জহির রায়হান – ফাগুনের দ্বিগুণ স্বপ্নে গুম হওয়া এক সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তী পুরুষ, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও মুক্তি আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক জহির রায়হান। তাঁর সৃজনশীলতা, সাহসিকতা এবং আপোষহীন জীবনবোধ তাকে বাঙালি জাতির ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। কিন্তু এই সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টার জীবনাবসান হয়েছিল এক রহস্যময় ও মর্মান্তিক উপায়ে, স্বাধীনতার ঠিক পরেই।

TruthBangla
Aug 19, 2025
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তী পুরুষ, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও মুক্তি আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক জহির রায়হান। তাঁর সৃজনশীলতা, সাহসিকতা এবং আপোষহীন জীবনবোধ তাকে বাঙালি জাতির ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। কিন্তু এই সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টার জীবনাবসান হয়েছিল এক রহস্যময় ও মর্মান্তিক উপায়ে, স্বাধীনতার ঠিক পরেই। তিনি ফিরে এসেছিলেন স্বাধীন বাংলায়, কিন্তু নিজের ভাইকে খুঁজতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন এক অন্ধকার গুমের আড়ালে। আজ ১৯ আগস্ট তাঁর জন্মদিনে - যাঁর লেখনীতে ছিল বিদ্রোহের তেজ, আর চোখে ছিল আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন - সেই অকুতোভয় স্রষ্টার জীবনের শেষ অধ্যায়, অন্তর্ধান রহস্য এবং তাঁর কালজয়ী অবদান নিয়ে এই বিশেষ রচনা।
একাত্তরের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাহাত্তরের নিখোঁজ শিল্পী
জহির রায়হান ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি কলমকে অস্ত্রের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না। সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং রাজনৈতিক সচেতনতা - এই তিন ধারায় তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে করেছেন ঋদ্ধ। তিনি কেবল একজন লেখক বা চলচ্চিত্রকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘বিপ্লবী’। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ”, আজও যেকোনো গণ-আন্দোলন ও বিপ্লবে প্রেরণা জোগায়।
কিন্তু বিজয়ের আলো ফোটার মাত্র ৪৪ দিনের মাথায়, ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি, তিনি মিরপুর থেকে নিখোঁজ হন। তাঁর অন্তর্ধানের ঘটনাটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়, যা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য। জহির রায়হান যে কারণে ঢাকা ফিরেছিলেন তাঁর অগ্রজ ভাই, প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে, সেই একই নিয়তি যেন তাঁকে গ্রাস করেছিল।
জহির রায়হানের ব্যক্তি ও শিল্পীসত্তা – লেখনীতে বিদ্রোহের তেজ
জহির রায়হান (১৯৩৩ – ১৯৭২) তাঁর স্বল্পকালীন জীবনে যে সৃষ্টি রেখে গেছেন, তা এক বিস্ময়। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী ও লেখক।
ভাষা আন্দোলন ও সাহিত্য-চলচ্চিত্র
প্রথম লেখক: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর উপন্যাস 'আরেক ফাল্গুন' ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম শিল্পসম্মত দলিল।
চলচ্চিত্রে সমাজ বাস্তবতা: তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতেও ছিল সমাজ ও রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। 'কাঁচের দেওয়াল', 'বেহুলা' এবং বিশেষত 'জীবন থেকে নেয়া' (১৯৭০) - এই চলচ্চিত্রগুলো ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতীকী উপস্থাপনা। 'জীবন থেকে নেয়া'তে একনায়কতন্ত্র ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয় যে, ছবিটি সে সময় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রোষানলে পড়েছিল।
একাত্তরে জহির রায়হান – ক্যামেরা হাতে যুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধের সময় জহির রায়হানের ভূমিকা ছিল আপোষহীন। তিনি ক্যামেরা হাতে রণাঙ্গনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র: তাঁর পরিচালিত কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ (Stop Genocide) এবং ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ (A State Is Born) ছিল একাত্তরের গণহত্যার নৃশংসতা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার শক্তিশালী মাধ্যম। এই প্রামাণ্যচিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক: তিনি কেবল ক্যামেরা হাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ভারতীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং অর্থ সংগ্রহে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
ভাইয়ের খোঁজে স্বাধীন ঢাকায়
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। জহির রায়হান তখন কলকাতায়। দেশ স্বাধীনের পরদিনই, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন ছিল আনন্দের নয়, বরং ছিল চরম উদ্বেগের।
শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়া
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে, বিজয়ের ঠিক আগে, বাংলাদেশের সেরা মেধাবী সন্তানদের টার্গেট করে আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর ঘাতকেরা এক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালায়।
বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ: ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর সেই কালো রাতে জহির রায়হানের অগ্রজ ভাই, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারও মিরপুরের ঠিকানায় আল-বদরদের হাতে অপহৃত হন এবং এরপর আর তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
অনুসন্ধান শুরু: শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজে বের করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জহির রায়হানকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনে। তিনি শুরু করেন এক নিরলস ও বিপজ্জনক অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধান কেবল ব্যক্তিগত শোকের প্রকাশ ছিল না, এটি ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনের শক্তিগুলোকে উন্মোচন করার এক সাহসী প্রচেষ্টা।
'একাত্তরের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা' নিয়ে কাজ
জহির রায়হান বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। তিনি শুধু ভাইকে খুঁজছিলেন না, এই হত্যার নেপথ্যে জড়িত রাজাকার, আল-বদর ও পাকিস্তানি দোসরদের মুখোশ উন্মোচন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
সাক্ষ্য সংগ্রহ: তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। শোনা যায়, তিনি নাকি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিছু শীর্ষ ব্যক্তি এবং পাকিস্তানি জেনারেলদের ভূমিকা সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ছবি সংগ্রহ করেছিলেন। এই তথ্যগুলোই সম্ভবত তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মিরপুর - স্বাধীনতার পরেও যে শহর ছিল শেষ রণক্ষেত্র
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে, তখন বাঙালি জাতি উদ্যাপন করছিল এক চূড়ান্ত বিজয়। কিন্তু রাজধানী ঢাকার একেবারে পাশেই, মিরপুরে তখনো পাকিস্তানি বাহিনীর একটি অংশ, বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র রাজাকার, আল-বদর এবং বিহারী জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধে স্বাধীনতার পরেও দীর্ঘ ৪৬ দিন ধরে যুদ্ধ চলছিল।
এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ সামরিক ঘাঁটি, যেখানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো স্বাধীনতার পরও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি
১৬ ডিসেম্বরের পর পাকিস্তান বাহিনীর কিছু অংশ মিরপুরে অবস্থান করছিল এবং আত্মসমর্পণের নির্দেশ উপেক্ষা করেছিল। এই সৈন্যদের সঙ্গে ছিল বিপুল সংখ্যক স্থানীয় সশস্ত্র সহযোগী, যার মধ্যে প্রধান ছিল রাজাকার, আল-বদর এবং বিহারী জনগোষ্ঠী। এই বিহারী জনগোষ্ঠী - যারা ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তারা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে একটি বিশাল সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও মিরপুর এলাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের মূল টার্গেট ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ এবং সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া জনগোষ্ঠী।
অব্যাহত গণহত্যা ও সহিংসতা
মিরপুর তখন পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুপুরীতে। ১৬ ডিসেম্বরের আগে যেমন ছিল, স্বাধীনতার পরেও এখানে চলেছে গণহত্যা। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে এবং স্বাধীনতার পরেও অনেক শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক তথা বুদ্ধিজীবীকে ধরে ধরে নিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল সামরিক বিজয় নয়, বরং বাঙালি জাতির মনন ও মেধার কেন্দ্রকে ধ্বংস করে দেওয়া।
এই সম্মিলিত সশস্ত্র প্রতিরোধ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মিরপুর সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছিল। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বুদ্ধিজীবী হত্যার নেপথ্যে আল-বদর ও ইসলামী ছাত্র সংঘ
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল ধর্মান্ধ রাজাকার ও আল-বদরদের প্রত্যক্ষ সহায়তায়। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল সুপরিকল্পিত এবং টার্গেটেড।
ধর্মান্ধতার ব্যবহার: তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘের (পরবর্তীকালের জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন) সদস্যরা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই ঘৃণ্যতম অপরাধগুলো করেছিল। তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে হত্যাকাণ্ডকে 'হালাল' প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল।
কাদের মোল্লার ভূমিকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ধরে নিয়ে যেতে আল-বদর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল আব্দুল কাদের মোল্লা, যিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে থাকতেন। বাইরে নম্র-ভদ্র ধার্মিক হিসেবে পরিচিত হলেও, এই আল-বদর সদস্য পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঘৃণ্য অপরাধগুলো করেছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তিগুলো কীভাবে স্বাধীনতার মূল চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
চূড়ান্ত সামরিক অভিযান ও মিরপুরের মুক্তি
স্বাধীনতার পরেও মিরপুরের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দীর্ঘ দিন চলতে দেওয়া সম্ভব ছিল না। সদ্য গঠিত সরকার এবং মুক্তিবাহিনী চূড়ান্তভাবে মিরপুরকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সম্মিলিত অ্যামবুশ: ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী এক সম্মিলিত অ্যামবুশ চালায়। এটি ছিল মিরপুরের সশস্ত্র প্রতিরোধের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত।
আত্মসমর্পণ: এই অভিযানের মুখে অবশিষ্ট পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। তাদের সহযোগী বহু রাজাকার, আল-বদর ও বিহারীকেও আটক করা হয়। ৩১শে জানুয়ারিই কার্যত মিরপুরের আনুষ্ঠানিক মুক্তি ঘটে।
জহির রায়হানের অন্তর্ধান রহস্য - ৩০শে জানুয়ারির কালো দিন
স্বাধীনতার উল্লাস শেষ হওয়ার আগেই বাঙালি জাতি এক মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছিল, বরেণ্য সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের রহস্যময় নিখোঁজ হওয়া। তিনি ফিরেছিলেন বিজয়ের বাংলাদেশে, কিন্তু নিজের অপহৃত ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে নিজেই গুম হয়ে গেলেন ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ে।
জহির রায়হান তাই ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীন ঢাকায় ফিরে আসেন শোক আর অনুসন্ধানের এক তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে। চলচ্চিত্র, সাহিত্য এবং ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর মতো প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে যিনি আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি করেছিলেন, সেই আপোষহীন শিল্পী তাঁর ভাইয়ের সন্ধানে নেমে নিজেই এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হন। তাঁর এই অনুসন্ধানই তাঁকে নিয়ে যায় ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারির সেই ভয়াবহ দিনে, মিরপুরের রণাঙ্গনে।
অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপট - মিরপুরের শেষ রণক্ষেত্র
জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন ছিল না; এটি মিরপুরের সেই সময়কার অস্থির পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ভাইয়ের খোঁজে নেমে জহির রায়হান জানতে পারেন যে, মিরপুর ১২ নম্বর এলাকার কালাপানি পানির ট্যাংক সংলগ্ন অঞ্চলে শহীদুল্লাহ কায়সারের মতো অপহৃত আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর খোঁজ পাওয়া যেতে পারে।
জহির রায়হান বুঝতে পেরেছিলেন, এটি শুধু বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এই সূত্র ধরেই তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ পাকিস্তানি অফিসার ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, তাঁর কাছে এমন কিছু ছবি বা তথ্য ছিল, যা ফাঁস হলে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির মূল পরিকল্পনাকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হতো। আর এই তথ্য সংগ্রহের কাজই তাঁর জীবনে চরম বিপদ ডেকে আনে।
৩০শে জানুয়ারির ঘটনা - এক দুঃসাহসী অভিযান
শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজে বের করার তীব্র তাগিদ জহির রায়হানকে ৩০শে জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে মিরপুরে এক বিপজ্জনক অভিযানে টেনে নিয়ে যায়। জহির রায়হান তাঁর অনুসন্ধানকে আরও কার্যকর করার জন্য সরকারি সহায়তার দ্বারস্থ হন।
সরকারি দল: তিনি তাঁর ভাইকে খুঁজতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের একটি দলের সাথে মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এই অভিযান ছিল মূলত অপহৃতদের সন্ধানের জন্য একটি প্রাথমিক তল্লাশি অভিযান।
লক্ষ্য: তাদের লক্ষ্য ছিল মিরপুর ১১ বা ১২ নম্বর এলাকার সেই কালাপানি পানির ট্যাংক সংলগ্ন এলাকা, যা অপহৃতদের সন্ধান পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিল।
গুলিবর্ষণ ও নিখোঁজ হওয়া
কালাপানি পানির ট্যাংকের সামনে পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। মিরপুরে ওঁত পেতে থাকা সশস্ত্র পাকিস্তান আর্মি (অবশিষ্ট অংশ), আল-বদর ও বিহারীরা তাদের ওপর আকস্মিক এবং প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু করে। এই প্রচণ্ড গোলাগুলির মুখে সেনাবাহিনী ও পুলিশের দলটি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা শুরু করে।
সেই তীব্র গুলিবর্ষণ এবং বিশৃঙ্খলার আড়ালেই জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যান। প্রচলিত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্যমতে, সেই সশস্ত্র আল-বদর বা তাদের সহযোগী সশস্ত্র বিহারীরাই তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর আর তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁর লাশটিও ছিল চিরতরে গুম।
এই নিখোঁজ হওয়া ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পরিকল্পিত রাজনৈতিক গুমগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা স্বাধীনতার ৪৪ দিনের মাথায় বাঙালি জাতিকে আরেকবার শোকে স্তব্ধ করে দেয়।
অমীমাংসিত রহস্যের সূত্র - কে ছিল নেপথ্যে?
জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং এর পেছনে একাধিক সূত্র কাজ করেছিল বলে ধারণা করা হয়। তাঁর অন্তর্ধানের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ বা সূত্র অনুমান করা হয়:
বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ ও উন্মোচনের প্রচেষ্টা
জহির রায়হান তাঁর ভাইয়ের অনুসন্ধানের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রকৃত চিত্র এবং এর নেপথ্যের মূল হোতাদের নাম জনসম্মুখে আনতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি নিশ্চিতভাবেই বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ স্থানীয় পাকিস্তানি অফিসার এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ছবি সংগ্রহ করে ফেলেছিলেন। এই তথ্য ফাঁস হলে কেবল পাকিস্তানপন্থী দোষীরাই নয়, বরং সদ্য স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির মুখোশও খুলে যেত। এই প্রমাণগুলোই তাঁকে টার্গেটে পরিণত করেছিল।
জহির রায়হান ছিলেন একজন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং আপোষহীন লেখক ও চলচ্চিত্রকার। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর 'স্টপ জেনোসাইড' বা 'জীবন থেকে নেয়া'র মতো কাজগুলো ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের দোসরদের আদর্শের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। তাঁর আপোষহীন ভূমিকা এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শের কারণে পরাজিত চরমপন্থী শক্তি তাঁকে পূর্ব থেকেই টার্গেট করেছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পরেও প্রতিশোধের আগুন তাদের ভেতরে জিইয়ে ছিল।
মিরপুরের সশস্ত্র চক্র ও চরমপন্থী মনোভাব
৩০শে জানুয়ারির ঘটনাটি ঘটেছিল মিরপুরের সেই অংশে, যেখানে পরাজিত আল-বদর ও বিহারী চক্র তখনও চরমপন্থায় বিশ্বাসী ছিল এবং তারা স্বাধীন বাংলাদেশে নিজেদের পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।
পরাজয়ের প্রতিশোধ: এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তখনও সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়নি। জহির রায়হান যখন সরকারি নিরাপত্তা দলের সাথে তাদের ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন, তখন তারা এটিকে তাদের ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখে এবং সুযোগ পেয়ে তাঁকে অপহরণ করে বা হত্যা করে। এটি ছিল তাদের চরম প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ।
জহির রায়হান আজও অমর
জহির রায়হানের ব্যক্তিগত জীবন যেখানে চরম ট্র্যাজেডি দিয়ে শেষ হলো, সেখানে তাঁর শিল্পীর জীবন অমর হয়ে আছে।
প্রেরণার প্রতীক: তাঁর কালজয়ী উক্তি “আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ” আজও যেকোনো প্রগতিশীল আন্দোলনে, ছাত্র মিছিলে, বা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে স্লোগানে ব্যবহৃত হয়। তিনি আজও বাঙালির প্রতিবাদ, সংগ্রাম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।
চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের প্রভাব: তাঁর সাহিত্যকর্ম, যেমন - ‘হাজার বছর ধরে’, ‘বরফ গলা নদী’, এবং চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং জাতিসত্তার সঙ্গে পরিচিত করে চলেছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন শিল্পী চাইলেই তাঁর সৃষ্টি দিয়ে সমাজ ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারেন।
এক সাহসী লেখককে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা
জহির রায়হান স্বাধীনতাকে কেবল দেখেননি, তিনি এর জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তিনি স্বাধীন দেশে ফিরে এসেছিলেন ভাইকে খুঁজতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই সেই স্বাধীনতার অপূর্ণতার শিকার হলেন। তাঁর অন্তর্ধান একটি জাতিকে বুঝিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের পরেও শত্রু সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়নি, বরং তারা সুযোগ বুঝে আঘাত হানতে পারে।
আজ তাঁর জন্মদিনে, আমরা তাঁকে জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। জহির রায়হান আজও আছেন আমাদের স্মৃতিতে, মগজে, কিংবা কোমল হৃদয়ে - প্রতিটা স্লোগানে, মিছিলে, আর মুক্তি ও প্রগতির স্বপ্নে। তাঁর অকালমৃত্যু আমাদেরকে বারংবার মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার মূল্য কত রক্তক্ষয়ী এবং সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করার সংগ্রামও কত কঠিন ও দীর্ঘ। জহির রায়হানের আদর্শই হোক আমাদের প্রেরণার উৎস।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















