>

>

রক্ষীবাহিনী বনাম সেনাবাহিনী - নবজাতক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই

রক্ষীবাহিনী বনাম সেনাবাহিনী - নবজাতক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই

একটি দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নবজাতক এই রাষ্ট্রে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল নানা ক্ষমতার সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' এবং 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী'। এই দুই বাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল।

TruthBangla

রক্ষীবাহিনী বনাম সেনাবাহিনী - নবজাতক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে উদয় হলো একটি নতুন সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দ ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিল রাষ্ট্র পরিচালনার বিশাল চ্যালেঞ্জ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, তখন একটি নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্রের সাথে সাথে আমরা পেয়েছিলাম এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ।

একটি দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নবজাতক এই রাষ্ট্রে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল নানা ক্ষমতার সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' এবং 'বাংলাদেশ সেনাবাহিনী'। এই দুই বাহিনীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক অধ্যায়ের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল, আজ আমরা তার গভীরে প্রবেশ করব।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল লাখ লাখ অবৈধ অস্ত্র। স্বাধীনতার পরপরই সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছিল প্রধান অগ্রাধিকার। পুলিশ বাহিনী তখনো বিপর্যস্ত, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই চরম অস্থিরতার মধ্যে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ১৯৭২ সালে গঠিত হয়েছিল ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’।

কেন প্রয়োজন ছিল এই বিশেষ বাহিনীর?

একটি যুদ্ধোত্তর দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে বেসামরিক জনগণের হাত থেকে অস্ত্র ফিরিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশে তখন চিত্রটি ছিল আরও জটিল। পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে থাকা অস্ত্রের একটি বড় অংশ তখনো জমা পড়েনি। এর পাশাপাশি সমাজবিরোধী ও দেশবিরোধী শক্তি যেমন জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টির অপতৎপরতা বেড়ে গিয়েছিল।

তৎকালীন পুলিশ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল অপ্রতুল এবং তাদের প্রশিক্ষণেও ছিল বড় ঘাটতি। এমন এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অনুভব করেছিল যে, একটি বিশেষায়িত আধা-সামরিক বাহিনী (Paramilitary Force) প্রয়োজন, যারা দ্রুত কমান্ডের মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবে। এই ভাবনা থেকেই ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ' (Jatiya Rakkhi Bahini Order, 1972)-এর মাধ্যমে একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠন করা হয়।

রক্ষীবাহিনী বিষয়ে কে এম শফিউল্লাহ বলেন,

“স্বাধীনতার পর দেশের আইন শৃঙ্খলার কিছু অবনতি ঘটে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে অস্ত্র উদ্ধার করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়। কাজেই অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব আর্মিকে দেওয়া হতো। ওই সময় আমি এই দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম। সেটাকে লক্ষ্য রেখে পুলিশকে শক্তিশালী করার জন্য রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়।”

“এই বাহিনী সম্বন্ধে কিছু মহল বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বলে যে, রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে গঠিত হয় এবং এ মর্মে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। রক্ষীবাহিনীকে কার্যকর করার জন্য পার্লামেন্টে আইন পাস হয়, যাতে রক্ষীবাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে অপপ্রচার হয় এবং সামরিক বাহিনীতে অসন্তোষ দেখা দেয়।”

রক্ষীবাহিনীর গঠন ও নেতৃত্ব

শুরুতে এই বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছিলেন 'মুজিব বাহিনী' ও 'কাদেরিয়া বাহিনী'-র সদস্যরা। জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়েছিল ঢাকার শেরেবাংলা নগরে (বর্তমান গণভবন ও এর আশপাশের এলাকা)। বাহিনীর প্রথম পরিচালক বা প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন অভিজ্ঞ সেনাকর্মকর্তা ক্যাপ্টেন এ. এন. এম. নূরুজ্জামান। সরকারের প্রতি পূর্ণ অনুগত একটি বাহিনী হিসেবে এর যাত্রা শুরু হলেও শুরু থেকেই এটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

এই বাহিনীর গঠনতন্ত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। এর সদস্যদের বড় একটি অংশ ছিল তৎকালীন 'মুজিব বাহিনী' (BLF) এবং 'কাদেরিয়া বাহিনী'-র দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা। মূলত যারা সরাসরি রণাঙ্গনে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগের আদর্শের প্রতি এবং মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্যে অবিচল ছিলেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরেও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের এই বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পোশাক ও প্রশিক্ষণ

রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা বেশিরভাগ মুজিব বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য থেকে হওয়ায় স্বভাবতই তারা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে চরমভাবে ঘৃনা করতো। তাই তারা খাকি বর্ণের পোশাক পরিধান করতে রাজি ছিলেন না। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পোশাক খাকি রঙের হওয়ায় তারা এই রঙের পোশাক পরিধান করতে চাননি।

ফলে সরকার তাদের জন্য জলপাই সবুজ রঙের পোশাক বরাদ্দ করে, যা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুরূপ। আবার রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ সুশৃঙ্খলিতভাবে ডিউটিতে নিয়োজিত থাকতো এবং নিরবতা পালন করতো। এসব সুযোগে স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী গুজব রটিয়ে দেয় যে রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ ভারতীয়।

কেন রক্ষীবাহিনী বিতর্কিত হলো?

জাতীয় রক্ষীবাহিনী তাদের সাড়ে তিন বছরের কার্যকালে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয় তাদের 'বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা' এবং রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগে।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল যে, রক্ষীবাহিনীকে রাষ্ট্রের বাহিনীর চেয়ে ‘দলীয় বাহিনী’ হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, রক্ষীবাহিনী রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়েও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বেশি তৎপর ছিল।

বিশেষ করে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যেমন জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) এর গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি দমনে রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কঠোর। অসংখ্য বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার অভিযোগ উঠে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে।

দেশব্যাপী জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি বিরামহীন সহিংসতায় ১৯৭৪ সালে রক্ষীবাহিনী আদেশে একটি সংশোধনী আনা হয়, যার মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের যে কোনো কাজের জন্য আদালতে চ্যালেঞ্জ করার পথ প্রায় রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এই 'লিগ্যাল ইমিউনিটি' বা দায়মুক্তির কারণে বাহিনীর সদস্যরা অনেক সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার এবং তল্লাশির ক্ষমতা তাদের সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় "রক্ষীবাহিনী কাউকে তুলে নিলে তার হদিস পাওয়া যায় না।" এতে জনসাধারণে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয় যা রাষ্ট্রের একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কখনোই ইতিবাচক ছিল না।

সেনাবাহিনী বনাম রক্ষীবাহিনীর বাজেট যুদ্ধ

একটি দেশের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্বের অন্যতম বড় কারণ ধরা হয় বাজেট বরাদ্দকে। রক্ষীবাহিনীর গঠন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ভেতরে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি করেছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একটি ব্যাপক অপপ্রচার ছিল যে, সরকার সেনাবাহিনীকে অবহেলা করে রক্ষীবাহিনীকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে এবং এটি সম্ভবত সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।কিন্তু প্রকৃত তথ্য কী বলে?

পাকিস্তান আমলের তুলনায় বরাদ্দ হ্রাস: পাকিস্তান আমলে বাজেটের সিংহভাগ (প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ) ব্যয় হতো সামরিক খাতে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য শিক্ষা, কৃষি ও অবকাঠামোতে জোর দেন। ফলে সামরিক খাতে বরাদ্দ ১৩ শতাংশে নেমে আসে। পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের জন্য এটি ছিল একটি বিশাল ধাক্কা।

তথ্যের বিভ্রাট ও প্রকৃত পরিসংখ্যান: প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ হ্রাসের জন্য সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছিল যে, রক্ষীবাহিনীর পেছনে সব টাকা ঢালা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তুলনায় রক্ষীবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র ও যানবাহনে সজ্জিত করা হচ্ছিল বলে একটি ধারণা সামরিক মহলে কৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক নথি বলছে ভিন্ন কথা।

১৯৭৩-৭৪ অর্থবছর: রক্ষীবাহিনীর বাজেট ছিল মাত্র ৯ কোটি টাকা

একই সময়ে সেনাবাহিনীর বাজেট: শুরুতে ৯২ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে তা ১২২ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর বরাদ্দ রক্ষীবাহিনীর চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও গুপ্ত স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী অপপ্রচারের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষের বীজ বুনে দিয়েছিল।

পেশাদার সেনাবাহিনীর সমান্তরালে একটি রাজনৈতিক অনুগত বাহিনীকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে কৌশলে গুজব রটিয়ে দেয়া হচ্ছিলো, যা সামরিক শৃঙ্খলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে সেনাসদস্যদের এই পুঞ্জীভূত অসন্তোষ একটি পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করেছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

মুক্তিযোদ্ধা বনাম পাকিস্তান ফেরত সেনা অফিসার ও সদস্য

তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গঠন ছিল অত্যন্ত জটিল। বাহিনীটি প্রধানত দুটি বড় গ্রুপে বিভক্ত ছিল:

মুক্তিযোদ্ধা সেনা: যারা ১৯৭১ সালে দেশেই ছিলেন এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

পাকিস্তান প্রত্যাগত (Repatriated) সেনা: যারা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা পড়ে ছিলেন এবং ১৯৭৩ সালের পর দেশে ফিরে বাহিনীতে যোগ দেন।

বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের বেশ কিছু লক্ষণ প্রকট হয়ে ওঠে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার। তার মধ্যে পাকিস্তান প্রত্যাগত জওয়ানদের সংখ্যা ২৪ হাজার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ান ও নতুন করে রিক্রুটদের মিলিয়ে মোট সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার। পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের সংখ্যা ছিল ১১ শত এবং রক্ষীবাহিনীর সদস্য ছিল ২০ হাজার।

পদোন্নতি নিয়ে বিরোধ ও ভিন্ন আদর্শ

মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের তাঁদের বীরত্বের পুরস্কারস্বরূপ সরকার দুই বছরের 'অ্যান্টি-ডেটেড সিনিয়রিটি' বা জ্যেষ্ঠতা প্রদান করে। এটি ছিল পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের জন্য এক বড় অস্বস্তির কারণ। তাঁরা মনে করতেন, যুদ্ধে অংশ না নিলেও পেশাদারিত্বে তাঁরা কোনো অংশে কম নন। জ্যেষ্ঠতা (Seniority) কে পাবেন, তা নিয়ে প্রায়ই বিরোধ লাগত। বঙ্গবন্ধু যখন সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে চলার চেষ্টা করতেন, তখন একদল মনে করত তারা অবহেলিত হচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ডকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের মতে, পাকিস্তান প্রত্যাগত অনেক অফিসার ছিলেন আদর্শিকভাবে রক্ষণশীল এবং ভারত-বিদ্বেষী। তাঁরা মুজিব সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি। অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের একটি অংশ মনে করত দেশ স্বাধীনতায় তাদের অবদান অনুযায়ী তারা যথেষ্ট মূল্যায়ন পাচ্ছে না।

আবাসন সংকট ও প্রশাসনিক হাহাকার

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর লোকবল কয়েকগুণ বাড়লেও অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত জরাজীর্ণ। অফিসারদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা মুজিব সরকারের জন্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ১০ হাজার সেনা সদস্যের আবাসিক বাসস্থানের সুযােগ ছিলাে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার সময়ে সেনাবাহিনীর সংখ্যাই ছিলাে প্রায় ২০ হাজার। তার উপর পাকিস্তান প্রত্যাগত সামরিক বাহিনীর আরাে প্রায় ২৫ হাজার সদস্য সেনাবাহিনীতে যােগদান করে। এরূপ অবস্থায় রাতারাতি প্রায় ৪০ /৪৫ হাজার সৈন্য বাহিনীর আবাসিক সুবিধা প্রদান শুধু মাত্র কথার কথা ছিলােনা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশাের, সৈয়দপুর, রংপুর এবং কুমিল্লায় সেনানিবাসগুলিতে তাদের সাময়িক আবাসিক সুবিধার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয় মুজিব সরকার।

বঙ্গবন্ধু সরকার রাতারাতি এই বিশাল বাহিনীর জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর ও কুমিল্লায় আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছিল। খোলা আকাশের নিচে বা তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হয়ে অনেক সৈনিক ও কর্মকর্তা সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস

ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বইয়ের লেখক ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এবিষয়ে নিম্নলিখিত মতামত বিবৃত করেন:

“পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসাররা এক কথায় ভারত বিদ্বেষী, রক্ষণশীল, মুসলিম বিশ্বের প্রতি অনুরক্ত ছিল। যার ফলে তারা মুজিব সরকারকে মনে প্রাণে গ্রহণ করেনি।”

“মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কৃতিত্ব স্বরূপ দুই বছরের সিনিয়রিটি গ্রহণ করে। ফলে প্রত্যাগত অফিসারগণ ক্ষুব্ধ হয়।”

“অনেক অফিসার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের অনেক বেশি প্রাপ্য বলে মনে করত। তাই তা অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

“পাকিস্তান আমলে বাজেটের সিংহভাগ সামরিক খাতে ব্যয় হলেও সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সংকটকালীন অবস্থায় বাজেটের ১৩% এর বেশি সামরিক খাতে ব্যয় করা জাতীয় নীতির সহায়ক নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। তাই তা অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

“অনেক সামরিক কর্মকর্তার বদ্ধমূল ধারণা ছিলো যে তারা যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল তখন তাঁরা (আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ) ভারতে নিরাপদে অবস্থান করছিলো। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা অসন্তোষের অন্যতম কারণ।”

“সেনাবাহিনীতে সীমাহীন অপপ্রচার এবং ভুল বোঝাবুঝির ফলে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। এমতাবস্থায় গ্রুপিং-দলাদলি প্রভৃতি কারণে সেনাবাহিনীতে ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।”

বঙ্গবন্ধুর আক্ষেপ “দেশ চালাবো না আর্মি সামলাবো?”

বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন একটি বৈষম্যহীন সোনার বাংলার। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর তিনি খুব দ্রুতই টের পেয়েছিলেন যে, তাঁর চারপাশের প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে সেনাবাহিনী, কাঙ্ক্ষিত পেশাদারিত্বের পথে হাঁটছে না।

সেনাবাহিনীতে যখন দলাদলি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরমে, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গভীর উদ্বেগে ছিলেন। লে. কর্নেল এম এ হামিদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর সেই অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। তিনি যখন শুনতেন যে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন, পদোন্নতি আর পোস্টিং নিয়ে তদবির করছেন, তখন তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়তেন। তিনি বলেছিলেন:

“কর্নেল সাহেব কী বলব! আপনার আর্মির কথা। অফিসাররা আসে আর একে অন্যের বিরুদ্ধে complain করে। অমুক এই করেছে - সে এই করেছে। আমার পোস্টিং, আমার প্রোমোশন... বলুন তো কী হবে এসব আর্মি দিয়ে? অফিসাররা এভাবে কামড়াকামড়ি করলে, ডিসিপ্লিন না রাখলে এই আর্মি দিয়ে আমি কী করবো? আমি এদের ঠেলাঠেলি সামলাবো না দেশ চালাবো? আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবাই খাই খাই শুরু করেছে। কোথা থেকে আমি দেব, তা কেউ ভাবতে চায় না।”

বঙ্গবন্ধুর এই আক্ষেপটি কেবল বিরক্তি ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রকৃত অবস্থা।

বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি পেশাদার বাহিনীর ভেতর যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং গ্রুপিং ঢুকে পড়ে, তখন সেই বাহিনী দেশের জন্য সুরক্ষার বদলে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে বাহিনীর কাজ সীমান্ত রক্ষা করা, তারা যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিগলি এবং পদ-পদবির লোভে মত্ত হয়, তখন সেই বাহিনী দেশের জন্য সুরক্ষার বদলে সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একটি নবীন রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যে কঠোর চেইন অব কমান্ড থাকা উচিত ছিল, তা ব্যাহত হচ্ছিল। মেজরের ওপর কর্নেল কিংবা জেনারেলের যে নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, তা তখন ছিল না। ১৫ আগস্টের ঘটনায় জুনিয়র মেজররা যখন সিনিয়র জেনারেলদের আদেশ অমান্য করে ট্যাংক নিয়ে বের হয়ে আসে, তখনই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুর সেই ‘আক্ষেপের’ উৎস কত গভীর ছিল।

প্রোপাগান্ডা ও ভুল বোঝাবুঝির রাজনীতি

রাজনীতি ও গোয়েন্দা তৎপরতায় একটি কথা প্রচলিত আছে "একটি মিথ্যাকে বারবার বললে তা সত্যে পরিণত হয়।" রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে তৎকালীন বাংলাদেশে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল।

ইউনিফর্ম বিতর্ক - জলপাই সবুজ না খাকি?

রটানো হয়েছিল যে, রক্ষীবাহিনীর পোশাক ভারতীয় সেনাবাহিনীর মতো। আসলে রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা খাকি রঙ ঘৃণা করতেন কারণ এটি ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতীক। সরকার তাদের জন্য 'জলপাই সবুজ' বা অলিভ গ্রিন পোশাক বরাদ্দ করে। এই তুচ্ছ বিষয়টিকেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বলা হয়েছিল যে রক্ষীবাহিনীতে ভারতীয় নাগরিকরা কাজ করছে। সারাদেশ ব্যাপী গুজব রটিয়ে দেওয়া হয় যে রক্ষীবাহিনীর সদস্যগণ ভারতীয়। কিন্তু এই গুজবের কোন ভিত্তি ছিলনা। কিন্তু মুজিব সরকারের প্রতি বিদ্বেষ রটনাকারীরা এই গুজবের পূর্ণ সুযোগ নেয়।

কথিত আছে, এক ভুখা মিছিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী একদল রক্ষীবাহিনীর সদস্যকে তাদের জেলা, গ্রাম কোথায় তার খোজখবর নিয়ে তাঁর পাশে থাকা কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননকে বলেন,

তোমরা না কও রক্ষীবাহিনীর সবাই ভারতীয়? আমি তো দ্যাখতাছি এরা আমাগো পোলা।

সদস্য সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি

তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহর ভাষ্যমতে, রক্ষীবাহিনীর প্রকৃত সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ হাজার। কিন্তু গুপ্ত স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী সফলভাবে গুজব ছড়াতে সক্ষম হয় যে রক্ষীবাহিনীর সংখ্যা ১ লক্ষ ছাড়িয়েছে।

১৫ আগস্টে রক্ষীবাহিনী কেন নিষ্ক্রিয় ছিল?

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠেছিল হাজার হাজার সদস্যের রক্ষীবাহিনী কেন এগিয়ে আসেনি? তখন রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে কয়েক হাজার সশস্ত্র সদস্য মজুদ ছিল। সাভারের হেডকোয়ার্টারেও ছিল বিশাল বহর। অথচ তারা একটি গুলিও ছোঁড়েনি। কেন? ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং তখনকার কমান্ডিং অফিসারদের ভাষ্যমতে এর কয়েকটি কারণ ছিল।

সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি ও দুর্বলতা হলো ‘অর্ডার’ বা নির্দেশ। সেদিন ভোরে যখন বঙ্গবন্ধু সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন করেছিলেন, তখন এক প্রকার বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। রক্ষীবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা তোফায়েল আহমেদ কিংবা বাহিনীর পরিচালক কর্নেল নুরুজ্জামান কারও কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পাল্টাহামলার নির্দেশ আসেনি। নেতৃত্ব যখন বিভ্রান্ত থাকে, তখন মাঠপর্যায়ের সেনারা কোনো অ্যাকশনে যায় না। কেউ ঘুর্ণাক্ষরে ধারণাও করতে পারেনি জুনিয়র মেজররা দেশদ্রোহী হয়ে উঠবে এবং প্রেসিডেন্টকে মারার জন্য রাস্তায় ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নামবে।

রক্ষীবাহিনীর কাছে ছিল এলএমজি (LMG) এবং এসএলআর (SLR)-এর মতো হালকা ও মাঝারি অস্ত্র। কিন্তু বিদ্রোহী সেনারা রাস্তা দখল করেছিল ভারী ট্যাংক (T-54) এবং আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (APC) দিয়ে। যদিও অনেক ট্যাংকে সেদিন পর্যাপ্ত গোলা ছিল না, কিন্তু ধানমন্ডি ও রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরের সামনে ট্যাংকের উপস্থিতি রক্ষীবাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। একটি সুশৃঙ্খল সাঁজোয়া আক্রমণের মুখে হালকা অস্ত্র নিয়ে পাল্টাহামলা করা সামরিক কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন তৎকালীন কমান্ডাররা।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই রেডিওতে ঘোষণা দেওয়া হয় এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে সরকার গঠনের কথা প্রচারিত হয়। একই সাথে এমন গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, পুরো সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করেছে। রক্ষীবাহিনীর কমান্ডিং অফিসাররা ভেবেছিলেন, তারা যদি এখন লড়াই শুরু করেন তবে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে এবং ভারতীয় হস্তক্ষেপের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই দোটানাই তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখে।

রক্ষীবাহিনীর বিলুপ্তি

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও খুনীচক্র বুঝতে পেরেছিলেন যে, রক্ষীবাহিনীকে পৃথক অবস্থায় রাখা তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হতে পারে। কারণ এই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর আনুগত্য ছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় খন্দকার মোশতাক আহমেদের আমলে রক্ষীবাহিনীর নাম ও স্বতন্ত্র পরিচয় বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৫ অক্টোবর একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে একীভূত (Absorb) করে নেওয়া হয়। বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এভাবেই রক্ষীবাহিনী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

রক্ষীবাহিনী কি কেবলই বিতর্কিত ছিল?

ইতিহাসের পাতায় রক্ষীবাহিনীর নেতিবাচক দিকগুলো যতটা আলোচিত হয়, তাদের গঠনমূলক কাজগুলো ততটা সামনে আসে না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে রক্ষীবাহিনী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল:

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার: সারাদেশে চিরুনি অভিযান চালিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করে, যা সাধারণ পুলিশের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

মজুতদারি ও চোরাচালান রোধ: যুদ্ধের পর দেশে খাদ্য সংকট ও নিত্যপণ্যের আকাল দেখা দিলে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পণ্য মজুত করতে শুরু করে। রক্ষীবাহিনী এই মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল।

থানা ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষা: তৎকালীন অস্থির সময়ে বিভিন্ন স্থানে থানা লুট ও সরকারি সম্পদ ধ্বংস করতো জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি। এসব দেশবিরোধীদের অনেক হামলা রুখে দিয়েছিল রক্ষীবাহিনী।

রক্ষীবাহিনী কি সত্যিই অনিবার্য ছিল?

আজকের প্রেক্ষাপট থেকে যদি আমরা বিচার করি, তবে দেখা যায় যেকোনো যুদ্ধোত্তর দেশে একটি বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা থাকে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে আমরা পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী বিজিবি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আরো অনেকগুলো বিশেষায়িত বাহিনী দেখতে পাই। বাংলাদেশে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অনেকগুলো বিশেষায়িত বাহিনী বা ইউনিট রয়েছে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB): এটি একটি যৌথ এলিট ফোর্স যা মূলত পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য বাহিনী থেকে আসা সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত।

সোয়াট (SWAT): ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি বিশেষায়িত কমান্ডো ইউনিট যা সন্ত্রাসবাদ দমন এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ব্যবহৃত হয়।

অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU): এটি সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত জাতীয় ইউনিট।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC): জঙ্গিবাদ ও সাইবার অপরাধ দমনে কাজ করে এমন একটি বিশেষায়িত শাখা।

স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB): এটি পুলিশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে কাজ করে।

স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন (SPBn): ভিভিআইপি (VVIP) নিরাপত্তা প্রদানের জন্য এটি একটি বিশেষায়িত ইউনিট।

অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিট: পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI), সিআইডি (CID), হাইওয়ে পুলিশ, টুরিস্ট পুলিশ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ এবং এপিবিএন (APBn)।

সেনাবাহিনীর বিশেষ অপারেশন এবং দুর্গম অঞ্চলে অভিযানের জন্য নির্ধারিত বিশেষ বাহিনীগুলো হলো:

প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড: এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান স্পেশাল অপারেশন ফোর্স। এই ব্রিগেডের অধীনে বর্তমানে একাধিক প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন রয়েছে (যেমন: ১ম ও ২য় প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন)।

স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF): রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের (যেমন: প্রধান উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রপতি) নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF) কাজ করে।

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি সুশৃঙ্খল দেশ গড়ার জন্য একটি শক্তিশালী হাত। কিন্তু অতি-উৎসাহী কিছু নেতা ও রক্ষীবাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্যদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ এবং গুপ্ত স্বাধীনতা বিরোধীদের লাগাতার রটানো গুজব সেই মহৎ উদ্দেশ্যকে ম্লান করে দিয়েছিল। এটি কেবল একটি বাহিনীর ইতিহাস নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শৈশবকালীন সংগ্রামের এক জটিল দলিল।

ইতিহাসের শিক্ষা

১৯৭২-৭৫ এর সময়কালটি ছিল একটি চরম অস্থিরতার সময়। রক্ষীবাহিনী গঠন ছিল একটি প্রশাসনিক প্রয়োজন, কিন্তু এর প্রয়োগ এবং একে কেন্দ্র করে চলা গুপ্ত স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর অপপ্রচার সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেনাবাহিনীর ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পাকিস্তান আমলের মানসিকতা এবং অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে যে বারুদের স্তূপ তৈরি হয়েছিল, ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রকারীরা তাকেই কাজে লাগিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু যে সেনাবাহিনীকে নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন, সেই সেনাবাহিনীই শেষ পর্যন্ত তাঁর হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি অরাজনৈতিক, পেশাদার ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী। কিন্তু তৎকালীন আমেরিকা ও পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের ফাদে পা দেয়া উচ্চাভিলাষী মেজরদের হাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যা এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান ক্ষমতা গ্রুপিংয়ের পেছনে ছুটে পুরো জাতির ভাগ্যকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল।

আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অযৌক্তিক ঘৃণা বা পক্ষপাতিত্ব রাষ্ট্রের সংহতি বিনষ্ট করে। বঙ্গবন্ধু একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী চেয়েছিলেন, কিন্তু ষড়যন্ত্রের জালে সেই বাহিনীর একটি অংশকেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.