একাত্তরের ২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধু কেন গ্রেপ্তার হলেন? আত্মত্যাগ নাকি কৌশল?
একাত্তরের ২৫শে মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করে, তখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেন আত্মগোপন না করে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন - আন্তর্জাতিক ইতিহাসের মানদণ্ডে এবং স্বাধীনতার নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্ত ছিল এক সুদূরপ্রসারী কৌশল এবং চূড়ান্ত আত্মত্যাগের প্রতীক।

TruthBangla
Aug 20, 2025
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল স্তম্ভটি কেবল রণক্ষেত্রের কৌশল বা অস্ত্রের জোরে গঠিত হয়নি, এটি নির্মিত হয়েছিল নৈতিক দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ এবং এক অবিসংবাদিত নেতার অটল অবস্থানের ওপর। একাত্তরের ২৫শে মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করে, তখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেন আত্মগোপন না করে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন - এই প্রশ্নটি আজও রাজনীতির ময়দানে ওঠে। কিছু মহল একে 'পলায়ন' বা 'দুর্বলতা' হিসেবে চিত্রিত করতে চাইলেও, আন্তর্জাতিক ইতিহাসের মানদণ্ডে এবং স্বাধীনতার নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্ত ছিল এক সুদূরপ্রসারী কৌশল এবং চূড়ান্ত আত্মত্যাগের প্রতীক।
পলায়ন নাকি সংগ্রামের অংশ?
প্রকৃত স্বাধীনতাকামী নেতার কাছে কারাগারের অন্ধকার কখনো সমাপ্তি নয়, বরং তা সংগ্রামের এক অপরিহার্য অংশ। এই নৈতিক দৃঢ়তাই তাঁকে একজন সাধারণ নেতা থেকে কালজয়ী কিংবদন্তীতে পরিণত করে।
ঐতিহাসিক প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়, তা মূলত ইতিহাসের মৌলিক শিক্ষাকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা। তিনি কি স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিলেন? নাকি তাঁকে সুকৌশলে গ্রেফতার করা হয়েছিল? মুক্তিযুদ্ধে কি তাঁর কোনো অবদান নেই?
উত্তর: ইতিহাসের সাক্ষ্য হলো - বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেননি, বরং তিনি সুকৌশলে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার এক অসাধারণ নিদর্শন।
আসুন, বিশ্ব ইতিহাসের সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত স্বাধীনতাকামী নেতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করা যাক।
বিশ্বনেতারা ও কারাগারের দর্শন
পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায়, প্রকৃত স্বাধীনতাকামী নেতারা সাধারণ শত্রুর চোখ ফাঁকি দিতে পালিয়ে যান না। তাঁরা কারাগারের অন্ধকারকেও সংগ্রামের অংশ হিসেবে বরণ করে নেন। কারণ, তাঁদের কাছে স্বাধীনতার পথ শুধু রণক্ষেত্র নয়, নৈতিক দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের পরীক্ষাক্ষেত্রও।
নেলসন ম্যান্ডেলা – ২৭ বছরের কারাভোগ
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। তাঁর সংগ্রামী জীবন কারাবাসকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছিল। তিনি কি পালিয়েছিলেন? না। নেলসন ম্যান্ডেলা প্রায় ২৭ বছর কারাভোগ করেন।
এই দীর্ঘ কারাভোগ তাঁকে ভাঙতে পারেনি - বরং বিশ্বজুড়ে তাঁর সংগ্রামকে আরও আলোকিত করেছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ম্যান্ডেলা জানতেন, তাঁর জীবিত থাকা ও কারাবরণ করাটা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক শক্তি। তাঁর অনুপস্থিতি দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলনকে বৈধতা দিয়েছিল।
মহাত্মা গান্ধী – অহিংসার পথের কারাবাস
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা মহাত্মা গান্ধী ছিলেন সত্যাগ্রহ ও অহিংসার আদর্শে বিশ্বাসী। প্রতিবারই তিনি জানতেন, অহিংস আন্দোলনের পথে অগ্রসর হলে ব্রিটিশদের হাতে তাঁর গ্রেপ্তার অনিবার্য। তবু তিনি পালিয়ে যাননি।
তাঁর কাছে কারাগার ছিল ন্যায়ের পথে চলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারাবাসই ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়কে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিল।
সুকর্ণো (Sukarno) – ইন্দোনেশিয়ার অবিচল নেতা
ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণোও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একই আদর্শিক পথ বেছে নেন। ১৯৩০-এর দশকে স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি ডাচদের হাতে কারাগারে গিয়েছিলেন এবং নির্বাসনেও ছিলেন।
সুকর্ণো কখনোই পালিয়ে যাননি। তাঁর অবিচল অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার জনগণের মনোবলকে ধরে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।
২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধু কেন পালাননি? পাঁচ কৌশলী কারণ
প্রকৃত স্বাধীনতাকামী নেতা বা জননেতার কাছে আত্মগোপন নয়, বরং শত্রুর মোকাবিলা করাই আদর্শ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৫ মার্চের সিদ্ধান্ত সেই আদর্শেরই প্রতিফলন। তিনি জানতেন, তাঁর জীবিত থাকা এবং বন্দি থাকা - উভয়ই বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করবে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে পাঁচটি অকাট্য কারণ ছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারবরণের সিদ্ধান্ত ছিল কেবল আবেগ নয়, বরং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নৈতিক অবস্থান এবং সামরিক ঝুঁকির চুলচেরা বিশ্লেষণের ফল।
(১) জনগণের বৈধ নেতা হিসেবে অবস্থান – পলায়নের প্রশ্ন নেই
বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই সময়ের পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত সংসদীয় নেতা। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল (আওয়ামী লীগ) কেবল পূর্ব পাকিস্তানেই নয়, গোটা পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল।
একজন নির্বাচিত বৈধ নেতার পক্ষে এই পরিস্থিতিতে পালিয়ে যাওয়া ছিল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করা। তিনি যদি পালিয়ে যেতেন, তাহলে পাকিস্তানি প্রচারযন্ত্র তাঁকে "রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নেতা" বা "পলাতক" হিসেবে চিহ্নিত করত এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বৈধতা হারাত। তাঁর নৈতিক দৃঢ়তা প্রমাণ করে, তিনি কোনো অপরাধী নন, বরং তিনি জনগণের বৈধ নেতা।
(২) গেরিলা বা গোপন যোদ্ধা নন
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল জনগণের অংশগ্রহণে, উন্মুক্ত রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তিনি কোনো গোপন গেরিলা বা কমিউনিস্ট সংগঠনের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন উন্মুক্ত রাজনীতির নেতা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে জনগণকে সংগঠিত করেছেন। তাঁর যুদ্ধ ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং স্বাধীনতার জন্য জনমত গঠনের।
বিচ্ছিন্নতাবাদী বা গেরিলা নেতা হিসেবে পালানোর প্রয়োজন তাঁর ছিল না। গ্রেফতারের মাধ্যমে তিনি তাঁর আন্দোলনের নৈতিক উচ্চতা ধরে রেখেছিলেন, যা সাধারণ জনগণকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে।
(৩) আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ও জীবনরক্ষার কৌশল
গ্রেফতার বরণের সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর জীবন রক্ষার এবং যুদ্ধের বৈধতা রক্ষার একটি সুদূরপ্রসারী সামরিক কৌশল। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন প্রভাবশালী নেতা। তাঁকে গ্রেফতার করার পরপরই পাকিস্তানের ওপর দ্রুত আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল।
যদি তিনি পালিয়ে যেতেন এবং গেরিলা যুদ্ধে যোগ দিতেন, তাহলে পাকিস্তানি বাহিনী হয়তো তাঁকে হত্যা করে প্রচার করত যে, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে বন্দি করার কারণে পাকিস্তানিরা তাদের হেফাজতে তাঁকে হত্যা করার সাহস পায়নি। তাঁর জীবিত থাকাটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলার অন্যতম প্রধান কারণ।
(৪) অটল নৈতিক অবস্থান ও আপোষহীন দৃঢ়তা
বঙ্গবন্ধু জানতেন, তাঁর নৈতিক অবস্থান দেশের জনগণের মনোবল ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে তাঁর জন্য কবর খুঁড়লেও (যা পরবর্তীতে জানা যায়), তিনি আপোষ করেননি বা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।
গ্রেফতারের ঠিক আগে তিনি স্বাধীনতার চূড়ান্ত বার্তাটি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর কর্তব্য শেষ করেই শত্রুর কাছে ধরা দিয়েছিলেন। এই অটল নৈতিক অবস্থান পুরো জাতিকে নয় মাস ধরে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে অবিচল রেখেছিল।
(৫) রাজনৈতিক অপপ্রচারের মুখেও সত্য প্রতিষ্ঠা
তাঁর গ্রেফতারবরণের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের সকল মিথ্যা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এক অকাট্য দলিল হিসেবে কাজ করেছিল পাকিস্তানি প্রচারযন্ত্র ও তাদের এদেশীয় দোসররা তাঁকে “বিচ্ছিন্নতাবাদী” ও “ভারতের এজেন্ট” বলে অপপ্রচার চালালেও, তাঁর গ্রেফতারবরণের সিদ্ধান্ত ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, তিনি ছিলেন আপসহীন স্বাধীনতার নেতা, যিনি দেশের জনগণের মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলেন।
তাঁর গ্রেফতারই পাকিস্তানের সামরিক জান্তার অপরাধী চেহারা আন্তর্জাতিক মহলে উন্মোচিত করে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখে।
কারাবন্দী মুজিব – প্রেরণার বীজমন্ত্র ও বিজয়ের চালিকাশক্তি
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের অজ্ঞাত কারাগারে নিয়ে যায়, তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিল যে, বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম থেমে যাবে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ। তাঁর কারাবন্দি থাকাই যেন পুরো জাতির জন্য পরিণত হয়েছিল এক অলিখিত অনুপ্রেরণায়। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁর নাম ও আদর্শ হয়ে উঠেছিল পুরো মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তি, প্রেরণার বীজমন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
কারাবাস যেখানে সংগ্রামের কেন্দ্র
স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জনযুদ্ধের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, যেখানে নেতা অনুপস্থিত থেকেও যুদ্ধের প্রতিটি ধাপকে নিয়ন্ত্রণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রাম এবং নৈতিক দৃঢ়তা এমন এক জনভিত্তি তৈরি করেছিল যে, তাঁর কারাবন্দি অবস্থাই মুক্তিযুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পরিবর্তে এক গভীর প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী বা ফয়সালাবাদের অন্ধকার কারাগারে বঙ্গবন্ধু বন্দি থাকা সত্ত্বেও তাঁর নাম ও আদর্শই ছিল রণাঙ্গন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টেবিল পর্যন্ত পুরো মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি। তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের বীজমন্ত্র, "জয় বাংলা" স্লোগানটি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এমন এক আদর্শিক বন্ধন তৈরি করেছিল, যা কোনো সামরিক শক্তি ভাঙতে পারেনি।
মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি – অনুপস্থিতিতেও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা
মুক্তিযুদ্ধকে সফল ও আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ করার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সরকারের প্রয়োজন ছিল। আর এই সরকার গঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নাম ও নেতৃত্বকে কেন্দ্র করেই।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। এই ঘোষণার মাধ্যমে প্রমাণ হলো যে, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁর নেতৃত্বকেই সরকার মেনে নিয়েছিল। এই পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একদিকে যেমন পাকিস্তানিদের সামরিক আগ্রাসনকে অবৈধ প্রমাণ করে, তেমনি অন্যদিকে স্বাধীনতার সংগ্রামকে আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়।
তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি (পরবর্তীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই নেতৃত্ব কেবল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই পরিচালিত হচ্ছিল।
"জয় বাংলা" স্লোগান ও জনমনোবল
মুক্তিযোদ্ধারা "জয় বাংলা" স্লোগানে যুদ্ধ করেছিল, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল বীজমন্ত্র। এই স্লোগান ছিল কেবল একটি জয়ধ্বনি নয়, এটি ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক মুক্তির প্রতীক।
বঙ্গবন্ধুর নামেই যুদ্ধের প্রতিটি প্রচার-প্রচারণা পরিচালিত হতো। তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উদ্দীপনা জনগণকে গেরিলা যোদ্ধা, আশ্রয়দাতা, বা তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে যুদ্ধে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর কারাবন্দি থাকাটাই জনগণের মনোবলকে আরও ইস্পাত কঠিন করেছিল - কারণ তারা জানত, তাদের নেতা চরম ত্যাগ স্বীকার করছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি – স্বাধীনতার শক্তিশালী হাতিয়ার
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বন্দিদশা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল না, এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।
কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের বহু দেশ শেখ মুজিবের বন্দিদশাকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে। এই বিশ্বনেতারা পাকিস্তানের সামরিক জান্তার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন যাতে বঙ্গবন্ধুর কোনো ক্ষতি না হয়।
তাঁর প্রতি বিশ্বনেতাদের এই সহমর্মিতা এবং আন্তর্জাতিক চাপই নিশ্চিত করেছিল যে, পাকিস্তান সরকার তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সাহস পায়নি। তাঁর জীবিত থাকাটাই ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নেতাকে বন্দি করার কারণে পাকিস্তান দ্রুত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি নির্যাতনকারী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই চাপ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিল।
"Mujib’s Bangladesh" উপাধি
বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে “Mujib’s Bangladesh” বলা শুরু করে। এই উপাধি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব তখন থেকেই জানত যে, এই যুদ্ধ একজন একক, নির্বাচিত এবং জনপ্রিয় নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই স্বাধীনতার যুদ্ধকে নিছক কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে না দেখে, বরং বৈধ জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরেছিল।
তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং নামের প্রতি সহানুভূতি থাকার কারণেই প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় পেয়েছিল এবং ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণে সহায়তা করেছিল।
নৈতিক দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের অপরিহার্যতা
নেলসন ম্যান্ডেলা, মহাত্মা গান্ধী এবং শেখ মুজিবুর রহমান - তাঁদের জীবন আমাদের এক ঐতিহাসিক শিক্ষা দেয়: প্রকৃত স্বাধীনতাকামী নেতা কখনো পালিয়ে যান না। তাঁরা কারাগারের শিকল ভেতর থেকেও স্বাধীনতার শপথ অটুট রাখেন।
স্বাধীনতার জন্য শুধু সশস্ত্র সংগ্রাম নয়, নৈতিক দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগও অপরিহার্য। বঙ্গবন্ধুর ২৫শে মার্চের গ্রেফতারবরণ ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি আদর্শিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে তাঁর এক চূড়ান্ত বিজয়। অপবাদ দিলেও ইতিহাস প্রমাণ করেছে - তিনি ছিলেন আপসহীন স্বাধীনতার নেতা, যিনি জানতেন যে, তাঁর জীবন রক্ষা পেলে তা একটি স্বাধীন জাতি গঠনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
বঙ্গবন্ধুর এই আত্মত্যাগের সিদ্ধান্তই নিশ্চিত করেছিল, স্বাধীনতার যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি ছিল নৈতিকতা ও ন্যায়ের পথে চলা এক মহাকাব্যিক গণযুদ্ধ। এই কারণেই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদান প্রশ্নাতীত, আর তাঁর গ্রেফতারবরণ ছিল সেই সংগ্রামের এক অপরিহার্য ও ঐতিহাসিক কৌশল।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.













