>

>

জীবিত বনাম মৃত ওসমান হাদি - একটি লাশের রাজনীতি

জীবিত বনাম মৃত ওসমান হাদি - একটি লাশের রাজনীতি

জীবিত বনাম মৃত ওসমান হাদি - রাজনীতিতে মানুষের জীবনের চেয়ে কি লাশের মূল্য বেশি? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত কর্কশ, নিষ্ঠুর এবং সংবেদনহীন মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে যদি আমরা কোনো চশমা ছাড়া, একদম নগ্ন চোখে দেখার চেষ্টা করি, তবে এই প্রশ্নটি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এটি আজ এক জ্বলন্ত ও অনিবার্য জিজ্ঞাসা।

TruthBangla

জীবিত বনাম মৃত ওসমান হাদি - একটি লাশের রাজনীতি

জীবিত বনাম মৃত ওসমান হাদি - রাজনীতিতে মানুষের জীবনের চেয়ে কি লাশের মূল্য বেশি? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত কর্কশ, নিষ্ঠুর এবং সংবেদনহীন মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে যদি আমরা কোনো চশমা ছাড়া, একদম নগ্ন চোখে দেখার চেষ্টা করি, তবে এই প্রশ্নটি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এটি আজ এক জ্বলন্ত ও অনিবার্য জিজ্ঞাসা।

তরুণ ছাত্রনেতা ওসমান হাদির অকাল ও নির্মম প্রয়াণ এবং তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিনে আমাদের সমাজে যে ধরণের উন্মাদনা, আবেগ প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দড়িটানাটানি লক্ষ্য করা গেছে, তা আমাদের সামষ্টিক মনস্তত্ত্বের এক অন্ধকার দিককে উন্মোচিত করেছে।

এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি মৌলিক নৈতিক সংকট দাঁড় করিয়ে দিয়েছে: আমরা কি কেবল মানুষকে মরার পরই সম্মান করতে জানি? নাকি জীবিত হাদির চেয়ে ‘মৃত হাদি’ এখন কোনো কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা ও বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বেশি সুবিধাজনক এবং লাভজনক?

একটি সমাজ যখন জীবন্ত মানুষের আদর্শকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, কিন্তু তার নিথর দেহটিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার বা 'পণ্য' হিসেবে ব্যবহার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ডে পচন ধরেছে। এই প্রবন্ধে আমরা ওসমান হাদির জীবনের শেষ দিনগুলোর নির্মম সংগ্রাম, তাঁর মৃত্যুর পর ঘনীভূত হওয়া রহস্যময় সুবিধাবাদী রাজনীতি এবং আমাদের চারপাশের চেনা মানুষদের ভোল পাল্টানোর নগ্ন উৎসবের একটি নির্মোহ ও তথ্যভিত্তিক ব্যবচ্ছেদ করব।

অবহেলিত ওসমান হাদি: জীবিত বনাম মৃত

ওসমান হাদিকে নিয়ে আজ ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) কিংবা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগের সুনামি বয়ে যাচ্ছে। যে দিকেই তাকানো যায় হাদির ছবি, হাদির উদ্ধৃতি, হাদির পুরোনো বক্তব্যের ক্লিপিংস আর লম্বা লম্বা শোকগাথা। কিন্তু মাত্র এক মাস আগের বাস্তবতার দিকে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখব সেই দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, নিদারুণ এবং চরম হতাশাজনক।

নির্বাচনী প্রচারণার সেই নিঃসঙ্গ দিনগুলো

নির্বাচনী প্রচারণার সময় এই ওসমান হাদি যখন নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসের কথা বলতে দ্বারে দ্বারে লিফলেট নিয়ে যেতেন, তখন তাকে কী ধরণের অবহেলা ও উপহাসের শিকার হতে হয়েছে, তা আজ সাধারণ মানুষের স্বল্পস্থায়ী স্মৃতির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।

সাধারণ মানুষের উদাসীনতা: চায়ের দোকানদার থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাচালক, পথচারী কিংবা তথাকথিত সচেতন নাগরিক অনেকেই হাদির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। মানুষ তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া লিফটের হাতটি এড়িয়ে চলে গেছে।

ন্যক্কারজনক আচরণ: অনেক জায়গায় তাঁর গায়ে ময়লা-আবর্জনা ছুঁড়ে মারার মতো অত্যন্ত নিচু মানের ঘটনাও ঘটেছে।

নিঃসঙ্গ লড়াই: প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর যখন তপ্ত রোদে বা ক্লান্তিকর দুপুরে তিনি একাকী মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে লিফলেট বিলি করতেন, তখন মানুষ তাকে 'পাগল', 'উদ্ভট' বা 'অপ্রাসঙ্গিক' ভেবে পাশ কাটিয়ে চলে যেত।

"গালি দিয়েন, তবুও আসব। গালি দিতে দিতে একদিন হয়তো চায়ের কাপও এগিয়ে দেবেন।" - ওসমান হাদি (এক অবাধ্য ও অদম্য আশাবাদের নাম)

এই যে একজন মানুষের আপসহীন সংগ্রাম, নিজের সততা ও বিশ্বাসের প্রতি এই যে অবিচল একাগ্রতা জীবিত অবস্থায় সমাজ তাকে তার প্রাপ্য ন্যূনতম সম্মান বা মনোযোগ দেয়নি। অথচ আজ তিনি যখন কবরে শায়িত, তখন সবাই যেন তার সবচেয়ে বড় হিতৈষী, সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী এবং পরম সুহৃদ হয়ে ওঠার এক অসুস্থ ও নোংরা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। জীবন্ত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষের যে এই কদর, তা মূলত আমাদের সমাজের এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা।

শাহাদাতের তকমা ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতি

ওসমান হাদি যখন সন্ত্রাসীদের বুলেটের আঘাতে গুরুতর আহত হলেন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, ঠিক তখনই যেন রাতারাতি তিনি অত্যন্ত 'মূল্যবান' এক রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হলেন। এই যে আকস্মিক রূপান্তর, এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি মারাত্মক অশনিসংকেত।

হাদি যাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে মূল্যবান ছিলেন তাঁর পরিবার, তাঁর অতি কাছের কয়েকজন নিঃস্বার্থ সহযোদ্ধা এবং সাধারণ শোষিত মানুষ তারা কিন্তু হাদি গুলি খাওয়ার আগেও তাকে একইভাবে ভালোবাসতেন। তাদের সেই ভালোবাসার মধ্যে কোনো লুকানো এজেন্ডা কিংবা ক্ষমতার লোভ ছিল না।

লাশের ওপর ভাগাড়ের শকুন

আসল সমস্যা তৈরি হয়েছে সেই সব সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে, যারা হাদির মৃত্যুকে পুঁজি করে নিজেদের ঝিমিয়ে পড়া বা অচল রাজনীতিকে সচল করার নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। বিশেষ করে হাদির জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তির (যেমন জামায়াত-শিবির বা অন্যান্য উগ্র/সুযোগসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম) যে ধরণের অতি-তৎপরতা দেখা গেছে, তা সচেতন মহলের কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনীতির নামান্তর মনে হয়েছে।

রাজনৈতিক সত্য: যারা হাদিকে জীবিত অবস্থায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে বা নীতিনির্ধারণী জায়গায় বসার সুযোগ দেয়নি, আজ তারাই হাদির লাশের পাশে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে বড় বড় বিপ্লবী বুলি আউড়াচ্ছে। হাদির খাঁটি আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা মূলত নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়।

যখন একটি তরুণের তাজা রক্ত ঝরে পড়ে, তখন এই শকুনেরা সেই রক্তের গন্ধ শুঁকে শুঁকে চলে আসে এবং হিসাব কষতে বসে যে, এই লাশটি ব্যবহার করে কতটি মিছিল বের করা যাবে, কতটি সেন্টিমেন্টাল পোস্ট দেওয়া যাবে এবং প্রতিপক্ষের ওপর কতটা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে। এটি ইনসাফের রাজনীতি নয়, এটি হলো নিখাদ লাশের ব্যবসা।

ভিড়ের মাঝে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশী শত্রু

ওসমান হাদির মৃত্যুর পর সবচেয়ে ভয়ংকর ও মনস্তাত্ত্বিক দিকটি হলো হাদির খুনি কিংবা তাঁর মৃত্যুর পেছনে থাকা আসল চক্রান্তকারীরা হয়তো অন্য কোথাও নেই, তারা হয়তো আজ হাদির জন্য আয়োজিত শোকসভার প্রথম সারিতেই বসে আছে।

এটি রাজনীতির অত্যন্ত প্রাচীন ও কুৎসিত একটি কৌশল: "প্রথমে টার্গেটকে হত্যা করো, তারপর তার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জোরে বিলাপ করো।"

স্লোগানের আড়ালে ভণ্ডামি

এক সময় যারা হাদির চারপাশে ভিড় করে থাকত, তাঁর সাথে সেলফি তুলত এবং উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দিত:

"তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি, ইনকিলাব জিন্দাবাদ!"

তাদের সবার নিয়ত কি পরিষ্কার ছিল? তাদের মধ্যেই কি কেউ ছিল না, যে ভেতর ভেতর হাদির জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর জীবনের আলো নিভিয়ে দেওয়ার ছক কষেছিল? কিংবা এমন কেউ, যে জানত হাদি বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলেই তাদের সংগঠনের বেশি লাভ?

তাই আজ যারা হাদির জন্য সবচেয়ে বেশি মায়াকান্না কাঁদছে, সবচেয়ে বেশি বুক চাপড়াচ্ছে, তাদের মধ্যকার অতি-উৎসাহী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যক্তিদের কড়া নজরদারিতে ও সন্দেহের তালিকায় রাখা প্রয়োজন। একমাত্র সাধারণ মানুষ যাদের কোনো পদ-পদবি পাওয়ার লোভ নেই, কোনো সাংগঠনিক পদোন্নতির বাসনা নেই তারাই হয়তো হাদিকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল। বাকিদের চোখের জল মূলত কুমিরের অশ্রু।

অদৃশ্য সেন্সরশিপ ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম

ওসমান হাদি দেশ নিয়ে কী ভাবতেন, তাঁর বৈষম্যহীন সমাজের রূপরেখা কেমন ছিল, তাঁর বিভিন্ন টকশো বা তাত্ত্বিক আলোচনাগুলো তাঁর মৃত্যুর পর হঠাৎ করে ফেসবুক বা ইউটিউবের ফিডে বন্যা বয়ে এনেছে। এখানে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন জাগে: এই ভিডিওগুলো কি হাদি বেঁচে থাকার সময় ইন্টারনেটে ছিল না?

অবশ্যই ছিল। কিন্তু হাদি যখন জীবিত থেকে সমাজ সংস্কারের কথা বলতেন, রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতেন, তখন এক অদৃশ্য সেন্সরশিপ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের মারপ্যাঁচে তাঁর বক্তব্যগুলোকে সাধারণ মানুষের সামনে আসতে দেওয়া হতো না। তাঁর অ্যাকাউন্ট রিচ কমিয়ে দেওয়া হতো, তাঁকে মূলধারার মিডিয়া থেকে ব্লক বা শ্যাডো-ব্যান করে রাখা হতো।

কারণ, একজন জীবিত ও প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত হাদি ছিলেন সমাজের ক্ষমতাবান সিন্ডিকেটের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তিনি জীবিত থাকলে প্রশ্ন তুলতেন, জবাবদিহিতা চাইতেন।

আর আজ যখন তিনি মৃত, যখন তিনি আর কখনো নতুন কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না, যখন তাঁর কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে তখন তাঁর পুরোনো বক্তব্যগুলোকে মানুষের কানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এটি হাদির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা নয়, এটি হলো তাঁর কণ্ঠ রোধ করার পর তাঁর অবর্তমানে তাঁর অবশিষ্ট জনপ্রিয়তাকে ভাঙিয়ে খাওয়ার এবং ভিউ ও রাজনৈতিক সেন্টিমেন্ট কামানোর এক আধুনিক কর্পোরেট কৌশল।

জানাজার আড়ালে 'মব কালচার' ও লুণ্ঠন

ওসমান হাদির জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল, এটা সত্য। কিন্তু এই ভিড়ের সবাই কি আসলেই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক তরুণকে শেষ বিদায় দিতে গিয়েছিলেন? দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য হলো, এই ভিড়ের ভেতরে মিশে ছিল একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী, যাদের চোখ ছিল অন্য কোথাও।

তারা হাদির জানাজার এই বিশাল আবেগময় জমায়েতকে কাজে লাগিয়ে একটি 'মব' (Mob) বা উগ্র বিশৃঙ্খলা তৈরি করার ধান্ধায় ছিল।

৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের ক্ষত

৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক 'মব জাস্টিস' বা মব সংস্কৃতির উত্থান দেখেছি। বিপ্লব ও পরিবর্তনের সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একদল উগ্র, সুবিধাবাদী মানুষ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে।

দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা বা সংসদ ভবন থেকে শুরু করে আমাদের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু 'ছায়ানট' কোনোটিই এই উন্মাদনা থেকে রেহাই পায়নি। সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী নীতি লক্ষ্য করা যায় তখনই, যখন দেখা যায় যে মানুষগুলো বা যে গোষ্ঠীগুলো ছায়ানটকে 'হারাম' বা 'ইসলাম-বিরোধী' বলে ফতোয়া দেয়, তারাই আবার সুযোগ বুঝে সেই ছায়ানটের ভেতরে ঢুকে হারমোনিয়াম, তবলার পাশাপাশি কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা এসি চুরি করে নিয়ে আসে! এই চুরিকে তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে 'গণিমতের মাল' বলে জায়েজ করার ধৃষ্টতা দেখায়।

ওসমান হাদির জানাজাকেও এই ধরণের একটি উগ্র মব তৈরি করে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা বা ব্যক্তিগত আখের গোছানোর উছিলা হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা করা হয়েছিল বলে সচেতন সমাজ মনে করে। হাদি নিজে কখনো এই ধরণের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা লুটপাটের রাজনীতি সমর্থন করতেন না, অথচ তাঁর নামেই এই অপকর্মের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

ভোল পাল্টানো 'নব্য জনসেবক' ও বাটপারদের আর্তনাদ

আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের আরেকটি বড় ট্র্যাজেডি হলো রাত জারাতেই 'নব্য বিপ্লবী' এবং 'নব্য জনসেবক'দের ব্যাঙের ছাতার মতো উত্থান। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা কিছুদিন আগেও সমাজের চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, সুদী কারবারি কিংবা সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎকারী বাটপার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তারা এখন গায়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লেবাস লাগিয়ে কিংবা মুখে বড় বড় ইনসাফের বুলি আউড়ে রাতারাতি সমাজের চালক সেজে বসেছেন।

আজ এই বাটপার শ্রেণীটিই ওসমান হাদির নামে সবচেয়ে বেশি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিচ্ছে, প্রোফাইল পিকচার কালো করছে এবং হাদিকে নিজেদের 'কলিজার টুকরা ভাই' দাবি করে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কান্নাকাটি করছে।

কেন এই নব্য বিপ্লবীদের নিয়ে আমরা শঙ্কিত?

এদের নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট এবং যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কারণ যে মানুষটি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সৎ নয়, যে মানুষের হাত অন্যের আমানত খেয়ানত করতে বিন্দুমাত্র কাঁপে না, সে যখন হাদির মতো একজন নির্লোভ ও ত্যাগী মানুষের রক্তের উত্তরাধিকার দাবি করে, তখন বুঝতে হবে সে কোনো বড় ধরণের প্রতারণার জাল বুনছে।

এরা মূলত হাদির লাশের ওপর পা দিয়ে নিজেদের অতীত পাপ ঢাকতে চায় এবং নতুন শাসনব্যবস্থায় নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ আসন নিশ্চিত করতে চায়। এরা সুযোগ পেলেই দেশ ও দশের সাথে এর চেয়েও বড় কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করবে।

ইনসাফ কায়েমের পূর্বশর্ত

ওসমান হাদি আজীবন সমাজে একটি জিনিসই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, আর তা হলো 'ইনসাফ' বা ন্যায়বিচার। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, ক্ষুধার্ত, হিংস্র, অসহিষ্ণু এবং বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ দিয়ে কখনো সমাজে ইনসাফ কায়েম করা যায় না।

যাদের নিজেদের পেট নীতিহীনতায় ভরা, যাদের হৃদয় অশান্ত এবং প্রতিহিংসায় অন্ধ, তাদের প্রথম এবং একমাত্র লক্ষ্য থাকে যেকোনো উপায়ে নিজের আখের গোছানো, ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া এবং পকেট ভারী করা। ইনসাফ বা বৈষম্যহীন সমাজ কোনো সস্তা স্লোগান বা মব তৈরির বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের ভেতরগত কিছু মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

ইনসাফ কায়েমের স্তম্ভত্রয়

১. শান্ত ও স্থিতিশীল হৃদয়: ক্রোধ, প্রতিহিংসা কিংবা ক্ষমতার লোভ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একটি মন, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে পারে।

২. উন্নত ও প্রগতিশীল চিন্তা: সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ, গোঁড়ামি কিংবা অন্ধ অন্ধত্ব থেকে ঊর্ধ্বে উঠে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ ভাবার মানসিকতা।

৩. ব্যক্তিগত সততা: নিজে দুর্নীতিমুক্ত না হয়ে অন্যকে সততার ছবক দেওয়া চরম ভণ্ডামি। ইনসাফ শুরু হয় নিজের ঘর থেকে।

হাদির প্রয়াণের পর আজ যারা তাঁর পবিত্র আবেগকে বাজারে বিক্রি করে, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা দুই নম্বরি উপায়ে কামাইয়ের ধান্ধায় লিপ্ত রয়েছে, তাদের চিনে রাখা এবং তাদের থেকে দূরে থাকা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই ছদ্মবেশী বিপ্লবীদের মূল লক্ষ্য দেশ সংস্কার নয়, তাদের মূল লক্ষ্য হলো নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন।

ব্যতিক্রমী ওসমান হাদি: ছাতার তলায় না যাওয়ার পরিণতি

ওসমান হাদি তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য ছাত্রনেতা বা সহযোদ্ধাদের তুলনায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও অনন্য ছিলেন। তাঁর সাথে রাজনীতি শুরু করা বা তাঁর সমসাময়িক অনেকেরই আজ ঢাকা শহরে আলিশান ফ্ল্যাট আছে, ব্যাংক ব্যালেন্স ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, দামী গাড়িতে চড়েন এবং তাদের শারীরিক অবয়বেও ক্ষমতার চর্বি স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু হাদির ভাগ্যে এর কোনোটিই জোটেনি। হাদি কেন শেষ দিন পর্যন্ত একজন সাধারণ, প্রায় দরিদ্র মানুষ হিসেবেই থেকে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তরটি লুকিয়ে আছে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার মধ্যে।

সিন্ডিকেটের দাসত্ব বর্জন

হাদি কখনো কোনো বড় ভাই, রাজনৈতিক গডফাদার কিংবা প্রভাবশালী কোনো 'সিন্ডিকেটের ছাতার তলায়' আশ্রয় নেননি। তিনি জানতেন, কোনো সিন্ডিকেটের তলায় যাওয়া মানে নিজের বিবেককে বন্ধক দেওয়া, নিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।

তিনি বরং আজীবন সেই সব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন, যারা বিপ্লব ও রাজনীতির নাম ব্যবহার করে পর্দার আড়ালে নিজেদের আখের গোছায়। আজ যারা হাদির নাম ব্যবহার করে মিডিয়ার লাইমলাইটে আসতে চাইছেন, তারা যদি হাদি জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁকে একটু প্রাধান্য দিতেন, তাঁকে যদি একটু আর্থিক বা রাজনৈতিকভাবে নিঃস্বার্থ সাপোর্ট দিতেন, তবে হয়তো হাদিকে আজ এত তাড়াতাড়ি কবরের অন্ধকূপে শুয়ে থাকতে হতো না। জীবিত হাদি তাঁর সমস্ত মেধা ও শক্তি নিয়ে নিজের স্বপ্নগুলো রাজপথে বাস্তবায়ন করতে পারতেন। কিন্তু সমাজ তাকে বেঁচে থাকতে একাকীত্ব আর অবহেলা ছাড়া কিছুই দেয়নি।

জীবিত হাদি বনাম মৃত হাদি

নিচের ছকটি লক্ষ্য করলে পরিষ্কার বোঝা যাবে কীভাবে আমাদের সমাজ একজন জীবন্ত আদর্শবাদীকে অবজ্ঞা করে এবং তার মৃত্যুর পর তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে:

মূল্যায়নের ক্ষেত্র

জীবিত ওসমান হাদি (বাস্তব সংগ্রাম)

মৃত ওসমান হাদি (সুযোগসন্ধানী রাজনীতি)

সমাজের প্রকৃত চরিত্র

সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

মানুষ তাকে 'পাগল', 'অপ্রাসঙ্গিক' বা 'উদ্ভট' ভেবে এড়িয়ে চলত। লিফলেট বিলির সময় উপহাস ও ময়লা ছুঁড়ে মারা হতো।

রাতারাতি তিনি 'জাতীয় বীর', 'শহীদ' এবং 'ইনকিলাবের প্রতীক'-এ পরিণত হয়েছেন। ফেসবুক-ইউটিউবে আবেগের জোয়ার।

জীবিত অবস্থায় গুণের কদর না করা এবং মৃত মানুষের ওপর সস্তা আবেগ দেখানোর সামষ্টিক ভণ্ডামি।

রাজনৈতিক উপযোগিতা

কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তাকে তাদের মূল মঞ্চে বা নীতিনির্ধারণী পদে জায়গা দেয়নি।

জামায়াত-শিবিরসহ বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী তাঁর লাশ ও জানাজাকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের ঢাল বানিয়েছে।

আদর্শের চেয়ে লাশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য আমাদের সমাজে অনেক বেশি।

মিডিয়া ও সোশ্যাল রিচ

অদৃশ্য সেন্সরশিপ এবং অ্যালগরিদমের মারপ্যাঁচে তাঁর প্রখর বক্তব্য ও টকশো সমাজ থেকে লুকিয়ে রাখা বা শ্যাডো-ব্যান করা হতো।

মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিটি পুরোনো ভিডিও ক্লিপ, তাত্ত্বিক আলোচনা মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পাচ্ছে এবং ভাইরাল করা হচ্ছে।

স্তব্ধ কণ্ঠস্বরকে পুঁজিকরণ করে ব্যবসা ও ভিউ কামানোর আধুনিক কর্পোরেট মানসিকতা।

সহযোদ্ধা ও চারপাশের মানুষ

একাকী লড়াই করতেন, যখন তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরা রাজনৈতিক প্রভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছিল, হাদি তখনো দরিদ্র ও নির্লোভ ছিলেন।

তাঁর খুনি বা চক্রান্তকারীরাই হয়তো আজ প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে "ইনকিলাব জিন্দাবাদ" স্লোগান দিচ্ছে এবং ভাই হারানোর মায়াকান্না কাঁদছে।

রাজনীতির কুৎসিত খেলা—প্রথমে হত্যা করো, তারপর সেই লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করো।

জানাজা ও মব কালচার

তিনি ইনসাফ ও নিয়মতান্ত্রিক সুশৃঙ্খল আন্দোলনের কথা বলতেন, যা মানুষকে শান্ত হতে শেখাত।

তাঁর জানাজার ভিড়কে পুঁজি করে একদল উগ্র মানুষ 'মব জাস্টিস' ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাটের উছিলা খুঁজছিল।

বিপ্লবের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং 'গণিমতের মাল' নাম দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির মানসিকতা।

মৃত মানুষ কেন 'নিরাপদ' রাজনৈতিক পুঁজি?

রাজনীতিতে জীবিত আদর্শবাদীর চেয়ে মৃত আদর্শবাদী অনেক বেশি জনপ্রিয় এবং "ব্যবহারযোগ্য" হওয়ার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।

কণ্ঠহীন প্রতীক: একজন জীবিত ওসমান হাদি ছিলেন বিপজ্জনক। তিনি যেকোনো ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে পারতেন, নিজের দলের বা সংগঠনের ভেতরের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারতেন এবং সবচেয়ে বড় কথা তার চিন্তাভাবনা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত বা বিবর্তিত হতে পারত। কিন্তু একজন মৃত হাদি সম্পূর্ণ নীরব। তিনি আর কখনো কোনো প্রশ্ন করবেন না, কারো অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন না।

ব্র্যান্ডিং-এর সুবিধা: মৃত্যুর পর একজন মানুষকে ইচ্ছামতো ফ্রেমে বন্দি করা যায়। সুযোগসন্ধানীরা এখন হাদির মুখে নিজেদের সুবিধাজনক স্লোগান বসিয়ে দিতে পারে। হাদিকে একটি ‘ব্র্যান্ড’ বা ‘আইকন’-এ রূপান্তর করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যতটা সহজ, একজন রক্ত-মাংসের স্বাধীনচেতা তরুণকে নিয়ন্ত্রণ করা তার চেয়ে হাজার গুণ কঠিন ছিল।

"জীবিত আদর্শবাদী সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে, কিন্তু মৃত আদর্শবাদী সুবিধাবাদীদের ব্যবসার লাইসেন্স দেয়।"

সামষ্টিক অপরাধবোধ (Collective Guilt) ও ভার্চুয়াল ক্ষতিপূরণ

হাদির মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় যে আবেগের জোয়ার আমরা দেখি, তার একটা বড় অংশ আসে সমাজের সামষ্টিক অপরাধবোধ থেকে।

উদাসীনতার খেসারত: যে মানুষগুলো এক মাস আগে তাকে এড়িয়ে চলেছিল, যারা তাকে পাগল ভেবেছিল, হাদির মৃত্যুর পর তাদের অবচেতন মনে একটি অপরাধবোধ কাজ করে। তারা বুঝতে পারে যে তারা একজন খাঁটি মানুষকে অবহেলা করেছে।

ভার্চুয়াল ওয়াশআউট: এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নেয়। লম্বা স্ট্যাটাস দেওয়া, প্রোফাইল পিকচার কালো করা বা হাদির পুরোনো ভিডিও শেয়ার করা এগুলো আসলে হাদির প্রতি ভালোবাসা যতখানি, তার চেয়ে বেশি নিজের ভেতরের অপরাধবোধ ধুয়ে ফেলার চেষ্টা। সমাজ জীবিত থাকতে যাকে এক ফোঁটা পানি দেয়নি, মৃত অবস্থায় তার কবরে গ্যালন গ্যালন চোখের জল ঢেলে তারা নিজেদের ‘পাপমোচন’ করতে চায়।

বিপ্লবোত্তর শূন্যতা ও ‘মব জাস্টিস’

৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে ‘মব কালচার’ বা বিশৃঙ্খলার কথা বলা হয়েছে, তা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত চেনা একটি প্যাটার্ন। একে বলা হয় "ট্রানজিশনাল ভ্যাকুয়াম" (Transitional Vacuum) বা পরিবর্তনকালীন শূন্যতা।

আইনহীনতার সুযোগ: যখন একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে, তখন পুরনো শাসনকাঠামো ভেঙে পড়ে কিন্তু নতুন কোনো শক্ত নিয়মকানুন সাথে সাথে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এই মধ্যবর্তী সময়ে সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট উপাদানগুলো (চাঁদাবাজ, লুম্পেন ও সুযোগসন্ধানী) সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বিপ্লবের ছদ্মবেশ: এরা খুব ভালো করেই জানে যে সরাসরি অপরাধ করতে গেলে মানুষ ধরে ফেলবে। তাই তারা ‘বিপ্লব’, ‘ইনসাফ’ কিংবা ‘ওসমান হাদির রক্ত’-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা করার আগে তারা হাদির ছবি সামনে বাড়িয়ে দেয়, যেন কেউ তাদের দিকে আঙুল তুলতে না পারে। হাদির জানাজাকে কেন্দ্র করে যে জমায়েত হয়েছিল, তা এই মব সংস্কৃতির জন্য ছিল একটি উর্বর ভূমি।

সিন্ডিকেট সংস্কৃতির গ্রাস ও একাকীত্বের ট্র্যাজেডি

ওসমান হাদি কেন কোনো ‘ছাতার তলায়’ যাননি, তা আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে পরিষ্কার হয়। বর্তমান যুগে রাজনীতি বা ক্যারিয়ার যেকোনো জায়গায় টিকতে হলে কোনো না কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হতে হয়।

সিন্ডিকেটের সুবিধা: সিন্ডিকেটের ভেতরে থাকলে ভুল করলেও পার পাওয়া যায়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মেলে এবং শারীরিক সুরক্ষাও পাওয়া যায়।

একাকীত্বের শাস্তি: হাদি এই সিন্ডিকেট সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। আর আমাদের সমাজব্যবস্থা এতটাই নিষ্ঠুর যে, যে ব্যক্তি দলবদ্ধ না হয়ে একা চলতে চায়, সমাজ তাকে অবহেলা আর একাকীত্ব দিয়ে পিষে মারে। হাদি বেঁচে থাকতে যে চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছেন, তা কোনো স্বাভাবিক সমাজ তৈরি করতে পারে না। এটি ছিল একটি সৎ ছেলের ওপর সমাজের পরোক্ষ অত্যাচার।

ঘাতকদের "হিরো মেকিং" প্রসেস

রাজনীতিতে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যেখানে কোনো ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে মেরে ফেললে বেশি লাভ হয়। হাদির চারপাশের চেনা মানুষেরাই যে তাঁর খুনি হতে পারে, এই তত্ত্বটি ইতিহাসের অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাথে মিলে যায়।

শহীদ বানানোর তাড়না: কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বুঝতে পেরেছিল যে, হাদি বেঁচে থাকলে হয়তো তাদের সংগঠনের পদ পাবেন না বা তাদের কথা মতো চলবেন না। কিন্তু তাকে যদি একটা ‘শহাদতের তকমা’ দিয়ে দেওয়া যায়, তবে তাকে পুঁজি করে বছরের পর বছর রাজনীতি করা যাবে, মিছিল করা যাবে এবং আবেগ বিক্রি করে ফান্ড কালেকশন করা যাবে।

শোকের প্রথম সারিতে ঘাতক: এই কারণে যারা হাদির জন্য সবচেয়ে বেশি চিৎকার করছে, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা জরুরি। রাজনীতির এই অন্ধকার খেলাটি বুঝতে না পারলে ওসমান হাদির মতো আরও অনেক তরুণকে আগামীতে অকালে প্রাণ দিতে হবে।

ওসমান হাদির এই পুরো ঘটনাটি আমাদের দেখায় যে, একটি সমাজ হিসেবে আমরা কতটা ভণ্ড এবং সুবিধাবাদী। আমরা যতক্ষণ না জীবিত মানুষের গুণের কদর করতে শিখব, ততক্ষণ পর্যন্ত এই লাশের রাজনীতি বন্ধ হবে না।

জীবিত হাদিকে তো হারিয়েছি, মৃত হাদিকে কি রক্ষা করতে পারব?

ওসমান হাদি কিসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিজের তাজা প্রাণটি উৎসর্গ করলেন, আর আজ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা ও স্মৃতিকে ঢাল বানিয়ে সেই একই অপকর্মগুলো কারা করছে তা এখন গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

হাদি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি বৈষম্যহীন, শোষনমুক্ত ও প্রকৃত ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশের। তিনি চেয়েছিলেন প্রতিটি মানুষ যেন তার অধিকার পায়, সমাজ থেকে যেন চাটুকারিতা আর সুবিধাবাদের অবসান ঘটে।

অথচ তাঁর মৃত্যুর পর আমরা যা দেখছি, তা চরম অসহিষ্ণুতা, উগ্র মব কালচার এবং লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের আখের গোছানোর নোংরা ও কুৎসিত রাজনীতি।

আমরা যদি সত্যিই ওসমান হাদিকে ভালোবেসে থাকি, যদি তাঁর আত্মার প্রতি আমাদের ন্যূনতম শ্রদ্ধা থেকে থাকে, তবে আমাদের এই ভার্চুয়াল মায়াকান্না ও লাশের নোংরা রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। হাদিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা গোষ্ঠীর ফ্রেমের মধ্যে বন্দী করে তাঁর আদর্শকে ছোট করা যাবে না।

হাদির খাঁটি ও নির্লোভ চিন্তাকে নিজেদের জীবনে ও সমাজে বাঁচিয়ে রাখাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি। অন্যথায়, আমরা কেবল আরেকটি তাজা লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের চিরন্তন সুবিধাবাদ ও সামষ্টিক ভণ্ডামিকেই জয়ী করব, আর আড়াল থেকে হাসবে সেই ছদ্মবেশী ঘাতকেরা যারা হাদির জীবনের আলো কেড়ে নিয়েছে। আসুন, মৃত হাদির আদর্শকে অন্তত এই শকুনেদের হাত থেকে রক্ষা করি।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.