মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মওলানা ভাসানী কি ভারতে বন্দি ছিলেন?
স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ডামাডোলে একাত্তরে মওলানা ভাসানীর অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে একশ্রেণির সংকীর্ণ রাজনৈতিক গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসিত অপপ্রচার ও মিথ্যাচার ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বহুল প্রচারিত এবং চটকদার অপপ্রচারটি হলো: “১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় মওলানা ভাসানী ভারত সরকারের দ্বারা গৃহবন্দী বা রাজনৈতিক কারাবন্দী ছিলেন এবং ভারতের পরামর্শে তাঁর হাত-পা বাঁধা ছিল।” সত্যিই কি একাত্তরে মওলানা ভাসানী ভারত সরকারের বন্দী ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত অতিথি, ভারত সরকারের আশ্রিত কূটনৈতিক বন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের অন্যতম কান্ডারি? ভারতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা মওলানা ভাসানীর নিজস্ব চিঠি, তৎকালীন ভারত সরকারের আতিথেয়তা, চিকিৎসাসেবা এবং দিল্লির ঈদগাহে তাঁর ঈদ উদযাপনের নথিবদ্ধ প্রমাণ কী বলে?

TruthBangla

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে যে কজন কালজয়ী পুরুষ গণমানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে প্রবাদপ্রতীম পুরুষ হলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ, জাঁতাকল ও শোষণের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ২৪ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষকে সংগঠিত করতে তাঁর ভূমিকা ছিল তুলনাহীন। ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে যখন পুরো বাঙালি জাতি জীবনপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখনো এই বয়োবৃদ্ধ নেতা ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধিকার ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণমানুষের ঐক্যের অন্যতম মূল স্তম্ভ।
তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ডামাডোলে একাত্তরে মওলানা ভাসানীর অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে একশ্রেণির সংকীর্ণ রাজনৈতিক গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসিত অপপ্রচার ও মিথ্যাচার ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বহুল প্রচারিত এবং চটকদার অপপ্রচারটি হলো:
“১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় মওলানা ভাসানী ভারত সরকারের দ্বারা গৃহবন্দী বা রাজনৈতিক কারাবন্দী ছিলেন এবং ভারতের পরামর্শে তাঁর হাত-পা বাঁধা ছিল।”
সত্যিই কি একাত্তরে মওলানা ভাসানী ভারত সরকারের বন্দী ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত অতিথি, ভারত সরকারের আশ্রিত কূটনৈতিক বন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের অন্যতম কান্ডারি? ভারতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা মওলানা ভাসানীর নিজস্ব চিঠি, তৎকালীন ভারত সরকারের আতিথেয়তা, চিকিৎসাসেবা এবং দিল্লির ঈদগাহে তাঁর ঈদ উদযাপনের নথিবদ্ধ প্রমাণ কী বলে? এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়; বরং ঐতিহাসিক নথিপত্র, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের আলোকে এই অপপ্রচারের মূল উৎপাটিত করব।
মওলানা ভাসানী: কৃষক আন্দোলন থেকে স্বাধিকারের মহানায়ক
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি আন্দোলন, একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহাপুরুষ সারা জীবন কাটিয়েছেন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। আসামের লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৯ সালে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' গঠন সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতাদের অগ্রভাগে।
১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক বার্তা: “আসসালামু আলাইকুম!” অর্থাৎ, তোমরা যদি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার না দাও, তবে আমাদের পথ আলাদা হয়ে যাবে এবং আমরা চিরতরে বিদায় নেব।
১৯৭০ সালের নভেম্বরের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্নিঝড়ের পর যখন পাকি সরকার পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করে, তখন পল্টন ময়দানে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ডাক দেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপক্ষে জনমত গঠন করতে থাকেন। ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি তিনি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন।

'বন্দি' নাকি আশ্রিত বন্ধু? একাত্তরে মওলানা ভাসানীর অবস্থান
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ঢাকায় নিরীহ বাঙালিদের ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক নারকীয় গণহত্যা শুরু করে, তখন মওলানা ভাসানী ছিলেন টাঙ্গাইলে। তাঁর বয়স তখন নব্বইয়ের ঘরে। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা এবং জীবন সংশয় থাকা সত্ত্বেও তিনি পাক বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে যান।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা খুব ভালো করেই জানত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং চীনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মওলানা ভাসানীর প্রভাব কতটা বিশাল। তাই পাক বাহিনী তাঁর ওপর কড়া নজরদারি রাখার এবং তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্য ও অনুসারীদের পরামর্শে এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি এপ্রিলের প্রথমার্ধে ভারতের আসাম সীমান্তে প্রবেশ করেন এবং আশ্রয়ের আবেদন জানান।
অপপ্রচারের উৎস ও উদ্দেশ্য
স্বাধীনতাবিরোধী ও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল পরবর্তীতে প্রচার করে যে, ভারতে প্রবেশ করার পর ভারত সরকার নাকি ভাসানীকে একপ্রকার বন্দী করে রেখেছিল এবং তাঁকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে দেয়নি। এই অপপ্রচারের প্রধান দুটি উদ্দেশ্য ছিল:
ভারত-বিদ্বেষ উসকে দেওয়া: এটি বোঝানো যে ভারত স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো প্রকৃত বন্ধু ছিল না; বরং তারা বাংলাদেশের বর্ষীয়ান নেতাদের বন্দী করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের বহুত্ববাদী চেতনা বিনষ্ট করা: মুক্তিযুদ্ধকে কেবল এক দলের একক সংগ্রাম হিসেবে চিত্রায়িত করে ভাসানী ও অন্যান্য বামপন্থী নেতাদের অবদান ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা।
দিল্লির ঈদগাহে ঈদ উদযাপিত ও স্বাভাবিক চলাফেরা
যদি মওলানা ভাসানী ভারতে একজন বন্দী বা কারারুদ্ধ নেতা হচ্ছিলেন, তবে কোনো বন্দী ব্যক্তিকে কি কোনো দেশের সরকার রাজকীয় আতিথেয়তা, চিকিৎসা এবং প্রকাশ্যে হাজার হাজার মানুষের সামনে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেয়? ইতিহাসের নথিপত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে।
দিল্লির ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহে খোলা মাঠে ঈদের নামাজ: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ১৯৭১ সালে ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী অত্যন্ত মর্যাদার সাথে ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন। তিনি তখন দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (AIIMS)-এ চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঈদের দিন তিনি চিকিৎসকদের অনুমতি নিয়ে দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদ ও ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করতে যান।
জনসমক্ষে উপস্থিতি ও বার্তা: হাজার হাজার হিন্দু-মুসলিম জনতা ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন।
ঈদের শুভেচ্ছা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক: তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভারতের জনগণ ও বিশ্ববাসীর কাছে সমর্থন চান এবং উপস্থিত সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
একজন রাজনৈতিক বন্দীকে কখনো খোলা ময়দানে সাংবাদিক ও সাধারণ জনতার মুখোমুখি হতে দেওয়া হয় না। ভারত সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং সম্মান প্রদান করেছিল বলেই এটি সম্ভব হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা ভাসানীর ঐতিহাসিক চিঠি
মওলানা ভাসানীর ভারত অবস্থানকাল এবং তাঁর মানসিক প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে নিখুঁত ও প্রামাণ্যভাবে ফুটে ওঠে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে লেখা তাঁর ঐতিহাসিক চিঠিতে। চিঠিটি কোনো পরাধীন বন্দীর আকুতি ছিল না; এটি ছিল এক আত্মমর্যাদাবান, জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা, দেশের প্রতি অকৃত্রিম আবেগ এবং ভূ-রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এক সাহসী স্পষ্টীকরণ।

ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া চিঠির অবিকল অংশ
ইন্দিরা গান্ধীকে মাওলানা ভাসানী ভারতে আশ্রয়ের জন্য চিঠিও দিয়েছিলেন। চিঠিটির বক্তব্য নিম্নরূপ:
“আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং ভারতের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের কনফেডারেশন গঠন করার লক্ষ্যে আমি আমার সংগ্রাম অক্ষুন্ন রাখবো।
এই বুড়ো বয়সে স্ত্রী ও নাতনীদের নিয়ে আসামের ধুবড়ী মহকুমার যে কোন স্থানে বাস করার জন্য যদি আপনি আমাকে পাঁচ একর জমি সহ একটি টিনের ঘর এর ব্যবস্থা করে দেন তাহলে এই বদন্যতার জন্য আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকবো। আসামের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে আমি কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করবো না। আপনার এবং আসাম সরকারের নিকট আমি এই প্রতিজ্ঞা করছি। ছয়মাস যাবত আমার থাকা খাওয়ার পরার জন্য আপনার উপর নির্ভরশীলতার দরুন অত্যন্ত লজ্জাবোধ করছি।
যদি ধুবড়ী থাকতে আমাকে অনুমতি দেয়া হয় তাহলে সরকারি তহবিল হতে আমার জন্য অর্থ খরচের দরকার হবে না। যেই আমাকে প্র-চাইনীজ বলে আপনার কাছে চিহ্নিত করতে অপচেষ্টা করুন ইনশাআল্লাহ আমি ভারত ও আপনার অবাধ্য হবো না।
সর্বাধিক সম্মানসহকারে,
আপনার বিশ্বস্ত
উ স্বাক্ষরঃ-
(মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী)
মওলানা ভাসানী তাঁর চিঠিতে দুটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেন তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং তাঁর ব্যক্তিগত মানবিক আকুতি।মওলানা ভাসানী কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন না, তিনি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। মওলানা ভাসানী ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল একজন নেতা। তাঁর চিঠি তাঁর মানবিক কষ্টের দিকটি তুলে ধরে।
'প্র-চাইনীজ' বা 'চীন-পন্থী' অপবাদের জবাব
১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল চরম স্নায়ুযুদ্ধে বিভক্ত। চীন তখন সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে সমর্থন দিচ্ছিল। অন্যদিকে ভারত ও সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়ন বাংলাদেশকে সহায়তা করছিল। একশ্রেণির ভারতবিরোধী এবং সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ভারত সরকারের কাছে চক্রান্ত করে রটিয়েছিল যে মওলানা ভাসানী যেহেতু চীনপন্থী রাজনীতি করেন, তাই তিনি ভারতের ওপর হামলা চালানো বা ভারতকে বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র করছেন।
মওলানা ভাসানী ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই কুচক্রী মহলের মুখোশ উন্মোচন করেন এবং জানান যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনে তিনি ভারত সরকারের ওপর কোনো দ্বিমুখী আচরণ করবেন না।
চরম আত্মমর্যাদাবোধ ও লজ্জিত মানসিকতা
মওলানা ভাসানী সারাজীবন প্রথাগত রাজনীতির লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ছিলেন। অন্য কোনো দেশের সরকারের টাকায় থাকা-খাওয়া তাঁর স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সাথে খাপ খাচ্ছিল না। তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন:
"ছয়মাস যাবত আমার থাকা খাওয়ার পরার জন্য আপনার উপর নির্ভরশীলতার দরুন অত্যন্ত লজ্জাবোধ করছি।"
এটি কোনো কয়েদীর কথা হতে পারে না। এটি একজন স্বাধীন আত্মমর্যাদাবান নেতার খেদ, যিনি অন্যের করুণায় বেঁচে থাকতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন আসামে ৫ একর জমিতে নিজস্ব কৃষিকাজ করে জীবনধারণ করতে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার
চিঠির প্রথম বাক্যেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তাঁর জীবনের শেষ বয়সের একমাত্র লক্ষ্য হলো "বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন"। কোনো ভয়ভীতি বা চাপ তাঁকে এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান: সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি মওলানা ভাসানী
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধকে আরও বেগবান করা, বিশ্বদরবারে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা এবং দেশের সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিকে এক মঞ্চে আনার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি’ (All-Party Advisory Committee)। আর সর্বসম্মতিক্রমে এই সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি বা প্রধান নির্বাচিত করা হয় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী-কে।
সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির গঠন ও গুরুত্ব
সভাপতি: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (ন্যাপ-ভাসানী)
সদস্যগণ:
তাজউদ্দীন আহমদ (প্রধানমন্ত্রী, মুজিবনগর সরকার)
শ্রীমনোরঞ্জন ধর (বাংলাদেশ কংগ্রেস)
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ (ন্যাপ-মোজাফফর)
কমরেড মনি সিংহ (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি - সিপিবি)
এই সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালে মওলানা ভাসানী ভারত সরকারের কোনো 'বন্দী' বা নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি ছিলেন না। বরং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নীতি-নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন ও অন্যান্য বামপন্থী বিশ্ব শক্তিগুলোকে পাকিস্তানের কাছ থেকে সরিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে আনার জন্য তাঁর রাজনৈতিক ওজন ও পরামর্শ অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
স্বাধীনতার ডাক: 'আসসালামু আলাইকুম'
যদিও অনেকে মনে করেন, মওলানা ভাসানী শুধুমাত্র ন্যাপ-ভাসানীর মতো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন, কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক 'আসসালামু আলাইকুম' ঘোষণা ছিল স্বাধীনতার পথে প্রথম আনুষ্ঠানিক ডাকগুলোর মধ্যে অন্যতম।
১৯৭০ সালের ঘোষণা: ১৯৭০ সালের শেষের দিকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে 'স্বাধীন বাংলাদেশ' হিসেবে ঘোষণা দেন। যদিও সেই সময় এটি অনেকেই চরমপন্থি মনে করেছিলেন, কিন্তু এটি প্রমাণ করে তিনি অন্যদের আগেই স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
বিশ্বনেতাদের কাছে খোলা চিঠি ও চীনকে বার্তা
একাত্তরের এপ্রিল ও মে মাসে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফাঁকে মওলানা ভাসানী বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্বনেতাদের কাছে একের পর এক খোলা চিঠি ও টেলিগ্রাম পাঠান।
চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং ও চৌ এন লাই-কে চিঠি: চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের কাছে মওলানা ভাসানী একটি ঐতিহাসিক বার্তা পাঠান। তিনি চীনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশে গণহত্যার তাণ্ডব চালাচ্ছে। তাই কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের পক্ষে এই গণঘাতক পাকি সরকারকে সমর্থন দেওয়া চরম অনৈতিক। তাঁর এই চিঠির ফলে চীনের মনোভাব পাকিস্তান প্রশ্নে কিছুটা হলেও নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বার্তা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে তিনি লেখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন পাকি সরকারকে কোনো অস্ত্র সহায়তা না দেয়, কারণ সেই অস্ত্রে নির্বিচারে বাঙালি হত্যা করা হচ্ছে।
একজন 'বন্দী' বা 'হাত-পা বাঁধা' ব্যক্তির পক্ষে এভাবে বিশ্বরাজনীতির শীর্ষ মহলে চিঠি পাঠানো ও প্রভাব ফেলা ইতিহাসের দৃষ্টিতে অসম্ভব।
একনজরে ভাসানীকে নিয়ে সত্য বনাম প্রোপাগান্ডা
নিচে একাত্তরে মওলানা ভাসানীর অবস্থান নিয়ে ছড়ানো গুজব ও বাস্তবতার এক নিরপেক্ষ ও নথিবদ্ধ তুলনামূলক সারণী দেওয়া হলো:
মূল তুলনার ক্ষেত্র | ছড়ানো প্রোপাগান্ডা / গুজব | ঐতিহাসিক নথিবদ্ধ সত্য ও তথ্য |
একাত্তরে ভারতে অবস্থান | ভারত সরকার তাকে কারারুদ্ধ বা বন্দী করে রেখেছিল। | ভারত সরকারের আমন্ত্রিত, আশ্রিত ও সম্মানিত অতিথি হিসেবে অবস্থান। |
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা | তাকে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা মিডিয়ার সাথে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। | সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি হিসেবে দিকনির্দেশনা এবং বিশ্বনেতাদের চিঠি প্রেরণ। |
ঈদ উদযাপন ও চলাচল | সম্পূর্ণ অন্তরীণ ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছিল। | দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা গ্রহণ এবং দিল্লির ঈদগাহ ময়দানে খোলা মাঠে নামাজ ও ভাষণদান। |
ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি | ভারতের দালালি বা চাপের মুখে লেখা আত্মসমর্পণমূলক চিঠি। | চরম আত্মমর্যাদাবান নেতার পরনির্ভরশীলতার লজ্জা ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকারমূলক চিঠি। |
চীন-পন্থী রাজনীতি | চীনপন্থী হওয়ার কারণে ভারতের কাছে তিনি শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন। | প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে স্পষ্টিকরণ দিয়ে ভারতের সাথে পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। |
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা | তিনি মুক্তিযুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। | মুজিবনগর সরকারের সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির প্রধান হিসেবে সর্বজনীন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। |
কেন ভাসানীকে নিয়ে মিথ্যার বেড়াজাল তৈরি করা হয়েছিল?
মওলানা ভাসানীর মতো একজন বিশালমাপের দূরদর্শী নেতাকে স্বাধীনতার পর এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে কেন অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু বানানো হলো? এর পেছনে কাজ করেছে কুৎসিত রাজনৈতিক স্বার্থ:
মুক্তিযুদ্ধের বহুত্ববাদী ইতিহাস মুছে ফেলা: মুক্তিযুদ্ধকে কেবল নির্দিষ্ট কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর কৃতিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ভাসানীর মতো পর্বতসম ব্যক্তিত্বের অবদানকে ছোট করা প্রয়োজন ছিল।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বিষবাষ্প ছড়ানো: পাকিস্তানের দোসরেরা এবং অতি-উগ্র ভারতবিরোধী গোষ্ঠী দেখাতে চেয়েছিল যে ভারত একজন প্রবীণ বাঙালি নেতাকেও ছাড়েনি, তাকে বন্দী করেছিল যাতে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের প্রতি গভীর ঘৃণা তৈরি করা যায়।
তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্তকরণ: তরুণ প্রজন্ম যাতে কৃষক-শ্রমিকের পক্ষের রাজনীতি এবং মজলুমের কণ্ঠস্বর মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, সে উদ্দেশ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছিল।
মওলানা আবদুল হামিদ খানকে মওলানা ভাসানী বলা হয় কেন?
মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল আসামে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। ১৯২০-এর দশকে আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে বাঙালি কৃষক ও অভিবাসীদের ওপর স্থানীয় অসমীয়া জমিদার এবং ব্রিটিশ প্রশাসন এক নির্মম বৈষম্যমূলক আইন চাপিয়ে দিয়েছিল, যার নাম ছিল ‘লাইন প্রথা’ (Line System)।
লাইন প্রথা কী ছিল? লাইন প্রথা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা ‘লাইন’ টেনে দেওয়া হতো, যার বাইরে বাঙালি কৃষকরা জমি কিনতে পারতেন না বা বসবাস করতে পারতেন না। এমনকি প্রতিকূল নদীর চরে বাধ্য হয়ে বসবাসকারী কৃষকদেরও কোনো ভূমিস্বত্ব দেওয়া হতো না।
ভাসান চরের মহাসমাবেশ ও ‘ভাসানী’ উপাধি: ১৯২৮ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ভাসান চরে মওলানা আবদুল হামিদ খান এক ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন। সেখানে হাজার হাজার নিপীড়িত বাঙালি কৃষক সমবেত হন। তাঁর একক নেতৃত্বে এই বৈষম্যমূলক লাইন প্রথার বিরুদ্ধে এক তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে।
ভাসান চরের সেই ঐতিহাসিক সমাবেশের পর থেকেই সাধারণ কৃষক ও মেহনতী মানুষ ভালোবেসে তাঁকে ‘মওলানা ভাসানী’ বা ‘ভাসানী সাহেব’ নামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীতে এই নামটিই বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়।
১৯৪৯: আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল 'বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ'-এর মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মওলানা ভাসানী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র দু'বছরের মাথায়, মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল ও গণবিরোধী আচরণের প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কাজী বশির মিলনায়তন (রোজ গার্ডেন)-এ গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী
সাধারণ সম্পাদক: শামসুল হক
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক: শেখ মুজিবুর রহমান (যিনি তখন কারাবন্দী ছিলেন)
অসাম্প্রদায়িকতার পথে যাত্রা (১৯৫৫): মওলানা ভাসানী খুব ভালো করেই অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য রাজনীতি করে একটি বহু-জাতীয় ও বহু-ধর্মীয় রাষ্ট্রের অধিকার আদায় সম্ভব নয়। তাই তাঁরই প্রত্যক্ষ উদ্যোগে এবং সর্বাত্মক সম্মতিতে ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ রাখা হয়। এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনীতির আনুষ্ঠানিক শুভসূচনা ঘটে।
১৯৫৭-এর কাগমারী সম্মেলন: 'আসসালামু আলাইকুম' ও ন্যাপ (NAP) গঠন
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ কোথায় বোনা হয়েছিল এই প্রশ্নের উত্তরে ঐতিহাসিকরা বারবার ফিরে যান ১৯৫৭ সালের ৭ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সম্মেলনে।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংঘাত: তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রথামাফিক মার্কিন সমর্থিত সামরিক চুক্তি (SEATO ও CENTO)-র পক্ষে অবস্থান নেন। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) সমর্থক।
কাগমারী সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন:
"আপনারা যদি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য বন্ধ না করেন এবং সাম্রাজ্যবাদীদের দালালি ছাড়তে না পারেন, তবে আমরা বাধ্য হয়ে আপনাদের বলব ‘আসসালামু আলাইকুম’ (বিদায়)!"
এই সম্মেলনের পরপরই পররাষ্ট্রনীতি ও আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে গঠন করেন নতুন দল 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' (ন্যাপ), যা পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বামপন্থী-প্রগতিশীল জাতীয় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
‘রুবুবিয়াত’ ও ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’
মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিশ্ব রাজনীতির প্রথাগত কোনো ছকে বাঁধা যায় না। তিনি নিজেকে একাধারে একনিষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ এবং মেহনতী মানুষের সমর্থক মনে করতেন। তাঁর এই অনন্য রাজনৈতিক দর্শনের নাম ছিল ‘রুবুবিয়াত’ বা ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’। রুবুবিয়াত দর্শনের মূল কথা:
রব (রক্ষণাবেক্ষণকারী) তত্ত্ব: পবিত্র কুরআনের প্রথম সুরার ‘রব্বুল আলামীন’ (সকল সৃষ্টির প্রতিপালক) ধারণা থেকে ভাসানী এই তত্ত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বলতেন, আল্লাহ যেমন বর্ণ, ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে বিশ্বের প্রতিটি প্রাণীর খাদ্যের সংস্থান করেন; ঠিক তেমনি রাষ্ট্রকেও তার সকল নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে।
ধনপুঁজি ও শোষণের নিরসন: তিনি বিশ্বাস করতেন অতিরিক্ত অর্থ বা সম্পদ জমা করে রাখা ইসলামের পরিপন্থী। সম্পদ বণ্টন হতে হবে সুষম এবং সাম্যবাদী উপায়ে।
নাস্তিক্যবাদমুক্ত সাম্যবাদ: প্রথাগত মার্ক্সবাদ বা সাম্যবাদে ধর্মকে মূল উপাদান হিসেবে দেখা না হলেও, ভাসানী সমাজতন্ত্রকে ধর্মীয় নৈতিকতা ও সামাজিক সুবিচারের এক উচ্চতর রূপ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
মওলানা ভাসানী ও ইতিহাসের সঠিক পাঠ
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন এমন এক নক্ষত্র, যা রাজনীতির আকাশে নিজস্ব আলোতেই ভাস্বর। তিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি; তিনি রাজনীতি করেছেন গণমানুষের জন্য, কৃষকের জন্য, শোষিত শ্রেণির জন্য। ১৯৭১ সালে নব্বই বছর বয়সে স্বদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তিনি যে কষ্ট সহ্য করেছেন, ভারতে প্রবাস জীবনের যে মানসিক বেদনা বহন করেছেন তা তাঁর দেশপ্রেমেরই এক মহান দলিল।
ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা তাঁর সেই চিঠি প্রমাণ করে, তিনি অন্যের দয়ায় বা অর্থে বেঁচে থাকতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে একজন মুক্ত কৃষক হিসেবে নিজের রক্তঘাম দিয়ে বেঁচে থাকতে।
১৯৭১ সালে মওলানা ভাসানী ভারতে 'বন্দী' ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক মহান কান্ডারি এবং ভারতের শ্রদ্ধেয় অতিথি। মিথ্যা প্রোপাগান্ডা দিয়ে সূর্যের আলোকে যেমন হাত দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না, তেমনি ইতিহাসও কখনো মওলানা ভাসানীর অবদানকে মুছে ফেলতে পারবে না। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তাঁর অসীম ত্যাগ, ঐতিহাসিক 'আসসালামু আলাইকুম' এবং নির্ভীক নেতৃত্বের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে চিরদিন অমর ও অমলিন হয়ে থাকবেন।















