১৯৭২-৭৫ সিরাজ সিকদার, সর্বহারা পার্টি এবং বিদেশী ষড়যন্ত্র
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখন চারদিকে ছিল কেবল ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে যে কেবল পুনর্গঠনের স্বপ্ন ছিল তা নয়, বরং ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের বীজ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিতর্কিত চরিত্রগুলোর একজন হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি'।

TruthBangla
Jan 25, 2026
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখন চারদিকে ছিল কেবল ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে যে কেবল পুনর্গঠনের স্বপ্ন ছিল তা নয়, বরং ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের বীজ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিতর্কিত চরিত্রগুলোর একজন হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি'। আজ যখন আমরা বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে নতুন কোনো বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি, তখন ১৯৭২-৭৫ এর সেই সময়কালকে ফিরে দেখা জরুরি। সিরাজ সিকদার কি আসলেই কোনো বিপ্লবী ছিলেন, নাকি তিনি ছিলেন পাকিস্তান ও চীনের এক ছদ্মবেশী প্রক্সি?
জাতিসংঘের ভেটো ও চীনের দালালির আড়ালে 'বিপ্লব'
স্বাধীনতার পর পর বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছিল, তখন চীন ছিল অন্যতম প্রধান বাধা। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশের আবেদনে চীন ভেটো দেয়। সাধারণ মানুষের মনে যখন চীনের প্রতি তীব্র ক্ষোভ, তখন সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি সেই ভেটোকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়।
সিরাজ সিকদার দাবি করেছিলেন, চীন সঠিক কাজ করেছে এবং যারা এর বিরোধিতা করছে তারা মূলত ‘চীন-বিরোধী’ জনমত তৈরির চেষ্টা করছে। ইতিহাসের পরিহাস হলো, যারা আজ ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’ নিয়ে বড় বড় কথা বলেন, তাদের আদর্শিক গুরু সিরাজ সিকদার সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি আটকাতেই ব্যস্ত ছিলেন। এটি কি কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল, নাকি এর পেছনে কাজ করছিল বেইজিংয়ের সরাসরি প্রেসক্রিপশন? তথ্যপ্রমাণ বলে, সে সময়কার পিকিংপন্থী বামেরা মনে করত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল ভারতের একটি ষড়যন্ত্র, যা তাদের ভাষায় ছিল ‘দুই কুকুরের লড়াই’।
'জয় বাংলা' বনাম 'জয় পূর্ব বাংলা' - স্লোগানের অন্তরালে বিচ্ছিন্নতাবাদ
বর্তমান সময়ের কিছু বুদ্ধিজীবী ও মাহফুজ আলম বা নাহিদ-আসিফদের মতো নতুন যুগের বামপন্থী তাত্ত্বিকেরা প্রায়ই একটি জগাখিচুড়ি পাকানো যুক্তি দেন। তারা দাবি করেন, শেখ মুজিবুর রহমান ‘সেগ্রেগেশনিস্ট আইডলজির’ (বিচ্ছিন্নতাবাদী আদর্শ) ছিলেন বলে ভারতের দালালি করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ আমাদের হয়নি। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাদেরই আদর্শিক পিতা সিরাজ সিকদার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
সিরাজ সিকদারের যুক্তি ছিল, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি বৃহত্তর বাংলার ধারণা দেয় এবং এর ফলে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বাংলাদেশে ঢুকে পড়বে। এই আশঙ্কা থেকেই তিনি ‘জয় পূর্ব বাংলা’ স্লোগানকে জাতীয় মুক্তির সঠিক প্রতীক হিসেবে প্রচার করেন। অর্থাৎ, একদিকে ভারতবিদ্বেষ আর অন্যদিকে পাকিস্তানের কাঠামোকে মানসিকভাবে ধারণ করা এই ছিল সিরাজ সিকদারের রাজনীতির মূল ভিত্তি। যারা আজ বঙ্গবন্ধুকে ভারতের দোসর বানাতে চান, তারা কি জানেন সিরাজ সিকদাররা কীভাবে একটি স্বাধীন দেশকে অস্থিতিশীল করতে ভাষাগত ও আদর্শিক বিভাজন তৈরি করেছিলেন?
পাকিস্তানি ফান্ডিং ও চিনা বামপন্থার গোপন আঁতাত
সিরাজ সিকদার এবং তার দলের সাথে পাকিস্তানের আর্থিক ও সামরিক সম্পর্কের বিষয়টি আর এখন গোপন কোনো গুঞ্জন নয়। বিভিন্ন লিকড ডকুমেন্ট এবং তৎকালীন গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, সর্বহারা পার্টির অপারেশনগুলোর পেছনে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় সমর্থন ছিল। স্বয়ং সর্বহারা পার্টির নেতারাই বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন যে তাদের আন্দোলনের পেছনে পাকিস্তানি অর্থের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘চিনা বাম’ মানেই ছিল পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা। চীন সে সময় পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছিল এবং বাংলাদেশে অস্থিরতা বজায় রাখা ছিল পাকিস্তানের প্রতিশোধমূলক রাজনীতির অংশ। ব্যাংক ডাকাতি, থানা লুট আর সাধারণ মানুষ হত্যার মাধ্যমে সিরাজ সিকদাররা যে ‘বিপ্লব’ করতে চেয়েছিলেন, তার রসদ আসত সেই দেশ থেকে যারা আমাদের ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল। এটিই কি বিপ্লবের সংজ্ঞা?
ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও মৈত্রী চুক্তির অপব্যাখ্যা
আজকের দিনের জামাত-শিবির বা আরিফ রহমান-মেঘমল্লারের মতো নতুন যুগের বামেরা প্রায়ই দাবি করেন যে মুজিব ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তাদের এই প্রোপাগান্ডার উৎস কিন্তু সেই ১৯৭২ সালের সিরাজ সিকদারদের ছড়ানো গুজব।
অথচ ঐতিহাসিক সত্য এই যে, ১৯৭২ সালের ১২ মার্চ তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। বিশ্ব ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা যে কোনো মিত্রবাহিনী এত দ্রুত কোনো দেশ ত্যাগ করেছে।
ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিটি ছিল মূলত একটি নবজাতক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায়।
সিরাজ সিকদাররা গোপনে জানতেন যে ভারতীয় সেনাবাহিনী চলে গেছে, কিন্তু তারা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে প্রচার করতেন যে ভারতীয় সৈন্যরা সিভিল পোশাকে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের লক্ষ্য ছিল ভারতবিদ্বেষী সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করা।
সর্বহারাদের দ্বিমুখী চরিত্র - নারী অধিকার ও বিপ্লবী মেকি
সিরাজ সিকদার ও তার অনুসারীরা মুখে সাম্যবাদ ও নারী অধিকারের কথা বললেও বাস্তবে তাদের কর্মকাণ্ড ছিল ঠিক উল্টো। তাদের দলে মেয়েদের ভূমিকা ছিল কেবল রান্নাবান্না বা ঘরোয়া কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। মুখে 'ইকুয়ালিটি'র বুলি আউড়ে ঘরে নারীদের পর্দানশীন করে রাখার যে সংস্কৃতি আজ আমরা চরমপন্থী দলগুলোর মধ্যে দেখি, তার সূচনা ছিল সর্বহারাদের হাতেই। বিপ্লবের নামে তারা নিজেদের পরিবারের নারীদের ঘরের কোণে বন্দি করে রেখে বাইরে নারী মুক্তির শ্লোগান দিত এটাই ছিল তাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড।
উইকিলিকস ও ১৫ আগস্টের নেপথ্য পরিকল্পনা
সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং ভয়ংকর তথ্যটি পাওয়া যায় উইকিলিকসের লিকড ডকুমেন্টে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে ফারুক-রশিদ-ডালিম গং যদি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করতে ব্যর্থ হতো, তবে সেই দায়িত্বটি পালন করার জন্য প্রস্তুত ছিল সিরাজ সিকদার এবং সিরাজুল আলম খানের অনুসারীরা।
১৯৭৪ সালের দিকে মুজিব সরকারকে উৎখাত করার জন্য পাকিস্তান থেকে বড় অংকের অর্থ সহায়তা গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সিঙ্গাপুরে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের সাথে সিরাজ সিকদারের দলের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বৈঠকের বর্ণনাও এখন আর গোপন নেই। নির্দিষ্ট অংকের টাকার বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার এই চুক্তিই প্রমাণ করে যে, তারা কখনোই দেশের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না।
ষড়যন্ত্রের অংকসমূহ:
স্থান: সিঙ্গাপুর এবং লন্ডন।
উদ্দেশ্য: সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদ।
সহযোগিতা: পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু উগ্রপন্থী দেশ।
কেন বর্তমান প্রজন্ম সিরাজ সিকদারকে গুরু মানে?
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন ২০২৪ পরবর্তী এই নতুন বিপ্লবী প্রজন্ম সিরাজ সিকদারকে তাদের ‘আইডল’ বা গুরু বলে ডাকছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের অস্থিরতায়। একটি স্বাধীন দেশ গড়ে তোলার চেয়ে ধ্বংস করার মধ্যে যে একধরনের বিকৃত রোমাঞ্চ আছে, সিরাজ সিকদারের ডাকাতি ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে তারা সেই রোমাঞ্চ খুঁজে পায়।
সিরাজ সিকদারের পুলিশ হেফাজতে নিহত হওয়াকে তারা আজ ‘রাজনৈতিক শাহাদাত’ হিসেবে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে। অথচ তারা ভুলে যাচ্ছে, পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার আগে সিরাজ সিকদার কতজন নিরপরাধ পুলিশ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিলেন। তাদের ডাকাতি ও থানা লুটের ঘটনাগুলোকে আজ ‘বিপ্লবী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে রঙ চড়ানো হচ্ছে কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে।
ইতিহাসের শিক্ষা ও আমাদের ভবিষ্যৎ
১৯৭২-৭৫ এর ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা যতটা কঠিন, তাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করা তার চেয়েও সহজ। সিরাজ সিকদার বা সর্বহারা পার্টি কখনোই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান পায়নি, কারণ তাদের নাড়ির টান ছিল করাচি কিংবা বেইজিংয়ের সাথে।
আজ যারা নতুন করে বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি করছেন, তাদের চিনে রাখা প্রয়োজন। ইতিহাস বারবার ফিরে আসে না, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা বারবার ভুললে একটি জাতিকে চরম মূল্য দিতে হয়। বঙ্গবন্ধু কোনো ফেরেশতা ছিলেন না, কিন্তু তিনি এই মাটির মানুষ ছিলেন। আর সিরাজ সিকদাররা ছিলেন সেই ভ্রান্ত বিপ্লবের প্রতিনিধি, যা আমাদের কেবল পেছনে টেনে নিয়ে গেছে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















