জীবিত বনাম মৃত ওসমান হাদি - একটি লাশের রাজনীতি
রাজনীতিতে মানুষের জীবনের চেয়ে লাশের মূল্য কি বেশি? প্রশ্নটি কর্কশ হলেও বাংলাদেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ছাত্রনেতা ওসমান হাদির অকাল প্রয়াণ এবং তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্মাদনা আমাদের সমাজের এক নগ্ন সত্যকে সামনে এনেছে। আমরা কি কেবল মানুষকে মরার পরই সম্মান করতে জানি? নাকি জীবিত হাদির চেয়ে ‘মৃত হাদি’ এখন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বেশি সুবিধাজনক?

TruthBangla

Dec 22, 2025
রাজনীতিতে মানুষের জীবনের চেয়ে লাশের মূল্য কি বেশি? প্রশ্নটি কর্কশ হলেও বাংলাদেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ছাত্রনেতা ওসমান হাদির অকাল প্রয়াণ এবং তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্মাদনা আমাদের সমাজের এক নগ্ন সত্যকে সামনে এনেছে। আমরা কি কেবল মানুষকে মরার পরই সম্মান করতে জানি? নাকি জীবিত হাদির চেয়ে ‘মৃত হাদি’ এখন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বেশি সুবিধাজনক?
এই প্রবন্ধে আমরা ওসমান হাদির জীবনের শেষ দিনগুলোর সংগ্রাম, তার মৃত্যুর পর ঘনিয়ে আসা রহস্যময় রাজনীতি এবং আমাদের সমাজের সুযোগ সন্ধানী মানুষের মুখোশ উন্মোচন করার চেষ্টা করব।
অবহেলিত ওসমান হাদি - এক মাস আগের দৃশ্যপট
ওসমান হাদিকে নিয়ে আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মাত্র এক মাস আগের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় এই ওসমান হাদি যখন দ্বারে দ্বারে লিফলেট নিয়ে যেতেন, তখন তাকে কী নিদারুণ অবহেলার শিকার হতে হয়েছে, তা আজ অনেকেরই বিস্মৃতির আড়ালে।
চায়ের দোকানি থেকে শুরু করে রিকশাচালক অনেকেই হাদির ডাকে সাড়া দেয়নি। এমনকি তার প্রচারণায় ময়লা ছুঁড়ে মারার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। জুমার নামাজের পর যখন তিনি একা দাঁড়িয়ে লিফলেট বিলি করতেন, তখন মানুষ তাকে পাগল বা অপ্রাসঙ্গিক ভেবে এড়িয়ে যেত। কিন্তু হাদি ছিলেন অদম্য। কেউ তাকে গালি দেওয়ার হুমকি দিলে তিনি বলতেন, "গালি দিয়েন, তবুও আসব। গালি দিতে দিতে একদিন হয়তো চায়ের কাপও এগিয়ে দেবেন।"
এই যে একজন মানুষের আপসহীন সংগ্রাম, নিজের বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকা, জীবিত অবস্থায় সমাজ তাকে প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। অথচ আজ তার মৃত্যুর পর সবাই যেন তার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
শাহাদাতের তকমা ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতি
ওসমান হাদি সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হওয়ার পরই হঠাৎ করে 'মূল্যবান' হয়ে উঠলেন। এই পরিবর্তনটি আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত। হাদি যাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে মূল্যবান ছিল, তারা তার গুলি খাওয়ার আগেও তাকে একইভাবে ভালোবাসত। তাদের সেই ভালোবাসায় কোনো গোপন উদ্দেশ্য ছিল না।
কিন্তু গোল বেধেছে তাদের নিয়ে, যারা হাদির মৃত্যুকে পুঁজি করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে। বিশেষ করে হাদির জানাজা ও দাফন নিয়ে জামায়াত-শিবিরের মতো রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর যে ভূমিকা দেখা গেছে, তা অনেকের কাছেই ঘৃণ্য রাজনীতির নামান্তর মনে হয়েছে। তারা হাদির আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের অচল রাজনীতিকে সচল করার পায়তারা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যারা হাদিকে জীবিত অবস্থায় কোনো মঞ্চে জায়গা দেয়নি, আজ তারাই হাদির লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বড় বড় বুলি আউড়াচ্ছে।
ঘাতকের স্লোগান - ভিড়ের মাঝে লুকিয়ে থাকা শত্রু
সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, হাদির খুনিরা বা ষড়যন্ত্রকারীরা হয়তো হাদির চারপাশেই ছিল। যারা এক সময় হাদির সাথে ভিড় করে থাকত, স্লোগান দিত "তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি, ইনকিলাব জিন্দাবাদ" তাদের মধ্যেই হয়তো কেউ হাদির জীবনের আলো নিভিয়ে দিয়েছে। এটি রাজনীতির একটি পুরোনো খেলা; আগে মারো, তারপর লাশের ওপর দাঁড়িয়ে বিলাপ করো।
তাই যারা আজ হাদির জন্য মায়াকান্না কাঁদছে, তাদের মধ্যেকার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যক্তিদের সন্দেহে রাখা জরুরি। একমাত্র সাধারণ মানুষ, যাদের কোনো পদ-পদবি বা সাংগঠনিক উদ্দেশ্য নেই, তারাই হয়তো হাদিকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে।
অদৃশ্য সেন্সরশিপ ও সোশ্যাল মিডিয়া রিচ
ওসমান হাদি দেশ নিয়ে কী ভাবতেন, তার টকশো বা তাত্ত্বিক আলোচনাগুলো তার মৃত্যুর পর ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই ভিডিওগুলো কি আগে ছিল না? অবশ্যই ছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে বা অ্যালগরিদমের মারপ্যাঁচে হাদির বক্তব্যগুলো মানুষের সামনে আসতে দেওয়া হয়নি।
হাদি যখন জীবিত থেকে সমাজ সংস্কারের কথা বলতেন, তখন তাকে মিডিয়া বা সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ব্লক করে রাখা হয়েছিল। আর আজ যখন তিনি কথা বলতে পারবেন না, তখন তার বক্তব্যগুলো মানুষের কানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এটা কি হাদির প্রতি ভালোবাসা, নাকি তার কণ্ঠ রোধ করার পর তার জনপ্রিয়তা ভাঙিয়ে খাওয়ার নতুন কোনো কৌশল?
জানাজার আড়ালে 'মব কালচার' ও লুটপাটের আকাঙ্ক্ষা
হাদির জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। কিন্তু এই ভিড়ের সবাই কি হাদিকে শেষ বিদায় দিতে গিয়েছিল? দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। জানাজার ভিড়কে কাজে লাগিয়ে একটি 'মব' বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যায় কি না, সেই ধান্ধায় ছিল একটি বিশেষ গোষ্ঠী।
৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা দেখেছি কীভাবে 'মব' জাস্টিসের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট করা হয়েছে। সংসদ ভবন থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছায়ানট কোনোটিই বাদ যায়নি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যারা ছায়ানটকে 'হারাম' বলে ফতোয়া দেয়, তারাই আবার সেখান থেকে হারমোনিয়াম বা কম্পিউটার চুরি করে আনাকে 'গণিমতের মাল' বা জায়েজ মনে করে। হাদির জানাজাকেও এই ধরণের লুটপাটের একটি উছিলা হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে সচেতন মহল মনে করে।
ভোল পাল্টানো 'নতুন জনসেবক'দের আর্তনাদ
আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা অনেক নব্য বিপ্লবীর দেখা পেয়েছি। আমার পরিচিত এমন অনেক মানুষ আছে, যারা মানুষের টাকা আত্মসাৎ করেছে বা বাটপার হিসেবে পরিচিত ছিল, তারা এখন রাতারাতি জনসেবক বনে গেছে।
এই বাটপার শ্রেণীটিই এখন হাদির নামে সবচেয়ে বেশি আর্তনাদ করছে। হাদিকে তারা নিজেদের ভাই দাবি করে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। এদের নিয়ে শংকিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। যারা মানুষের আমানত খেয়ানত করে, তারা যদি আজ রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে, তবে ওসমান হাদির মতো নির্লোভ মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। এরা সুযোগ পেলেই দেশ ও দশের সাথে বড় ধরনের প্রতারণা করবে।
ইনসাফ কায়েমের পূর্বশর্ত - হৃদয় ও চিন্তার উন্নয়ন
ক্ষুধার্থ, অসহিষ্ণু এবং বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ দিয়ে কখনো ইনসাফ বা ন্যায়বিচার কায়েম করা যায় না। যারা ভাতে মরা বা অশান্ত হৃদয়ের অধিকারী, তাদের প্রথম লক্ষ্য থাকে নিজের আখের গোছানো। ইনসাফ কায়েমের জন্য প্রয়োজন:
শান্ত হৃদয়: ক্রোধ বা প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত মন।
উন্নত চিন্তা: সংকীর্ণ দলীয় বা ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে ওঠা।
ব্যক্তিগত সততা: নিজে সৎ না হয়ে অন্যকে সততার ছবক দেওয়া ভণ্ডামি।
হাদির প্রয়াণের পর যারা তার আবেগ বিক্রি করে 'মব' তৈরির ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি বা কামাইয়ের ধান্ধায় আছে, তাদের থেকে সাবধান থাকা জরুরি। অনেক বিপ্লবীই আসলে ছদ্মবেশী সুবিধাবাদী, যাদের মূল লক্ষ্য হলো দুই নাম্বারি উপায়ে অর্থ উপার্জন করা।
ব্যতিক্রমী ওসমান হাদি - ছাতার তলায় না যাওয়ার পরিণতি
ওসমান হাদি তার সমসাময়িক অনেকের তুলনায় ব্যতিক্রম ছিলেন। তার অনেক সহযোদ্ধার ব্যাংক ব্যালেন্স, গাড়ি-বাড়ি এবং শারীরিক অবয়ব ফুলে-ফেঁপে উঠলেও হাদির ভাগ্যে তা জোটেনি। হাদি কেন গরিব থেকে গেলেন? কারণ তিনি কোনো 'ছাতার তলায়' বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের আশ্রয় নেননি।
তিনি সেই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেই কথা বলতেন, যারা বিপ্লবের নামে নিজেদের আখের গোছায়। আজ যারা হাদির নাম ব্যবহার করে হাইলাইট হচ্ছে, তারা যদি হাদিকে জীবিত অবস্থায় একটু প্রাধান্য দিত, তবে হয়তো হাদিকে আজ কবরে শুয়ে থাকতে হতো না। জীবিত হাদি সবার কাঁধে কাঁধ রেখে তার স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করতে পারতেন।
জীবিত হাদিকে আমরা হারিয়েছি, মৃত হাদিকে কি রক্ষা করতে পারব?
ওসমান হাদি কিসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ দিলেন, আর আজ তার জানাজাকে ঢাল বানিয়ে সেই একই অপকর্মগুলো কারা করছে তা দেখার সময় এসেছে। হাদি চেয়েছিলেন একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফপূর্ণ সমাজ। অথচ তার মৃত্যুর পর আমরা দেখছি চরম অসহিষ্ণুতা ও লুটপাটের রাজনীতি।
যদি আমরা সত্যিই হাদিকে ভালোবাসতাম, তবে তার চিন্তাকে জীবিত রাখতাম। লাশের রাজনীতি বন্ধ করে হাদির আদর্শকে ধারণ করাই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। অন্যথায়, আমরা কেবল আরেকটি লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের সুবিধাবাদকেই জয়ী করব।














