>

>

শেখ মুজিব কি জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে সরাসরি হত্যা করেছিলো?

শেখ মুজিব কি জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে সরাসরি হত্যা করেছিলো?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কালটি ছিল পুনর্গঠনের পাশাপাশি চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার। এই অস্থিরতার কেন্দ্রে ছিল নবগঠিত রাজনৈতিক দল 'জাসদ' এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্ন বিতর্ক উসকে দেয় বঙ্গবন্ধু কি সত্যিই জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিলেন? কেন জাসদ সেই সময় এত সশস্ত্র হয়ে উঠেছিল? আর ১৫ আগস্টের পর হঠাৎ কেন তারা স্তিমিত হয়ে গেল?

TruthBangla

শেখ মুজিব কি জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে সরাসরি হত্যা করেছিলো?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি হলো ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের চার বছর। এটি ছিল একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নতুন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সংগ্রাম, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং অস্ত্রধারী বামপন্থী উগ্রবাদের উত্তাল দিন। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে ছিল সদ্য গঠিত রাজনৈতিক দল 'জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল' (জাসদ)।

দশক পর দশক ধরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে একটি অভিযোগ চটকদারভাবে ঘুরে বেড়ায়: “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর গঠিত 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল।” কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ‘৩০ হাজার’ সংখ্যাটির ভিত্তি কী? এটি কি কোনো ঐতিহাসিক সত্য, নাকি স্বাধীন বাংলাদেশ ও তার স্থপতিকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা জামায়াত ও পাকিস্তানী এজেন্টদের ছড়ানো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা? কেন তৎকালীন সময়ে ছাত্রলীগের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া জাসদ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছিল? কেনই বা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম ও ট্র্যাজিক পটপরিবর্তনের পর এবং সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে রাজপথ কাঁপানো সেই জাসদ একপ্রকার স্তিমিত ও নিঃশেষ হয়ে গেল?

এই নিবন্ধে কোনো আবেগ বা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নয়; বরং ইতিহাসের নথিপত্র, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকে এই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর এক নিরপেক্ষ ও নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করা হবে।

ছাত্রলীগের গর্ভ থেকে জাসদের জন্ম

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের আদর্শিক দিকনির্দেশনা কী হবে—তা নিয়ে আওয়ামী লীগের তরুণ নেতৃত্ব এবং ছাত্র সংগঠন 'বাংলাদেশ ছাত্রলীগ'-এর ভেতরে এক গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়। এই ফাটলের ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালের মে মাসে ছাত্রলীগ দ্বিখণ্ডিত হয় এবং একই বছরের ৩১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)

দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সিরাজুল আলম খান (যাঁকে জাসদের 'তাত্ত্বিক গুরু' বলা হতো), আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ এবং পরবর্তীতে তাঁদের সাথে যুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) এম এ জলিল ও ফাঁসির মঞ্চে যাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) আবু তাহের (বীর উত্তম)।

আদর্শগত চরম মেরুকরণ

বঙ্গবন্ধুর দর্শন (সংসদীয় গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ): বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বাস করতেন সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধাপে ধাপে গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র ও অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার নীতিতে। তিনি ১৯৭২ সালে দেশকে একটি বিশ্বমানের গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দেন এবং ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন।

জাসদের দর্শন (‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ ও দ্বিতীয় বিপ্লব): অন্যদিকে, জাসদ নেতৃত্ব প্রথাগত সংসদীয় গণতন্ত্রকে 'বুর্জোয়া বা ধনকুবেরদের শাসন ব্যবস্থা' হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। তারা মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদের একটি উগ্র রূপ 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' প্রবর্তনের ডাক দেয়। তাদের দাবি ছিল, ১৯৭১ সালের ২১ মার্চের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা বা শাসক পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু 'শ্রেণি সংগ্রাম' বা গণমানুষের প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি সম্পন্ন হয়নি। তাই জাসদ অবিলম্বে এক 'দ্বিতীয় সশস্ত্র বিপ্লব'-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দর্শনের সংঘাতই নবজাতক বাংলাদেশে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধসদৃশ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল।

‘গণবাহিনী’, জাসদের উগ্রতা ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ড

জাসদ কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বা রাজপথের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। খুব দ্রুতই তারা একটি গোপন সশস্ত্র শাখা গঠন করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘গণবাহিনী’। এই গণবাহিনীর প্রধান করা হয় সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) আবু তাহেরকে।

একটি স্বাধীন, সদ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র যার অর্থনীতি ছিল তলাবিহীন, পুলিশ বাহিনী ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্র ও প্রশিক্ষণহীন, এবং দেশে অগণিত পাকিস্তানি অবমুক্ত অস্ত্র ছড়িয়ে ছিল সেই ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাসদ ও তাদের গণবাহিনী যে তাণ্ডব শুরু করেছিল, তা তৎকালীন যেকোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।

থানা ও ফাঁড়ি লুট: গণবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অচল করে দেওয়া। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলের ডজন ডজন পুলিশ থানা ও ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়। বহু সাধারণ পুলিশ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

ব্যাংক ডাকাতি ও অর্থনৈতিক নাশকতা: রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে গণবাহিনী বিভিন্ন ব্যাংকের শাখায় সশস্ত্র ডাকাতি চালায়। এছাড়া ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটের সময় সরকারের লঙ্গরখানাগুলোতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, সরকারি খাদ্যের গুদামে আগুন দেওয়া এবং রপ্তানি পণ্য বিশেষ করে পাটের গুদামে নাশকতামূলক অগ্নিসংযোগ করার মতো দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জাসদের চরমপন্থীরা লিপ্ত হয়।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও চোরাগোপ্তা হামলা: জাসদ কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর হামলা চালায়নি, তারা তৃণমূলের আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে চোরাগোপ্তা হামলা শুরু করে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য (এমপি), ইউপি চেয়ারম্যান এবং শত শত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী জাসদ ও অন্যান্য উগ্র বামপন্থী ক্যাডারদের হাতে নিহত হন।

১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চের স্মারক ঘটনা: জাসদের উগ্রতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ। জাসদের একটি বিশালাকার মিছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর সরকারি বাসভবন ঘেরাও করতে যায়। মিছিলে থাকা বেশ কিছু সশস্ত্র ক্যাডার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করে এবং হামলা চালায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এই মর্মান্তিক সংঘর্ষে জাসদের প্রায় ৫০ জন কর্মী নিহত হন। এটি ছিল জাসদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নথিবদ্ধ প্রাণহানির ঘটনা।

‘জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মী হত্যা’ কতটুকু সত্য?

জামায়াত-শিবির ও পাকিস্তানি দোসররা সবসময়ই রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রোপাগান্ডায় বারবার বলে, “বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।” কিন্তু যখন ঐতিহাসিক দলিল, নিরপেক্ষ তথ্য এবং পরিসংখ্যানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই দাবি বিশ্লেষণ করা হয়, তখন থলের বেড়াল বেরিয়ে পড়ে।

জাসদের পক্ষ থেকেও দীর্ঘকাল দাবি করা হয়েছে যে, শেখ মুজিবের আমলে তাদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে এই সংখ্যার কোনো সঠিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। তৎকালীন কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (যেমন- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল), দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম বা সরকারি দলিলে এই ‘৩০ হাজার’ সংখ্যার সমর্থন পাওয়া যায় না। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এটি একটি রাজনৈতিক অতিরঞ্জন

‘৩০ হাজার’ সংখ্যার বস্তুনিষ্ঠ ব্যবচ্ছেদ

১. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল' (Amnesty International) ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বন্দি ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অ্যামনেস্টির তৎকালীন নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার, যার মধ্যে একটা বড় অংশ ছিল জাসদ ও অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপের সদস্য। কিন্তু অ্যামনেস্টির পুরো প্রতিবেদনে কোথাও '৩০ হাজার হত্যাকাণ্ড'-এর সামান্যতম ইঙ্গিত বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২. দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নথি: তৎকালীন সময়ে ঢাকার প্রভাবশালী দ্য ডেইলি ইত্তেফাক, সংবাদ, কিংবা আন্তর্জাতিক সাময়িকী ফার ইস্টার্ন অর্থনৈতিক রিভিউ (Far Eastern Economic Review) বা দ্য গার্ডিয়ান-এর সংবাদ অনুসন্ধানে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাগুলো বিস্তারিত কভার করা হতো। সব গণমাধ্যমের তথ্য একত্র করলেও এই সংখ্যাটি কোনোভাবেই কয়েক শর বেশি অতিক্রম করে না।

৩. জাসদের নিজস্ব তালিকা প্রকাশে ব্যর্থতা: স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরেও বেশি সময়ে জাসদ (রব, ইনু বা বাসদ) কখনোই তাদের '৩০ হাজার নিহত নেতাকর্মী'র কোনো তালিকা, নাম, ঠিকানা বা শহীদদের স্মরণে কোনো সুনির্দিষ্ট স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করতে পারেনি।

৪. রাজনৈতিক অতিরঞ্জন (Exaggeration): বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, '৩০ হাজার' সংখ্যাটি কোনো তথ্যভিত্তিক সত্য নয়; এটি ছিল আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালকে 'স্বৈরাচারী' 'রক্তপিপাসু' হিসেবে বিশ্বদরবারে চিত্রায়িত করার উদ্দেশ্যে তৈরি এক কাল্পনিক রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা।

রাজনৈতিক সংঘর্ষ, জাসদের সশস্ত্র আক্রমণ এবং রক্ষীবাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধে জাসদের সদস্য, পুলিশ, রক্ষীবাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষসহ উভয় পক্ষে কয়েকশত প্রাণহানি ঘটেছিল যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু এই বাস্তব সংখ্যাকে ৩০ হাজারে উন্নীত করা ঐতিহাসিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সহিংসতা কি একতরফা ছিল?

১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করতে গিয়ে রক্ষীবাহিনীর সাথে সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে রক্ষীবাহিনীর গুলিতে জাসদের প্রায় ৫০ জন কর্মী নিহত হন। এটি ছিল একটি নথিবদ্ধ বড় হত্যাকাণ্ড।

এছাড়া ক্রসফায়ার বা রাজনৈতিক সংঘর্ষে উভয় পক্ষের মানুষ মারা গিয়েছিল। কিন্তু সংখ্যাটি কোনোভাবেই ৩০ হাজারে পৌঁছানোর মতো কোনো প্রমাণ বা তালিকা আজ পর্যন্ত কেউ পেশ করতে পারেনি।

ইতিহাস বলে, সেই সময়ের সহিংসতা ছিল দ্বিপাক্ষিক। জাসদের সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’ থানা লুট, ব্যাংক ডাকাতি এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ পুলিশের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালাত। রাষ্ট্র যখন এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করতে যায়, তখনই রক্ষীবাহিনীর সাথে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

জাসদ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে এত উগ্র ছিল কেন?

জাসদের উত্থান হয়েছিল মূলত তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন 'ছাত্রলীগ' থেকে বেরিয়ে আসা একটি অংশ নিয়ে। সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব এবং শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে এই দলটি শুরু থেকেই 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার কথা বলে তরুণ সমাজকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। জাসদের সেই সময়ের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা একটি নবজাতক রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার জন্য চরমপন্থা বেছে নিয়েছিল।

সশস্ত্র বিপ্লবের ভুল ধারণা: জাসদের তৎকালীন নীতিনির্ধারকরা মনে করেছিলেন, রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব বা চীনের মাও সে তুং-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো বাংলাদেশেও একটি 'বিপ্লব' সম্ভব। তারা মনে করেছিল রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব বা চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো বাংলাদেশেও সশস্ত্র পথে ক্ষমতা দখল সম্ভব। তারা সংসদীয় গণতন্ত্রকে ‘বুর্জোয়া’ ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র পন্থায় ক্ষমতা দখল করা। এই ভুল রাজনৈতিক দর্শনের কারণে তারা হাজার হাজার মেধাবী তরুণকে পড়াশোনা ছেড়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করে, যা রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে।

আন্তর্জাতিক স্নায়ুযুদ্ধের ঢেউ: তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধে (Cold War) টালমাটাল। সোভিয়েতপন্থী ও চীনপন্থী বামপন্থীদের মধ্যকার বিরোধের ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছিল। এই স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের বামপন্থীদের ওপরও পড়েছিল। জাসদ চরমপন্থী বাম ধারার প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের ইন্ধন পায় বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। তারা তৎকালীন সরকারকে 'ভারতীয় আধিপত্যবাদের দালাল' হিসেবে প্রচার করে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ তৈরির চেষ্টা করেছিল।

বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি: ১৯৭৪ সালে যখন বিশ্বব্যাপী মন্দা এবং দেশের ভেতরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাদ্য সংকট দেখা দেয়, তখন জাসদ পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। তারা লঙ্গরখানাগুলোতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, থানা লুট এবং পাটের গুদামে আগুন দেওয়ার মতো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করতে গিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জাসদের এসব কর্মকাণ্ড সরকারকে কঠোর হতে বাধ্য করেছিল, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে দেয়।

শেখ মুজিব পরবর্তী জাসদ কেন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল?

একটি ঐতিহাসিক ও জটিল বিস্ময় হলো যে জাসদ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছিল, সরকারি বাহিনীকে অচল করে দিয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারকে বিপর্যস্ত করেছিল, সেই জাসদ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর কেন হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? কেন তারা তৎকালীন খুনি খন্দকার মোশতাক বা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারল না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ‘গণতান্ত্রিক নমনীয়তা’ বনাম ‘সামরিক শাসনের বুটের তলা’-র পার্থক্যের মধ্যে।

সামরিক দমন নিপীড়ন

বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজপথের আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন খাঁটি গণতান্ত্রিক নেতা। হাজারো উস্কানি, থানা লুট এবং জাসদের সশস্ত্র তাণ্ডব সত্ত্বেও শেখ মুজিব চেষ্টা করেছিলেন জাসদকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে। তিনি জাসদকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করতে দিয়েছিলেন। জাসদকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়েছিল, সংসদীয় বিরোধী দল হিসেবে কাজ করার সুযোগ ছিল এবং রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয়েছিল। জাসদ মূলত বঙ্গবন্ধুর দেওয়া 'গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার সুযোগ'-কে অপব্যবহার করেই উগ্রতা দেখানোর সুযোগ পেয়েছিল। জাসদের উৎপাত ও সন্ত্রাসের তুলনায় বঙ্গবন্ধু সরকার তুলনামূলকভাবে অনেক কম দমননীতি অবলম্বন করেছিল।

কিন্তু ১৫ আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা চলে যায় সামরিক জান্তা ও খন্দকার মোশতাকের হাতে। পরবর্তীতে জাসদেরই প্রত্যক্ষ মদদে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত হয় তথাকথিত ‘সিপাহী-জনতা বিপ্লব’। জাসদ নেতা কর্নেল তাহের গৃহবন্দী জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতায় বসান। জাসদ ভেবেছিল তারা জিয়াউর রহমানকে ব্যবহার করে নিজেদের 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' কায়েম করবে।

কিন্তু সামরিক সরকার কঠোর দমননীতি অবলম্বন করে। ক্ষমতার খেলায় চরম চতুর জেনারেল জিয়াউর রহমান উল্টো জাসদের ওপর নির্মম আঘাত হানেন:

সামরিক বিচার ও কর্নেল তাহেরের ফাঁসি: জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসেই ১৯৭৬ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক গোপন প্রহসনের সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জাসদের প্রাণপুরুষ কর্নেল আবু তাহেরকে ফাঁসি দেন।

গণগ্রেপ্তার ও শীর্ষ নেতাদের সাজা: সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, মেজর (অব.) জলিল, হাসানুল হক ইনুসহ জাসদের প্রথম সারির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। জাসদের শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশকেই কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।

রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ: সামরিক ফরমান জারি করে জাসদের রাজনৈতিক কার্যক্রম কঠোর হস্তে পিষে ফেলা হয়।

সামরিক শাসনের সেই বুটের তলায় জাসদের উগ্রতার বেলুন মুহূর্তেই ফুটে যায়। গণতান্ত্রিক সরকারের সুবাতাস পেয়ে যে জাসদ সিংহ হয়ে উঠেছিল, সামরিক সরকারের নির্মমতায় তারা লেজ গুটিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

খন্দকার মোশতাক এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান বামপন্থী বা যেকোনো রাজনৈতিক বিরুদ্ধ মতকে কঠোর হাতে দমন করেন। জাসদ যে 'গণতন্ত্রের' সুযোগ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সময় উগ্রতা দেখিয়েছিল, সামরিক শাসনের আমলে সেই সুযোগটি তারা আর পায়নি।

সিপাহি-জনতা বিপ্লবের ব্যর্থতা ও জাসদে বিভাজন

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ‘সিপাহি-জনতা বিপ্লব’ এর পেছনে জাসদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। বামপন্থী মতাদর্শী কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে তারা চেয়েছিল সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি শ্রেণিহীন কাঠামো তৈরি করতে। কিন্তু রাজনীতির খেলায় তারা হেরে যায় জেনারেল জিয়ার কাছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জেলে থাকায় দলটি সাংগঠনিকভাবে দিশেহারা হয়ে পড়ে।

কর্নেল আবু তাহেরের ফাঁসি এবং অন্যান্য নেতাদের দীর্ঘ কারাদণ্ড জাসদকে সাংগঠনিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চাপ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জাসদ বহু খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাসদ, জাসদ (রব), জাসদ (ইনু) এমন নানা ধারায় দলটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তাদের তথাকথিত 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' এর নেশা কেটে গিয়ে তখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়। ফলে তারা তাদের পুরনো উগ্রতা হারিয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়ে এবং কার্যত রাজনীতির মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে।

শেখ মুজিবের শাসনকাল বনাম সামরিক শাসনের বাস্তব চিত্র

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং পরবর্তী সামরিক শাসকদের শাসনকালে জাসদ ও বিরোধী মত দমনে নেওয়া পদক্ষেপের একটি তথ্যভিত্তিক তুলনা নিচে সারণী আকারে দেওয়া হলো:

মূল মূল্যায়নের ক্ষেত্র

বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল (১৯৭২ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫)

জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকাল (১৯৭৫ – ১৯৮১)

রাজনৈতিক দর্শনের ধরন

সংসদীয় গণতন্ত্র, সাংবিধানিকতা ও জাতীয়তাবাদ।

সামরিক শাসন, সামরিক ফরমান ও মার্শাল ল।

জাসদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

উগ্রতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক উপায়ে মোকাবিলা ও রাজনৈতিক স্পেস প্রদান।

চরম দমনপীড়ন, গোপন ট্রাইব্যুনাল ও রাজনৈতিক বিনাশ।

আইনি প্রক্রিয়া

প্রচলিত আদালত, রক্ষীবাহিনী আইন ও আইনি ব্যবস্থা।

সামরিক ট্রাইব্যুনাল, সামারি মার্শাল ল কোর্ট।

শীর্ষ নেতৃত্বের পরিণতি

জাসদ নেতারা মুক্ত থেকে সভা-সমাবেশ ও নির্বাচন করার সুযোগ পান।

কর্নেল তাহেরের ফাঁসি, রব-জলিল-ইনুসহ শীর্ষ নেতৃত্বের দীর্ঘ কারাদণ্ড।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

জাসদের মুখপত্র 'দৈনিক গণকণ্ঠ' সাময়িক বন্ধের আগে অবাধে সরকারের সমালোচনা করত।

সামরিক সেন্সরশিপ ও কঠোর গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ।

ঐতিহাসিক ফলাফল

রাষ্ট্রের ভিত্তি রক্ষায় সশস্ত্র আন্দোলন দমনের চেষ্টা।

জাসদকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু ও টুকরো টুকরো করে দেওয়া।

জাসদের ভুল রাজনীতি কীভাবে ১৫ আগস্টের পথ প্রশস্ত করেছিল?

ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে একটি সত্য আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট: ১৯৭২-১৯৭৫ সালে জাসদের হঠকারী ও সশস্ত্র রাজনীতি কেবল তাদের নিজস্ব দলের ক্ষতি করেনি, বরং বাংলাদেশ নামক সদ্যজাত রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি করেছিল।

রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা: একটি ভঙ্গুর ও আন্তর্জাতিকভাবে চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশকে পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল সর্বজনীন রাজনৈতিক ঐক্য। কিন্তু জাসদের উগ্র কর্মকাণ্ড সরকারকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তামূলক কাজে ব্যস্ত রাখতে বাধ্য করেছিল।

১৫ আগস্টের পথ প্রশস্ত করা: জাসদ তাদের অপপ্রচার, সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো এবং দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে ১৫ আগস্টের দেশি-বিদেশি খুনি চক্রান্তকারীদের জন্য একটি উপযুক্ত মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল। তারা ভেবেছিল শেখ মুজিবের পতন হলে তারা ক্ষমতায় আসবে; কিন্তু বাস্তবে পতন ঘটেছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল চেতনার।

জাসদের কারণে ‘নিউক্লিয়াস’ ও মুক্তিযুদ্ধের ভেতরের ফাটল (১৯৬২–১৯৭১)

জাসদের জন্ম হঠাৎ করে ১৯৭২ সালে হয়নি; এর বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে।

স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ (নিউক্লিয়াস): ১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ভেতরে একটি গোপন সংগঠন তৈরি হয়, যার নাম ছিল 'নিউক্লিয়াস'। এই নিউক্লিয়াসের মূল উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁদের অনুগত শ্রদ্ধা থাকলেও তাঁদের কাজের ধরণ ছিল গোপন ও বিপ্লবী।

মুজিব বাহিনী (BLF) বনাম সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র' (RAW)-এর সহায়তায় এবং শেখ ফজলুল হক মনি ও সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (BLF) বা ‘মুজিব বাহিনী’। মূল মুক্তিবাহিনী (যা তাজউদ্দীন আহমদের প্রবাসী সরকারের অধীনে ছিল) থেকে আলাদা হয়ে এই বাহিনী পরিচালিত হতো। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতেই নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের একধরনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দূরত্ব তৈরি হয়।

স্বাধীনতার পর এই মুজিব বাহিনীর তরুণেরাই মনে করেছিলেন তাঁরা রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করেছেন, তাই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।

‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ ও তরুণ সমাজের মোহভঙ্গ

স্বাধীনতার পরপরই দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ, প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা, চোরাচালান এবং কিছু স্থানীয় নেতার দুর্নীতি সাধারণ মানুষকে হতাশ করে। এই সুযোগে সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব এবং শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে জাসদ 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র'-এর বয়ান নিয়ে হাজির হয়। জাসদের আদর্শিক ভিত্তি হলো:

শ্রেণি সংগ্রাম ও বিপ্লব: তাঁরা বিশ্বাস করতেন ১৯৭১ সালে কেবল 'ভৌগোলিক স্বাধীনতা' এসেছে, কিন্তু শ্রমিক-কৃষকের ‘শ্রেণি শোষণের’ অবসান ঘটেনি।

সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান: তারা ১৯৭২ সালের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে 'ধনী ও বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষাকারী ব্যবস্থা' হিসেবে আখ্যা দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধিপত্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা জাসদের ‘বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের’ মন্ত্রে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জাসদ সমর্থিত জাসদ ছাত্রলীগ বিপুল জয় লাভ করে, যা মূল আওয়ামী লীগের ওপর বড় আঘাত ছিল।

সশস্ত্র গণবাহিনী (Gonobahini) ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম

জাসদ যখন অনুধাবন করে যে গণতান্ত্রিক উপায়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব নয়, তখন তাঁরা গোপন সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’ গঠন করে। গণবাহিনীর প্রধান হন পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছেড়ে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) আবু তাহের (বীর উত্তম)। গণবাহিনীর উল্লেখযোগ্য ধ্বংসাত্মক অপারেশন হলো:

ভারতীয় হাই কমিশনারকে অপহরণ চেষ্টা: ১৯৭৫ সালের ২৫ নভেম্বর (বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর) জাসদের গণবাহিনীর ক্যাডাররা ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে অপহরণ করার জন্য ভারতীয় হাইকমিশনে সশস্ত্র হামলা চালায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক বন্দী মুক্ত করা। পুলিশের গুলিতে ৪ জন জাসদ ক্যাডার ঘটনাস্থলেই মারা যান।

সাংসদ ও নেতাদের হত্যা: ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য (যেমন জহুরুল ইসলাম মেহের), ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং শত শত স্থানীয় কর্মীকে হত্যা করে গণবাহিনী।

‘বিপ্লবী ব্যাংক ডাকাতি’: জাসদ তাদের ভাষায় ‘বিপ্লবী ফান্ড’ গড়ার জন্য ব্যাংক ও সরকারি ট্রেজারি লুট করাকে নীতিগতভাবে বৈধ মনে করত।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB) ও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া

জাসদ ও উগ্র বামপন্থী (যেমন সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি)-দের উগ্রতা ও সশস্ত্র নাশকতা দমনে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি আদেশের মাধ্যমে 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' (Jatiya Rakkhi Bahini) গঠন করা হয়। রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা ও বিতর্কগুলো হলো:

শৃঙ্খলার সংকট: নিয়মিত পুলিশ বাহিনীর সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস দমনের মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা আধুনিক অস্ত্র ছিল না। ফলে রক্ষীবাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও বিতর্ক: রক্ষীবাহিনীর প্রধান কাজ ছিল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সশস্ত্র জঙ্গিবাদ দমন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে রক্ষীবাহিনীর কিছু সদস্য অতিউৎসাহী হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিনা বিচারে আটক এবং টর্চারের আশ্রয় নেন।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: রক্ষীবাহিনী বনাম জাসদের গণবাহিনীর এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দেশের সাধারণ আইনশৃঙ্খলা। জাসদ তাদের প্রচারপত্রে রক্ষীবাহিনীকে ‘শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত পেটুয়া বাহিনী’ এবং ‘ভারতীয় স্বার্থরক্ষাকারী’ হিসেবে চিত্রায়িত করে দেশে তীব্র ভারত-বিরোধী ও সরকার-বিরোধী জনমত তৈরি করে।

১৯৭৪ সালের মহামারী, বাকশাল (BAKSAL) এবং জাসদের সন্ত্রাস

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এর পেছনে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট, দেশের অভ্যন্তরে বন্যা, চোরাচালান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সাহায্য (PL-480) বন্ধের রাজনৈতিক চাল দায়ী ছিল।

নাশকতা ও পাটের গুদামে আগুন: সংকটকালে জাসদ লঙ্গরখানাগুলোতে কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পাট ছিল বাংলাদেশের আয়ের মূল উৎস; জাসদের ক্যাডাররা পাটের গুদামে আগুন দিয়ে দেশের রপ্তানি আয় অচল করার চেষ্টা করে বলে তৎকালীন সরকারি প্রতিবেদনে উঠে আসে।

বাকশাল (BAKSAL) গঠন: দেশে চলমান নৈরাজ্য, উগ্রপন্থীদের সামাল দেওয়া এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের শুরুতে সকল রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করে জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক ও আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠন করেন। জাসদ বাকশালকে 'একনায়কত্ব' আখ্যা দিয়ে তাদের সশস্ত্র হামলা আরও জোরদার করে।

৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ কর্নেল তাহের, জিয়াউর রহমান এবং ট্র্যাজিক মহাপ্রয়াণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাসদের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম বিভ্রান্তিকর। তারা মনে করেছিল, শেখ মুজিবের পতনের ফলে 'বিপ্লবের পথ উন্মুক্ত হয়েছে'। ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের নাটকীয়তা:

৩ নভেম্বর: ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে ক্ষমতা নেন এবং ১৫ আগস্টের খুনিদের বঙ্গভবন থেকে তাড়ান।

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা: কর্নেল তাহের সেনাবাসগুলোর ভেতরে সাধারণ জোয়ানদের সংগঠিত করে 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' গঠন করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর অফিসারদের শাসন উৎখাত করে 'শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা' গড়ে তোলা।

৭ই নভেম্বর (সিপাহী-জনতা বিপ্লব): কর্নেল তাহেরের নির্দেশে সেনাসদস্যরা অভ্যুত্থান ঘটায় এবং জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে। জিয়াকে মুক্ত করার পর জাসদ ভেবেছিল জিয়া তাঁদের হাতের পুতুলে পরিণত হবেন।

স্বৈরাচার বনাম রাষ্ট্র রক্ষা

জাসদের তৎকালীন রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি সদ্য স্বাধীন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং সামাজিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে ক্ষমতায় যাওয়ার যে হঠকারী চিন্তা তারা করেছিল, তা দেশের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি। বরং তাদের উস্কানি এবং অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড প্রকারান্তরে ১৫ আগস্টের খুনিদের জন্য পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।

জাসদ যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তা যেকোনো দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি ছিল। রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করা প্রতিটি সরকারের দায়িত্ব।

বঙ্গবন্ধু কোনো ফেরেশতা ছিলেন না, তাঁর শাসনামলেরও সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু সেই সমালোচনা যখন সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার রূপ নেয়, তখন তার ফল ভোগ করতে হয় পুরো জাতিকে।

জাসদ তার উগ্রতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে দুর্বল করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তারা বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিল দীর্ঘ এক সামরিক শাসনের অন্ধকার অধ্যায়। কিন্তু তথাকথিত '৩০ হাজার হত্যা'র তকমা দিয়ে তাঁকে খুনি হিসেবে চিত্রায়িত করা একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা মাত্র

ইতিহাস কারো অনুকম্পা করে না

আজ ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে এক অদ্ভুত ও অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়। যে জাসদ ১৯৭২-৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে 'স্বৈরাচার' আখ্যা দিয়েছিল, যে জাসদ রক্ষীবাহিনী ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল পরবর্তীতে সেই জাসদের শীর্ষ নেতা হাসানুল হক ইনু ও আ স ম আবদুর রব আওয়ামী লীগের গঠিত সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধুর রক্তে ভেজা নৌকার প্রতীকে নির্বাচন করেছেন।

এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে, ১৯৭২-৭৫ সালের সেই সংঘাত ও ‘৩০ হাজার নেতাকর্মী হত্যা’র জপমালা ছিল মূলত ভুল রাজনৈতিক দর্শন, ক্ষমতার মোহ এবং এক অনভিপ্রেত আবেগের ফসল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে থাকা কোনো ঈশ্বর ছিলেন না। তাঁর সরকারের আমলে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রক্ষীবাহিনীর কিছু অতিউৎসাহী পদক্ষেপ বা অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা নিশ্চিতভাবেই হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনার সুযোগ নিয়ে একটি উগ্র সশস্ত্র দলকে দিয়ে রাষ্ট্র অচল করা এবং পরবর্তীতে '৩০ হাজার হত্যা'র কাল্পনিক গল্প বানিয়ে স্বাধীনতার স্থপতিকে খুনি বানানোর অপচেষ্টা হলো ইতিহাস বিকৃতির এক নিকৃষ্ট উদাহরণ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাসদের সংঘাত ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের শৈশবের এক বেদনাদায়ক ও ট্র্যাজিক সত্য। জাসদ তাদের উগ্রতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে দুর্বল করেছিল ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তারা নিজেরাও রাজনীতি থেকে মুছে গিয়ে দেশকে তুলে দিয়েছিল দুই দশকের এক সামরিক স্বৈরাচারের অন্ধকারে। ইতিহাস অবশেষে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যা প্রোপাগান্ডাকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.