শেখ হাসিনার সেই ৪ কিলোমিটার হাঁটা এবং সেনানিবাসের বাড়ির নেপথ্য কথা
ইতিহাসের বিচার ও কালের সাক্ষী ইতিহাসের একটি চিরন্তন শিক্ষা হলো ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমনই কিছু অমীমাংসিত এবং আলোচিত অধ্যায় রয়েছে, যা আজও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। ২০০৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১০ সালের সেনানিবাসের বাড়ির আইনি লড়াই এই সময়কালটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক উত্তাল ও নাটকীয় অধ্যায়।

TruthBangla
Jan 1, 2026
ইতিহাসের বিচার ও কালের সাক্ষী ইতিহাসের একটি চিরন্তন শিক্ষা হলো ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সময় হয়তো বহমান, কিন্তু প্রতিটি ঘটনার ছাপ থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়। বিজ্ঞানের ভাষায় যেমন কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে কোনো বস্তুর বয়স বা উৎস নির্ণয় করা যায়, ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহও ঠিক তেমনি সমকালের খাতায় অমোছনীয়ভাবে খোদাই হয়ে থাকে। আমরা অনেক সময় বর্তমানের মোহে অতীতকে ভুলে যাই কিংবা বিকৃত করি, কিন্তু সত্য তার আপন মহিমায় একদিন না একদিন প্রকাশিত হয়ই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমনই কিছু অমীমাংসিত এবং আলোচিত অধ্যায় রয়েছে, যা আজও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। ২০০৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১০ সালের সেনানিবাসের বাড়ির আইনি লড়াই এই সময়কালটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক উত্তাল ও নাটকীয় অধ্যায়।
হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা - অন্ধকারের সেই নীল নকশা
২০০৪ সাল। বাংলাদেশে তখন উগ্রবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানকাল। প্রথাবিরোধী লেখক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ তখন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে মৌলবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই বছরের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপন্যাস ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’।
বইটি প্রকাশের আগে একটি জাতীয় দৈনিকের ঈদসংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। তৎকালীন কুখ্যাত জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমানের নজরে আসে উপন্যাসটি। ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে হুমায়ুন আজাদকে হত্যার ফতোয়া জারি করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঘাতকদের চাপাতির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন তিনি। এই ঘটনাটি ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চার ওপর এক কালো ছায়া।
শেখ হাসিনার ওপর সেই অমানবিক আচরণ
হুমায়ুন আজাদ যখন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন, তখন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেদিন যা ঘটেছিল, তা ছিল শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন।
শেখ হাসিনার গাড়ি বহর সেনানিবাসের জাহাঙ্গীর গেটে পৌঁছালে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে দীর্ঘ ১০ মিনিট আটকে রাখা হয়। কোনো উপায় না দেখে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। তিনি একাই হেঁটে সিএমএইচের দিকে যাত্রা শুরু করেন। প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ তিনি হেঁটে হাসপাতালে পৌঁছান।
তাঁর সঙ্গে কোনো নেতাকর্মী বা নিরাপত্তা কর্মীকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি সাংবাদিকদেরও প্রবেশাধিকার ছিল না।সিএমএইচে পৌঁছানোর পর তাঁকে তল্লাশির নামে আরও ৩০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সাংবাদিকদের ফটোফিল্ম কেড়ে নেওয়া হয়। এই অমানবিক আচরণের কারণ জানতে চাইলে কর্তব্যরত সেনা কর্মকর্তারা স্রেফ জানিয়েছিলেন "উপরের নির্দেশ আছে।"
মইনুল রোডের সেই বাড়ি - লিজ থেকে আইনি লড়াই
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের ৬ নম্বর মইনুল রোডের বাড়িটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বাড়িটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তী তিন দশক ধরে অনেক রাজনীতি ও আইনি লড়াই চলেছে।
বরাদ্দের প্রেক্ষাপট ও শর্তাবলী
১৯৮১ সালের ১২ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার একটি বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাড়িটি খালেদা জিয়াকে লিজ দেন।
নামমাত্র মূল্য: বাড়িটি মাত্র ১ টাকা সেলামি এবং মাসিক ১ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে লিজ দেওয়া হয়েছিল।
মানবিক কারণ: একজন প্রয়াত রাষ্ট্রপতির বিধবা স্ত্রীর বসবাসের জন্য এটি ছিল একটি মানবিক বরাদ্দ। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে এই লিজের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল যা পরবর্তীতে সামনে আসে।
২০০৯ সালের নোটিশ এবং আইনি জটিলতা
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৮ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান যুক্তি তুলে ধরা হয়:
Cantonments Act, 1924: এই আইন অনুযায়ী কোনো বেসামরিক নাগরিক স্থায়ীভাবে সেনানিবাসের ভেতরে বসবাস করতে পারেন না। সেনানিবাসের জমি সামরিক প্রয়োজনেই সংরক্ষিত থাকতে হবে।
একাধিক আবাসন সুবিধা: খালেদা জিয়া ইতোমধ্যেই গুলশানে সরকারের কাছ থেকে আরেকটি প্লট বরাদ্দ নিয়েছিলেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি একাধিক আবাসন সুবিধা পেতে পারেন না।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড: সেনানিবাসের বাড়িটি ছিল আবাসিক উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে দলীয় কার্যালয়ের মতো রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল, যা লিজের শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আদালতের রায় এবং সেনানিবাস ত্যাগ
খালেদা জিয়া এই নোটিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১০ সালের ১৩ অক্টোবর হাইকোর্ট সরকারের নোটিশকে বৈধ ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সেনানিবাস একটি সংবেদনশীল এলাকা এবং সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সমীচীন নয়।
অনেকে মনে করেন, শেখ হাসিনাকে যেভাবে সেনানিবাসের ভেতরে ৪ কিলোমিটার হাঁটিয়ে হেনস্তা করা হয়েছিল, ইতিহাস ঠিক সেভাবেই তার জবাব দিয়েছে। ২০১০ সালে আইনি বাধ্যবাধকতায় খালেদা জিয়াকে চোখের জলে সেই বাড়ি ছাড়তে হয়।
রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা - সেনানিবাসের অন্তরাল
খালেদা জিয়ার সেনানিবাসে অবস্থান নিয়ে খোদ বিএনপির ভেতরেই অনেক সময় অসন্তোষ ছিল। সেনানিবাসের কঠোর নিরাপত্তার কারণে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা তো বটেই, অনেক শীর্ষ নেতাও নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারতেন না।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মন্তব্য: বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তিনি চান তাঁর নেত্রী এমন জায়গায় থাকুন যেখানে কর্মীরা অনায়াসে যেতে পারে। জাহাঙ্গীর গেট বা কাকলী গেটে আটকে যাওয়া ছিল নেতাদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
সুধাসদন বনাম মইনুল রোড: ১/১১-এর জরুরি অবস্থার সময় দেখা যেত শেখ হাসিনার বাসভবন 'সুধাসদন'-এর সামনে নেতাকর্মীদের ভিড়, কিন্তু খালেদা জিয়ার বাসভবন ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো। এই বিচ্ছিন্নতা বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছিল।
শেখ রেহানার বাড়ি বরাদ্দ বাতিল
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইতিহাস কেবল একপক্ষীয় নয়। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গণভবন এবং শেখ রেহানাকে ধানমণ্ডির একটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সেই বরাদ্দ বাতিল করে দেওয়া হয়। শেখ রেহানাকে তাঁর বরাদ্দকৃত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল কোনো মানবিক বিবেচনা ছাড়াই। ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।
ইতিহাস বিকৃতি রোধে সচেতনতা
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্য আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু তথ্যের বিকৃতিও এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যারা ইতিহাস জানেন না, তারা সহজেই প্রোপাগান্ডার শিকার হন।
আপনি যে রাজনৈতিক আদর্শেরই হোন না কেন, প্রকৃত ইতিহাস জানা জরুরি। তথ্যসূত্র যাচাই না করে কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা বা পক্ষ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু দালিলিক প্রমাণ কখনো মুছে যায় না। ২০০৪ সালের সেই ৪ কিলোমিটার পথ হাঁটার কষ্ট যেমন সত্য, ২০১০ সালের আইনি রায়ে বাড়ি ছাড়ার ঘটনাও তেমনই সত্য।
ইতিহাসের শিক্ষা
ইতিহাসের আয়নায় যখন আমরা অতীতকে দেখি, তখন জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের আচরণ ও কর্মফল। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কখনো কারো জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। শেখ হাসিনাকে সেনানিবাসের ভেতর দেওয়া সেই কষ্ট কিংবা খালেদা জিয়ার বাড়ি হারানোর বেদনা সবই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। তবে দিনশেষে সত্যের জয় এবং অন্যায়ের বিচারই ইতিহাসের মূল শিক্ষা।
রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে কেবল স্লোগান নয়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন। আপনি যদি আপনার দলকে ভালোবাসেন, তবে দলের এবং দেশের সঠিক ইতিহাস জানুন। ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। মনে রাখবেন, মূর্খতা দিয়ে কখনো আদর্শিক লড়াই জেতা যায় না।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















