মা যদি আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তবে এখনো ক্ষমতায় থাকতেন
"আমার মা যদি আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তবে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন" - আলজাজিরাকে দেয়া সাক্ষাতকারে সজিব ওয়াজেদ জয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের উত্তাল দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এক গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগ এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় যে মন্তব্য করেছেন, তা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে বিশ্ব রাজনীতি ও ইতিহাসের বোদ্ধাদের।

TruthBangla

"আমার মা যদি আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তবে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন" - আলজাজিরাকে দেয়া সাক্ষাতকারে সজিব ওয়াজেদ জয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের উত্তাল দিনগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত জটিল, আবেগঘন ও অমীমাংসিত অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত রূপান্তরিত হয় এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং তাড়াহুড়ো করে দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে ইতি ঘটে টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এক ঐতিহাসিক শাসনকালের। কিন্তু এই ক্ষমতার পরিবর্তন কি কেবলই একটি রাজনৈতিক পতন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক সুবিশাল আত্মত্যাগ ও কৌশলী রাষ্ট্রনায়কসুলভ মানবিক সিদ্ধান্ত?
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার তনয় ও তাঁর তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় যে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, তা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ভূ-রাজনীতির গবেষক এবং ইতিহাসের বোদ্ধাদের। সজীব ওয়াজেদ জয়ের সেই একটি বাক্য আজ বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু:
“আমার মা যদি আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তবে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন। তিনি রক্তপাত এড়াতেই দেশ ছেড়েছেন।”
এই বক্তব্যটি কি কেবলই একজন পুত্রের মায়ের প্রতি রাজনৈতিক সাফাই, নাকি এর পেছনে রয়েছে বিশ্ব ইতিহাসের গতিধারা, স্বৈরশাসনের মনস্তত্ত্ব এবং বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচানোর এক ঐতিহাসিক সত্য? শেখ হাসিনা কি ক্ষমতার মোহকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, নাকি হাজার হাজার তরুণ ও সাধারণ মানুষের জীবনকে নিজের রাজনীতির চেয়ে বড় করে দেখেছিলেন? এই নিবন্ধে আমরা সজীব ওয়াজেদ জয়ের মন্তব্যের আলোকেই শুধু নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের আয়াতুল্লাহ খোমেনি, জোসেফ স্ট্যালিন, বেনিতো মুসোলিনি কিংবা আধুনিক যুগের বাশার আল-আসাদের মতো শাসকদের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে শেখ হাসিনার এই কঠিন সিদ্ধান্তের চুলচেরা ব্যবচ্ছেদ করব।
আল জাজিরায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকার
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পেছনের নেপথ্য গল্প ও অজানা সমীকরণ উন্মোচন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা নানা গুঞ্জন, ভুল তথ্য ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের ভিড়ে জয়ের দেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি ছিল একটি স্পষ্ট ও কৌশলগত রাজনৈতিক বক্তব্য। এই সাক্ষাৎকারের মূল সুর লুকিয়ে ছিল দুটি শব্দের ভেতর ‘মায়ের প্রতি ন্যায়বিচার’ এবং ‘বাস্তবতার নিরিখে ভুল স্বীকার’।
সাক্ষাৎকারে জয় অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ সরকার এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা যেভাবে মোকাবিলা করেছিল, তাতে কৌশলগত ও রাজনৈতিক বড় ধরনের ভুল ছিল। জয় স্বীকার করেন যে, আন্দোলনের শুরুর দিকেই সরাসরি শিক্ষার্থীদের সাথে কোনো আমলাতান্ত্রিক মধ্যস্থতাকারী ছাড়া রাজনৈতিক টেবিলে বসা উচিত ছিল। সরকারের ভেতরের কিছু ভুল পরামর্শ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির কারণে আন্দোলনটি একটি অগ্নিকুণ্ডে রূপ নেয়, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতাবিরোধী ও উগ্রপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে।
তবে জয়ের বক্তব্যের সবচেয়ে জোরালো এবং ঐতিহাসিক অংশটি ছিল শেখ হাসিনার ক্ষমতা ত্যাগের পেছনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা কোনো পরিস্থিতিতেই একজন বলপ্রয়োগকারী স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যদি তিনি আন্দোলনকারীদের যেকোনো মূল্যে দমনের পূর্ণ এবং নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা দিতেন, তবে সেই মুহূর্তে সরকার পতন ঘটানো কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রযন্ত্র, সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশের সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রয়োগ করলে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়তো হতো, কিন্তু ক্ষমতার মসনদ সুরক্ষিত থাকত। কিন্তু শেখ হাসিনা সেই রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার পথ বেছে নেননি। জয়ের ভাষায়:
"আমার মা যদি আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তবে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন। তিনি দেশের মানুষকে হত্যা করে ক্ষমতায় থাকার নীতিতে বিশ্বাস করেন না। রাজপথে হাজার হাজার মানুষের লাশ ফেলার চেয়ে তিনি নিজে ক্ষমতা থেকে সরে গিয়ে প্রবাস জীবন বেছে নেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছেন।"
‘শেখ হাসিনা যুগ’ এর অবসান?
অনেকে মনে করেন ৫ আগস্টের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে আকস্মিকভাবে ও জোরপূর্বক ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে। কিন্তু সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া তথ্য এক সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের উন্মোচন করে। তিনি জানান, শেখ হাসিনা নিজেই ২০২৪ সালের জানুয়ারি নির্বাচনের পর এই মেয়াদের শেষেই রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে অবসরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত্তি সুদৃঢ় করে এক নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। অর্থাৎ, ‘শেখ হাসিনা যুগ’-এর অবসান ছিল সময়ের একটি স্বাভাবিক ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া। ৫ আগস্টের উসকানিমূলক রাজনৈতিক সংকট কেবল সেই বিদায়কে ত্বরান্বিত করেছে এবং এক আবেগঘন ও নাটকীয় প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়েছে।
খোমেনি, স্ট্যালিন ও মুসোলিনি বনাম শেখ হাসিনা
ইতিহাস এক নির্মম ও নিরপেক্ষ বিচারক। কোনো শাসক যখন কোনো রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তখন তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত সমকালীন সমাজকে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি দূরবর্তী ভবিষ্যতেও তার প্রভাব থেকে যায়। ইতিহাস যখন কোনো রাজনৈতিক নেতাকে মূল্যায়ন করে, তখন শুধু তাঁর শাসনকালের সাফল্য বা ভুলত্রুটি দেখে না; বরং সংকটকালে তিনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন এবং ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটিকে মূল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।
পৃথিবীর ইতিহাস রক্তাক্ত রাজনৈতিক অভ্যুত্থান, বিপ্লব এবং গণআন্দোলনে পরিপূর্ণ। ইতিহাস জুড়ে আমরা দেখেছি, শাসকরা যখনই তাঁদের ক্ষমতার ওপর হুমকি দেখতে পেয়েছেন, তখনই তাঁরা নির্দ্বিধায় রাষ্ট্রের পুরো শক্তি প্রয়োগ করে বিরোধীদের পিষে ফেলেছেন। ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখতে কোটি মানুষের জীবন নিতেও অনেক শাসক পিছপা হননি।
তাহলে ইতিহাসের সেই সমস্ত নৃশংস ও রক্তপিপাসু শাসকদের সাথে শেখ হাসিনার তুলনা কীভাবে সম্ভব? স্বাধীনতাবিরোধী ও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন শেখ হাসিনাকে একজন ‘একনায়ক’ বা ‘রক্তচক্ষু স্বৈরশাসক’ হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালায়, তখন বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস আমাদের ভিন্ন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। শেখ হাসিনার পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের তিন বিতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী শাসনামলের দিকে তাকাতে হবে ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি, সোভিয়েত ইউনিয়নের জোসেফ স্ট্যালিন এবং ইতালির বেনিতো মুসোলিনি।
রক্তখেকো আয়াতুল্লাহ খোমেনির শাসনামল
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে দিয়েছিল। মার্কিন সমর্থিত অপপ্রশাসন ও রেজা শাহ পাহলভির পতনের পর ইরানে ধর্মীয় বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। খোমেনির শাসনকালকে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ধর্মতাত্ত্বিক একনায়কত্ব ও চরম দমনপীড়নের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
খোমেনি যখন দেখলেন তাঁর বিপ্লবের পর দেশে বিভিন্ন বামপন্থী, উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক দলগুলো নিজস্ব অধিকার ও ক্ষমতার অংশ দাবি করছে, তখন তিনি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটেননি। বরং তিনি তাঁর নিজস্ব অনুগত সশস্ত্র বাহিনী 'ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর' (IRGC) এবং 'বাসিজ' মিলিশিয়া ব্যবহার করে বিরোধীদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম বর্বর দমনপীড়ন চালান।
হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান: ইরানি বিপ্লব পরবর্তী প্রথম কয়েক বছরে অফিশিয়াল ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী, প্রায় ১৮,০০০ মানুষকে সরাসরি রাজনৈতিক কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বা হত্যা করা হয়েছিল। এই আন্দোলন ও গৃহযুদ্ধসদৃশ পরিস্থিতিতে আহত ও পঙ্গু হয়েছিলেন ৪ লক্ষেরও বেশি মানুষ।
১৯৮৮ সালের বন্দি হত্যাকাণ্ড: খোমেনির শাসনের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ছিল ১৯৮৮ সালে রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর চালানো গণহত্যা। একটি গোপন ফতোয়ার মাধ্যমে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ রাজনৈতিক বন্দিকে (যাঁদের অনেকেই আগে থেকেই সাজা ভোগ করছিলেন) বিনা বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল এবং গণকবরে পুঁতে ফেলা হয়েছিল।
ঐশ্বরিক ক্ষমতার দাবি: খোমেনির রাজনৈতিক দর্শন ছিল ‘ভেলায়েত-ই ফকিহ’ বা ধর্মীয় তত্ত্ব অভিভাবকত্ব। তাঁর কাছে ক্ষমতার মূল ভিত্তি ছিল ঐশ্বরিক নির্দেশ। ফলে তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করাকে তিনি স্রষ্টার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করতেন। এর ফলে যেকোনো বিরোধী কণ্ঠকে হত্যা বা গুপ্তহত্যা করাকে তিনি বৈধ মনে করতেন।
খোমেনি তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পুরো দেশকে লাশের স্তূপে পরিণত করেছিলেন। তাঁর কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে ক্ষমতার ধরে রাখা এবং 'বিপ্লবী আদর্শ' বজায় রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
জোসেফ স্ট্যালিন ও বেনিতো মুসোলিনির নৃশংসতা
ইউরোপের বিশ শতকের ইতিহাস ছিল দুই সর্বগ্রাসী মতাদর্শের দ্বারা বিষাক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্যবাদী একনায়কত্ব এবং ইতালির ফ্যাসিবাদ। এই দুই মতাদর্শের শীর্ষে ছিলেন জোসেফ স্ট্যালিন এবং বেনিতো মুসোলিনি। ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এই দুইজন যেভাবে মানবজাতিকে লাঞ্ছিত করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী কালিমালিপ্ত অধ্যায় হয়ে আছে।
জোসেফ স্ট্যালিনের 'মহাবিনাশ' (Great Purge)
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিতে নিজের একছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে জোসেফ স্ট্যালিন যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন, তাকে বলা হয় 'গ্রেট পার্জ' বা মহাবিনাশ।
স্ট্যালিনের মনে সামান্যতম সন্দেহ দেখা দিলেই তিনি তাঁর সহযোদ্ধা, সেনা প্রধান, বুদ্ধিজীবী কিংবা সাধারণ জনগণকে গুম করে ফেলতেন বা গুলি করে হত্যা করতেন।
১৯৩৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে স্ট্যালিন প্রায় ১০ থেকে ২০ লক্ষ মানুষকে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে সাইবেরিয়ার বরফাবৃত ‘গুলাগ’ (Gulag) শ্রমশিবিরে পাঠিয়েছিলেন, যার মধ্যে আনুমানিক ৭ থেকে ১২ লক্ষ মানুষকে সরাসরি হত্যা করা হয়। স্ট্যালিনের কাছে ক্ষমতা রক্ষার একমাত্র মূলমন্ত্র ছিল:
"মানুষ থাকলে সমস্যা থাকে, মানুষ না থাকলে সমস্যাও থাকে না।"
তিনি ক্ষমতার জন্য পুরো সমাজকে একটি বিশাল বন্দিশালায় পরিণত করেছিলেন।
বেনিতো মুসোলিনির ব্ল্যাকশার্ট ও ফ্যাসিবাদের রাজত্ব
ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনি প্রবর্তন করেছিলেন ফ্যাসিবাদ, যা ছিল চরম জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক সহিংসতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মুসোলিনির নিজস্ব অনুগত ক্যাডার বাহিনী 'ব্ল্যাকশার্টস' (Blackshirts) দিয়ে তিনি যেকোনো শ্রমিক ধর্মঘট, ছাত্র আন্দোলন বা রাজনৈতিক সমাবেশকে বুলেটের মুখে ভেঙে দিতেন।
সংবাদপত্রের বাকস্বাধীনতা পুরোপুরি রুদ্ধ করা হয়েছিল এবং সমস্ত বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ করে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল।
ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে তিনি ইতালিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো আত্মঘাতী যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন, যার পরিণতিতে লাখ লাখ ইতালীয় নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছিল।
বিশ্ব শাসকদের সাথে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের পার্থক্য
শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের সিদ্ধান্তকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে খোমেনি বা স্ট্যালিনের মতো ঐতিহাসিক উদাহরণের পাশাপাশি আধুনিক যুগের সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ এবং লিবিয়ার মুয়াম্মা গাদ্দাফির সাথে তুলনা করা প্রয়োজন।
২০১১ সালের 'আরব বসন্ত'-এর সময় যখন সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন বাশার আল-আসাদ ক্ষমতা ছাড়েননি। তিনি নিজের দেশের জনগণের ওপর কেমিক্যাল অস্ত্র, ব্যারেল বোমা এবং ফাইটার জেট ব্যবহার করেছিলেন। ফলাফল? সিরিয়া আজ এক ধ্বংসস্তূপ, যেখানে ৫ লক্ষের বেশি মানুষ মারা গেছে এবং এক কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হয়েছে। লিবিয়ায় গাদ্দাফী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।
নিচের টেবিলে বিশ্ব ইতিহাসের চরম সংকটকালে কয়েকজন প্রভাবশালী শাসকের নেওয়া পদক্ষেপের সাথে শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট ২০২৪-এর সিদ্ধান্তের একটি নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তুলনা তুলে ধরা হলো:
শাসকের নাম ও দেশ | সংকটের ধরণ ও সময়কাল | ব্যবহৃত বলপ্রয়োগের মাত্রা | ক্ষমতা রক্ষার পরিণাম / ফলাফল | শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের সাথে মৌলিক পার্থক্য |
আয়াতুল্লাহ খোমেনি (ইরান) | ১৯৭৯-১৯৮৮ (রাজনৈতিক বিরোধিতা ও গণবিক্ষোভ) | চরম নৃশংসতা; ১৮,০০০+ রাজনৈতিক হত্যা, ১৯৮৮-তে বন্দি গণহত্যা। | ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ও সুরক্ষিত হয়; বিরোধী মত পুরোপুরি নির্মূল। | খোমেনি ক্ষমতার জন্য রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন; শেখ হাসিনা রাজপথে প্রাণহানি এড়াতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। |
জোসেফ স্ট্যালিন (সোভিয়েত ইউনিয়ন) | ১৯৩৬-১৯৩৮ (পার্টি ও জনগণের অসন্তোষ) | মহাবিনাশ (Great Purge); সাইবেরিয়ার গুলাগে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা। | ভয় ও ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করে আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখা। | স্ট্যালিন সন্দেহের বশেও মানুষকে হত্যা করেছিলেন; শেখ হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখার চেয়ে জীবনের মূল্যকে বড় দেখেছেন। |
বাশার আল-আসাদ (সিরিয়া) | ২০১১-বর্তমান (আরব বসন্ত ও আন্দোলন) | রাজপথে ফাইটার জেট, কেমিক্যাল অস্ত্র ও ব্যারেল বোমার ব্যবহার। | দেশ ধ্বংসস্তূপ, ৫ লক্ষাধিক মৃত, ১ কোটি মানবেতর শরণার্থী। | আসাদ ক্ষমতা রক্ষায় দেশকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দেন; শেখ হাসিনা দেশকে গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচাতে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান। |
মুয়াম্মা গাদ্দাফি (লিবিয়া) | ২০১১ (জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থান) | সাধারণ মানুষের ওপর বিমান হামলা ও ভারী সামরিক বাহিনী মোতায়েন। | লিবিয়া একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়, গাদ্দাফির নিদারুণ পতন। | গাদ্দাফি শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে দেশকে ধ্বংস করেন; শেখ হাসিনা দেশের শান্তির জন্য নিজের সিংহাসন বিসর্জন দেন। |
শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ) | ২০২৪ (জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান) | সীমিত ও বিতর্কিত প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর চরম বলপ্রয়োগ প্রত্যাখ্যান। | পদত্যাগ ও প্রবাস জীবন গ্রহণ; ঢাকাকে রক্তাক্ত গণহত্যা থেকে রক্ষা। | রাজপথে হাজার হাজার লাশ ফেলার প্রযুক্তি ও সামরিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার না করে আত্মত্যাগ বেছে নেন। |
শেখ হাসিনা কেন আলাদা? একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এড়ানোর সিদ্ধান্ত?
উপরের ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক তুলনা বিশ্লেষণ করলে একটি সত্য পরিষ্কার হয়ে ওঠে: শেখ হাসিনা যদি সত্যিই রক্তপিপাসু কোনো একনায়ক হতেন, তবে ৫ আগস্ট ঢাকার রাজপথ এক অভূতপূর্ব গণহত্যার সাক্ষী হতো।
৫ আগস্ট সকালে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ গণভবনের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল, তখন শেখ হাসিনার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল:
প্রথম পথ (সামরিক বলপ্রয়োগ): স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF), পুলিশ, র্যাব এবং সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে চরম বলপ্রয়োগ করা। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে এবং গণভবনের সুরক্ষায় আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষকে গুলি করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া। এতে হয়তো সেদিন গণভবন রক্ষা পেত, কিন্তু ঢাকার রাজপথ পরিণত হতো হাজারো লাশের স্তূপে।
দ্বিতীয় পথ (স্বেচ্ছায় পদত্যাগ ও আত্মত্যাগ): ক্ষমতার মায়া ত্যাগ করে, অনুগত নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার ঝুঁকি জেনেও, নিজের জীবনকে বাজি রেখে দেশত্যাগ করা যাতে সাধারণ মানুষের রক্ত না ঝরে।
শেখ হাসিনা দ্বিধাহীনভাবে দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে কোনো গণআন্দোলন দমনের জন্য প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে তার শীর্ষ ১০-১৫ জন মাস্টারমাইন্ডকে আটক বা নিষ্ক্রিয় করাই যথেষ্ট ছিল। প্রযুক্তির এই সুবর্ণ যুগে বাংলাদেশের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এটি মোটেও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনা চাননি দেশ একটি দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধে (Civil War) নিপতিত হোক।
তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, আন্দোলনকারীদের ওপর সর্বাত্মক হামলা চালালে দেশের ভেতর শুরু হতে পারত চরম বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধ। যার সুযোগ নিত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব-বিরোধী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরাশক্তি এবং প্রতিবেশী শত্রু ভাবাপন্ন গোষ্ঠীগুলো। দেশের অর্থনীতি, তৈরি পোশাক শিল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা মেট্রোরেলের মতো সুবিশাল জাতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে যেত।
সুতরাং, তিনি ক্ষমতার মোহ ছেড়ে নিজের ওপর সমস্ত অপবাদ ও নিঃসঙ্গ প্রবাস জীবনের ঝুঁকি নিজ স্কন্ধে তুলে নেন। এটি কোনো দুর্বলতা ছিল না; এটি ছিল একজন দূরদর্শী 'স্টেটসম্যান' বা রাষ্ট্রনায়কের চরম আত্মত্যাগ।
১৫ বছরের শেখ হাসিনা যুগ
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকাল ছিল আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত রূপান্তরের এক স্বর্ণযুগ। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করার পর বাংলাদেশ যখন দীর্ঘ সামরিক শাসন, কুপমণ্ডূকতা এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন শেখ হাসিনা আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন।
২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তিনি বাংলাদেশকে 'তলাবিহীন ঝুড়ি'র তকমা থেকে মুক্ত করে বিশ্বে এক উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
দৃশ্যমান মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক পরিকাঠামো
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, তা আগামী এক শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের মানুষ ভোগ করবে:
পদ্মা বহুমুখী সেতু: বিশ্বব্যাংক যখন অপপ্রচারের ভিত্তিতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করে দেখান। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে সরাসরি রাজধানীর সাথে যুক্ত করেছে।
ঢাকা মেট্রোরেল: রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার এক মাইলফলক, যা বাংলাদেশের নগর জীবনে ইউরোপীয় স্তরের আধুনিকতা নিয়ে এসেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: বাংলাদেশকে বিশ্বের পরমাণু শক্তিধর এলিট ক্লাবে যুক্ত করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা দেশের ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুতের চাহিদা মেটাবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল: দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদী তলদেশের টানেল, যা চট্টগ্রামকে 'ওয়ান সিটি টু টাউন' মডেলের দিকে নিয়ে গেছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ
তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' রূপকল্প বাস্তবায়নের ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ আজ ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ) এবং ই-গভর্নেন্সের সুফল ভোগ করছে। ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি সেক্টরে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থা দমনে ঐতিহাসিক সাফল্য
শেখ হাসিনার শাসনকালের অন্যতম বড় অবদান ছিল জঙ্গিবাদ ও উগ্র ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর 'জিরো টলারেন্স' নীতি। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে বাংলাদেশে উগ্রপন্থার অভূতপূর্ব উত্থান ঘটেছিল। দেশের ৬৩টি জেলায় একসাথে সিরিজ বোমা হামলা, বাংলা ভাইয়ের উদ্ভব এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য তৈরির প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।
পাকিস্তান সবসময়ই বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে তাদের দোসর জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে উগ্রবাদ জারি রাখতে চেয়েছিল, যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সীমান্তে অস্থিরতা বজায় থাকে। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে অত্যন্ত শক্ত হাতে এবং সাহসিকতার সাথে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় জঙ্গিবাদ দমন করেন।
হোলি আর্টিসান ট্র্যাজেডি ও কঠোর পদক্ষেপ: ২০১৬ সালের হোলি আর্টিসান হামলার পর শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে পুলিশ ও সিটিটিসি (CTTC) দেশের কোণায় কোণায় থাকা জঙ্গি আস্তানাগুলো ধ্বংস করে দেয়।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা: বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে কোনো বিদেশী বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গি গোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে না দিয়ে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। বিশ্ব দরবারে তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন 'জঙ্গিবাদ বিরোধী নেত্রী' হিসেবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সজীব ওয়াজেদ জয়ের অন্যান্য যুক্তি
সজীব ওয়াজেদ জয় কেবল আল জাজিরা নয়, বরং বিবিসি (BBC), রয়টার্স (Reuters), এসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং ভারতের এএনআই-কে (ANI) দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের ক্ষমতা পরিবর্তন নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেছেন:
রাজনীতি থেকে অবসরের পরিকল্পনা: আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয় স্পষ্ট করেছেন যে, শেখ হাসিনা এই মেয়াদেই স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাঁর বয়স এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্লান্তি বিবেচনা করে ২০২৪ সালের পর তিনি আর নতুন করে নির্বাচনে দাঁড়াতে চাননি। ফলে তাঁর অপসারণকে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক সূচকের ত্বরান্বিত রূপ বলা যায়।
ভারতের আশ্রয়ে শেখ হাসিনা ও জীবনরক্ষা: ভারতের গণমাধ্যম এএনআই-কে (ANI) দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয় জানান, ৫ আগস্ট যদি শেখ হাসিনা দেশত্যাগ না করতেন, তবে ছদ্মবেশী উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও আততায়ীরা তাঁকে হত্যা করত। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন যে, সঠিক সময়ে উদ্ধার করে ভারত সরকার তাঁর মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।
লিকড অডিও টেক্সট ও বলপ্রয়োগের নির্দেশ সম্পর্কিত স্পষ্টীকরণ
গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপে শেখ হাসিনাকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিতে শোনা গেছে বলে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সজীব ওয়াজেদ জয় তার একটি কৌশলগত আইনি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:
অডিওর মূল প্রেক্ষাপট: জয় উল্লেখ করেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এই অডিও ক্লিপগুলোকে আংশিকভাবে এবং প্রেক্ষাপটচ্যুত করে (taken out of context) প্রচার করা হয়েছে।
উগ্রপন্থী প্রতিরোধ বনাম সাধারণ ছাত্র: শেখ হাসিনার নির্দেশ ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ (যেমন মেট্রোরেল, বিটিভি ভবন, সেতু ভবন, ডাটা সেন্টার) ধ্বংসকারী উগ্রপন্থী ও নাশকতামূলক শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া, কোনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালানো নয়। জয় দাবি করেন, সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের ওপর যখন সন্ত্রাসীরা প্রাণঘাতী আক্রমণ চালিয়েছিল, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আত্মরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষার আইনি এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও প্রত্যর্পণ (Extradition) আইনি লড়াই
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং ভারত থেকে প্রত্যর্পণের যে আবেদন জানিয়েছে, সে বিষয়ে জয়ের বক্তব্য হলো:
আইনি মানদণ্ড ও 'ডাইনি শিকার' (Witch Hunt): জয় এই বিচারপ্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘ডাইনি শিকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভারতের অবস্থান: ভারত একটি স্বাধীন ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণকারী দেশ। কোনো প্রকার নিরেট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের আন্তর্জাতিক সুযোগ না দিয়ে কাউকে রাজনৈতিক হস্তান্তরের আইনি ভিত্তি ভারতে নেই বলে তিনি মনে করেন।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও বহিরাগত শক্তির ভূমিকা
বিশ্লেষকদের একাংশ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলবিদদের মতে, ২০২৪ সালের এই আন্দোলন কেবল অভ্যন্তরীণ কোটা আন্দোলনের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির গভীর প্রভাব ছিল:
বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল: ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের এক অদৃশ্য যুদ্ধ দীর্ঘকাল ধরে চলছে।
ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি: শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে চীন, ভারত ও পশ্চিমের সঙ্গে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেছিলেন। বিশেষ করে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাবে রাজি না হওয়া এবং দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে না দেওয়ার অনমনীয় অবস্থান পশ্চিমা কিছু রাষ্ট্রকে অসন্তুষ্ট করেছিল বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে।
৭০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত হয়ে যাবে এমন ধারণাকে সজীব ওয়াজেদ জয় পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিয়েছেন:
ঐতিহাসিক ভিত্তি: জয় স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোনো ক্ষণস্থায়ী দল নয়; এটি বিগত ৭০ বছর ধরে টিকে থাকা দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
নেতৃত্বের পরিবর্তন: "কেউ চিরদিন বেঁচে থাকে না" এক সাক্ষাৎকারে জয়ের এই মন্তব্য নির্দেশ করে যে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবসানের পরও আওয়ামী লীগ একটি নতুন তরুণ নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনর্গঠিত হবে এবং ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজপথে ফিরে আসবে।
২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট
শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশ যেসব জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং বৈশ্বিক গবেষকরা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন:
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: টানা ১৫ বছরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পোশাক খাতের স্থায়িত্ব এবং প্রবাসী আয়ের সুবাতাস আজ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগের মন্দা ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়তে শুরু করেছে।
উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ উত্থানের শঙ্কা: শেখ হাসিনা কঠোর হাতে যেসব উগ্র ধর্মীয় চরমপন্থী সংগঠনকে দমন করে রেখেছিলেন, তাদের পুনর্বাসন দেশের অভ্যন্তরীণ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
প্রচার-অপপ্রচার ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন
আজকের সোশ্যাল মিডিয়া চালিত আবেগপ্রবণ ও অপতথ্যে ভরপুর রাজনৈতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে অনেকেই হয়তো শেখ হাসিনাকে ভুল বুঝছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অতি-ব্যবহার বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণীর স্বাধীনতাবিরোধী ও সুযোগ সন্ধানী রাজনৈতিক শক্তি তাঁর উন্নয়ন ও ব্ল্যাকআউট করে দিতে চাচ্ছে।
কিন্তু ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম ও সত্যবাদী। আজ যারা তাঁকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে গালি দিচ্ছে, কাল যখন তারা ক্ষমতার অস্থিতিশীলতা, উগ্রবাদের পুনরুত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার দেশগুলোর মতো গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা চাক্ষুষ করবে, তখন তারা অনুধাবন করতে পারবে শেখ হাসিনা কীভাবে এক শক্ত ঢাল হয়ে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছিলেন।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসে গবেষণার বিষয় হবে। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য হাজার হাজার তরুণকে হত্যা না করে, নিজে নির্বাসিত হওয়াটা কোনো রাজনৈতিক পরাজয় নয়; বরং এটি ইতিহাসের পাতায় এক বিশাল নৈতিক ও মানবিক বিজয়।
নেতা বনাম শাসক এবং এক অমর ইতিহাস
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বে শাসক (Ruler) এবং নেতা বা রাষ্ট্রনায়কের (Statesman) মধ্যে এক মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। শাসক রাজত্ব করে অস্ত্রের মুখে, ভয়ের রাজত্ব তৈরি করে এবং ক্ষমতার লোভে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতেও দ্বিধা করে না। অন্যদিকে, একজন প্রকৃত নেতা বা রাষ্ট্রনায়ক নেতৃত্ব দেন ত্যাগ, নৈতিকতা এবং দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে।
শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪ প্রমাণ করেছেন যে তিনি ক্ষমতার লোভী কোনো সাধারণ শাসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা এক প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক। তিনি জানতেন দেশ ছাড়লে তাঁর প্রিয় দল আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ কর্মী বিপদে পড়বেন, তাঁর বিরুদ্ধে ভূয়া ও প্রতিহিংসামূলক শত শত মামলা দেওয়া হবে, এবং হয়তো তাঁকে সারা জীবন প্রবাসের নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হবে। সব জেনেও তিনি দেশের শান্তি এবং তরুণ প্রজন্মের রক্ত বাঁচানোকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সজীব ওয়াজেদ জয় আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে যে সত্যটি উচ্চারণ করেছেন, তা আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে: "আমার মা যদি হত্যা করতে চাইতেন, তবে তিনি ক্ষমতায় থাকতেন।" কিন্তু তিনি রক্ত চাননি, তিনি শান্তি চেয়েছিলেন।
ইতিহাস একদিন ঠিকই তার নিরপেক্ষ রায় দেবে। কাল মেঘ কেটে সূর্য উঠবেই, আর সেদিন ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেবে কে ছিল রক্তপিপাসু ঘাতক আর কে ছিল নিজের সর্বোচ্চ বিসর্জন দিয়ে জাতিকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচানো সত্যিকারের রক্ষক। শেখ হাসিনা নামক অধ্যায়টি হয়তো সাময়িকভাবে প্রবাসের কুয়াশায় আবৃত, কিন্তু তাঁর অর্জিত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, মেগা প্রকল্পসমূহ এবং মহৎ আত্মত্যাগের গল্প বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।















