জহির রায়হান – ফাগুনের দ্বিগুণ স্বপ্নে গুম হওয়া এক সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা
ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্রান্তিকালের সবচেয়ে বড় এবং নির্মম ট্র্যাজেডির নাম জহির রায়হান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তী পুরুষ, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও মুক্তি আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক। যিনি শুধু ক্যামেরা দিয়ে যুদ্ধ করেননি, যিনি তাঁর কলমকে বানিয়েছিলেন শোষকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু বিজয়ের আলো ফোটার মাত্র ৪৪ দিনের মাথায়, ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি, স্বাধীন বাংলার বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলেন এই সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সেই বিজয়ের আলোয় যখন পুরো জাতি ভাসছিল, ঠিক তখনই সদ্য স্বাধীন দেশের অলিতে-গলিতে জমছিল এক গভীর অন্ধকার ষড়যন্ত্রের মেঘ। বিজয়ের সেই আনন্দোচ্ছ্বাসের সমান্তরালে চলছিল এদেশীয় বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ক্ষত নিয়ে স্বজনদের হাহাকার।
এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্রান্তিকালের সবচেয়ে বড় এবং নির্মম ট্র্যাজেডির নাম জহির রায়হান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তী পুরুষ, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও মুক্তি আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক। যিনি শুধু ক্যামেরা দিয়ে যুদ্ধ করেননি, যিনি তাঁর কলমকে বানিয়েছিলেন শোষকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু বিজয়ের আলো ফোটার মাত্র ৪৪ দিনের মাথায়, ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি, স্বাধীন বাংলার বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলেন এই সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টা।
নিজের অপহৃত বড় ভাই, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজেই পরিণত হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ও সবচেয়ে বড় ‘অমীমাংসিত গুম’ এর শিকারে। আজ তাঁর স্মরণে, তাঁর কালজয়ী অবদান, বিপ্লবের দর্শন এবং মিরপুরের সেই শেষ রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস নিয়ে এই বিস্তারিত ও গবেষণাধারার অনুসন্ধান।
জহির রায়হানের ব্যক্তি ও শিল্পীসত্তা
জহির রায়হান (১৯৩৩ – ১৯৭২) কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি চলন্ত প্রতিষ্ঠান। তাঁর স্বল্পকালীন ৩৯ বছরের জীবনে তিনি বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে যে গভীর রেখাপাত করে গেছেন, তা এক কথায় বিস্ময়কর। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে তাঁর উপস্থিতি ছিল অগ্রভাগে।
ভাষা আন্দোলনে কারাবরণ ও ‘আরেক ফাল্গুন’: ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ উত্তাল, তখন ১৯ বছরের তরুণ জহির রায়হান ছিলেন আন্দোলনের সামনের সারির ছাত্র সংগঠক। পাকিস্তান সামরিক সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভাঙার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত যারা নিয়েছিলেন, জহির রায়হান ছিলেন তাঁদের অন্যতম। ১৪৪ ধারা অমান্য করার অপরাধে পাকিস্তানি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায়।
জেলখানার অন্ধ প্রকোষ্ঠে বসে যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে রূপ নেয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কালজয়ী উপন্যাস 'আরেক ফাল্গুন'-এ। ১৯৫২-র রক্তভেজা স্মৃতি ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের ওপর রচিত এটিই প্রথম শিল্পসম্মত দলিল। এই উপন্যাসের অমোঘ একটি বাক্য পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছিল:
"আসছে ফাগুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব।"
এই একটিমাত্র অমোঘ বাণী বাঙালি জাতিকে দশকের পর দশক ধরে যেকোনো সামরিক স্বৈরাচার, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক ও নৈতিক বারুদ জুগিয়েছে।
সাহিত্যে সমাজবাস্তবতা ও মনস্তত্ত্ব: জহির রায়হানের সাহিত্যকর্ম কখনোই কেবল বিনোদন বা নন্দনতাত্ত্বিক বিলাসের মাধ্যম ছিল না। তা ছিল সামন্ততান্ত্রিক কুসংস্কার, গ্রামীণ শোষণ ও মধ্যবিত্ত সমাজের নৈতিক সংকটের এক নিপুণ অস্ত্রোপচার।
'হাজার বছর ধরে': আবহমান গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, গ্রামীণ মোড়লদের অত্যাচার এবং ধর্মের নামে গ্রামীণ নারীকে শৃঙ্খলিত করার যে নিখুঁত বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত। এটি পরবর্তীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও ভূষিত হয়।
'বরফ গলা নদী': গ্রামীণ সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে শহরের উদীয়মান নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তীব্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, বেকারত্ব, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারিবারিক ভাঙনের করুণ গল্প তিনি এই উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। 'মাহমুদ' ও 'লাইলা' চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বের বাস্তব রূপ।
'আর কত দিন': আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ভয়াবহতা, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং মানবতার অপমৃত্যুর বিরুদ্ধে লেখা তাঁর একটি অসাধারণ সৃষ্টি যা বৈশ্বিক শান্তিকামী দর্শনের পরিচয় বহন করে।
চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিপ্লব ও স্বাধিকার আন্দোলন
জহির রায়হান খুব দ্রুত উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, অক্ষর ও সাহিত্যের সীমানা পেরিয়ে চলচ্চিত্রের দৃশ্যমান মাধ্যম বা ভিজ্যুয়াল মিডিয়া সাধারণ অশিক্ষিত ও সাধারণ জনমানুষের মনকে অনেক বেশি দ্রুত ও গভীরভাবে নাড়া দিতে পারে। তাই তিনি কলমের পাশাপাশি হাতে তুলে নেন আইমো গ্রাফ্লেক্স ক্যামেরা।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্থবির ও অনুকরণপ্রিয় চলচ্চিত্র শিল্পকে তিনি এক ধাক্কায় বাণিজ্যিক বৃত্ত থেকে বের করে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ারে রূপান্তর করেন।
‘কাঁচের দেওয়াল’ থেকে ‘বেহুলা’: ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'কাঁচের দেওয়াল' ছবিতে তিনি এক আবদ্ধ ঘরের চার দেয়ালের মধ্য দিয়ে তৎকালীন অবরুদ্ধ সমাজব্যবস্থাকে ফুটিয়ে তোলেন। এরপর ১৯৬৬ সালে নির্মিত 'বেহুলা' ছবিটির মাধ্যমে তিনি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও পৌরাণিক ঐতিহ্যকে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনায় উপস্থাপন করেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের সমাজতান্ত্রিক ও বিপ্লবী সত্তা কেবল সামাজিক ও পৌরাণিক ড্রামায় আটকে থাকার মতো ছিল না।
‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০): ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া' চলচ্চিত্রটি বাংলা তো বটেই, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই এক বিরল ও অভূতপূর্ব সৃষ্টি। একটি একান্নবর্তী স্বৈরাচারী পরিবারের ভেতরের একনায়কত্ব, নির্যাতন ও চাবির গোছার কর্তৃত্বের রূপক দিয়ে তিনি পুরো পাকিস্তানের আয়ুব খান ও জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার নৃশংস শোষণকে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তোলেন।
সংসারের সর্বময় কর্ত্রী ও অত্যাচারী বড় বোন (রোজী সামাদ অভিনীত) ছিলেন সামরিক dictator বা জান্তার প্রতীক। আর শোষিত ও বন্দী ছোট ভাইয়েরা এবং তাঁদের স্ত্রীরা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি নিপীড়িত জনতা। চাবির গোছাটি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক। সেন্সর বোর্ডের চরম রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই ছবিতেই জহির রায়হান প্রথমবারের মতো রূপালী পর্দায় চিত্রায়িত করেন ২১শে ফেব্রুয়ারির নগ্নপায়ে প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সুহৃদ রাজ্জাক-সুচন্দা জোড়ার বিপ্লবী প্রতিবাদ।
'আমার সোনার বাংলা'র প্রথম প্রকাশ: এই ছবিতে তিনি প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটি (যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়) এবং কাজী নজরুল ইসলামের 'কারার ঐ লৌহকপাট'।
পাকিস্তানি সামরিক সেন্সর বোর্ড ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ করতে একাধিকবার চেষ্টা করে এবং জহির রায়হানকে সামরিক দপ্তরে ডেকে এনে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে সামরিক জান্তা সেন্সর ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয়। এটি কেবল একটি চলচ্চিত্র ছিল না, এটি ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক সরাসরি সাংস্কৃতিক মহড়া।
একাত্তরের রণাঙ্গনে ক্যামেরা হাতে জহির রায়হানের যুদ্ধ
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে ঢাকা শহরকে রক্তে ভাসিয়ে দেয় এবং বাঙালির ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে, জহির রায়হান তখন ঢাকায় ছিলেন। কিন্তু তিনি চুপ করে বসে থাকেননি। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান। সেখানে তিনি অস্ত্র হাতে নেওয়ার পরিবর্তে তাঁর পেশাদার অস্ত্র ক্যামেরাকে বানিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বজোড়া প্রচারযুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার।
‘স্টপ জেনোসাইড’ (Stop Genocide) ও বিশ্ববিবেক
কলকাতায় অত্যন্ত সীমিত সম্পদ, পুরনো একটি ক্যাসেট রেকর্ডার এবং জরাজীর্ণ ক্যামেরায় জহির রায়হান নির্মাণ করেন ২০ মিনিটের এক ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র 'স্টপ জেনোসাইড'।
এটি ছিল গণহত্যা নিয়ে তৈরি পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও শক্তিশালী ডকুমেন্টারি। এতে তিনি একদিকে তুলে ধরেন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতায় বাস্তুচ্যুত কোটি বাঙালি শরণার্থীর কাদা-পানিতে ভেসে থাকা লাশ ও হাড্ডিসার শিশুদের করুণ মুখ, অন্যদিকে লেনিনের উক্তি ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এনে বিশ্ববিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেন:
"পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ কি আজ নীরব দর্শক হয়ে থাকবে, যখন একটি পুরো জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে?"
আন্তর্জাতিক জনমত গঠন: 'স্টপ জেনোসাইড' প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি হওয়ার পর তা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে প্রদর্শন করা হয়। ছবিটি দেখার পর ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত আবেগপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলোর মাধ্যমে এটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে জহির রায়হান নির্মাণ করেন 'এ স্টেট ইজ বর্ন' (A State Is Born), যা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক যৌক্তিকতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অকাট্যভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়া আলমগীর কবীরের সাথে যৌথভাবে তিনি তদারকি করেন 'ইনোসেন্ট মিলিয়নস' এবং 'মুক্তিযুদ্ধের সংবাদের' মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো।
শহীদুল্লাহ কায়সারের অপহরণ ও ভাইয়ের খোঁজে স্বাধীন ঢাকায় জহির রায়হান
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। ঢাকায় স্বাধীনতার সূর্য উঠেছে। চারিদিকে 'জয় বাংলা' স্লোগানে মুখরিত আনন্দ মিছিল। কিন্তু এই সর্বজনীন আনন্দের দিনে জহির রায়হানের হৃদয়ে ছিল রক্তক্ষরণ ও এক চরম ব্যক্তিগত শোক। ১৭ই ডিসেম্বর জহির রায়হান কলকাতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসেন। কিন্তু তাঁর এই ফিরে আসা বিজয়ের আনন্দ উদ্যাপনের জন্য ছিল না; তা ছিল এক নিখোঁজ স্বজনকে ব্যাকুলভাবে খোঁজার আর্তনাদ।
শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়া
বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে তখন পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে ও স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধা ও মননশূন্য পঙ্গু রাষ্ট্রে পরিণত করতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসর আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকারেরা এক জঘন্য ও সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করে এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যায়।
১৪ই ডিসেম্বর কালরাতে পুরান ঢাকার কায়েতটুলির ২৯ নম্বর সাধারণ বাসা থেকে আল-বদর বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল প্রখ্যাত সাহিত্যিক, 'শহীদুল্লাহ কায়সার' (যিনি 'সংশপ্তক' ও 'সারেং বউ'-এর লেখক এবং দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক ছিলেন)-কে তাঁর চোখ বেঁধে কাদা মাখা গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায়। জহির রায়হান ঢাকায় ফিরে নিজের প্রিয় ভাইয়ের খালি ঘর ও মায়ের অঝোর কান্না দেখে স্থির থাকতে পারেননি।
তথ্য অনুসন্ধান কমিটি ও বিপজ্জনক নথি সংগ্রহ
ঢাকায় ফিরেই জহির রায়হান গঠন করেন 'বুদ্ধিজীবী নিধন তথ্য অনুসন্ধান কমিটি'। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্লুপ্রিন্টের অংশ।
জহির রায়হান দিন-রাত এক করে রায়েরবাজার, মিরপুর ও শিয়ালবাড়ির বিভিন্ন বধ্যভূমিতে ঘুরে ঘুরে লাশের স্তূপ থেকে তথ্য-প্রমাণ ও আলোকচিত্র সংগ্রহ করছিলেন। গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই তদন্তের ধারাবাহিকতায় জহির রায়হানের হাতে এমন কিছু গোপন নথি, ডায়েরি ও ছবি এসে পৌঁছায়, যাতে কেবল চিহ্নিত রাজাকার বা আল-বদর নেতাদের নামই ছিল না, বরং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের ভেতরে ও বাইরে ছদ্মবেশে থাকা অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে পড়েছিল।
জহির রায়হান ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন,
“বুদ্ধিজীবী হত্যার অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। আমাদের কাছে, এমন অনেক তথ্য ও প্রমাণ আছে যা প্রকাশ করলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে। সময় বুঝে আমি এক এক করে সব প্রকাশ করব।” (মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে: পান্না কায়সার)
জহির রায়হান একটি বিশাল সংবাদ সম্মেলন করে এই সমস্ত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চক্রান্তের দলিল বিশ্বের সামনে উন্মোচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর এই অপ্রিয় সত্যের অনুসন্ধানই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মিরপুর: স্বাধীনতার পরেও যা ছিল অবরুদ্ধ ও শেষ রণক্ষেত্র
১৬ই ডিসেম্বর সমগ্র বাংলাদেশে স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা উড়লেও, রাজধানী ঢাকার বুক ঘেঁষে থাকা মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর এলাকা দুটি ১৬ই ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ ৪৬ দিন স্বাধীন হয়নি। এটি ছিল এক কার্যত অবরুদ্ধ, বিচ্ছিন্ন ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার, আলবদর ও বিহারীদের শত্রুঘাঁটি।
সশস্ত্র পাকিস্তান ও বিহারী চক্রের দুর্গ: মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় তৎকালীন সময়ে বিপুল সংখ্যক অবাঙালি (বিহারী) জনগোষ্ঠী বসবাস করত, যাদের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের নির্দেশ অমান্য করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর '১০ম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট' এর বহু সুসজ্জিত সৈন্য এবং আল-বদর বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র সহ মিরপুরের এই অবাঙালি মহল্লাগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
মিরপুরের প্রতিটি বাড়ি, পানির ট্যাংক ও গলির মুখে বাঙ্কার ও মাইন ফিল্ড তৈরি করে এক অবরুদ্ধ 'ছোট পাকিস্তান' গড়ে তোলা হয়েছিল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত মিরপুর ছিল এক মৃত্যুপুরী। সেখান থেকে প্রতিদিন বাঙালিদের লাশ উদ্ধার হতো।
জল্লাদ কাদের মোল্লার দুর্গ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের কুখ্যাত বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী ও আল-বদর কমান্ডার আব্দুল কাদের মোল্লা (পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া 'কসাই কাদের') মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টর ও মুসলিম বাজার এলাকায় এক বিশাল ঘাতক চক্র নিয়ে অবস্থান করছিল। সাধারণ বাঙালিরা মিরপুরে প্রবেশ করলেই তাদের গলা কেটে বা গুলি করে হত্যা করা হতো।
৩০শে জানুয়ারি কালাপানির মরণফাঁদ ও জহির রায়হানের গুপ্তহত্যা
১৯৭২ সালের ২৯শে জানুয়ারি। জহির রায়হানের কাছে একটি রহস্যময় টেলিফোন কল আসে (কারো মতে কোনো এক বিশেষ ব্যক্তি এসে তথ্য দেয়)। জানানো হয় যে, তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুর ১২ নম্বর এলাকার কালাপানি পানির ট্যাংক সংলগ্ন একটি ক্যাম্পে জীবিত আটকে রাখা হয়েছে।
ফোনদাতা জহির রায়হানকে অত্যন্ত জোর দিয়ে জানায়:
"আপনার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার এখনো বেঁচে আছেন! তাঁকে মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের কালাপানি পানির ট্যাংক সংলগ্ন একটি ছোট বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আপনি যদি এখনই গিয়ে তাঁকে উদ্ধার না করেন, তবে বিহারীরা আজ রাতেই তাঁকে মেরে ফেলবে!" (মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে: পান্না কায়সার)
৩০শে জানুয়ারির সেই দুঃসাহসী যাত্রা: ভাইকে জীবিত পাওয়ার এক তীব্র ব্যাকুলতায় জহির রায়হান কোনো কালবিলম্ব না করে মিরপুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যেহেতু মিরপুর তখনও স্বাধীন হয়নি এবং অবরুদ্ধ এলাকা ছিল, তাই জহির রায়হান একা যাননি। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে সহায়তা চান।
৩০শে জানুয়ারি সকালে তিনি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (PAB) একটি দল এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি বিশেষ টহল দলের সাথে মিরপুরের দিকে যাত্রা করেন। এই যৌথ সেনা-পুলিশ দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাহসী সেনাকর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট সেলিম (যিনি পরবর্তীতে এই অপারেশনে শহীদ হন)।
কালাপানির সেই আকস্মিক অ্যামবুশ (Ambush): সকাল আনুমানিক ৯টা থেকে ৯:৩০ মিনিটের দিকে জহির রায়হান ও সেনা বাহিনীর গাড়ি বহরটি যখন মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের 'কালাপানি পানির ট্যাংক' এবং মুসলিম বাজার এলাকার মাঝামাঝি সরু গলিতে প্রবেশ করে, ঠিক তখনই ঘটে যায় এক ভয়াবহ ও পরিকল্পিত ঘটনা।
চারপাশের বিহারীদের বাড়িঘরের ছাদ, বাঙ্কার এবং আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা সশস্ত্র পাকিস্তানি সৈন্য, আল-বদর ও বিহারী মিলিশিয়ারা মেশিনগান, তিন-তিনটি স্মল আর্মস এবং চাইনিজ রাইফেল দিয়ে সেনা ও পুলিশের গাড়ির ওপর একযোগে গুলিবর্ষণ শুরু করে। আক্রমণটি এতটাই আকস্মিক ও তীব্র ছিল যে, গাড়ি থেকে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সামান্য সুযোগও সরকারি বাহিনীর জোয়ানরা পাননি।
এটি ছিল একটি নিখুঁত ও সুপরিকল্পিত অ্যামবুশ। গোলাগুলির শুরুতেই লেফটেন্যান্ট সেলিম সহ বেশ কয়েকজন সেনা ও পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। চারদিক ধোঁয়া, রক্তের বন্যা এবং প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলায় ছেয়ে যায়।
গোলাগুলির সেই বীভৎস ধোঁয়াশা ও রক্তের স্রোতের মাঝে জহির রায়হান কাদা ও খাদের মধ্যে পড়ে যান। এরপর আর কখনোই তাঁকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়নি। এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের বুক থেকে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল এক কালজয়ী সেলুলয়েড সৈনিকের জীবনপ্রদীপ।
৩১শে জানুয়ারির চূড়ান্ত সামরিক অভিযান
৩০শে জানুয়ারির এই ভয়াবহ ঘটনার পর সদ্য গঠিত বাংলাদেশ সরকার ও যৌথ বাহিনী নড়েচড়ে বসে। ৩১শে জানুয়ারি ভোর থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং চারপাশের মুক্তিবাহিনী একত্রিত হয়ে অবরুদ্ধ মিরপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অপারেশন পরিচালনা করে।
কয়েক হাজার সশস্ত্র বিহারী, আলবদর ও পাকিস্তানি অবশিষ্ট সেনা এই অপারেশনে নিহত হয় এবং বাকিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ৩১শে জানুয়ারি অপরাহ্ণে অবশেষে মিরপুর মুক্ত হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পুরো মিরপুর খুঁজেও জহির রায়হানের কোনো সন্ধান মেলেনি। তাঁর দেহটিও বধ্যভূমির শত শত লাশের মাঝে আর শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
১৯৯৯ সালের চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধান
দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে রাষ্ট্রীয় নীরবতা বজায় ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে দৈনিক ভোরের কাগজ এবং লেখক-গবেষক শাহরিয়ার কবির, ড. মুনতাসীর মামুন ও কাজী রোজি একটি বিশেষ অনুসন্ধান চালান। তারা মিরপুরের সেই দিনটির প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী আমীর হোসেনের বিবরণ: তৎকালীন পুলিশ সদস্য আমীর হোসেন (যিনি ৩০শে জানুয়ারির সেই কালাপানির অ্যামবুশ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন) জানান, গোলাগুলি শুরু হওয়ার সাথে সাথে তারা সবাই রাস্তায় ও পাশের ড্রেনে পজিশন নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি জহির রায়হানকে সেনা কর্মকর্তাদের গাড়ির পাশেই দেখেছিলেন। কিন্তু গুলিবর্ষণের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে, মিনিটের মধ্যে পুরো এলাকা লাশের স্তূপে পরিণত হয়।
৩০শে জানুয়ারি সকালে জহির রায়হান যখন মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তিনি কিন্তু একা ছিলেন না। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি মইনুল হাসেব এবং প্রখ্যাত সাংবাদিক ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অনেকে।
সামরিক এসকর্ট: মিরপুরের বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জহির রায়হানকে একটি সামরিক জিপ এবং পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান দেওয়া হয়েছিল। এই দলে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সেনা সদস্য এবং সিভিল পুলিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মইনুল হাসেবের জবানবন্দি: পরবর্তীতে মইনুল হাসেবের দেওয়া বিবরণ থেকে জানা যায়, মিরপুর প্রবেশমুখের চেকপোস্ট পার হওয়ার পরই পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠে। কালাপানি পানির ট্যাংকের কাছাকাছি পৌঁছানো মাত্র আচমকা চারদিকের বহুতল বাড়ির ছাদ ও জানালা থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো শুরু হয়। জহির রায়হান জিপ থেকে নেমে আত্মরক্ষার জন্য একটি দেয়ালের আড়ালে যান। তীব্র ধোঁয়া ও অনবরত বোমাবাজির কারণে মইনুল হাসেব ও বাকি জোয়ানরা পিছু হটতে বাধ্য হন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জহির রায়হানকে শেষবারের মতো জীবিত দেখা গিয়েছিল।
‘মুসলিম বাজার ও কালাপানি বধ্যভূমি’ আবিষ্কার
জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ২৭ বছর পর, ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে মিরপুরের মুসলিম বাজার এলাকায় একটি মসজিদের সেপটিক ট্যাংক ও ভিত্তিখনন করতে গিয়ে মাটির নিচে শত শত মানুষের খুলি, হাড়গোড় এবং পচে যাওয়া পোশাকের সন্ধান মেলে।
মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের শিয়ালবাড়ি ও কালাপানি এলাকার একাধিক গণকবর থেকে বহু মানুষের কঙ্কাল ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয়, ৩০শে জানুয়ারি নিহতদের সাথে জহির রায়হানের দেহকেও সেই বধ্যভূমির কোনো একটি গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল, যা শত শত লাশের ভিড়ে আর আলাদাভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এই আবিষ্কারটি জহির রায়হানের অন্তর্ধান রহস্যে এক নতুন আলোকপাত করে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরও যে মিরপুরে বিহারী ও আল-বদররা বিশাল বধ্যভূমি তৈরি করে রেখেছিল, এটি ছিল তার চাক্ষুষ প্রমাণ।
ফরেনসিক অনুমান: ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি কালাপানি ও মুসলিম বাজারে যে অ্যামবুশটি হয়েছিল, তাতে জহির রায়হানসহ যেসকল সেনা ও পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছিলেন, তাদের লাশগুলো এই মুসলিম বাজারের কুয়ো এবং গর্তগুলোতে ফেলে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। ডিএনএ টেস্টের সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো না থাকায় জহির রায়হানের দেহাবশেষ আলাদাভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, তবে এটিই তাঁর শেষ বিশ্রামস্থল বলে প্রবলভাবে ধারণা করা হয়।
অমীমাংসিত রহস্য: কে বা কারা ছিল নেপথ্যে?
জহির রায়হানের গুম হওয়া বা হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার এক অমোঘ রাজনৈতিক চক্রান্ত। গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ৩টি প্রধান সুনির্দিষ্ট মাত্রা কাজ করেছে:
আল-বদর ও বিহারীদের প্রতিশোধমূলক ট্র্যাপ: সবচেয়ে সরল ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বটি হলো, পরাজিত আল-বদর ক্যাডাররা (বিশেষ করে কাদের মোল্লার দল) এবং পাকিস্তানি সামরিক অবশিষ্টাংশ জানতো যে, জহির রায়হান মুক্তিসংগ্রামের এক প্রধান প্রতীক। তাঁকে হত্যা করা এবং তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই সেই কাল্পনিক ফোন কলের মাধ্যমে কালাপানির অবরুদ্ধ এলাকায় ডেকে এনে অ্যামবুশ করে হত্যা করা হয়।
বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ ধ্বংসের চেষ্টা: জহির রায়হান যে 'বুদ্ধিজীবী নিধন তথ্য অনুসন্ধান কমিটি' গঠন করেছিলেন, তার কাছে এমন কিছু প্রামাণ্য দলিল ও ট্রাঙ্ক ভর্তি ছবি জমা হয়েছিল, যা দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আল-বদর ও পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। তাঁকে হত্যা করার পর কায়েতটুলির বাসা ও তাঁর অফিস থেকে বুদ্ধিজীবী নিধন সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও ফিল্মের নেগেটিভ চিরতরে গায়েব হয়ে যায়।
সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের ছদ্মবেশী শত্রুদের আতঙ্ক: সবচেয়ে বিতর্কিত ও গভীর তত্ত্বটি হলো জহির রায়হানের অনুসন্ধানে কেবল পরাজিত পাকিস্তানিদের নামই উঠে আসেনি, বরং ১৯৭১ সালে কলকাতায় অবস্থানকালে এবং স্বাধীন ঢাকায় ফেরা পর্যন্ত বেশ কিছু প্রভাবশালী ছদ্মবেশী ব্যক্তি (যাঁরা একাত্তরে পাকিস্তানের সাথে গোপনে আঁতাত করছিলেন অথবা সিআইএ-র এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন)-র নামও তাঁর নথিতে চলে এসেছিল।
জহির রায়হান যদি তাঁর সংগৃহীত তথ্য নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতেন, তবে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিরাট তোলপাড় সৃষ্টি হতো এবং অনেক ক্ষমতাশালী ব্যক্তির ছদ্মবেশী রূপ উন্মোচিত হয়ে যেত। ফলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অলিন্দে থাকা সেই চক্রান্তকারীরাও সুকৌশলে জহির রায়হানকে সুরক্ষিত ব্যবস্থা ছাড়া অবরুদ্ধ মিরপুরের মরণফাঁদে ঠেলে দিয়েছিল কি না সেই প্রশ্নও আজ ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সংক্ষেপে জহির রায়হানের জীবন, কালজয়ী সৃষ্টিকর্ম ও শেষ মুহূর্ত
জহির রায়হানের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বর্ণাঢ্য জীবন, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের অবদান এবং মিরপুরের শেষ রণাঙ্গনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী নিচে সারণীবদ্ধ করা হলো:
বিষয় ও ক্যাটাগরি | ঐতিহাসিক তথ্য ও বিস্তারিত বিবরণ | প্রধান প্রভাব ও সাংস্কৃতিক/রাজনৈতিক তাৎপর্য |
জন্ম ও প্রাথমিক পরিচয় | ১৯৩৩ সালের ১৯শে আগস্ট; দাগনভূঞা, ফেনী। পিতা: কাজী মোজাফফর হোসেন। | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক; প্রগতিশীল রাজনীতির পতাকাবাহী। |
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা (১৯৫২) | ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে নেতৃত্বদান এবং কারাবরণ। | কারাবন্দী অবস্থায় রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস 'আরেক ফাগুন' (১৯৫৫)। |
কালজয়ী সাহিত্যকর্ম | 'হাজার বছর ধরে', 'বরফ গলা নদী', 'আর কত দিন', 'শেষ বিকেলের মেয়ে'। | গ্রামীণ সামন্তবাদ, মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক crisis ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দলিল। |
বিপ্লবী চলচ্চিত্রসমূহ | 'কাঁচের দেওয়াল' (১৯৬৩), 'বেহুলা' (১৯৬৬), 'জীবন থেকে নেয়া' (১৯৭০)। | রূপকের মাধ্যমে আইয়ুব-ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ; চলচ্চিত্রে রূপালী পর্দায় 'আমার সোনার বাংলা'র প্রথম রূপায়ন। |
একাত্তরের আন্তর্জাতিক অবদান | 'স্টপ জেনোসাইড' (Stop Genocide), 'A State Is Born' প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ। | পাকিস্তানি গণহত্যার নগ্ন দলিল বিশ্বদরবারে উপস্থাপন ও ভারতের কূটনৈতিক প্রচার জোরদার। |
শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ | ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১ কালরাতে আল-বদর ক্যাডারদের দ্বারা কায়েতটুলির বাসা থেকে অপহৃত। | ভাইকে খুঁজতে জহির রায়হানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন ও 'বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিটি' গঠন। |
রহস্যময় অন্তর্ধান (৩০ জানুয়ারি ১৯৭২) | ফোন কলের ভিত্তিতে অবরুদ্ধ মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের কালাপানিতে গমন। | সশস্ত্র বিহারী, পাকিস্তানি সেনা ও আল-বদরদের অ্যামবুশে নিখোঁজ ও শাহাদাত বরণ। |
অপারেশন মিরপুর (৩১ জানুয়ারি ১৯৭২) | যৌথ বাহিনীর তীব্র সামরিক অভিযানে অবশেষে মিরপুর শত্রুমুক্ত হয়। | জহির রায়হানের পবিত্র দেহ বা কঙ্কাল আর কখনোই শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। |
সেই রহস্যময় টেলিফোন কল
১৯৭২ সালের ২৯শে জানুয়ারি সন্ধ্যায় জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসভবনে (কারো মতে বেইলি রোডের বাসায়) একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট টেলিফোন কল এসেছিল। এই কলের বিবরণ নিয়ে পরবর্তীতে অনেক অনুসন্ধান হয়েছে।
ছদ্মনাম ও ফাঁদ: ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একজন ব্যক্তি নিজেকে 'রিফাত' বা এই জাতীয় কোনো নামে পরিচয় দেয়। সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জহির রায়হানকে জানায় যে, তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের কালাপানি পানির ট্যাংক অথবা মুসলিম বাজার এলাকার একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
পেশাদার সাইকোলজিক্যাল গেম: ঘাতকরা খুব ভালো করেই জানত, ভাইয়ের প্রতি জহির রায়হানের আবেগ কতটা তীব্র ছিল। তাই তারা কোনো লিখিত বার্তার ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি ফোনে এই তথ্য দেয়, যাতে জহির রায়হান তড়িঘড়ি করে কোনো গভীর তদন্ত ছাড়াই সেখানে ছুটে যান।
জহির রায়হানের সেই ‘গোপন ডায়েরি’ ও চলচ্চিত্র রিল
কলকাতায় অবস্থানকালেই জহির রায়হান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ওপর কাজ করছিলেন। তিনি একটি লস্ট-ডকুমেন্টারি বা বিশেষ ডায়েরি মেইনটেইন করতেন, যার নাম ছিল ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ (Let There Be Light)।
ছদ্মবেশী অপরাধীদের তালিকা: জহির রায়হান কলকাতায় থাকাকালীনই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি ঢাকায় ফিরেই বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল খলনায়কদের তালিকা প্রকাশ করবেন। তাঁর সংগৃহীত নথিতে এমন কিছু ব্যক্তির নাম ও ছবি ছিল, যারা বাইরে প্রগতিশীল ও মুক্তিযোদ্ধা সাজলেও ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানি জান্তা ও আল-বদরদের অর্থায়ন ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরামর্শ দিয়েছিল।
নথি গায়েব: জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর পরই তাঁর কায়েতটুলির বাসা এবং তাঁর ব্যক্তিগত লকার থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যা সংক্রান্ত সমস্ত ডায়েরি, খসড়া স্ক্রিপ্ট এবং দুর্লভ নেগেটিভ রিলগুলো রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়। এর থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ঘাতকরা কেবল জহির রায়হানকে শারীরিকভাবেই সরিয়ে দেয়নি, বরং তাঁর সংগৃহীত সমস্ত প্রমাণও রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবন থেকে চিরতরে মুছে দিয়েছিল।
বিভিন্ন তত্ত্ব ও প্রাপ্ত তথ্যের তুলনামূলক ছক
জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে যে প্রধান তিনটি হাইপোথিসিস বা তত্ত্ব রয়েছে, তা নিচে ছকের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হলো:
তত্ত্বের নাম | নেপথ্যের মূল শক্তি / কুশীলব | প্রধান যুক্তি ও মোটিভ (Motivations) | বর্তমান ঐতিহাসিক স্থিতি ও প্রমাণ |
১. আল-বদর ও বিহারী চক্রের প্রতিশোধ | মিরপুরে অবরুদ্ধ থাকা কুখ্যাত কাদের মোল্লার অনুসারী ও সশস্ত্র বিহারী গোষ্ঠী। | মুক্তিযুদ্ধের পরাজয়ের চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়া এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত বন্ধ করা। | সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য: ১৯৯৯ সালের মুসলিম বাজার বধ্যভূমি আবিষ্কার এবং ৩০শে জানুয়ারির প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এই তত্ত্বকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। |
২. গোপন নথির অন্তরাল (ইনসাইডার থিওরি) | সদ্য স্বাধীন দেশের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশী প্রভাবশালী মহল। | জহির রায়হানের কাছে থাকা 'গোপন ডায়েরি' ও অপরাধীদের তালিকা প্রকাশ আটলানো। | আংশিক প্রমাণিত: জহির রায়হানের মৃত্যুর পর তাঁর বাসা থেকে সমস্ত গবেষণামূলক নথিপত্র ও ফিল্ম রিল গায়েব হয়ে যাওয়া এই তত্ত্বের সত্যতা নির্দেশ করে। |
৩. ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র | আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কিছু গোয়েন্দা সংস্থা (যেমন পাকিস্তানের ISI-এর স্লিপার সেল)। | বাংলাদেশে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি করে নবজাত রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেওয়া। | অনুমাননির্ভর: যুদ্ধের অব্যবহিত পরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শক্তির প্রচ্ছন্ন মদদ থাকা অসম্ভব নয়, তবে সরাসরি প্রমাণ নথিবদ্ধ নেই। |
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা
জহির রায়হানের মতো একজন বৈশ্বিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ও জাতীয় বীরের নিখোঁজ হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক প্রশ্ন তোলেন।
তদন্ত কমিটির স্থবিরতা: ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ভঙ্গুর প্রশাসনিক কাঠামো এবং আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির দোহাই দিয়ে এই মামলার ফাইলটি কখনো আলোর মুখ দেখেনি।
সাংস্কৃতিক ক্ষতি: জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সমান। তিনি বেঁচে থাকলে আশির বা নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের সিনেমা বিশ্বমঞ্চে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে পারত।
জহির রায়হান আজও অমর
ব্যক্তিগত জীবনে জহির রায়হান হয়তো মিরপুরের কোনো এক নাম না জানা গণকবরে হারিয়ে গেছেন, কিন্তু একজন কালজয়ী শিল্পী ও বিপ্লবী হিসেবে তিনি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।
প্রতিবাদের চিরন্তন প্রতীক: আজ এই নতুন বাংলাদেশে দাঁড়িয়েও যখনই এদেশের ছাত্র-জনতা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কোনো নতুন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কিংবা শোষণের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে, তখনই জহির রায়হানের স্লোগান তাদের মুখে ধ্বনিত হয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ক্যামেরার লেন্সকে রাইফেলের নলের চেয়েও ধারালো করতে হয়।
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার: তাঁর ‘হাজার বছর ধরে’, ‘বরফ গলা নদী’ কিংবা ‘জীবন থেকে নেয়া’ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতি, প্রকৃত ইতিহাস এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার পাঠ দিয়ে চলেছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, শাসকের তরবারি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, একজন প্রকৃত শিল্পীর সৃষ্টির শক্তি তার চেয়েও কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী।
ইতিহাসের পাতায় এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা
জহির রায়হান স্বাধীনতাকে কেবল দূর থেকে দেখেননি, তিনি নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীনতার মূল্য চুকিয়ে গেছেন। স্বাধীন দেশে ফিরে এসেও যিনি নিজের ভাইয়ের সন্ধান পাননি এবং নিজে গুম হয়ে গেছেন, তাঁর এই অকালপ্রস্থান আমাদের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক বিশাল অপূর্ণতা ও লজ্জার প্রতীক।
তাঁর এই নিখোঁজ হওয়া আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে স্বাধীনতা অর্জন করলেই শত্রুর ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে যায় না। পরাজিত শক্তি কখনো খোলস বদলে, কখনো বা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নবজাত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তির ওপর আঘাত হানতে পারে।
আজ তাঁর জন্মদিনে, এই মহান শিল্পীর প্রতি আমাদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। জহির রায়হান কোনো হারিয়ে যাওয়া অতীত নন, তিনি আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় এক অবিনাশী আলো। তাঁর রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ কাজ একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনচেতা বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। তাঁর আদর্শই হোক আমাদের আগামীর পথ চলার একমাত্র পাথেয়।















