সাদ্দাম হোসেন ও শেখ মুজিব - দুই মহান নেতাই যখন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার
ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উভয় নেতাই নিজ নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি যে পিতৃসুলভ আস্থা রেখেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই আস্থার বৃত্তের ভেতরেই যে বিশ্বাসঘাতকতার বিষবাষ্প দানা বেঁধেছিল, তা ইতিহাসের এক নির্মম সমান্তরাল রেখা। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কদের পতনের গল্পগুলো প্রায়ই রণক্ষেত্রের বীরত্ব দিয়ে নয়, বরং অন্দরমহলের বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে লেখা হয়েছে।

TruthBangla
Dec 21, 2025
ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উভয় নেতাই নিজ নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি যে পিতৃসুলভ আস্থা রেখেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই আস্থার বৃত্তের ভেতরেই যে বিশ্বাসঘাতকতার বিষবাষ্প দানা বেঁধেছিল, তা ইতিহাসের এক নির্মম সমান্তরাল রেখা। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কদের পতনের গল্পগুলো প্রায়ই রণক্ষেত্রের বীরত্ব দিয়ে নয়, বরং অন্দরমহলের বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে লেখা হয়েছে।
ইরাকের লৌহমানব সাদ্দাম হোসেন এবং বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভৌগোলিক দূরত্ব, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সময়ের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়ে এক করুণ ও অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। উভয়েই তাঁদের দেশের সামরিক বাহিনীকে নিজের পরিবারের মতো আগলে রেখেছিলেন, গভীর আস্থা স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, সেই বাহিনীরই কিছু উচ্চাভিলাষী ও বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক সদস্যের বিশ্বাসঘাতকতায় তাঁদের জীবনের প্রদীপ নিভে গিয়েছিল। আজকের নিবন্ধে আমরা এই দুই নেতার জীবনের সেই ট্র্যাজেডির ছকটি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
সাদ্দাম হোসেন - ইরাকের লৌহমানব ও তাঁর 'সামরিক সন্তানরা'
সাদ্দাম হোসেন ছিলেন আধুনিক ইরাকের রূপকার এবং আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। ১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি ইরাক শাসন করেন। সাদ্দামের শাসনের ধরণ ছিল একাধারে কঠোর এবং জাতীয়তাবাদী।
সামরিক বাহিনীর প্রতি পিতৃসুলভ অনুরাগ
সাদ্দাম হোসেন কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি নিজেকে ইরাকি সামরিক বাহিনীর একজন অভিভাবক মনে করতেন। তিনি প্রায়ই তাঁর ভাষণে বলতেন যে, ইরাকের প্রতিটি সৈনিক তাঁর নিজের সন্তানের মতো। ১৯৯০ সালে কুয়েত যুদ্ধের সময় এক আবেগঘন ভাষণে তিনি বলেছিলেন, "পৃথিবী জানে আমার দুইজন পুত্র আছে (উদাই ও কুসাই), কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইরাকি সামরিক বাহিনীর প্রতিটি সদস্যই আমার একেকজন পুত্র।" তিনি সামরিক কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং তাঁদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে সব সময় সচেষ্ট থাকতেন।
২০০৩-এর বিশ্বাসঘাতকতা ও পতনের সূত্রপাত
২০০৩ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী ইরাক আক্রমণ করে, তখন সাদ্দাম হোসেন বিশ্বাস করেছিলেন তাঁর গড়ে তোলা বিশাল সামরিক বাহিনী শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বাগদাদ রক্ষা করবে। কিন্তু দৃশ্যপট ছিল উল্টো। সাদ্দামের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনেক জেনারেল এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা তলে তলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র সাথে আঁতাত করেছিলেন।
তথ্য পাচার: সাদ্দামের গতিবিধি এবং সামরিক কৌশলগুলো নিজ দেশের কর্মকর্তারাই শত্রুর কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন।
পারিবারিক ট্র্যাজেডি: এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই সাদ্দামের দুই ছেলে উদাই ও কুসাই মোসুলে এক গোপন আস্তানায় অবস্থানকালে মার্কিন সেনাদের অভিযানে নিহত হন। শেষ পর্যন্ত সাদ্দাম নিজেও ধরা পড়েন এবং ২০০৬ সালে তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়। নিজ জাতির একদল বিপথগামী সদস্যের 'গাদ্দারি' না থাকলে সাদ্দামকে হয়তো এভাবে অপদস্থ হতে হতো না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান - জাতির প্রতি তাঁর আস্থার দুর্গ
সাদ্দাম হোসেনের ঘটনার কয়েক দশক আগে ঠিক একই ধরনের এক ট্র্যাজেডি ঘটেছিল দক্ষিণ এশিয়ার বদ্বীপ বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি একটি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিলেন, তিনিও তাঁর দেশের সামরিক বাহিনীর ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখতেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি পিতৃসুলভ মমতা
বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেক্টর কমান্ডার এবং সামরিক কর্মকর্তাদের তিনি নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। স্বাধীনতার পর যখন নবগঠিত সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা অভিযুক্ত হন, বঙ্গবন্ধু তখন কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার বদলে তাঁদের নিজের বাসায় ডেকে আনতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যারা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে, তারা কখনও দেশের অমঙ্গল করতে পারে না। তিনি তাঁদের শাসাতেন কিন্তু আবার ক্ষমাও করে দিতেন পিতৃসুলভ স্নেহে।
রক্ষক যখন ভক্ষক - ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট
বঙ্গবন্ধু তাঁর সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেক সতর্কতা সত্ত্বেও বিশ্বাস করেননি যে, কোনো বাঙালি তাঁর দিকে বন্দুক তাক করতে পারে। এ জন্য শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরেও নিজ বাসভবনে থাকতেন এবং অরক্ষিত অবস্থায় থাকতেন। কোন ভারী পাহাড়া বা প্রটোকল তিনি ব্যবহার করতেন না। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে সেই বিশ্বাস চুরমার হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর একদল বিশ্বাসঘাতক সামরিক অফিসার, যাদের মধ্যে অনেকেই এক সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তারা সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করে।
বিদেশি আঁতাত: সাদ্দাম হোসেনের মতো বঙ্গবন্ধুর পতনের পেছনেও ছিল দেশি-বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানি আদর্শ ও আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রনীতির সমর্থকরা এই হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন ও সহযোগিতা করেছিল।
সপরিবারে হত্যা: সাদ্দামের মতো বঙ্গবন্ধুও সেদিন তাঁর দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হারিয়েছিলেন। তাঁর নিজ হাতে গড়া সেনাবাহিনীর একাংশই সেদিন খুনিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।
সাদ্দাম ও বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজেডি - কোথায় মিল?
এই দুই নেতার ঘটনার দিকে তাকালে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে হুবহু মিল পাওয়া যায় যা ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার বিষয় হতে পারে:
সামরিক বাহিনীর ওপর অন্ধ বিশ্বাস
উভয় নেতাই তাঁদের সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। সাদ্দাম তাঁর বাহিনীকে বলতেন ‘নিজের সন্তান’, আর বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন ‘মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা’ তাঁর রক্ষক। এই আস্থাই তাঁদের নিরাপত্তা বেষ্টনীকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
বিদেশি শক্তির কারসাজি ও স্থানীয় দালাল
সাদ্দাম ও বঙ্গবন্ধু উভয়কেই উৎখাতের পেছনে তৎকালীন পরাশক্তি আমেরিকার ভূ-রাজনীতি এবং স্থানীয় দালালদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। সাদ্দামের ঘনিষ্ঠ জেনারেলরা যেমন ডলারের বিনিময়ে তথ্য বিক্রি করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চক্রের খন্দকার মোশতাক এবং একদল বিপথগামী সেনাসদস্য তেমনি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতেছিলেন।
পারিবারিক রক্তপাত
উভয় পরিবারই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত শিকার হয়েছেন। সাদ্দামের দুই ছেলে এবং বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দুই ছেলেসহ সপরিবারে নিহত হওয়া প্রমাণ করে যে, ষড়যন্ত্রকারীরা কেবল ক্ষমতা বদল নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার বা আদর্শকে চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছিল।
ইতিহাসের শিক্ষা - আস্থার সীমানা কোথায়?
সাদ্দাম হোসেন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই সমান্তরাল জীবন ও মৃত্যু আমাদের এক কঠিন শিক্ষা দেয়। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সামরিক বাহিনীর প্রতি আস্থা থাকা জরুরি, কিন্তু সেই আস্থা যেন ‘অন্ধ বিশ্বাসে’ পরিণত না হয়। সামরিক বাহিনীর ভেতরে উচ্চাভিলাষী বা বিদেশি শক্তির চররা সব সময় ওত পেতে থাকে।
বঙ্গবন্ধু ও সাদ্দাম উভয়েই জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। কিন্তু তাঁদের পতনের মুহূর্তটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শাসক যখন প্রজাকে বা সেনাকে অতিরিক্ত স্নেহ করেন, তখন অনেক সময় সেই স্নেহের সুযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা ছুরি শানায়।
মহাকালের বিচার
সাদ্দাম হোসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ ইতিহাসের অংশ। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাক আজও স্থিতিশীলতা ফিরে পায়নি, আর বঙ্গবন্ধুকে হারানোর পর বাংলাদেশ কয়েক দশক পিছিয়ে গিয়েছিল সামরিক শাসনের যাঁতাকলে। বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কদের হত্যা করা গেলেও তাঁদের আদর্শকে কখনও মুছে ফেলা যায় না। তবে তাঁদের এই অকাল মৃত্যু বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়, যেখানে স্নেহের প্রতিদান দেওয়া হয়েছিল বুলেটের আঘাতে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















