>

>

মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকরা

মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকরা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে রাজাকারদের পরিচয় কেবলই দেশ ও জাতির বিশ্বাসঘাতক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম যখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই দেশদ্রোহী শক্তি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধানতম দোসর হিসেবে কাজ করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

TruthBangla

মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকরা

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের রক্তস্নাত ইতিহাসের একটি চিরন্তন ও অমলিন সত্য কখনো বদলানো সম্ভব নয় ইতিহাসে ঘৃন্য রাজাকার কখনো দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা হতে পারে না। রাজাকারের পরিচয় কোনো সুবিধাবাদী রাজনৈতিক অভিধান দিয়ে কখনো পাল্টে দেওয়া যায় না; তার একমাত্র ঐতিহাসিক সত্য হলো সে দেশ ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী, মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী এবং মুক্তিকামী বাঙালির ওপর চালানো নারকীয় হত্যাযজ্ঞের অংশীদার।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতির রক্তক্ষয়ী স্বাধিকার অর্জনের মহাকাব্য। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোনের অসীম সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম যখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এই দেশদ্রোহী অপশক্তি দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধানতম দোসর হিসেবে কাজ করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চরম নির্যাতন, লুণ্ঠন ও সুপরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছিল।

পরবর্তীকালে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ইতিহাস বিকৃতির এক নতুন ও বিপজ্জনক অপচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি ও তাদের রাজনৈতিক উত্তরসূরীরা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বিতর্কিত নিবন্ধ এবং চতুর প্রচারণার মাধ্যমে রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের কালো অতীতকে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই তরুণ প্রজন্ম তথা সমগ্র জাতিকে স্পষ্ট ভাষায় অনুধাবন করতে হবে যে, স্বাধীনতার আদর্শ কোনো রাজনৈতিক পণ্য নয়। এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট, সুনির্দিষ্ট শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের দলিল এবং বিচারিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ইতিহাসের সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, এই বাংলায় রাজাকারের কোনো ঠাঁই নেই

একাত্তরের স্বাধীনতা, গণহত্যা ও বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক ঘৃণ্য সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ধানমন্ডি সহ সমগ্র বাংলাদেশে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর এক নজিরবিহীন গণহত্যা শুরু করে। ২৫শে মার্চের মধ্যরাতের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর বাঙালি জাতি সর্বাত্মক প্রতিরোধ ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকরা

বাঙালির এই অভূতপূর্ব ঐক্য ও স্বাধীনতার চরম মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ শত্রুরূপে আত্মপ্রকাশ করে দেশীয় কুচক্রী মহল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভূ-প্রকৃতি, পথঘাট ও বাঙালি সমাজের ভাষা-সংস্কৃতির সাথে পরিচিত ছিল না। ফলে মুক্তিকামী সশস্ত্র জনতাকে দমন করতে তারা দেশীয় দোসরদের সমন্বয়ে প্যারা-সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনে তৎপর হয়। এই প্রক্রিয়ায় আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘শান্তি কমিটি’ (Peace Committee), ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’ এবং ‘আলশামস’ বাহিনীর

এই বাহিনীগুলোর প্রধানতম সামাজিক ও রাজনৈতিক উৎস ছিল তৎকালীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহ, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের অঙ্গসংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ (যা স্বাধীনতার পর নাম পরিবর্তন করে 'ইসলামী ছাত্রশিবির' রূপ ধারণ করে)। এরা মৌলিকভাবেই পাকিস্তান বিভক্তির ঘোর বিরোধী ছিল। তারা পাকিস্তান বিভক্তির ঘোর বিরোধী ছিল এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার আন্দোলনকে "ইসলাম-বিরোধী" এবং "ভারতের ষড়যন্ত্র" হিসেবে আখ্যায়িত করত। তাদের আদর্শিক ভিত্তি ছিল 'মুসলিম জাতীয়তাবাদ' যা তারা 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' এর বিপরীতে স্থাপন করেছিল।

গোলাম আযম: যুদ্ধাপরাধের মাস্টারমাইন্ড

গোলাম আযম: যুদ্ধাপরাধের মাস্টারমাইন্ড

গোলাম আযম নামটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঘৃনিত নাম। গোলাম আযম একাত্তরের নিষ্ঠুরতা এবং সুসংগঠিত অপরাধের একটি প্রতীক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি সুসংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশদাতা বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন তিনি। তিনি বারবার প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ মূলত "ভারতের উস্কানিতে বিভ্রান্ত দুষ্কৃতকারী"

১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শাখার আমীর। দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় গোলাম আজমের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রবন্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের "দুষ্কৃতকারী", "ভারতের এজেন্ট" এবং "পাকিস্তানের শত্রু" বলে অভিহিত করতেন। তাঁর গঠিত শান্তি কমিটি ও সশস্ত্র মিলিশিয়া রাজাকার বাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দিতেন মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনচেতা বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের হত্যা ও নির্মুল করতে। জামায়াতের দলীয় প্রধান বা আমির হিসেবে তাদের সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘আল-বদর’ ও ‘আল-শামস’ বাহিনীকেও নিয়ন্ত্রণ ও দিকনির্দেশনা দিতেন গোলাম আজম।

শান্তি কমিটি ও গণহত্যার নীলনকশা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যার পর যখন পুরো ঢাকা শহর লাশের স্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন তার মাত্র কয়েকদিন পর ৬ই এপ্রিল ১৯৭১ গোলাম আযম তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক গভর্নর ও 'ঢাকার কসাই' নামে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাত করে পূর্ণ সমর্থনের ওয়াদা করেন এবং সামরিক জান্তাকে টিকিয়ে রাখতে নিজেদের সর্বাত্মক দলীয় জনবল ব্যবহারের অঙ্গীকার করেন।

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকায় তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৪০ সদস্যের সশস্ত্র ‘শান্তি কমিটি’। গোলাম আযম নিজে এই কমিটির কার্যকরী পর্ষদের শীর্ষ নিয়ন্ত্রক ছিলেন। নাম শান্তি কমিটি হলেও, এদের কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা সম্পন্ন মানুষদের চিহ্নিত করা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য খাদ্য, বাসস্থান ও নারী সরবরাহের বন্দোবস্ত করা।

এই শান্তি কমিটির মাধ্যমেই গ্রামগঞ্জে ঘুরে ঘুরে রাজাকার বাহিনীতে সদস্য নিয়োগ ও গণহত্যার উস্কানি দেওয়া হতো। এই কমিটি গঠনের দিনে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনকে সরাসরি ‘ভারতের ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেন।

কুখ্যাত রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস মিলিশিয়া বাহিনী গঠন: জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের শাখাগুলোকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে রাজাকারের আইনি কাঠামোতে আনা হয়। এই রাজাকার বাহিনীকেই পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার নিয়মিত সামরিক বাহিনীর স্বীকৃতি দেয় এবং পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অনুরূপ অস্ত্র ও বেতনভাতা লাভ করে রাজাকার বাহিনী।

১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনায় প্রথম যে রাজাকার ক্যাম্প উদ্বোধন করা হয়েছিল, তার পেছনেও গোলাম আযম ও তার আস্থাভাজন নেতাদের সরাসরি তদারকি ও নেতৃত্ব ছিল। গোলাম আযম 'আমীর' হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের সাংগঠনিক কাঠামোকে সরাসরি এই সহযোগী বাহিনীগুলোর কার্যক্রমে নিয়োজিত করেন।

উস্কানিমূলক নির্দেশাবলী ও ঐতিহাসিক নথি: একাত্তরের বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের মুখপত্র 'দৈনিক সংগ্রাম' এ প্রকাশিত গোলাম আযমের বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কীভাবে তিনি দেশপ্রেমিক বাঙালিদের ‘ধ্বংস’ করার জন্য নিয়মিত ফতোয়া ও নির্দেশ জারি করতেন।

১৩ ও ১৫ জুলাই, ১৯৭১-এ রংপুর জামাতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ যখন মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার আহবান জানাচ্ছিলেন, তার একদিন পরেই ১৫ জুলাই গোলাম আযম ও মিয়া তোফায়েল গভর্নর হাউসে টিক্কা খানের সাথে দেখা করেন। এরপর গোলাম আজম বিভিন্ন বিবৃতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের গণহত্যা করার উস্কানি দিতে থাকেন।

৩১শে আগস্ট, ১৯৭১ গোলাম আযম এক বিবৃতিতে বলেন, "কোনো ভালো মুসলমান তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলনের সমর্থক হতে পারে না।"

২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ গোলাম আজম ঘোষণা করেন, "জামায়াতের কর্মীরা মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে রাজি নয়।"

জুলাই, ১৯৭১ রংপুর সফরে গিয়ে গোলাম আযম এবং জামায়াত নেতারা মুক্তিকামী জনতাকে "পাকিস্তানের শত্রু" হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নিশ্চিহ্ন করার প্রকাশ্যে উস্কানি দেন।

সুকৌশলে পলায়ন ও আরবে বাংলাদেশ বিরোধী চক্রান্ত: দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই ২২শে নভেম্বর তিনি চতুরতার সাথে দেশত্যাগ করে করাচিতে পালিয়ে যান। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের পর তিনি লাহোরে অবস্থান করে 'পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি' গঠন করেন।

তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও বিভিন্ন মুসলিম দেশ সফর করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানকে পুনরায় পাকিস্তানের অংশ করতে মধ্যপ্রাচ্যে লবিং করেন, প্রচুর ফান্ড সংগ্রহ করেন এবং বাংলাদেশকে সাহায্য না করতে অনুরোধ করতে থাকেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি জেদ্দা, কুয়েত, আবুধাবি, দুবাই, বৈরুত সফর করেন। তিনি চিঠি লিখে ও সরাসরি দেখা করে সৌদির বাদশাহকে সাতবার অনুরোধ করেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে এবং কোনো প্রকার সাহায্য না করতে। তিনি প্রচার করতেন যে, বাংলাদেশে ইসলাম বিপন্ন এবং এটি ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের বিচার: দীর্ঘ ৩৯ বছরের প্রতীক্ষা শেষে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠিত হলে গোলাম আযমকে ২০১২ সালে গ্রেফতার করা হয়। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর। তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনীত অভিযোগগুলোকে প্রধানত ৫টি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে ৬১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করা হয়:

১. ষড়যন্ত্র (৯টি অভিযোগ): সামরিক শাসক টিক্কা খান ও ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠক করে গণহত্যা ও শান্তি কমিটি গঠনের নীল নকশা প্রণয়ন।

২. পরিকল্পনা (৪২টি অভিযোগ): সারা দেশে রাজাকার, আলবদর ও শান্তি কমিটির মাধ্যমে মুক্তিকামী জনতাকে গণহত্যা ও বিতাড়নের পরিকল্পনা।

৩. উস্কানি (২৮টি অভিযোগ): স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ‘ভারতীয় চর’ ও ‘দুষ্কৃতকারী’ আখ্যায়িত করে তাদের ধ্বংস করার আহবান। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে পাক-বাহিনীর সহযোগী সংগঠনগুলোর সদস্যদের দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়ে সাধারণ জনগণের উপর হামলার আহবান জানানো।

৪. সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততা (২৩টি অভিযোগ): পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে রসদ, খাদ্য ও স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ। ‘কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি’র কার্যকরী সদস্য হিসাবে দেশব্যাপী গণহত্যায় সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততা। দেশি-বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী জনগণকে ‘দুষ্কৃতকারী’ বলা এবং তাদের ‘পাকড়াও’ চেষ্টা অব্যাহত রাখার ঘোষণা।

৫. সরাসরি হত্যা ও নির্যাতন (১টি অভিযোগ): এই অভিযোগটি ছিল সবচেয়ে গুরুতর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাব-ইন্সপেক্টর সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেসহ ছয়জনকে রাজাকার বাহিনী আটক করার পর সিরু মিয়ার স্ত্রী গোলাম আযমের কাছে আকুল আবেদন জানান। কিন্তু গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারে মিয়ার কাছে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া ছিল। চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী, ঈদের দিন রাতে পৈরতলা ব্রিজের কাছে ৩৯ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যেখানে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেও ছিলেন।

রায় ও পরিণতি: গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনিত সবকয়টি অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে একাত্তরের সমস্ত অপরাধের প্রধান নির্দেশদাতা ও সমন্বয়ক হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে। রায়ে বলা হয়, তার অপরাধ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য হলেও, তার বয়স (৯০ বছরের বেশি) ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড (যা কার্যত ৯০ বছরের কারাদণ্ড) প্রদান করা হয়।

রায় প্রদানের পর ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট খালাস চেয়ে আপিল করেন গোলাম আযম, এবং সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল চলাকালীন ২০১৪ সালের ২৩শে অক্টোবর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে এই সাজাপ্রাপ্ত ঘৃন্য কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুতে একটি বড় কলঙ্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, তার কৃতকর্মের ক্ষত সর্বদা বয়ে বেড়াবে বাংলাদেশ।

মতিউর রহমান নিজামী:  আল-বদর বাহিনীর বীভৎস ইতিহাস

মতিউর রহমান নিজামী: আল-বদর বাহিনীর বীভৎস ইতিহাস

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে যে দেশদ্রোহী শক্তিগুলো এদেশের মুক্তিকামী মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল আল-বদর বাহিনী। তিনি ছিলেন এই কুখ্যাত ঘাতক মিলিশিয়া বাহিনী 'আলবদর' এর প্রধান সমন্বয়ক। একাত্তরে যে বুদ্ধিজীবী হত্যার ভয়াবহ নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, তার মূল কারিগর ও বাস্তবায়নকারী ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী।

নৃশংসতার প্রতীক আলবদর বাহিনীর গঠন: মতিউর রহমান নিজামী (জনগণের কাছে যিনি 'মইত্যা রাজাকার' নামে পরিচিত) ছিলেন একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির) কেন্দ্রীয় সভাপতি। পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করতে এবং মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি স্বাধীনচেতাদের দমনে ইয়াহিয়া খান ও রাও ফরমান আলীর নির্দেশে তিনি ছাত্রসংঘের ক্যাডারদের নিয়ে গঠন করেন কুখ্যাত ‘আলবদর’ মিলিশিয়া বাহিনী

আলবদর ছিল মূলত একটি বিশেষায়িত 'কিলিং স্কোয়াড'। এদের মূল কাজ ছিল গেরিলা ধাঁচে কাজ করা। এদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে সশস্ত্র যুদ্ধ করা এবং বুদ্ধিজীবী তথা প্রগতিশীল বাঙালিদের হত্যা করা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নির্মূল করা। আল-বদর বাহিনী ছিল রাজাকার বাহিনীর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক ও সুসংগঠিত। এই বাহিনী তৈরি হয়েছিল মূলত মেধাবী ও পাকিস্তানি আদর্শিকভাবে অন্ধ প্রশিক্ষিত ছাত্রদের সমন্বয়ে, যাদেরকে ব্যবহার করা হয়েছিল ভয়ংকর গুপ্তহত্যা মিশনে। তারা সাধারণ চুরি-লুটপাটের চেয়ে রাজনৈতিক হত্যা, গেরিলা রোধ এবং বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার মিশন নিয়ে কাজ করতো।

দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় একাত্তরে নিজামীর বক্তব্য ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি খোলাখুলিভাবে মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর আক্রমণের নির্দেশ ও উসকানি দিতেন। তিনি আলবদরকে ‘আজরাইলের বাহিনী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বিচারে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

গণহত্যা ও নারী নির্যাতন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজামীর নেতৃত্বাধীন আল-বদর বাহিনীর বীভৎস গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ এবং অগি্নসংযোগের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন গণতদন্ত কমিশন ও ঐতিহাসিক নথিপত্রের প্রতিবেদনে। এই বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন করতো, যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাক সেনাদের ক্যাম্পে তুলে দিত এবং স্থানীয় হিন্দু ও জাতীয়তাবাদী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর চরম নির্যাতন করত।

জাতির সূর্যসন্তানদের নির্মূল: বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জঘন্যতম অপরাধ হলো মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আল-বদর বাহিনী কর্তৃক জাতির সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা। পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী এক বিভৎস ও গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তারা আগে থেকেই তালিকা তৈরি করে রেখেছিল স্বাধীন হতে যাওয়া বাংলাদেশের সেরা ব্রেইনগুলোর শিক্ষক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বিচারক ও সংস্কৃতিসেবীদের।

১২ই থেকে ১৪ই ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকার বুক থেকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ড. জহিরুল হক, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, ডা. ফজল রাব্বী, ডা. আলিম চৌধুরী, সেলিনা পারভীন সহ শত শত বুদ্ধিজীবীকে। তাদের মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানোর পর রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। এই পুরো নিধনযজ্ঞের অপারেশনাল ফিল্ড নির্দেশনা দিয়েছিলেন নিজামী নিজে।

১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ মতিউর রহমান নিজামী এক ভাষণে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান সম্পর্কে বলেন,

“যে বিশ্বাসঘাতক বিগত ২০ শে আগস্ট একটি ট্রেনিংদাতা জেট বিমানকে ভারতে হাইজ্যাক করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় তার নাম হচ্ছে মতিউর রহমান। মতিউর রহমান ভারতের এজেন্ট ও দুস্কৃতিকারী, রশীদ মিনহাজ বীর শহীদ। পাকিস্তানি ছাত্রসমাজ তার এ মহান আত্মত্যাগে গর্বিত। ভারতীয় হানাদার ও এজেন্টদের মোকাবেলায় মহান শহীদ মিনহাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অক্ষুন্ন রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।” (দৈনিক সংগ্রাম)

পলায়ন এবং পুনর্বাসন: পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের খবর পাওয়ার পরপরই নিজামী আত্মগোপন করেন। অত্যন্ত চতুরতার সাথে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন, সেখান থেকে ছদ্মবেশে পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবে আত্মগোপন করে থাকেন।

১৯৭১ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছর তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করেন। এসময় তিনি লাহোর ও করাচিতে বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে দালাল আইন বাতিল হলে নিজামী স্বগর্বে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি প্রথমে ইসলামী ছাত্রশিবির এবং পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন।

সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ঘটে ২০০১ সালে, যখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে নিজামী প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্প মন্ত্রী হন। ১৯৭১ সালে যে লাল-সবুজ পতাকাকে নস্যাৎ করতে তিনি অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন, সেই পতাকাবাহী গাড়ি হাঁকিয়ে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সচিবালয়ে অফিস করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ ও বিচার: দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করার পর, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

প্রমাণিত অপরাধ: দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ৮টি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে।

মৃত্যুদণ্ড: পাবনার সাঁথিয়ায় ভয়াবহ গণহত্যা, বাউশগাড়ী ও ডেমরা গ্রামে ৪৫০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা ও ধর্ষণ, এবং ১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ২, ৪ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগে হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

খালাস: বাকি ৮ অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে না পারায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগেও তার এই সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকে। সকল আইনি প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৬ সালের ৯ই মে দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়।

এই দণ্ড কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও যুদ্ধাপরাধীরা আইনের হাত থেকে বাঁচতে পারে না। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতি এবং ন্যায়বিচারের প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের সর্বোচ্চ প্রতিফলন।

কাদের মোল্লা: মিরপুরের কসাই

কাদের মোল্লা: মিরপুরের কসাই

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে আঞ্চলিক পর্যায়ে যেসব দোসর চরম নির্দয়তার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল, তাদের মধ্যে কুখ্যাত ছিল জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের সক্রিয় কর্মী ও আলবদর কমান্ডার ছিলেন। মূলত রাজধানী ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর অঞ্চলে বাঙালি ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো গণপিশাচবৃত্তির কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে 'কসাই কাদের' নামে পরিচিতি লাভ করেন।

মূলত তাঁর জন্মস্থান ফরিদপুরের পাংশা অঞ্চলে 'কসাই কাদের' অপবাদ পেয়েছিলেন। তবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে ঢাকা শহরের মিরপুর এলাকা। ঢাকা শহরের মিরপুর এলাকা তখন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। কাদের মোল্লা এই এলাকাতেই হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের এক বিভীষিকাময় নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন।

সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত অপরাধসমূহ: আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল সমাজের বুদ্ধিজীবী অংশ এবং সাধারণ ছাত্রদের উপর সরাসরি আঘাত হানার ঘটনা। ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যে অপরাধগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছিল, তা যেকোনো সভ্য মানবসমাজকে শিউরে ওঠায়।

পল্লব হত্যাকাণ্ড বেপরোয়া নির্যাতন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কাদের মোল্লার নির্দেশে মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে আটক করা হয়। পল্লবের উপর চালানো নির্যাতন ছিল চরম অমানবিক। তাঁকে মিরপুর ১২ নম্বর থেকে ১ নম্বরের শাহ আলী মাজার পর্যন্ত টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে আবার টানতে টানতে ১২ নম্বরের ঈদগাহ মাঠে নিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

কাদের মোল্লার সহচর আখতার ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল পল্লবকে গুলি করে হত্যা করেন। এই অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

মা-ভাইসহ কবি মেহেরুননিসা হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ কাদের মোল্লা তার সশস্ত্র দলবল নিয়ে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে প্রগতিশীল তরুণ কবি মেহেরুননিসার বাসায় হামলা চালায়। সেখানে তাঁরা মেহেরুননিসা, তাঁর মা এবং দুই ভাইকে নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে হত্যা করেন। এই অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন।

সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যাকাণ্ড: কাদের মোল্লার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন সেইসব ব্যক্তিরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সহায়তা করছিলেন, যার মধ্যে সাংবাদিকরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বাসস্ট্যান্ড থেকে কাদের মোল্লা ও তাঁর সহযোগী আল-বদর-রাজাকাররা আটক করেন। আবু তালেবকে জল্লাদখানা পাম্পহাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের দায়ে কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

কাদের মোল্লার অপরাধের মাত্রা কেবল ব্যক্তিগত হত্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা গণহত্যামূলক এবং যৌন সহিংসতা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

আলুব্দী (আলোকদী) গ্রামের ভয়াবহ গণহত্যা: মিরপুরের পল্লবী থানার আলুব্দী গ্রামটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের একটি ঘাঁটি। গণহত্যার ভয়াবহতার এক চিত্র দেখা যায় মিরপুরের পল্লবী থানার আলুব্দী (আলোকদী) গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল কাদের মোল্লা পাকিস্তানি সেনা, অর্ধশতাধিক অবাঙালি ও রাজাকার নিয়ে আলুব্দী গ্রামে যৌথ হামলা চালান। এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে সেদিন ৩৪৪ জনেরও বেশি নিরপরাধ গ্রামবাসীকে এক স্থানে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞে জড়িত থাকার দায়ে ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।

ঘাটার চর ও ভাওয়াল খানবাড়ি হত্যাকাণ্ড: ঘাটার চর ও ভাওয়াল খানবাড়ির ঘটনা ছিল সাধারণ গ্রামবাসীদের উপর সুপরিকল্পিত হামলা। ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর সকালে কাদের মোল্লা ৬০-৭০ জন রাজাকার নিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘাটার চরে (বর্তমানে শহীদনগর) হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র শতাধিক গ্রামবাসীকে হত্যা করেন। প্রাথমিক ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগে খালাস দিলেও, আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৪:১) মতে কাদের মোল্লাকে এই অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

হযরত আলী লস্করসহ পাঁচজনকে হত্যা ও ধর্ষণ: কাদের মোল্লার অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও ঘৃণ্য ছিল হযরত আলী লস্করের পরিবারের উপর হামলা। এই জঘন্য অপরাধেই তাঁর সর্বোচ্চ চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেছিল।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কাদের মোল্লা, তাঁর সহযোগী অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনারা মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনে হযরত আলী লস্করের বাসায় যায়। কাদের মোল্লার নির্দেশে হযরত আলী লস্করকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছোট ছেলেকে হত্যা করা হয়। এই জঘন্য অপরাধের শেষ এখানেই ছিল না। কাদের মোল্লা এবং তাঁর ১২ সহযোগী মিলে হযরত আলীর ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে।

বিচারিক রূপান্তর ও ঐতিহাসিক রায়: ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে হযরত আলী লস্করের ঘটনা সহ বেশ কয়েকটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করলেও বয়স বিবেচনায় 'যাবজ্জীবন কারাদণ্ড' প্রদান করে। এই রায়ের প্রতিবাদে এবং শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে জাগ্রত তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমে আসে, যার ফলে জন্ম নেয় ঐতিহাসিক 'শাহবাগ আন্দোলন' বা 'গণজাগরণ মঞ্চ'।

জনদাবির মুখে সরকার ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে প্রসিকিউশন পক্ষকে সাজা বৃদ্ধির আপিল করার অধিকার দেয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের সাজা বৃদ্ধির আপিল মঞ্জুর করে হযরত আলী লস্কর পরিবারের হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের দায়ে কাদের মোল্লার সাজা সংশোধন করে 'মৃত্যুদণ্ড' প্রদান করে। ২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কাদের মোল্লার চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হয়।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ: ঢাকার ডেথ স্কোয়াড প্রধান ও বধ্যভূমির কসাই

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ: ঢাকার ডেথ স্কোয়াড প্রধান ও বধ্যভূমির কসাই

একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনীর সবচেয়ে হিংস্র কুখ্যাত মিলিশিয়া বাহিনী ছিল ‘আলবদর বাহিনী’, যার কেন্দ্রীয় কমান্ডে নিজামীর ঠিক পরেই যার অবস্থান ছিল, তিনি হলেন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ। গোলাম আযম যদি যুদ্ধের মস্তিষ্ক হয়ে থাকেন, তবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ছিলেন সেই যুদ্ধের ধারালো অস্ত্র।

ছাত্র নেতা থেকে দেশদ্রোহী: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই ছিলেন কট্টর পাকিস্তানপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের (আইসিএস) কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন।

মুজাহিদের দেশদ্রোহিতার স্বরূপ উন্মোচিত হয় তাঁর নিজ বক্তব্যে। তিনি পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের কাছে গর্বের সঙ্গে আইসিএস সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন:

"পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীরা যারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এবং যারা অনুগত, আন্তরিক ও সৎ পাকিস্তানি, তারা এই দুঃসময়ে সর্বোত্তমভাবে জাতির সেবা করতে প্রস্তুত।"

মুজাহিদের প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই মূলত আইসিএস সদস্যদের নিয়ে কুখ্যাত আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়।

আলবদর বাহিনী ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালে মুজাহিদ ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলার সভাপতি এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সভাপতি হন (নিজামীর পর)। একই সাথে তিনি ছিলেন ঢাকার আলবদর বাহিনীর প্রধান। আলবদর বাহিনীকে বলা হতো পাকিস্তানি বাহিনীর 'ডেথ স্কোয়াড'। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকদের হত্যা করে নবজাতক রাষ্ট্রটিকে মেধা শূন্য করে দেওয়া। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকা তৈরি করে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব দেন মুজাহিদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ড. সেলিনা পারভীন, শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরীসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে চোখ বেঁধে মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজের আলবদর ক্যাম্প ও টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্মম নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করে রায়েরবাজার ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমিতে ফেলে রাখা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের স্পটগুলোতে মুজাহিদ নিজে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনা দিতেন বলে আদালতে নিরপেক্ষ সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত হয়।

এই বুদ্ধিজীবীদের নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডগুলো এতটাই নির্মম ছিল যে, বিভিন্ন বধ্যভূমিতে অনেকের মরদেহ এত বিকৃত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল যে, তাদের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।

মুজাহিদের টর্চার সেল: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজাহিদ ঢাকা শহরের ফকিরাপুল, নয়াপল্টন এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে অবস্থান করতেন এবং আলবদরদের অপারেশনাল কার্যক্রম তদারকি করতেন। তাঁর প্রধান আড্ডা ছিল ফকিরাপুলের গরম পানির গলি ১৮১ নং এর ফিরোজ মিয়ার বাড়ি। তিনি নয়াপল্টনের 'সেখ ভিলা' এবং মোহাম্মদপুরের 'ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে' মূল সামরিক ঘাঁটি ও টর্চার সেল স্থাপন করেছিলেন। এই বাড়িগুলোতে সশস্ত্র ট্রেনিং, সভা, রাজাকার রিক্রুটমেন্ট, অপারেশন পরিচালনা করতেন মুজাহিদ।

মুক্তিকামী বাঙালি, সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের ধরে এনে এই কেন্দ্রগুলোতে নির্মম নির্যাতন করা হতো। নভেম্বরের শেষভাগে মুজাহিদ ঘোষণা করেছিলেন, "ছাত্রসংঘের কর্মীরা পাকিস্তানের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর এবং তারা দুষ্কৃতকারীদের মূল উপড়ে ফেলবে।" ডিসেম্বরের প্রাক্কালে মুজাহিদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ঢাকার শীর্ষ শিক্ষকদের তালিকা আলবদরদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের হত্যা করা হয়। ফকিরাপুল-আরামবাগে শত শত নিরস্ত্র নিরাপরাধ বাঙালি হত্যায় তাঁর তৎপরতা ছিল গোটা ঢাকা জুড়ে।

ক্ষমতা স্বাধ প্রদর্শন ও ইতিহাস বিকৃতি: দেশ স্বাধীনের পর মুজাহিদ কিছুকাল আত্মগোপনে থাকলেও ১৯৭৭ সালের পর পুনর্বাসিত হন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রধান নির্দেশক ও সেক্রেটারি জেনারেল পদে উন্নীত হন। ২০০১ সালে জোট সরকারের টেকনোক্র্যাট 'সমাজকল্যাণ মন্ত্রী' হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তার পুরনো মানবতাবিরোধী অতীতকে অস্বীকার করার চরম ধৃষ্টতা দেখান।

২০০৭ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদ ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেন: "বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই এবং একাত্তরে কোনো যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত হয়নি; ওটা ছিল স্রেফ একটি গৃহযুদ্ধ!" তার এই বয়ান ছিল ৩০ লক্ষ শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনের স্মৃতির ওপর এক চরম অবমাননাকর আঘাত।

ট্রাইব্যুনালের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: ২০১০ সালের ২৯শে জুন তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে আনীত ৭টি সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল ৫টিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে।

অভিযোগ-৬ (মৃত্যুদণ্ড): মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে বসে দখলদার বাহিনীর সাথে বুদ্ধিজীবী নিধন ও সারা দেশে গণহত্যা সংগঠিত করার ষড়যন্ত্রের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

অভিযোগ-৫ (যাবজ্জীবন): নাখালপাড়া ড্রাগ রিসার্চ ল্যাবরেটরি ক্যাম্পে রমিজ উদ্দিন, সুরকার আলতাফ মাহমুদ সহ প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে যাবজ্জীবন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১৫ সালের ১৬ই জুন তার মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় বহাল রাখে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ২২শে নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: ‘দেইল্লা’ রাজাকার থেকে ওয়াজের বক্তা

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: ‘দেইল্লা’ রাজাকার থেকে ওয়াজের বক্তা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পিরোজপুর অঞ্চলে সাঈদী গঠন করেছিলেন কুখ্যাত ‘জহুরুল হক বাহিনী’। এটি ছিল মূলত স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য সমন্বয়ে গঠিত একটি ক্যাডার গ্রুপ, যা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করত। সাঈদী পাকিস্তানি সৈন্যদের পথ দেখিয়ে পিরোজপুর শহর, পাড়েরহাট বন্দর এবং আশেপাশের হিন্দুপ্রধান গ্রামগুলোতে নিয়ে যেতেন। তিনি কেবল তাদের সহযোগীই ছিলেন না, বরং আঞ্চলিক পর্যায়ে গণহত্যা ও নির্যাতনের পরিকল্পনাকারী হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছিলেন।

পিরোজপুরের বিভীষিকা ও অপরাধের বিবরণ: একাত্তরে স্থানীয়দের কাছে সাঈদী পরিচিত ছিলেন 'দেইল্লা' বা 'দেইল্লা রাজাকার' নামে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীদের বয়ান থেকে জানা যায়, তিনি পিরোজপুরের মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় গণহত্যা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

পাড়েরহাট বাজারের মুকুন্দ লাল সাহার দোকানসহ বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর থেকে বাইশ সের স্বর্ণ-রৌপ্য ও অন্যান্য মালামাল লুট করে সাঈদী নিজের চাল-ডালের ব্যবসা গড়ে তোলেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে স্থানীয় হিন্দু পরিবারগুলোকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে রূপান্তরিত করা এবং একাধিক নারীকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নির্যাতন ও ধর্ষণের জন্য তুলে দেওয়ার ভয়াবহ সত্য প্রমাণিত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহিম কুট্টি ও বিশ্ববালীকে হত্যাসহ বহু নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে হত্যায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। ঢাকা ট্রিব্রিউন-এর প্রতিবেদন এ তার বিরুদ্ধে আনীত এসব হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিবরণ উল্লেখ রয়েছে।

আত্মগোপন ও মধ্যপ্রাচ্যে পলায়ন: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে সাঈদী পিরোজপুরের দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করেন। কিছুদিন পর তিনি ছদ্মবেশে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় অবস্থান নেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের দিকে তিনি গোপনে বাংলাদেশ ত্যাগ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান এবং ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি ধর্মীয় কাজের আড়ালে নিজের অতীত পরিচয় গোপন রেখে প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ গড়ে তোলেন।

ধর্মীয় ছদ্মবেশে প্রত্যাবর্তন ও সুরের জাদু: ১৯৭৮-৭৯ সালের দিকে সাঈদী দেশে ফিরে এক নতুন রূপ ধারণ করেন। তিনি চমৎকার আকর্ষক বাচনভঙ্গি, সুর এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে মূলধন করে ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। ওয়াজের মাধ্যমে তিনি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন এবং নিজেকে এক জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা বা ‘আল্লামা’ হিসেবে গড়ে তোলেন। এই ধর্মীয় পরিচিতি ব্যবহার করে তিনি তার একাত্তরের অপরাধমূলক ইতিহাস সম্পূর্ণ চেপে যেতে সক্ষম হন। ফলে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে তার অন্ধ অনুসারী তৈরি হয়, যারা তার একাত্তরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে হয় জানত না, অথবা ধর্মীয় অনুভূতির কারণে তা এড়িয়ে যেত।

রাজনৈতিক উত্থান ও সংসদ সদস্য পদ: ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে দলটির মজলিসে শূরা এবং নির্বাহী পরিষদের সদস্য হন, এমনকি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর পদে দায়িত্ব পালন করেন। ধর্মীয় বক্তা হিসেবে গড়ে ওঠা তার ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ব্যানারে তিনি পিরোজপুর-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। উইকিপিডিয়া-এর তথ্য মতে, চরমপন্থী ও উসকানিমূলক বক্তব্যের জন্য পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও তার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা জারি করেছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার, দণ্ড ও মৃত্যু: ২০১০ সালে সাঈদীকে গ্রেফতার করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। ২০১১ সালে তার বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও ধর্মান্তরিত করার মতো মোট ২০টি অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১৩ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আটটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ইব্রাহিম কুট্টি ও বিশ্ববালী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।

এই রায়ের পরপরই জামায়াত-শিবির সারাদেশে ভয়াবহ তাণ্ডব চালায়; যার ফলে বহু পুলিশ সদস্যসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। পরবর্তীতে সাঈদীর আপিলের প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ প্রদান করে। সাজা ভোগের সময় ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (BSMMU) চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আব্বাস আলী খান: দখলদার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী

আব্বাস আলী খান: দখলদার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী

আব্বাস আলী খান ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের বগুড়া জেলার জয়পুরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হুগলী মাদ্রাসা থেকে ম্যাট্রিক এবং পরবর্তীতে কারমাইকেল কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান-এ যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে দলটি রাজশাহী বিভাগের আমীর নিযুক্ত হন।

১৯৬২ সালে তিনি দিনাজপুর-বগুড়া আসন থেকে পাকিস্তানের ৩য় জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার ডেপুটি আমীর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রকাশ্যে স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক দলিল ও উইকিপিডিয়ায় আব্বাস আলী খানের জীবনী-তে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ জুন তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে জয়পুরহাটে ১৫ সদস্যের একটি রাজাকার কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালের বিভিন্ন গণসমাবেশে বক্তব্যে তিনি রাজাকারদের "বিচ্ছিন্নতাবাদী ও দুষ্কৃতকারীদের" (মুক্তিযোদ্ধা) সমূলে নির্মূল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।

ড. এ এম মালিকের পুতুল মন্ত্রিসভা ও শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ভূমিকা: ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ মুক্তিযোদ্ধা ও যৌথ বাহিনীর জোরালো আক্রমণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করতে এবং পূর্ব পাকিস্তানে একটি "বেসামরিক শাসন" বিদ্যমান দেখানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়। এই উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর সামরিক জান্তার তত্ত্বাবধানে গভর্নর ড. এ এম মালিকের নেতৃত্বে এক পুতুল মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। এই মন্ত্রিসভায় আব্বাস আলী খান শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাকিস্তানি ভাবধারা ও অখণ্ডতার এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর হয়ে কাজ করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ। সংগ্রামের নোটবুক আর্কাইভ-এর নথি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ৪ঠা অক্টোবর তিনি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেন এবং পাকিস্তান কাউন্সিল হলে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন। একই দিনে তিনি ইসলামিক একাডেমী হলে 'শাহীন ফৌজ' আয়োজিত এক সমাবেশে অংশ নিয়ে কর্মীদের "সাচ্চা পাকিস্তানি" হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আদর্শিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

গ্রেফতার, মুক্তি ও ভারতে/পাকিস্তানে পলায়ন: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর দখলদার সরকারের সহযোগী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের গ্রেফতার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ২৪শে ডিসেম্বর সাবেক গভর্নর ড. এ এম মালিক ও মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের সাথে আব্বাস আলী খানকেও গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালের দালাল আইনে মামলা দায়ের ও বিচারকাজ পরিচালনা করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের অপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রক্রিয়া চলাকালে, ১৯৭৩ সালের ৩০শে নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার নির্দিষ্ট কিছু সুনির্দিষ্ট গুরুতর অপরাধে (যেমন হত্যা, rape, অগ্নিসংযোগ) সরাসরি অভিযুক্ত না থাকা বন্দীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। এই আইনি সুযোগে আব্বাস আলী খান কারাগার থেকে মুক্তি পান। জেল থেকে মুক্ত হয়েই তিনি গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন, জামায়াত পুনর্গঠন ও ভারপ্রাপ্ত আমীর: ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৭ সালে আব্বাস আলী খান বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালের মে মাসে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু করলে তিনি দলটির মূল সংগঠক ও প্রথম সিনিয়র নায়েবে আমীর হিসেবে আবির্ভূত হন।

সেই সময় জামায়াতের মূল নেতা গোলাম আযম পাকিস্তানি পাসপোর্টে নাগরিকত্বহীন অবস্থায় বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতা ও কৌশলগত কারণে আব্বাস আলী খান ১৯৭৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর 'ভারপ্রাপ্ত আমীর' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে সরকার গোলাম আযমকে গ্রেফতার করলে তিনি আবারও পরবর্তী ১৬ মাস ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৯ সালের ৩রা অক্টোবর ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু না হলেও একাত্তরের রদবদল, গোপন চক্রান্ত ও দখলদার সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ইতিহাসের পাতায় একজন চিহ্নিত দালাল হিসেবে নথিভুক্ত আছেন।

চৌধুরী মুঈনউদ্দিন: ১৪ই ডিসেম্বরের ‘অপারেশন ইন-চার্জ’

চৌধুরী মুঈনউদ্দিন: ১৪ই ডিসেম্বরের ‘অপারেশন ইন-চার্জ’

চৌধুরী মুঈনউদ্দিন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন 'ইসলামী ছাত্রসংঘ'-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি তৎকালীন বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকার একজন সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সাংবাদিকতার সূত্রে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের বাসভবনের সঠিক অবস্থান, কাজের সময়সূচি এবং সামাজিক গতিবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতেন। এই পেশাগত পরিচয় ও তথ্যকে কাজে লাগিয়ে তিনি রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে বুদ্ধিজীবীদের একটি গোপন ‘হিট লিস্ট’ প্রস্তুত করেন।

আলবদর বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডে তিনি ‘অপারেশন ইন-চার্জ’ (Operation In-Charge) পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর সঙ্গে প্রধান জল্লাদ (Executioner) হিসেবে যুক্ত ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা অবরুদ্ধ হয়ে এলে বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে, ১৪ই ডিসেম্বর রাতে পরিকল্পিতভাবে শহরের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযানে মুঈনউদ্দিন সরাসরি নেতৃত্ব দেন। আলবদর সদস্যরা কাদা মাখা গাড়ি ও ক্যানভাস ঢাকা ট্রাকে করে ঘুরে ঘুরে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজল রাব্বী, ডা. আলিম চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজুল হক খান, সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সহ ১৮ জন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে তাঁদের নিজ নিজ বাসভবন থেকে চোখ বেঁধে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমিতে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।

যুক্তরাজ্যে পলায়ন ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে কৌশলগতভাবে চৌধুরী মুঈনউদ্দিন সীমান্ত অতিক্রম করে নেপালে পালিয়ে যান। সেখান থেকে ১৯৭৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) পৌঁছান এবং রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তিনি নিজের অতীত পরিচয় ও রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পূর্ণ গোপন রেখে স্থানীয় ব্রিটিশ-মুসলিম কমিউনিটিতে নিজস্ব বলয় গড়ে তুলতে শুরু করেন।

লন্ডনে তিনি নিজেকে একজন সমাজসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘মুসলিম এইড’ (Muslim Aid)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যের সংগঠন ‘ইসলামিক ফোরাম ইউরোপ’ (IFE) গঠন, ইস্ট লন্ডন মসজিদের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন এবং ‘মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন’ (MCB) প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের আড়ালে তিনি ব্রিটিশ সমাজে দীর্ঘদিন একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে অবস্থান বজায় রাখেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড (২০১৩): ২০১০ সালে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' (ICT) গঠিত হয়। তদন্ত সংস্থা অনুসন্ধানে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের সরাসরি সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ, নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। বিচারে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

তিনি বিচারে অংশ নিতে বাংলাদেশে ফিরে না আসায় এবং পলাতক থাকায় আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী আসামির অনুপস্থিতিতেই (In Absentia) বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ২০১৩ সালের ৩রা নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ চৌধুরী মুঈনউদ্দিন এবং তাঁর সহযোগী আশরাফুজ্জামান উভয়কে বুদ্ধিজীবীদের সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পরিচালনা ও অংশ নেওয়ার দায়ে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসির আদেশ) প্রদান করে। ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন যে, তিনি ছিলেন আলবদর বাহিনীর সেই ঘাতক দলের প্রধান চালিকাশক্তি যিনি জাতিকে মেধা শূন্য করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন।

ইন্টারপোল রেড নোটিশ, যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান ও সাম্প্রতিক আইনি ঘটনাপ্রবাহ: রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চৌধুরী মুঈনউদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করার উদ্যোগ নেয় এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে। তবে বাংলাদেশ সরকারের হস্তান্তরের (Extradition) অনুরোধ সত্ত্বেও যুক্তরাজ্য সরকার তাঁকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। ব্রিটিশ আইনি কাঠামোর মানবাধিকার বিধিমালা অনুযায়ী, যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেসব দেশে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ না করার নীতি রয়েছে।

২০১৯ সালে ইউকে হোম অফিস (British Home Office) কর্তৃক প্রকাশিত 'Challenging Hateful Extremism' বিষয়ক প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের উল্লেখ করা হলে তিনি ইউকে সরকারের বিরুদ্ধে মানহানি (Libel) ও তথ্য সুরক্ষা আইন (GDPR) লঙ্ঘনের মামলা করেন। নিম্ন আদালত মামলাটি খারিজ করলেও, ২০২৪ সালের জুনে যুক্তরাজ্য সুপ্রিম কোর্ট CaseMine-এর আইনি বিশ্লেষণ এবং Chambers and Partners-এর প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে মামলাটি পুনরায় বিচারিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। LawTeacher.net-এর আইনি পর্যালোচনা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করে যে, বিদেশের আদালতের অনুপস্থিতিতে দেওয়া রায়ের সত্যতা প্রমাণের দায়িত্ব হোম অফিসের ওপর বর্তায়। পরবর্তীতে মামলাটির গতিপ্রবাহে GOV.UK-এর সরকারি বিজ্ঞপ্তি-এর নথিসূত্রে দেখা যায়, ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলাটি আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করে ক্ষতিপূরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুঃখপ্রকাশ প্রদান করে।

আশরাফুজ্জামান খান: রায়েরবাজারের ঘৃন্য জল্লাদ

আশরাফুজ্জামান খান: রায়েরবাজারের ঘৃন্য জল্লাদ

মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান খান (ওরফে নায়েব আলী খান) ১৯৪৮ সালে ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন 'ইসলামী ছাত্রসংঘ'-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের মে মাসে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক অধিনায়ক মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ছাত্রসংঘের কর্মীদের নিয়ে 'আলবদর' বাহিনী গঠিত হলে আশরাফুজ্জামান এতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। বুদ্ধিজীবী নিধন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আলবদর বাহিনীর গাজী সালাউদ্দিন কোম্পানির অধিনায়ক এবং 'চিফ এক্সিকিউটর' বা প্রধান জল্লাদ হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই বাহিনীতে চৌধুরী মুঈনউদ্দিন ছিলেন 'অপারেশন ইন-চার্জ' এবং আশরাফুজ্জামান ছিলেন মাঠ পর্যায়ে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের মূল বাস্তবায়নকারী।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সংগঠিত রূপ ও মাঠপর্যায়ের তাণ্ডব: ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে, যখন পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী আলবদর বাহিনী বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার চূড়ান্ত নীলনকশা সাজায়, তখন আশরাফুজ্জামান খান প্রধান ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কাদা মাখানো মাইক্রোবাস ও সেনা ট্রাকে করে আলবদর ঘাতক দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা, ধানমণ্ডি, নীলক্ষেত ও গোপীবাগসহ ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের অপহরণ করে।

অপহৃতদের নিয়ে যাওয়া হতো মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কলেজে স্থাপিত আলবদর বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্রে, সেখান থেকে চোখ বেঁধে রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি গণকবরে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হতো। আশরাফুজ্জামান নিজেই ট্রিগার চেপে একাধিক বুদ্ধিজীবীকে গুলি করেন। অপহৃতদের তালিকায় ছিলেন ড. মুনীর চৌধুরী, ড. আবুল খায়ের, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, রশীদুল হাসান, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, ডা. মোহাম্মদ মর্তুজা, ড. সিরাজুল হক খান, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ডা. আলিম চৌধুরী এবং সাংবাদিক সেলিনা পারভীন ও এ এন এম গোলাম মোস্তফা।

অপরাধের প্রামাণ্য দলিল-উদ্ধারকৃত ডায়েরি ও চালকের জবানবন্দি: ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর ঢাকায় আশরাফুজ্জামানের বাসা থেকে একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। ওই ডায়েরির দুটি পাতায় তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীর নাম, তাঁদের আবাসিক কোয়ার্টার নম্বর, ফোন নম্বর এবং তাঁদের গাড়ি নম্বর নিজ হাতে লেখা ছিল।

তালিকাভুক্ত এই ২০ জনের অধিকাংশই ১০ থেকে ১৪ই ডিসেম্বরের মধ্যে নিখোঁজ হন এবং পরে রায়েরবাজার ও মিরপুরে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পাওয়া যায়। এছাড়া আলবদর ঘাতকদের ব্যবহৃত গাড়ির চালক মফিজউদ্দিন পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। মফিজউদ্দিন আদালতের বিচারে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দেন যে, আশরাফুজ্জামান খান নিজেই কাদা মাখানো গাড়ি চালিয়ে বুদ্ধিজীবীদের তুলে আনতেন এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিজ হাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ জন শিক্ষককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ও মৃত্যুদণ্ড: ২০১৩ সালের ৩রা নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ (ICT-2) বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনাল আশরাফুজ্জামান খান ও তার সহযোগী চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন ও গণহত্যার মোট ১১টি সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছিলেন, যার সবকটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। অভিযুক্ত দুজনই পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বিচারে আলবদর বাহিনীর প্রধান জল্লাদ হিসেবে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে সরাসরি অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে আশরাফুজ্জামান খানকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক জীবন ও কূটনৈতিক জটিলতা: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পর আশরাফুজ্জামান খান দেশ ছেড়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান এবং দীর্ঘদিন রেডিও পাকিস্তানে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন। নিউ ইয়র্কের কুইন্সে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে তিনি আমেরিকার মুসলিম সংগঠন 'ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা' (ICNA)-এর কুইন্স শাখার শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রত্যর্পণ চিঠি পাঠালেও দ্বিপাক্ষিক অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতার কারণে আজও এই দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীকে বাংলাদেশে এনে ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

এ কে এম ইউসুফ: ঘৃন্য রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা

এ কে এম ইউসুফ: ঘৃন্য রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা

আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ (এ কে এম ইউসুফ) ১৯৫২ সালে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে তিনি দলটির খুলনা বিভাগীয় শাখার আমির হন এবং ১৯৫৮ সালে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি বাকেরগঞ্জ-কাম-খুলনা আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে তাঁকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর যৌথ সম্পাদক ও পরবর্তীতে ডেপুটি আমির হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধকালীন ভূমিকা: ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে তিনি কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় খুলনা জেলা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ৫ মে খুলনার তৎকালীন আনসার ক্যাম্প (বর্তমান আনসার ও ভিডিপি আঞ্চলিক সদর দফতর) থেকে ৯৬ জন জামায়াত কর্মীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সজ্জিত করে তিনি প্রথম সশস্ত্র 'রাজাকার' বাহিনী গঠন করেন।

ফারসি শব্দ 'রাজাকার'-এর আক্ষরিক অর্থ 'স্বেচ্ছাসেবী'। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকে পাকিস্তান সামরিক সরকার বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে রাজাকার বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি আধাসামরিক বাহিনীর মর্যাদা দেয় এবং তাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়মিত সহকারী শক্তি হিসেবে অর্থায়ন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। ১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ড. এ এম মালিকের নেতৃত্বাধীন বিতর্কিত পুতুল সরকারের রাজস্ব এবং পরে ভারপ্রাপ্ত পূর্ত, বিদ্যুৎ ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য উপ-নির্বাচনে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খুলনা-২ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য ঘোষিত হন।

নৃশংসতা ও গণহত্যা: এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে গঠিত রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটি তৎকালীন বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। বাগেরহাটের রাজাপুর গণহত্যা এবং রায়েন্দা বাজারে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে চালানো ধ্বংসযজ্ঞ তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে সংঘটিত হয়েছিল বলে নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

স্বাধীনোত্তর পুনরুত্থান: ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি পুনরায় সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন এবং ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ চাষী কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল এবং ১৯৯২ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন এবং মারা যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দলটির নায়েবে আমির পদে বহাল ছিলেন।

যুদ্ধোত্তর গ্রেপ্তার, বিচার ও অভিযোগ: ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর 'দালাল আইন' (কোল্যাবরেটরস অ্যাক্ট)-এর অধীন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার: ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তাঁর ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শেষ করে ফরমাল চার্জ গঠন করে। ২০১৩ সালের ১২ মে ট্রাইব্যুনাল-১ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে ঢাকার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করে প্রথম আলোর প্রতিবেদন

২০১৩ সালের ১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যা, খুন, লুণ্ঠন, অগ্নিকাণ্ড ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরসহ ১৩টি নির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে। প্রসিকিউশনের আনীত তথ্যানুযায়ী, ১৯৭১ সালে তাঁর নির্দেশে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে প্রায় ৭০০ মানুষকে হত্যা, ৩০০ ঘরবাড়ি ও ৪০০ দোকানে অগ্নিসংযোগ এবং আনুমানিক ২০০ হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। বিচারিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত বিবরণ পাওয়া যাবে bdnews24.com-এর সংবাদে

কারাগারে অসুস্থতা ও মৃত্যু: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ ধাপে থাকা অবস্থায়, ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দী অবস্থায় কাশিমপুর কারাগারে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাঁকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই মৃত্যু হলে বাংলাদেশ আইন ও ট্রাইব্যুনালের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রমটি স্থগিত ও অবসান (Abated) ঘোষণা করা হয়, ফলে এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হতে পারেনি।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী: কুখ্যাত আল-শামস বাহিনীর জল্লাদ

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী: কুখ্যাত আল-শামস বাহিনীর জল্লাদ

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী) ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর পিতা এ কে এম ফজলুল কাদের চৌধুরী (ফকা চৌধুরী) ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার ও কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পুরো পরিবার পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেয় এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলন নস্যাৎ করতে আল-শামস ও রাজাকার বাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়।

গুডস হিলের নির্যাতন সেল ও আল-শামস বাহিনীর জল্লাদ ভূমিকা: ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জে অবস্থিত চৌধুরী পরিবারের পারিবারিক বাসভবন 'গুডস হিল' (Goods Hill)-কে একটি ভয়াবহ নির্যাতন কেন্দ্র ও টর্চার সেলে পরিণত করা হয়। চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ধরে এনে এই গুডস হিলে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে, সাকা চৌধুরী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আল-শামস, আল-বদর ও রাজাকারদের নিয়ে সেখানে আটককৃতদের ওপর অত্যাচার চালাতেন এবং পরবর্তীতে অনেককে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিতেন।

আধা-সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব: বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকায় আল-শামস বাহিনী গঠন, তাদের অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক নির্দেশনা প্রদান করার পেছনে সাকা চৌধুরীর প্রত্যক্ষ ও একক নেতৃত্ব ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। সাকা চৌধুরী তার আল-শামস বাহিনী নিয়ে রাউজানে জিপ গাড়িতে নিয়মিত টহল দিতেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয়তাবাদীদের ধরে নিয়ে আসতেন এবং মেয়েদের পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিতেন।

গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু নিধন: ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, প্রখ্যাত সমাজসেবক ও দানবীর নতুন চন্দ্র সিংহকে সাকা চৌধুরী নিজস্ব উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। সংগ্রামের নোটবুক আর্কাইভ-এ সংরক্ষিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী, এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগটি প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।

উনসত্তরপাড়া ও রাউজানে গণহত্যা: রাউজানের উনসত্তরপাড়া, পাহাড়তলী এবং মহামুনি মন্দির এলাকায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের ওপর পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয়। সাকা চৌধুরীর নির্দেশে ও উপস্থিতিতে একই দিনে উনসত্তরপাড়ায় ৭০ জনেরও বেশি নিরপরাধ মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

স্বাধীনোত্তর রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের পর দেশ ছেড়ে পালালেও পরবর্তীতে দেশে ফিরে আসেন। তিনি বিভিন্ন মেয়াদে (১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮) চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসন থেকে মোট ৭ বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

উইকিপিডিয়ার তথ্যকোষ-এর তথ্য অনুযায়ী, এইচ এম এরশাদের শাসনকালে তিনি স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নীতি-নির্ধারণী স্থায়ী কমিটির সদস্য হন এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার পদে আসীন ছিলেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রক্রিয়া: ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করে বিচারকাজ শুরু করে।

সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্মান্তরিত করতে বাধ্য করা ও লুটপাটসহ মোট ২৩টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ৪টি অভিযোগে (গণহত্যা ও সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের দায়ে) মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।

আপিল, রায় বহাল ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: ট্রাইব্যুনালের রায় চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করা হলে ২০১৫ সালের ২৯ জুলাই সর্বোচ্চ আদালত তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিবেদন থেকে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর তাঁর রিভিউ আবেদনও সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক খারিজ হয়ে যায়।

২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর মধ্যরাতে (রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে) পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। একই রাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসিও একই কারাগারে কার্যকর করা হয়েছিল।

ঘসিয়াতুল হক মজনু: ছদ্মবেশে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত আলবদর

ঘসিয়াতুল হক মজনু নামটি অনেকের কাছে অপরিচিত মনে হতে পারে, কিন্তু একাত্তরে আলবদর বাহিনীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থেকে যেসব অপরাধী নিজেদের আড়াল করতে পেরেছিল, তাদের মধ্যে ঘসিয়াতুল হক মজনু অন্যতম।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে সহায়তা প্রদান এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের দমন করতে তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘ-এর ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত হয় আধা-সামরিক উগ্রবাদী সংগঠন আলবদর। ঘসিয়াতুল হক মজনু ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘ-এর একজন সক্রিয় সদস্য, যিনি পরবর্তীতে আলবদর বাহিনী-তে যোগ দিয়ে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের চলাচলের গোপন তথ্য সংগ্রহ করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেওয়া ছিল তাঁর প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় রাজাকার ক্যাম্পগুলোর সমন্বয় ও তদারকি করতেন এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর নিপীড়ন ও নিধন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতেন।

পাকিস্তানে আত্মগোপন ও জিয়া-এরশাদ আমলে প্রত্যাবর্তন: ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিজয়ের পর জনরোষ এবং আইনি বিচার এড়াতে ঘসিয়াতুল হক মজনু আত্মগোপন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে যান এবং পরবর্তী সুবিধাজনক সময়ে পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করে সেখান থেকে পাকিস্তানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন শাসক জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে এইচ এম এরশাদের শাসনকালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পুনরায় চালু হলে এবং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের ছায়ায় যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের পথ উন্মুক্ত হয়। এই রাজনৈতিক সুবিধার সুযোগ নিয়ে মজনু সুকৌশলে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

জামায়াতে অবস্থান, ছদ্মবেশ ও সুসংগঠিত পুনর্বাসন: দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ঘসিয়াতুল হক মজনু প্রকাশ্যে নিজের একাত্তরের পরিচয় গোপন রাখতে দূরদর্শী কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি সরাসরি দৃশ্যমান রাজনীতির সামনে না এসে ব্যবসায়ী ও সমাজসেবকের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। অর্জিত অর্থ ও সামাজিক প্রভাবকে ঢাল বানিয়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন গোপন শাখা ও অঙ্গসংগঠনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ চালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের দায় থেকে বাঁচতে রাজনীতি, বাণিজ্য ও সমাজসেবাকে তিনি সুরক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করেন। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ফলে মজনুর মতো শত শত মধ্যম ও নিম্ন সারির আলবদর-রাজাকার স্বাধীন বাংলাদেশে নিজেদের অর্থ, রাজনৈতিক পদবী ও সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।

ফজলুল কাদের চৌধুরী: চট্টগ্রাম শান্তি কমিটির কুখ্যাত ত্রাস

ফজলুল কাদের চৌধুরী: চট্টগ্রাম শান্তি কমিটির কুখ্যাত ত্রাস

ফজলুল কাদের চৌধুরী (যিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘ফকা চৌধুরী’ নামে অধিক পরিচিত) ছিলেন পাকিস্তানপন্থী একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তি। ফজলুল কাদের মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় কৃষি, পূর্ত, শিক্ষা, তথ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে একাধিকবার পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও সামলান।

তিনি কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রথাবিরোধী ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঘোর বিরোধিতা করেন। পারিবারিক সূত্রে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পিতা, যার সাজা ও ফাঁসির দণ্ড সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছিল The Guardian

১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম শান্তি কমিটি গঠন ও পরিচালনা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার পর ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রকাশ্যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেন এবং চট্টগ্রাম শহরে তাদের স্বাগত জানান। পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তার লক্ষ্যে তিনি চট্টগ্রামে ‘নাগরিক শান্তি কমিটি’ গঠন করেন এবং পরবর্তীতে তা জেলা ও থানা পর্যায়ে বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে মূল সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেন। রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীকে সংগঠিত করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুক্তিকামী বাঙালির ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন তিনি, যা নথিবদ্ধ রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ-এ।

'গুডস হিল' টর্চার সেল ও অমানবিক নির্যাতন: চট্টগ্রাম শহরের গনি বেকারি এলাকায় অবস্থিত ফজলুল কাদের চৌধুরীর নিজস্ব বাসভবন ‘গুডস হিল’ হয়ে উঠেছিল আল-শামস, রাজাকার এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আঞ্চলিক সদরদপ্তর ও কুখ্যাত টর্চার সেল। সেখানে ৮ কক্ষবিশিষ্ট একটি গ্যারেজের ৫টি কক্ষকে নির্যাতন কেন্দ্র বানিয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে নৃশংস কর্মকাণ্ড চালানো হতো, যার বিশদ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে প্রিয়.কম-এ।

নির্যাতনের কৌশল ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ: গুডস হিলে বিশেষ পেরেক লাগানো টেবিল রাখা হতো, যেখানে বন্দীদের হাত-পা বেঁধে তক্তা দিয়ে চেপে ধরে শরীরের মাংস ক্ষত-বিক্ষত করা হতো। এছাড়া নখের ভেতর সুই ঢোকানো এবং উরুতে ড্রিল মেশিন চালিয়ে মাংস তুলে নেওয়ার মতো নৃশংসতা পরিচালনা করা হতো।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে সাংবাদিক নিজামউদ্দিন আহমেদকে হাজারী লেন থেকে ধরে এনে গুডস হিলে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সামনে হাজির করা হলে তিনি নিজে তাকে মারধর ও গালিগালাজ করে নির্যাতনকারীদের হাতে তুলে দেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়ন ও গ্যারেজ মেকানিক বিষ্ণু দে-সহ অসংখ্য স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে ধরে এনে সেখানে পাশবিক অত্যাচার চালানো হতো, যা লিপিবদ্ধ রয়েছে সংগ্রামের নোটবুক-এ।

গণহত্যা, লুণ্ঠন ও সাম্প্রদায়িক নির্যাতন: চট্টগ্রামের রাউজান, নন্দন কানন ও আশপাশের অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায় ও স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের সম্পত্তি দখল, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং সপরিবারে গণহত্যার নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। নন্দন কাননের হিন্দু পাড়ায় তার অনুগত আলবদর ও আলশামস বাহিনী ব্যাপক লুটপাট ও গণহত্যা চালায়, যার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের বিবরণ তুলে ধরেছে Banglanews24। ১৯৭১ সালের এই সার্বিক গণহত্যার তথ্য সংগৃহীত রয়েছে Wikipedia-তে।

পলায়ন, গ্রেপ্তার ও দালাল আইনে বিচার: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে ফজলুল কাদের চৌধুরী বিপুল পরিমাণ সোনা, নগদ অর্থ ও পরিবারসহ বঙ্গোপসাগর দিয়ে নৌপথে করাচি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে লতিফপুর উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রসীমা থেকে ভারতীয় নৌবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর হাতে তিনি সপরিবারে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে গঠিত ‘বাংলাদেশ দালাল আইন, ১৯৭২’ (Collaborators Act)-এর অধীনে তার বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত করা হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিচারাধীন অবস্থায় বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৭৩ সালের ১৭ই জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী মারা যান। বিচারকাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেও, পরবর্তীতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে চট্টগ্রামে সংগঠিত গণহত্যার মূল কেন্দ্র হিসেবে গুডস হিল ও চৌধুরী পরিবারের ভূমিকা প্রমাণিত হয়।

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান: ময়মনসিংহে আল-বদর কমান্ডার

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান: ময়মনসিংহে আল-বদর কমান্ডার

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী ছাত্রসংগঠন 'পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ'-এর ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি। ১৯৭১ সালের এপ্রিল-মে মাসে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘের ক্যাডারদের সংগঠিত করে ময়মনসিংহে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী সশস্ত্র আল-বদর বাহিনী গঠন করা হয়। কামরুজ্জামান বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে (বর্তমান ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ) এই বাহিনীর প্রধান সংগঠক ও আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা ও অপারেশন পরিচালনা করেন।

সোহাগপুর গণহত্যা (বিধবা পল্লী) ও টর্চার সেল পরিচালনা: ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই কামরুজ্জামানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় পাকিস্তানি সেনা এবং স্থানীয় আল-বদর বাহিনী শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রাম ঘেরাও করে। সেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১৮৭ জন নিরস্ত্র বাঙালি পুরুষকে নির্মমভাবে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় এবং নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। গ্রামের প্রায় সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নিহত হওয়ায় সোহাগপুর পরবর্তীতে ইতিহাসে "বিধবা পল্লী" নামে পরিচিতি লাভ করে।

টর্চার সেল পরিচালনা ও বুদ্ধিজীবী-ছাত্র হত্যা: ময়মনসিংহ শহরের জেলা পরিষদ ডাকবাংলোকে আল-বদর বাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয় ও নির্যাতন কেন্দ্রে (টর্চার সেল) রূপান্তর করা হয়। কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে ও উপস্থিতিতে সেখান থেকে শত শত মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও স্বাধীনতাকামী বেসামরিক নাগরিকে ধরে এনে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হতো।

১৯৭১ সালের রমজান মাসে কামরুজ্জামানের হুকুমে শেরপুরের বিশিষ্ট ছাত্রনেতা বদিউজ্জামানকে অপহরণের পর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া ময়মনসিংহের সুবর্ণখালী ঘাটে একাধিক নিরীহ বাঙালিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক উত্থান: স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পর তিনি জামায়াতে ইসলামীর নতুন ছাত্রসংগঠন 'ইসলামী ছাত্রশিবির'-এর দুই মেয়াদে কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে দলটির গুরুত্বপূর্ণ পদ সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে আসীন হন।

১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন কামরুজ্জামান। পরবর্তীতে তিনি জামায়াত নিয়ন্ত্রিত 'সাপ্তাহিক সোনার বাংলা' পত্রিকার সম্পাদক এবং 'দৈনিক সংগ্রাম' পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে তাঁদের রাজনৈতিক মতামত প্রচার করেন।

গ্রেপ্তার, বিচারিক প্রক্রিয়া ও ফাঁসি কার্যকর: মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালের ২৯ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মতো ৭টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে আনা হয়।

২০১৩ সালের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কামরুজ্জামানকে ৭টির মধ্যে ৫টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। বিশেষ করে ৩ নম্বর অভিযোগ (সোহাগপুর গণহত্যা) সহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এবং সর্বোচ্চ বিচারিক প্রক্রিয়া 'রিভিউ আবেদন' খারিজের মাধ্যমে সোহাগপুর গণহত্যার দায়ে তাঁর চূড়ান্ত ফাঁসির রায় বহাল রাখা হয়।

সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এবং রাষ্ট্রপতি বরখাস্ত বা মার্জনা না চাওয়ায়, ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

মীর কাসেম আলী: চট্টগ্রামের আল-বদর কমান্ডার

মীর কাসেম আলী: চট্টগ্রামের আল-বদর কমান্ডার

মীর কাসেম আলী ১৯৬৬ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালের মধ্যে সংগঠনটির চট্টগ্রাম শহর শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও আল-বদর বাহিনীর নেতৃত্ব: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে মীর কাসেম আলী তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা স্থগিত রেখে সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী বাহিনী গঠনে অংশ নেন। ২৫ মার্চ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘ চট্টগ্রাম শহর শাখার সভাপতি থাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলে সশস্ত্র আল-বদর বাহিনী গড়ে তোলেন এবং এর আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শুরুতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক হন। তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে আল-বদর বাহিনী চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে মুক্তিকামী বাঙালি, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালায়, যার ফলে তিনি স্থানীয়ভাবে চট্টগ্রামের প্রধান নির্যাতনকারী বা "খানবাহাদুর" হিসেবে পরিচিতি পান।

'ডালিম হোটেল' ও নির্যাতন সেলের নৃসংশতা: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মীর কাসেম আলীর পরিকল্পনা ও নির্দেশে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত 'ডালিম হোটেল' দখল করে সেটিকে আল-বদর বাহিনীর প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। পাশাপাশি চণ্ডীপুর চা বাগান ও ডাওলা হাউসের নির্যাতন কেন্দ্রগুলোও তাঁর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। শহর ও আশপাশের অঞ্চল থেকে স্বাধীনতাকামী মানুষদের ধরে এনে ডালিম হোটেলে আটকে রেখে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে আল-বদর সদস্যরা কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে আসে এবং মীর কাসেমের নির্দেশে তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে জসিমসহ আরও পাঁচজন শহীদের লাশ বস্তাবন্দী করে কর্ণফুলী নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সানাউল্লাহ চৌধুরী ও নাসিরুদ্দিন চৌধুরীসহ বহু মুক্তিকামী মানুষকে এ নির্যাতন সেলে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

স্বাধীনোত্তর পুনরুত্থান ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য: ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মীর কাসেম আলী আত্মগোপনে চলে যান এবং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনীতিতে পুনরার্বিভূত হন। ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম পরিবর্তন করে 'বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৮০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সালে দলের কেন্দ্রীয় শূরার সদস্য হয়ে জামায়াতের প্রধান অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারক ও অর্থদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে গঠিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া তিনি ইবনে সিনা ট্রাস্ট ও ইবনে সিনা হাসপাতালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান (যা দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দিগন্ত টেলিভিশন পরিচালনা করত), সৌদি প্রতিষ্ঠান 'রাবেতা আল-আলম আল ইসলামী'-এর বাংলাদেশ পরিচালক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ট্রাস্টি সহ দেশে-বিদেশে অন্তত ৪০টি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন।

আইনি প্রক্রিয়া ও বিচার ট্রাইব্যুনাল: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের ১৪টি নির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায়ে ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে।

এর মধ্যে কিশোর জসিম হত্যা (১১ নম্বর অভিযোগ) এবং হাজারী লেনের নির্যাতন-হত্যাকাণ্ডের (১২ নম্বর অভিযোগ) দুটি পৃথক অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মীর কাসেম আলী রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ আপিল বিভাগ ১১ নম্বর অভিযোগে কিশোর জসিম হত্যার দায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত নির্দেশ প্রদান করে।

ফাঁসি কার্যকর: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন খারিজ হওয়ার পর মীর কাসেম আলী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি। অবশেষে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ওবায়দুল হক তাহেরী: নেত্রকোনার রাজাকার জল্লাদ

ওবায়দুল হক তাহেরী: নেত্রকোনার রাজাকার জল্লাদ

মো. ওবায়দুল হক (যিনি ওবায়দুল হক তাহের বা আবু তাহের নামে পরিচিত) ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোনা অঞ্চলের অন্যতম প্রধান রাজাকার কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি রাজনৈতিক দল নেজাম-ই-ইসলামীর একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তাঁর পিতা মওলানা মঞ্জুরুল হকের চরম পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করে তিনি স্থানীয় তরুণদের সংগঠিত করেন এবং নেত্রকোনা সদরে পাক সেনাবাহিনীর সহায়ক দল হিসেবে রাজাকার বাহিনী গঠনে মূল সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।

টর্চার সেল ও নির্যাতন কেন্দ্র পরিচালনা: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নেত্রকোনা শহরের 'বলয় বিহারী বিশ্বাস'-এর বাসভবনটি বেআইনিভাবে দখল করে নেয় ওবায়দুল হক তাহের ও তাঁর অনুসারীরা। বাড়িটিকে নেত্রকোনা জেলা রাজাকারের মূল কার্যালয় ও নির্যাতন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। সেখান থেকে ওবায়দুল হক তাহেরের প্রত্যক্ষ আদেশে প্রতিদিন স্থানীয় সাধারণ মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ধরে এনে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো এবং স্বঘোষিত ট্রাইব্যুনাল বসিয়ে চাঁদাবাজি ও হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করা হতো।

সুনির্দিষ্ট নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের বিবরণ: মুক্তিযুদ্ধকালে নেত্রকোনা সদর ও বারহাট্টা থানা এলাকায় প্রায় ৪৫০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক লুণ্ঠন এবং অন্তত ১৫ জন নিরস্ত্র বাঙালিকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় ওবায়দুল হক তাহের ও তাঁর সহযোগী আতাউর রহমান ননীর সরাসরি সম্পৃক্ততা আদালতে প্রমাণিত হয়।

বিরামপুর বাজারের ঘটনা: ১৯৭১ সালে বিরামপুর বাজার থেকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামানকে ধরে এনে দিনভর বর্বর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং তাঁর বাড়িঘরে লুটপাট চালানো হয়।

ঠাকুরাকোনা সেতু গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ১৯ অক্টোবর তাহের ও ননীর নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকাররা বারহাট্টা উপজেলার লাউফা গ্রাম থেকে ১০ জন নিরস্ত্র বাঙালিকে অপহরণ করে ঠাকুরাকোনা ব্রিজে নিয়ে যায়। সেখানে ৭ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করার পর তাঁদের মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর আরেকটি অভিযানে একাধিক নিরীহ বাসিন্দাকে ধরে এনে হত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়।

মামলার বিচার প্রক্রিয়া ও ঐতিহাসিক রায়: ২০১০ সালের আগস্টে নেত্রকোনা আদালতে মুক্তিযোদ্ধা আলী রেজা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করার পর মামলাটি তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর পরোয়ানার ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট নেত্রকোনা জেলা পুলিশ তাহের ও তাঁর সহযোগী ননীকে গ্রেপ্তার করে।

বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ (অন্য দুই বিচারক: বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী) এই রায় ঘোষণা করেন।

International Committee of the Red Cross National Practice Database-এর মামলার নথিতে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, আসামীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মধ্যে ৪টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। ট্রাইব্যুনাল ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে তাঁদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন এবং ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন। এই মামলার আইনি বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত তথ্য প্রথম আলো এবং বাংলা ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনেও প্রকাশিত হয়।

কারাবাস ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু: মৃত্যুদণ্ডাদেশের পর তাহের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন এবং আপিল বিচারাধীন অবস্থায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েদী হিসেবে থাকেন। দীর্ঘ দিন বন্দি থাকার পর ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই তিনি গুরুতর শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ৭০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

রাজাকার তোতা মিয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কুখ্যাত রাজাকার

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন কুমিল্লা জেলার (বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া) বাঞ্ছারামপুর ও পার্শ্ববর্তী থানাগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মী ও শান্তি কমিটির সহায়তায় রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। মো. তোতা মিয়া (রাজাকার তোতা মিয়া নামে পরিচিত) এই অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় প্রভাবশালী প্রতিনিধি হিসেবে রাজাকার বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের পথপ্রদর্শক ও স্থানীয় তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর প্রধান কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতাকামী বাঙালি এবং সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের তালিকা তৈরি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা এবং অপারেশন পরিচালনায় সরাসরি সহায়তা প্রদান করা।

মুক্তিযোদ্ধা ও বেসামরিক জনগণের ওপর নির্যাতন, গণহত্যা ও লুণ্ঠন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তোতা মিয়া এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজাকার সদস্যরা বাঞ্ছারামপুর ও এর আশেপাশের গ্রামগুলোতে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দাতা ও সমর্থক পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের ঘরবাড়ি লুটপাট করা হতো এবং পরবর্তীতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হতো।

নিরীহ গ্রামবাসীদের ধরে এনে রাজাকার ক্যাম্পে বা অস্থায়ী নির্যাতন সেলে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনীকে ডেকে এনে একযোগে একাধিক গ্রামে অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন এবং গণহত্যার মতো নৃশংস মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো। তোতা মিয়ার প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও সহযোগিতায় স্থানীয় শত শত পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ: বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এর তদন্তকারী দল বাঞ্ছারামপুর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, ভুক্তভোগী পরিবার এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। তোতা মিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যা, অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন এবং বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার মতো সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধের আলামত ও নথিপত্র সংগৃহীত হয়। দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া: তদন্তকারী দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তোতা মিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০১৬ সালের ২ মে বাঞ্ছারামপুর থানা পুলিশ নিজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তৎকালীন প্রায় ৭৬ বছর বয়সী তোতা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কঠোর নিরাপত্তায় রাজধানী ঢাকায় ট্রাইব্যুনালে সোপর্দ করা হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয়।

আইনি পরিক্রমা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া: তোতা মিয়ার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ স্থানীয় পর্যায়ে চার দশক ধরে প্রচলিত বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বাঞ্ছারামপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাঁর বিচার শুরুর ঘটনায় দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বঞ্চনার বিপরীতে ন্যায়বিচারের আশা প্রকাশ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও নির্যাতনের সত্য উন্মোচনে ভূমিকা রাখে।

শাহ আজিজুর রহমান: পাকিস্তানের কূটনৈতিক দালাল

শাহ আজিজুর রহমান: পাকিস্তানের কূটনৈতিক দালাল

শাহ আজিজুর রহমান ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৫০-এর দশকে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা শাহ আজিজুর রহমান ১৯৬২ সালে গণপরিষদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করলেও তিনি ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপিত ঐতিহাসিক 'ছয় দফা' কর্মসূচির তীব্র বিরোধিতা করেন এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানের কূটনীতি: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শাহ আজিজুর রহমান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার প্রত্যক্ষ সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানে ড. আবদুল মোতালেব মালিকের (ড. এ এম মালিক) নেতৃত্বে একটি পুতুল সরকার গঠন করা হলে শাহ আজিজুর রহমান সেই মন্ত্রিসভার রাজস্ব ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভাগে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম যখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছিল, তখন ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক দল গঠন করেন, যার নেতা হিসেবে পাঠানো হয় শাহ আজিজুর রহমানকে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত নারকীয় গণহত্যা, নারী নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে "পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়" এবং মুক্তিযুদ্ধকে "ভারতের উসকানিতে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা" হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্ব সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালান। একই সাথে তিনি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানান।

কারাবাস ও সাধারণ ক্ষমা: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাহ আজিজুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সরাসরি সহযোগী বা 'কোলাবোরেটর' হিসেবে কাজ করার অপরাধে অভিযুক্ত হন। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের জারিকৃত 'দালাল আইন, ১৯৭২' (Collaborators Act 1972) এর অধীনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারারুদ্ধ করা হয়।

১৯৭৩ সালের ৩০শে নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধী, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্য সাধারণ দালালদের জন্য "সাধারণ ক্ষমা" ঘোষণা করেন। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা মারপ্যাঁচে শাহ আজিজুর রহমান ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে মুক্তি লাভ করেন এবং আত্মগোপন করেন।

বিএনপিতে যোগদান ও প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভ: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক পটভূমি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সামরিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শাহ আজিজুর রহমান পুনরায় প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেন। প্রথমে তিনি পুনর্গঠিত মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিলে শাহ আজিজুর রহমান তাঁর সাথে হাত মেলান। তিনি ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এ যোগদান করেন এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমান তাকে সংসদ নেতা এবং ১৫ই এপ্রিল ১৯৭৯ তারিখে বাংলাদেশের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পতাকার সক্রিয় বিরোধিতা করা একজন ব্যক্তি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় দেশ ও বিদেশে তা তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন ও মৃত্যু: জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের আমলেও শাহ আজিজুর রহমান ২৪শে মার্চ ১৯৮২ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল ছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করলে শাহ আজিজুর রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে।

পরবর্তী সময়ে তিনি এরশাদ সরকারের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও জাতীয় পার্টি গঠনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা সহযোগিতা প্রদান করেন। তবে জীবনের শেষভাগে তিনি মূলধারার রাজনীতি থেকে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ১৯৮৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ৬৩ বছর বয়সে ঢাকায় শাহ আজিজুর রহমান মৃত্যুবরণ করেন।

খান আবদুস সবুর: খুলনা অঞ্চলের শীর্ষ রাজাকার

খান আবদুস সবুর (সবুর খান নামে পরিচিত) ১৯৩৭ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টিতে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করার পর ১৯৩৮ সালে তিনি বেঙ্গল প্রোভিনশিয়াল মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে দলটির যুগ্ম সম্পাদক হন।

১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় খুলনায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিরোধিতায় মাঠে নামেন এবং পিকেটারদের ওপর ভাড়াটে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

আইয়ুব খানের রাজত্বকাল, মন্ত্রিত্ব ও স্থানীয় উন্নয়ন: পাকিস্তানের রাজনীতিতে ১৯৬০-এর দশকে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের অন্যতম অনুগত রাজনীতিবিদ হিসেবে খান আবদুস সবুর আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী হন। খুলনা অঞ্চলে তাঁর অনুগত একটি সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যা তিনি পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে ব্যবহার করেন।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ৬ দফার তীব্র বিরোধিতা: ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচির তীব্র বিরোধিতা করেন সবুর খান। তিনি ৬ দফাকে অখণ্ড পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে ফেলার চক্রান্ত হিসেবে আখ্যা দেন। ১৯৬৮-৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি আইয়ুব সরকারের নিপীড়নমূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপকে সমর্থন জানান। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি কাইয়ুম মুসলিম লীগের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

রাজাকার, শান্তি কমিটি ও পাকিস্তান সেনা সহযোগিতা: ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নেই সবুর খান প্রকাশ্যে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গণহত্যার পক্ষ নেন। তিনি বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে পাকিস্তানপন্থী শান্তি কমিটির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারক ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেন। মে মাসে খুলনায় আয়োজিত শান্তি কমিটির বিভিন্ন জনসভায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দমন করতে এবং পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের সহায়তা পাঠাতে স্থানীয়দের উসকানি দেন।

খুলনায় গঠিত প্রথম রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা ও তাদের প্রশাসনিক সুরক্ষায় তাঁর প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি রেডিও পাকিস্তান থেকে মুক্তিকামী বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের "দুষ্কৃতকারী" আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান রক্ষার আহ্বানে অপপ্রচার চালিয়ে যান। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় তাঁর নাম অন্যতম শীর্ষ সহযোগী হিসেবে স্থান পায়।

দালাল আইনে গ্রেপ্তার ও রাজনীতিতে পুনর্বাসন: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলে জনতার ক্ষোভ থেকে আত্মরক্ষায় সবুর খান থানায় গিয়ে ধরা দেন। পরে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের জারিকৃত 'দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ, ১৯৭২'-এর অধীনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

১৯৭৩ সালের শেষের দিকে সাধারণ ক্ষমার আংশিক সুযোগে তিনি কারামুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে তিনি 'বাংলাদেশ মুসলিম লীগ' পুনরুজ্জীবিত করেন। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি খুলনা অঞ্চল থেকে একসঙ্গে তিনটি আসনে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন, যা স্বাধীন বাংলাদেশে চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বড় উদাহরণ।

মৃত্যু, ট্রাস্ট গঠন ও 'খান এ সবুর রোড': ১৯৮২ সালের ২৫ জানুয়ারি ৭৩ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন সবুর খান। তিনি আজীবন অবিবাহিত ছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্বে নিজের অধিকাংশ সম্পত্তি 'খান এ সবুর ট্রাস্ট'-এর নামে দান করে যান।

স্বাধীনতার পর খুলনার ঐতিহাসিক যশোর রোডের একটি অংশের নাম পরিবর্তন করে তাঁর নামে 'খান এ সবুর রোড' রাখা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে শাহরিয়ার কবির ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের এক রিটের প্রেক্ষিত নিয়ে ঢাকা ট্রিব্রিউন-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন যে, কোনো চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী বা স্বাধীনতাবিরোধীর নামে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো বা সড়কের নামকরণ রাখা যাবে না। আদালত খুলনা সিটি কর্পোরেশনকে 'খান এ সবুর রোড'-এর নাম বাতিল করে পুনরায় পূর্বের 'যশোর রোড' নাম পুনর্বহালের স্পষ্ট নির্দেশ দেন।

৫ই আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর এসে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের সুবাদে এক শ্রেণীর অপশক্তি পুনরায় ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধামতো নতুন করে লেখার (Historical Revisionism) অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে। এই চক্রটি ডিজিটাল সামাজিক মাধ্যম, সামাজিক নেটওয়ার্ক, বেনামী পোর্টাল এবং কৌশলগত প্রচারণাকে ব্যবহার করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের চিত্রকে ঝাপসা করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইতিহাস বিকৃতির নতুন কৌশলসমূহ:

ভুক্তভোগী সাজানোর অপচেষ্টা (Victim Card Play): যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি বা কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নেতাদের কেবল "রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার" হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ঐতিহাসিক ও আইনি সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিলই না।

ভাষা ও পরিভাষার পরিবর্তন: 'রাজাকার' বা 'আলবদর' শব্দগুলোকে রাজনৈতিক গালি বা তুচ্ছ শব্দ হিসেবে ডিলিউট করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যাতে এই শব্দগুলোর সাথে সম্পর্কিত গণহত্যার ভয়াবহতা নতুন প্রজন্মের কাছে হালকা হয়ে যায়।

তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি তৈরি: ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ভয়াবহতা যারা নিজের চোখে দেখেনি, সেই নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে কৃত্রিম তথ্য, খণ্ডিত ভিডিও এবং পক্ষপাতদুষ্ট নিবন্ধ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নতুন প্রজন্ম ও সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব

এই ইতিহাস বিকৃতির ভয়াল জোয়ারকে রুখে দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারা দেশের তরুণ সমাজ ও প্রজাতিকে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে অত্যন্ত সচেষ্ট ও দৃঢ় থাকতে হবে:

সত্য তথ্য যাচাই (Fact-Checking): সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা যেকোনো চটকদার মুখরোচক ঐতিহাসিক দাবিকে গ্রহণ করার পূর্বে একাত্তরের মূল খবরের কাগজ (যেমন: দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক পাকিস্তান, দ্য পূর্বদেশ), আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যপ্রমাণের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।

রাজনীতি বনাম মুক্তিযুদ্ধের সত্য: বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, বিরোধিতা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু রাজনীতি আর ইতিহাস এক জিনিস নয়। ক্ষমতার সমীকরণে ইতিহাসকে বলি হতে দেওয়া যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি রক্ষা: স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল আদর্শ জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার কে ধারণ করে যেকোনো ধরনের উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক পুনর্বাসন প্রচেষ্টাকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

বাংলাদেশের মানচিত্রটি কেবল একখণ্ড জমি নয়; এটি ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, অগণিত গণকবর এবং ২ লক্ষ মা-বোনের অসীম বলিদানের দ্বারা অঙ্কিত এক পবিত্র সীমানা। রাজনীতিতে রূপান্তর ঘটিয়ে সাময়িকভাবে কোনো ঘাতককে নতুন পোশাক পরানো যেতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তার কপালে আঁকা 'রাজাকার' ও 'দেশদ্রোহী' কলঙ্কতিলক কখনো মুছে ফেলা যাবে না। কারণ, রাজাকারের পরিচয় একটাই সে রাজাকারের মতোই ঘৃণিত। ইতিহাস কোনো সুবিধাবাদী রাজনীতির আজ্ঞাবহ দাস নয়; ইতিহাস পরম সত্যে ভাস্বর। নতুন প্রজন্মকে ধারণ করতে হবে সেই অমলিন অঙ্গীকার এই ভূখণ্ডে অনেক পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলায় রাজাকারের কোনো স্থান কখনোই হবে না।

আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সত্যের আলোয় ইতিহাসকে অক্ষুণ্ণ রাখা। আমাদের অবশ্যই দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করতে হবে: 'এই দেশের রাজনীতিতে অনেক কিছু হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে রাজাকার কখনো মুক্তিযোদ্ধা হবে না। রাজাকারের পরিচয় একমাত্র রাজাকার। এই বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই হবে না।'

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া, মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ১৯৭২ দালাল আইন

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.