>

>

সেন্টমার্টিন - বঙ্গোপসাগরের নাভি নাকি বিশ্বশক্তির দাবার ঘুঁটি?

সেন্টমার্টিন - বঙ্গোপসাগরের নাভি নাকি বিশ্বশক্তির দাবার ঘুঁটি?

নীল জলরাশি, নারিকেল বীথি আর প্রবাল প্রাচীরে ঘেরা বাংলাদেশের একমাত্র সামুদ্রিক প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সাধারণ পর্যটকদের কাছে এটি পরম শান্তির এক স্বপ্নের স্বর্গভূমি হলেও বিশ্বশক্তির সামরিক পরিকল্পনাবিদ ও পেন্টাগনের স্ট্র্যাটেজিস্টদের কাছে এটি এক ভূ-রাজনৈতিক 'সোনার খনি'। সাম্প্রতিক সময়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপের মালিকানা, লিজ এবং এর সামরিক ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুমুখী বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

TruthBangla

সেন্টমার্টিন - বঙ্গোপসাগরের নাভি নাকি বিশ্বশক্তির দাবার ঘুঁটি?

নীল জলরাশি, নারিকেল বীথি আর প্রবাল প্রাচীরে ঘেরা বাংলাদেশের একমাত্র সামুদ্রিক প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সাধারণ পর্যটকদের কাছে এটি পরম শান্তির এক স্বপ্নের স্বর্গভূমি হলেও বিশ্বশক্তির সামরিক পরিকল্পনাবিদ ও পেন্টাগনের স্ট্র্যাটেজিস্টদের কাছে এটি এক ভূ-রাজনৈতিক 'সোনার খনি'। সাম্প্রতিক সময়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপের মালিকানা, লিজ এবং এর সামরিক ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুমুখী বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, সেন্টমার্টিন অত্যন্ত ছোট এবং এর চারপাশের মাটি ও ভূ-প্রকৃতি নরম হওয়ায় এখানে আধুনিক সামরিক ঘাঁটি বা ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করা অবাস্তব। আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। হিন্দি সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপের মতো "জিসকে হাত মে হাতিয়ার, ও হে সেকান্দার।" বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিরা যখন ভূ-কৌশলগত সুবিধার জন্য কোনো অঞ্চলের ওপর নজর দেয়, তখন সেখানকার প্রাকৃতিক মানচিত্র ও ইতিহাস বদলে যাওয়ার অজস্র উদাহরণ রয়েছে। আজ দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উত্তপ্ত সমীকরণে সেন্টমার্টিনের গুরুত্বকে অনুধাবন করা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

নরম মাটি বনাম আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যা: পরাশক্তির কাছে অসম্ভব বলতে কিছু নেই

বর্তমান প্রশাসনের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান কিংবা পরিবেশবাদীদের একটি বড় অংশের মতে, সেন্টমার্টিনের ভূ-প্রকৃতি অত্যন্ত নাজুক, এর বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) প্রবাল-নির্ভর এবং আয়তন অত্যন্ত ছোট হওয়ায় এখানে স্থায়ী কোনো সামরিক অবকাঠামো বা নৌঘাঁটি নির্মাণ করা বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগতভাবে অবাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আধুনিক সামরিক প্রকৌশল ও বিজ্ঞান কি কেবল প্রাকৃতিক গঠনের সীমাবদ্ধতার ওপর থমকে দাঁড়িয়ে থাকে?

বর্তমান পৃথিবী এমন এক প্রযুক্তিগত উচ্চতায় পৌঁছেছে যেখানে সমুদ্রের মাঝখানে সম্পূর্ণ কৃত্রিম দ্বীপ বা মেগা-স্ট্রাকচার তৈরি করা এখন অত্যন্ত সাধারণ বা ‘পান্তা ভাত’ তুল্য ব্যাপার। বিশ্বের বুকে এর কয়েকটি জ্বলন্ত উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

দুবাইয়ের পাম জুমেইরা (Palm Jumeirah): পারস্য উপসাগরের বুকে সম্পূর্ণ মরুভূমির বালু আর সমুদ্রের পানি ড্রেজিং করে তৈরি এই কৃত্রিম দ্বীপটি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ও ভারী স্থাপত্যের উদাহরণ।

জাপানের কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Kansai Airport): রিখটার স্কেলে তীব্র ভূমিকম্প এবং টাইফুনের আঘাত সহ্য করতে সক্ষম এই বিমানবন্দরটি সম্পূর্ণ সমুদ্রের ওপর কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে সফলভাবে পরিচালনা করছে জাপান।

নেদারল্যান্ডসের ফ্লেভোপোল্ডার (Flevopolder): সমুদ্রের গ্রাস থেকে ড্রেজিং ও পোল্ডার প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমি পুনরুদ্ধার করে তৈরি করা হয়েছে বিশাল জনপদ ও শিল্পাঞ্চল।

আমেরিকা, চীন বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর কাছে সেন্টমার্টিনের স্থায়ী ৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তন কোনো ভৌগোলিক বাধাই নয়। তদুপরি, জোয়ার-ভাটার তারতম্যে ভাটার সময় এই দ্বীপের আয়তন চারপাশের রিফসহ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ বর্গ কিলোমিটারে। যেখানে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী সাবমেরিন বা নেভাল লজিস্টিক হাবের জন্য মাত্র ১.৩ বর্গ কিলোমিটার (বা প্রায় ৬৫ একর) জায়গাই যথেষ্ট, সেখানে সেন্টমার্টিনের ভৌগোলিক আয়তন পরাশক্তিদের কাছে এক বিশাল চারণভূমি।

দক্ষিণ চীন সাগরের স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জ

সেন্টমার্টিন নিয়ে যাঁরা "ভৌগোলিকভাবে অসম্ভব" বলে রায় দিচ্ছেন, তাঁদের দক্ষিণ চীন সাগরের (South China Sea) দিকে তাকানো উচিত। চীন সেখানে মিসচিফ রিফ (Mischief Reef), গাভেন রিফস (Gaven Reefs) এবং সুবি রিফ (Subi Reef)-এর মতো ছোট ছোট সামুদ্রিক ডুবো পাহাড় বা প্রবাল রিফগুলোকে (যা জোয়ারের সময় পানির নিচে তলিয়ে যেত) স্রেফ বালি ও পলি দিয়ে ভরাট করে বিশাল কৃত্রিম দ্বীপে রূপান্তর করেছে।

আজ সেইসব কৃত্রিম দ্বীপে চীনের বিমানবাহী রণতরী ভেড়ার জেটি, ফাইটার জেট ওঠানামার রানার এবং শক্তিশালী মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম বা নৌঘাঁটি রয়েছে। এমনকি আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির কল্যাণে ৭৮,০০০ টন পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধাক্কা বা প্রলয়ঙ্কারী সামুদ্রিক ঝড় সহ্য করতে পারে এমন ‘ভাসমান দ্বীপ’ (Floating Islands) তৈরির প্রযুক্তিও এখন পরাশক্তিদের হাতের নাগালে।

সেন্টমার্টিন তো প্রবাল দ্বীপ। এর চারপাশে প্রবাল ও শক্ত চুনাপাথরের (Limestone) ভিত্তি থাকায় এর চারপাশ কৃত্রিমভাবে সম্প্রসারণ করা ভূ-তাত্ত্বিকভাবে অনেক সহজ। বালি ও পলি ড্রেজিং করে চারপাশে 'ব্রেকওয়াটার' (Breakwater) বা কৃত্রিম সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করলে সেন্টমার্টিন অনায়াসেই হয়ে উঠতে পারে বঙ্গোপসাগরের বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য সামরিক দুর্গ।

পরাশক্তিদের কাছে কেন সেন্টমার্টিন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সেন্টমার্টিনের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের এমন এক কৌশলগত ও ভৌগোলিক বিন্দুতে, যেখান থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক ট্রাফিক ও আকাশপথকে খুব সহজেই পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর প্রধান দুটি ভূ-রাজনৈতিক কারণ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

চীনের 'মালাক্কা ট্র্যাপ' (Malacca Trap) ও বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ

চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের সিংহভাগ পরিবাহিত হয় সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধের সময় আমেরিকা বা তার মিত্ররা মালাক্কা প্রণালী ব্লক করে দিলে চীন অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে এটাই চীনের ‘মালাক্কা ট্র্যাপ’। এই ট্র্যাপ থেকে বাঁচতে চীন বিকল্প রুট হিসেবে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে নিজ ভূখণ্ডে জ্বালানি নিচ্ছে।

সেন্টমার্টিন থেকে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন বন্দরের দূরত্ব মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার। ফলে, সেন্টমার্টিনে যদি কোনো শত্রুভাবাপন্ন শক্তির রাডার বা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি থাকে, তবে সেখান থেকে খুব সহজেই চীনের এই বিকল্প সাপ্লাই চেইন ও এনার্জি করিডোর সম্পূর্ণ ব্লক করে দেওয়া সম্ভব।

মিয়ানমার ও ভারত কার্ড

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উপকূল থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের দূরত্ব মাত্র ৫ মাইল। রাখাইনের গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গা সংকট এবং সেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখার জন্য সেন্টমার্টিন একটি প্রাকৃতিক অবজারভেটরি টাওয়ার। অন্যদিকে, ভারতের একমাত্র পরমাণু সাবমেরিন ও নৌবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি সংবলিত ‘আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ’ বঙ্গোপসাগরের অপর প্রান্তে অবস্থিত। সেন্টমার্টিন থেকে ভারতের এই সংবেদনশীল সামরিক অঞ্চলের ওপর ইলেকট্রনিক নজরদারি চালানো অত্যন্ত সহজ। আমেরিকা বা অন্য কোনো পরাশক্তি যখন কোথাও ঘাঁটি করতে চায়, তারা কেবল জমি খোঁজে না; তারা খোঁজে এমন এক কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব (Strategic Dominance), যা দিয়ে এক ঢিলে একাধিক প্রতিপক্ষকে হাতের মুঠোয় রাখা যায়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সিআইএ (CIA) ও ক্ষমতার রাজনীতি

২০২৩ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক চাঞ্চল্যকর সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, "সেন্টমার্টিন দ্বীপ বিদেশীদের কাছে ইজারা দিলে বা বিক্রি করলে আমি অনায়াসে ক্ষমতায় থাকতে পারতাম।" তাঁর এই বক্তব্যকে অনেকে সে সময় কেবলই একটি রাজনৈতিক স্ট্যান্ট বা ব্লেইম-গেম হিসেবে দেখলেও, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এর পেছনে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী সত্যতার সূত্র মেলে।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পেছনে যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত কাজ করেছিল, তার অন্যতম নেপথ্য কারণ ছিল বঙ্গোপসাগরে কোনো বিদেশী পরাশক্তিকে ঘাঁটি বা সুবিধা করতে না দেওয়া। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র ডিক্লাসিফাইড হওয়া অসংখ্য নথিতে সেন্টমার্টিন ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে কয়েক দশক ধরে তৈরি করা শত শত গোপন রিপোর্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে আজকের নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ (ইউএসএ বনাম চীন) পর্যন্ত আমেরিকা এই অঞ্চলের ওপর গভীর নজর রাখছে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সাম্প্রতিক সময়ে সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত হঠাৎ সীমিত করা বা সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে সাধারণ মানুষ কোনো বড় আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মহড়া বা নিরাপত্তার গোপন ছক রয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠছে।

আধুনিক যুদ্ধকৌশল: রাডার ও ইলেকট্রনিক নজরদারির কেন্দ্রবিন্দু

আজকের একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুদ্ধকৌশলে সামরিক ঘাঁটি মানেই কেবল হাজার হাজার পদাতিক সৈন্যের সমাবেশ, যুদ্ধজাহাজ বা কামানের গর্জন নয়। বর্তমান যুগে তথ্য ও নজরদারি (Surveillance & Electronic Intelligence) হলো যুদ্ধের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম হাতিয়ার। সেন্টমার্টিনকে একটি পূর্ণাঙ্গ নৌঘাঁটি না বানিয়েও কেবল একটি "ইলেকট্রনিক লিসেনিং পোস্ট" (Electronic Listening Post) হিসেবে ব্যবহার করেই পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব।

উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রাডার সিস্টেম: ৩০০০ থেকে ৫০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশ ও সমুদ্রসীমা নিখুঁতভাবে স্ক্যান করার জন্য সেন্টমার্টিনে মাত্র একটি উঁচু টাওয়ার এবং শক্তিশালী ‘অ্যাক্টিভ ফেজড অ্যারে রাডার’ (APAR) সিস্টেমই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে ভারত, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিমান ওঠানামাও ট্র্যাক করা যাবে।

সমুদ্রের তলদেশের সোনার (Sonar) নেটওয়ার্ক: বঙ্গোপসাগরের তলদেশে শত্রু সাবমেরিনের চলাচল ট্র্যাক করতে সেন্টমার্টিনের ভৌগোলিক অবস্থান অদ্বিতীয়। এখান থেকে সাগরের হাইড্রোফোন নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর সংযোগ: সেন্টমার্টিন থেকে বাংলাদেশের একমাত্র গভীর সমুদ্র বন্দর মাতারবাড়ীর দূরত্ব মাত্র ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। যেকোনো পরাশক্তি মাতারবাড়ীর গভীর ড্রাফটকে তাদের বড় বড় যুদ্ধজাহাজ বা বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier) ভেড়ানোর লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে, আর সেন্টমার্টিন দ্বীপে রাডার টাওয়ার বসিয়ে সেইসব যুদ্ধজাহাজের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম পরিচালনা করবে।

আমেরিকা ও ডিয়েগো গার্সিয়া মডেল বনাম সেন্টমার্টিন

ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে ‘ডিয়েগো গার্সিয়া’ (Diego Garcia) নামক একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তাহলে তাদের কেন আবার সেন্টমার্টিনের মতো ছোট দ্বীপের প্রয়োজন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সামরিক ব্যয় ও রেসপন্স টাইমের (Response Time) মধ্যে।

ডিয়েগো গার্সিয়া থেকে বঙ্গোপসাগর তথা বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনের আকাশপথের দূরত্ব প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ কিলোমিটার। ডিয়েগো গার্সিয়া থেকে কোনো সংকটের সময় আমেরিকার বি-২ স্পিরিট (B-2 Spirit) বোমারু বিমান বা যুদ্ধবিমান উড়িয়ে এনে এই অঞ্চলে অপারেশন চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। কিন্তু সেন্টমার্টিনে যদি আমেরিকার একটি ছোট ‘ফরওয়ার্ড লজিস্টিক সাইট’ (Forward Logistic Site) বা রিফুয়েলিং স্টেশন থাকে, তবে তারা সরাসরি চীন ও ভারতকে তাদের হাতের নাগালে পাবে। এটি মূলত দূরপাল্লার শত শত পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী এক মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত অস্ত্র (Strategic Weapon)।

বঙ্গোপসাগরের সামরিকীকরণ

নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ ছকের মাধ্যমে সেন্টমার্টিনকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিদের কৌশলগত পরিকল্পনা, সুবিধা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ঝুঁকির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হলো:

কৌশলগত দিক

পরাশক্তিদের মূল উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা

প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা ও মডেল

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রভাব ও ঝুঁকি

নজরদারি ও রাডার স্টেশন

ভারত, মিয়ানমার ও দক্ষিণ চীন সাগরের ৩০০০-৫০০০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে ইলেকট্রনিক নজরদারি।

সেন্টমার্টিনের কেন্দ্রে উঁচু টাওয়ার ও শক্তিশালী রাডার এবং সোনার (Sonar) সিস্টেম স্থাপন।

দেশের আকাশ ও সমুদ্রসীমার ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও গোপনীয়তা হারানো।

চীনের এনার্জি করিডোর ব্লক

মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ ও ইয়াঙ্গুন বন্দরে চীনের জ্বালানি পাইপলাইন ও বাণিজ্য পথকে ‘জিম্মি’ করা।

ব্রেকওয়াটার প্রতিরক্ষা প্রাচীর তৈরি করে সাবমেরিন ও দ্রুতগামী গানবোটের লজিস্টিক হাব নির্মাণ।

বাংলাদেশ অনিচ্ছাকৃতভাবে চীন-মার্কিন সামরিক সংঘাতের প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হবে।

আন্দামান ও নিকোবর মনিটরিং

ভারতের একমাত্র ট্রাই-সার্ভিস সামরিক কমান্ডের (আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ) ওপর সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি।

দ্বীপের চারপাশের প্রবাল চুনাপাথরের ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সম্প্রসারণ (চীনের স্পার্টলি মডেল)।

ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতি এবং সীমান্তে স্থায়ী সামরিক উত্তেজনা।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার

মাতারবাড়ীর গভীর ড্রাফটে মার্কিন বা মিত্র বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ নোঙর করা এবং সেন্টমার্টিন থেকে তা গাইড করা।

'প্লাম ফ্রন্ডস' ও স্যান্ড ড্রেজিং পদ্ধতিতে সেন্টমার্টিনকে মাতারবাড়ীর ‘কমান্ড সেন্টার’ বানানো।

দেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক করিডোরগুলো বিদেশী শক্তির সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া।

কৃত্রিম দ্বীপ ও আগামীর বাংলাদেশ

পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব ভৌগোলিকভাবে খুবই কম। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব মাত্র ১৬.১ কিলোমিটার। এই পুরো অঞ্চল এবং সংলগ্ন নাফ নদীর মোহনাকে যদি কোনো আন্তর্জাতিক শক্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তবে তারা পরোক্ষভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথকে নিজেদের কবজায় নিতে পারবে।

আধুনিক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁরা জানেন যে 'প্লাম ফ্রন্ডস' (Plum Fronds) বা ড্রেজিং পদ্ধতিতে বালি ও পলি ভরাট করে সমুদ্রের মাঝখানে টেকসই ও ভারী স্থাপনা তৈরি করা এখন কোনো রূপকথা নয়। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও সিন্ধু নদীর মোহনায় এবং করাচি উপকূলে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরির বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। অর্থাৎ, সামগ্রিক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য ও মোড়লত্ব বজায় রাখতে আমেরিকা বা চীন এখন সমুদ্রবেষ্টিত প্রতিটি কৌশলগত বিন্দুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া।

‘কোয়াড’ (QUAD) এবং মার্কিন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (IPS)

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমেরিকার সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হলো এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান। চীনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে কোয়াড (QUAD) জোট।

আইপিএস-এর কৌশলগত নোঙর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’র মূল লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরে এমন একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা, যেখান থেকে মালাক্কা প্রণালী এবং ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক করিডোরকে সার্বক্ষণিক মনিটর করা যায়। সেন্টমার্টিন এই আইপিএস-এর জন্য একটি পারফেক্ট ‘কৌশলগত নোঙর’ (Strategic Anchor)।

লজিস্টিকস শেয়ারিং চুক্তি (ACSA): আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাথে 'অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট' (ACSA) স্বাক্ষর করার জন্য কূটনৈতিক চাপ দিয়ে আসছে। এই চুক্তিটি হলে মার্কিন সামরিক বাহিনী জ্বালানি নেওয়া, মেরামত বা জরুরি প্রয়োজনে বাংলাদেশের বন্দর ও উপকূলীয় সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেন্টমার্টিন ও মাতারবাড়ী সংলগ্ন অঞ্চল।

মিয়ানমারের ‘কিয়াউকপিউ’ গভীর সমুদ্র বন্দর ও চীনা কাউন্টার

চীনও কিন্তু বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলে হাত গুটিয়ে বসে নেই। সেন্টমার্টিনের ঠিক বিপরীতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চীন তৈরি করেছে কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্র বন্দর (Kyaukphyu Deep Sea Port) এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল।

চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি: এই বন্দরটি মূলত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর অংশ। এখান থেকে চীন সরাসরি কুনমিং পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন টেনেছে।

কাউন্টার-সার্ভেইল্যান্স: কিয়াউকপিউ বন্দরে চীনা নৌবাহিনীর সাবমেরিন এবং যুদ্ধজাহাজের নিয়মিত আনাগোনা রয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপটি মিয়ানমারের এই চীনা ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েক নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত। ফলে, সেন্টমার্টিনে যদি মার্কিন বা পশ্চিমা কোনো রাডার বা নজরদারি পোস্ট বসে, তবে তা সরাসরি চীনের এই বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের কার্যকারিতাকে ধ্বংস করে দেবে। এই কারণেই চীন যেকোনো মূল্যে সেন্টমার্টিনে মার্কিন প্রভাব ঠেকাতে ব্যাকস্টেজে কাজ করছে।

‘গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার’ (Grey Zone Warfare) ও নাফ নদীর সীমান্ত সংকট

সেন্টমার্টিনকে সরাসরি সামরিক ঘাঁটি না বানিয়েও পরাশক্তিরা সেখানে ‘গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার’ বা ছায়া যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে।

রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মি কার্ড: মিয়ানমারের রাখাইনে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র সাথে সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ সীমান্তের ভূ-রাজনীতি গভীরভাবে জড়িত। সেন্টমার্টিনের চারপাশের জলসীমায় মিয়ানমার নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের অনুপ্রবেশ এবং সেন্টমার্টিনগামী ট্রলারে গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা: এগুলো মূলত বাংলাদেশের সামরিক প্রস্তুতি এবং মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানকে পরীক্ষা করার (To test the waters) একটি আন্তর্জাতিক ছক। সেন্টমার্টিনকে অস্থিতিশীল বা অনিরাপদ প্রমাণ করতে পারলে, আন্তর্জাতিক শান্তি বাহিনী বা কোনো বিদেশী শক্তি সেখানে ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার’ অজুহাতে নাক গলানোর আইনি সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।

মাতারবাড়ী-সেন্টমার্টিন টুইন-হাব (Twin-Hub) মডেল

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে কোনো একক দ্বীপকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করা হয় না। সেন্টমার্টিনকে নিয়ে পরাশক্তিদের আসল পরিকল্পনা হলো একটি টুইন-হাব বা যৌথ কেন্দ্র মডেল।

মাতারবাড়ীর গভীরতা ও সেন্টমার্টিনের উচ্চতা: মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরটি তৈরি হচ্ছে ভারী বাণিজ্যিক ও লজিস্টিকস জাহাজের জন্য, যার ড্রাফট বা গভীরতা প্রায় ১৬-১৮ মিটার। কিন্তু মাতারবাড়ী কোনো দ্বীপাঞ্চল নয়, এটি মূল ভূখণ্ডের অংশ। তাই এর প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজন একটি দূরবর্তী নজরদারি কেন্দ্র। সেন্টমার্টিন দ্বীপটি মাতারবাড়ীর ঠিক প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হওয়ায়, একে একটি ‘ফরওয়ার্ড গার্ড পোস্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে মাতারবাড়ীতে আসা সমস্ত যুদ্ধজাহাজের নিরাপত্তা ও গাইডেন্স নিশ্চিত করা সম্ভব।

ভারতের ‘নেকলেস অব ডায়মন্ডস’ (Necklace of Diamonds) বনাম চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’

বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের মধ্যে যে ‘সমুদ্রের লড়াই’ চলছে, তাতে সেন্টমার্টিন এক চরম ট্রাম্প কার্ড।

ভারতের ভূ-কৌশলগত উদ্বেগ: চীন যখন মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা (হাম্বানটোটা) এবং পাকিস্তানে (গওয়াদার) বন্দর তৈরি করে ভারতকে ঘিরে ফেলার ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ (String of Pearls) নীতি গ্রহণ করেছে, ভারত তখন তার বিপরীতে ওমান, ইন্দোনেশিয়া এবং মঙ্গোলিয়াকে সাথে নিয়ে ‘নেকলেস অব ডায়মন্ডস’ কৌশল সাজিয়েছে।

বাফার জোন (Buffer Zone): এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের ঠিক মাঝখানে বাংলাদেশ অবস্থিত। ভারত কখনোই চাইবে না তার ঘরের ঠিক পাশে সেন্টমার্টিন দ্বীপে মার্কিন বা চীনা সামরিক উপস্থিতি ঘটুক। কারণ, এতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ (চিকেনস নেক) এবং আন্দামান নিকোবরের নিরাপত্তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। তাই সেন্টমার্টিনকে সম্পূর্ণ সামরিকীকরণমুক্ত রাখা ভারতের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।

সচেতনতা নাকি আনুগত্যের সংকট?

সেন্টমার্টিনের মাটি নরম নাকি শক্ত, এর আয়তন ছোট নাকি বড় ২০২৬ সালের আধুনিক প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে সেই বিতর্কের চেয়ে বড় এবং নির্মম সত্য হলো এর ‘ভৌগোলিক অবস্থান’ (Geographical Location)। যাঁরা সাধারণ মানুষকে আজ ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চান যে "সেন্টমার্টিনে সামরিক ঘাঁটি করা প্রাকৃতিকভাবেই অসম্ভব", তাঁরা হয়তো আধুনিক সামরিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে কোনো জ্ঞান রাখেন না, অথবা তাঁরা জেনেশুনে কোনো বিদেশী শক্তির গোপন এজেন্ডা ও প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করছেন।

পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র বা আধুনিক ভূ-রাজনীতি সচেতন যে কেউ আন্তর্জাতিক মানচিত্রের দিকে তাকালেই বুঝবেন, সেন্টমার্টিন কেবল বাংলাদেশের একটি পর্যটন দ্বীপ নয়; এটি মূলত সমগ্র বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বারের চাবিকাঠি।

আমরা বাংলাদেশে পর্যটন চাই, আমাদের দ্বীপের নীল জলরাশি ও পরিবেশ রক্ষা করতে চাই, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়। সেন্টমার্টিন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিটি পদক্ষেপে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, বিশ্ব ইতিহাসের নির্মম সত্য এই যে পরাশক্তিরা যেখানেই বন্ধুত্বের বা সহযোগিতার নামে পা রাখে, সেখানে শেষ পর্যন্ত ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় সার্বভৌমত্ব চিরতরে হুমকির মুখে পড়ে। সেন্টমার্টিন রক্ষা করার অর্থই হলো স্বাধীন বাংলাদেশকে রক্ষা করা।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.