১৯৭২-৭৫ শেখ মুজিব - ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান বাংলাদেশ
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।

TruthBangla
Jan 4, 2026
ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর, আবার ইতিহাসই বড় সত্যবাদী। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল হলো ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিন। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ দেশে ফেরা থেকে শুরু করে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর সেই কালো রাত পর্যন্ত এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি যা করেছিলেন, তা কি কেবল আবেগ ছিল, নাকি ছিল এক অসম্ভবের পথ চলা? আজ আমরা নির্মোহভাবে সেই সময়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করব। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কি কোনো রাজনৈতিক সমাধান ছিল, নাকি এটি ছিল দেশের অভ্যন্তরীন গাদ্দারদের দ্বারা সংঘটিত একটি নবজাতক রাষ্ট্রের গলা টিপে ধরার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র? নাকি এটি ছিল একাত্তরের যুদ্ধে হারের বদলা?
শূন্য থেকে শুরু - একটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র গল্প
ছাইস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক স্বপ্নদ্রষ্টা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে এলেন তাঁর প্রিয় স্বাধীন স্বদেশে। কিন্তু রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে যখন তিনি ভাষন দিচ্ছিলেন, তাঁর চোখে ছিল জল। সেই অশ্রু কেবল আনন্দের ছিল না, ছিল এক চরম অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসস্তূপ দেখার বিষাদ।
পকেটে কোনো রাষ্ট্রীয় তহবিল নেই, গুদামে নেই এক মুঠো চাল, আর দেশের মানচিত্র জুড়ে কেবল পোড়া মাটির গন্ধ। ঠিক সেই মুহূর্তেই তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। আজ যখন আমরা একটি মধ্যম আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশের গর্ব করি, তখন পেছনে ফিরে দেখা প্রয়োজন কেমন ছিল সেই শূন্য থেকে শুরু করার দিনগুলো?
অর্থনীতির ধ্বংসলীলা, শূন্য রিজার্ভ ও রিক্ত হাত
একটি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাথমিক শর্ত হলো তার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংগতি। কিন্তু ১৯৭২ সালের সেই শুরুর দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল মরুভূমির মতো শুষ্ক। পাকিস্তানের শাসকরা যাওয়ার সময় বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ তো দেয়-ই নি, উল্টো এদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনা সরিয়ে নিয়েছিল। ফলে বঙ্গবন্ধুর সামনে যখন দেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল আক্ষরিক অর্থেই ‘শূন্য’।
স্বাধীনতার আগে এদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল পাট ও বস্ত্র শিল্প। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, ২৩৭টি বড় শিল্প কারখানার মধ্যে ১৯৫টিই সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত বা অচল হয়ে পড়ে আছে। দক্ষ ব্যবস্থাপক ও কারিগরি কর্মীরা (যাদের বড় অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি) দেশ ছেড়ে পালানোর ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা থমকে গিয়েছিল।
যুদ্ধের ফলে টাকার মান কমে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ছিল আকাশচুম্বী। এই রিক্ত অর্থনীতি নিয়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে টেনে তোলা ছিল এক অসাধ্য সাধন।
কৃষি ও খাদ্য সংকট - এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়
বাঙালি চিরকালই কৃষিনির্ভর। কিন্তু ১৯৭১ সালের ‘পোড়া মাটি নীতি’ (Scorched Earth Policy) প্রয়োগ করে পাকিস্তানি বাহিনী এদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়ে গিয়েছিল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখা গেল গুদামে খাদ্য নেই, অথচ কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে হবে। বার্ষিক খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াল ৩০ লক্ষ মেট্রিক টনের উপরে। কৃষি মানেই লাঙল আর বলদ।
কিন্তু দখলদার বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার সময় হালের বলদগুলোকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। কৃষকের ঘরে ছিল না বীজ, জমিতে ছিল না সার। ঘোড়াশাল সার কারখানাসহ বড় বড় উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চাষাবাদ শুরু করাই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অবকাঠামোর কঙ্কাল - বিচ্ছিন্ন এক জনপদ
একটি দেশের রক্ত চলাচলের মতো কাজ করে তার যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছিল এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সমষ্টি। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হঠার সময় কৌশলগত কারণে ৪৩ শতাংশের বেশি যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়।
৪০০+ সেতু ধ্বংস: দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গকে যুক্ত করা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং ভৈরব ব্রিজের মতো বিশাল স্থাপনাগুলো বোমা মেরে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ৪০০-এর বেশি ছোট-বড় সেতু তখন ভাঙা পড়ে ছিল।
রেলপথের চিহ্ন বিলোপ: কয়েকশ কিলোমিটার রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছিল, যার ফলে পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
পোড়া ভিটে ও ছিন্নমূল মানুষ
স্বাধীনতার পর দেখা গেল প্রায় ৪৩ লাখ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। এর সাথে যুক্ত ছিল ভারত থেকে ফিরে আসা এক কোটি শরণার্থী এবং দেশের ভেতরে থাকা কয়েক কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ। শীতের রাতে মাথার ওপর চালহীন এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
বন্দর ও বিদ্যুৎ অচল চাকা
একটি দেশের আমদানি-রপ্তানি সচল রাখতে বন্দরের বিকল্প নেই। কিন্তু ষড়যন্ত্র ছিল আরও গভীর। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনী অসংখ্য মাইন পুঁতে রেখেছিল এবং জাহাজ ডুবিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, কোনো বিদেশি সাহায্যবাহী জাহাজ যেন বাংলাদেশে ভিড়তে না পারে। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌবাহিনীর সহায়তায় এই মাইন অপসারণ করা হয়।
দেশের প্রধান প্রধান বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং গ্রিডগুলো অকেজো করে দেওয়া হয়েছিল। শিল্পকারখানা ও সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত।
শিক্ষা ও প্রশাসন - যেখানে মেধা নিধনের ক্ষত
প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিটি স্তরকে ধ্বংস করা হয়েছিল। ৯০০টি কলেজ এবং ৬,০০০-এর বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, নয়তো ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে কলুষিত করা হয়েছিল।
১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রশাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে নেতৃত্বহীন করার যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
প্রশ্ন জাগে এই অবস্থায় আর কে পারতেন?
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি বা জাপানের পুনর্গঠনে কয়েক দশক সময় লেগেছিল এবং তাদের পেছনে ছিল মার্কিন ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর মতো বিশাল অর্থনৈতিক সহায়তা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে?
বঙ্গবন্ধুর সামনে কোনো বিশাল তহবিল ছিল না, ছিল না শক্তিশালী কোনো বন্ধু রাষ্ট্রের সরাসরি আর্থিক অনুদান। তাঁর ছিল কেবল অদম্য সাহস আর জনগণের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। এই ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিনে তিনি যে রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
তিনি একটি আধুনিক সংবিধান দিয়েছিলেন মাত্র এক বছরের মাথায়। মিত্র বাহিনীকে দেশ থেকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন মাত্র ৩ মাসে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন অতি অল্প সময়ে।
রাষ্ট্র পুনর্গঠন - অসম্ভবকে সম্ভব করার ৩ বছর
বঙ্গবন্ধুর শাসনকালকে কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল একটি জাতি গঠনের (Nation Building) সময়।
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন (১৯৭২)
একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সংবিধান। পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন জন্ম নিয়েছিল (১৯৪৭), তখন তাদের প্রথম সংবিধান তৈরি করতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ৯ বছর (১৯৫৬)। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেরও সময় লেগেছিল প্রায় ৩ বছর।
সেখানে বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান উপহার দেওয়ার উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ গণপরিষদ আদেশ জারি করা হয় এবং মাত্র ৩২৫ দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হয়।
এই সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চার নীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-কে নির্ধারণ করা হয়। এটি এমন এক সংবিধান ছিল যেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি শাসন আমলের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে একটি গণমুখী রাষ্ট্র তৈরির স্বপ্ন ছিল এই সংবিধানে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিপ্লব - মেধার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন
বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, "একটি শিক্ষিত জাতি ছাড়া দেশ গড়া সম্ভব নয়। শিক্ষায় বিনিয়োগ হলো শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।" তিনি জানতেন, পাকিস্তানি শোষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।
১৯৭৩ সালে এক বৈপ্লবিক আদেশে বঙ্গবন্ধু প্রায় ৩৬,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। এর ফলে এক নিমেষে প্রায় ৭৩,০০০ শিক্ষকের চাকরি সরকারি হয়ে যায়। যুদ্ধের পর যেখানে রাষ্ট্রের নিজের খরচ চালানোর টাকাই ছিল না, সেখানে এত বড় সাহসী পদক্ষেপ বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
গরিব মানুষের সন্তানরা যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ এবং পড়াশোনা অবৈতনিক করার ঘোষণা দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শিক্ষাকে একটি সামাজিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে নয়।
একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নির্ধারণে তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে একটি আধুনিক শিক্ষা কমিশন “কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন” গঠন করেন। এই কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল কুসংস্কারমুক্ত, বিজ্ঞানমুখী এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব - নজরুলকে ফিরিয়ে আনা ও আত্মপরিচয়
একটি জাতির মুক্তি কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক মুক্তির ওপরও নির্ভর করে। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশের ওপর।
১৯৭২ সালের ২৫ মে বঙ্গবন্ধু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন এবং তাঁকে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা দেন। এটি ছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও দ্রোহের সংস্কৃতির প্রতি তাঁর পরম শ্রদ্ধা।
শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং বাংলা একাডেমিকে নতুন জীবন দান করার মাধ্যমে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পথ প্রশস্ত করেন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দালাল আইন
একটি সাধারণ অপপ্রচার প্রায়ই শোনা যায় যে, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেননি। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি ‘দালাল আইন’ (Collaborators Act) জারি করেন।
এই আইনের অধীনে দেশজুড়ে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে প্রায় ৩৭ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন অপরাধে প্রায় ১১ হাজার ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
রাজাকার ও দেশদ্রোহীদের বিশাল সংখ্যা বিবেচনা করে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু একটি ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে একটি কঠোর শর্ত ছিল। যারা হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা লুটতরাজের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত ছিল, তারা এই ক্ষমার আওতার বাইরে ছিল। অর্থাৎ, মানবিকতার দোহাই দিয়ে তিনি কখনোই খুনি ও ধর্ষকদের ছেড়ে দেননি।
প্রশাসনিক পুনর্গঠন - শূন্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি
একটি স্বাধীন দেশের জন্য নিজস্ব আমলাতন্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনী অপরিহার্য। বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে একটি জনবান্ধব সিভিল সার্ভিস তৈরির উদ্যোগ নেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর ভিত্তি: যুদ্ধের পর পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) ছিল সম্পূর্ণ অগোছালো। বঙ্গবন্ধু তাঁর মেধা ও দূরদর্শিতা দিয়ে এই বাহিনীগুলোকে পুনর্গঠন করেন।
আধুনিক সামরিক বাহিনী: আজকের সুশৃঙ্খল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। ১৯৭৪ সালে তিনি কুমিল্লায় মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ও যুদ্ধবিমান সংগ্রহ শুরু করেন।
সার্বভৌমত্বের অনন্য নজির - মিত্র বাহিনীর প্রত্যাবর্তন
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনা। সাধারণত কোনো দেশ যখন অন্য কোনো দেশে মিত্র শক্তি হিসেবে প্রবেশ করে, তারা সেখানে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে চায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক দেশে বিদেশি সেনাবাহিনী দশকের পর দশক অবস্থান করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর সফল কূটনৈতিক আলোচনার ফলে ১৯৭২ সালের ১২ মার্চ ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে।
এটি ছিল বাংলাদেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের প্রথম ও প্রধান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ কোনো দেশের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র নয়, বরং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড। এই দ্রুত প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে দ্রুত স্বীকৃতি আদায়ে সহায়তা করেছিল।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি - একঘরে রাষ্ট্র থেকে বিশ্বমঞ্চে
স্বাধীনতার পর মুসলিম দেশগুলো এবং পশ্চিমা বিশ্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অনীহা প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তানের অপপ্রচারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মনে করেছিল বাংলাদেশ ইসলাম বিরোধী।
জাতিসংঘের সদস্যপদ (১৯৭৪): ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪-এ বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ পায় এবং বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেন।
ওআইসি সম্মেলন (১৯৭৪): পাকিস্তানের লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিয়ে বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন করেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা: দেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য ১৯৭৫ সালে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM): কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো থেকে শুরু করে যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করেন। কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে দেখে বলেছিলেন, "আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।"
ষড়যন্ত্রের মাকড়সা ও ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে যারা কেবল খাদ্যসংকট হিসেবে দেখেন, তারা ইতিহাসের একটি বিশাল অংশ এড়িয়ে যান। বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে দিনরাত এক করছিলেন, ঠিক তখনই তাঁকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত করতে শুরু হয় এক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ছিল সেই ষড়যন্ত্রেরই এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
ভূ-রাজনীতি ও খাদ্যের অস্ত্র - যখন ষড়যন্ত্রে শামিল আমেরিকা
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খাবারকে যখন যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তার শিকার হয় সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ তখন কিউবার কাছে পাটের ব্যাগ বিক্রি করেছিল। সে সময় কিউবা ছিল আমেরিকার চরম শত্রু। এই তুচ্ছ অজুহাতে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশে গমবাহী জাহাজ আসতে বাধা দেয়।
মার্কিন 'পিএল-৪৮০' (PL-480) আইনের দোহাই দিয়ে লোহিত সাগর থেকে খাদ্যবাহী জাহাজ ফিরিয়ে নেওয়া হয়। যখন বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ বন্যার কবলে এবং গুদামে খাবার নেই, তখন এই "ডিপ্লোমেটিক ব্ল্যাকমেইল" ছিল অত্যন্ত অমানবিক। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে একটি "তলাবিহীন ঝুড়ি" হিসেবে প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, যাতে বঙ্গবন্ধু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।
অভ্যন্তরীণ নাশকতা - এক রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট
দুর্ভিক্ষ কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক চাপের ফল ছিল না; দেশের ভেতরের পরিস্থিতিকেও ঘোলাটে করা হয়েছিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে।
জাসদের ‘গণবাহিনী’ এবং সিরাজ সিকদারের ‘সর্বহারা পার্টি’ দেশজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা কেবল রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং থানা লুট এবং ব্যাংক ডাকাতির মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
সেই সময় আওয়ামী লীগের প্রায় ৩,০০০-এর বেশি নেতাকর্মীকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। একদল অসাধু ব্যবসায়ী ও ষড়যন্ত্রকারী খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল।
এই চরম অরাজকতা ও সশস্ত্র সন্ত্রাস দমনে বঙ্গবন্ধু যখন কঠোর পদক্ষেপ নিলেন, তখন তাকেই আবার ‘স্বৈরাচার’ হিসেবে প্রচার করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর মানবিক লড়াই, লঙ্গরখানা ও আর্তনাদ
দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখে বঙ্গবন্ধু স্থির থাকতে পারেননি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, "আমার মানুষ যেন না খেয়ে না মরে।" সীমিত সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
সারা দেশে প্রায় ৫,৭০০টি লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। প্রতিদিন প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষকে সরাসরি রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হতো। সরকারি হিসেবে সে সময় মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭,০০০। যদিও বেসরকারি হিসেব অনুযায়ী সংখ্যাটি আরও বেশি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এই তাৎক্ষণিক ও বিশাল উদ্ধার তৎপরতা না থাকলে প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হতে পারতো।
ষড়যন্ত্র কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, বঙ্গবন্ধু দমে যাননি। ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকেই তিনি খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য 'সবুজ বিপ্লব'-এর ডাক দেন। ১৯৭৪-এর সেই কৃত্রিম সংকটের মেঘ কাটিয়ে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ১৫ আগস্টের কালো রাত নেমে আসে, যা প্রমাণ করে যে দুর্ভিক্ষে সফল না হয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা শেষ পর্যন্ত হত্যার পথ বেছে নিয়েছিল।
বাকশাল - স্বৈরতন্ত্র নাকি দ্বিতীয় বিপ্লব?
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানামুখী ষড়যন্ত্রে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। একদিকে জাসদ ও সর্বহারাদের সশস্ত্র অপতৎপরতা, অন্যদিকে ১৯৭৪-এর ভয়াবহ বন্যা ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি। এই চরম সংকটে দেশ যখন অরাজকতার মুখে, তখনই বঙ্গবন্ধু চাইলেন একটি আমূল পরিবর্তন।
কেন প্রয়োজন ছিল এই জাতীয় ঐক্য?
বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য করেছিলেন যে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে একদল মানুষ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ব্যাংক ডাকাতি, থানা লুট এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন বিভেদ ভুলে একটি ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তুলতে। বাকশাল ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে আওয়ামী লীগ ছাড়াও ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং এমনকি সরকারি আমলা ও সামরিক কর্মকর্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাতে সবাই মিলে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করতে পারে।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জেলা গভর্নর ব্যবস্থা
বাকশালের সবচেয়ে বৈপ্লবিক অংশ ছিল প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন সচিবালয়ে বন্দি ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে। তৎকালীন ১৯টি জেলাকে ভেঙে ৬১টি জেলায় রূপান্তরিত করা হয়।
প্রতিটি জেলায় একজন করে ‘জেলা গভর্নর’ নিয়োগ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল আমলাতন্ত্রের জটিলতা কমিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এর ফলে সাধারণ মানুষ স্থানীয়ভাবেই তাদের সমস্যার সমাধান পাবে এমনটাই ছিল পরিকল্পনা।
শোষিতের গণতন্ত্র ও সবুজ বিপ্লব
বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, "আমি শোষিতের গণতন্ত্র চাই।" তিনি বিশ্বাস করতেন, পেটে ক্ষুধা নিয়ে ভোটাধিকার বা গণতন্ত্র অর্থহীন। বাকশালের মাধ্যমে তিনি 'সবুজ বিপ্লব'-এর ডাক দেন। প্রতিটি গ্রামে বহুমুখী সমবায় সমিতি গঠন করে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়।
জমির মালিকানা যারই হোক, ফসল ভাগ হবে তিন ভাগে এক ভাগ মালিকের, এক ভাগ চাষির এবং এক ভাগ রাষ্ট্রের (উন্নয়ন কাজের জন্য)। এটি ছিল কৃষি বিপ্লবের এক অনন্য মডেল।
দুর্নীতি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ
বাকশাল ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল কালোবাজারি, মজুতদার এবং দুর্নীতিবাজদের কঠোর হস্তে দমন করা। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকবে না। তিনি বিদেশি শক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ - একটি রাষ্ট্রকে সপরিবারে হত্যা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত ভোরে যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিথর দেহ পড়ে ছিল, তখন আসলে কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারকে হত্যা করা হয়নি। বরং সেই বুলেটের আঘাতে বিদ্ধ হয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন বছরের একটি নবজাতক রাষ্ট্রের স্বপ্ন, চেতনা এবং তার সার্বভৌম অস্তিত্ব।
কেন লক্ষ্যবস্তু হলেন বঙ্গবন্ধু? স্বনির্ভরতার অপরাধ?
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জেদ। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক বাংলাদেশ, যা কোনো বিদেশি শক্তির করুণা বা আজ্ঞাবহ হয়ে চলবে না।
তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু যখন 'শোষণমুক্ত সমাজ' এবং 'দ্বিতীয় বিপ্লবের' ডাক দিচ্ছিলেন, তখন তা অনেক আন্তর্জাতিক পরাশক্তির হিসাব নিকাশ ও আধিপত্য বিস্তারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ ছিল বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থমকে দেওয়া এবং দেশটিকে পুনরায় পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা।
ঘাতকদের ঠুনকো যুক্তি ও বর্বরোচিত বাস্তবতা
বাঙালি জাতির বিশ্বাসঘাতক মেজর ডালিম, রশীদ ও ফারুকরা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার স্বপক্ষে ‘স্বৈরাচার’ বা ‘দুর্শাসনের’ অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যদি এটি রাজনৈতিক প্রতিবাদই হতো, তবে ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলকে কেন হত্যা করা হলো? কেন অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণিকে বুলেটে ঝাঁঝরা করা হলো?
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক রাজনৈতিক অভ্যুত্থান হয়েছে, কিন্তু একটি পরিবারের নারী, শিশু এবং এমনকি মেহমানদেরও এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নজির বিরল। এটি পরিষ্কার করে দেয় যে, ১৫ আগস্টের ঘটনা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল পরিকল্পিত একটি আদর্শিক হত্যাকাণ্ড (Ideological Assassination)। ঘাতকরা চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের বংশপরম্পরা ও রক্তবীজকে চিরতরে শেষ করে দিতে।
পাকিস্তানি ধারায় প্রত্যাবর্তন
১৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পটভূমি যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল, তা লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কারা ছিল। হত্যাকাণ্ডের পরপরই 'জয় বাংলা' স্লোগানকে নির্বাসিত করে পাকিস্তানি কায়দায় 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' চালু করা হয়।
'বাংলাদেশ বেতার' এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'রেডিও বাংলাদেশ'। সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, যার মাধ্যমে খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়ে তাদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার হিসেবে বিদেশে দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।
এই পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করে যে, ঘাতকরা আসলে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছিল। বাংলাদেশকে আবার সেই পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ও সামরিক ধারায় ফিরিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
ইতিহাসের শিক্ষা ও দায়বদ্ধতা
বঙ্গবন্ধু কোনো অতিমানব ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রক্ত-মাংসের মানুষ যিনি অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর শাসনকাল নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনার সমাধান কখনো সপরিবারে হত্যা হতে পারে না। যাঁরা এই হত্যাকাণ্ডকে 'জায়েজ' বা ন্যায়সংগত বলতে চান, তাঁরা আসলে সভ্যতা, মানবতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোকেই অস্বীকার করেন।
১৫ আগস্টের সেই রক্তস্রোত আজও আমাদের জাতীয় জীবনে এক বড় শূন্যতা। তবে ঘাতকরা সফল হতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করা গেলেও তাঁর আদর্শ ও স্বপ্নকে মুছে ফেলা যায়নি। আজকের বাংলাদেশ যখন বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, তখন সেই ঘাতকদের চক্রান্তই পরাজিত হয়।
ইতিহাস আপনার বিবেকের কাছে
বঙ্গবন্ধু কোনো দেবতা ছিলেন না, তিনি রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। তাঁর ভুল থাকতে পারে, তাঁর প্রশাসনে দুর্বলতা থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
যিনি ৯ মাস মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন দেশ এনে দিলেন, তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছরে যদি সেই দেশকে সোনার বাংলা বানাতে না পারেন, তবে তার জন্য কি কেবল তিনিই দায়ী?
পাকিস্তান আমলের ২২ বছরের শোষণ কি সাড়ে তিন বছরে মোছা সম্ভব? ৪০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি কি জাদুমন্ত্রে দূর করা সম্ভব?বঙ্গবন্ধু যা করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশটিকে তুলে এনে যখন মাত্র দাঁড় করাচ্ছিলেন, তখনই তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হয়।
আজকের বাংলাদেশ যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সেই সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে। ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না, বিকৃত করা যায়। কিন্তু দিনশেষে সত্য সূর্যের আলোর মতোই উজ্জ্বল হয়ে বেরিয়ে আসে।
আপনার বিবেকের কাছে প্রশ্ন বঙ্গবন্ধু কি আসলেই ‘স্বৈরাচার’ ছিলেন, নাকি তিনি ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া এক নিঃসঙ্গ শেরপা?
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.














