মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কি ভারতে বন্দি ছিলেন?
কিংবদন্তী মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন ও ভূমিকা নিয়ে একাত্তর-পরবর্তী সময়ে কিছু মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও মিথ্যাচার ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত অপপ্রচার হলো - মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নাকি ভারত সরকারের দ্বারা 'বন্দি' ছিলেন। বস্তুত, যুদ্ধের সময় তিনি ভারতে ছিলেন আশ্রয়প্রার্থী, বন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সচেষ্ট একজন নেতা হিসেবে।

TruthBangla
Dec 10, 2025
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক কিংবদন্তী নাম। তাঁর সংগ্রামী জীবন, কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং 'আসসালামু আলাইকুম' ঘোষণার মতো সাহসী পদক্ষেপগুলো তাঁকে 'গণমানুষের নেতা' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর জীবন ও ভূমিকা নিয়ে একাত্তর-পরবর্তী সময়ে কিছু মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও মিথ্যাচার ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত অপপ্রচার হলো - মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নাকি ভারত সরকারের দ্বারা 'বন্দি' ছিলেন।
প্রকৃত ইতিহাস এবং মওলানা ভাসানীর নিজস্ব নথিপত্র প্রমাণ করে, এই দাবিটি ভিত্তিহীন এবং নির্লজ্জ মিথ্যাচার। বস্তুত, যুদ্ধের সময় তিনি ভারতে ছিলেন আশ্রয়প্রার্থী, বন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সচেষ্ট একজন নেতা হিসেবে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিকূলতা এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে লেখা আবেগপূর্ণ চিঠিটিই সেই সত্যের সাক্ষ্য দেয়।
ঐতিহাসিক নেতা বনাম মিথ্যাচার
মওলানা ভাসানী ছিলেন বাঙালির রাজনীতি ও চেতনার এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তাঁর চীন-ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে একাত্তরে পাকিস্তানপন্থী এবং স্বাধীনতা বিরোধীরা তাঁকে 'বন্দি' তকমা দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো সঠিক ঐতিহাসিক দলিল ও তথ্য দিয়ে এই মিথ্যাচারের জবাব দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধে মওলানা ভাসানীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও তাঁর বাস্তব অবস্থানকে তুলে ধরা।
'বন্দি' নাকি আশ্রিত বন্ধু? একাত্তরে মওলানার অবস্থান
২৫ মার্চ 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর পর মওলানা ভাসানী জীবন বাঁচাতে আত্মগোপনে যান এবং একপর্যায়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাঁর ভারতে অবস্থান কোনো রাজনৈতিক কারাবন্দীর মতো ছিল না; বরং তা ছিল ভারতের তৎকালীন সরকারের নিরাপত্তা ও আতিথেয়তায়।
দিল্লিতে ঈদ উদযাপন - স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রমাণ
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী দিল্লীতে ঈদ পালন করেন। এই ঘটনাটি তাঁর 'বন্দি' থাকার দাবিকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে।
দিল্লী ঈদগাহ ময়দান: অসুস্থ মওলানা ভাসানী দিল্লী ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। এটি একটি প্রকাশ্য স্থান এবং জনসমাগমপূর্ণ অনুষ্ঠান। কোনো বন্দি নেতাকে এমন জনসমক্ষে আসার সুযোগ দেওয়া হয় না।
শুভেচ্ছা জ্ঞাপন: সেখানে তিনি একটি জমায়েতে হিন্দু মুসলমান সকলকেই ঈদের শুভেচ্ছা জানান। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, ভারতে তাঁর চলাফেরা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল যা একটি স্বাধীন ও আশ্রিত নেতার পক্ষেই সম্ভব।
চিকিৎসা ও সরকারি ব্যবস্থাপনা
ভারত সরকার মওলানা ভাসানীর অসুস্থতা এবং বয়সের কথা বিবেচনা করে তাঁকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসার সুযোগ দিয়েছিল। এই চিকিৎসা সুবিধা প্রদান একজন সম্মানিত অতিথি এবং বন্ধুর প্রতি আচরণ, বন্দীর প্রতি নয়। যদি ভারত সরকার তাঁকে রাজনৈতিক কারণে আটক করত, তবে চিকিৎসা ও সম্মান প্রদর্শন সম্পূর্ণ বিপরীত হতো।
ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা চিঠি - আশ্রয়ের আকুতি ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা
মওলানা ভাসানীর ভারতে থাকার পরিস্থিতি এবং তাঁর মানসিক অবস্থা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা তাঁর একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে। এই চিঠিটি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের দৃঢ়তা এবং ব্যক্তিগত মানবিক কষ্টের এক নজির।

চিঠির মূল বক্তব্য
ইন্দিরা গান্ধীকে মাওলানা ভাসানী ভারতে আশ্রয়ের জন্য চিঠিও দিয়েছিলেন। চিঠিটির বক্তব্য নিম্নরূপ:
“আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং ভারতের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের কনফেডারেশন গঠন করার লক্ষ্যে আমি আমার সংগ্রাম অক্ষুন্ন রাখবো।
এই বুড়ো বয়সে স্ত্রী ও নাতনীদের নিয়ে আসামের ধুবড়ী মহকুমার যে কোন স্থানে বাস করার জন্য যদি আপনি আমাকে পাঁচ একর জমি সহ একটি টিনের ঘর এর ব্যবস্থা করে দেন তাহলে এই বদন্যতার জন্য আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকবো। আসামের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে আমি কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করবো না। আপনার এবং আসাম সরকারের নিকট আমি এই প্রতিজ্ঞা করছি। ছয়মাস যাবত আমার থাকা খাওয়ার পরার জন্য আপনার উপর নির্ভরশীলতার দরুন অত্যন্ত লজ্জাবোধ করছি।
যদি ধুবড়ী থাকতে আমাকে অনুমতি দেয়া হয় তাহলে সরকারি তহবিল হতে আমার জন্য অর্থ খরচের দরকার হবে না। যেই আমাকে প্র-চাইনীজ বলে আপনার কাছে চিহ্নিত করতে অপচেষ্টা করুন ইনশাআল্লাহ আমি ভারত ও আপনার অবাধ্য হবো না।
সর্বাধিক সম্মানসহকারে,
আপনার বিশ্বস্ত
উ স্বাক্ষরঃ-
(মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী)
মওলানা ভাসানী তাঁর চিঠিতে দুটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেন তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং তাঁর ব্যক্তিগত মানবিক আকুতি।মওলানা ভাসানী কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন না, তিনি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। মওলানা ভাসানী ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল একজন নেতা। তাঁর চিঠি তাঁর মানবিক কষ্টের দিকটি তুলে ধরে।
'প্র-চাইনীজ' অপবাদ ও বিশ্বস্ততার প্রতিজ্ঞা
মওলানা ভাসানী তাঁর বামপন্থী রাজনীতির কারণে অনেকেই তাঁকে 'চীন-পন্থী' (Pro-Chinese) হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত সরকারের কাছে ভুল বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। তিনি এই গুজব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং ইন্দিরা গান্ধীকে সরাসরি আশ্বস্ত করেন। এই চিঠি প্রমাণ করে, তিনি কেবল বন্দি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন সজাগ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি গুজব সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং তাঁর বিশ্বস্ততা প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্ব ও ভূমিকা
মওলানা ভাসানীর মতো নেতার উপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধকে কেবল আওয়ামী লীগের একক সংগ্রাম হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় জনযুদ্ধ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি দিতে সাহায্য করেছিল।
সর্বদলীয় নেতৃত্ব - উপদেষ্টা কমিটির প্রধান
মওলানা ভাসানী ছিলেন মুজিবনগর সরকার গঠিত সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি বা পরামর্শক কমিটির প্রধান। এই কমিটি গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ, ন্যাপ-ভাসানী, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-মোজাফ্ফর) প্রতিনিধিদের নিয়ে।
জাতীয় ঐক্য: তাঁর এই নেতৃত্ব প্রমাণ করে, তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর অবস্থান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। এটি মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক ছিল।
আন্তর্জাতিক সমর্থন: ভাসানীর মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নেতার সমর্থন মুক্তিযোদ্ধাদের নৈতিক বৈধতা দিয়েছিল এবং ভারতের বাইরে বামপন্থী দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন আদায়ে সহায়ক হয়েছিল।
স্বাধীনতার ডাক - 'আসসালামু আলাইকুম'
যদিও অনেকে মনে করেন, মওলানা ভাসানী শুধুমাত্র ন্যাপ-ভাসানীর মতো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন, কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক 'আসসালামু আলাইকুম' ঘোষণা ছিল স্বাধীনতার পথে প্রথম আনুষ্ঠানিক ডাকগুলোর মধ্যে অন্যতম।
১৯৭০ সালের ঘোষণা: ১৯৭০ সালের শেষের দিকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে 'স্বাধীন বাংলাদেশ' হিসেবে ঘোষণা দেন। যদিও সেই সময় এটি অনেকেই চরমপন্থি মনে করেছিলেন, কিন্তু এটি প্রমাণ করে তিনি অন্যদের আগেই স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্য - বিভাজন ও ইতিহাস বিকৃতি
মওলানা ভাসানীকে 'বন্দি' হিসেবে চিত্রিত করার পেছনে প্রধানত দুটি উদ্দেশ্য কাজ করেছে:
ভারত-বিদ্বেষ তৈরি
স্বাধীনতা বিরোধীরা সবসময়ই ভারত-বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছে। 'ভাসানীকে ভারত বন্দি করেছিল' এই গুজব ছড়িয়ে তারা বোঝাতে চেয়েছিল, ভারত বাংলাদেশের বন্ধু নয়, বরং সুবিধাবাদী বা দখলদার শক্তি।
জাতীয় ঐক্যে ফাটল
ভাসানীকে বিতর্কের কেন্দ্রে আনার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সর্বদলীয় চেতনাকে দুর্বল করা এবং স্বাধীনতার প্রধান দুই নেতা বঙ্গবন্ধু ও ভাসানীর ঐতিহাসিক ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা সহজ হয়।
মওলানা ভাসানী ও ইতিহাসের সঠিক পাঠ
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থান নিয়ে ছড়ানো গুজবগুলো ঐতিহাসিক সত্যের সামনে দাঁড়াতে পারে না। তাঁর ভারতে অবস্থান ছিল অসুস্থতা, বার্ধক্য এবং পরিবারের নিরাপত্তার কারণে নেওয়া একটি মানবিক সিদ্ধান্ত, যা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল না।
ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা তাঁর চিঠি তাঁর আত্মমর্যাদা, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি তাঁর গভীর আবেগ এবং ভারতের কাছে তাঁর বিশ্বস্ততার অঙ্গীকারের দলিল। এটি কোনো বন্দীর চিঠি হতে পারে না। মওলানা ভাসানীর মতো নেতাকে কেবল গুজব বা মিথ্যাচারের জালে আবদ্ধ করে রাখা উচিত নয়। তাঁর সংগ্রামী জীবন, তাঁর কৃষক দরদী রাজনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পূর্ণ শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতির সঙ্গে পাঠ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
মওলানা ভাসানী ছিলেন সেই দূরদর্শী নেতা, যিনি স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পথে জাতিকে একাত্ম করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার সঠিক মূল্যায়ন এবং মিথ্যাচার নিরসন - উভয়ই ইতিহাসের প্রতি আমাদের কর্তব্য।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















