রক্ষীবাহিনী বনাম সেনাবাহিনী – নবজাতক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই
একটি দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নবজাতক এই রাষ্ট্রে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল নানা ক্ষমতার সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' এবং 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী'। এই দুই বাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে উদয় হলো একটি নতুন সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দ ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিল রাষ্ট্র পরিচালনার বিশাল চ্যালেঞ্জ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, তখন একটি নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্রের সাথে সাথে আমরা পেয়েছিলাম এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ।
একটি দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নবজাতক এই রাষ্ট্রে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল নানা ক্ষমতার সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' এবং 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী'।
রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত প্যারামিলিটারি ফোর্স। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে রক্ষীবাহিনীর আদলে বিশেষায়িত প্যারামিলিটারি ফোর্স রয়েছে। কিন্তু জাসদের গণকন্ঠ ও স্বাধীনতার চিরশত্রু জামায়াতের অনুসারীরা গুজব ছড়িয়ে দেয় “বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন”। এমন একটা নিকৃষ্ট মিথ্যাচার তথ্য ছড়িয়ে তৎকালীন সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়। এই দুই বাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে ১৯৭৫ এর মর্মান্তিক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল, আজ আমরা তার গভীরে প্রবেশ করব।
জাতীয় রক্ষীবাহিনী কেন গঠন করা হয়?
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল লাখ লাখ অবৈধ অস্ত্র। স্বাধীনতার পরপরই সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই চরম অস্থিরতার মধ্যে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ১৯৭২ সালে গঠিত হয়েছিল ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’। এটি কোনো সমান্তরাল বা বিকল্প সেনাবাহিনী ছিল না, বরং একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী (প্যারামিলিটারি ফোর্স) হিসেবে কাজ করত।
কেন প্রয়োজন ছিল এই বিশেষ বাহিনীর?
একটি যুদ্ধোত্তর দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে বেসামরিক জনগণের হাত থেকে অস্ত্র ফিরিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশে তখন চিত্রটি ছিল আরও জটিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দেশের লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ, ছাত্র ও যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে থাকা অস্ত্রের একটি বড় অংশ তখনো জমা পড়েনি।
এর পাশাপাশি সমাজবিরোধী ও দেশবিরোধী মাওবাদী শক্তি জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টির অপতৎপরতা বেড়ে গিয়েছিল। এই অস্ত্র হাতে নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি, ছিনতাই, ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানো এবং থানা লুটের মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। তৎকালীন পুলিশ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল অপ্রতুল এবং তাদের প্রশিক্ষণেও ছিল বড় ঘাটতি। সাধারণ পুলিশ বাহিনীর পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত অপরাধীদের মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই এই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটি এলিট ও কঠোর বাহিনীর প্রয়োজন ছিল।
এমন এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অনুভব করেছিল যে, একটি বিশেষায়িত আধা-সামরিক বাহিনী (Paramilitary Force) প্রয়োজন, যারা দ্রুত কমান্ডের মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবে। এই ভাবনা থেকেই ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ' (Jatiya Rakkhi Bahini Order, 1972)-এর মাধ্যমে একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠন করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে তিনি বলেছিলেন, "পাহাড়সম অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান বন্ধ এবং চরমপন্থীদের দমনে এই বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। রক্ষী বাহিনী কোনো দলীয় বাহিনী নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদেই এটি গঠিত হয়েছে।" বিভিন্ন ভাষণ ও সংসদে তিনি রক্ষী বাহিনীকে ‘অপশক্তি দমন ও দেশ পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় একটি অনুগত বাহিনী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
রক্ষীবাহিনী বিষয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বলেন,
“স্বাধীনতার পর দেশের আইন শৃঙ্খলার কিছু অবনতি ঘটে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে অস্ত্র উদ্ধার করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়। কাজেই অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব আর্মিকে দেওয়া হতো। ওই সময় আমি এই দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম। সেটাকে লক্ষ্য রেখে পুলিশকে শক্তিশালী করার জন্য রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়।”
“এই বাহিনী সম্বন্ধে কিছু মহল বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বলে যে, রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে গঠিত হয় এবং এ মর্মে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। রক্ষীবাহিনীকে কার্যকর করার জন্য পার্লামেন্টে আইন পাস হয়, যাতে রক্ষীবাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে অপপ্রচার হয় এবং সামরিক বাহিনীতে অসন্তোষ দেখা দেয়।”
রক্ষীবাহিনীর উপ-পরিচালক ও লেখক আনোয়ার উল আলম তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন, "রক্ষীবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাফল্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে বাহিনীর নাম কালিমালিপ্ত করা হয়েছে।"
রক্ষীবাহিনীর গঠন ও নেতৃত্ব
শুরুতে এই বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছিলেন 'মুজিব বাহিনী' ও 'কাদেরিয়া বাহিনী'-র সদস্যরা। জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়েছিল ঢাকার শেরেবাংলা নগরে (বর্তমান গণভবন ও এর আশপাশের এলাকা)। বাহিনীর প্রথম পরিচালক বা প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন অভিজ্ঞ সেনাকর্মকর্তা ক্যাপ্টেন এ. এন. এম. নূরুজ্জামান। সরকারের প্রতি পূর্ণ অনুগত একটি বাহিনী হিসেবে এর যাত্রা শুরু হলেও শুরু থেকেই এটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
এই বাহিনীর গঠনতন্ত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। এর সদস্যদের বড় একটি অংশ ছিল তৎকালীন 'মুজিব বাহিনী' (BLF) এবং 'কাদেরিয়া বাহিনী'-র দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা। মূলত যারা সরাসরি রণাঙ্গনে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগের আদর্শের প্রতি এবং মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্যে অবিচল ছিলেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরেও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের এই বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া হাজার হাজার বেসামরিক গেরিলা বা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের মেধা ও শক্তিকে রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই তরুণ ও দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সুশৃঙ্খল সরকারি বাহিনীর আওতায় আনা হবে। এর ফলে রক্ষীবাহিনী গঠনের মাধ্যমে বহুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে এই বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা তাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রক্ষীবাহিনী গঠন করে তাদের এই বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়।
তৎকালীন মন্ত্রী ও সাবেক সেনাপ্রধান এম এ জি ওসমানী রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পুষ্ট তরুণদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনীটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সাধারণ পুলিশ বাহিনীর ওপর চাপ কমাতে এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে।”
তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই বাহিনীকে যুদ্ধপরবর্তী অস্বাভাবিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, "সদ্য স্বাধীন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, কালোবাজারি ও চোরাচালান বন্ধে রক্ষী বাহিনীর তাৎক্ষণিক উপস্থিতি ও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজনীয় ছিল।"
পোশাক ও প্রশিক্ষণ
রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা বেশিরভাগ মুজিব বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য থেকে হওয়ায় স্বভাবতই তারা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে চরমভাবে ঘৃনা করতো। তাই তারা খাকি বর্ণের পোশাক পরিধান করতে রাজি ছিলেন না। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পোশাক খাকি রঙের হওয়ায় তারা এই রঙের পোশাক পরিধান করতে চাননি।
ফলে সরকার তাদের জন্য জলপাই সবুজ রঙের পোশাক বরাদ্দ করে, যা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুরূপ। আবার রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ সুশৃঙ্খলিতভাবে ডিউটিতে নিয়োজিত থাকতো এবং নিরবতা পালন করতো। এসব সুযোগে স্বাধীনতার চিরশত্রু গোষ্ঠী গুজব রটিয়ে দেয় যে রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ ভারতীয় সেনাসদস্য।
এক ভুখা মিছিলে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী একদল রক্ষীবাহিনীর সদস্যকে তাদের জেলা, গ্রাম কোথায় তার খোজখবর নিয়ে তাঁর পাশে থাকা কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননকে বলেন, "তোমরা না কও রক্ষীবাহিনীর সবাই ভারতীয়। আমি তো দ্যাখতাছি এরা আমাগো পোলা।" এই উক্তির মাধ্যমে তিনি রক্ষীবাহিনী নিয়ে সেসময়ে প্রচলিত রাজনৈতিক গুজব ও ভুল ধারণার অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন।
রক্ষীবাহিনীর সদস্য সংখ্যা
রক্ষীবাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৬,০০০। রক্ষীবাহিনীতে মোট ১৫টি ব্যাটালিয়ন ছিল, যার মধ্যে ১২টি নিয়মিত এবং ৩টি প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো।অপরদিকে বাংলাদেশের নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ এরও বেশি। একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর কাঠামো, ভারী আর্টিলারি, সাঁজোয়া যান এবং সামরিক কাঠামোর বিপরীতে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল হালকা অস্ত্রনির্ভর (যেমন: এসএলআর, এসএমজি এবং ৩০৩ রাইফেল) একটি অভ্যন্তরীণ সহায়ক শক্তি হিসেবে। সামরিক বাজেট, রেশন ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকেও নিয়মিত সেনাবাহিনী রক্ষীবাহিনীর চেয়ে বহু গুণে এগিয়ে ছিল।
তৎকালীন সময়ে জাসদ ও স্বাধীনতার চিরশত্রুরা গুজব রটিয়ে দেয় রক্ষীবাহিনী দিয়ে শেখ মুজিব সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করছে। অথচ একটি প্যারামিলিটারি ফোর্স দিয়ে পুরো সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপনের দাবি ভিত্তিহীন ও অবাস্তব। তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ বলেন, “রক্ষীবাহিনীর সদস্য-সংখ্যা ১২০০০ হলেও সর্বত্র প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল তাদের সংখ্যা লক্ষাধিক।”
পোলায় জানে না, পোলার বাপ কে?
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ রক্ষীবাহিনীর ইতিহাস সম্পর্কে জানে না। বাংলাদেশ যখন রক্ষীবাহিনীর প্রয়োজন অনুভব করেছিল তখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশেই ছিলেন না। তখন তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে "রক্ষীবাহিনী" গঠন করার জন্য একটি বোর্ড গঠিত হয়।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে আসার ৪ দিন আগে ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে মাওলানা ভাসানী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ সহ অনেক নেতার উপস্থিতিতে রক্ষীবাহিনী করার প্রথম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, “জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও দলমত নির্বিশেষে যারা পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের সবাইকে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী ‘রক্ষীবাহিনী’ তে নেয়া হবে।” এই সভার চারদিন পর বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরলে মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে “জাতীয় রক্ষাবাহিনী” গঠন করা হয়।
অর্থনৈতিক অপরাধ, চোরাচালান ও কালোবাজারি রোধ
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। এর ওপর যোগ হয়েছিল তীব্র খাদ্যসংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। এই সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার এবং কালোবাজারি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। একই সাথে দেশের সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে ভারতে পাট, খাদ্যশস্য এবং চামড়া পাচারের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল।
"রক্ষীবাহিনীকে সমস্ত অর্থনৈতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও বিশেষ অভিযান চালানোর জন্য ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যেন দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।"
বিভিন্ন দেশে রয়েছে ‘রক্ষীবাহিনী’
ইরানের আইআরজিসি সম্পর্কে আমরা সবাই জানি, এটি ইরানের রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনীর নিজস্ব পদাতিক, নৌ ও বিমান শাখার পাশাপাশি ‘কুদস ফোর্স’ নামে একটি বিশেষ শাখা রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় ‘ন্যাশনাল গার্ড’। এটি রক্ষীবাহিনীর মতোই একটি প্যারামিলিটারি বাহিনী। বেসামরিক পেশায় নিযুক্ত নাগরিকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে এই রিজার্ভ বা আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য হতে পারে।
মিশরে রক্ষীবাহিনীর আদলে রয়েছে সেন্ট্রাল সিকিউরিটি ফোর্সেস (CSF)। এই বিশালাকার আধাসামরিক বাহিনী প্রধানত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আন্দোলন প্রতিরোধে নিরাপত্তায় নিয়োজিত।
কানাডায় একই রক্ষীবাহিনীর নাম হচ্ছে “সিটিজেন সোলজার”। এটি মূলত সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত ‘আর্মি রিজার্ভ’ বাহিনী।
ডেনমার্ক এবং ফিনল্যান্ডে স্থানীয় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে রক্ষীবাহিনীর আদলে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী আছে।
চীনের 'পিপলস আর্মড পুলিশ' একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত বিশাল আধাসামরিক বাহিনী, এটাও বঙ্গবন্ধুর রক্ষীবাহিনীর আদলে গড়া। এই বাহিনীর প্রধান কাজ হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দাঙ্গা ও গণ-উত্তেজনা দমন, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান পরিচালনা।
রাশিয়ায় ‘ন্যাশনাল গার্ড অব দ্য রাশিয়ান ফেডারেশন’ বা ‘রসবার্ডিয়া’ রয়েছে, এটাও রক্ষীবাহিনীর মতো প্যারামিলিটারি বাহিনী। এটি সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে জবাবদিহি করে। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা এই বাহিনীর মূল দায়িত্ব।
সৌদি আরবে রক্ষীবাহিনীর আদলে রয়েছে সৌদি অ্যারাবিয়ান ন্যাশনাল গার্ড (SANG)। এটি সরাসরি সৌদি রাজপরিবারের বিশেষ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
ভারতে রক্ষীবাহিনীর আদলে রয়েছে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (CRPF) বাহিনী। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, নকশালবিরোধী অভিযান ও সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধে নিয়মিত সেনাবাহিনীর বাইরে এটি রাষ্ট্রীয় বিশেষ বাহিনী হিসেবে নিয়োজিত থাকে।
রক্ষীবাহিনী ও র্যাব: বাংলাদেশের দুই বিশেষায়িত বাহিনী
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জারি করা এক রাষ্ট্রপতির আদেশ (President's Order No. 21 of 1972) এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' গঠিত হয়। সদ্য স্বাধীন দেশের অসংগঠিত অস্ত্রধারী উপদলের তৎপরতা দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য।
অপরদিকে, ২০০৪ সালে জাতীয় সংসদে 'আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধন) আইন, ২০০৪' পাসের মাধ্যমে গঠিত হয় র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। নব্বইয়ের দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে সারা দেশে অপরাধের চরম বৃদ্ধি, সংগঠিত অপরাধী চক্রের বিস্তার এবং জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর উত্থান রোধে র্যাবের জন্ম হয়।
সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল: জাতীয় রক্ষীবাহিনীর মূল ভিত্তি ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা, বিশেষ করে যুব ও ছাত্রনেতাকর্মীরা। এটি সরাসরি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে পরিচালিত হতো।
এর বিপরীতে, র্যাব কোনো নতুন অনিয়মিত দল বা আলাদাভাবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যাডার বাহিনী নয়। এটি সামরিক ও বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষায়িত সংস্থা। র্যাবের অর্ধেকের বেশি সদস্য আসেন বাংলাদেশ পুলিশ থেকে এবং বাকি অংশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি এবং আনসার থেকে প্রেষণে নিয়োগ পান।
অভিযানের ধরন ও কাজের ক্ষেত্র: রক্ষীবাহিনীর অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সরকারের সশস্ত্র বিরোধীদের মোকাবিলা করা। তৎকালীন জাসদের গণবাহিনী, ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি এবং অসাধু কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে বাহিনীটি ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক ও সাময়িক অভিযান পরিচালনা করে।
অন্যদিকে, র্যাবের অভিযানের ক্ষেত্র আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং অপরাধ দমনে বিস্তৃত। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর শাইখ আব্দুর রহমান এবং বাংলা ভাইয়ের মতো শীর্ষ চরমপন্থীদের গ্রেপ্তার, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) দমন, সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ করানো এবং সীমান্ত এলাকার বিপুল পরিমাণ মাদক ও অবৈধ অস্ত্র জব্দে র্যাব মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
বিতর্ক ও মানবাধিকারের অভিঘাত: উভয় বাহিনীই তাদের নিজ নিজ মেয়াদের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ১৯৭৪ সালে জাতীয় রক্ষীবাহিনী আইনে সংশোধনী আনা হয়। রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন ও বিচারবহির্ভূত আটকের অভিযোগ তাদের ইতিহাসের বড় দাগ।
একইভাবে, র্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকেই "ক্রসফায়ার" বা "বন্দুকযুদ্ধ" এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগে দেশে-বিদেশে বিতর্কিত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর অর্থনৈতিক ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
কেন রক্ষীবাহিনী বিতর্কিত হলো?
জাতীয় রক্ষীবাহিনী তাদের সাড়ে তিন বছরের কার্যকালে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয় তাদের 'বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা' এবং রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল যে, রক্ষীবাহিনীকে রাষ্ট্রের বাহিনীর চেয়ে ‘দলীয় বাহিনী’ হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, রক্ষীবাহিনী রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়েও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বেশি তৎপর ছিল।
তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন করে তীব্র সরকার বিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয়। জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি দমনে রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কঠোর। গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ, নাশকতা ও ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। তারা আওয়ামী লীগ সদস্য এবং থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশকে আহত করতো ও পুলিশের অস্ত্র লুটপাট করে নিতো। গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি সারা দেশে লিফলেট বিলিয়ে বোমা বিস্ফোরণ করতো ও আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে টহল দিতো। আইনশৃঙ্খলা জবাবে রক্ষীবাহিনীও কঠোর ধরপাকড় ও দমননীতি গ্রহণ করে।
১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসকে ‘কালো দিবস’ আখ্যায়িত করে জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা করে ও বোমা বিস্ফোরণ করে। ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে আবারও তারা নাশকতা শুরু করে। ১৭ মার্চ জাসদের একটি মিছিল থেকে গণবাহিনীর কর্মীরা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ করে এবং কয়েকটি স্থানে ভাংচুর চালায়। মিছিলটি ঢাকা রমনা ও পল্টন এলাকায় আসলে জাসদের কর্মীরা রক্ষীবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। এ সময় রক্ষীবাহিনীর গুলিতে কিছু জাসদ কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর জাসদ নেতা মেজর আবদুল জলিল রক্ষীবাহিনীকে "সরকারের ব্যক্তিগত বা দলীয় পেটোয়া বাহিনী" হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
জাসদের গণবাহিনী যত্রতত্র রক্ষীবাহিনীর সাথে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তো এবং বোমা বিস্ফোরণ সহ দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করতো। জবাব রক্ষীবাহিনীও তাদের প্রতি গুলিবর্ষণ করতো ও গণগ্রেফতার করতো। এভাবে অসংখ্য জাসদের রাজনৈতিক কর্মীর হতাহতের অভিযোগ উঠে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে।
এদের বিরামহীন সহিংসতায় ১৯৭৪ সালে রক্ষীবাহিনী আদেশে একটি সংশোধনী আনা হয়, যার মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের যে কোনো কাজের জন্য আদালতে চ্যালেঞ্জ করার পথ প্রায় রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এই 'লিগ্যাল ইমিউনিটি' বা দায়মুক্তির কারণে বাহিনীর সদস্যরা অনেক সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার এবং তল্লাশির ক্ষমতা তাদের সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
তৎকালীন সময়ে জাসদের মুখপত্র ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ ও মওলানা ভাসানীর পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক হক-কথা’ পত্রিকা বঙ্গবন্ধু সরকার ও রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে নানা মিথ্যাচার ও গুজব সংবাদ ছাপাতো। তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেয় "রক্ষীবাহিনী কাউকে তুলে নিলে তার হদিস পাওয়া যায় না"। এতে জনসাধারণে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয় যা রাষ্ট্রের একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কখনোই ইতিবাচক ছিল না।
মওলানা ভাসানী জাসদের গণবাহিনীর সহিংসতা দমনকে “নকশাল বা দুষ্কৃতকারী দমনের নামে রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর চালানো অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড” বলে অভিহিত করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য ছিল "নকশাল কারও কপালে লেখা থাকে না।" অর্থাৎ, এই অজুহাতে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, বামপন্থী নেতাকর্মীদের টার্গেট করা হচ্ছিল।
আরেক জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব রক্ষীবাহিনীর গঠন নিয়ে তিনি অভিযোগ তুলেছিলেন, "রক্ষী বাহিনী কোনো পেশাদার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়; এটি মূলত সরকারি দলের নিজস্ব সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।"
সেনাবাহিনী বনাম রক্ষীবাহিনীর বাজেট যুদ্ধ
একটি দেশের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্বের অন্যতম বড় কারণ ধরা হয় বাজেট বরাদ্দকে। রক্ষীবাহিনীর গঠন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ভেতরে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি করেছিল। তৎকালীন জাসদের গণবাহিনীর শীর্ষ নেতারা ও ডাকু সিরাজের অনুসারীরা ভাষণ ও লিফলেট বিতরণ করে সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে উসকানি দিত। রক্ষীবাহিনীর বাজেট ও সুযোগ-সুবিধা সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি এমন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সেনাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করা হতো, যা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একটি ব্যাপক অপপ্রচার ছিল যে, সরকার সেনাবাহিনীকে অবহেলা করে রক্ষীবাহিনীকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে এবং এটি সম্ভবত সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য কী বলে?
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সার্বিক অর্থ ও সরঞ্জামের সংকট ছিল। সেনাবাহিনীর জন্য বুট, ইউনিফর্ম ও আধুনিক আবাসন সরবরাহে বাজেট ঘাটতিকে সরকারের অবহেলা হিসেবে প্রচার করে নিম্নপদস্থ জওয়ানদের উসকে দেওয়া হয়েছিল। সেনাসদস্যদের উত্তেজিত করতে চক্রান্তকারীরা অপপ্রচার ছড়িয়েছিল যে “রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি বাজেট পায়”।
পাকিস্তান আমলের তুলনায় বরাদ্দ হ্রাস: পাকিস্তান আমলে বাজেটের সিংহভাগ (প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ) ব্যয় হতো সামরিক খাতে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য শিক্ষা, কৃষি ও অবকাঠামোতে জোর দেন। ফলে সামরিক খাতে বরাদ্দ ১৩ শতাংশে নেমে আসে। পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা সামরিক অফিসার ও জওয়ানদের কাছে বাজেট ও কাঠামোগত এই পরিবর্তন এক বিরাট পেশাগত ধাক্কা হিসেবে আসে, যা পরবর্তীতে অসন্তোষের রূপ নেয়।
তথ্যের বিভ্রাট ও প্রকৃত পরিসংখ্যান: প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ হ্রাসের জন্য সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছিল যে, রক্ষীবাহিনীর পেছনে সব টাকা ঢালা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তুলনায় রক্ষীবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র ও যানবাহনে সজ্জিত করা হচ্ছিল বলে একটি ধারণা সামরিক মহলে কৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক নথি বলছে ভিন্ন কথা।
১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে রক্ষীবাহিনীর বাজেট ছিল মাত্র ৯ কোটি টাকা। একই সময়ে সেনাবাহিনীর বাজেট শুরুতে ৯২ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে তা ১২২ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে এই অর্থবছরে জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যেখানে রক্ষীবাহিনীর বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। রক্ষীবাহিনীর মোট বরাদ্দ ছিল সেনাবাহিনীর মূল বাজেটের ১০ থেকে ১২ শতাংশের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র।
অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর বরাদ্দ রক্ষীবাহিনীর চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও গুপ্ত স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী অপপ্রচারের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষের বীজ বুনে দিয়েছিল।
রক্ষীবাহিনী ছিল মূলত হালকা পদাতিক বাহিনী। তাদের হাতে মূলত থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, হালকা সাব-মেশিনগান (SMG) এবং টহল যানবাহন ছিল। তাদের কোনো ভারী আর্টিলারি, সাঁজোয়া যান বা ট্যাংক ছিল না। সেনাবাহিনী ছিল দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ পেশাদার প্রতিরক্ষা শক্তি। তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল ভারী কামান, সাঁজোয়া বহর এবং মিশর থেকে উপহার পাওয়া টি-৫৪/৫৫ ট্যাংক।
"পেশাদার সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষীবাহিনীকে প্রধান সামরিক বাহিনী বানানো হবে" এমন কৃত্রিম গুজব সেনানিবাসগুলোতে নিয়মিত ছড়ানো হতো। পেশাদার সেনাবাহিনীর সমান্তরালে একটি রাজনৈতিক অনুগত বাহিনীকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে কৌশলে গুজব রটিয়ে দেয়া হচ্ছিলো, যা সামরিক শৃঙ্খলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে সেনাসদস্যদের এই পুঞ্জীভূত অসন্তোষ একটি পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করেছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
মুক্তিযোদ্ধা বনাম পাকিস্তান ফেরত সেনা অফিসার ও সেনা সদস্যদের বিরোধ
তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গঠন ছিল অত্যন্ত জটিল। বাহিনীটি প্রধানত দুটি বড় গ্রুপে বিভক্ত ছিল:
মুক্তিযোদ্ধা সেনা: যারা ১৯৭১ সালে দেশেই ছিলেন এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
পাকিস্তান প্রত্যাগত (Repatriated) সেনা: যারা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা পড়ে ছিলেন এবং ১৯৭৩ সালের পর দেশে ফিরে বাহিনীতে যোগ দেন।
বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের বেশ কিছু লক্ষণ প্রকট হয়ে ওঠে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার। তার মধ্যে পাকিস্তান প্রত্যাগত জওয়ানদের সংখ্যা ২৪ হাজার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ান ও নতুন করে রিক্রুটদের মিলিয়ে মোট সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার। পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের সংখ্যা ছিল ১১ শত এবং রক্ষীবাহিনীর সদস্য ছিল ২০ হাজার।
পদোন্নতি নিয়ে বিরোধ ও ভিন্ন আদর্শ
মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বীরত্ব ও যুদ্ধের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন সরকার তাঁদের দুই বছরের 'অ্যান্টি-ডেটেড সিনিয়রিটি' বা প্রাক-জ্যেষ্ঠতা প্রদান করে। এর ফলে বহু মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে তাঁদের চেয়ে বয়সে ও পাকিস্তান সামরিক একাডেমির ব্যাচে জ্যেষ্ঠ পাকিস্তান ফেরত সেনা অফিসারদের উপরস্থ কর্মকর্তা হয়ে যান।
এই পদক্ষেপটি পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। তাঁদের যুক্তি ছিল, পাকিস্তানে বন্দি থাকা কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ ছিল না এবং পেশাগত দক্ষতা ও একাডেমিক যোগ্যতায় তাঁরা পিছিয়ে ছিলেন না। কোন পক্ষ জ্যেষ্ঠতা পাবে তা নিয়ে ক্যান্টনমেন্টগুলোতে অঘোষিত দ্বন্দ্বে সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ড মারাত্মকভাবে শিথিল হয়ে পড়ে।
বঙ্গবন্ধু যখন সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে চলার চেষ্টা করতেন, তখন একদল মনে করত তারা অবহেলিত হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যাগত অফিসারদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ফারাক ছিল স্পষ্ট। সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের মতে,
“পাকিস্তান প্রত্যাগত অনেক অফিসার ছিলেন আদর্শিকভাবে রক্ষণশীল এবং ভারত-বিদ্বেষী। তাঁরা মুজিব সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি। অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের একটি অংশ মনে করত দেশ স্বাধীনতায় তাদের অবদান অনুযায়ী তারা যথেষ্ট মূল্যায়ন পাচ্ছে না।”
এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ডকে দুর্বল করে দিয়েছিল। উপরন্তু, মুক্তিযোদ্ধা সেনা ও সৈনিকদের মধ্যে জাসদের ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এবং বিভিন্ন মাওবাদী বামপন্থী মতাদর্শের অনুপ্রবেশ ঘটে, যা পেশাদার অফিসার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ সৈনিকদের খেপিয়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।
আবাসন সংকট ও প্রশাসনিক হাহাকার
দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্থায়ী ক্যান্টনমেন্টগুলোতে মাত্র ১০ হাজার সেনা সদস্যের আবাসিক ব্যবস্থা ছিল। অথচ যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজারে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে আরও প্রায় ২৫ হাজার সেনা সদস্য ও কর্মকর্তা ফিরে এলে নিয়মিত বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়ে যায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজারে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাতারাতি এত বিপুলসংখ্যক সেনা সদস্যকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, কুমিল্লা, সৈয়দপুর ও রংপুর সেনানিবাসে ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত ব্যারাক না থাকায় হাজার হাজার সৈনিক ও কর্মকর্তাকে তাঁবু বা অস্থায়ী ছাউনিতে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে হয়েছিল। খাদ্য, পোশাক এবং দৈনন্দিন সুযোগ-সুবিধার এই তীব্র ঘাটতি সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বৃদ্ধি করে।
ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস
ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বইয়ের লেখক ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এবিষয়ে নিম্নলিখিত মতামত বিবৃত করেন:
“পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসাররা এক কথায় ভারত বিদ্বেষী, রক্ষণশীল, মুসলিম বিশ্বের প্রতি অনুরক্ত ছিল। যার ফলে তারা মুজিব সরকারকে মনে প্রাণে গ্রহণ করেনি।”
“মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কৃতিত্ব স্বরূপ দুই বছরের সিনিয়রিটি গ্রহণ করে। ফলে প্রত্যাগত অফিসারগণ ক্ষুব্ধ হয়।”
“অনেক অফিসার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের অনেক বেশি প্রাপ্য বলে মনে করত। তাই তা অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
“পাকিস্তান আমলে বাজেটের সিংহভাগ সামরিক খাতে ব্যয় হলেও সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সংকটকালীন অবস্থায় বাজেটের ১৩% এর বেশি সামরিক খাতে ব্যয় করা জাতীয় নীতির সহায়ক নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। তাই তা অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
“অনেক সামরিক কর্মকর্তার বদ্ধমূল ধারণা ছিলো যে তারা যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল তখন তাঁরা (আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ) ভারতে নিরাপদে অবস্থান করছিলো। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা অসন্তোষের অন্যতম কারণ।”
“সেনাবাহিনীতে সীমাহীন অপপ্রচার এবং ভুল বোঝাবুঝির ফলে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। এমতাবস্থায় গ্রুপিং-দলাদলি প্রভৃতি কারণে সেনাবাহিনীতে ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।”
বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ “দেশ চালাবো না আর্মি সামলাবো?”
বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন একটি বৈষম্যহীন সোনার বাংলার। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর তিনি খুব দ্রুতই টের পেয়েছিলেন যে, তাঁর চারপাশের প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, কাঙ্ক্ষিত পেশাদারিত্বের পথে হাঁটছে না।
সেনাবাহিনীতে যখন দলাদলি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরমে, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গভীর উদ্বেগে ছিলেন। লে. কর্নেল এম এ হামিদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর সেই অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। তিনি যখন শুনতেন যে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন, পদোন্নতি আর পোস্টিং নিয়ে তদবির করছেন, তখন তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়তেন। তিনি বলেছিলেন:
“কর্নেল সাহেব কী বলব! আপনার আর্মির কথা। অফিসাররা আসে আর একে অন্যের বিরুদ্ধে complain করে। অমুক এই করেছে - সে এই করেছে। আমার পোস্টিং, আমার প্রোমোশন... বলুন তো কী হবে এসব আর্মি দিয়ে? অফিসাররা এভাবে কামড়াকামড়ি করলে, ডিসিপ্লিন না রাখলে এই আর্মি দিয়ে আমি কী করবো? আমি এদের ঠেলাঠেলি সামলাবো না দেশ চালাবো? আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবাই খাই খাই শুরু করেছে। কোথা থেকে আমি দেব, তা কেউ ভাবতে চায় না।”
বঙ্গবন্ধুর এই আক্ষেপটি কেবল বিরক্তি ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রকৃত অবস্থা।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি পেশাদার বাহিনীর ভেতর যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং গ্রুপিং ঢুকে পড়ে, তখন সেই বাহিনী দেশের জন্য সুরক্ষার বদলে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে বাহিনীর কাজ সীমান্ত রক্ষা করা, তারা যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিগলি এবং পদ-পদবির লোভে মত্ত হয়, তখন সেই বাহিনী দেশের জন্য সুরক্ষার বদলে সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একটি নবীন রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যে কঠোর চেইন অব কমান্ড থাকা উচিত ছিল, তা ব্যাহত হচ্ছিল। মেজরের ওপর কর্নেল কিংবা জেনারেলের যে নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, তা তখন ছিল না। ১৫ আগস্টের ঘটনায় জুনিয়র মেজররা যখন সিনিয়র জেনারেলদের আদেশ অমান্য করে ট্যাংক নিয়ে বের হয়ে আসে, তখনই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুর সেই ‘আক্ষেপের’ উৎস কত গভীর ছিল।
১৫ আগস্টে রক্ষীবাহিনী কেন নিষ্ক্রিয় ছিল?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠেছিল হাজার হাজার সদস্যের রক্ষীবাহিনী কেন এগিয়ে আসেনি? তখন রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে কয়েক হাজার সশস্ত্র সদস্য মজুদ ছিল। সাভারের হেডকোয়ার্টারেও ছিল বিশাল বহর। অথচ তারা একটি গুলিও ছোঁড়েনি। কেন? ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং তখনকার কমান্ডিং অফিসারদের ভাষ্যমতে এর কয়েকটি কারণ ছিল।
সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি ও দুর্বলতা হলো ‘অর্ডার’ বা নির্দেশ। সেদিন ভোরে যখন বঙ্গবন্ধু সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন করেছিলেন, তখন এক প্রকার বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। রক্ষীবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা তোফায়েল আহমেদ কিংবা বাহিনীর পরিচালক কর্নেল নুরুজ্জামান কারও কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পাল্টাহামলার নির্দেশ আসেনি। নেতৃত্ব যখন বিভ্রান্ত থাকে, তখন মাঠপর্যায়ের সেনারা কোনো অ্যাকশনে যায় না। কেউ ঘুর্ণাক্ষরে ধারণাও করতে পারেনি জুনিয়র মেজররা দেশদ্রোহী হয়ে উঠবে এবং প্রেসিডেন্টকে মারার জন্য রাস্তায় ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নামবে।
রক্ষীবাহিনীর কাছে ছিল এলএমজি (LMG) এবং এসএলআর (SLR)-এর মতো হালকা ও মাঝারি অস্ত্র। কিন্তু বিদ্রোহী সেনারা রাস্তা দখল করেছিল ভারী ট্যাংক (T-54) এবং আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (APC) দিয়ে। যদিও অনেক ট্যাংকে সেদিন পর্যাপ্ত গোলা ছিল না, কিন্তু ধানমন্ডি ও রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরের সামনে ট্যাংকের উপস্থিতি রক্ষীবাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। একটি সুশৃঙ্খল সাঁজোয়া আক্রমণের মুখে হালকা অস্ত্র নিয়ে পাল্টাহামলা করা সামরিক কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন তৎকালীন কমান্ডাররা।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই রেডিওতে ঘোষণা দেওয়া হয় এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে সরকার গঠনের কথা প্রচারিত হয়। একই সাথে এমন গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, পুরো সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করেছে। রক্ষীবাহিনীর কমান্ডিং অফিসাররা ভেবেছিলেন, তারা যদি এখন লড়াই শুরু করেন তবে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে এবং ভারতীয় হস্তক্ষেপের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই দোটানাই তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখে।
রক্ষীবাহিনীর বিলুপ্তি
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও খুনীচক্র বুঝতে পেরেছিলেন যে, রক্ষীবাহিনীকে পৃথক অবস্থায় রাখা তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হতে পারে। কারণ এই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর আনুগত্য ছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় খন্দকার মোশতাক আহমেদের আমলে রক্ষীবাহিনীর নাম ও স্বতন্ত্র পরিচয় বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৫ অক্টোবর একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে একীভূত (Absorb) করে নেওয়া হয়। বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এভাবেই রক্ষীবাহিনী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
রক্ষীবাহিনী কি কেবলই বিতর্কিত ছিল?
ইতিহাসের পাতায় রক্ষীবাহিনীর নেতিবাচক দিকগুলো যতটা আলোচিত হয়, তাদের গঠনমূলক কাজগুলো ততটা সামনে আসে না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে রক্ষীবাহিনী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল:
ব্যাপক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান: রক্ষীবাহিনী টাঙ্গাইল, পাবনা, কুমিল্লা, ঢাকা ও পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় টানা চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র, রকেট লাঞ্চার ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে, যা রাষ্ট্রের প্রাথমিক নিরাপত্তা সুসংহত করতে সাহায্য করেছিল।
কালোবাজারি, মজুতদারি ও সীমান্ত চোরাচালান রোধ: যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয় এবং এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। রক্ষীবাহিনী সীমান্ত এলাকায় কঠোর টহল বসিয়ে চোরাচালান রোধ করে এবং দেশের অভ্যন্তরে চাল ও সারের অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে।
থানা, সরকারি সম্পত্তি ও অবকাঠামো রক্ষা: তৎকালীন সময়ে জাসদের গণবাহিনী এবং সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অজস্র থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুট করে, সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগ করে এবং রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করতে শুরু করে। দুর্বল থানা ও সরকারি অবকাঠামো পাহারা দেওয়া এবং এসব উগ্রপন্থীদের হামলা নস্যাৎ করতে রক্ষীবাহিনী একটি দ্রুতিকামী (Quick Response) বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল।
রক্ষীবাহিনী কি সত্যিই অনিবার্য ছিল?
আজকের প্রেক্ষাপট থেকে যদি আমরা বিচার করি, তবে দেখা যায় যেকোনো যুদ্ধোত্তর দেশে একটি বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা থাকে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে আমরা পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী বিজিবি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আরো অনেকগুলো বিশেষায়িত বাহিনী দেখতে পাই। বাংলাদেশে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অনেকগুলো বিশেষায়িত বাহিনী বা ইউনিট রয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB): এটি একটি যৌথ এলিট ফোর্স যা মূলত পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী থেকে আসা সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত। এটি মূলত ডিরেক্ট-অ্যাকশন, সন্ত্রাসবাদ দমন ও ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধীদের গ্রেফতারে কাজ করে।
প্যারা কমান্ডো brigade: এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান বিশেষ অপারেশন ফোর্স। এই ব্রিগেডের অধীনে ১ম ও ২য় প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন অত্যন্ত দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
সোয়াট (SWAT): ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি বিশেষায়িত কমান্ডো ইউনিট যা সন্ত্রাসবাদ দমন, বন্দিদশা উদ্ধার এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ব্যবহৃত হয়।
অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU): এটি সমগ্র দেশে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনে নজরদারি ও অভিযান পরিচালনার জন্য নির্ধারিত পুলিশের বিশেষায়িত জাতীয় ইউনিট।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC): জঙ্গিবাদ, নেটওয়ার্কভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার অপরাধ দমনে কাজ করে এমন একটি বিশেষায়িত শাখা।
স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF): রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান (যেমন: প্রধান উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রপতি) ও বিদেশি রাষ্ট্রীয় অতিথিদের ভিভিআইপি (VVIP) নিরাপত্তা প্রদানের জন্য সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ সংস্থা।
স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB): এটি পুলিশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও তথ্য সংগ্রহের কাজ করে।
স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন (SPBn): গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সংবেদনশীল স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য নিবেদিত পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট।
অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিট: অপরাধের জটিল রহস্য উন্মোচনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI) ও সিআইডি (CID); মহাসড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় হাইওয়ে পুলিশ; পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশ; শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ এবং বিশেষ নিরাপত্তার জন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBn) কাজ করে।
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি সুশৃঙ্খল দেশ গড়ার জন্য একটি শক্তিশালী হাত। কিন্তু অতি-উৎসাহী কিছু নেতা ও রক্ষীবাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্যদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ এবং গুপ্ত স্বাধীনতা বিরোধীদের লাগাতার রটানো গুজব সেই মহৎ উদ্দেশ্যকে ম্লান করে দিয়েছিল। এটি কেবল একটি বাহিনীর ইতিহাস নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শৈশবকালীন সংগ্রামের এক জটিল দলিল।
ইতিহাসের শিক্ষা
১৯৭২-৭৫ এর সময়কালটি ছিল একটি চরম অস্থিরতার সময়। রক্ষীবাহিনী গঠন ছিল একটি প্রশাসনিক প্রয়োজন, কিন্তু এর প্রয়োগ এবং একে কেন্দ্র করে চলা গুপ্ত স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর অপপ্রচার সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেনাবাহিনীর ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পাকিস্তান আমলের মানসিকতা এবং অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে যে বারুদের স্তূপ তৈরি হয়েছিল, ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রকারীরা তাকেই কাজে লাগিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু যে সেনাবাহিনীকে নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন, সেই সেনাবাহিনীই শেষ পর্যন্ত তাঁর হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি অরাজনৈতিক, পেশাদার ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী। কিন্তু তৎকালীন আমেরিকা ও পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের ফাদে পা দেয়া উচ্চাভিলাষী মেজরদের হাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যা এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান ক্ষমতা গ্রুপিংয়ের পেছনে ছুটে পুরো জাতির ভাগ্যকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল।
আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অযৌক্তিক ঘৃণা বা পক্ষপাতিত্ব রাষ্ট্রের সংহতি বিনষ্ট করে। বঙ্গবন্ধু একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী চেয়েছিলেন, কিন্তু ষড়যন্ত্রের জালে সেই বাহিনীর একটি অংশকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তথ্যসূত্র:
১. ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড - অধ্যাপক আবু সাইয়িদ।
২. রক্ষীবাহিনী: সত্য-মিথ্যা - আনোয়ার উল আলম।
৩. তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা - লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ।
৪. বাংলাদেশ অ্যাট ওয়ার / ১৫ আগস্ট: রক্তের দাগ কাটা ভোর - মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ (বীর উত্তম)।
৫. President's Order No. 21 of 1972 (জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ, ১৯৭২)
৬. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ও সাক্ষাৎকার: জাতীয় সংসদ এবং গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য (অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অনুগত বাহিনী গঠন প্রসঙ্গে)।
৭. দৈনিক গণকণ্ঠ ও সাপ্তাহিক হক-কথা।
৮. হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদন
৯. ১৯৭২-১৯৭৪ মেয়াদে জাসদ ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ঐতিহাসিক ভাষণ ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি।















