শ্রীনগরের গ্রাফিতি এবং ওসমান হাদি - কাশ্মীর থেকে বাংলার ভূ-রাজনৈতিক সংকট
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রক্সি যুদ্ধ এবং আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথের গ্রাফিতি পর্যন্ত। সম্প্রতি ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নিহত ওসমান হাদির ছবি এবং কিছু বিতর্কিত স্লোগান অঙ্কিত হয়েছে। বিষয়টিকে কেবল একটি দেয়ালচিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীল নকশা।

TruthBangla
Dec 27, 2025
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রক্সি যুদ্ধ এবং আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথের গ্রাফিতি পর্যন্ত। সম্প্রতি ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নিহত ওসমান হাদির ছবি এবং কিছু বিতর্কিত স্লোগান অঙ্কিত হয়েছে। বিষয়টিকে কেবল একটি দেয়ালচিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীল নকশা।
গ্রাফিতির প্রেক্ষাপট - বুরহান ওয়ানি থেকে ওসমান হাদি
শ্রীনগরের এই দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকার ইতিহাস বেশ পুরনো এবং এটি মূলত ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানি
গ্রাফিতির উপরের অংশে ২০১৬ সালের একটি ছবি লক্ষ্য করা যায়, যা হিজবুল মুজাহিদিন নেতা বুরহান ওয়ানির। ২০১৬ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যুর পর কাশ্মীরে ব্যাপক গণ-আন্দোলন শুরু হয়েছিল। লস্কর-ই-তৈয়বা বা জইশ-ই-মুহাম্মদের মতো সংগঠনগুলো তখন বুরহান ওয়ানিকে কেন্দ্র করে শ্রীনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন গ্রাফিতি এঁকেছিল। উদ্দেশ্য ছিল কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহের বীজ বপন করা।
২০২৫ সালে ওসমান হাদি
২০২৫ সালে এসে এই একই দেয়ালে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের ওসমান হাদির ছবি। ওসমান হাদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিহত হয়েছিলেন। তবে কাশ্মীরের সশস্ত্র সংগঠনগুলো তাঁর এই মৃত্যুকে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। ওসমান হাদির ছবির পাশে উর্দুতে লেখা স্লোগানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে কাশ্মীরি স্বাধীনতার দাবির সাথে বাংলাদেশের নামকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
উর্দু স্লোগানের ব্যবচ্ছেদ - কী বার্তা দিতে চায় লস্কর?
গ্রাফিতিতে উর্দু ভাষায় লেখা স্লোগানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ।
বাম পাশে বড় অক্ষরে লেখা হয়েছে, "ওসমান, বিপ্লব তোমার রক্তের মধ্য দিয়ে আসবে!!"
এর নিচেই লেখা সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি, "কাশ্মীর থেকে বাংলায়, মুসলমানদের একটাই স্লোগান; আমরা পাকিস্তানি, পাকিস্তান আমাদের!" এই স্লোগানটি কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। ১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের ওপর জোরপূর্বক 'পাকিস্তানি' পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা লস্করের মতো গোষ্ঠীগুলোর হীন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
ডানদিকে লেখা, "হিন্দুত্ব সন্ত্রাসবাদ অগ্রহণযোগ্য!"
নীচে লাল এবং কালো লেখা, "কাশ্মীর থেকে বাংলা, এক স্লোগান, স্বাধীনতার এক বার্তা! আজাদী (স্বাধীনতা)! হিন্দুত্ববাদী শাসন থেকে মুক্তি!"
ছবিতে "REST IN PEACE" ইংরেজি লেখাটিও রয়েছে।
এই স্লোগানগুলোর মাধ্যমে কাশ্মীরের স্থানীয় আন্দোলনের সাথে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও সেন্টিমেন্টকে একীভূত করার একটি সুক্ষ্ম প্রক্সি চাল চালানো হচ্ছে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বনাম পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন যে, ওসমান হাদি বাংলাদেশের পতাকার স্বার্থে কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন হয়েছে, সেটি ছিল এদেশের মানুষের নিজস্ব অধিকার রক্ষার লড়াই।
ওসমান হাদির আসল পরিচয়
ওসমান হাদি কখনোই পাকিস্তানের হয়ে লড়াই করেননি। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এদেশের স্বার্থে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। অথচ শ্রীনগরের গ্রাফিতিতে তাঁর ছবির পাশে পাকিস্তানের নাম জুড়ে দিয়ে তাঁকে 'পাকিস্তানি' হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি হাদির স্মৃতির প্রতি অবমাননা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। যদি কাশ্মীরিরা সত্যিই হাদিকে সম্মান জানাতে চাইত, তবে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা অঙ্কিত হওয়া উচিত ছিল, পাকিস্তানের নয়।
ওসমান হাদির পরিবারকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সচেতনভাবে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। এই পরিবারটির মূল পরিচয় হলো তারা ছারছিনাপন্থি। ওসমান হাদির বড় ভাই একজন পরিচিত আলেম এবং তিনি ছারছিনা দরবারের পীর সাহেবের মুরিদ। ঐতিহাসিকভাবে ছারছিনাপন্থি আলেমসমাজ কখনোই পাকিস্তানপন্থী জামায়াত–শিবিরের রাজনীতির সাথে একাত্ম ছিল না। এটি কেবল মতাদর্শগত বিরোধ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও স্পষ্ট।
ছারছিনার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেখানে শিবিরের কোনো সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ নেই এটাই বাস্তবতা।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়টি হলো, ছারছিনাপন্থি পরিবেশে বেড়ে ওঠা ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিচয়কে জোর করে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে পাকিস্তানপন্থী জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির, যাদের রাজনীতি ও চিন্তাধারাকে সে জীবদ্দশায় স্পষ্টভাবেই অপছন্দ করত।
লস্কর ও পাকিস্তানের প্রক্সি ইন্টারেস্ট
কাশ্মীরিরা খুব ভালোভাবেই জানে যে, পাকিস্তান সেখানে স্থানীয় মিলিট্যান্টদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে একটি 'প্রক্সি যুদ্ধ' বা ছায়া যুদ্ধ জিইয়ে রেখেছে। এই যুদ্ধে গত কয়েক দশকে হাজার হাজার সাধারণ কাশ্মীরি প্রাণ হারিয়েছে। এমনকি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে (আজাদ কাশ্মীর) যখন জনগণ তাদের অধিকারের দাবিতে প্রতিবাদ করে, তখন পাকিস্তান সরকার ও এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কঠোরভাবে তা দমন করে। ফলে লস্কর যখন 'আজাদী'র কথা বলে, তখন তারা আসলে পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি - ভূ-রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
কাশ্মীরের মতো একটি বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর অঞ্চলে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তির ছবি বা নাম সশস্ত্র সংগঠনের মাধ্যমে ব্যবহৃত হওয়া বাংলাদেশের জন্য মোটেই শুভ কোনো সংবাদ নয়। এর ফলে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংকটের সৃষ্টি হতে পারে:
জঙ্গিবাদ বিরোধী ভাবমূর্তি সংকটে: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে উগ্রপন্থী বা পাকিস্তানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহযোগী হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন: ভারত এই গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আন্দোলনকে 'পাকিস্তান সমর্থিত' বলে আখ্যা দেওয়ার সুযোগ পাবে, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সার্বভৌমত্ব অবমাননা: বাংলাদেশের মানুষের ত্যাগ ও আন্দোলনকে পাকিস্তানের এজেন্ডা হিসেবে দেখানো এদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী।
ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের প্রতি সমর্থন বনাম উগ্রবাদ
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে আসছে। তবে সেই সমর্থন কখনোই উগ্রবাদ বা পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধের সমর্থনে নয়। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিপীড়ন কিংবা কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন - এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কারভাবে মানবতার পক্ষে।
কিন্তু যখন লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সংগঠন ওসমান হাদির মতো এদেশীয় কোনো চরিত্রকে তাদের পোস্টারে ব্যবহার করে, তখন তারা আসলে বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনকে 'হাইজ্যাক' করার চেষ্টা করে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের লড়াই আমাদের নিজস্ব; এটি কোনো বিদেশী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর দাবার ঘুঁটি হওয়ার জন্য নয়।
সচেতনতা ও সত্যের প্রকাশ
কাশ্মীরের শ্রীনগরে ওসমান হাদির ছবি ও পাকিস্তানপন্থী স্লোগান অঙ্কিত হওয়া একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। একদিকে যেমন পাকিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের আন্দোলনকে নিজেদের বলে দাবি করতে চাইছে, অন্যদিকে ভারত এই সুযোগে বাংলাদেশের পরিবর্তনকে 'মৌলবাদ' বা 'বিদেশী ষড়যন্ত্র' বলে প্রচার করতে পারে।
আমাদের পরিষ্কারভাবে বলতে হবে ওসমান হাদি ছিলেন বাংলাদেশের সন্তান। তাঁর লড়াই ছিল এদেশের মাটিতে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, কোনো বিদেশী দেশের স্বার্থে নয়। কাশ্মীর থেকে বাংলা পর্যন্ত এক স্লোগান তৈরির যে চেষ্টা লস্কর করছে, তা আসলে প্রক্সি রাজনীতির একটি কদর্য রূপ। বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে অত্যন্ত সচেতন; তারা পাকিস্তান বা হিন্দুত্ববাদ কারও প্রক্সি হতে চায় না। সত্য এটাই যে, ওসমান হাদির রক্তের মর্যাদা তখনই রক্ষা হবে যখন তাঁকে একজন গর্বিত বাংলাদেশী হিসেবে মনে রাখা হবে, কোনো বিদেশী গোষ্ঠীর এজেন্ডা হিসেবে নয়।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















