ছাত্রশিবির কি আসলেই রগ কাটে? কতজনের রগ কেটেছে ছাত্রশিবির?
ছাত্রশিবির কি আসলেই রগ কাটে? কতজনের রগ কেটেছে ছাত্রশিবির? বাংলাদেশি ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে সহিংসতা এক কলঙ্কিত অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার লড়াইয়ের চেয়ে পেশিশক্তির মহড়া বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছে চরম নৃশংসতার। সেটি হলো 'বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির'। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছাত্র সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে 'রগ কাটা' ও নৃশংস নির্যাতনের রাজনীতির জন্য।

TruthBangla
Jan 31, 2026
ছাত্রশিবির কি আসলেই রগ কাটে? কতজনের রগ কেটেছে ছাত্রশিবির? বাংলাদেশি ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে সহিংসতা এক কলঙ্কিত অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার লড়াইয়ের চেয়ে পেশিশক্তির মহড়া বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অভিযোগ উঠেছে চরম নৃশংসতার। সেটি হলো 'বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির'। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ছাত্র সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে 'রগ কাটা' ও নৃশংস নির্যাতনের রাজনীতির জন্য।
বিগত চার দশক ধরে এই সংগঠনটি তাদের রাজনীতির প্রসারে মেধা বা যুক্তির চেয়ে পেশিশক্তি এবং নির্মমতাকে বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া এবং বর্বরোচিত হত্যার মাধ্যমে তাদের শিক্ষাঙ্গনে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে দেখা গেছে।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে শিবিরের সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী। এই ব্লগে আমরা শিবিরের সেই বিতর্কিত ও সহিংস ইতিহাসের কিছু ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরব।
ছাত্রশিবিরের পরিচিতি
ছাত্রশিবির বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন। ১৯৭১ এর পূর্বে জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংস্থার নাম ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘ। পাকিস্তান আমলে এই দলটির পূর্ব নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘ (ইসলামী জমিয়তে-ই-তালাবা পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান শাখা)। মুসলিম ছাত্র ব্যতীত কেউ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য হতে পারেনা। ছাত্র সংঘের নেতা-কর্মীদের দিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গঠিত হয় কুখ্যাত সশস্ত্র আলবদর ও আল শামস নামে আধা সামরিক সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী। যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগণিত গণহত্যা করে। ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল এ সংগঠনটি।
ছাত্রশিবিরের রগ কাটার সূচনা
একাত্তরের ঘৃন্য গণহত্যার জন্য নিষিদ্ধ থাকার পর ইসলামী ছাত্রসংঘ থেকে নাম পাল্টিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির নামকরণ করে রাজনীতি শুরু করে। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবিরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মোড়কে যাত্রা শুরু করলেও প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই সংগঠনটি চরমপন্থী ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ড শুরু করে। মূলত চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তারা তাদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং সেখানে বিরোধী মত দমনে শুরু করে নৃশংসতা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ তথ্যানুযায়ী, ১৯৮১ সাল থেকে পরবর্তী ৩২ বছরে শিবির প্রায় ৩২ জনের অধিক ছাত্রনেতাকে হত্যা করেছে এবং শতাধিক রগ কাটার ঘটনা ঘটিয়েছে। শিবির রগ কাটার জন্য কুখ্যাত হলেও নতুন প্রজন্ম তথা জেনজি প্রজন্ম তাদের বর্বরতা সমন্ধে ততোটা অবগত নয়। চলুন নজর দেয়া যাক শিবিরের বর্বর রগ কাটার কুখ্যাত ইতিহাসের দিকে।
আশির দশকে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের বিভীষিকা
ছাত্রশিবিরের খুনের রাজনীতির সূচনা হয় ১৯৮১ সালে। চট্টগ্রাম ছিল শিবিরের প্রধান ঘাঁটি। সেখান থেকেই তারা তাদের ‘কিলিং স্কোয়াড’ তৈরি করে বলে তৎকালীন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তবারক হোসেন হত্যা: সেই বছর চট্টগ্রাম সিটি কলেজের তৎকালীন নির্বাচিত এজিএস এবং ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা। ১৯৮১ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে ঘিরে ধরে শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা। অত্যন্ত নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পয়ের রগ কেটে তাকে হত্যা করা হয়। এলোপাতাড়ি কোপে গুরুতর আহত তবারক হোসেন যখন পানি পানি করে কাতরাচ্ছিলো তখন শিবিরকর্মীরা তাঁর মুখে প্রস্রাব করে দেয়।
এটিই ছিল প্রকাশ্য রাজনীতিতে শিবিরের প্রথম বড় কোনো হত্যাকাণ্ড। এর আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বা আদর্শিক দ্বন্দ্বে সংঘর্ষ হলেও, এভাবে পরিকল্পিতভাবে ‘টার্গেট কিলিং’ করার ঘটনা ছিল এই প্রথম। এই সময়েই মূলত 'রগ কাটা' শব্দের সাথে পরিচিত হয় এদেশের সাধারণ মানুষ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মীর মোশতাক এলাহী হত্যা: চট্টগ্রামের পর শিবিরের পরবর্তী বড় টার্গেট হয়ে ওঠে উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ভয়াবহ হামলায় নিহত হন ছাত্রলীগ নেতা মীর মোশতাক এলাহী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৩টি যাত্রীবাহী বাস ভর্তি বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে শিবির ক্যাডাররা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এই সহিংস ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
রাজশাহীতে এটিই ছিল তাদের প্রথম বড় আঘাত। এরপর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য ও টর্চার সেলে পরিণত হয়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা শিবিরের ভয়ে আতংকিত থাকতো। শিবিরের সন্ত্রাসীরা হলে হলে তল্লাশি চালাতো এবং সাধারণ ছাত্রদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতো।
শাহাদাত হোসেনকে জবাই করে হত্যা: ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে ছাত্র শিবিরের নৃশংসতা আরও বৃদ্ধি পায়। চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হলে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র শাহাদাত হোসেনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে আহত হয় অসংখ্য ছাত্রলীগ কর্মী ও সাধারণ ছাত্র। মেধাবী এই ছাত্রের মৃত্যুতে তৎকালীন ছাত্র সমাজে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
আবদুল হামিদের হাতের রগ কাটা: ১৯৮৬ সালে জাতীয় ছাত্রসমাজের নেতা আবদুল হামিদের ডান হাতের কবজি কেটে ফেলার মাধ্যমে শিবির তাদের নিষ্ঠুরতার চরম সীমা প্রদর্শন করে। পরবর্তীতে ওই কর্তিত হাত বর্ষার ফলায় গেঁথে তারা উল্লাস প্রকাশ করে।
১৯৮৮ - শিবিরের নৃশংসতম বছর
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে আশির দশকের শেষভাগ ছিল অত্যন্ত অস্থির। একদিকে স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন, অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারের নামে সশস্ত্র দখলদারিত্ব। এই দখলদারিত্বের লড়াইয়ে সবচেয়ে হিংস্র ছিল ইসলামী ছাত্রশিবির। ১৯৮৮ সালে তাদের পরিকল্পিত আক্রমণ এবং হত্যাকাণ্ডের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে, একে শিবিরের ইতিহাসের ‘নৃশংসতম বছর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। রাজশাহী থেকে সিলেট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম সর্বত্রই শিবিরের ক্যাডাররা তৈরি করেছিল এক ত্রাসের রাজত্ব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা হত্যা: ১৯৮৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে তৎকালীন জাসদ নেতা এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জালালকে তাঁর নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। তাঁর খণ্ডিত মাথা তাঁর বাড়ির প্রধান দরজার সামনে পুরো দিন ঝুলিয়ে রাখে। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ছাত্রশিবিরের আদর্শিক অবস্থান সবসময়ই ছিল বিরোধী। দিনের আলোয় তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
জামিল আক্তার রতনের হাত পায়ের রগ কাটা: ১৯৮৮ সালে ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে ও হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। জামিল আক্তার রতন ছিলেন একজন প্রতিশ্রুতিশীল চিকিৎসক ও ছাত্রনেতা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ প্রধান ছাত্রাবাসের সামনে কলেজের প্রিন্সিপাল ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ ও শত শত শিক্ষার্থীদের সামনে তাকে হত্যা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে আহত হয় অসংখ্য ছাত্রলীগ ও ছাত্রমৈত্রীর কর্মীরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা: ১৯৮৮ সালের জুলাইর প্রথম সপ্তাহ। বহিরাগত শিবির ক্যাডারদের হামলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমির আলী হল ছাত্র সংসদের জিএস ও জাসদ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্সসহ ২০ থেকে ২৫ জন গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে। দুইজনের রগ কেটে দেয় ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা।
১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই ভোর সাড়ে চারটার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ্ মাখদুম হলে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা হামলা চালায় এবং জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ূব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। এই ঘটনায় প্রতিবাদ করতে আহত হয় ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী।
ছাত্রনেতা আসলাম হোসেন হত্যা: ১৯৮৮ সালের ১৭ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ছাত্রদের ওপর হামলা চালায় শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। সেই হামলায় ছাত্রনেতা আসলাম হোসেনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
আজগর আলী হত্যা: পরের দিন অর্থাৎ ১৮ নভেম্বর শিবিরের সন্ত্রাসীরা পুনরায় হামলা করে মেধাবী ছাত্র আজগর আলীকে কুপিয়ে হত্যা করে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই-দুইজন ছাত্রকে হারানো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক বিরল ও মর্মান্তিক ঘটনা। সেই সময় সাধারণ ছাত্ররা প্রাণভয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। শিবিরের আতংকে পুরো ক্যাম্পাস ছাত্রশূন্য হয়ে পড়েছিল।
শিক্ষকদের ওপর হামলা: শুধু ছাত্র নয়, শিবিরের হাত থেকে রেহাই পাননি শিক্ষকরাও। শিবিরের জোড়া খুনের বিরুদ্ধে কথা বলায় ওই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনূসের বাসভবনে ভয়াবহ গ্রেনেড বোমা হামলা চালানো হয়। এ বোমা হামরায় তাঁর বাড়ির কর্মচারী আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে। এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষকরা যেন তাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস না পায়। পরবর্তী সময়ে এই অধ্যাপক ইউনূসকেই ২০০৪ সালে জামাত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে।
সিলেটের তিন নেতা হত্যা
১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেটের রাজনীতিতে এক কলঙ্কজনক ও ভয়াবহ দিন। সিলেটের তৎকালীন প্রগতিশীল রাজনীতির তিন প্রধান মুখ ছিলেন মুনীর-ই-কিবরিয়া চৌধুরী (তৎকালীন জাসদ নেতা), তপন জ্যোতি (ছাত্রলীগ নেতা) এবং এনামুল হক জুয়েল (ছাত্রলীগ নেতা)। ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছিলেন তারা। ছাত্রশিবিরের বিশাল সশস্ত্র বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায় এবং প্রকাশ্য দিবালোকে সড়কে তাদের গুলি করে হত্যা করে। হত্যার পর তাদের মৃতদেহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। সিলেটের সাধারণ মানুষ দলমত নির্বিশেষে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছিল।
গোলাম মোস্তফার রগ কাটা: ১৯৮৯ সালের রমজান মাস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র গাজী গোলাম মোস্তফাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী চপাড়ায় ইফতারের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়ে হাতের রগ কেটে দেয় ছাত্র শিবির ক্যাডাররা, আজও পঙ্গুত্ব নিয়েই বেঁচে আছেন তিনি।
জাসদ নেতাদের উপর বোমা হামলা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে সন্ধ্যায় জাসদ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ওপর শিবিরের বোমা হামলায় দুইজন নিহত এবং ছাত্রনেতা বাবু, রফিকসহ ১০ জন আহত হয়।
নব্বইয়ের দশক - ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক সময়েও শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি। এই সময়ে শিবিরের রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায় 'রগ কাটা'। প্রতিপক্ষকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার এই ভয়াবহ নৃশংসতা তৎকালীন সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতংকিত থাকতো। নব্বইয়ের দশকের শুরুটা হয়েছিল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ক্যাম্পাসগুলোতে নিজেদের ক্ষমতা জানান দিতো।
ফারুকুজ্জামান হত্যাকাণ্ড: ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমৈত্রীর সহ-সভাপতি ফারুকুজ্জামানকে জবাই করে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। তাঁর খণ্ডিত মাথা প্রকাশ্য রাস্তায় দুই ঘন্টা রেখে দেয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের একাধিপত্য বিস্তারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফারুকুজ্জামান। এই হত্যাকান্ডের পর চবিতে শিবিরের দীর্ঘমেয়াদী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের তান্ডব: ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র শিবির সভাপতি সৈয়দ জাকিরের (বর্তমানে এ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স-এর প্রকাশক) নেতৃত্বে কুখ্যাত সিরাজুস সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক হাজার সশস্ত্র বহিরাগত ছাত্র শিবির সন্ত্রাসী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেলা ১১ টার সময় অতর্কিত হামলা চালালে ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত পিটু নিহত হয় এবং ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো, জাফু, ফারুক এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের রাজেশসহ প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। এদের অনেকেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়। এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা শাহ্ মাখদুম হল, আনোয়ার হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিলো। লতিফ হলের অনেকগুলো কক্ষ এখনো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এই হামলার তীব্রতা এতটাই ছিলো যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা রাত ৩টায় বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি।
ছাত্রীসংস্থা নেত্রীর বোমা হামলা: ছাত্র শিবিরের ছাত্রী শাখা ইসলামী ছাত্রী সংস্থা রাজশাহী কলেজ শাখার নেত্রী মুনীরা বোমা বহন করার সময় বিষ্ফোরণে মারা যায় এবং তার সহযাত্রী-সহকর্মী আপন খালা এবং ওই রিকশাওয়ালা আহত হয়, এই মুনীরা ওই সময়ে আটজন সাধারণ মানুষকে বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে হত্যা করে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনে হামলা ও মুকিম হত্যাকাণ্ড: ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের ঢেউ যখন ক্যাম্পাসগুলোতে শুরু হলে তখন সরাসরি রাজাকারদের পক্ষ নিয়ে সশস্ত্র মাঠে নামে শিবির। ১৯৯২ সালে জামায়াত-শিবিরের হামলায় গুরুতর আহত হন জাসদ নেতা মুকিম। হাসপাতালের বিছানায় পাঁচ দিন যন্ত্রণার সাথে লড়াই করে অবশেষে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বোমা বানানোর সময় শিবির সন্ত্রাসী নিহত: ১৯৯২ সালের আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী নতুন বুথপাড়ায় শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়িতে বোমা বানানোর সময় শিবির ক্যাডার আজিবরসহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিনজন নিহত হয়। বিষ্ফোরণে পুরো ঘর মাটির সাথে মিশে যায় এবং টিনের চাল কয়েক’শ গজ দুরে গাছের ডালে ঝুলতে দেখা যায়। পরবর্তীতে পুলিশ মহল্লার একটি ডোবা থেকে অনেকগুলো খণ্ডিত হাত পা উদ্ধার করে। যদিও শিবির সাংগঠনিকভাবে আজিবর ছাড়া আর কারো মৃত্যুর কথা স্বীকার করেনি। পুলিশ বাদী হয়ে মতিহার থানায় শিবির সন্ত্রাসী মোজাম্মেলকে প্রধান আসামী করে বিষ্ফোরক ও হত্যা মামলা দায়ের করে। প্রায় ৫ বছর পলাতক থাকার পর মামলা ম্যানেজ করে মোজাম্মেল এলাকায় ফিরে আসে এবং জামাতের রাজনীতিতে পুনরায় সক্রিয় হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ ছাত্র হত্যা: ১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালালে ছাত্রলীগ ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হামলায় ছাত্রনেতা বিশ্বজিৎ, সাধারণ ছাত্র এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপনসহ ৫জন ছাত্র নিহত হয়।
জুবায়ের রিমুকে রগ কেটে হত্যা: ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ছাত্রমৈত্রী নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়ের হোসেন রিমুকে শিবিরের সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে গিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে কুপিয়ে হত্যা করে। রিমু হত্যার ধরন অনেক বীভৎস ছিল, পুরো দেশে এ হত্যাকান্ড আলোচিত ছিল।
প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতীর হাতের রগ কাটা: শিবিরের নৃশংসতা থেকে নারী শিক্ষার্থীরাও রেহাই পাননি। ১৯৯৪ সালে পরীক্ষা দিতে আসার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রমৈত্রী নেত্রী প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতীর ওপর বর্বরোচিত হামলা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা জনসম্মুখে তার হাতের কবজি কেটে নেয়। একজন নারী শিক্ষার্থীর এমন হামলা সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়েছিল।
দেবাশীষ ভট্টাচার্যকে রগ কেটে হত্যা: ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শিবির কর্মীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সকাল-সন্ধ্যা বাসে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রীর নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে বাসের মধ্যে যাত্রীদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার আগে বর্বর শিবির ক্যাডাররা তাঁর হাত ও পায়ের রগ কেটে নেয়।
আমান উল্লাহ আমানকে রগ কেটে হত্যা: ১৯৯৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংস্কৃতিকর্মী আমান উল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্র শিবিরের ক্যাডারেরা এবং অন্য একজন ছাত্রের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। এদের বাঁচাতে এসে দুইজন সহপাঠী ছাত্রী এবং একজন শিক্ষকও আহত হয়।
চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে রগ কেটে জোড়া খুন: ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দখল করার জন্য শিবির ক্যাডাররা ছাত্র সংসদের ভিপি মোহাম্মদ জমির ও ছাত্রনেতা ফরিদউদ্দিন আহমদকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করার পরেও পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
শিক্ষকের বাসায় বোমা হামলা: ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু পরিষদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি অধ্যাপক আবদুল খালেকসহ প্রায় কুড়িজন শিক্ষকের বাসায় বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে ছাত্র শিবির ক্যাডারেরা।
১৯৯৭ সালে গভীর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আহত করে রগ কেটে দেয়। তাদের অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম পুলিশ ক্যাম্পেও বোমা হামলা করে শিবির ক্যাডারেরা।
অধ্যাপক ইউনুসের উপর বোমা হামলা: ১৯৯৮ সালে শিক্ষক সমিতির মিটিং থেকে ফেরার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে অধ্যাপক মো. ইউনূসের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্র শিবিরের ক্যাডারেরা। ছাত্র-কর্মচারীদের প্রতিরোধে সেই যাত্রায় অধ্যাপক ইউনূস প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হত্যাকান্ড
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছিল শিবিরের প্রধান ঘাঁটি বা 'অভয়ারণ্য'। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় শিবিরের ক্যাডাররা ক্যাম্পাসটিকে তাদের টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করত।
বকুল ও মুসফিকুর সালেহীন হত্যাকাণ্ড: ১৯৯৭ সালে ছাত্রলীগ কর্মী বকুলকে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে চবিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে শিবিরের নৃশংসতা সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাধারণ শিক্ষকদের বহনকারী বাসে শিবিরের ক্যাডাররা অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। এই কাপুরুষোচিত হামলায় মেধাবী ছাত্র মুসফিকুর সালেহীন নিহত হন। শিক্ষকদের বাসে হামলা চালানোর উদ্দেশ্য ছিল ক্যাম্পাসে তাদের কথার বাইরে যাওয়ার সাহস যেন ছাত্র শিক্ষক কেউ না করে।
সঞ্জয় তলাপত্র ও সৌমিত্র বিশ্বাস হত্যাকাণ্ড: ১৯৯৭ সালে একই বছরের শেষের দিকে শিবিরের খুনিরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সিলেটে ব্লু-বার্ড স্কুলের সামনে প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগ নেতা সৌমিত্র বিশ্বাসকে। এর কিছুদিন পরেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সঞ্জয় তলাপত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সঞ্জয় ছিলেন প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির এক নিবেদিত প্রাণ। এই হত্যাকান্ডগুলোর পর চবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশব্যাপী ছাত্রশিবিরকে মানুষজন ঘৃনার দৃষ্টিতে দেখতো।
শিক্ষকের ছেলেকে হত্যা: ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এনামুল হকের ছেলে মোহাম্মদ মুছাকে শিবিরকর্মীরা নৃশংসভাবে হত্যা করে তার মাথা বাসার গেটের সামনে ঝুলিয়ে রাখে।
একই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত একাত্তরের গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য স্থাপিত ভিত্তিপ্রস্তর রাতের আঁধারে ছাত্র শিবির ভাঙতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী বাঁধা দেন। ফলে শিবির ক্যাডাররা তাঁকে কুপিয়ে আহত করে এবং ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে ফেলে।
২০০০ সাল - বহদ্দারহাটের সেই বিভীষিকাময় '৮ খুন'
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম নৃশংসতম দিন ১২ জুলাই ২০০০। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডটি '৮ মার্ডার' হিসেবে পরিচিত।
তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রামে শিবিরের ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিল সন্ত্রাসী নাসির। তার নেতৃত্বাধীন বাহিনী ১২ জুলাই প্রকাশ্য দিবালোকে একটি মাইক্রোবাসকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার শুরু করে। মাইক্রোবাসটিতে ছিলেন ৮ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। তারা একটি মিছিলে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা হয়ে যায় মাইক্রোবাসটি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৮ জন তরুণ। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা আশরাফুল আলম খান হ্যাপী এবং অন্যান্য তরুণ নেতৃবৃন্দ।
বিচার প্রক্রিয়া: এই ঘটনা পুরো দেশব্যাপী আতংকের সৃষ্টি করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৮ সালে চট্টগ্রামের একটি আদালত শিবিরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নাসিরসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পরে হাইকোর্টের মাধ্যমে হত্যাকারীরা জামিন নেয়। সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও পায়নি নিহতের পরিবারেরা। চট্টগ্রামের মানুষের কাছে বহদ্দারহাটের সেই ৮ খুনের স্মৃতি এক জীবন্ত ক্ষত হয়ে আছে।
একবিংশ শতাব্দী এবং আধুনিক শিবিরের নৃশংসতা
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রশিবির লাগামহীন হয়ে পড়ে। দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে এরা সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাস করে।
আলী মর্তুজা হত্যাকাণ্ড: ২০০১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি আলী মর্তুজাকে ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে হত্যা করে ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা। আলী মর্তুজা সাধারণ ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন। মর্তুজা হত্যার পর পুরো ক্যাম্পাসে আতংকজনক পরিবেশ তৈরি হয়।
একই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে এক নজিরবিহীন ঘটনা। শিবিরের সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে 'কমান্ডো স্টাইলে' হামলা চালায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী হলে বহিরাগত অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ছাত্রী বিক্ষোভ করেছিলো তারা। শিবিরের কর্মীরা পর্দা এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে সাধারণ ছাত্রীদের ওপর বর্বর নির্যাতন ও রক্তাক্ত করে। মান্নুজান হলসহ বিভিন্ন হলের সাধারণ ছাত্রীরা সেই রাতে যে বিভীষিকার সম্মুখীন হয়েছিল।
অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে জবাই চেষ্টা: ২০০১ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে ছাত্র শিবির কর্মীরা হাত-পা বেঁধে জবাই করার চেষ্টা করে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা টের পাবার ফলে, তাদের হস্তক্ষেপে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
ছাত্রফ্রন্ট নেতা সুশান্ত সিনহার উপর দুইবার হামলা: ২০০২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নেতা সুশান্ত সিনহাকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয় শিবির কর্মীরা। এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে ছাত্রলীগের সাথে ব্যাপক আকারে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় শিবিরের।
২০০৪ সালের ২৫ জুলাই শিবির ক্যাডার রবি ও রোকনের নেতৃত্বে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল রাজশাহী ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক সুশান্ত সিনহার ওপর পুনরায় হামলা চালায়। ইট দিয়ে জখম করার পামাপাশি তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চালায় শিবির ক্যাডাররা।
২০০৪ সালে পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে বহিরাগত অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ছাত্রী বিক্ষোভে সশস্ত্র ছাত্র শিবির কর্মীরা হামলা চালায়। অনেক ছাত্রীকে নির্যাতন ও রক্তাক্ত করে।
অধ্যাপক মো. ইউনূসকে হত্যা: ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর অধ্যাপক মো. ইউনূসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাবার সময় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যদিও এই হত্যা মামলায় ছাত্র শিবির ও জেএমবির দুইজন সদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্র শিবির তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলো।
ছাত্রমৈত্রীর শামীম আহমেদকে রগ কেটে হত্যা: ২০০৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বরিশালের বাবুগঞ্জের আগরপুর ইউনিয়নের ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি শামীম আহমেদকে শিবির ক্যাডাররা কুপিয়ে ও হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করে।
২০০৪ সালের ৩০ অক্টোবর ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক রক্তাক্ত দিন। জামাতের বর্তমান রাজশাহী মহানগরের আমীর আতাউর রহমান এবং প্রক্টর নূরুল আফসারের উপস্থিতিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে শিবির ক্যাডাররা প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্রীকে রক্তাক্ত করে।
২০০৫ সালের ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জুবেরী ভবনের সামনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এস এম চন্দনের ওপর হামলা চালিয়ে তার রগ কেটে নেওয়ার চেষ্টা চালায় শিবির ক্যাডাররা।
অধ্যাপক আবু তাহের হত্যা: ২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জামাতপন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্র শিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীনসহ আরো দুইজন শিবির ক্যাডার মিলে একযোগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে।
২০০৬ সালের ২১ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘সেকুলারিজম ও শিক্ষা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার অপরাধে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হককে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার ওপর হামলা চালায় ছাত্র শিবির। প্রকাশ্য সমাবেশে তারা অধ্যাপক হাসান আজিজুল হকের গলা কেটে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিউদ্দিন হত্যাকাণ্ড: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পরেই, অর্থাৎ ২০১০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের নৃশংসতা চালায় শিবির। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এএএম মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। শিবিরের এই ক্যাডাররা দিনের আলোতে ক্যাম্পাসের ভেতর অস্ত্র হাতে মহড়া দিত এবং যে কেউ তাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে কথা বলত, তাকেই তারা আক্রমণ করত। এই ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিবিরের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে এবং তাদের নিষিদ্ধের দাবি জানায়।
২০১০-২০১৩ রাজশাহীতে ৮ জনের রগ কাঁটে ছাত্রশিবির
শুধুমাত্র রাজশাহীতে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল এই সময়ের মধ্যে ৮ জনের রগ কাঁটে ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা। জামায়াত-শিবির সারা দেশেই এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ করলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই সবচেয়ে বেশীসংখ্যক মানুষের হাত-পায়ের রগ কেটেছে শিবির। যাদের রগ কটেছে এদের সবাই এখন পঙ্গু।
ফারুক হত্যাকান্ড: ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে এক অমানবিক ঘটনা। শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে হত্যা করার পর তার লাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রেনের ম্যানহোলের ভেতর ফেলে দেয় শিবিরের সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল শিবিরের বিরোধিতা করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
ফারুক হোসেনের সেই নিথর দেহ ম্যানহোল থেকে উদ্ধার করার ছবি সে সময় জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ওই রাতে ছাত্রলীগের কর্মী সাইফুর রহমান বাদশা, ফিরোজ মাহমুদ, আরিফুজ্জামান ও শহিদুল ইসলামের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির।
সাইফুর রহমান বাদশার রগ কাটা: ফারুক হত্যাকান্ডের দিনই শিবিরের হাতে রগ কাটা বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা সাইফুর রহমান বাদশা জানান, তিনি এখনো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফারুক মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। আর আমি বেঁচে আছি মরার মতো। শরীরের কাটা দাগগুলো দেখে এখনো আঁতকে উঠি। দুই হাত ও পায়ের রগ কাটার পর মাথায় চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়ে ওরা যখন ফেলে যায়, বাঁচব বলে ভাবিনি। ব্যথার যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতে পারি না। শিবিরের নৃশংসতা কেড়ে নিয়েছে আমার সব স্বপ্ন। পড়াশোনা শেষ করে কোনো চাকরিও জোগাড় করতে পারিনি। বৃদ্ধ বাবার পেনশনের টাকায় এখনো চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।’
আখেরুজ্জামান তাকিমের রগ কাটা: ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর শিবিরের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হন ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন সহসভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিম। তাকিমকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার পর তাঁর এক পা ও এক হাতের রগ কেটে দেন দুর্বৃত্তরা। তাকিম জানান, তিনি এখনো স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন না। হাঁটতে গেলে ব্যথা করে বাঁ পা। আর শরীরের বিভিন্ন স্থানের ক্ষতগুলো যন্ত্রণা দেয়।
শহিদুল ইসলামের রগ কাটা: ২০১৩ সালের ১৭ মার্চ রাতে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় ৩০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালায় শিবির। তারা শহিদুল ইসলামের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের সদস্য মাইনুল হোসেন ও যুবলীগের নেতা রুহুল আমিনকে কুপিয়ে জখম করা হয়।
শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ডান পায়ের গোড়ালি থেকে নিচ পর্যন্ত কোনো অনুভূতি নেই। বাঁ পায়ে ৩৫টি সেলাই দেওয়া হয়েছে। হাঁটতে গেলে পা ফুলে যায়, রাতে প্রচণ্ড ব্যথা করে।
হাবিবুর রহমানের রগ কাটা: ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের মেহেরচণ্ডী এলাকায় শিবিরের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হন রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান। হামলাকারীরা তাঁর বাঁ পা ও ডান হাতের রগ কেটে দেয়। পরবর্তী সময়ে হাবিবুরের ডান পায়ের হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হাবিবুরের চলাফেরার ভরসা এখন ক্রাচ।
পুলিশ ও সংবাদমাধ্যম সূত্র মতে, ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হত্যা ও পঙ্গু করে দিতো। শিবির কোনো ছাত্র সংগঠন নয়, এটি একটি জঙ্গি সন্ত্রাসী সংগঠন।
তুহিনের রগ কাটা: ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদ আল হোসেন ওরফে তুহিনকে রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতর্কিত হামলা চালিয়ে তুহিনের হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবিরের কর্মীরা। একই সঙ্গে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় তাঁকে। তুহিনের জীবন শঙ্কামুক্ত হলেও পঙ্গুত্বের আশঙ্কা এখনো কাটেনি বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
২০১৩ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে সহিংসতা
২০১৩ সাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে, তখন জামায়াত-শিবির সারাদেশে এক ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল এই বিচার প্রক্রিয়া নসাৎ করা।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে যখন সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে 'গণজাগরণ মঞ্চ' গড়ে তোলে, তখন শিবির সারাদেশে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। ২০১৩ সালে তারা ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলা, বাসে আগুন দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনা ঘটায়। এই সময়টিতে শিবিরের সহিংসতা ক্যাম্পাসের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
ব্যাংক কর্মচারী জাফর মুন্সী হত্যা: ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মতিঝিলের ব্যাংক কর্মচারী জাফর মুন্সীকে রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে শিবির ক্যাডারেরা। মাথা থেতলে দেওয়া হয় জাফর মুন্সীকে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জফার মুন্সী।
মুক্তিযোদ্ধা জাবি ভিসি অবমাননা: ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত করে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির কর্মীরা। এর পিছনে মদদ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিসহ জামাতপন্থী কিছু শিক্ষক। এখানে জাবি ভিসি’র মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে কটাক্ষ করা হয় এবং ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহ আকবর’ বলে শ্লোগান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের বিপক্ষে দাড় করানোর অপচেষ্টা করা হয়।
বুয়েট ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপ হত্যাকান্ড: ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল ছাত্র শিবির ও নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরিরের সশস্ত্র কর্মীদের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ায় বুয়েট ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপের ওপর হামলা চালানো হয়। বুয়েট ক্যাম্পাসে দুর্বৃত্তরা তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। তিন মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্কয়ার হসপিটালে মারা যান দ্বীপ। দ্বীপকে খুনের অপরাধে মেজবাহ নামের বুয়েটের এক ছাত্রকে গ্রেফতারের পর দ্বীপের ওপর হামলায় ছাত্র শিবিরের জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
ছাত্রলীগের তিনশ নেতাকর্মীর উপর হামলা: ২০১৩ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুরে চট্টগ্রাম শহর থেকে দলীয় অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের প্রায় তিনশ নেতাকর্মীর উপর আক্রমণ করে হাজারের অধিক শিবির সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয় প্রায় সব নেতাকর্মী; মৃত্যুবরণ করেন তিনজন, কয়েকজনের রগ কেটে দেয়, পঙ্গুত্ববরণ করে এখনো বেঁচে আছেন প্রায় ৬০ জন নেতাকর্মী।
২০১৩ সালের ২১ আগস্ট শোক দিবসের আলোচনা শেষে আমীর আলী হল থেকে মাদার বখশ্ হলে ফেরার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিবিরের সদস্যরা। তুহিনের পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়, হাতের আঙুল কেটে নেওয়া হয়।
২০১৩ সালে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক বেনজীর আহমেদের হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়েছে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। সরকারি শাহ সুলতান কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দিয়ে রিকশায় করে ফেরার পথে তিনি হামলার শিকার হন। পরীক্ষা দিয়ে রিকশায় বাসায় যাওয়ার পথে বগুড়া শহরের শেরপুর-সাতমাথা সড়কের কানুছগাড়ী এলাকায় শিবির সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন তিনি। এ সময় দৌড়ে রাস্তার পাশের একটি ওষুধের দোকানে আশ্রয় নিলে সেখানেই রামদা-চাকুসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁকে কুপিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় সন্ত্রাসীরা। পরে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়।
সাখাওয়াত হোসেনের হাত-পায়ের রগ কাটা: ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেনের হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়েছে শিবির সন্ত্রাসীরা। হামলাকারী শিবিরের ক্যাডার তারেক আজিজ বিস্ফোরণ মামলাসহ কয়েকটি মামলার আসামী।
যুবলীগ সভাপতিকে রগ কেটে হত্যা: ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর গাইবান্ধায় যুবলীগ সভাপতি জাহিদুল ইসলামকে হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করে ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা। তার উপর সিনেমার স্টাইলে হামলা করা হয়। প্রথম ৭-৮ জন হঠাৎ রশি টেনে মোটরসাইকেল গতিরোধ করে। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে জাহিদুলের দুই হাত ও দুই পায়ের রগ কেটে দেয় এবং মাথাসহ শরীরে একাধিক কুপিয়ে হত্যা করে।
আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা: ২০১৪ সালে শিবিরের সন্ত্রাসীরা রগ কেটে গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করে পঙ্গু করেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে। ২০২৪ সালের ০৮ সেপ্টেম্বর আবারও তার উপর সশস্ত্র হামলা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় একটি দোকানের পেছনে নিয়ে মাসুদকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে শিবিরের সন্ত্রাসীরা।
রংপুরে শিবিরের ঘাটি
২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রংপুর কারমাইকেল কলেজে কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশাররফ হোসেনকে ক্যাম্পাসে একা পেয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় শিবিরের সন্ত্রাসীরা।
রংপুর কারমাইকেল কলেজকে কেন্দ্র করেও ছাত্রশিবির শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তুলছিল। কলেজের হোস্টেলগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল অনেক বছর। কলেজের পাশের কলেজপাড়া, দর্শনা, মর্ডান মোড়সহ আশপাশের এলাকায় নব্বই দশক ও তার পরের সময়ে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা বিয়ে করে আত্মীয়তা তৈরি করে ওই এলাকাগুলোতে ঘাটি গাড়ে বলে পুলিশ ও মিডিয়াসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। কারমাইকেল কলেজে সামান্য সমস্যা হলেই এসব এলাকা থেকে বহিরাগতদের নিয়ে আসত তারা।
শিবিরের রগ কাটার আরো অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। অতীতে বর্তমানের মতো অনলাইন আর্কাইভ বা তথ্য প্রযুক্তির অবাধ সুযোগ সুবিধা না থাকায় অনেক তথ্য সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘেঁটে বের করতে হয়েছে। আমাদের অনুসন্ধান চলমান। শিবিরের রগ কাটা, বর্বর হত্যাকান্ড, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ে আমাদের আরো পর্ব সামনে আসবে। উপরের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে এটা স্পষ্ট যে, ‘রগ কাটা’ যেন শিবির নামের সমার্থক হয়ে উঠেছে।
বিশ্বখ্যাত নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্কট্যাংক আইএইচএস জেনস গ্লোবাল টেরোরিজম অ্যান্ড ইনসারজেন্সি অ্যাটাক ইনডেক্স-২০১৩ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস ও তৎপর সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রথম তিনটির একটি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাংলাদেশের ইসলামী ছাত্র শিবির। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাম উঠে এসেছে শীর্ষ দশ সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায়। আফগানিস্তানের তালিবানের পরপরই রয়েছে ছাত্র শিবিরের নাম।
কেন এই 'রগ কাটা' রাজনীতি?
বিশ্লেষকদের মতে, শিবিরের এই 'রগ কাটা' সংস্কৃতির পেছনে মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল কাজ করত। কাউকে সরাসরি হত্যা করার চেয়ে পঙ্গু করে দিলে ওই ব্যক্তি আর কখনো রাজনীতিতে ফিরতে পারতেন না এবং তার মাধ্যমে অন্য কর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া যেত। এটি ছিল তাদের বিরোধী মত দমনের এক আদিম ও নিষ্ঠুর পন্থা।
ছাত্ররাজনীতি হওয়ার কথা ছিল মেধাবীদের বিকাশ ও অধিকার আদায়ের ক্ষেত্র। কিন্তু ছাত্রশিবিরের মতো সংগঠনের ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদ ও নৃশংস কর্মকাণ্ডের ফলে এটি বহু প্রাণ অকালে ঝরিয়ে দিয়েছে। আজ ইতিহাসের পাতায় ছাত্রশিবিরের নাম শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি সন্ত্রাসী ও রক্তপিপাসু সংগঠন হিসেবেই অধিকাংশের কাছে পরিচিত। নিহত এবং আহত হাজারো শিক্ষার্থীর পরিবারের সেই হাহাকার আজও বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি হোক শান্তিপূর্ণ ও মেধাভিত্তিক এটাই বর্তমান প্রজন্মের একমাত্র প্রত্যাশা।
আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ধরনের সহিংসতা রোধে বর্তমান আইন যথেষ্ট? নাকি নতুন কোনো সংস্কার প্রয়োজন?
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















