সেন্টমার্টিন - বঙ্গোপসাগরের নাভি নাকি বিশ্বশক্তির দাবার ঘুঁটি?
শান্ত সমুদ্রের নিচে অশান্ত কূটনীতি নীল জলরাশি আর প্রবাল প্রাচীরে ঘেরা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটকদের কাছে এটি স্বপ্নের স্বর্গভূমি হলেও বিশ্বশক্তির সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কাছে এটি এক স্ট্র্যাটেজিক 'সোনার খনি'। সাম্প্রতিক সময়ে সেন্টমার্টিন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন এটি ছোট এবং নরম মাটির দ্বীপ বলে এখানে সামরিক ঘাঁটি করা অসম্ভব, আবার কেউ বলছেন আধুনিক প্রযুক্তির যুগে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।

TruthBangla
Jan 8, 2026
শান্ত সমুদ্রের নিচে অশান্ত কূটনীতি নীল জলরাশি আর প্রবাল প্রাচীরে ঘেরা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটকদের কাছে এটি স্বপ্নের স্বর্গভূমি হলেও বিশ্বশক্তির সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কাছে এটি এক স্ট্র্যাটেজিক 'সোনার খনি'। সাম্প্রতিক সময়ে সেন্টমার্টিন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন এটি ছোট এবং নরম মাটির দ্বীপ বলে এখানে সামরিক ঘাঁটি করা অসম্ভব, আবার কেউ বলছেন আধুনিক প্রযুক্তির যুগে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। হিন্দি সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপের মতো "জিসকে হাত মে হাতিয়ার, ও হে সেকান্দার।" বিশ্ব রাজনীতির মোড়লরা যখন কোথাও নজর দেয়, তখন সেই অঞ্চলের মানচিত্র বদলে যাওয়ার ইতিহাস নতুন কিছু নয়।
নরম মাটি বনাম আধুনিক প্রযুক্তি
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বা বর্তমান প্রশাসনের অনেকের মতে, সেন্টমার্টিনের ভূ-প্রকৃতি অত্যন্ত নাজুক এবং এর আয়তন ছোট হওয়ায় এখানে সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ অবাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আধুনিক বিজ্ঞান কি কেবল প্রাকৃতিক গঠনের ওপর নির্ভর করে?
বর্তমানে পৃথিবী এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যেখানে সমুদ্রের মাঝখানে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করা এখন 'পান্তা ভাত'।
দুবাইয়ের পাম জুমেইরা: মরুভূমির বালু আর সমুদ্রের পানি দিয়ে তৈরি এই কৃত্রিম দ্বীপটি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থাপত্য।
জাপানের কানসাই বিমানবন্দর: সম্পূর্ণ সমুদ্রের ওপর কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে এই বিমানবন্দর পরিচালনা করছে জাপান।
নেদারল্যান্ডসের ফ্লেভোপোল্ডার: সমুদ্র থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার করে তৈরি করা হয়েছে বিশাল জনপদ।
আমেরিকা বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর কাছে সেন্টমার্টিনের ৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তন কোনো বাধাই নয়। ভাটার সময় এই দ্বীপের আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ বর্গ কিলোমিটারে। যেখানে একটি আধুনিক সাবমেরিন ঘাঁটির জন্য মাত্র ১.৩ বর্গ কিলোমিটার বা ৬৫ একর জায়গাই যথেষ্ট, সেখানে সেন্টমার্টিন তাদের কাছে এক বিশাল চারণভূমি।
চীনের স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জ - একটি জ্বলন্ত উদাহরণ
সেন্টমার্টিন নিয়ে যারা অসম্ভব বলে চিৎকার করছেন, তাদের দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে তাকানো উচিত। চীন সেখানে মিসচিফ রিফ, গাভেন রিফস এবং সুবি রিফ-এর মতো ছোট ছোট ডুবো পাহাড় বা রিফগুলোকে বালি দিয়ে ভরাট করে কৃত্রিম দ্বীপে রূপান্তর করেছে।
সেখানে আজ চীনের নৌ ও বিমান ঘাঁটি রয়েছে। এমনকি ৭৮,০০০ টন পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধাক্কা সহ্য করতে পারে এমন ভাসমান দ্বীপ তৈরির প্রযুক্তিও এখন হাতের নাগালে।
সেন্টমার্টিন তো প্রবাল দ্বীপ। এর চারপাশে প্রবাল ও চুনাপাথর থাকায় এটি কৃত্রিমভাবে সম্প্রসারণ করা অনেক সহজ। বালি ও পলি ড্রেজিং করে 'ব্রেকওয়াটার' বা প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করলে সেন্টমার্টিন হয়ে উঠতে পারে বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক দুর্গ।
কেন সেন্টমার্টিন এত কাঙ্ক্ষিত?
সেন্টমার্টিনের অবস্থান এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়াকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ক) চীনের 'মালাক্কা ট্র্যাপ' ও বঙ্গোপসাগর
চীনের প্রায় ৮০ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয় এই সমুদ্রপথ দিয়ে। চীন তার জ্বালানি ও মালামাল আমদানির জন্য মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন বন্দর ব্যবহার করে। সেন্টমার্টিন থেকে ইয়াঙ্গুন বন্দরের দূরত্ব মাত্র ২৫০-৩০০ কিলোমিটার। এখান থেকে খুব সহজেই চীনের সাপ্লাই চেইন ব্লক করে দেওয়া সম্ভব।
খ) মিয়ানমার ও ভারত কার্ড
মিয়ানমার উপকূল থেকে সেন্টমার্টিন মাত্র ৫ মাইল দূরে। অন্যদিকে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ওপর নজরদারি করার জন্য সেন্টমার্টিন এক চমৎকার অবজারভেটরি টাওয়ার। আমেরিকা যেখানে যেতে চায়, সেখানে যাওয়ার জন্য তারা কেবল ভৌগোলিক সুবিধা নয়, বরং কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব খোঁজে।
শেখ হাসিনার দাবি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, "সেন্টমার্টিন বিদেশীদের কাছে ইজারা দিলে আমি ক্ষমতায় থাকতে পারি।" তাঁর এই দাবি কেবল রাজনৈতিক স্ট্যান্ট ছিল নাকি এর পেছনে গভীর কোনো সত্যতা ছিল?
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পেছনেও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অন্যতম কারণ ছিল সেন্টমার্টিন বা বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি করতে না দেওয়া। আমেরিকা এই দ্বীপের ওপর লোভ পোষণ করছে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে। সিআইএ (CIA)-র গোয়েন্দা নথিতে সেন্টমার্টিন ও বঙ্গোপসাগরকে নিয়ে অসংখ্য গোপন রিপোর্ট রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত সীমিত করা বা নিষিদ্ধ করা কি সেই বড় কোনো চক্রান্তের মহড়া?
সেন্টমার্টিন - রাডার ও ইলেকট্রনিক নজরদারির কেন্দ্রবিন্দু
সামরিক ঘাঁটি মানেই কেবল হাজার হাজার সৈন্যের সমাবেশ নয়। বর্তমান যুগে নজরদারি বা সার্ভেইল্যান্সই হলো সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
রাডার সিস্টেম: ৩০০০-৫০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা স্ক্যান করার জন্য সেন্টমার্টিনে মাত্র একটি উঁচু টাওয়ার এবং শক্তিশালী রাডার সিস্টেমই যথেষ্ট।
জিপিএস ও সোনার: সমুদ্রের তলদেশে শত্রু সাবমেরিনের চলাচল ট্র্যাক করতে সেন্টমার্টিনের ভৌগোলিক অবস্থান অদ্বিতীয়।
মাতারবাড়ী সংযোগ: সেন্টমার্টিন থেকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের দূরত্ব মাত্র ৯০-১০০ কিলোমিটার। যে কোনো বড় যুদ্ধজাহাজ বা ক্যারিয়ার জাহাজ মাতারবাড়ীতে ভিড়তে পারবে, আর সেন্টমার্টিন থেকে তাদের কমান্ড নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
আমেরিকা ও ডিয়েগো গার্সিয়া মডেল
ভারত মহাসাগরে আমেরিকার ডিয়েগো গার্সিয়া নামক একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তাহলে সেন্টমার্টিন কেন দরকার? ডিয়েগো গার্সিয়া থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৪,০০০-৫,০০০ কিলোমিটার। এখান থেকে বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান উড়িয়ে এসে অপারেশন চালানো খরচসাপেক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ। কিন্তু সেন্টমার্টিনে একটি ছোট লজিস্টিক হাব থাকলে আমেরিকা সরাসরি চীন ও ভারতকে তাদের হাতের নাগালে পাবে। এটি শত শত পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র।
কৃত্রিম দ্বীপ ও আগামীর বাংলাদেশ
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব খুবই কম। শাহপরীর দ্বীপ থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১৬.১ কিলোমিটার। এই পুরো অঞ্চলটিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ৫০-৬০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আধুনিক বিজ্ঞানে যারা বিশ্বাসী, তারা জানেন যে 'প্লাম ফ্রন্ডস' পদ্ধতিতে বালি ও পলি ভরাট করে সমুদ্রের মাঝখানে টেকসই স্থাপনা তৈরি করা এখন কোনো রূপকথা নয়।
পাকিস্তানেও সিন্ধু নদীর মোহনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইন্ধনে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। অর্থাৎ, দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে আমেরিকা এখন সমুদ্রবেষ্টিত প্রতিটি কৌশলগত বিন্দুকে কবজা করতে মরিয়া।
সচেতনতা নাকি আনুগত্য?
সেন্টমার্টিনের মাটি নরম নাকি শক্ত সেই বিতর্কের চেয়ে বড় সত্য হলো এর অবস্থান। যারা সাধারণ মানুষকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চান যে এখানে ঘাঁটি করা সম্ভব নয়, তারা হয়তো আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন না অথবা জেনেশুনে গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র বা আধুনিক ভূ-রাজনীতি সচেতন যে কেউ বুঝবেন, সেন্টমার্টিন কেবল একটি দ্বীপ নয়, এটি বঙ্গোপসাগরের চাবিকাঠি।
আমরা পর্যটন চাই, পরিবেশ রক্ষা চাই, কিন্তু সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়। সেন্টমার্টিন নিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষী দেয় আমেরিকা যেখানে বন্ধুত্বের নামে পা রাখে, সেখানে শেষ পর্যন্ত জাতীয় সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে।
আপনি কি মনে করেন সেন্টমার্টিন নিয়ে এই আন্তর্জাতিক টানাটানি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি? নাকি এটি কেবলই একটি রাজনৈতিক গুঞ্জন?
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















