>

>

শ্রীনগরের গ্রাফিতি এবং ওসমান হাদি - কাশ্মীর থেকে বাংলার ভূ-রাজনৈতিক সংকট

শ্রীনগরের গ্রাফিতি এবং ওসমান হাদি - কাশ্মীর থেকে বাংলার ভূ-রাজনৈতিক সংকট

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রক্সি যুদ্ধ এবং আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথের গ্রাফিতি পর্যন্ত। সম্প্রতি ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নিহত ওসমান হাদির ছবি এবং কিছু বিতর্কিত স্লোগান অঙ্কিত হয়েছে। বিষয়টিকে কেবল একটি দেয়ালচিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীল নকশা।

TruthBangla

আধুনিক যুগের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত, সামরিক ব্যারাকে কিংবা ট্যাংকের মহড়াতেই আবদ্ধ নেই। একাবিংশ শতাব্দীর প্রক্সি যুদ্ধ (Proxy War) এবং আদর্শিক লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ময়দান হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম, ভিজ্যুয়াল আইকনোগ্রাফি এবং রাজপথের দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি (Graffiti)। কোনো অঞ্চলের রাজপথের দেয়ালে আঁকা একটি ছবি বা লেখা স্লোগান কেবল শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে এগুলোকে ব্যবহার করা হয় শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে।

সম্প্রতি ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের কেন্দ্রস্থলে অঙ্কিত একটি গ্রাফিতি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেখানে একদিকে যেমন ২০১৬ সালে নিহত কাশ্মীরি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল মুজাহিদিনের নেতা বুরহান ওয়ানির ছবি দেখা যায়, তেমনি তার পাশেই যুক্ত করা হয়েছে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণ-আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিহত তরুণ ওসমান হাদির ছবি। কেবল ছবিতেই সীমাবদ্ধ না রেখে, সেই দেয়ালচিত্রে উর্দু ও ইংরেজিতে অত্যন্ত বিতর্কিত কিছু স্লোগান যুক্ত করা হয়েছে যা সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত ইতিহাস এবং দেশের ১৬ কোটি মানুষের পরিচয়ের ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এই ঘটনাটিকে কোনো সাধারণ দেয়ালচিত্র বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এর গভীরে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার অত্যন্ত জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ, পাকিস্তানি প্রক্সি যুদ্ধের এজেন্ডা এবং লস্কর-ই-তৈয়বা বা জইশ-ই-মুহাম্মদের মতো উগ্রপন্থী আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের কুটিল নীল নকশা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার আদায়ের লড়াইকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ও পাকিস্তানপন্থী নেটওয়ার্কগুলো কীভাবে 'হাইজ্যাক' বা অপদখল করার চেষ্টা করছে, শ্রীনগরের এই গ্রাফিতি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রবন্ধে আমরা শ্রীনগরের দেয়ালে বুরহান ওয়ানি থেকে ওসমান হাদির রূপান্তরের প্রেক্ষাপট, গ্রাফিতির উর্দু স্লোগানগুলোর ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ, ওসমান হাদির প্রকৃত পরিচয় ও ছারছিনাপন্থি পারিবারিক বাস্তবতা, লস্কর-ই-তৈয়বার কৌশলগত স্বার্থ, এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও সার্বভৌম নিরাপত্তার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণী আলোচনা উপস্থাপন করব।

শ্রীনগরের দেয়ালচিত্র: বুরহান ওয়ানি (২০১৬) থেকে ওসমান হাদি (২০২৫)

কাশ্মীর উপত্যকার রাজধানী শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থলের দেয়ালগুলো দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারত-বিরোধী মনোভাব এবং স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র আন্দোলনের প্রচারপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই দেয়ালচিত্রের নিজস্ব একটি রাজনৈতিক ইতিহাস এবং মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন রয়েছে, যা অনুধাবন করা এই সংকটটি বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

২০১৬ সালের বুরহান ওয়ানি অধ্যায়

২০১৬ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার কোকেরনাগে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে এক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন হিজবুল মুজাহিদিনের তরুণ কমান্ডার বুরহান ওয়ানি। বুরহান ওয়ানি ছিলেন কাশ্মীরি সশস্ত্র রাজনীতির এক নতুন মোড়। প্রথাগত গেরিলা যুদ্ধের বদলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে কাশ্মীরের উঠতি তরুণদের সশস্ত্র বিদ্রোহে আকৃষ্ট করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুরো কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে অভূতপূর্ব বিক্ষোভ ও সহিংস আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রায় কয়েক মাস ধরে কাশ্মীরকে অচল করে রেখেছিল।

বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পরপরই লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মুহাম্মদ এবং হিজবুল মুজাহিদিনের মতো উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো শ্রীনগরের প্রাণকেন্দ্রের দেয়ালগুলোতে বুরহান ওয়ানির প্রতিকৃতি এবং সেন্টিমেন্টাল পোস্টার আঁকতে শুরু করে। এই দেয়ালচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল কাশ্মীরি তরুণদের মানসে প্রথাগত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জিয়িয়ে রাখা। সশস্ত্র সংগ্রামকে এক ধরনের 'পবিত্র ধর্মযুদ্ধ' বা 'ইনকিলাব' হিসেবে রূপ দান করা। নিহত কমান্ডারদের 'শহীদী আইকন' হিসেবে উপস্থাপন করে নতুন সদস্য রিক্রুটমেন্টের পথ প্রশস্ত করা।

২০২৫ সালে ওসমান হাদির অন্তর্ভুক্তির নেপথ্যে

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সেই একই দেয়ালে তাকাই, তখন দেখতে পাই যে ২০১৬ সালের বুরহান ওয়ানির ছবির পাশেই ২০২৫ সালে যুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশের নিহত তরুণ ওসমান হাদির ছবি।

ওসমান হাদি ছিলেন বাংলাদেশের একজন নাগরিক, যিনি ২০২৪-২০২৫ সালের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, গণ-আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ-বিরোধী স্থানীয় নাগরিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর আন্দোলন ও লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশ; তাঁর আকাক্সক্ষা ছিল একটি সার্বভৌম, স্বৈরাচারমুক্ত ও স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

তবে শ্রীনগরের দেয়ালে লস্কর-ই-তৈয়বা বা পাকিস্তানপন্থী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো ওসমান হাদির এই দেশপ্রেমী আত্মত্যাগকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছে। তারা ওসমান হাদিকে কাশ্মীরের সশস্ত্র সংগ্রামের সাথে একসূত্রে গেঁথে দেওয়ার এক সুচতুর প্রোপাগান্ডা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে উপড়ে ফেলে তারা তাকে আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী 'ইনকিলাব'-এর অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে।

উর্দু ও ইংরেজি স্লোগানের ভাষাতাত্ত্বিক ও আদর্শিক ব্যবচ্ছেদ

শ্রীনগরের গ্রাফিতিতে ব্যবহৃত বার্তাগুলোকে শুধু সাধারণ কিছু শব্দ সমষ্টি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে প্রতিটি বাক্যের একটি নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য রয়েছে। চলুন, এই দেয়ালে ফুটে ওঠা উর্দু ও ইংরেজি স্লোগানগুলোর গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা যাক:

"উসমান, ইনকিলাব তুমহারে খুন সে আয়েগা!" (ওসমান, বিপ্লব তোমার রক্তের মধ্য দিয়ে আসবে!!)

এই স্লোগানটির মাধ্যমে ওসমান হাদির মৃত্যুকে চরমপন্থী সশস্ত্র ভাবধারার সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। 'ইনকিলাব' বা বিপ্লব শব্দটি ইসলামী চরমপন্থী সংগঠনগুলোর অভিধানে প্রায়শই সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হাদির রক্তের দোহাই দিয়ে কাশ্মীর ও বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে উসকানি দেওয়াই এই বাক্যের মূল লক্ষ্য।

"কাশ্মীর সে বাংলা তক, মুসালমানোঁ কা এক হি নারাহ; হাম পাকিস্তানি হ্যায়, পাকিস্তান হামারা হ্যায়!" (কাশ্মীর থেকে বাংলায়, মুসলমানদের একটাই স্লোগান; আমরা পাকিস্তানি, পাকিস্তান আমাদের!)

গ্রাফিতির এই অংশটি সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, উসকানিমূলক এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সরাসরি পরিপন্থী।

১৯৭১-এর চেতনার ওপর আঘাত: ১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ পাকিস্তান নামক একটি শোষক রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

জোরপূর্বক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া: বাংলাদেশের একজন নাগরিক যিনি স্বদেশের মাটিতে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মারা গেলেন, তাঁর ওপর জোরপূর্বক 'পাকিস্তানি' পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া কেবল বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রতি এক চরম অপমান। লস্কর বা তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো বোঝাতে চাইছে যে বাংলাদেশিরা এখনো মানসিকভাবে পাকিস্তানপ্রীতিতে মগ্ন, যা ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার চরম বিকৃতি।

"হিন্দুত্ব সন্ত্রাসবাদ অগ্রহণযোগ্য!"

ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও তাদের কাশ্মীর নীতিকে লক্ষ্য করে এই স্লোগানটি তৈরি করা হয়েছে। তবে এখানে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আধিপত্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনকে ভারতের হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে একটি 'প্যান-ইসলামিক' ধর্মীয় যুদ্ধের অংশ হিসেবে চিত্রিত করতে চেয়েছে, যা বাংলাদেশের সেক্যুলার ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের মূল চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

"কাশ্মীর সে বাংলা, এক নারাহ, এক পৈগাম-ই-আজাদী! আজাদী! হিন্দুত্ববাদী শাসন থেকে মুক্তি!"

এই স্লোগানটির মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে যে কাশ্মীর ও বাংলাদেশের 'আজাদী' বা স্বাধীনতা একই সুতোয় বাঁধা। কাশ্মীর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে ভারত রাষ্ট্রের সাথে সশস্ত্র লড়াই চলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট বা আধিপত্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনকে কাশ্মীরের আঞ্চলিক সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলা বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী ভাবমূর্তির জন্য এক চরম হুমকিস্বরূপ।

ওসমান হাদির আদর্শিক অবস্থান ও ছারছিনাপন্থি পারিবারিক বাস্তবতা

শ্রীনগরের গ্রাফিতিতে ওসমান হাদিকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, বাস্তবতার সাথে তার দূরত্ব আলোকবর্ষ পরিমাণের। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক খেলায় হাদির আসল পরিচয় ও আদর্শকে সচেতনভাবে মুছে ফেলা হয়েছে।

ওসমান হাদির মূল পরিচয়: ওসমান হাদি কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের ক্যাডার ছিলেন না, কিংবা তিনি কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রক্সি হিসেবে যুদ্ধ করেননি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের এক স্বাধীনচেতা নাগরিক, যিনি দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, স্বৈরাচারী শাসন এবং বহিরাগত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন। তিনি লাল-সবুজের পতাকাকে ভালোবাসতেন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার্থেই জীবন দিয়েছেন। যদি সত্যিই কাশ্মীরের মানুষ বা কোনো গোষ্ঠী তাঁকে সম্মান জানাতে চাইত, তবে সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা চিত্রিত হওয়া উচিত ছিল, কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাম বা স্লোগান নয়।

ছারছিনাপন্থি পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও জামায়াত-শিবির বিরোধ

ওসমান হাদির পরিবারকে ঘিরে যে মূল সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতাটি আড়াল করার চেষ্টা চলছে, তা হলো তাঁদের পারিবারিক আদর্শিক ব্যাকগ্রাউন্ড। ওসমান হাদির পরিবার ঐতিহাসিকভাবে পিরোজপুরের ঐতিহ্যবাহী ছারছিনা দরবার শরীফ-এর অনুসারী বা 'ছারছিনাপন্থি'

ওসমান হাদির বড় ভাই একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত সুন্নি আলেম, যিনি ছারছিনা দরবারের পীর সাহেবের পীরপ্রথার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। বাংলাদেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ছারছিনাপন্থি আলেমসমাজ এবং জামায়াতে ইসলামী বা ছাত্রশিবিরের মধ্যকার আদর্শিক দূরত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক।

আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড

ছারছিনাপন্থি ঐতিহ্য ও মাদ্রাসা ব্যবস্থা

পাকিস্তানপন্থী জামায়াত-ই-ইসলামী ও ছাত্রশিবির

ধর্মীয় ও ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি

প্রথাগত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত, সুফিবাদ ও পীরপ্রথায় বিশ্বাসী।

মওদুদীবাদী রাজনৈতিক ইসলাম, প্রথাগত পীরপ্রথার বিরোধী।

রাজনৈতিক অবস্থান

সরাসরি দলীয় ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির চেয়ে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও নিজস্ব ঐতিহ্যে বিশ্বাসী।

ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দল; অতীতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানপন্থী ভূমিকা।

মাদ্রাসায় রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা

ছারছিনার অধীনস্থ সমস্ত মাদ্রাসায় ছাত্রশিবিরের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব রিক্রুটমেন্ট ও ক্যাডার রাজনীতি পরিচালনা।

ওসমান হাদির আদর্শ

সুন্নি ও ছারছিনাপন্থি ইসলামিক মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেমভিত্তিক রাজনীতি।

জামায়াত-শিবিরের মওদুদীবাদী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি সম্পূর্ণ অনীহা।

আদর্শিক অপদখল (Ideological Hijacking)

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, ওসমান হাদি জীবদ্দশায় কখনোই জামায়াতে ইসলামী কিংবা ইসলামী ছাত্রশিবিরের মওদুদীবাদী ও পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক ভাবধারাকে সমর্থন করেননি। ছারছিনাপন্থি ব্যাকগ্রাউন্ডে বেড়ে ওঠার কারণে তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে এই দলগুলোর রাজনীতি কীভাবে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে।

অথবা, তিনি নিহত হওয়ার পর, তাঁর আত্মত্যাগের বিরাট জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করার জন্য জামায়াত-শিবির এবং আন্তর্জাতিক প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলো (যেমন লস্কর-ই-তৈয়বা) তাকে নিজেদের 'আইকন' হিসেবে দাবি করতে শুরু করেছে। যে রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে হাদি তাঁর জীবদ্দশায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, মৃত্যুর পর সেই চিন্তাধারার সমর্থকরাই তাকে 'পাকিস্তানি ইনকিলাবের শহীদ' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি কেবল এক রাজনৈতিক জালিয়াতি নয়, বরং ওসমান হাদির স্মৃতির প্রতি এক চরম অবমাননা।

পাকিস্তানি প্রক্সি যুদ্ধ, লস্কর-ই-তৈয়বা এবং কাশ্মীরের বাস্তবতা

পাকিস্তান এবং তার দ্বারা লালিত-পালিত উগ্রপন্থী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা কখনোই কাশ্মীরি বা অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতার সমর্থক ছিল না। তারা সবসময়ই চেয়েছে আঞ্চলিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ হাসিল করতে।

'প্রক্সি যুদ্ধ' বা ছায়া যুদ্ধের কুফল

গত সাড়ে তিন দশক ধরে লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মুহাম্মদ এবং হিজবুল মুজাহিদিনের মতো সংগঠনগুলো কাশ্মীর উপত্যকায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সহায়তায় প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। এর ফলে কাশ্মীরে যা ঘটেছে, হাজার হাজার সাধারণ কাশ্মীরি তরুণ প্রক্সি রাজনীতির বলির পাঁঠা হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।

কাশ্মীরের অর্থনীতি, পর্যটন ও শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। স্থানীয় কাশ্মীরিদের আসল অধিকার আদায়ের অহিংস আন্দোলনকে উগ্রবাদী তকমা দিয়ে দমন করার সুযোগ পেয়েছে ভারত সরকার।

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের (আজাদ কাশ্মীর) বৈষম্য

লস্কর বা পাকিস্তান যখন 'আজাদী' বা স্বাধীনতার স্লোগান দেয়, তখন তাদের ভণ্ডামি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর (PoK) ও গিলগিত-বালতিস্তানের দিকে তাকালে। সেখানে সাধারণ মানুষ যখন আটা, বিদ্যুৎ, পানি কিংবা মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে রাজপথে নামে, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও সরকারি বাহিনী তাদের ওপর নির্মম দমনপীড়ন চালায়। ফলে, লস্কর যখন শ্রীনগরের দেয়ালে 'পাকিস্তান আমাদের' বলে চিৎকার করে, তখন তা কাশ্মীরের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এক তামাশা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

একমাত্র তথ্যভিত্তিক সারসংক্ষেপ ও বিশ্লেষণাত্বক টেবিল

নিম্নলিখিত টেবিলে শ্রীনগরের গ্রাফিতির দুটি মূল চরিত্র, তাদের প্রকৃত বার্তা এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাবকে একটি সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

বিশ্লেষণের মানদণ্ড

বুরহান ওয়ানি অধ্যায় (২০১৬)

ওসমান হাদি অধ্যায় (২০২৫-২০২৬)

ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা

মূল চরিত্র ও পরিচয়

বুরহান ওয়ানি (হিজবুল মুজাহিদিনের নিহত কমান্ডার)।

ওসমান হাদি (বাংলাদেশের নিহত আন্দোলনকারী ও নাগরিক)।

একজন সশস্ত্র গেরিলা যোদ্ধা; অন্যজন স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক অধিকার কর্মী।

আন্দোলনের ক্ষেত্র

ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীর (সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন)।

স্বাধীন বাংলাদেশ (অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার ও আধিপত্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম)।

দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভৌগোলিক, আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

গ্রাফিতির স্লোগান

কাশ্মীরি আজাদী ও সশস্ত্র বিদ্রোহের আহ্বান।

"কাশ্মীর সে বাংলা... হাম পাকিস্তানি হ্যায়, পাকিস্তান হামারা হ্যায়।"

বাংলাদেশের আন্দোলনকে 'পাকিস্তান সমর্থিত' প্রক্সি হিসেবে দেখানোর সুচতুর চেষ্টা।

পরিবার ও রাজনৈতিক আদর্শ

কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও পাকিস্তানপন্থী সশস্ত্র ভাবধারা।

ছারছিনাপন্থি ইসলামিক পরিবার; ছাত্রশিবির ও পাকিস্তানপ্রীতির বিরোধী।

হাদির মূল আদর্শকে মুছে দিয়ে জামায়াত-শিবির ও লস্কর তাকে হাইজ্যাক করেছে।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি

কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল না (এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল)।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের তকমা, ১৯৭১-এর চেতনার অপমান, ভারতের সাথে কূটনৈতিক জটিলতা।

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি চরম হুমকির মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক ঝুঁকি ও নিরাপত্তা সংকট

শ্রীনগরের দেয়ালে ওসমান হাদির ছবি ভেসে ওঠা বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান, শান্তিপ্রিয় এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে বেশ কিছু গুরুতর ঝুঁকির সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন:

উগ্রবাদ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী ভাবমূর্তি সংকট: বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি বজায় রেখে চলেছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ একটি প্রগতিশীল, উন্নয়নমুখী এবং মডারেট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।

কিন্তু লস্কর-ই-তৈয়বার মতো আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো যখন বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা আন্দোলনকে তাদের ব্যানারে ব্যবহার করে, তখন ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (FATF) বা জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক জিহাদী বা পাকিস্তানপন্থী প্রক্সি নেটওয়ার্কের 'হটস্পট' হিসেবে সন্দেহ করতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম টানাপোড়েন: ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে অত্যন্ত সংবেদনশীল। শ্রীনগরের এই গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে ভারতের জাতীয়তাবাদী গণমাধ্যম ও নীতি নির্ধারকরা খুব সহজেই প্রচার করতে পারবে যে, বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা আসলে কোনো নাগরিক আন্দোলন ছিল না; বরং তা ছিল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং লস্কর-ই-তৈয়বার পরিকল্পনা।

এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে। সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদান, বাণিজ্য এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় চরম কড়াকড়ি আরোপ করা হতে পারে।

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর কুঠারাঘাত

বাংলাদেশের সংবিধানে এবং সাধারণ মানুষের মানসে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ একটি লালিত স্তম্ভ। লস্কর যখন স্লোগান দেয় "হাম পাকিস্তানি হ্যায়, পাকিস্তান হামারা হ্যায়" তখন তা প্রকারান্তরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে। এটি ৩০ লক্ষ শহীদ এবং ২ লক্ষ নির্যাতিত মা-বোনের রক্তের সাথে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।

ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের প্রতি সমর্থন বনাম উগ্রবাদী এজেন্ডাকে প্রত্যাখ্যান

বাংলাদেশিরা বরাবরই বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সোচ্চার। আমাদের এই মানবিক ও রাজনৈতিক নীতি ঐতিহাসিকভাবে পরীক্ষিত।

ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের মানবাধিকারের প্রতি সমর্থন

ফিলিস্তিন সংকট: ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরে যে গণহত্যা এবং বর্ণবাদী নির্যাতন চালানো হচ্ছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এদেশের নাগরিকরা দৃঢ়ভাবে তার প্রতিবাদ জানায়। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান অনড়।

কাশ্মীর সংকট: কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কিংবা ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের সহানুভূতি একটি মানবিক ও প্রসংগভিত্তিক অবস্থান।

নীতিগত সমর্থন এবং প্রক্সি উগ্রবাদের পার্থক্য

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, নিপীড়িত মানুষের প্রতি মানবিক সহানুভূতি জানানো আর লস্কর-ই-তৈয়বা বা পাকিস্তানি সশস্ত্র প্রক্সি যুদ্ধের দাবার ঘুঁটি হওয়া এক বস্তু নয়।

ফিলিস্তিনিদের অধিকার বা কাশ্মীরের মানবাধিকার রক্ষা করার অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেব। বাংলাদেশের লড়াই আমাদের নিজস্ব অধিকার, নিজস্ব ভূখণ্ড এবং নিজস্ব নাগরিক মর্যাদার জন্য। কোনো বিদেশী চরমপন্থী সংগঠন যখন আমাদের শহীদদের ছবি ব্যবহার করে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দেয়, তখন আমাদের অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

কৌশলগত সচেতনতা, সত্য উন্মোচন ও ভবিষ্যৎ করণীয়

শ্রীনগরের দেয়ালে অঙ্কিত গ্রাফিতিটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দেয়ালচিত্র নয়, এটি একটি সুসংগঠিত 'ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার' বা তথ্য যুদ্ধের অংশ। এই চক্রান্ত নস্যাৎ করতে হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, সচেতন নাগরিক সমাজ এবং মিডিয়াকে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:

দ্ব্যর্থহীন জাতীয় অবস্থান প্রকাশ: বাংলাদেশি নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও বিভিন্ন ফোরামে স্পষ্ট করে বলতে হবে যে, বাংলাদেশিদের একমাত্র পরিচয় আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা কোনো আঞ্চলিক শক্তি বা আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংগঠনের প্রক্সি নই। আমাদের রাজনীতি "না পাকিস্তানপ্রীতি, না কোনো দেশের আধিপত্য কেবল বাংলাদেশ প্রথম (Bangladesh First)।"

ওসমান হাদির প্রকৃত ইতিহাস বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা: বিশ্ব গণমাধ্যম ও গবেষণাদলগুলোর কাছে ওসমান হাদির আসল পরিচয় তুলে ধরতে হবে। তিনি যে ছারছিনাপন্থি সুন্নি ধারার পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং তিনি কীভাবে জামায়াত-শিবির ও পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক ভাবধারা থেকে দূরে ছিলেন, সেই ঐতিহাসিক তথ্যগুলো ডকুমেন্টারি ও নিবন্ধের মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত। এতে লস্কর ও শিবিরের যৌথ রাজনৈতিক ফ্রড ফাঁস হয়ে যাবে।

তরুণ সমাজকে প্রক্সি রাজনীতির ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন করা: বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যারা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, তাদের মনে রাখতে হবে আমাদের লড়াইকে যেন কোনো বিদেশী উগ্রপন্থী শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল না করতে পারে। আবেগের বশে এমন কোনো স্লোগান বা প্রতীক আঁকড়ে ধরা যাবে না, যা দিনশেষে আমাদের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং সার্বভৌমত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

সার্বভৌম মর্যাদায় উজ্জ্বল ওসমান হাদি

ইতিহাস প্রমান দেয় যে, কোনো জাতি যখন তার নিজস্ব পরিচয় এবং ইতিহাস ভুলে যায়, তখন বাইরের শকুনেরা এসে তার অর্জনগুলোকে খুব সহজেই ভাগাড়ের দিকে নিয়ে যায়। শ্রীনগরের কেন্দ্রীয় দেয়ালে ওসমান হাদির ছবি এবং প্রক্সি উগ্রপন্থীদের উর্দু স্লোগান আমাদের জাতীয় চেতনার ওপর এক বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা।

একদিকে যেমন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সমর্থিত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের রক্তস্নাত আন্দোলনকে নিজেদের প্রক্সি যুদ্ধের অংশ বলে দাবি করতে চাইছে, অন্যদিকে কিছু আঞ্চলিক পরাশক্তি এই ঘটনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের পুরো পরিবর্তনকে 'মৌলবাদ' বা 'বিদেশী ষড়যন্ত্র' হিসেবে বিশ্ব দরবারে চিহ্নিত করার সুযোগ খুঁজছে।

এই দ্বিবিধ ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের সততার সাথে সত্যকে তুলে ধরতে হবে। ওসমান হাদি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের এক নির্ভীক সন্তান। তাঁর রক্তের মূল্য এবং আত্মত্যাগ তখনই সার্থকতা পাবে, যখন তাঁকে কোনো বিদেশী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর দাবার ঘুঁটি হিসেবে নয়, বরং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের এক গর্বিত জাতীয় সন্তান হিসেবে স্মরণে রাখা হবে।

বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান বা হিন্দুত্ববাদ কারোরই প্রক্সি হতে চায় না। শ্রীনগরের দেয়ালচিত্রের মতো প্রোপাগান্ডাকে নস্যাৎ করে দিয়ে ১৬ কোটি বাঙালিকে আজ একস্বরে উচ্চকিত হতে হবে: "আমাদের পরিচয় বাংলাদেশ, আমাদের প্রতীক লাল-সবুজ, এবং আমাদের লড়াই কেবলই আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য।"

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.