যে ‘পোড়া মাটি নীতি’ (Scorched Earth Policy) প্রয়োগ করেছিল, তার ফলে কৃষি খাত সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে পড়ে।
খাদ্য ঘাটতির পাহাড়: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখা গেল রাষ্ট্রীয় গুদামে কোনো খাদ্যশস্য নেই। অথচ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে হবে। বার্ষিক খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন।
উৎপাদন উপকরণের অভাব: পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার সময় হালের বলদগুলোকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। কৃষকের ঘরে কোনো বীজ ছিল না, জমিতে দেওয়ার মতো সার ছিল না। ঘোড়াশাল সার কারখানাসহ দেশের প্রধান সার উৎপাদন কেন্দ্রগুলো যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চাষাবাদ শুরু করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অবকাঠামোর কঙ্কাল: এক বিচ্ছিন্ন জনপদ
একটি দেশের সচলতার প্রতীক হলো তার যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছিল মূলত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সমষ্টি। পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে পিছু হঠার সময় কৌশলগত কারণে দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ যোগাযোগ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
সেতু ধ্বংসের তাণ্ডব: দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গকে যুক্ত করা ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং ভৈরব ব্রিজের মতো বিশাল স্থাপনাগুলো বোমা মেরে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া আরও প্রায় ৪০০টি ছোট-বড় সেতু ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
রেলপথের চিহ্ন বিলোপ: কয়েকশ কিলোমিটার রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছিল এবং রেলের ইঞ্জিন ও ওয়াগনগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল।
মাইনে অবরুদ্ধ বন্দর: চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনী অসংখ্য সামুদ্রিক মাইন পুঁতে রেখেছিল এবং বড় বড় জাহাজ ডুবিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, স্বাধীনতার পর কোনো বিদেশি সাহায্য বা বাণিজ্যিক জাহাজ যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। (পরবর্তীতে সোভিয়েত নৌবাহিনীর সাহসী সদস্যরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে এই মাইন অপসারণ করেন)।
পোড়া ভিটে ও এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন
স্বাধীনতার পর দেখা গেল দেশের প্রায় ৪৩ লক্ষ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল ভারত থেকে ফিরে আসা এক কোটি চরম সংকটাপন্ন শরণার্থী এবং দেশের ভেতরে থাকা আরও প্রায় তিন কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ। শীতের তীব্রতার মধ্যে মাথার ওপর ছাদহীন এক বিশাল জনসমুদ্রকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
শিক্ষা ও প্রশাসনের মেধা নিধনের ক্ষত
১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে চিরতরে পঙ্গু ও নেতৃত্বহীন করে দেওয়া। প্রশাসন চালানোর মতো দক্ষ জনবল ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা ছিল করুণ প্রায় ৯০০টি কলেজ এবং ৬,০০০-এর বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বা আংশিক পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্র পুনর্গঠন: অসম্ভবকে সম্ভব করার সাড়ে তিন বছর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি বা জাপানের মতো ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশগুলোর পুনর্গঠনে সময় লেগেছিল কয়েক দশক, এবং তাদের পেছনে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর মতো বিশাল বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সাহায্য। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে?
বঙ্গবন্ধুর সামনে কোনো আন্তর্জাতিক তহবিল ছিল না, ছিল না শক্তিশালী কোনো পরাশক্তির সরাসরি বিপুল আর্থিক অনুদান। তাঁর ছিল কেবল অদম্য সাহস আর জনগণের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। এই ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিনে তিনি যে রাষ্ট্রকাঠামো দাঁড়িয়ে করিয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল কীর্তি।
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন (১৯৭২)
একটি রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হলো তার সংবিধান। পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর তাদের প্রথম সংবিধান তৈরি করতে সময় নিয়েছিল দীর্ঘ ৯ বছর (১৯৫৬ সালে প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়)। এমনকি পার্শ্ববর্তী গণতান্ত্রিক দেশ ভারতেরও সময় লেগেছিল প্রায় ৩ বছর।
সেখানে বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান উপহার দেওয়ার উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ গণপরিষদ আদেশ জারি করা হয়। মাত্র ৩২৫ দিনের মাথায় (৪ঠা নভেম্বর ১৯৭২) বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭২ (স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে) তা কার্যকর হয়।
এই সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চার নীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-কে নির্ধারণ করা হয়। এটি এমন এক যুগান্তকারী দলিল ছিল যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সর্বোচ্চ আইনি গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল।
স্বাধীনতার মাত্র ১১ মাসের মাথায় একটি প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান উপহার দেওয়া ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সেরা প্রশাসনিক কীর্তি। ৪ নভেম্বর ১৯৭২ গণপরিষদে সংবিধান গ্রহণের দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "এই সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে লেখা এক পবিত্র আমানত। চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা হলো এই রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি, যা কখনো ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না।"
শিক্ষা ও সংস্কৃতির বৈপ্লবিক রূপান্তর
বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, "একটি শিক্ষিত জাতি ছাড়া কখনো একটি উন্নত দেশ গড়া সম্ভব নয়। শিক্ষায় বিনিয়োগ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।"
প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ (১৯৭৩): ১৯৭৩ সালে এক ঐতিহাসিক ও সাহসী আদেশে বঙ্গবন্ধু দেশের প্রায় ৩৬,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। এর ফলে এক রাতে প্রায় ৭৩,০০০ শিক্ষকের চাকরি সরকারি মর্যাদা লাভ করে। যে রাষ্ট্রের নিজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার মতো সংগতি ছিল না, সেখানে এত বড় সাহসী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন।
বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ: দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা যাতে শিক্ষার সুযোগ পায়, সেজন্য তিনি পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ এবং পড়াশোনা অবৈতনিক করার ঘোষণা দেন।
কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন: একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনে তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন শিক্ষা কমিশন গঠন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ (১৯৭৩): ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়, যাতে মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কোনো সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকে।
১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষাসংক্রান্ত জাতীয় সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "সোনার বাংলা গড়তে হলে আগে 'সোনার মানুষ' চাই। আর সোনার মানুষ তৈরি করার সর্বশ্রেষ্ঠ কারিগর হলেন আমাদের শিক্ষকেরা। শিক্ষায় অর্থব্যয় কোনো অপব্যয় নয়, এটি একটি জাতির জন্য সবচেয়ে দূরদর্শী বিনিয়োগ।"
"আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা চাই যা মানুষকে কেবল কেরানি বানাবে না, বরং দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।"
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ‘দালাল আইন’ (১৯৭২)
একটি মিথ্যা প্রচারণা প্রায়ই চালানো হয় যে, বঙ্গবন্ধু একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেননি। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, স্বাধীনতার মাত্র ৩৮ দিনের মাথায় ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি তিনি ‘দালাল আইন’ (Collaborators Act) জারি করেন।
দেশজুড়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। এই আইনের অধীনে সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রায় ৩৭,০০০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্ত ও বিচারের পর প্রায় ১১,০০০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল।
সাধারণ ক্ষমার বিভ্রান্তি নিরসন: ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু একটি সাধারণ ক্ষমা (General Amnesty) ঘোষণা করেছিলেন বটে, তবে সেখানে একটি কঠোর আইনি রক্ষাকবচ ছিল। যারা হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, বা জলদস্যুতার মতো গুরুতর মানবিক অপরাধে লিপ্ত ছিল, তারা এই ক্ষমার সম্পূর্ণ আওতার বাইরে ছিল। অর্থাৎ, কোনো প্রকৃত ঘাতক বা ধর্ষককে তিনি ক্ষমা করেননি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ১৯৭২সালের ১২মার্চ স্বাধীনতার দলিল বুঝিয়ে দিচ্ছেন ভারতের সেনারা।
সার্বভৌমত্বের অনন্য নজির: মিত্র বাহিনীর দ্রুত প্রত্যাবর্তন
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনা। সাধারণত কোনো দেশ যখন অন্য কোনো দেশে ‘মিত্র শক্তি’ বা ‘ত্রাতা’ হিসেবে সৈন্য পাঠায়, তারা সেখানে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে চায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন ও সোভিয়েত সৈন্যরা বিশ্বের বহু দেশে দশকের পর দশক অবস্থান করেছে।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কূটনৈতিক ক্যারিশমা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর সফল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফলে স্বাধীনতার মাত্র ৩ মাসের মধ্যে ১২ই মার্চ ১৯৭২ সালে ভারতীয় মিত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। এটি ছিল বাংলাদেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের প্রথম ও প্রধান আন্তর্জাতিক সনদ।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি: একঘরে রাষ্ট্র থেকে বিশ্বমঞ্চে
স্বাধীনতার ঠিক পরমুহূর্তে পাকিস্তান ও চীনের কঠোর বিরোধিতার কারণে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ভুল ধারণার ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী কূটনীতির কারণে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ দ্রুত নিজের আসন নিশ্চিত করে।
জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ (১৯৭৪): ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ করে। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর, ২৫শে সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত গভীর। বাংলাদেশের জনগণ এমন এক বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্নে বিশ্বাস করে, যেখানে প্রতিটি মানুষের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও সমতা সুনিশ্চিত হবে।"
ওআইসি সম্মেলনে যোগদান (১৯৭৪): পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (OIC) সম্মেলনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের বরফ গলে যাওয়া সম্পর্ক পুনর্গঠন করেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা (১৯৭৫): দেশে ইসলামের সঠিক প্রচার, প্রসার ও গবেষণার জন্য তিনি ১৯৭৫ সালের ২৮শে মার্চ সরকারি অর্থায়নে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM): কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো থেকে শুরু করে যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো সবার সঙ্গে গভীর সুসম্পর্ক স্থাপন করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্স সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন:
"আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় এই মানুষটিই হলেন হিমালয়।"
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ: ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে যারা কেবল খাদ্য ব্যবস্থাপনার ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখেন, তারা আসলে ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অন্ধকার অংশকে আড়াল করতে চান। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ছিল মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক খাদ্য কূটনীতির নিষ্ঠুর ব্ল্যাকমেইল এবং অভ্যন্তরীণ নাশকতার এক সম্মিলিত ট্র্যাজেডি।
ভূ-রাজনীতি ও খাদ্যের অস্ত্র: মার্কিন প্রশাসনের কুৎসিত ব্ল্যাকমেইল
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খাবারকে যখন যুদ্ধের অস্ত্র বা ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। ১৯৭৪ সালে ঠিক এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছিল বাংলাদেশের সাথে।
কিউবা সংযোগ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য সমাজতান্ত্রিক কিউবার কাছে সামান্য কিছু পাটের ব্যাগ বিক্রি করেছিল। সে সময়ে কিউবা ছিল আমেরিকার পরম শত্রু।
পিএল-৪৮০ (PL-480) আইনের অপপ্রয়োগ: এই পাটের ব্যাগ বিক্রির অজুহাতে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশে মার্কিন গমবাহী জাহাজ পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয়। মার্কিন খাদ্য আইন ‘পিএল-৪৮০’ এর দোহাই দিয়ে লোহিত সাগরে ভাসমান খাদ্যবাহী জাহাজগুলোকে দিক পরিবর্তন করে অন্য দেশে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিসিঞ্জারের চরম প্রতিশোধ: কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে একটি "তলাবিহীন ঝুড়ি" হিসেবে প্রমাণ করতে এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারকে নতজানু করতে এই কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি করেছিলেন। যখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ বন্যায় ভাসছিল, তখন এই খাদ্য আটকে দেওয়া ছিল এক চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তার 'Poverty and Famines' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, "১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে খাদ্য সংকট যতটা না উৎপাদন ঘাটতির কারণে হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কূটচালের ফল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় সামান্য চট রপ্তানির অজুহাতে পিএল-৪৮০ (PL-480) চুক্তির খাদ্যবাহী জাহাজ আটকে দিয়েছিল, যা কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষকে ত্বরান্বিত ও ভয়াবহ করে তোলে।"
অভ্যন্তরীণ নাশকতা: রক্ষীবাহিনী বনাম জাসদ ও সর্বহারা পার্টির রক্তাক্ত অধ্যায়
দুর্ভিক্ষ কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ফল ছিল না; দেশের ভেতরের পরিস্থিতিকেও ঘোলাটে করা হয়েছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে।
জাসদের গণবাহিনী ও সিরাজ সিকদারের সহিংসতা: ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জাসদ সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী গঠন করে, যা সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। এই গণবাহিনী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ, নাশকতা ও ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। জাসদের গণবাহিনী আওয়ামী লীগ সদস্য এবং থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশকে আহত করতো ও পুলিশের অস্ত্র লুটপাট করে নিতো। এর জবাবে রক্ষীবাহিনীও ধরপাকড় ও দমননীতি গ্রহণ করে।
অপরদিকে মাওবাদী চরমপন্থী সিরাজ সিকদারের ‘সর্বহারা পার্টি’ দেশজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ডাকু সিরাজের বাহিনী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ করে শক্তি জানান দিতো এবং লিফলেট বিলি করে আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে জিপে টহল দিতো। দেশের বিভিন্ন থানা লুট, ব্যাংক ডাকাতি এবং খাদ্য গুদামে অগ্নিসংযোগ করে লুটপাটের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
জাসদ ও সিরাজের অনুসারীদের উস্কানিতে টঙ্গি, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনার প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত শ্রমিক সংঘর্ষ হতো এবং পাটের গুদামে আগুন দেওয়া হতো। চরমপন্থীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালেই ৫৪টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কেবল ১৯৭৩ সালেই সারা দেশে ১,৮৯৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: জাসদের গণবাহিনী এবং সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি দেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুরু করে। এই সময়ে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করে তারা। আওয়ামী লীগের প্রায় ৩,০০০ এর বেশি স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ১৯৭২ সালে ২৯ জন, ১৯৭৩ সালে ৭৭ জন, ১৯৭৪ সালে ৫২ জন এবং ১৯৭৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৪ জন জনপ্রতিনিধি, ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্যকে হত্যা করা হয়। যার ফলে গ্রামীণ এলাকায় প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে।
রক্ষীবাহিনী গঠন: রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত প্যারামিলিটারি ফোর্স। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে রক্ষীবাহিনীর আদলে বিশেষায়িত প্যারামিলিটারি ফোর্স রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিকৃত এবং প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া অধ্যায়গুলোর একটি এই রক্ষীবাহিনী।
জাসদ ও সর্বহারা পার্টির লাগামহীন নাশকতা মোকাবেলায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংকট মোকাবেলার জন্য একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড এবং বিশ্বস্ত বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ভাবনারই ফসল ছিল “জাতীয় রক্ষীবাহিনী”। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে তিনি বলেছিলেন, "পাহাড়সম অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান বন্ধ এবং চরমপন্থীদের দমনে এই বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। রক্ষী বাহিনী কোনো দলীয় বাহিনী নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদেই এটি গঠিত হয়েছে।"
১৯৭৩ সালে সমাজবিরোধী ও দেশবিরোধী মাওবাদী শক্তি জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টির অপতৎপরতা বেড়ে গিয়েছিল। সাধারণ পুলিশ বাহিনীর পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত চরমপন্থীদের মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
১৯৭৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দেশের ১৫০টি থানায় রক্ষীবাহিনী মোতায়েন করা হয়। একই বছরের ৩ অক্টোবর পাবনার শাহজাদপুরে দুর্বৃত্তদের সাথে রক্ষীবাহিনীর এক তীব্র বন্দুকযুদ্ধ হয়, যাতে ৮ জন সন্ত্রাসী (তথাকথিত বিপ্লবী) নিহত হয়। এরপর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে এবং ১৯৭৫ সালের প্রথমার্থের মধ্যেই দেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
অসাধু চক্রের খাদ্য মজুত: একদল অসাধু ব্যবসায়ী, কালোবাজারি ও একাত্তরের পরাজিত শক্তি কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে চালের বস্তা গুদামে লুকিয়ে ফেলেছিল, যাতে সাধারণ মানুষের মনে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়।
বঙ্গবন্ধুর মানবিক লড়াই ও ঘুরে দাঁড়ানো
দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখে বঙ্গবন্ধু স্থির থাকতে পারেননি। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষকালীন সংকটকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "ভিক্ষুক জাতির কোনো সম্মান থাকে না। আমরা কারও করুণার ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চাই না। কিন্তু আজ আমার দেশের মানুষ না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে... আমার শেষ সম্বল বিক্রি করে হলেও আমার দেশের ভুখা মানুষকে বাঁচাতে হবে।"
লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা: সারা দেশে প্রায় ৫,৭০০টি লঙ্গরখানা (Gruel Kitchens) খোলা হয়েছিল। প্রতিদিন প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষকে সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হতো।
সবুজ বিপ্লবের ডাক: এই সংকটের পরই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে পরনির্ভরশীলতা দূর করতে হবে। তিনি ১৯৭৫ সালের শুরুতেই দেশজুড়ে ‘সবুজ বিপ্লব’-এর ডাক দেন, যার ফলে কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক জোর দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছিল।
বাকশাল: স্বৈরতন্ত্র নাকি দ্বিতীয় বিপ্লব ও শোষিতের গণতন্ত্র?
১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একটি একক জাতীয় দল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (BAKSAL - বাকশাল) গঠন করা হয়। এটিকে পশ্চিমা ঘেঁষা সুশীল সমাজ ও ডানপন্থীরা ‘স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ছিল মূলত একটি ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ (Second Revolution)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমকালীন গবেষকদের মতে, বাকশাল কোনো চিরস্থায়ী একদলীয় একনায়কতন্ত্র বা আজীবন ক্ষমতায় থাকার চক্রান্ত ছিল না। সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রকে গৃহযুদ্ধতুল্য বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষা করার জরুরি ব্যবস্থা।
বাকশাল ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধু নিজেই সংসদে দেওয়া ভাষণে অত্যন্ত বেদনাহত কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে, “এটি তার সারাজীবনের রাজনৈতিক আদর্শের পরিপন্থি, কিন্তু দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং স্বাধীনতা রক্ষা করার বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকে এই কঠোর পথ বেছে নিতে হয়েছে।”
কেন প্রয়োজন ছিল এই জাতীয় ঐক্য?
বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য করেছিলেন যে, পশ্চিমা ধাঁচের বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এবং উগ্র বামপন্থীরা দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করছে। ১৯৭৩-৭৪ সালের বৈশ্বিক তেল সংকট, ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া খাদ্য সংকট এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষ দেশকে এক চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। একই সময়ে সদ্য স্বাধীন দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক বিস্তার, চোরাচালান, মজুদদারি এবং কালোবাজারির কারণে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করে।
এমন সময় জাসদের গণবাহিনী ও সিরাজ সিকদারের উগ্রপন্থী দলের সশস্ত্র তৎপরতা, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস, পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ, জনপ্রতিনিধিদের হত্যা এবং নাশকতা দমনে একটি কঠোর ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) আত্মপ্রকাশ করে। এটি ছিল মূলত একটি জাতীয় মোর্চা বা সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম।
তিনি চেয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য সমস্ত রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে একটি ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তুলতে, যেখানে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, এমনকি আমলা ও সামরিক বাহিনীও এক ছাতার নিচে এসে দেশ গঠনে কাজ করবে।
ক্ষমতার বৈপ্লবিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জেলা গভর্নর ব্যবস্থা
বাকশালের সবচেয়ে বৈপ্লবিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ক্ষমতাকে ঢাকা বা সচিবালয়ের চার দেয়াল থেকে বের করে সরাসরি প্রান্তিক জনগণের হাতে পৌঁছে দেওয়ার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল।
তৎকালীন ১৯টি জেলাকে ভেঙে ৬১টি নতুন জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। প্রতিটি জেলায় একজন করে ‘জেলা গভর্নর’ নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যারা সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। ১৯৭৫ সালের ১৬ই আগস্ট থেকে এই গভর্নরদের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার কথা ছিল।
‘শোষিতের গণতন্ত্র’ ও কৃষি সমবায় মডেল
রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, এবং চোরাচালান বন্ধ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু বাকশাল বা দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। ২৬শে মার্চ ১৯৭৫ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। আমার এই দ্বিতীয় বিপ্লব দুর্নীতিবাজ, চোর, চোরাকারবারি আর কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে; কৃষক ও শ্রমিকের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য।"
বাকশালের মাধ্যমে তিনি ভূমি সংস্কারের এক অভিনব মডেল প্রস্তাব করেছিলেন:
তিন ভাগে ফসল বণ্টন (তেভাগা সমবায়): জমির মালিকানা যারই হোক না কেন, উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ পাবেন জমির মালিক, এক-তৃতীয়াংশ পাবেন প্রকৃত চাষি বা শ্রমিক এবং অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ পাবে রাষ্ট্র (যা গ্রামীণ অবকাঠামো ও কৃষি সহায়তায় ব্যয় হবে)। এটি ছিল কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করার এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য দূর করার এক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক নকশা।
১৫ই আগস্ট ১৯৭৫: একটি রাষ্ট্রকে সপরিবারে হত্যা
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিথর দেহ পড়ে ছিল, তখন আসলে কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়নি। সেদিন ঘাতকদের বুলেটে বিদ্ধ হয়েছিল একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রাণস্পন্দন, তার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা এবং তার সার্বভৌম অস্তিত্ব।
কেন লক্ষ্যবস্তু হলেন বঙ্গবন্ধু? স্বনির্ভরতার অপরাধ?
বঙ্গবন্ধুর অপরাধ ছিল একটাই তিনি বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি কোনো পরাশক্তির পদলেহন করতে রাজি হননি।
যখন তিনি বাকশালের মাধ্যমে সম্পদ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে শোষিতের রাজত্ব কায়েম করতে যাচ্ছিলেন, তখন তা দেশীয় বুর্জোয়া গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পিলে চমকে দিয়েছিল। তাঁকে বাঁচিয়ে রাখলে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে পরনির্ভরশীল রাখা যাবে না এই উপলব্ধি থেকেই তাঁকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার নীলনকশা তৈরি হয়।
ঘাতকদের ঠুনকো যুক্তি ও বর্বরোচিত সত্য
মেজর ডালিম, ফারুক ও রশীদের মতো খুনিরা পরবর্তীতে তাদের এই জঘন্য অপরাধের পক্ষে ‘দুর্শাসন’ বা ‘বাকশালের’ দোহাই দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের কাছে আমাদের আজ কিছু জরুরি প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
যদি এটি শুধুই একটি ‘রাজনৈতিক অভ্যুত্থান’ বা শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা হতো, তবে কেন ১০ বছরের নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করা হলো? কেন অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণিকে বুলেটে ঝাঁঝরা করা হলো? কেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ পরিবারের মেহমান ও নারী সদস্যদেরও রেহাই দেওয়া হলো না?
এই নৃশংসতা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো সাধারণ ক্ষমতা বদল ছিল না। এটি ছিল একটি আদর্শিক হত্যাকাণ্ড (Ideological Assassination)। ঘাতকরা চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর রক্তের বংশপরম্পরাকে চিরতরে অবলুপ্ত করে দিতে।
১৭ই আগস্ট ১৯৭৫ লন্ডনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ সংবাদ প্রকাশ করে, "যদি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়ে থাকে, তবে বাংলাদেশ তার অস্তিত্ব ও আত্মাকে হারিয়ে ফেলবে। কারণ তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের প্রাণস্পন্দন।"
১৬ই আগস্ট ১৯৭৫ দ্য টাইম অব লণ্ডন প্রকাশ করে, "মুজিবকে হত্যা করার অর্থ হলো স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তিকেই ধূলিসাৎ করে দেওয়ার চেষ্টা করা। এটি কোনো সাধারণ অভ্যুত্থান নয়, এটি ইতিহাসের এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।"
প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও গবেষক অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেন, "যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।"
পাকিস্তানি ধারায় সুপরিকল্পিত প্রত্যাবর্তন
১৫ই আগস্টের ঠিক পরমুহূর্তে ঘাতকেরা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হয়ে যায় এই হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল:
স্লোগান পরিবর্তন: মুক্তিযুদ্ধের মূল রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তানি কায়দার ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ চালু করা হয়।
বেতারের নাম বদল: ‘বাংলাদেশ বেতার’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পাকিস্তানি ধাঁচে ‘রেডিও বাংলাদেশ’।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (Indemnity Ordinance): খুনি খোন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক কালো আইন ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়, যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার পাওয়ার হাত থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয় এবং তাদের পুরস্কৃত করে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়।
এই সমস্ত কার্যক্রম প্রমাণ করে যে, ১৫ই আগস্টের কুশীলবেরা মূলত ১৯৭১ সালের পরাজয়ের বদলা নিতে এবং বাংলাদেশকে পুনরায় একটি মিনি-পাকিস্তানে রূপান্তরিত করতেই এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।
১৯৭২-১৯৭৫: চ্যালেঞ্জ বনাম অর্জনের ঐতিহাসিক তুলনামূলক খতিয়ান
বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছরের শাসনকালকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে নিচের তথ্যসমৃদ্ধ টেবিলটি লক্ষ্য করুন:
প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ (১৯৭২) | বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও নীতি | ঐতিহাসিক অর্জন ও সুনির্দিষ্ট ফলাফল (১৯৭৫) |
১. শূন্য রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব | পাট, বস্ত্র ও বড় বড় কলকারখানা জাতীয়করণ; নতুন মুদ্রা চালুকরণ। | দেশের ২৩৭টি বড় কারখানার পুনর্বাসন ও সচলীকরণ; নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থার শক্ত ভিত স্থাপন। |
২. ১ কোটি শরণার্থী ও পোড়া বাড়িঘর | দ্রুত পুনর্বাসন প্রকল্প, জাতিসংঘের সাহায্যে ত্রাণ বিতরণ। | অতি অল্প সময়ে ১ কোটি শরণার্থীর সফল পুনর্বাসন ও ৪৩ লক্ষ ঘরবাড়ি পুনঃনির্মাণ। |
৩. যোগাযোগ ব্যবস্থার কঙ্কাল | হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ভৈরব ব্রিজ ও ৪০০টিরও বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতু পুনর্গঠন। | দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় সচলকরণ এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে মাইনমুক্ত করা। |
৪. ভারতীয় মিত্র বাহিনীর উপস্থিতি | বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যকার সফল দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি। | ১২ই মার্চ ১৯৭২: ভারতীয় বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বাংলাদেশ ত্যাগ (সার্বভৌমত্বের বড় প্রমাণ)। |
৫. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব | সফল আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক সফর ও জোট নিরপেক্ষ নীতি। | ওআইসি, কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ; বিশ্বের শতাধিক দেশের স্বীকৃতি আদায়। |
৬. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার | ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি ‘দালাল আইন’ (Collaborators Act) প্রণয়ন। | ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন, ৩৭,০০০ গ্রেপ্তার এবং ১১,০০০ চিহ্নিত অপরাধীর সাজা প্রদান। |
৭. শিক্ষা খাতের ধ্বংসলীলা | প্রায় ৩৬,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন। | প্রায় ৭৩,০০০ শিক্ষকের চাকরি সরকারি করা; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বায়ত্তশাসন প্রদান। |
৮. ১৯৭৪-এর চরম বন্যা ও দুর্ভিক্ষ | সারা দেশে ৫,৭০০টি লঙ্গরখানা খোলা এবং ‘সবুজ বিপ্লব’-এর ডাক। | প্রতিদিন ৪০ লক্ষ মানুষের খাদ্য নিশ্চিতকরণ; ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি কৃষিতে ব্যাপক ঘুরে দাঁড়ানো। |
৯. চরমপন্থী সন্ত্রাস ও অরাজকতা | ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বাকশাল’ গঠন। | প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ (৬১ জেলা), জেলা গভর্নর পদ্ধতি এবং সমবায়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথ উন্মোচন। |
জ্বালানি নিরাপত্তা ও গ্যাসক্ষেত্র জাতীয়করণ (৯ আগস্ট, ১৯৭৫)
আজকে বাংলাদেশ যে দেশীয় গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং শিল্পকারখানা চালাচ্ছে, তার মূল কৃতিত্ব ১৯৭৫ সালের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের। ১৯৭৫ সালের ৯ই আগস্ট বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে ৫টি বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র কিনে নেওয়া এবং ১৪ই জুন বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন ছিল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।
শেল অয়েলের কাছ থেকে গ্যাসক্ষেত্র ক্রয়: ১৯৭৫ সালের ৯ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সরকার বহুজাতিক তেল কোম্পানি ‘শেল অয়েল’-এর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে (মাত্র ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড বা তৎকালীন ১৭-১৮ কোটি টাকা) ৫টি বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র কিনে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে নেয়।
শেল অয়েলের কাছ থেকে গ্যাসক্ষেত্র ক্রয়ের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "আমাদের মাটি আছে, মানুষ আছে, আর আছে মাটির নিচের প্রাকৃতিক সম্পদ। এই সম্পদের প্রকৃত মালিক বাংলাদেশের জনগণ, কোনো বিদেশি কোম্পানি বা লুটেরা গোষ্ঠী নয়।"
ক্রয়কৃত গ্যাসক্ষেত্রসমূহ: তিতাস, বাখরাবাদ, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা এবং রশিদপুর।
ফলাফল: এই ৫টি গ্যাসক্ষেত্র আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মূল মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। এই একক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি আমদানির খরচ থেকে বেঁচে যায়। এজন্য প্রতি বছর ৯ই আগস্ট বাংলাদেশে ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
সমুদ্রসীমা আইন ও ব্লু ইকোনমির (Blue Economy) ভিত্তি (১৯৭৪)
অনেকেই মনে করেন সমুদ্রসীমা জয়ের লড়াই কেবল সাম্প্রতিককালের ঘটনা। কিন্তু এই আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল স্বাধীনতার পরপরই।
টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট, ১৯৭৪: আন্তর্জাতিকভাবে সমুদ্র আইন (UNCLOS) জাতিসংঘ কর্তৃক চূড়ান্ত হওয়ারও ৮ বছর আগে, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু এদেশের নিজস্ব সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য এই আইন পাস করেন।
দূরদর্শিতা: তখন দেশের ভেতরে খাওয়ার অন্ন ছিল না, অথচ রাষ্ট্রনায়ক চিন্তা করেছিলেন ভবিষ্যতের সমুদ্র সম্পদের কথা। এই আইনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ২০১২ ও ২০১৪ সালে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের ঐতিহাসিক আইনি লড়াই লড়েছিল বাংলাদেশ।
মহাকাশ যুগে প্রবেশ ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র (১৯৭৫)
আজকের ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ বা ইন্টারনেটের যে অবারিত সুবিধা আমরা পাচ্ছি, তার প্রথম বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে।
বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন: ১৯৭৫ সালের ১৪ই জুন রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র (Satellite Earth Station) উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু।
গুরুত্ব: এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরাসরি বহির্বিশ্বের সাথে টেলিযোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের এক নতুন যুগে প্রবেশ করে।
বৈপ্লবিক ভূমি সংস্কার ও কৃষি অর্থনীতি
কৃষকদের ওপর থেকে সামন্ততান্ত্রিক শোষণের অবসান ঘটাতে বঙ্গবন্ধু কয়েকটি বড় আইনি পরিবর্তন এনেছিলেন:
খাজনা মওকুফ: ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমির খাজনা চিরতরে মওকুফ করা হয়।
ভূমি মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা (Land Ceiling): পরিবারপ্রতি জমির সর্বোচ্চ সীমা ১০০ বিঘা নির্ধারণ করা হয়, যাতে অতিরিক্ত জমি ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের মাঝে বণ্টন করা যায়।
উদ্বাস্তু ও নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসন: ‘গুচ্ছগ্রাম’ বা ‘আদর্শ গ্রাম’ প্রকল্পের মাধ্যমে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ভূমিহীন মানুষদের সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়।
প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৮)
একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে বঙ্গবন্ধু দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘পরিকল্পনা কমিশন’ গঠন করেন। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে এই কমিশন কাজ শুরু করে।
মূল লক্ষ্য: ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (First Five-Year Plan) চালু করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল বার্ষিক ৫.৫% জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা, দারিদ্র্য বিমোচন, এবং কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ার এটিই ছিল প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক রোডম্যাপ।
পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ফিরিয়ে আনা (১৯৭৩-১৯৭৪)
স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক দপ্তরে কর্মরত প্রায় দেড় লক্ষাধিক বাঙালি এবং তাদের পরিবার সেখানে বন্দি জীবনযাপন করছিলেন। তাদেরকে ফিরিয়ে আনা ছিল এক বিশাল মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
দিল্লি চুক্তি (১৯৭৩): ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
ফলাফল: জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের (UNHCR) সহায়তায় একটি বিশাল বিমান ও নৌ-যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার আটকে পড়া বাঙালিকে সসম্মানে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এদের মধ্যে অনেক দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও আমলা ছিলেন, যারা পরবর্তীতে বাংলাদেশ গঠন ও নিরাপত্তা বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
যুদ্ধাহত ও বীরঙ্গনাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা
যুদ্ধের ক্ষত কেবল অর্থনৈতিক ছিল না, ছিল চরম সামাজিক ও মানসিক ক্ষত। লক্ষ লক্ষ নির্যাতিত নারী এবং অঙ্গ হারানো মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ছিল সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়।
বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি: পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের দ্বারা নির্যাতিত নারীদের সামাজিক গ্লানি থেকে বাঁচাতে বঙ্গবন্ধু তাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ (বীর নারী) উপাধিতে ভূষিত করেন এবং ঘোষণা দেন, "যদি কারও বাবার নামের জায়গা খালি থাকে, তবে সেখানে আমার নাম 'শেখ মুজিবুর রহমান' লিখে দাও, আর ঠিকানা লিখে দাও 'ধানমন্ডি ৩২ নম্বর'।"
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা কল্যাণ সংস্থা: এই নারীদের চিকিৎসা, মানসিক ট্রমা কাটানো এবং কর্মসংস্থানের জন্য এই সংস্থা গঠন করা হয়।
পঙ্গু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা: যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন ড. আর জে গা we-র সহায়তায় ঢাকার শেরেবাংলা নগরে পঙ্গু হাসপাতাল (RIHD) প্রতিষ্ঠা করা হয়।
কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট (১৯৭৪)
একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তার বিস্তারিত রূপরেখা ছিল এই রিপোর্টে।
ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়: এই রিপোর্টে মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ এবং সাধারণ শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর: সাধারণ বিএ/এমএ পাসের চেয়ে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল, যাতে বেকারত্ব দূর হয়।
ধর্মনিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতি: মুখস্থ বিদ্যার বদলে সৃজনশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে জোর দেওয়া হয়েছিল। (দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৭৫ সালের পর এই প্রগতিশীল শিক্ষানীতিটি হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়)।
এই প্রতিটি তথ্যই প্রমাণ করে যে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সময়কালটি কেবল রাজনৈতিক কোন্দল বা সংকটের গল্প নয়; এটি ছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ লিখে যাওয়ার সময়।
ইতিহাস আপনার বিবেকের কাছে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো ঐশ্বরিক দেবতা বা অতিমানব ছিলেন না। তিনি ছিলেন রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, যিনি তাঁর দেশের মানুষকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। তিনি নিজেই বলতেন, "আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি, আর আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমি তাদেরকে খুব বেশি ভালোবাসি।" তাঁর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে কিছু প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকতে পারে, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত থাকতে পারে, তাঁর দলে কিছু চাটুকার ও দুর্নীতিবাজের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম, তাঁর সততা এবং বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার সংকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ ইতিহাসের সামনে নেই।
যিনি দীর্ঘ ২৪ বছর লড়াই করে, পাকিস্তানের ফাঁসির মঞ্চ থেকে বারবার ফিরে এসে একটি স্বাধীন দেশ এনে দিলেন তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছরে যদি সেই দেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করতে না পারেন, তবে তার জন্য কি কেবল তিনিই দায়ী ছিলেন?
পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ ২৩ বছরের সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক শোষণ ও যুদ্ধের তাণ্ডব কি জাদুমন্ত্রে সাড়ে তিন বছরে মুছে ফেলা সম্ভব ছিল? আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্র যখন খাদ্যকে অস্ত্র বানিয়ে একটি নবজাতক রাষ্ট্রের মুখে লাথি মারে, তখন কি কেবল একজন নেতার আন্তরিকতাই যথেষ্ট ছিল?
বঙ্গবন্ধু যা করেছিলেন, তা বিশ্বের বুকে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি যখন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে দেশটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছিলেন এবং দেশটিকে মাত্র সোজা হয়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই তাঁকে চিরতরে থামিয়ে দেওয়া হয়।
আজকের বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে কথা বলে, তার প্রতিটির ইট বিছানো হয়েছিল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সেই তীব্র সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে।
ইতিহাসের পাতা থেকে সত্যকে কখনো মুছে ফেলা যায় না। সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দেওয়া গেলেও তা দিনশেষে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।
আজকের এই স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আপনার বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম বঙ্গবন্ধু কি আসলেই ‘স্বৈরাচার’ ছিলেন, নাকি তিনি ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া এক নিঃসঙ্গ শেরপা?














