আমেরিকার বিরুদ্ধে গর্জন দিয়ে বিশ্বে একমাত্র শেখ হাসিনাই প্রাণে বেঁচে আছেন
আমেরিকার বিরুদ্ধে গর্জন দিয়ে বিশ্বে একমাত্র শেখ হাসিনাই প্রাণে বেঁচে আছেন। বিশ্ব রাজনীতির নেপথ্য খেলা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন একটি 'গণতান্ত্রিক' ও 'মানবাধিকার' রক্ষা রক্ষাকারী বিশ্বের কথা বলি, তার আড়ালে কি কোনো অদৃশ্য সুতো খেলা করে? ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, কোনো ক্ষুদ্র বা মাঝারি রাষ্ট্রের নেতা যখনই নিজের দেশের স্বার্থকে পরাশক্তির স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন, তখনই তাঁর ওপর নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। আমেরিকার মতো পরাশক্তির নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের ক্ষমতা এবং জীবন বাজি রাখার সাহস দেখিয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন বিশ্বনেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার শেখ হাসিনা পর্যন্ত এই যাত্রাপথে 'বিদ্রোহ' আর 'দমন' এর এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস লেখা আছে।

TruthBangla
Jan 6, 2026
আমেরিকার বিরুদ্ধে গর্জন দিয়ে বিশ্বে একমাত্র শেখ হাসিনাই প্রাণে বেঁচে আছেন। বিশ্ব রাজনীতির নেপথ্য খেলা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন একটি 'গণতান্ত্রিক' ও 'মানবাধিকার' রক্ষা রক্ষাকারী বিশ্বের কথা বলি, তার আড়ালে কি কোনো অদৃশ্য সুতো খেলা করে? ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, কোনো ক্ষুদ্র বা মাঝারি রাষ্ট্রের নেতা যখনই নিজের দেশের স্বার্থকে পরাশক্তির স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন, তখনই তাঁর ওপর নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। আমেরিকার মতো পরাশক্তির নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের ক্ষমতা এবং জীবন বাজি রাখার সাহস দেখিয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন বিশ্বনেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার শেখ হাসিনা পর্যন্ত এই যাত্রাপথে 'বিদ্রোহ' আর 'দমন' এর এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস লেখা আছে।
আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি - বন্ধু না কি স্বার্থের নিয়ন্ত্রক?
আমেরিকার বিরুদ্ধে অভিযোগটি অনেক পুরনো তারা যে দেশে প্রবেশ করে কিংবা যে দেশের শাসনের পরিবর্তন ঘটাতে চায়, শুরুতে সেখানে 'গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা' বা 'দুর্নীতি দমন'-এর সাইনবোর্ড ঝোলায়। লাতিন আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এবং এখন দক্ষিণ এশিয়া সবখানেই একটি সাধারণ প্যাটার্ন বা ছক দেখা যায়।
'লেবেলিং' বা তকমা দেওয়ার কৌশল
আমেরিকা যখন কোনো রাষ্ট্রনেতাকে অপছন্দ করে, তখন তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো নির্দিষ্ট কিছু তকমা ব্যবহার করে:
ফ্যাসিস্ট (Fascist): বিরোধী দল বা ভিন্নমত দমনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করা।
মাদক কারবারি (Narco-terrorist): নেতাদের চরিত্র হনন করার জন্য ড্রাগ কার্টেলের সাথে সম্পৃক্ততার মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ।
মানবাধিকার লঙ্ঘন: নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহার করা হয়।
বঙ্গবন্ধু এবং ১৯৭৫ - বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রথম মহাবলিদান
ইতিহাসের পাতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনটিকে অনেক সময় কেবল 'সামরিক অভ্যুত্থান' হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক চাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশ্বশক্তির 'চক্ষুশূল' হতে হয়েছিল এবং কেন তাঁর হত্যাকাণ্ড ছিল একটি পরিকল্পিত বৈশ্বিক প্রজেক্ট।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে প্রধান বাধা কেবল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছিল না, বরং পর্দার আড়ালে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন।
আমেরিকা কেন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল? এর উত্তর লুকিয়ে ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণে। পাকিস্তান তখন আমেরিকার জন্য চীন ও রাশিয়ার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিল। তাই একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম মানে ছিল আমেরিকার সেই আঞ্চলিক মিত্রের পরাজয়। এমনকি ডিসেম্বরের শেষ দিকে পাকিস্তানের হার নিশ্চিত জেনে আমেরিকা তাদের কুখ্যাত 'সপ্তম নৌবহর' (Task Force 74) পাঠিয়েছিল বঙ্গোপসাগরের দিকে, যা ছিল স্পষ্টত এক হুমকির বার্তা।
'তলাবিহীন ঝুড়ি' উপহাস
স্বাধীনতার পর হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে নিয়ে যে অবমাননাকর উক্তি করেছিলেন, তা আজও ইতিহাসের পাতায় কালো দাগ হয়ে আছে। তিনি বাংলাদেশকে "তলাবিহীন ঝুড়ি" (Bottomless Basket) বলে উপহাস করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এই দেশ টিকে থাকতে পারবে না এবং একদিন হয়তো আবার পাকিস্তানের সাথে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হবে।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর অসীম সাহস আর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে মাত্র সাড়ে তিন বছরে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করলেন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করলেন, তখন পশ্চিমা বিশ্বের সেই দম্ভ চূর্ণ হতে শুরু করল।
আমেরিকার তৈরি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কৃত্রিম সংকট
আমেরিকা ও তার মিত্ররা বঙ্গবন্ধুকে দুর্বল করতে যে অস্ত্রটি ব্যবহার করেছিল, তা হলো 'খাদ্য সাহায্য'। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে যখন বন্যার কারণে খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়, তখন আমেরিকা তাদের 'পিএল-৪৮০' আইনের অজুহাতে খাদ্যবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নেয়।
এর পেছনের কারণ ছিল অত্যন্ত রাজনৈতিক। বাংলাদেশ তখন কিউবার কাছে পাটের ব্যাগ রপ্তানি করেছিল। কিউবা ছিল আমেরিকার শত্রু দেশ, তাই কিউবার সাথে ব্যবসা করায় শাস্তি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের অন্ন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এই কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তাহীন করার এক নীল নকশা তৈরি করা হয়েছিল।
জোটনিরপেক্ষ নীতি - যে আদর্শ শেখ মুজিবের কাল হলো
বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।" তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের (আমেরিকা বা সোভিয়েত ইউনিয়ন) অনুগত রাখতে চাননি। তিনি বাংলাদেশকে একটি 'জোটনিরপেক্ষ' রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনচেতা অবস্থান এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে (ওআইসি সম্মেলন ১৯৭৪) হৃদ্যতা তৈরি করা আমেরিকার সিআইএ (CIA) এবং পাকিস্তানের আইএসআই (ISI)-এর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে না দিলে এই অঞ্চলে তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
১৫ আগস্ট পরিকল্পিত আমেরিকা-আইএসআই প্রজেক্ট
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে যা ঘটেছিল, তা কেবল কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের কাজ ছিল না। লরেন্স লিফশুলজের মতো আন্তর্জাতিক গবেষকরা বিভিন্ন প্রমাণে দেখিয়েছেন যে, এর পেছনে ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এক আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
সিআইএ-র যোগসূত্র: ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একটি বিশেষ উইংয়ের সাথে সেই সময় ষড়যন্ত্রকারীদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
মীরজাফরদের ভূমিকা: ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকা খন্দকার মোশতাকদের মতো স্বার্থান্বেষী মহলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগানো হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি সার্বভৌম, শোষণহীন সোনার বাংলা। আর ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল একটি মেরুদণ্ডহীন রাষ্ট্র। ১৫ আগস্টের সেই বুলেটের আঘাতে থমকে গিয়েছিল একটি জাতির উত্তরণ।
শেখ হাসিনা বনাম আমেরিকা - একটি পতনের নেপথ্য গল্প
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকাল যেমন উন্নয়ন ও অগ্রগতির সমার্থক, তেমনি শেষ কয়েক বছর ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের এক চরম অধ্যায়। বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার সাথে তাঁর প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে ঢাকাকে এক অনন্য আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। প্রশ্ন উঠেছে শেখ হাসিনা কি কেবল একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, নাকি তাঁর পতন ছিল কোনো সুগভীর 'রেজিম চেঞ্জ' (Regime Change) প্রজেক্টের ফল?
সেন্ট মার্টিন বিতর্ক - সার্বভৌমত্ব নাকি রাজনৈতিক কৌশল?
শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ দিকে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। একাধিক সংবাদ সম্মেলন এবং জনসভায় তিনি দাবি করেছিলেন, একটি বিশেষ দেশ (আমেরিকা) বাংলাদেশের এই প্রবাল দ্বীপটিতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে চায়।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, "আমি ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের মাটি বিক্রি করব না।" তাঁর এই বক্তব্য জনমনে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটালেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বারবার এই দাবি অস্বীকার করেছে। মার্কিন মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন যে, সেন্ট মার্টিন নিয়ে আমেরিকার কোনো আগ্রহ বা পরিকল্পনা নেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব আমেরিকার কাছে অপরিসীম।
ভূ-রাজনীতিতে চীন ও ভারতের সমীকরণ
আমেরিকার সাথে শেখ হাসিনার দূরত্বের অন্যতম কারণ ছিল চীনের সাথে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এ অংশগ্রহণ ওয়াশিংটনকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল ভারত। আমেরিকা যখন বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল, ভারত তখন শেখ হাসিনার স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিচ্ছিল। এই ত্রিভুজমুখী সম্পর্কের টানাপোড়েনে শেখ হাসিনা এক আপসহীন অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা নীতির চাপ
২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল সম্পর্কের প্রথম বড় ধাক্কা। এরপর ২০২৩ সালে ঘোষিত 'থ্রি-সি' (3C) ভিসা নীতি যা বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগের কথা বলা হয়েছিল তা সরাসরি সরকারের ওপর এক বিশাল মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। শেখ হাসিনা একে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন এবং প্রকাশ্যেই আমেরিকার কড়া সমালোচনা করেন।
২০২৪ এর পটপরিবর্তন - নীল নকশা নাকি গণঅভ্যুত্থান?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়। এই পরিবর্তনের পেছনে অনেকে সাদ্দাম হোসেন কিংবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পরিণতির ছায়া দেখতে পান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আমেরিকার বিরুদ্ধাচরণ করে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো নেতার ক্ষমতায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। শেখ হাসিনা নিজেই পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে আমেরিকার নাম না করে বলেছিলেন যে তারা সরকার পরিবর্তন করতে চায়।
যদিও এই পতন মূলত দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জনরোষ এবং ছাত্র আন্দোলনের ফসল, তবুও এর পেছনে কোনো বিদেশি পরাশক্তির 'ইন্ধন' ছিল? যদিও বর্তমান ইউনুস সরকার ও তাদের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামের পাকিস্তান ও আমেরিকা ঘেষা নীতি স্পষ্ট করে এটা দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল ছিল, যা ভারতের আধিপত্যবাদের পতনের নামে পাকিস্তান ও আমেরিকার আধিপত্যবাদের কাছে দেশকে সপে দেয়ার নামান্তর।
ভেনিজুয়েলার ট্র্যাজেডি - নিকোলাস মাদুরো ও মার্কিন আধিপত্য
লাতিন আমেরিকার একসময়ের সবচেয়ে ধনী দেশটি আজ এক গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। যে ভেনিজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ, সেই দেশের মানুষ আজ মুদ্রাস্ফীতি, অভাব আর দেশান্তরের মিছিলে শামিল। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক আলোচিত ও বিতর্কিত নাম নিকোলাস মাদুরো। আমেরিকার চোখে তিনি একজন 'স্বৈরাচারী মাদক সম্রাট', আর সমর্থকদের কাছে তিনি পশ্চিমাবিরোধী লড়াইয়ের এক অবিনাশী সৈনিক।
মার্কিন লক্ষ্যবস্তু যখন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে নিকোলাস মাদুরো সম্ভবত হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে বড় 'টার্গেট'। আমেরিকার বিচার বিভাগ মাদুরোকে কেবল একজন ‘অবৈধ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেই দেখে না, বরং তাঁকে সরাসরি 'নারকো-টেররিজম' বা মাদক সন্ত্রাসের সাথে অভিযুক্ত করেছে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মাদুরোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করে এবং তাঁর গতিবিধি ও গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি পদক্ষেপ ও আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা কূটনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল ও চরম অসম্মানজনক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থনৈতিক অবরোধ, তেলের রাজনীতি ও জনদুর্ভোগ
ভেনিজুয়েলার এই অর্থনৈতিক ধসের পেছনে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা যেমন দায়ী, তেমনি বড় ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। ভেনিজুয়েলার আয়ের প্রধান উৎস হলো তেল। আমেরিকা এই তেল খাতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
আমেরিকার যুক্তি হলো, তারা মাদুরো সরকারকে চাপে ফেলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যের অভাবে কয়েক মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সমালোচকদের মতে, গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে আদতে ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই আমেরিকার মূল লক্ষ্য।
সার্বভৌমত্ব বনাম বিশ্বরাজনীতি
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে যেভাবে 'মাদক সম্রাট' হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শিষ্টাচারের গুরুতর লঙ্ঘন বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। মাদুরো বৈধ নাকি অবৈধ, সেই ফয়সালা করার দায়িত্ব ভেনিজুয়েলার জনগণের। কিন্তু আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলো যখন বাইরের থেকে শাসক নির্ধারণ করে দিতে চায়, তখন তা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে যায়। মাদুরোকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করার অর্থ হলো একটি দেশের সার্বভৌমত্বকে তুচ্ছজ্ঞান করা।
ভেনিজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশেষ সামরিক অভিযান (অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ)-এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করা হয়। বর্তমানে মাদুরো নিউইয়র্কের একটি আদালতের হেফাজতে রয়েছেন, যেখানে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। মাদুরোর অনুপস্থিতিতে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী দেলসি রদ্রিগেজ ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, একটি নিরাপদ ও যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে। এছাড়া ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের ওপর মার্কিন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও ব্যক্ত করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং বর্তমান অবরোধের ফলে দেশটি চরম মানবিক সংকটে রয়েছে। ভেনিজুয়েলার প্রায় ২ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে এবং খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাঁচার তাগিদে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন।
ইমরান খান, ড. ইউনূস এবং আমেরিকার 'সফট পাওয়ার' কৌশল
আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে পরাশক্তিগুলো সর্বদা তৎপর। একসময় যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ দখল করা হতো, কিন্তু এখনকার যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। এখন চলে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক চক্রান্তের মাধ্যমে 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসন পরিবর্তন।
ইমরান খানের 'সাইফার' রহস্য
পাকিস্তানের রাজনীতির ইতিহাসে ইমরান খানের পতন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই পতনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তা বা 'সাইফার'।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ত্যাগের পর এই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম তদারকি করার জন্য পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি চেয়েছিল। কিন্তু ইমরান খান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলেছিলেন, "Absolutely Not"। এই সরাসরি প্রত্যাখ্যান ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে ইমরান খানের মস্কো সফর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে ক্ষুব্ধ করে। ডোনাল্ড লু-এর সাথে পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের সেই বহুল আলোচিত বৈঠক এবং সাইফার বার্তায় ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। ফলশ্রুতিতে, অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে তাঁর পতন ঘটে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন, যা অনেক বিশ্লেষক সাদ্দাম হোসেন বা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পরিণতির সাথে তুলনা করছেন যদিও প্রেক্ষাপট ও পদ্ধতি ছিল ভিন্ন।
ড. ইউনূস ও বাংলাদেশ - নতুন সমীকরণ নাকি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা?
বাংলাদেশে গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ড. ইউনূসের সাথে আমেরিকার ডেমোক্র্যাট নেতাদের, বিশেষ করে ক্লিনটন পরিবার এবং বারাক ওবামার গভীর সখ্যতা সর্বজনবিদিত। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন ড. ইউনূস দায়িত্ব নিলেন, তখন অনেকেই এটিকে আমেরিকার একটি মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে দেখছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার দাবি করেছেন যে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি গড়ার সুযোগ না দেওয়ায় তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।
আমেরিকার বর্তমান বৈশ্বিক কৌশলের প্রধান লক্ষ্য হলো চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা। একে বলা হয় 'Indo-Pacific Strategy'। এই কৌশলে বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট। ড. ইউনূসের মতো একজন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং আমেরিকার 'ঘনিষ্ঠ' ব্যক্তিত্বকে নেতৃত্বে দেখে অনেকে মনে করছেন, আমেরিকা এখন খুব সহজেই বাংলাদেশে তাদের কৌশলগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
পুতুল সরকার নাকি জাতীয় মুক্তি?
সমালোচকদের মতে, ড. ইউনূস হতে পারেন আমেরিকার একজন 'পাপেট' বা হাতের পুতুল। এই ধারণার মূল ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হঠাৎ করে বাংলাদেশের প্রতি নমনীয়তা এবং বিশাল অংকের ঋণের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে, সমর্থকদের মতে ড. ইউনূস বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে এবং দেশের ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করতে এসেছেন।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, আধুনিক কূটনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই বিনামূল্যে কাউকে সাহায্য করে না। আমেরিকার সাহায্য বা সমর্থনের আড়ালে সর্বদা তাদের জাতীয় ও সামরিক স্বার্থ লুক্কায়িত থাকে।
আমেরিকাকে থামানোর কি কেউ নেই?
আজকের পৃথিবীতে এককেন্দ্রিক ক্ষমতার দাপট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের সনদ যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
জাতিসংঘের অসারতা: আমেরিকা ভেটো পাওয়ার ব্যবহার করে যে কোনো অন্যায়কে বৈধতা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: আইসিসি (ICC) বা আইসিজে (ICJ) কেবল দুর্বল দেশের বিচার করতে পারে, পরাশক্তির গায়ে হাত দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।
চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা: যদিও চীন ও রাশিয়া আমেরিকার বিকল্প হিসেবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে আমেরিকার একচেটিয়া প্রভাব এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ কী?
আমেরিকার এই 'নীতিহীন' বিশ্বরাজনীতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক বিরাট হুমকি। বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে যে, মাথা নত না করলে পরাশক্তিরা সেই মাথাটিই কেটে ফেলার চেষ্টা করে। তবে কি আমরা এক নব্য-উপনিবেশবাদী যুগে প্রবেশ করছি?
একটি দেশের জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তবে কোনো বহিঃশক্তিই স্থায়ীভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখতে পারে না। কিন্তু যদি দেশের ভেতরের মানুষেরাই বিজাতীয় স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তবে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পৃথিবীকে সত্য বলার এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে, নতুবা একের পর এক সার্বভৌম রাষ্ট্র কেবল দাবার ঘুঁটি হয়েই থেকে যাবে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















