>

>

মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকরা

মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকরা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে রাজাকারদের পরিচয় কেবলই দেশ ও জাতির বিশ্বাসঘাতক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম যখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই দেশদ্রোহী শক্তি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধানতম দোসর হিসেবে কাজ করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

TruthBangla

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক পটপরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু একটি মৌলিক সত্য কখনো পরিবর্তিত হবে না - ইতিহাসে রাজাকার কখনো মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবে না। রাজাকারের পরিচয় একটাই - রাজাকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে রাজাকারদের পরিচয় কেবলই দেশ ও জাতির বিশ্বাসঘাতক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি রক্তাক্ত গৌরবময় ইতিহাস। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম যখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই দেশদ্রোহী শক্তি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধানতম দোসর হিসেবে কাজ করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ইতিহাস বিকৃতির যে অপচেষ্টা দেখা গেছে, সেই ধারাবাহিকতায় ইতিহাস যেন কেউ বদলাতে না পারে, সেজন্য নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। এই নিবন্ধের লক্ষ্য হলো - মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা এবং রাজাকারদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরে জাতিকে আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, এই বাংলায় রাজাকারের কোনো ঠাঁই নেই।

একাত্তরের প্রেক্ষাপট - স্বাধীনতা ও বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালির ওপর এক নারকীয় গণহত্যা শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করে দেওয়া। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে জন্ম নেয় রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শামস-এর মতো সহায়ক বাহিনী। এই বাহিনীগুলোর মূল শক্তি এসেছিল তৎকালীন ধর্মীয় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী-এর সদস্যদের কাছ থেকে। তারা পাকিস্তান বিভক্তির ঘোর বিরোধী ছিল এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার আন্দোলনকে "ইসলাম-বিরোধী" এবং "ভারতের ষড়যন্ত্র" হিসেবে আখ্যায়িত করত। তাদের আদর্শিক ভিত্তি ছিল 'মুসলিম জাতীয়তাবাদ' যা তারা 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ'-এর বিপরীতে স্থাপন করেছিল।

গোলাম আযম - কুখ্যাত রাজাকারদের সর্দার ও বাংলাদেশের কলঙ্ক

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই নামগুলোর মধ্যে একটি হলো গোলাম আযম - যিনি একাত্তরে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধানতম সহযোগী দোসর। তিনি কেবল পাকিস্তান বিভক্তির বিরোধিতাই করেননি, বরং সক্রিয়ভাবে হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ এবং লুটপাটে মদদ দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুদ্ধকে 'ভারতের ষড়যন্ত্র' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব খাটিয়ে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস-এর মতো আধা-সামরিক বাহিনীগুলো গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। গোলাম আযম শুধু একজন বিরোধিতাকারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মূল ষড়যন্ত্রকারী এবং সামরিক বাহিনীর সহযোগী।

রাজনীতির আড়ালে দেশদ্রোহিতা

গোলাম আযম ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিরুদ্ধে আদর্শিক ও সামরিক ষড়যন্ত্রের প্রধান মুখ। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল জামায়াতে ইসলামীর আমির। কিন্তু একাত্তরে তাঁর কার্যকলাপ ছিল একজন দেশদ্রোহীর।

তিনি প্রথম থেকেই পাকিস্তান বিভক্তির চরম বিরোধিতা করেন এবং বারবার আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনীকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। ২৫ মার্চ কাল রাতে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর 'অপারেশন সার্চ লাইট' নামে গণহত্যা চালাবার পরও গোলাম আযম ৬ এপ্রিল, ১৯৭১ গভর্নর টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের অভিযানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। এমনকি, তিনি তাঁর দলের পক্ষ থেকে সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সহযোগী বাহিনী গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা বাস্তবায়নে গোলাম আযম তাঁর দলীয় কাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সাংগঠনিক ক্ষমতাকে তিনি রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠনে কাজে লাগান।

শান্তি কমিটির জন্ম

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকায় শান্তি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি গঠনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা ছিল গোলাম আযমের। এই কমিটি গঠনের দিনে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনকে সরাসরি ভারতের ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন।

সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সাথে দুই দফায় সাক্ষাৎ করে তিনি 'শান্তি কমিটি' গঠনের ষড়যন্ত্র করেন এবং রাজাকার বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করার পরামর্শ দেন। ১৪০ সদস্যের কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি গঠনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত।

রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস-এর নিয়ন্ত্রক

গোলাম আযম 'আমীর' হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের সাংগঠনিক কাঠামোকে সরাসরি এই সহযোগী বাহিনীগুলোর কার্যক্রমে নিয়োজিত করেন।

মানবতাবিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা: এই বাহিনীগুলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়।

উস্কানি ও নির্দেশ: 'ধ্বংস' করার আহ্বান

১৯৭১-এর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও রেডিও বার্তায় গোলাম আযমের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত উস্কানিমূলক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বাড়ানোর নির্দেশস্বরূপ।

তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের 'দেশোদ্রোহী', 'ভারতীয় চর', 'দুষ্কৃতিকারী' আখ্যা দিতেন। পাকিস্তানের দোসর রাজাকার, আল-বদর বাহিনীকে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন তাদের 'ধ্বংস' করার জন্য।

৩১ আগস্ট, ১৯৭১-এ তিনি ঘোষণা করেন, “কোনো ভালো মুসলমান তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলনের সমর্থক হতে পারে না।”

২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১-এ তিনি বলেন, 'জামাতের কর্মীরা মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে রাজী নয়।'

১৩ ও ১৫ জুলাই, ১৯৭১-এ রংপুর জামাতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ যখন মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন, তার একদিন পরেই ১৫ জুলাই গোলাম আযম ও মিয়া তোফায়েল গভর্নর হাউসে টিক্কা খানের সাথে দেখা করেন, যা প্রমাণ করে এই উস্কানি ছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ষড়যন্ত্র ও বিদেশে তৎপরতা

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের পরও গোলাম আযম তাঁর ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখেন। তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান।

১৯৭২ সালে গোলাম আযমের নেতৃত্বে বিদেশে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার সপ্তাহ’ পালিত হয়। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে মেনে নিতে পারেননি।

একই বছর তিনি হজ করার জন্য সৌদি আরব গমন করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত মিশন ছিল: পাকিস্তান-বাংলাদেশ কনফেডারেশান গঠনে আরব রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের সহায়তা ও সমর্থন আদায় করা। এই উদ্দেশ্যে তিনি জেদ্দা, কুয়েত, আবুধাবি, দুবাই, বৈরুত সফর করেন। তিনি সৌদিআরবের বাদশাহকে সাত বার অনুরোধ করেন বাংলাদেশকে যেন স্বীকৃতি না দেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ ও বিচার

দীর্ঘদিন বিচারহীনতার পর, বাংলাদেশ সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর।

ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা (৯টি অভিযোগ): সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাৎ করে 'শান্তি কমিটি' গঠনের ষড়যন্ত্র এবং রাজাকার বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করার পরামর্শ প্রদান। ১৪০ সদস্যের 'শান্তি কমিটি' গঠন।

উস্কানি (২৮টি অভিযোগ): স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যায়িত করে তাদের ধ্বংস করার আহ্বান। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে পাক-বাহিনীর সহযোগী সংগঠনগুলোর সদস্যদের দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়ে সাধারণ জনগণের উপর হামলার আহ্বান জানানো।

সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততা (২৩টি অভিযোগ): প্রাথমিক ভাবে গঠিত শান্তি কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি’ রাখা এবং কার্যকরী সদস্য হিসাবে যোগ দেওয়া। দেশি-বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী জনগণকে ‘দুষ্কৃতকারী’ বলা এবং তাদের ‘পাকড়াও’ চেষ্টা অব্যাহত রাখার ঘোষণা।

সরাসরি হত্যা ও নির্যাতন (১টি অভিযোগ): এই অভিযোগটি ছিল সবচেয়ে গুরুতর। সাব-ইন্সপেক্টর সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেসহ ছয়জনকে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ার পর, সিরু মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রেক্ষিতে গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারে মিয়ার কাছে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া ছিল। চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী, ঈদের দিন রাতে পৈরতলা ব্রিজের কাছে ৩৯ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যেখানে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেও ছিলেন।

রায় ও পরিণতি

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনিত সবকয়টি অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁর বয়স বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড (৯০ বছর) দন্ডিত করে।

আপিল ও মৃত্যু: রায় প্রদানের পর ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট খালাস চেয়ে আপিল করেন গোলাম আযম, এবং সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল চলাকালীন ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) হাসপাতালে প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোলাম আযম মারা যান।

মতিউর রহমান নিজামী - আল-বদর বাহিনীর বীভৎস ইতিহাস

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে যে দেশদ্রোহী শক্তিগুলো এদেশের মুক্তিকামী মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল আল-বদর বাহিনী। আর এই ঘৃণ্য আধা-সামরিক মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী, যিনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে এসে রাজনৈতিক পুনর্বাসন লাভ করেন এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি লাভ করেন।

একাত্তরের সহযোগী শক্তির প্রধান স্থপতি

মতিউর রহমান নিজামী (জনগণের কাছে যিনি 'মইত্যা রাজাকার' নামে পরিচিত) ছিলেন একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির) প্রধান। তাঁর নেতৃত্বে কেবল ছাত্রসংঘই নয়, বরং আল-বদর নামক এক নির্মম আধা-সামরিক বাহিনী গঠিত হয়, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে সশস্ত্র যুদ্ধ করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নির্মূল করা।

গঠন ও নেতৃত্ব: ১৯৭১ সালে নিজামীর নেতৃত্বেই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী সংগঠন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় আল-বদর বাহিনী। এই বাহিনী তৈরি হয়েছিল মূলত মেধাবী ও আদর্শিকভাবে প্রশিক্ষিত ছাত্রদের সমন্বয়ে, যাদেরকে ব্যবহার করা হয়েছিল ভয়ংকর গুপ্তহত্যা মিশনে।

আল-বদর - নৃশংসতার প্রতীক ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের হোতা

আল-বদর বাহিনী ছিল রাজাকার ও আল-শামসের চেয়েও বেশি সুসংগঠিত, আদর্শিক এবং গোপনীয়। এদের মূল কাজ ছিল গেরিলা ধাঁচে কাজ করা, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণ করা এবং বুদ্ধিজীবী তথা প্রগতিশীল বাঙালিদের নির্মূল করা।

গণহত্যা ও নারী নির্যাতন

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজামীর নেতৃত্বাধীন আল-বদর বাহিনীর বীভৎস গণহ'ত্যা, ধ'র্ষণ, লুটতরাজ এবং অগি্নসংযোগের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন গণতদন্ত কমিশন ও ঐতিহাসিক নথিপত্রের প্রতিবেদনে।

এই বাহিনী কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন করত না, যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাক সেনাদের ক্যাম্পে তুলে দিত এবং স্থানীয় হিন্দু ও জাতীয়তাবাদী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর চরম নির্যাতন করত।

জাতির সূর্যসন্তানদের নির্মূল

আল-বদর বাহিনী ইতিহাসের এক জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত - মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাতির সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের নির্ম'মভাবে হ'ত্যা করা।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে, এই বাহিনী তালিকা করে দেশের শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়।

ইতিহাসের এই জঘন্যতম হ'ত্যাকাণ্ডেরও সরাসরি নেতৃত্ব দেন তৎকালীন আল-বদর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী। এই অপরাধের লক্ষ্য ছিল সদ্য স্বাধীন হতে যাওয়া দেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়া, যাতে বাংলাদেশ কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।

দেশান্তর এবং সামরিক পুনর্বাসন

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে, তখন মতিউর রহমান নিজামীসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক যুদ্ধাপরাধী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

পলায়ন: নিজামী সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে।

প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন: ১৯৭৭ সালে তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে দেশে রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। এই সুযোগে নিজামী ঢাকায় প্রকাশ্যে আসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি দলটির শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারও হন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ ও বিচার

দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করার পর, বাংলাদেশের জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal - ICT) গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন সেই বিচারের প্রধান অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম।

নিজামীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ষোলোটি অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল।

প্রমাণিত অভিযোগ: দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

মৃত্যুদণ্ড: প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা আল-বদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার প্রমাণ দেয়।

যাবজ্জীবন: এ ছাড়া ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগে হত্যা, আটক ও নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র সংঘটনের দায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

খালাস: বাকি ৮ অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে না পারায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দীর্ঘ শুনানি শেষে তাঁর সাজা বহাল রাখেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তিনটি (২, ৪ ও ১৬) অভিযোগে নিজামীর সাজা মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, যা তাঁর অপরাধের গুরুত্বের চূড়ান্ত বিচারিক স্বীকৃতি।

আইনের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

দণ্ড কার্যকর: ০৯ মে ২০১৬ তারিখে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিজামীর মৃ'ত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

এই দণ্ড কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও যুদ্ধাপরাধীরা আইনের হাত থেকে বাঁচতে পারে না। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতি এবং ন্যায়বিচারের প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের সর্বোচ্চ প্রতিফলন।

কাদের মোল্লা - একাত্তরের 'কসাই'

মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছু স্থানীয় সহযোগী বিশ্বাসঘাতকতার নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, যিনি একাত্তরে তাঁর মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে কুখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন সেই সময়ের ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনী আল-বদরের একজন কমান্ডার। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নির্যাতনে মিরপুর এবং সংলগ্ন এলাকা পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমিতে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাঁর যে সকল অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তা ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

পরিচয় ও একাত্তরের ভূমিকা

আব্দুল কাদের মোল্লা, যিনি 'কসাই কাদের' নামেও পরিচিত ছিলেন, মূলত তাঁর জন্মস্থান ফরিদপুরের পাংশা অঞ্চলে এই অপবাদ পেয়েছিলেন। তবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে ঢাকা শহরের মিরপুর এলাকা।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি ছিলেন জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সক্রিয় সদস্য। পরবর্তীতে এই ছাত্রসংঘের কর্মীদের নিয়েই গঠিত হয় কুখ্যাত আধাসামরিক বাহিনী আল-বদর। কাদের মোল্লা এই আল-বদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে সক্রিয়ভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নেন।

ঢাকা শহরের মিরপুর এলাকা তখন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। কাদের মোল্লা এই এলাকাতেই হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের এক বিভীষিকাময় নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন।

কবি, সাংবাদিক ও সাধারণ ছাত্রদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডসমূহ

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল সমাজের বুদ্ধিজীবী অংশ এবং সাধারণ ছাত্রদের উপর সরাসরি আঘাত হানার ঘটনা।

পল্লব হত্যাকাণ্ড - বেপরোয়া নির্যাতন

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কাদের মোল্লার নির্দেশে তাঁর সহযোগীরা মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে আটক করে। পল্লবের উপর চালানো নির্যাতন ছিল চরম অমানবিক।

নির্যাতনের ধরণ: তাঁকে মিরপুর ১২ নম্বর থেকে ১ নম্বরের শাহ আলী মাজার পর্যন্ত টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে আবার টানতে টানতে ১২ নম্বরের ঈদগাহ মাঠে নিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

কাদের মোল্লার সহচর আখতার ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল পল্লবকে গুলি করে হত্যা করেন। এই অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

মা-ভাইসহ কবি মেহেরুননিসা হত্যাকাণ্ড

কাদের মোল্লার নৃশংসতা সমাজের সৃজনশীল এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদেরও ছাড়েনি। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা তাঁর সহযোগীদের নিয়ে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে কবি মেহেরুননিসার বাসায় যান।

সেখানে তাঁরা মেহেরুননিসা, তাঁর মা এবং দুই ভাইকে নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে হত্যা করেন। এই অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন।

সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যাকাণ্ড

কাদের মোল্লার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন সেইসব ব্যক্তিরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সহায়তা করছিলেন, যার মধ্যে সাংবাদিকরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

অপহরণ ও হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিকেলে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বাসস্ট্যান্ড থেকে কাদের মোল্লা ও তাঁর সহযোগী আল-বদর-রাজাকাররা আটক করেন। আবু তালেবকে জল্লাদখানা পাম্পহাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়।

এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের দায়ে কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।

কাদের মোল্লার অপরাধের মাত্রা কেবল ব্যক্তিগত হত্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা গণহত্যামূলক এবং যৌন সহিংসতা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

আলুব্দীতে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ

গণহত্যার ভয়াবহতার এক চিত্র দেখা যায় মিরপুরের পল্লবী থানার আলুব্দী (আলোকদী) গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল কাদের মোল্লা পাকিস্তানি সেনা, অর্ধশতাধিক অবাঙালি ও রাজাকার নিয়ে আলুব্দী গ্রামে যৌথ হামলা চালান।

হামলাকারী বাহিনীর এলোপাতাড়ি গুলিতে ৩৪৪ জনের বেশি নিরপরাধ গ্রামবাসী মারা যান। এই হত্যাযজ্ঞে জড়িত থাকার দায়ে ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।

ঘাটার চর ও ভাওয়াল খানবাড়ি হত্যাকাণ্ড

ঘাটার চর ও ভাওয়াল খানবাড়ির ঘটনা ছিল সাধারণ গ্রামবাসীদের উপর সুপরিকল্পিত হামলা। ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর সকালে কাদের মোল্লা ৬০-৭০ জন রাজাকার নিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘাটার চরে (বর্তমানে শহীদনগর) হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র শতাধিক গ্রামবাসীকে হত্যা করেন।

প্রাথমিক ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগে খালাস দিলেও, আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৪:১) মতে কাদের মোল্লাকে এই অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

হযরত আলী লস্করসহ পাঁচজনকে হত্যা ও ধর্ষণ

কাদের মোল্লার অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও ঘৃণ্য ছিল হযরত আলী লস্করের পরিবারের উপর হামলা। এই অভিযোগেই তাঁর সর্বোচ্চ দণ্ড নিশ্চিত হয়।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কাদের মোল্লা, তাঁর সহযোগী অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনারা মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনে হযরত আলী লস্করের বাসায় যায়। কাদের মোল্লার নির্দেশে হযরত আলী লস্করকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছোট ছেলেকে হত্যা করা হয়।

এই জঘন্য অপরাধের শেষ এখানেই ছিল না। কাদের মোল্লা এবং তাঁর ১২ সহযোগী মিলে হযরত আলীর ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে। ট্রাইব্যুনাল এই অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও, পরবর্তীতে আপিল বিভাগ এই সাজা বাড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৪:১) মতে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এই রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় ন্যায়বিচার।

আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ - একাত্তরের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনের কুখ্যাত হোতা

দেশদ্রোহী রাজাকার ও আলবদর চক্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও কুখ্যাত নেতা ছিলেন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, যিনি জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের (আইসিএস) প্রধান হিসেবে একাত্তরে জন্ম দিয়েছিলেন ভয়ঙ্কর 'আল-বদর' মিলিশিয়া বাহিনীর। মুজাহিদের নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীই মূলত যুদ্ধের শেষ দিকে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতীক বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছিল।

ছাত্র নেতা থেকে দেশদ্রোহী

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই ছিলেন কট্টর পাকিস্তানপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের (আইসিএস) কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন।

মুজাহিদের দেশদ্রোহিতার স্বরূপ উন্মোচিত হয় তাঁর নিজ বক্তব্যে। তিনি পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের কাছে গর্বের সঙ্গে আইসিএস সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন:

"পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীরা যারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এবং যারা অনুগত, আন্তরিক ও সৎ পাকিস্তানি, তারা এই দুঃসময়ে সর্বোত্তমভাবে জাতির সেবা করতে প্রস্তুত।"

এই বক্তব্যের মাধ্যমে মুজাহিদ কার্যত পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে আশ্বাস দেন যে, তাঁর নেতৃত্বে আইসিএস-এর সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যুদয় রুখে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় তাদের সঙ্গে সশস্ত্রভাবে যোগ দিতে প্রস্তুত।

মুজাহিদের প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই মূলত আইসিএস সদস্যদের নিয়ে কুখ্যাত আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়। এই বাহিনী কেবল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী ছিল না, বরং এটি এক ভয়ঙ্কর মিলিশিয়া বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। এদের কাজ ছিল সশস্ত্র প্রতিরোধ তৈরি করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নির্মূল করা।

আল-বদর, বুদ্ধিজীবী নিধন ও পরিকল্পিত গণহত্যা

মুজাহিদের নেতৃত্বে আল-বদর বাহিনীর কর্মকাণ্ড পরবর্তীতে সুপরিকল্পিত গণহত্যার রূপ নেয়। বিশেষ করে, পাকিস্তানের আসন্ন পরাজয় নিশ্চিত জেনে মুজাহিদ ও তার সহযোগীরা দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার ঘৃণ্য পরিকল্পনা করে।

যুদ্ধের শেষ দিকে, বিশেষ করে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে, মুজাহিদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযান। এই বাহিনী বাংলাদেশের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং শিল্পীদের বাড়ি বাড়ি থেকে খুঁজে ধরে নিয়ে যায়।

নৃশংসতা: এই বুদ্ধিজীবীদের নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডগুলো এতটাই নির্মম ছিল যে, বিভিন্ন বধ্যভূমিতে অনেকের মরদেহ এত বিকৃত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল যে, তাদের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। মুজাহিদ ছিলেন সেই গণহত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা।

ঢাকায় মুজাহিদের তৎপরতা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজাহিদ ঢাকা শহরের ফকিরাপুল, নয়াপল্টন এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে অবস্থান করতেন। সেখ ভিলা, ৩/৫ নয়াপল্টন তার মধ্যে একটি। তাঁর প্রধান আড্ডা ছিল ফকিরাপুলের গরম পানির গলি ১৮১ নং এর ফিরোজ মিয়ার বাড়ি। এই বাড়িগুলোতে সশস্ত্র ট্রেনিং, সভা, রাজাকার রিক্রুটমেন্ট, অপারেশন পরিচালনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে শারীরিক নির্যাতনসহ নানা অপরাধমূলক কাজ পরিচালনা করতেন মুজাহিদ। ফকিরাপুল-আরামবাগে শত শত নিরস্ত্র নিরাপরাধ বাঙালি হত্যায় তাঁর তৎপরতা ছিল গোটা ঢাকা জুড়ে।

ইতিহাসের বিচার - গ্রেফতার থেকে ফাঁসির রায় কার্যকর

দীর্ঘদিন ধরে বিচারের বাইরে থাকা এই যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে।

বিচারিক প্রক্রিয়া

তারিখ

ফলাফল

মানবতা বিরোধী অপরাধে গ্রেফতার

২৯ জুন ২০১০


দাখিলকৃত অভিযোগ

১৬ জানুয়ারি ২০১২


অভিযোগ গঠন

২১ জুন ২০১২

আসামীর বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ গঠন করা হয়।

ফাঁসির রায় ঘোষণা

১৭ জুলাই, ২০১৩

ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।

রায়ের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষের আপিল

১১ আগস্ট ২০১৩


আপিল বিভাগের রায়

১৬ জুন ২০১৫

ফাঁসি বহাল।

পুনর্বিবেচনার আবেদন

১৪ অক্টোবর ২০১৫


পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ

১৮ নভেম্বর ২০১৫


মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

২২ নভেম্বর ২০১৫

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হয়।

প্রমাণিত অপরাধ ও দণ্ডাদেশের চিত্র

ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগে প্রমাণিত অভিযোগগুলো মুজাহিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের চিত্র তুলে ধরে:

অভিযোগ নম্বর

অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

ট্রাইব্যুনালের রায়

আপিল বিভাগের রায়

অভিযোগ-৩

ফরিদপুর সার্কিট হাউসে রণজিৎ নাথ বাবুকে নির্যাতন ও হত্যার প্রচেষ্টা।

৫ বছরের কারাদণ্ড

বহাল

অভিযোগ-৫

ঢাকার নাখালপাড়ায় আলতাফ মাহমুদ সহ অন্যান্য নিরীহ বন্দিদের হত্যার ষড়যন্ত্র ও গুম।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

বহাল

অভিযোগ-৬

ঢাকার ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ক্যাম্পে অবস্থান করে বুদ্ধিজীবী নিধনসহ সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র ও পরামর্শ।

মৃত্যুদণ্ড

বহাল

অভিযোগ-৭

ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ, ধর্ষণ ও হত্যায় নির্দেশ।

মৃত্যুদণ্ড

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: যদিও কয়েকটি অভিযোগে তাঁকে খালাস বা দণ্ড হ্রাস করা হয়, কিন্তু মূল অভিযোগ-৬ (বুদ্ধিজীবী নিধনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র ও পরামর্শ) এবং অভিযোগ-৫ এ তাঁর সাজা বহাল থাকে। বিশেষ করে অভিযোগ-৬ এ প্রাপ্ত মৃত্যুদণ্ড-ই তাঁর অপরাধের মাত্রা ও বিচারিক গুরুত্ব প্রমাণ করে।

স্বাধীনতার পর নরঘাতকের দাপট

স্বাধীনতার পর কয়েক বছর এই নরঘাতক তার অন্য সহযোগীদের সঙ্গে পালিয়ে বেড়ালেও, ১৯৭৭ সাল থেকে সে আবার স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হন এবং পুরনো আদর্শ অনুযায়ী হত্যার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

যাদের রক্তদান ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের বাংলাদেশ, সেই রক্ত ও আত্মত্যাগের সঙ্গে আজন্ম বিশ্বাসঘাতক এই মুজাহিদ চারদলীয় সরকারের ৫ বছর সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা দেশে। ক্ষমতার দাপটে মানবতাকে পদদলিত করেছেন।




ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা ও নতুন প্রজন্মের সতর্কতা

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে গোলাম আযম এবং তার আদর্শের অনুসারী, অর্থাৎ রাজাকারদের উত্তরসূরীরা নানাভাবে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে রাজাকারদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন প্রদর্শনী, বিতর্কিত লেখনী এবং বক্তব্যের মাধ্যমে তারা একাত্তরের গণহত্যার নৃশংসতা এবং তাদের নেতাদের ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে।

এই অপচেষ্টা রুখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো পুরো নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। সত্য ইতিহাস জানতে হবে, এবং রাজাকারদের প্রকৃত পরিচয় ও তাদের অপরাধের মাত্রা সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

তথ্য যাচাই: সামাজিক মাধ্যম বা অন্য কোনো উৎস থেকে পাওয়া তথ্যকে অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ: এই দেশের বুকে এখনো পাকিস্তানী চেতনা তথা দেশদ্রোহী চেতনা বিদ্যমান, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে যাবে কেন? যতদিন ঘাতক দালালদের চেতনা থাকবে ততদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা - গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে।

ইতিহাসের বিকৃতি এবং যুদ্ধাপরাধীদের মহিমান্বিত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের অভ্যুদয় কেবল একটি ভূখণ্ডের জন্ম নয়, এটি ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত একটি মহান আদর্শ। এই আদর্শের কেন্দ্রে রয়েছে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সম-অধিকার। গোলাম আযমের মতো কুখ্যাত রাজাকার এবং তাদের দোসররা এই আদর্শের ঘোর বিরোধী ছিল। তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের দাগ ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো - সত্যের আলোয় ইতিহাসকে অক্ষুণ্ণ রাখা। আমাদের অবশ্যই দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করতে হবে: 'এই দেশের রাজনীতিতে অনেক কিছু হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে রাজাকার কখনো মুক্তিযোদ্ধা হবে না। রাজাকারের পরিচয় একমাত্র রাজাকার। এই বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই হবে না।'

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া, মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ১৯৭২ দালাল আইন

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 31, 2026

/

Post by

ছাত্রশিবির কি আসলেই রগ কাটে? কতজনের রগ কেটেছে ছাত্রশিবির? বাংলাদেশি ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে সহিংসতা এক কলঙ্কিত অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার লড়াইয়ের চেয়ে পেশিশক্তির মহড়া বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছে চরম নৃশংসতার। সেটি হলো 'বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির'। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছাত্র সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে 'রগ কাটা' ও নৃশংস নির্যাতনের রাজনীতির জন্য।

Jan 29, 2026

/

Post by

প্রায় ৬৭২ জন গণহত্যায় সরাসরি সহায়তাকারী তথা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে বা অন্য দেশে পালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে যখন পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পারে, তখন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব পরিকল্পিতভাবে দেশ ছেড়ে পলায়নের পথ বেছে নেয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন এবং ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।

Jan 25, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখন চারদিকে ছিল কেবল ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে যে কেবল পুনর্গঠনের স্বপ্ন ছিল তা নয়, বরং ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের বীজ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিতর্কিত চরিত্রগুলোর একজন হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি'।

Jan 25, 2026

/

Post by

একটি দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নবজাতক এই রাষ্ট্রে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল নানা ক্ষমতার সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' এবং 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী'। এই দুই বাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল।

Jan 24, 2026

/

Post by

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কালটি ছিল পুনর্গঠনের পাশাপাশি চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার। এই অস্থিরতার কেন্দ্রে ছিল নবগঠিত রাজনৈতিক দল 'জাসদ' এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্ন বিতর্ক উসকে দেয় বঙ্গবন্ধু কি সত্যিই জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিলেন? কেন জাসদ সেই সময় এত সশস্ত্র হয়ে উঠেছিল? আর ১৫ আগস্টের পর হঠাৎ কেন তারা স্তিমিত হয়ে গেল?

Jan 22, 2026

/

Post by

সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আবেগ। কারণ, আজ ঘরে ফিরছেন সেই মানুষটি, যিনি দশকের পর দশক ধরে এ দেশের কৃষক-শ্রমিক আর মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পূর্ণতা পাওয়ার পথে মওলানা ভাসানীর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল এক বিশাল মাইলফলক।

Jan 31, 2026

/

Post by

ছাত্রশিবির কি আসলেই রগ কাটে? কতজনের রগ কেটেছে ছাত্রশিবির? বাংলাদেশি ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে সহিংসতা এক কলঙ্কিত অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার লড়াইয়ের চেয়ে পেশিশক্তির মহড়া বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছে চরম নৃশংসতার। সেটি হলো 'বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির'। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছাত্র সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে 'রগ কাটা' ও নৃশংস নির্যাতনের রাজনীতির জন্য।

Jan 29, 2026

/

Post by

প্রায় ৬৭২ জন গণহত্যায় সরাসরি সহায়তাকারী তথা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে বা অন্য দেশে পালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে যখন পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পারে, তখন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব পরিকল্পিতভাবে দেশ ছেড়ে পলায়নের পথ বেছে নেয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন এবং ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।

Jan 25, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখন চারদিকে ছিল কেবল ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে যে কেবল পুনর্গঠনের স্বপ্ন ছিল তা নয়, বরং ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের বীজ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিতর্কিত চরিত্রগুলোর একজন হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি'।

Jan 25, 2026

/

Post by

একটি দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নবজাতক এই রাষ্ট্রে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল নানা ক্ষমতার সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' এবং 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী'। এই দুই বাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল।

Jan 31, 2026

/

Post by

ছাত্রশিবির কি আসলেই রগ কাটে? কতজনের রগ কেটেছে ছাত্রশিবির? বাংলাদেশি ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে সহিংসতা এক কলঙ্কিত অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার লড়াইয়ের চেয়ে পেশিশক্তির মহড়া বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছে চরম নৃশংসতার। সেটি হলো 'বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির'। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছাত্র সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে 'রগ কাটা' ও নৃশংস নির্যাতনের রাজনীতির জন্য।

Jan 29, 2026

/

Post by

প্রায় ৬৭২ জন গণহত্যায় সরাসরি সহায়তাকারী তথা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে বা অন্য দেশে পালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে যখন পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পারে, তখন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব পরিকল্পিতভাবে দেশ ছেড়ে পলায়নের পথ বেছে নেয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন এবং ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।

Jan 25, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখন চারদিকে ছিল কেবল ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে যে কেবল পুনর্গঠনের স্বপ্ন ছিল তা নয়, বরং ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের বীজ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিতর্কিত চরিত্রগুলোর একজন হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি'।

Jan 25, 2026

/

Post by

একটি দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নবজাতক এই রাষ্ট্রে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল নানা ক্ষমতার সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' এবং 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী'। এই দুই বাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.