ভারত কেন ১৬ ডিসেম্বর ‘ভিজায় দিওয়াস’ পালন করে?
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন আমরা 'বিজয় দিবস' উদযাপন করি, ঠিক একই দিনে ভারত তাদের সামরিক বিজয় ও নিহত সৈন্যদের আত্মত্যাগের স্মরণে পালন করে 'বিজয় দিওয়াস' (Vijay Diwas)। ১৬ ডিসেম্বর কেবল বাংলাদেশের ‘বিজয় দিবস’ নয়, এটি ভারতের সামরিক ইতিহাসেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জনের দিন। এই দুই দিবস একইসঙ্গে উদযাপন করা হয়, যা দুই দেশের ঐতিহাসিক মিত্রতা ও একাত্তরের রক্তঋণকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

TruthBangla
Dec 4, 2025
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল বাঙালির একার যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে এক মহাকাব্যিক সংঘাত, যেখানে ভারত সরকার ও তাদের সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন আমরা 'বিজয় দিবস' উদযাপন করি, ঠিক একই দিনে ভারত তাদের সামরিক বিজয় ও নিহত সৈন্যদের আত্মত্যাগের স্মরণে পালন করে 'বিজয় দিওয়াস' (Vijay Diwas)। ১৬ ডিসেম্বর কেবল বাংলাদেশের ‘বিজয় দিবস’ নয়, এটি ভারতের সামরিক ইতিহাসেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জনের দিন। এই দুই দিবস একইসঙ্গে উদযাপন করা হয়, যা দুই দেশের ঐতিহাসিক মিত্রতা ও একাত্তরের রক্তঋণকে স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু ভারত কেন এই দিনটিকে এত গুরুত্ব সহকারে পালন করে? এটি কি কেবলই একটি সামরিক বিজয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে একাত্তরের যুদ্ধে তাদের সৈন্যদের অপরিমেয় আত্মত্যাগ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের অবিচল সমর্থন?
১৬ ডিসেম্বর - দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধন
১৬ ডিসেম্বর দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের কাছে ভিন্ন আঙ্গিকে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, এর মূল ভিত্তি এক। বাংলাদেশের জন্য এটি মুক্তি ও বিজয়ের দিন, আর ভারতের জন্য এটি 'বিজয় দিওয়াস' - পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এক সামরিক সাফল্যের দিন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম সামরিক বিজয়ের নজির সৃষ্টি করেছিল।
ভারতের এই দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো - ১৯৭১ সালের যুদ্ধে নিহত ১৬৬১ জন ভারতীয় সেনা সহ সকল শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করা এবং সামরিক বাহিনীর বীরত্বকে শ্রদ্ধা জানানো।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে যখন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন, তখন সেটি ছিল একই সাথে দুটি বড় ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি। একটি হলো বাঙালির নয় মাসের রক্তক্ষয়ী ‘মুক্তিযুদ্ধ’, আর অন্যটি হলো মাত্র ১৩ দিনের ‘পাক-ভারত যুদ্ধ’।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল ভারতের জন্য শুধু একটি সামরিক বিজয় নয়, বরং গণতন্ত্র ও মানবিকতার পক্ষে একটি নৈতিক অবস্থান।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট - যখন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে জড়ালো
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে, কিন্তু ভারত প্রথম থেকেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত যুদ্ধে জড়ায় ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, যখন পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তে বিমান হামলা শুরু করে।
পাকিস্তানের 'অপারেশন চেঙ্গিস খান' এবং ভারতের যুদ্ধ ঘোষণা
অনেকে মনে করেন ভারত গায়ে পড়ে পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু সত্যটি হলো সম্পূর্ণ বিপরীত। যুদ্ধের শুরুটা ভারতের ইচ্ছেতে নয়, বরং পাকিস্তানের চরম বোকামি ও কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় ৮টি মতান্তরে ১১টি বিমানঘাঁটিতে একযোগে বিমান হামলা চালায়। এই সামরিক অভিযানের কোড নেম ছিল ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’।
বিকেল ৫:৪০ মিনিটে শুরু হওয়া এই হামলায় অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, যোধপুর এবং এমনকি আগ্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিগুলো আক্রান্ত হয়। পরিস্থিতি এতটাই গম্ভীর ছিল যে, আগ্রার তাজমহল যাতে শত্রু বিমানের টার্গেট না হয়, সেজন্য তড়িঘড়ি করে তা ঘাস ও লতাপাতা দিয়ে ক্যামোফ্লেজ বা আড়াল করা হয়েছিল।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেই মুহূর্তে কলকাতায় এক জনসভায় ছিলেন। হামলার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত দিল্লি ফেরেন এবং রাত বারোটায় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এই আক্রমণের পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানকে আক্রমণকারী ঘোষণা করে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের নির্দেশ দেন। এই ১৪ দিনের যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দেয়। ভারত ৩ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি। পাকিস্তানই ভারতকে আক্রমণ করে নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল।
ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল - প্রথমত, নিজ ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান গণহত্যা বন্ধ করা ও প্রায় এক কোটি শরণার্থীর ভারতে আশ্রয়জনিত মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করা।
কেন পাকিস্তান ভারতকে আক্রমণ করল?
পাকিস্তানের এই আক্রমণের পেছনে কাজ করছিল তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। ভারত তখন বাংলাদেশের ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা দিচ্ছিল। একই সাথে ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে সহায়তা করছিল। পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে যুদ্ধের মধ্যে টেনে এনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পারে। তারা ভেবেছিল ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে হামলা চালিয়ে ভারতকে ব্যস্ত করে ফেললে পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা পাবে। কিন্তু তাদের সেই হিসাব ছিল গাণিতিকভাবে ভুল।
ইসরায়েলি কৌশলের ব্যর্থ অনুকরণ
পাকিস্তান কেন ৩ ডিসেম্বর বিমান হামলা চালাল, তার পেছনে একটি মজার ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে। ১৯৬৭ সালের ‘ছয় দিনের যুদ্ধে’ (Six-Day War) ইসরায়েল হঠাৎ এক ঝটিকা বিমান আক্রমণ চালিয়ে মিশরের প্রায় সব যুদ্ধবিমান মাটির ওপরই ধ্বংস করে দিয়েছিল। পাকিস্তানি জেনারেলরা ভেবেছিলেন তারা ইসরায়েলের সেই ‘প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক’ কৌশল হুবহু কপি করে ভারতকে পঙ্গু করে দেবেন। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে ভারত আয়তনে মিশরের চেয়ে বড় এবং ভারতের সামরিক শক্তি বহুমাত্রিক। পাকিস্তানি জেনারেলদের এই দর্প ও আত্মম্ভরিতা মাত্র তের দিনের মাথায় তাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছিল। এটি ছিল সামরিক ইতিহাসের এক চরম ট্র্যাজেডি, যেখানে নকল করা পরিকল্পনায় জয়ী হওয়া যায় না।
রণাঙ্গনের তীব্রতা - দুই প্রান্তে ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগ
ভারতের কাছে 'বিজয় দিওয়াস' কেন শোক ও শ্রদ্ধার দিন, তা বুঝতে হলে দুই রণাঙ্গনে তাদের সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের চিত্রটি দেখতে হবে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এবং ভারতের পশ্চিমা সীমান্তে।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ১৪ দিনের যুদ্ধ
মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করে। এই ১৪ দিনের তীব্র যুদ্ধে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ১৬৬১ জন সেনা নিহত হন। প্রতিটি সৈন্যের মৃত্যু ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দেওয়া রক্তঋণ।
যৌথ কমান্ড: এই যুদ্ধ প্রমাণ করে, ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো দখলদার শক্তি হিসেবে নয়, বরং মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে 'যৌথ কমান্ড'-এর অধীনে কাজ করেছিল। এটি একটি নজিরবিহীন সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্রতা।
পশ্চিম সীমান্তের লংগেওয়ালা যুদ্ধ (Battle of Longewala)
ভারত-পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তেও ১৯৭১ সালে কয়েকটি ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজস্থানের লংগেওয়ালাতে সংঘটিত যুদ্ধ, যা ভারতের সামরিক ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
পাকিস্তানি আক্রমণ: ৪ থেকে ৭ ডিসেম্বর রাজস্থান সীমান্তে লংগেওয়ালা অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনারা ৪৫টি ট্যাংক নিয়ে প্রায় ৩ হাজার সেনা দ্বারা হামলা করে।
ভারতীয় প্রতিরোধ: ভারতের সীমান্তবর্তী চৌকিতে থাকা মাত্র ১২০ জন ভারতীয় সেনা (অধিকাংশই শিখ রেজিমেন্টের) মেজর কুলদীপ সিং চান্দপুরীর নেতৃত্বে সারা রাত সেই বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়ে তুলে। সকালে ভারতীয় বিমানবাহিনী এসে পাকিস্তানের ট্যাংক বহর ধ্বংস করে দেয়। এই বীরত্বগাঁথা নিয়ে পরবর্তীতে বলিউডের বিখ্যাত ‘Border’ সিনেমাটি নির্মিত হয়।
ফলাফল: এই তিন দিনের ভয়াবহ যুদ্ধে ভারতীয় সেনারা, বিমানবাহিনীর সাহায্যে, ৩৩টি পাকিস্তানি ট্যাংক ধ্বংস করে দেয়। প্রায় দেড় হাজার নিহত পাকিস্তানি সেনা রেখে বাকিরা পলায়ন করে। কিন্তু এই প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে স্বল্প সংখ্যক ভারতীয় সেনার বেশিরভাগই নিহত হন।
এই যুদ্ধগুলোর সামরিক সাফল্য যেমন ভারতের জন্য গর্বের, তেমনি এই যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের আত্মত্যাগ ভারতের জাতীয় শোকের কারণ। এই আত্মত্যাগই 'বিজয় দিওয়াস' পালনের প্রধান ভিত্তি।
অপারেশন ট্রাইডেন্ট - করাচি বন্দর ধ্বংস
৪-৫ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় নৌবাহিনী পাকিস্তানের করাচি বন্দরে দুঃসাহসিক আক্রমণ চালায়। ভারতীয় নৌসেনারা করাচির নৌ-সদরদপ্তর গুঁড়িয়ে দেয় এবং পাকিস্তানের গর্ব পিএনএস খাইবার ও পিএনএস মুহাফিজ জাহাজ দুটি ডুবিয়ে দেয়। এই বিশাল সাফল্যের স্মরণে ভারত আজও ৪ ডিসেম্বর ‘Navy Day’ পালন করে। পশ্চিম ফ্রন্টে ভারত পাকিস্তানের প্রায় ১৫,০০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি দখল করে নিয়েছিল। যে দেশ করাচি বন্দর ধ্বংস করে এবং তের দিনে বিশাল ভূখণ্ড দখল করে নেয়, তারা কেন ১৬ ডিসেম্বরকে ভিজায় দিওয়াস বলবে না?
৬ ডিসেম্বর ও ‘মিত্র বাহিনী’র জন্ম
অনেকে মনে করেন ভারত বাংলাদেশের বিজয়কে নিজের করে নিতে চায়। কিন্তু ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। এদিন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। স্বীকৃতির পরপরই দুই দেশের সেনাবাহিনী মিলে গঠিত হয় ‘মিত্র বাহিনী’ বা ‘Allied Forces’। এই বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন ভারতীয় জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় ছিল এই যৌথ কমান্ডের বিজয়। তাই দলিলে ভারত বা বাংলাদেশের নাম আলাদাভাবে নয়, বরং যৌথ বাহিনীর নাম যুক্ত ছিল।
সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট - ১৬ ডিসেম্বরের তাৎপর্য
১৬ ডিসেম্বরকে 'বিজয় দিওয়াস' হিসেবে পালনের পেছনে সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় কারণই রয়েছে।
ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ৯৩ হাজারেরও বেশি সৈন্য ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যৌথ বাহিনীর (বাংলাদেশ ও ভারত) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যের বৃহত্তম আত্মসমর্পণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সামরিক সাফল্য: এটি ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য এক অসামান্য সামরিক সাফল্য, যা তাদের রণকৌশল ও প্রস্তুতিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত করেছিল। এই আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হয় এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব
বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক মর্যাদা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভারত প্রমাণ করে যে, তারা কেবল নিজ দেশের নিরাপত্তা নয়, বরং প্রতিবেশী দেশে চলতে থাকা গণহত্যা বন্ধের জন্য কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।
স্নায়ুযুদ্ধের সেই সময়ে আমেরিকার চাপ সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোট বেঁধে ভারতের এই সামরিক বিজয় ছিল আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিস্তারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
ভিজায় দিওয়াস ও বিজয় দিবস - শোক ও শ্রদ্ধার সমন্বয়
ভারত ও বাংলাদেশের কাছে ১৬ ডিসেম্বরের তাৎপর্য ভিন্ন হলেও, উভয়ই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
বৈশিষ্ট্য | বাংলাদেশের 'বিজয় দিবস' | ভারতের 'ভিজায় দিওয়াস' |
মূল ফোকাস | পাকিস্তানি দখলদারিত্ব থেকে রাজনৈতিক মুক্তি | ১৯৭১ সালের যুদ্ধে সামরিক বিজয় ও সৈন্যদের আত্মত্যাগ |
অনুভূতির প্রকৃতি | চূড়ান্ত আনন্দ, মুক্তি ও জাতীয় গৌরব | সামরিক সাফল্য, আত্মত্যাগের শোক ও বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা |
ঐতিহাসিক ভিত্তি | সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম | পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সফল সামরিক অভিযান |
ভারত যখন 'বিজয় দিওয়াস' পালন করে, তখন তারা তাদের নিহত সৈনিকদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি এবং তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি শোক প্রকাশ করে। এখানে খারাপ কিছু তো নেই - বরং এটি একটি জাতি হিসেবে তাদের বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অপরিহার্য কর্তব্য।
এই দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে উভয় দেশই একাত্তরের যুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক মিত্রতার বন্ধনটিকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
স্বাধীনতা বিরোধীদের মিথ্যাচারের জবাব
১৬ ডিসেম্বর নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা অনেক বিভ্রান্তি ছড়ায় তাদের জন্য এই নিবন্ধটি একটি তথ্যবহুল দলিল হিসেবে কাজ করবে আশা করি। ১৬ ডিসেম্বর কেবল বাংলাদেশের ‘বিজয় দিবস’ নয়, এটি ভারতের সামরিক ইতিহাসেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জনের দিন। কেন একই দিন দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য ‘বিজয় দিবস’, তার পেছনে রয়েছে রক্ত, কূটনীতি এবং সামরিক কৌশলের এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান।
যারা ভারতের এই দিনটি উদযাপনে বিদ্বেষ অনুভব করেন, তাদের বোঝা উচিত যে ইতিহাস আবেগ দিয়ে চলে না, চলে নথিপত্র আর বাস্তবতার ভিত্তিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ের পর যেমন আমেরিকা, ব্রিটেন এবং রাশিয়া সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে বিজয়ের আনন্দ ভাগ করে নেয়, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরও ঠিক তেমনি বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়েরই বিজয়ের দিন।
আত্মসমর্পণের দলিল ও জেনেভা কনভেনশন
১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কেন জেনারেল ওসমানীর কাছে আত্মসমর্পণ না করে জেনারেল অরোরার কাছে করল, তা নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা অনেক কুযুক্তি দেয়। বাস্তব কারণটি ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক। নিয়াজী জানতেন যে ৯ মাস ধরে তারা বাংলাদেশে যে ভয়াবহ গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালিয়েছে, তার ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আকাশচুম্বী। তারা যদি সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পড়ত, তবে তাদের প্রাণ বাঁচানো কঠিন হতো।
অন্যদিকে ভারত একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র এবং জেনেভা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী। ভারতের প্রফেশনাল আর্মির কাছে আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধবন্দী (POW) হিসেবে নিরাপত্তা, খাবার এবং সুচিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। তাই নিয়াজী নিজের ও তার সৈন্যদের জীবন বাঁচাতে ভারতের কাছেই নতিস্বীকার করতে চেয়েছিলেন। আত্মসমর্পণের দলিলে বা ‘Instrument of Surrender’-এ স্পষ্ট লেখা ছিল:
"The Pakistan Eastern Command agrees to surrender all Pakistan Armed Forces in Bangladesh to Lieutenant-General Jagjit Singh Aurora, General Officer Commanding in Chief of Indian and Bangladesh Forces in the Eastern Theatre."
এখানে স্পষ্টত ‘Indian and Bangladesh Forces’ লেখা রয়েছে, যা প্রমাণ করে ভারত কখনোই বাংলাদেশকে খাটো করেনি।
ভারতের দেওয়া চড়া মূল্য
কোনো দেশের বিজয় কেবল স্লোগানে আসে না, আসে লাশের মিছিলে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের ৩,৮৪৩ জন সৈন্য নিহত হন এবং ৯,৮৫১ জন আহত হন। ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘পরমবীর চক্র’ দেওয়া হয় ৪ জনকে (ল্যান্স নায়েক আলবার্ট এক্কা, ফ্লাইং অফিসার নির্মল জিত সিং সেখোঁ, সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট অরুণ ক্ষেত্রপাল এবং মেজর হোশিয়ার সিং)। যে দেশ তার প্রায় ৪ হাজার সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছে, তাদের জন্য ১৬ ডিসেম্বর আবেগের এবং গর্বের দিন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সিমলা চুক্তি
এই যুদ্ধের জয় কেবল রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১০-১১ ডিসেম্বর আমেরিকার সপ্তম নৌবহর (Task Force 74) পাকিস্তানের সমর্থনে বঙ্গোপসাগরে আসার হুমকি দিয়েছিল। ভারত সেই হুমকি উপেক্ষা করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় যুদ্ধ চালিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে ভারতের কাছে বন্দী ছিল ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য। এদের ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল ভারত। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে ‘সিমলা চুক্তি’র মাধ্যমে ভারত এই ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করে এবং পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ের পথ সুগম করে।
৯ মাস বনাম ১৩ দিনের যুদ্ধ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের অপপ্রচারের প্রধান জায়গা হলো যুদ্ধের সময়কাল নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। বাঙালির জন্য মুক্তিযুদ্ধ ছিল ৯ মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধ। আর ভারত-পাকিস্তানের সরাসরি যুদ্ধ ছিল ৩ থেকে ১৬ ডিসেম্বর - মাত্র ১৩ দিনের। ভারতীয়রা যখন ভিজায় দিওয়াস পালন করে, তারা মূলত এই ১৩ দিনে পাকিস্তানের মতো একটি প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীকে হাঁটু গেড়ে বসানোর সাফল্য উদযাপন করে। সামরিক ইতিহাসে মাত্র ১৩ দিনে কোনো দেশ স্বাধীন করার নজির বিরল।
আত্মত্যাগের ঋণ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক
ভারত কেন 'ভিজায় দিওয়াস' পালন করে - এই প্রশ্নের উত্তর কেবল সামরিক ইতিহাসের পাতায় নেই, এটি নিহিত আছে মানবতা, গণতন্ত্র এবং প্রতিবেশীসুলভ আচরণের আদর্শে।
ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশের মুক্তির জন্য রক্ত ঝরিয়েছিলেন। এই আত্মত্যাগ স্মরণ করা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার। আমাদের উচিত তাদের এই আত্মত্যাগকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা। কারণ, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতীয় সেনাদের রক্ত মিশে আছে - যা দুই দেশের মৈত্রীর বন্ধনকে চিরন্তন করেছে।
১৬ ডিসেম্বর একইসঙ্গে বাংলাদেশ এবং ভারতের জন্য গৌরব, আত্মত্যাগ ও বন্ধুত্বের প্রতীক। এই দিবস পালনের মাধ্যমে ভারত তাদের সৈন্যদের প্রতি যেমন ঋণ স্বীকার করে, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের ভূমিকাকেও স্মরণীয় করে রাখে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















