>

>

১৯৭২-৭৫ সিরাজ সিকদার, সর্বহারা পার্টি এবং বিদেশী ষড়যন্ত্র

১৯৭২-৭৫ সিরাজ সিকদার, সর্বহারা পার্টি এবং বিদেশী ষড়যন্ত্র

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময়, রোমান্টিক এবং চরম বিতর্কিত চরিত্র হলেন চীনপন্থী কমিউনিস্ট নেতা সিরাজ সিকদার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’। আজ সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন তরুণ প্রজন্মের একটি নির্দিষ্ট অংশ নতুন কোনো ‘বিপ্লব’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন দেখে, তখন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সেই অগ্নিগর্ভ ও অস্থিতিশীল সময়কালকে নতুন করে নির্মোহভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাসের কাঠগড়ায় আজ এই প্রশ্নটি তোলা আবশ্যক সিরাজ সিকদার কি আসলেই কোনো খাঁটি দেশপ্রেমিক বা শোষিতের পক্ষের বিপ্লবী ছিলেন, নাকি তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করার লক্ষ্যে পরিচালিত পাকিস্তান ও চীনের এক ছদ্মবেশী প্রক্সি এজেন্ট?

TruthBangla

১৯৭২-৭৫ সিরাজ সিকদার, সর্বহারা পার্টি এবং বিদেশী ষড়যন্ত্র

১৯৭১ সালে ৯ মাসের একটি রক্তক্ষয়ী ও নজিরবিহীন যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখন চারদিকে ছিল কেবল লাশের গন্ধ, স্বজন হারানোর আর্তনাদ এবং সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত এক অর্থনৈতিক অবকাঠামো। শূন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের পর্বতসম চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাটি ও মানুষ নিয়ে একটি নতুন দেশ গড়ার সংগ্রামে অবতীর্ণ হলেন। ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন পরবর্তী ভাষণে বলেছিলেন, "আমার কাছে সোনা নেই, রুপা নেই, বৈদেশিক মুদ্রা নেই। আছে কেবল ধ্বংসস্তূপ, আর আছে আমার দেশের মাটি ও মানুষ। এই মাটি ও মানুষকে দিয়েই আমি আমার সোনার বাংলা গড়ে তুলব।"

ঠিক তখনই সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে সুকৌশলে বপন করা হচ্ছিল এক গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ঘাতের বিষাক্ত বীজ। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময়, রোমান্টিক এবং চরম বিতর্কিত চরিত্র হলেন চীনপন্থী মাওবাদী কমিউনিস্ট নেতা সিরাজ সিকদার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’।

আজ সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন তরুণ প্রজন্মের একটি নির্দিষ্ট অংশ নতুন কোনো ‘বিপ্লব’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন দেখে, তখন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সেই অগ্নিগর্ভ ও অস্থিতিশীল সময়কালকে নতুন করে নির্মোহভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাসের কাঠগড়ায় আজ এই প্রশ্নটি তোলা আবশ্যক সিরাজ সিকদার কি আসলেই কোনো খাঁটি দেশপ্রেমিক বা শোষিতের পক্ষের বিপ্লবী ছিলেন, নাকি তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করার লক্ষ্যে পরিচালিত পাকিস্তান ও চীনের এক ছদ্মবেশী প্রক্সি এজেন্ট?

জাতিসংঘের ভেটো ও চীনের দালালির আড়ালে ‘মেকি বিপ্লব’

স্বাধীনতার ঠিক পরপরই বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্র হিসেবে নিজের স্বীকৃতি আদায় এবং জাতিসংঘে শক্তিশালী অবস্থান তৈরির জন্য কূটনৈতিক লড়াই চালাচ্ছিল, তখন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈরী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল গণচীন। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশের প্রথম ও আইনসম্মত আবেদনে চীন সরাসরি ‘ভেটো’ (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এর ফলে সদ্য স্বাধীন দেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ এবং বিশ্বসংস্থায় নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার আইনি অধিকার থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত হয়।

চীনের এই অন্যায় ও আগ্রাসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যখন সমগ্র বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম নেয়, ঠিক তখনই সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি এক অদ্ভুত ও দেশবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। তারা চীনের সেই কুখ্যাত ভেটোকে প্রকাশ্য রাজপথে ও লিফলেটের মাধ্যমে স্বাগত ও সমর্থন জানায়।

সিরাজ সিকদার তাঁর রাজনৈতিক ইশতেহারে দাবি করেছিলেন যে, জাতিসংঘে ভেটো দিয়ে চীন মূলত অত্যন্ত সঠিক ও ঐতিহাসিক কাজ করেছে! তাঁর যুক্তি ছিল যারা চীনের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে, তারা আসলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি ‘চীন-বিরোধী’ ও সাম্রাজ্যবাদী জনমত তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতিহাসের কী নিখুঁত পরিহাস! আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যাঁরা ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’ ও ‘বৈদেশিক আধিপত্যবাদ’ নিয়ে বড় বড় তাত্ত্বিক কথা বলেন, তাঁদেরই একাংশের রাজনৈতিক ও আদর্শিক গুরু সিরাজ সিকদার সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি আন্তর্জাতিকভাবে আটকে রাখতেই সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন।

এটি কি কেবলই একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল, নাকি এর পেছনে কাজ করছিল বেইজিংয়ের সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক প্রেসক্রিপশন এবং আর্থিক প্রণোদনা? তৎকালীন নথিপত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, সে সময়কার পিকিংপন্থী চরম বামপন্থীরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালির জাতীয় মুক্তি আন্দোলন হিসেবে স্বীকারই করতে চায়নি। তাদের বিকৃত তাত্ত্বিক ভাষায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল আসলে মার্কিন-ভারত-সোভিয়েত অক্ষের একটি গভীর ষড়যন্ত্র, যাকে তারা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণভাবে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ (ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এই ছদ্মবেশী প্রচারণার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।

জাতিসংঘে চীনের ভেটো এবং দেশীয় চরমপন্থীদের অরাজকতার বিপরীতে পররাষ্ট্র নীতি প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্তব্য করেছিলেন, "আমরা কারও পকেটে যাওয়ার জন্য স্বাধীনতা অর্জন করিনি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত পরিষ্কার 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়'। কোনো দেশের সাম্রাজ্যবাদী কিংবা আধিপত্যবাদী চালবাজির কাছে বাংলাদেশ মাথা নত করবে না।"

তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, "স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে তা রক্ষা করা অনেক কঠিন। আজ যারা 'মাওবাদ' বা 'শ্রেণীশত্রু খতমের' নামে গ্রামে গ্রামে নিরীহ শিক্ষক, চেয়ারম্যান, পোস্টমাস্টার ও মুক্তিযোদ্ধাদের জবাই করছে, তারা মূলত বেইজিং ও করাচির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে।"

‘জয় বাংলা’ বনাম ‘জয় পূর্ব বাংলা’: স্লোগানের অন্তরালে বিচ্ছিন্নতাবাদ

বর্তমান সময়ের কিছু বুদ্ধিজীবী এবং সমকালীন তরুণ বামপন্থী তাত্ত্বিকেরা প্রায়শই একটি জগাখিচুড়ি পাকানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁরা দাবি করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল এক ধরনের ‘সেগ্রেগেশনিস্ট আইডলজি’ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আদর্শ ধারণ করতেন, যার কারণে ১৯৭১ সালে ভারতের দালালি করতে গিয়ে ঐতিহাসিক ‘বৃহত্তর বাংলা’র স্বপ্ন পূরণ হয়নি এবং পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের অংশ হতে পারেনি।

অথচ কী অদ্ভুত ও স্ববিরোধী ব্যাপার হলো, এই নতুন যুগের তাত্ত্বিকদেরই অন্যতম প্রধান আদর্শিক পিতা সিরাজ সিকদার। সিরাজ সিকদার ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের তীব্র এবং প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন।

সিরাজ সিকদারের যুক্তি ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত। তিনি দাবি করতেন, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি মূলত একটি বৃহত্তর বা অখণ্ড বাংলার ভৌগোলিক ধারণা দেয়, যার ফলে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্প্রসারণবাদ খুব সহজেই বাংলাদেশে ঢুকে পড়বে। এই মনস্তাত্ত্বিক আশঙ্কা ও ভারত-বিদ্বেষী সুড়সুড়ি থেকেই তিনি ‘জয় পূর্ব বাংলা’ স্লোগানকে জাতীয় মুক্তির একমাত্র সঠিক প্রতীক হিসেবে জোরপূর্বক প্রচার করতে শুরু করেন।

অর্থাৎ, একাত্তরে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র ও জাতীয় পরিচয়কে মেনে নিতে তাদের তীব্র অনীহা ছিল। একদিকে অন্ধ ভারতবিদ্বেষ আর অন্যদিকে অবচেতন মনে পুরনো অবিভক্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কাঠামোকে মানসিকভাবে ধারণ করা এই ছিল সিরাজ সিকদারের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। যাঁরা আজ বঙ্গবন্ধুকে ভারতের দোসর বা দাস হিসেবে প্রমাণ করার সস্তা প্রোপাগান্ডা চালান, তাঁরা সুকৌশলে এই সত্যটি চেপে যান যে, সিরাজ সিকদাররা কীভাবে একটি সদ্য স্বাধীন দেশকে অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল করতে ভাষাগত, মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক বিভাজন তৈরি করেছিলেন, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার ওপর কুঠারাঘাত করেছিল।

পাকিস্তানি ফান্ডিং ও চিনা বামপন্থার গোপন আঁতাত

সিরাজ সিকদার এবং তাঁর দল ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’র সাথে তৎকালীন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক মহলের আর্থিক এবং সামরিক যোগাযোগের বিষয়টি এখন আর কোনো গোপন গুঞ্জন বা ধারণা নয়। বিভিন্ন সময়ে ডিক্লাসিফাইড হওয়া লিকড ডকুমেন্ট, রাষ্ট্রীয় নথিপত্র এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরিচালিত সর্বহারা পার্টির নাশকতামূলক অপারেশনগুলোর পেছনে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন ছিল।

পরবর্তী সময়ে খোদ সর্বহারা পার্টির ভেতরের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ও মাঠ পর্যায়ের কমান্ডার বিভিন্ন সময়ে লিখিতভাবে বা সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, তাঁদের তথাকথিত বুর্জোয়া সরকার উৎখাত আন্দোলনের পেছনে সরাসরি পাকিস্তানি অর্থ ও গোপন যোগাযোগের সংশ্লিষ্টতা ছিল।

তৎকালীন কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘চিনা বাম’ মানেই ছিল পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা করা। কারণ সে সময় চীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান মিত্র ও সমর্থক ছিল। একাত্তরের পরাজয়ের পর বাংলাদেশের মাটিতে একটি স্থায়ী অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা বজায় রাখা ছিল পাকিস্তানের মূল প্রতিশোধমূলক রাজনীতির অংশ।

স্বাধীনতার পর দেশের ব্যাংকিং খাত যখন পুনর্গঠিত হচ্ছে, তখন একের পর এক ব্যাংক ডাকাতি করা, গ্রামীণ থানা লুট করে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা আর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে ‘শ্রেণীশত্রু’ আখ্যা দিয়ে জবাই করার মাধ্যমে সিরাজ সিকদাররা যে ‘বিপ্লব’ করতে চেয়েছিলেন, তার মূল রসদ ও অর্থ আসত সেই করাচি কিংবা ইসলামাবাদ থেকে যারা মাত্র কয়েক মাস আগে এই দেশের ৩০ লক্ষ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল এবং ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছিল। পাকিস্তানি অর্থ ও চিনা অস্ত্রের ওপর ভর করে স্বদেশের সম্পদ ধ্বংস করাকে আর যাই হোক, কোনো দেশপ্রেম বা মুক্তিকামী বিপ্লবের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না।

উগ্র-বাম ও ছদ্মবেশী 'বিপ্লবী' ডাকু সিরাজের নাশকতার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭৪ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রদত্ত জনসভায় ভাষণে বলেছিলেন, "একদল লোক রাতের আঁধারে থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুট করে, ব্যাংক ডাকাতি করে, পাটের গুদামে আগুন দেয়, আর নিজেদের 'বিপ্লবী' বলে দাবি করে। এরা বিপ্লব করছে না, এরা আমার ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ থেকে অন্ন কেড়ে নিচ্ছে। এরা বিদেশের প্রেসক্রিপশনে এই স্বাধীন রাষ্ট্রকে ব্যর্থ বানাতে চায়।"

ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও মৈত্রী চুক্তির অপব্যাখ্যা

আজকের দিনের ‍কুলাঙ্গার জামায়াত-শিবির বা সমকালীন উগ্র ডানপন্থী ও অতি-বামপন্থী একদল অপপ্রচারক (যাঁদের মূল এজেন্ডাই হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা) প্রায়শই দাবি করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশকে ভারতের একটি সুরক্ষিত উপরাজ্যে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু এই সস্তা ও ক্ষতিকর প্রোপাগান্ডার মূল উৎস কিন্তু আজকের নয়; এর আদি উৎস হলো ১৯৭২ সালে সিরাজ সিকদার ও তাঁর দল কর্তৃক দেশজুড়ে ছড়ানো নানামুখী গুজব ও লিফলেট।

অথচ ইতিহাসের অনস্বীকার্য ও নির্মম সত্য এই যে, স্বাধীনতার মাত্র ৩ মাসের মাথায়, ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ভূখণ্ড ছেড়ে নিজ দেশে চলে যায়। বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এটি একটি বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা যে, কোনো মিত্রবাহিনী বা সহযোগী শক্তি কোনো দেশকে শত্রুমুক্ত করার পর এত দ্রুত ও এত কম সময়ের মধ্যে সেই ভূখণ্ড ত্যাগ করেছে।

'বাংলাদেশ ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে' সিরাজ সিকদার ও তৎকালীন উগ্র গোষ্ঠীগুলোর এই প্রোপাগান্ডার বিপরীতে ঐতিহাসিক সত্যটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট।

১৯৭২ সালের শুরুতে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: "শ্রীমতী গান্ধী, আপনি কবে আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে ফেরত নিয়ে যাবেন?"

ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নের জবাবে: "আপনি যখনই বলবেন, ঠিক তখনই আমার সৈন্যবাহিনী ফিরে যাবে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, সেখানে অন্য কোনো দেশের সৈন্য থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।" উল্লেখ্য, এই আলাপের পর নির্ধারিত সময়ের আগেই ১২ই মার্চ ১৯৭২ সালে ভারতীয় সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়।

একই বছরের মার্চ মাসে ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি’টি কোনো গোলামির দলিল ছিল না; বরং তা ছিল একটি নবজাতক, সামরিকভাবে দুর্বল ও আন্তর্জাতিকভাবে অরক্ষিত রাষ্ট্রের প্রাথমিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার একটি আইনি উপায়, যাতে পাকিস্তান বা অন্য কোনো রাষ্ট্র পুনরায় হামলা করার সাহস না পায়।

সিরাজ সিকদার ও তাঁর দলের নীতিনির্ধারকেরা গোপনে খুব ভালো করেই জানতেন যে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু তারা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ও তীব্র ক্ষোভ ছড়ানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রচার করতে শুরু করে যে, ভারতীয় সৈন্যরা আসলে সিভিল পোশাকে, সাধারণ মানুষের বেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে ও কৌশলগত অবস্থানে গোপনে অবস্থান করছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভারতবিদ্বেষী সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে এবং গুজব ছড়িয়ে তরল জনমত তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর নবগঠিত গণতান্ত্রিক সরকারকে যেকোনো উপায়ে উৎখাত করা।

বিজয় দিবসকে ‘কালো দিবস’ দিয়ে দেশব্যাপী নাশকতা

মাওবাদী চরমপন্থী সিরাজ সিকদারের জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায় হলো ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বিজয় দিবসে ও ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা ও আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে টহল দেয়া।

সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদার ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে 'কালো দিবস' ঘোষনা দিয়ে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। বিজয় দিবস বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং লিফলেট বিলি করে তারা ঘোষণা করে জাতীয় প্রেসক্লাব, পত্রিকা অফিস, কমলাপুর রেলস্টেশন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ বোমা মেড়ে উড়িয়ে দেয়ার। এ সময় তারা ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিলি করে আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে জিপে টহল দেয়, রক্ষীবাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মীদের হত্যা করে।

এর আগে ১৪ ডিসেম্বর সর্বহারা পার্টি ঢাকায় দুটি বোমা বিস্ফোরণ করে নিজেদের শক্তি জানান দিয়েছিলো। একটি বোমা বিস্ফোরিত হয় বাংলার বাণী অফিসে (যার মালিক ছিলেন শেখ কামালের ফুফাত ভাই শেখ মণি) এবং অপরটি বিস্ফোরিত হয় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স অফিসে।

থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি ছিল সিরাজ সিকদারের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে ৫৪ টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা করে পুলিশের অস্ত্র লুটপাট করে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি। ডাকাতি খুন রাহাজানি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য মতে, ১৯৭৩ সালে ১৮৯৬ টি খুন হয়।

সর্বহারাদের দ্বিমুখী চরিত্র: নারী অধিকার ও বিপ্লবী মেকি

সিরাজ সিকদার ও তাঁর অনুসারীরা মুখে সবসময় চরম সাম্যবাদ, প্রগতিশীলতা, লিঙ্গ সমতা এবং নারী অধিকারের বড় বড় বুলি আওড়ালেও বাস্তবে তাঁদের নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত জীবন ছিল ঠিক এর উল্টো ও সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতায় জর্জরিত।

সর্বহারা পার্টির অভ্যন্তরীণ দলীয় কাঠামো এবং ডিক্লাসিফাইড নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের দলে নারী কর্মীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রান্তিক। মুখে সমাজ পরিবর্তনের কথা বললেও নারীদের মূলত কেবল ক্যাম্পে রান্নাবান্না করা, চিঠি বা অস্ত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেওয়া করা কিংবা ঘরোয়া সেবা করার কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো শীর্ষ রাজনৈতিক বা সামরিক কমিটিতে নারীদের কোনো প্রবেশাধিকার বা গুরুত্ব ছিল না।

মুখে ‘ইকুয়ালিটি’ বা সমতার বুলি আউড়ে নিজের ঘরের ও দলের নারীদের পর্দানশীন বা কঠোর পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে বন্দি করে রাখার যে দ্বিমুখী সংস্কৃতি আজ আমরা বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চরমপন্থী দলগুলোর মধ্যে দেখতে পাই, তার আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা কিন্তু এই সর্বহারাদের হাত ধরেই হয়েছিল। বিপ্লবের নামে তারা নিজেদের পরিবারের নারীদের ঘরের কোণে বন্দি করে রেখে বাইরে মেকি নারী মুক্তির স্লোগান দিত এটাই ছিল তাদের চরম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বিমুখী চরিত্রের বাস্তব প্রমাণ।

উইকিলিকস ও ১৫ই আগস্টের নেপথ্য পরিকল্পনা

সিরাজ সিকদার ও তাঁর আন্দোলনের নেপথ্য চক্রান্তের সবচেয়ে চমকপ্রদ, অকাট্য এবং ভয়ংকর তথ্যটি পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক তথ্য ফাঁসের ওয়েবসাইট উইকিলিকস (WikiLeaks)-এর ডিক্লাসিফাইড মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপন নথিসমূহে।

নথি ও কূটনৈতিক তারবার্তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে খুনি মেজর ফারুক, রশিদ ও ডালিম গং যদি কোনো কারণে বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন আক্রমণ করতে বা সরকারকে উৎখাত করতে ব্যর্থ হতো, তবে সেই একই দায়িত্বটি মাঠ পর্যায়ে অন্যভাবে পালন করার জন্য পর্দার আড়ালে প্রস্তুত ছিল সিরাজ সিকদার এবং জাসদের তাত্ত্বিক গুরু সিরাজুল আলম খানের অনুসারীদের একটি সুনির্দিষ্ট সশস্ত্র অংশ।

১৯৭৪ সালের দিকেই মুজিব সরকারকে সম্পূর্ণ অচল ও উচ্ছেদ করার জন্য পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি উগ্রপন্থী দেশের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ সহায়তা ও লজিস্টিকস গ্রহণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ করে, সিঙ্গাপুর এবং লন্ডনে পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিনিধি ও ছদ্মবেশী কূটনীতিকদের সাথে সিরাজ সিকদারের দলের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের একাধিক গোপন বৈঠকের বিবরণ এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়।

নির্দিষ্ট অঙ্কের মার্কিন ডলার ও পাকিস্তানি রুপির বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড নষ্ট করার এই কুৎসিত চুক্তিই প্রমাণ করে যে, এই চরমপন্থীরা কখনোই বাংলাদেশের বা এ দেশের সাধারণ মানুষের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল না।

সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির নাশকতার ব্লুপ্রিন্ট

নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ ছক বা টেবিলের মাধ্যমে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক, আন্তর্জাতিক যোগসূত্র এবং আধুনিক রাজনৈতিক মূল্যায়নের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হলো:

বিষয়/ক্ষেত্র

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনা (১৯৭২-১৯৭৫)

সর্বহারা পার্টির কৌশল ও অন্তর্ঘাত

নেপথ্যের আর্থিক ও আন্তর্জাতিক মদদদাতা

আধুনিক রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও পরিণতি

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও জাতিসংঘ

বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদের আবেদনের বিপরীতে ১৯৭২ সালে চীনের ঐতিহাসিক ‘ভেটো’।

চীনের ভেটোকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা এবং একে ‘সঠিক পদক্ষেপ’ হিসেবে লিফলেটে প্রচার।

গণচীন (বেইজিংয়ের সরাসরি রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক নির্দেশনা)।

স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টাকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করা।

জাতীয় স্লোগান ও সার্বভৌমত্ব

স্বাধীন দেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের সর্বজনীনতা।

স্লোগানের তীব্র বিরোধিতা করে বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবধারার ‘জয় পূর্ব বাংলা’ স্লোগান চালু।

অবচেতন পাকিস্তানি কাঠামো ও ভারতের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

ভাষাগত ও আদর্শিক বিভাজন তৈরি করে রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলা।

অর্থনৈতিক ও সামরিক নাশকতা

সদ্য স্বাধীন দেশের থানা পুনর্গঠন এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যাংক ব্যবস্থা।

একের পর এক গ্রামীণ থানা আক্রমণ, অস্ত্র লুট, ব্যাংক ডাকাতি এবং পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) এবং লিকড ডলারে অর্থায়ন।

রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেশকে একটি 'ব্যর্থ রাষ্ট্র' হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা।

সামাজিক ও লিঙ্গ সমতা

মুখে সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র এবং প্রগতিশীল নারী অধিকারের প্রকাশ্য স্লোগান।

সাংগঠনিকভাবে নারীদের শীর্ষ পদ থেকে বঞ্চিত রাখা, কেবল ক্যাম্পের ঘরোয়া কাজে ব্যবহার।

সামন্ততান্ত্রিক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও দ্বিমুখী সাংগঠনিক নীতি।

মুখে প্রগতিশীলতার বুলি আওড়ালেও বাস্তবে চরম রক্ষণশীল ও শোষক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

১৫ আগস্ট ও সরকার উৎখাত চক্রান্ত

১৯৭৪-৭৫ সালে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে সশস্ত্র পন্থায় উচ্ছেদের আন্তর্জাতিক ব্লুপ্রিন্ট।

সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে গোপন বৈঠক; ফারুক-রশিদ চক্র ব্যর্থ হলে বিকল্প শক্তিরূপে ব্যাকআপ প্রস্তুতি।

পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি উগ্র ও অনুদানপ্রদানকারী দেশ (উইকিলিকস সূত্র)।

এটি কোনো অভ্যন্তরীণ বিপ্লব ছিল না, বরং ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক প্রক্সি চক্রান্ত।

শ্রেণিশত্রু খতমের মনস্তত্ত্ব ও গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড

সিরাজ সিকদারের ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’র সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল গ্রামীণ জনপদে। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও মাওসেতুংয়ের চিন্তাধারার একটি উগ্র ও বিকৃত সংস্করণ তৈরি করে তারা ‘শ্রেণিশত্রু খতমের’ যে রাজনীতি শুরু করেছিল, তার শিকার কোনো বড় পুঁজিপতি বা শোষক ছিল না।

তৃণমূলের মেধা ধ্বংস: গ্রামের মুরুব্বি, বর্ধিষ্ণু কৃষক, স্থানীয় স্কুলশিক্ষক, পোস্টমাস্টার কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের তারা ‘শোষক শ্রেণী’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করত। এর ফলে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় এক ধরনের নেতৃত্বহীনতা ও চরম আতঙ্ক তৈরি হয়।

উৎপাদন ব্যাহত করা: কোনো কৃষক বা ছোট ব্যবসায়ী জীবননাশের ভয়ে কোনো বিনিয়োগ বা ফসল উৎপাদনের সাহস পেতেন না, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল।

জাসদের ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা

জাসদ কেবল বেসামরিক ক্ষেত্রে গণবাহিনী দিয়ে নাশকতা চালাচ্ছিল না, তাদের সবচেয়ে বড় এবং বিপজ্জনক চালটি ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে। কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে তারা সেনাবাহিনীর ভেতরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামক একটি গোপন সেল গঠন করে।

শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও উসকানি: তারা সাধারণ সৈনিক বা সিপাহিদের উসকে দিয়ে বলত যে, অফিসারদের কোনো নির্দেশ মানা যাবে না। তারা অফিসার ও সিপাহিদের মধ্যকার চিরাচরিত সামরিক শৃঙ্খলা ভেঙে একটি ‘শ্রেণিহীন সেনাবাহিনী’ গঠনের অবাস্তব স্বপ্ন দেখায়।

১৫ আগস্ট ও নভেম্বর অভ্যুত্থানের পথ সুগম: সেনাবাহিনীর ভেতরের এই সুপ্ত বিশৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগটিই পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের খুনি মেজররা এবং ৩রা ও ৭ই নভেম্বরের ক্যু-র নায়কেরা গ্রহণ করেছিলেন। জাসদের এই প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ঘাত মূলত সামরিক বাহিনীকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার পথ প্রশস্ত করে দেয়।

১৯৭৪ সালের জাসদ গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার রাজনৈতিক ইশতেহার থেকে কর্নেল আবু তাহের বলেন, "আমরা কেবল সরকার পরিবর্তন চাই না, আমরা প্রচলিত বুর্জোয়া রাষ্ট্রকাঠামো এবং সেনাশৃঙ্খলা ভেঙে একটি 'শ্রেণীহীন সৈনিক সংস্থা' ও বিপ্লবী সেনাবাহিনী গঠন করতে চাই।"

মার্কিন সাময়িকী 'ফার ইস্টার্ন ইকনোমিক রিভিউ' এর তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট লেখক লরেন্স লিফশুলজ মন্তব্য করেন, "১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের নেপথ্যে শুধু গুটিকয়েক সেনাসদস্য ছিল না; আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের ভেতরের উগ্র-বাম ও ছদ্মবেশী শক্তিসমূহ মিলে একটি দীর্ঘমেয়াদী অভ্যুত্থানের পথ সুগম করেছিল।"

রক্ষীবাহিনীর আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রোপাগান্ডা

বঙ্গবন্ধুর সরকারকে দানবীয় প্রমাণ করার জন্য জাসদের মুখপত্র ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ (যার সম্পাদক ছিলেন কবি আল মাহমুদ) এবং সর্বহারা পার্টির গোপন লিফলেটগুলো ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’কে একটি কুখ্যাত ও অবৈধ বাহিনী হিসেবে প্রচার করত। কিন্তু এর আসল আইনি ও প্রশাসনিক সত্যটি ছিল ভিন্ন।

রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত প্যারামিলিটারি ফোর্স। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে রক্ষীবাহিনীর আদলে বিশেষায়িত প্যারামিলিটারি ফোর্স রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিকৃত এবং প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া অধ্যায়গুলোর একটি এই রক্ষীবাহিনী।

জাসদের গণকন্ঠ ও সিরাজ সিকদারের অনুসারীরা গুজব ছড়িয়ে দেয় “বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন”। এমন একটা নিকৃষ্ট মিথ্যাচার তথ্য ছড়িয়ে তৎকালীন সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়। দেশের বিশেষ অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলার জন্য একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড এবং বিশ্বস্ত বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ভাবনারই ফসল ছিল “জাতীয় রক্ষীবাহিনী”।

দেশপ্রেমিক রক্ষীবাহিনী: রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, তারা কেউ প্রথাগত ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি সামরিক একাডেমির বিলাসবহুল ব্যারাকে বছরের পর বছর কুচকাওয়াজ করা পেশাদার সৈনিক ছিলেন না। এই বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন ছাত্র বা তরুণ বয়সের। তারা যুদ্ধের আগে কোনোদিন অস্ত্র ছুঁয়েও দেখেননি।

বঙ্গবন্ধু এই বীর সন্তানদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসন এবং একই সাথে তাদের ভেতরের অদম্য দেশপ্রেমকে দেশের কাজে লাগানোর জন্য রক্ষীবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। এরা প্রথাগত সামরিক বাহিনীর মতো সুযোগ-সুবিধা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন না। সেনা, পুলিশ বা ইপিআরের মধ্যে যেখানে পদোন্নতি, খাই খাই স্বভাব, পাওয়া না-পাওয়া এবং পাকিস্তান ফেরত সেনা অফিসার বনাম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনা অফিসারদের মধ্যে ক্ষমতার তীব্র কোন্দল ছিল, জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে তেমন কোনো অসন্তোষ বা শৃঙ্খলাভঙ্গ ছিল না। তারা ছিলেন দেশপ্রেমের পাগল এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।

লজিস্টিক্যালি দুর্বল বাহিনী: রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত হালকা পদাতিক বাহিনী। তাদের হাতে মূলত থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, হালকা সাব-মেশিনগান (SMG) এবং টহল যানবাহন ছিল। রক্ষীবাহিনীর কোনো নিজস্ব গোয়েন্দা শাখা (Intelligence Wing) বা ভারী যুদ্ধাস্ত্র ছিল না। তারা মূলত পুলিশ ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করত।

গুজবের ঢাল: যখনই কোনো চরমপন্থী ব্যাংক লুট করতে গিয়ে বা থানা আক্রমণ করতে গিয়ে রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহত হতো, তখনই চরমপন্থী মিডিয়াগুলো সেটিকে ‘সাধারণ জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় জুলুম’ বা ‘ভুয়া এনকাউন্টার’ হিসেবে রঙ চড়িয়ে প্রচার করত। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মূল লক্ষ্যই ছিল সাধারণ মানুষের মন থেকে সরকারের প্রতি নৈতিক সমর্থন তুলে নেওয়া।

"পেশাদার সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনীকে প্রধান সামরিক বাহিনী বানানো হবে" এমন কৃত্রিম গুজব ডাকু সিরাজের অনুসারীরা সেনানিবাসগুলোতে নিয়মিত ছড়িয়ে দিতো। সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করতে তারা সেনানিবাসগুলোতে লিফলেট বিলি করে অপপ্রচার করতো যে “রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি বাজেট পায়”। অথচ একটি প্যারামিলিটারি ফোর্স দিয়ে পুরো সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপনের দাবি ভিত্তিহীন ও অবাস্তব। তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ বলেন, “রক্ষীবাহিনীর সদস্য-সংখ্যা ১২০০০ হলেও সর্বত্র প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল তাদের সংখ্যা লক্ষাধিক।”

১৯৭৪ সালের বন্যা ও লঙ্গরখানায় অন্তর্ঘাত

১৯৭৪ সালের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ও বন্যা পরিস্থিতিকে এই প্রক্সি গ্রুপগুলো তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

ত্রাণ বিতরণ ও লঙ্গরখানায় হামলা: বঙ্গবন্ধু যখন দেশজুড়ে হাজার হাজার লঙ্গরখানা খুলে লাখ লাখ মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা সেই সব লঙ্গরখানায় আক্রমণ করে চাল-ডাল লুট করে নিয়ে যেত।

কালোবাজারি ও চোরাচালানের পৃষ্ঠপোষকতা: দেশের সীমান্ত এলাকায় চাল ও পাট পাচারের পেছনে এই চরমপন্থী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ ছিল। তারা সীমান্তকে অস্থিতিশীল রেখে চোরাচালানিদের নিরাপত্তা দিত, যাতে দেশের ভেতরের খাদ্যসংকট আরও তীব্র রূপ নেয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে কিসিঞ্জারের তত্ত্ব অনুযায়ী প্রমাণ করা যায়।

বাকশাল ও চক্রান্তের চূড়ান্ত মুহূর্ত

১৯৭৫ সালে দেশের জরুরি পরিস্থিতিতে গৃহীত ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বা বাকশাল ব্যবস্থাকে জাতীয় ঐক্যের সাময়িক কাঠামোর পরিবর্তে একদলীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত হিসেবে অপপ্রচার করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলিলপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাকশাল ছিল মূলত একটি ‘জরুরি জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমকালীন গবেষকদের মতে, বাকশাল কোনো চিরস্থায়ী একদলীয় একনায়কতন্ত্র বা আজীবন ক্ষমতায় থাকার চক্রান্ত ছিল না। সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রকে গৃহযুদ্ধতুল্য বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষা করার জরুরি ব্যবস্থা।

বাকশাল ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধু নিজেই সংসদে দেওয়া ভাষণে অত্যন্ত কান্নাভরা কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে, “এটি তার সারাজীবনের রাজনৈতিক আদর্শের পরিপন্থি, কিন্তু দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং স্বাধীনতা রক্ষা করার বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকে এই কঠোর পথ বেছে নিতে হয়েছে।”

২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫ জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "আমরা যখন চোরাচালান বন্ধ করতে যাই, যখন ব্যাংক লুট আর পাটের গুদামে আগুন দেওয়া বন্ধ করতে যাই, তখন একদল লোক গণতন্ত্রের দোহাই দেয়। কোন গণতন্ত্র? যে গণতন্ত্র আমার মানুষকে না খাইয়ে মারে? চরমপন্থী, চোরাচালানি আর দুর্নীতিবাজদের দমন করে মেহনতি মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই আমার দ্বিতীয় বিপ্লব।"

চারদিক থেকে যখন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব খামচে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তখন সমস্ত শক্তিকে একীভূত করে এই নৈরাজ্যবাদীদের কঠোর হস্তে দমন করার শেষ চেষ্টা ছিল বাকশাল। বাকশাল গঠনের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই চোরাচালান বন্ধ হয়ে আসে, থানা লুট ও পাটের গুদামে আগুন দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং ফসলের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

বাকশালের কল্যাণে দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটাতে শুরু করে এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও চোরাচালান কমে যেতে শুরু করে। কিন্তু বাকশালের সুফল পাওয়ার আগেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হন। পরবর্তীতে খুনীচক্র ও ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তা সরকারগুলো তাদের অবৈধ শাসনকে বৈধ করতে বাকশালকে ‘চিরস্থায়ী স্বৈরতন্ত্র’ বলে অপপ্রচার ও মিথ্যাচার ছড়াতে থাকে যা আজও বিদ্যমান।

কেন বর্তমান প্রজন্ম সিরাজ সিকদারকে গুরু মানে?

এখানে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্ন উঠতে পারে কেন ২০২৪ পরবর্তী বা বর্তমানের এই নতুন বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ সিরাজ সিকদারকে তাদের ‘আইডল’ বা রাজনৈতিক গুরু বলে ডাকছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বন্দনা করছে?

এর মূল উত্তরটি লুকিয়ে আছে এই প্রজন্মের একটি বড় অংশের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা এবং ইতিহাসের গভীরতাহীনতার মধ্যে। একটি স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার জন্য যে ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম, নিয়মতান্ত্রিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজন হয় তা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। পক্ষান্তরে, যেকোনো প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে ধ্বংস বা ভাঙচুর করার মধ্যে এক ধরনের সস্তা, আদিম ও বিকৃত রোমাঞ্চ (Romanticism) থাকে। সিরাজ সিকদারের ব্যাংক ডাকাতি, গেরিলা কায়দায় আক্রমণ ও রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসবাদের মধ্যে এই তরুণরা সেই ক্ষণস্থায়ী ও হঠকারী রোমাঞ্চ খুঁজে পায়।

সিরাজ সিকদারের ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে পুলিশ হেফাজতে নিহত হওয়াকে তারা আজ ‘রাজনৈতিক শাহাদাত’ হিসেবে জাস্টিফাই বা বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করছে। অথচ তারা সম্পূর্ণ সচেতনভাবে ইতিহাসের এই পাতাটি এড়িয়ে যায় যে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার বা নিহত হওয়ার আগে সিরাজ সিকদার ও তাঁর বাহিনী কতজন নিরপরাধ পুলিশ সদস্য, দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা এবং মেহনতি গ্রামীণ মানুষকে নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করেছিলেন। তাদের সেই সশস্ত্র ডাকাতি, নৈরাজ্য ও থানা লুটের জঘন্য ঘটনাগুলোকে আজ স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আওয়ামী লীগের বিরোধিতার খাতিরে ‘বিপ্লবী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে রঙ চড়িয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা ইতিহাসের সাথে এক চরম প্রতারণা।

ইতিহাসের শিক্ষা ও আমাদের ভবিষ্যৎ

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের এই রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের অত্যন্ত কঠোর ও মূল্যবান একটি শিক্ষা দেয়। শিক্ষাটি হলো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলা যতটা কঠিন ও তিল তিল কষ্টের ব্যাপার, সুদূর করাচি বা বেইজিংয়ের প্রেসক্রিপশনে তাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করা তার চেয়েও অনেক সহজ। সিরাজ সিকদার কিংবা তাঁর ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’ কখনোই বাংলাদেশের সাধারণ ও মূলধারার মানুষের হৃদয়ে স্থান পায়নি এবং পাবেও না। কারণ তাদের রাজনীতির নাড়ির টান এই মাটির সাথে ছিল না; তাদের টান ছিল বেইজিংয়ের মাওবাদী তত্ত্ব আর করাচির পাকিস্তানি ডলারে।

আজ বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যাঁরা নতুন করে বিভাজন, সমাজকে অস্থিতিশীল করা এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে ধ্বংস করার রাজনীতি করছেন, তাঁদের চিনে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। ইতিহাস বারবার ফিরে আসে না, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা যারা বারবার ভুলে যায়, একটি জাতিকে তার জন্য চরম এবং দীর্ঘমেয়াদী মূল্য দিতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা ফেরেশতা ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন এই বাংলার খাঁটি মাটির মানুষ, যাঁর প্রতিটি ধূলিকণায় ছিল এ দেশের মানুষের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা। আর সিরাজ সিকদাররা ছিলেন সেই ভ্রান্ত, ধার করা ও চাপিয়ে দেওয়া প্রক্সি বিপ্লবের প্রতিনিধি যা স্বাধীন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে কেবলই পেছনে টেনে নিয়ে গিয়েছিল এবং একটি মহান জাতির স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার চক্রান্ত করেছিল।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.