>

>

সাদ্দাম হোসেন ও শেখ মুজিব - দুই মহান নেতাই যখন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার

সাদ্দাম হোসেন ও শেখ মুজিব - দুই মহান নেতাই যখন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার

ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উভয় নেতাই নিজ নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি যে পিতৃসুলভ আস্থা রেখেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই আস্থার বৃত্তের ভেতরেই যে বিশ্বাসঘাতকতার বিষবাষ্প দানা বেঁধেছিল, তা ইতিহাসের এক নির্মম সমান্তরাল রেখা। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কদের পতনের গল্পগুলো প্রায়ই রণক্ষেত্রের বীরত্ব দিয়ে নয়, বরং অন্দরমহলের বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে লেখা হয়েছে।

TruthBangla

সাদ্দাম হোসেন ও শেখ মুজিব - দুই মহান নেতাই যখন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার

Power, Loyalty, and Betrayal বিশ্বরাজনীতির হাজার বছরের ইতিহাসে এই তিনটি শব্দবন্ধ যত রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে, অন্য কোনো উপাদান বোধহয় ততটা দিতে পারেনি। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক ক্ষমতাধর ও জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কের পতন কোনো রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধে বা দূরবর্তী শত্রুর সরাসরি বুলেটে ঘটেনি; বরং তাঁদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে নিজেদের পরম বিশ্বস্ত অন্দরমহলের বিশ্বাসঘাতকতায়। যে হাতগুলোকে তাঁরা পরম স্নেহে পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন, সেই হাতগুলোই শেষ পর্যন্ত পিঠে ছুরি বসাতে দ্বিধা করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল মরুপ্রান্তর ইরাকের লৌহমানব সাদ্দাম হোসেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার পলিমাটির দেশ বাংলাদেশের রূপকার ও স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভৌগোলিক অবস্থান, মতাদর্শিক ভিত্তি, শাসনের ধরণ এবং সময়কালের দিক থেকে এই দুই নেতার পার্থক্য ছিল বিশাল। কিন্তু ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির এক অদ্ভুত ও নির্মম সমান্তরাল রেখায় তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় এসে মিশে যায় এক বিন্দুতে।

উভয় নেতাই নিজ নিজ দেশের সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্তম্ভ হিসেবে কেবল গড়ে তোলেননি, বরং তাঁদের প্রতি পোষণ করতেন এক গভীর অপত্য ও পিতৃসুলভ মমতা। সেনাবাহিনী বা সামরিক কর্মকর্তাদের ভুলত্রুটিকে তাঁরা অনেক সময় রাষ্ট্রের কঠোর চোখে না দেখে পিতার মমতায় মার্জনা করেছেন, অগাধ ভালোবাসা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আগলে রেখেছেন। কিন্তু দুঃখজনক ও নির্মম বাস্তবতা হলো, সেই সামরিক বাহিনীরই একদল উচ্চাভিলাষী, ষড়যন্ত্রকারী ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চক্রের ক্রীড়নক কর্মকর্তার চরম বিশ্বাসঘাতকতায় কালগ্রাসে পতিত হন এই দুই অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়ক।

এই নিবন্ধে সাদ্দাম হোসেন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের সেই করুণ সমান্তরাল ট্র্যাজেডির রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

সাদ্দাম হোসেন ও শেখ মুজিব - দুই মহান নেতাই যখন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার

সাদ্দাম হোসেন: ইরাকের লৌহমানব ও তাঁর 'সামরিক সন্তানরা'

১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছর ইরাক শাসন করেছিলেন সাদ্দাম হোসেন। বাথ পার্টির (Ba'ath Party) পতাকাতলে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করে তিনি ইরাককে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে আত্মনিয়োগ করেন। সাদ্দাম হোসেনের রাজনৈতিক দর্শন ছিল অসাম্প্রদায়িক আরব জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরাকের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।

কঠোর হাতে শাসন করলেও সাদ্দাম হোসেনের আমলেই ইরাকের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করা হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। শত শত আধুনিক হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সুপেয় পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা অবকাঠামো তাঁর হাতেই নির্মিত হয়। শিক্ষা প্রসারে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ইউনেস্কো (UNESCO) থেকে তাঁকে পুরস্কৃতও করা হয়েছিল। তবে শাসনের শৈলীতে তিনি ছিলেন একজন আপসহীন ও চরম কঠোর শাসক।

সামরিক বাহিনীর প্রতি অপত্য ও পিতৃসুলভ অনুরাগ

সাদ্দাম হোসেন নিজের সামরিক শক্তি বিশেষ করে ‘ইরাকি সশস্ত্র বাহিনী’ এবং অভিজাত ‘স্পেশাল রিপাবলিকান গার্ড’ (Special Republican Guard)-কে শুধু শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার মনে করতেন না; তিনি তাঁদের প্রতি প্রকাশ করতেন এক ধরণের পিতা-পুত্রের সম্পর্ক। সেনা ব্যারাকে তিনি নিয়মিত যেতেন, সাধারণ সৈনিক থেকে শুরু করে শীর্ষ জেনারেলদের পর্যন্ত বিশাল সুযোগ-সুবিধা, পদোন্নতি, জমি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছিলেন।

১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের সময় এবং পরবর্তী প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাদ্দাম হোসেনের দেওয়া একটি বিশ্বখ্যাত ভাষণ আজ ইতিহাসের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল। তিনি আবেগভরে বলেছিলেন:

"সমগ্র পৃথিবী জানে সাদ্দাম হোসেনের দুজন মাত্র পুত্রসন্তান রয়েছে উদাই ও কুসাই। কিন্তু আমার দেশের সশস্ত্র বাহিনীর দিকে তাকিয়ে দেখুন। আমার দেশের প্রতিটি সৈনিক, প্রতিটি কম্যান্ডার আমার একেকজন পুত্র! ইরাকি সেনাবাহিনীর পুরোটা মিলেই সাদ্দাম হোসেনের পরিবার।"

সাদ্দাম বিশ্বাস করতেন, তাঁর তৈরি করা এই বিপুল সেনাবহর এবং তাঁদের সাথে গড়ে ওঠা এই আবেগীয় সম্পর্ক যেকোনো আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের মুখে ইরাকের জন্য অজেয় প্রতিরক্ষা ব্যূহ হয়ে দাঁড়াবে।

২০০৩ এর আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ অন্দরমহলের বিশ্বাসঘাতকতা

২০০৩ সালের মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী যখন মিথ্যা ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ (WMD)-এর অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করে, তখন সাদ্দাম হোসেন ও তাঁর অনুগতরা নিশ্চিত ছিলেন যে বাগদাদ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ইঞ্চি ইঞ্চি মাটিতে মার্কিন সেনারা তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে। সাদ্দাম তাঁর সেনাপতিদের ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখেছিলেন।

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত বাস্তবতায় রচিত হয়েছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় অন্দরমহলীয় বিশ্বাসঘাতকতা।

সিআইএ-র ‘অপারেশন হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’: মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (CIA) কেবল আকাশপথে বোমা ফেলেই খান্ত হয়নি; যুদ্ধের বহু আগে থেকেই তারা কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে সাদ্দামের অতি ঘনিষ্ঠ জেনারেল, রিপাবলিকান গার্ডের কমান্ডার এবং প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিজের দলে ভিড়িয়ে ফেলেছিল।

জেনারেলদের রহস্যজনক পিছু হটা: ২০০৩ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যখন মার্কিন ট্যাংক বাগদাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, তখন কোনো বড় ধরণের প্রতিরোধই গড়ে ওঠেনি। কারণ সাদ্দামের প্রধান প্রধান সেনাপতিরা সেনা ইউনিটগুলোকে লড়াই থামিয়ে বাড়ি চলে যেতে অথবা আত্মসমর্পণ করার গোপন নির্দেশ দিয়েছিলেন। রিপাবলিকান গার্ডের প্রধান কমান্ডার জেনারেল মাহের সুফিয়ান আল-তিকরিতিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে সাদ্দামের গোপন অবস্থান ও সামরিক কৌশলের সব তথ্য পাচার করে দিয়েছিলেন।

পারিবারিক রক্তপাত ও চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি: এই অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার জের ধরেই ২০০৩ সালের ২২ জুলাই মসুলে এক ঘেরাও অভিযানে মার্কিন বাহিনীর হামলায় নির্মমভাবে নিহত হন সাদ্দামের দুই ছেলে উদাই হোসেন ও কুসাই হোসেন এবং কুসাইয়ের ১৪ বছর বয়সী বালক পুত্র মুস্তফা। পরবর্তীতে নিজ শহর তিকরিতের কাছে আদ-দাওর এলাকার এক গোপন আশ্রয়স্থল থেকে বিশ্বাসঘাতকের গোপন সংবাদের ভিত্তিতেই সাদ্দাম হোসেন গ্রেফতার হন। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর, পবিত্র ঈদুল আজহার সকালে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত সরকার ফাসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে এই বীর আরব নেতাকে হত্যা করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জাতির প্রতি তাঁর আস্থার দুর্গ ও গাদ্দার সেনাবাহিনী

সাদ্দাম হোসেনের ট্র্যাজেডির কয়েক দশক আগে দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তর বাংলাদেশে ঘটে গিয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পরম মানবিকতা, গণমুখী ভালোবাসা ও অসীম উদারতার প্রতীক। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে তিনি পরাধীন বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মূল মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে যে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের উদয় ঘটেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার পর শূন্য হাতে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার এক বিশাল দায়িত্ব এসে পড়েছিল তাঁর ওপর।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি পিতৃসুলভ মমতা ও সেনাদলের গঠন

মুক্তিযুদ্ধের পরপরই গঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মূলত দুটি ধারা ছিল একদল যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন (মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্য), আর অন্যদল যারা যুদ্ধকালীন পাকিস্তানে আটকা ছিলেন এবং পরবর্তীতে ফেরত এসেছিলেন (প্রত্যাবাসিত সেনাসদস্য)। বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি এই দুই ধারার মধ্যে একতা আনার জন্য নিরলস চেষ্টা করে গেছেন।

বিশেষ করে, যে সকল তরুণ ও পদস্থ কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁদের কোনোদিন শুধুই রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা অধীনস্ত মনে করতেন না; তাঁদের তিনি দেখতেন নিজের সন্তান শেখ কামাল ও শেখ জামালের মতো।

স্বাধীনতার পর যখন কিছু তরুণ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চরম সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ উঠত, তখন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কঠোর সামরিক সাজা কার্যকর করার বদলে বঙ্গবন্ধু তাঁদের নিজ বাসভবনে ডেকে এনে শাসন করতেন। পিতার মতো ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে ধরে সমঝে দিতেন এবং ক্ষমা করে দিতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন:

"ওরা তো রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করেছে। একটু আবেগী হতে পারে, কিন্তু এরা তো আমারই ছেলে। এরা কোনোদিন আমার ক্ষতি করতে পারে না।"

অরক্ষিত ধানমন্ডি ৩২ ও আস্থার অন্ধবিন্দু

বঙ্গবন্ধুর এই অপরিসীম আস্থাই পরবর্তীতে তাঁর নিরাপত্তার সবচেয়ে দুর্বল দিক বা ‘অন্ধবিন্দু’ (Blind spot) হিসেবে দেখা দেয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সরকারি সুসজ্জিত ও সুরক্ষিত ‘বঙ্গভবন’ বা সুরক্ষিত গণভবনে স্থায়ী হননি। তিনি থাকতেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের অতি সাধারণ একটি দোতলা বাড়িতে, যেখানে নিরাপত্তার নামে ছিল না কোনো আধুনিক ভারী বুলেটপ্রুফ ব্যারিকেড বা সশস্ত্র সেনাবহর।

সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শুভাকাঙ্ক্ষীরা যখন তাঁকে বারবার সতর্ক করেছিলেন যে সেনাব্যালাকে ও অন্দরমহলে একদল পদলোভী উচ্চাকাঙ্খী সামরিক কর্মকর্তা ষড়যন্ত্র করছে এবং তাঁর প্রাণ সংশয়ের ঝুঁকি রয়েছে, তখন বঙ্গবন্ধু এক মুহূর্তের জন্য তা বিশ্বাস করতে চাননি। তিনি পরম আত্মবিশ্বাসে উচ্চারণ করতেন-

"কোনো বাঙালি আমার বুকে গুলি চালাতে পারে না। যে বাঙালিকে আমি ভালোবেসেছি, যাদের জন্য জীবন বাজি রেখেছি, তারা কখনো আমার শত্রু হতে পারে না।"

দেশি-বিদেশি চক্রান্তের জাল ও ১৫ আগস্টের নারকীয় তাণ্ডব

বঙ্গবন্ধুর এই নিঃশর্ত ভালোবাসার সুযোগ নিয়েছিল তাঁরই অতি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সতীর্থ খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী ও উগ্র মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তা (যেমন: মেজর ফারুক, মেজর রশিদ, মেজর ডালিম, মেজর নূর, রিসালদার মোসলেমউদ্দিন প্রমুখ)।

এর পেছনে ছিল আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকারপররাষ্ট্রনীতি ও তৎকালীন কোল্ড ওয়ার (Cold War) বা স্নায়ুযুদ্ধের জটিল হিসাব-নিকাশ। বাংলাদেশের চিরশত্রু পাকিস্তান ও তার আন্তর্জাতিক মিত্ররা ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল উপড়ে ফেলতে এই ষড়যন্ত্রে ইন্ধন জুগিয়েছিল।

১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে সেনা ক্যাম্প থেকে ভারী অস্ত্র নিয়ে ট্যাঙ্ক ও গানশিপসহ বিপথগামী সৈন্যরা হানা দেয় শান্ত সুনিবিড় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। পরম পিতার মতো যিনি এগিয়ে এসে খুনিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন "তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?", সেই মহানায়ককে সিঁড়িতেই ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়।

বংশপ্রদীপ নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা: কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই শান্ত হয়নি ঘাতকরা। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, দুই নবপরিণীতা বধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের এবং ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি মাত্র ১০ বছর বয়সী ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলও। একই সাথে শেখ ফজলুল হক মনি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতেও চালানো হয়েছিল গণহত্যা।

সাদ্দাম হোসেন ও শেখ মুজিব - দুই মহান নেতাই যখন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার

সাদ্দাম হোসেন ও বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের দুই ট্র্যাজেডির মিল কোথায়?

যদি সাদ্দাম হোসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, শাসনকাল এবং পতনের প্রেক্ষাপটকে পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে কয়েকটি অত্যন্ত মৌলিক বিষয়ে একদম হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির গবেষকদের কাছে এক পরম শিক্ষার বিষয়।

সামরিক বাহিনীর ওপর অপত্য ও অন্ধ বিশ্বাস

উভয় নেতাই নিজ নিজ সামরিক বাহিনীকে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার পাশাপাশি নিজেদের আবেগের জায়গা দিয়ে পরিমাপ করতেন। সাদ্দাম তাঁর সশস্ত্র বাহিনীকে বলতেন ‘নিজের সন্তানতুল্য’, আর বঙ্গবন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের আগলে রাখতেন অপত্য স্নেহে।

উভয় নেতাই নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে দেশের সামরিক বাহিনীর আনুগত্য ও ভালোবাসাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার যে স্বাভাবিক পেশাদারিত্ব ও গোয়েন্দা নজরদারি থাকা উচিত ছিল, সেই প্রতিরক্ষাব্যূহ তাঁদেরই আবেগ ও ভালোবাসার কাছে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

আন্তর্জাতিক পরাশক্তির চক্রান্ত ও স্থানীয় দালাল চক্র

বঙ্গবন্ধু এবং সাদ্দাম হোসেন উভয়েই নিজ নিজ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অনুসারী ছিলেন। সাদ্দাম ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও খনিজ তেল নিয়ন্ত্রণের প্রধান বাধা, আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী চক্রের বিরুদ্ধের এক অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী প্রাচীর।

দুটি ঘটনার পেছনেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (CIA) এবং তাদের মিত্র পররাষ্ট্রনীতির অদৃশ্য হাত কাজ করেছিল। তদুপরি, নিজস্ব জাতির ভেতরের দালাল (Quislings) ছাড়া এই বিশাল চক্রান্ত কার্যকর করা সম্ভব ছিল না। সাদ্দামের ক্ষেত্রে যেমন তাঁর ঘনিষ্ঠ জেনারেলরা ডলার ও সুবিধার বিনিময়ে জন্মভূমির তথ্য বিক্রি করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও খন্দকার মোশতাক এবং একদল পথভ্রষ্ট সেনাসদস্য নিজ স্বার্থ ও মতাদর্শের জন্য জাতির পিতাকে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।

রক্তপ্রদীপ ও বংশানুক্রম চিরতরে মুছে ফেলার নৃশংসতা

দুটি ট্র্যাজেডির দিকে তাকালেই দেখা যায়, ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য কেবল কোনো একজন শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করা ছিল না; বরং তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ওই নেতার রাজনৈতিক আদর্শ ও রক্তের উত্তরাধিকারকে চিরতরে পৃথিবী থেকে মুছে দেওয়া।

সাদ্দাম হোসেনের ক্ষেত্রে তাঁর দুই সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি উদাই ও কুসাইকে এবং কুসাইয়ের কিশোর পুত্র মুস্তফাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যাতে সাদ্দাম পরবর্তী ইরাকে বাথ পার্টি বা তাঁর পরিবারের কেউ আর নেতৃত্ব দিতে না পারে।

বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে এই নৃশংসতা ছিল আরও ভয়াবহ। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তো দূরের কথা, ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলকেও বাঁচতে দেওয়া হয়নি। উদ্দেশ্য ছিল একটাই শেখ মুজিবের রক্তের কোনো চিহ্ন যেন স্বাধীন বাংলাদেশে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।

শাসক পরবর্তী রাষ্ট্রের চরম অস্থিতিশীলতা ও পিছিয়ে পড়া

কোনো মহান রাষ্ট্রনায়ককে নির্মমভাবে হত্যা বা উৎখাত করলে রাষ্ট্র যে কতটা ভয়াবহ সংকটে পড়ে, তা ইরাক এবং বাংলাদেশ উভয়ের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।

২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে আজ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। দেশটি গৃহযুদ্ধ, আইএসআইএস (ISIS)-এর উত্থান এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিরতায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর পর বাংলাদেশ টানা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্ধকার সামরিক শাসন, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো কালো আইন, সংবিধান ধ্বংস এবং গণতন্ত্রহীনতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিল।

এক নজরে সাদ্দাম হোসেন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি

নিচে সাদ্দাম হোসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল, সামরিক দর্শন, ট্র্যাজেডির প্রেক্ষাপট ও ফলাফলের একটি তথ্যভিত্তিক তুলনামূলক সারণী তুলে ধরা হলো:

বিষয় ও ক্ষেত্র

সাদ্দাম হোসেন (ইরাক)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বাংলাদেশ)

রাষ্ট্রীয় পদবী ও শাসনকাল

রাষ্ট্রপতি, ইরাক (১৯৭৯ - ২০০৩)

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ (১৯৭১ - ১৯৭৫)

রাজনৈতিক মূল দর্শন

আরব জাতীয়তাবাদ, বাথিজম ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা

বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজতন্ত্র

সামরিক বাহিনীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

পিতৃসুলভ অভিভাবকত্ব; সামরিক বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে নিজ সন্তান বলে মনে করতেন।

অপত্য স্নেহ ও ক্ষমাশীলতা; মুক্তিসেনাদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন।

প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্ব

পাকিস্তান কেন্দ্রিক অশুভ চক্র ও সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি

অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার ধরণ

সিআইএ-র টাকায় বিক্রি হয়ে যাওয়া শীর্ষ জেনারেল ও সেনাপতিদের তথ্য পাচার ও যুদ্ধ না করা।

মোশতাক চক্র এবং একদল পথভ্রষ্ট সামরিক কর্মকর্তার সশস্ত্র তোপ ও প্রাসাদ চক্রান্ত।

পারিবারিক প্রাণহানি

দুই পুত্র (উদাই ও কুসাই) এবং ১ জন নাতি (মুস্তফা) যুদ্ধে শহীদ।

সপরিবারে নিহত (স্ত্রী, ৩ পুত্র, ২ পুত্রবধূ, ভাই এবং স্বজনসহ ১৮ জন)।

হত্যাকাণ্ড/উৎখাতের তারিখ

৯ এপ্রিল ২০০৩ (পতন), ৩০ ডিসেম্বর ২০০৬ (ফাঁসি কার্যকর)।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ (সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ড)।

ঐতিহাসিক পরিণতি

ইরাকে গৃহযুদ্ধ, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসস্তূপ।

বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক শাসন, ইনডেমনিটি আইন ও উন্নয়ন স্থবিরতা।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্র ও শীতল যুদ্ধের (Cold War) প্রভাব

সাদ্দাম হোসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উভয়েই এমন এক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন, যখন পুরো বিশ্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ বা কোল্ড ওয়ারের দাবাখেলায় বিভক্ত ছিল।

বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরাশক্তির ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন পাকিস্তান জান্তার রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষাবলম্বন করেছিল। হেনরি কিসিঞ্জার ও রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসন স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে পরম ভূ-রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখেছিল।

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি: স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন' (NAM), ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (OIC) এবং কমনওয়েলথে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর নীতি ছিল "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়"। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা এবং কিউবার মতো সমাজতান্ত্রিক দেশের কাছে পাট রপ্তানি করার সিদ্ধান্তকে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন ভালো চোখে দেখেনি।

খাদ্য রাজনীতি ও ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ: কিউবায় পাট বিক্রির অজুহাতে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে আসার পথে খাদ্যবাহী মার্কিন জাহাজ (PL-480) মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়, যা দেশে কৃত্রিম খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।

সিআইএ (CIA)-র সংযোগ: বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এবং সিআইএ-র স্টেশন অফিসারদের সাথে খন্দকার মোশতাক ও ফারুক-রশিদ চক্রের গোপন যোগাযোগ ছিল।

সাদ্দাম হোসেনের ক্ষেত্রে পরাশক্তির মেরুকরণ

সাদ্দাম হোসেনের সাথে মার্কিন প্রশাসনের সম্পর্ক ছিল এক চরম বৈপরীত্যে ভরা রাজনৈতিক খেলা।

ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮): ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনির প্রভাব ঠেকাতে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও অর্থনৈতিক সমর্থন প্রদান করেছিল।

কুয়েত আক্রমণ ও অক্ষ বদল (১৯৯০): ১৯৯০ সালে সাদ্দাম কুয়েত দখল করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাঁর চিরদিনের দূরত্ব তৈরি হয়। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সাদ্দামকে পশ্চিমাবিরোধী ‘আরব জাতীয়তাবাদের’ প্রধান প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়।

২০০৩-এর ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসন: ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর মার্কিন নব্য-রক্ষণশীল (Neoconservative) নীতি নির্ধারকরা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলানোর পরিকল্পনা করে। সিআইএ মিথ্যা দাবি করে যে সাদ্দামের কাছে ‘গণবিধ্বসংী রাসায়নিক অস্ত্র’ (WMD) রয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী ২০০৩ সালে অবৈধভাবে ইরাক আক্রমণ করে দেশের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।

সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও দ্বন্দ্ব

উভয় রাষ্ট্রনেতাই তাঁদের সামরিক বাহিনীকে পরম ভালোবাসায় গড়ে তুলেছিলেন, কিন্তু সেই বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত বিভাজন ও অসন্তোষকে পুরোপুরি প্রশমিত করতে পারেননি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ফাটল (১৯৭১-১৯৭৫)

মুক্তিসেনা বনাম প্রত্যাবাসিত মনস্তত্ত্ব: মুক্তিযুদ্ধের পর তৎকালীন সেনাবাহিনীতে দুটি ভিন্ন ধারার উপস্থিতি ঘটে। একদল রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা অফিসার, আর অন্যদল পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা (প্রত্যাবাসিত) অফিসারবৃন্দ। এই দুই দলের মধ্যে প্রমোশন, জ্যেষ্ঠতা ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছিল।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB) কেন্দ্রিক গুজব: সেনাবাহিনীর সমান্তরাল হিসেবে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ গঠন করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হচ্ছে এমন একটি মিথ্যা প্রচার সেনাব্যারাকগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ব্যক্তিগত আক্রোশ ও শৃঙ্খলাভঙ্গ: মেজর ডালিম, মেজর ফারুক, মেজর রশিদের মতো জুনিয়র অফিসাররা বিভিন্ন শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত অপরাধে যুক্ত হয়ে চাকরি হারিয়েছিলেন কিংবা প্রশাসনিক শাস্তির মুখে পড়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাদের কঠোর সাজা না দিয়ে অনুকম্পা দেখালেও, সেই ক্ষোভকে তারা রাষ্ট্রপ্রধান উৎখাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

ইরাকি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ধস (১৯৯০-২০০৩)

জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন: সাদ্দামের সেনাবাহিনীতে শীর্ষ পদগুলোতে ছিলেন মূলত তাঁর নিজের শহর তিকরিতের সুন্নি মতাবলম্বী অফিসাররা। অন্যদিকে সাধারণ সৈনিকদের বড় অংশই ছিল শিয়া ও কুর্দি, যাদের ওপর সাদ্দাম কঠোর দমনপীড়ন চালিয়েছিলেন। ফলে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ছিল না।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক মনোবল ধ্বংস: ১৯৯০-এর দশক থেকে জাতিসংঘের দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ ইরাকি সৈনিকদের বেতন ও রেশন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।

সিআইএ-র ‘অপারেশন হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’: ২০০৩ যুদ্ধের আগে সিআইএ কৌশলগতভাবে সাদ্দামের শীর্ষ জেনারেলদের কোটি কোটি টাকার লোভ দেখায়। "যুদ্ধ না করলে পরিবার সুরক্ষিত থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় মিলবে" এই আশ্বাসে সাদ্দামের এলিট রিপাবলিকান গার্ডের কমান্ডাররা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ান।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ ও এপ্রিল ২০০৩: অন্দরমহলের ঘাতক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা

দুটি ট্র্যাজেডির ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শত্রু বাইরে ছিল না, ছিল একদম ঘরের ভেতরে। উভয় ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মারাত্মক অবহেলা ও ব্যর্থতা লক্ষ্য করা যায়।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫: ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কালরাত্রি

গোয়েন্দা ব্যর্থতা (Intelligence Failure): তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (DFI) এবং এনএসআই (NSI) সেনাব্যালাকে ফারুক-রশিদ চক্রের গভীর রাতের বৈঠক ও নাইট ট্রেইনিংয়ের নামে সাজোয়া যান (ট্যাঙ্ক) বের করার ষড়যন্ত্রের খবর রাষ্ট্রপতিকে দিতে ব্যর্থ হয়।

আস্থার অন্ধবিন্দু: রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু গণভবন বা সুসংরক্ষিত বঙ্গভবনে থাকেননি। তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সাধারণ বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।

একমাত্র বীর সেনানী ব্রিগেডিয়ার জামিল: ১৫ আগস্ট শেষ রাতে যখন ঘাতকরা বাড়ি ঘেরাও করে, বঙ্গবন্ধু তাঁর মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার) জামিল উদ্দিন আহমেদকে ফোন করেন। জামিল এক মুহূর্ত দেরি না করে এককভাবে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে আসেন এবং লালমাটিয়া সোবহানবাগ মসজিদে ঘাতকদের বুলেটে শহীদ হন। অথচ সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম শফিউল্লাহসহ অন্যান্য শীর্ষ সেনাপতিরা কার্যকর কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন।

এপ্রিল ২০০৩: বাগদাদের পতন ও সাদ্দামের বন্দিদশা

জেনারেলদের গোপন আত্মসমর্পণ: ২০০৩ সালের ৭ থেকে ৯ এপ্রিলের মধ্যে মার্কিন বাহিনী যখন বাগদাদে প্রবেশ করে, তখন সাদ্দামের নির্দেশে গঠিত লাখ লাখ সেনার প্রতিরোধ ব্যূহ এক রাতে হাওয়ায় মিলাইয়া যায়। জেনারেল মাহের সুফিয়ান আল-তিকরিতি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী সুলতান হাশিম আহমেদ গোপনে মার্কিন গোয়েন্দাদের সাথে চুক্তি করে প্রতিরোধ তুলে নেন।

সাদ্দাম হোসেনকে ধরিয়ে দেওয়া: ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিকরিতের কাছে আদ-দাওর গ্রামে একটি ছোট্ট আন্ডারগ্রাউন্ড গর্ত (‘স্পাইডার হোল’) থেকে সাদ্দামকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাদ্দামের অতীব বিশ্বস্ত দেহরক্ষী ও স্বজন মোহাম্মদ ইব্রাহিম ওমর আল-মুসাল্লাত সিআইএ-র অমানুষিক জিজ্ঞাসাবাদ ও বিপুল অর্থ পুরষ্কারের মুখে সাদ্দামের গোপন আস্তানার তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছিল।

উত্তরসূরি বিনাশ ও রাজনৈতিক বংশানুক্রম মুছে ফেলার নৃশংস মনস্তত্ত্ব

ষড়যন্ত্রকারীদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা কেবল ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকে হত্যা করে ক্ষান্ত হননি; বরং তাঁরা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যেন ওই রাজনৈতিক দর্শন ও রক্তের উত্তরাধিকার কোনোদিন পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের রক্তপাত

১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডিতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং শেখ মনি ও আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনে মোট ১৮ জন মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

শিশু রাসেলকে হত্যা: ১০ বছরের অবুঝ শিশু শেখ রাসেল ঘাতকদের পায়ে ধরে আকুতি জানিয়েছিল তাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ঘাতকরা তাকে মায়ের লাশের কাছে নিয়ে গিয়েই ব্রাশফায়ার করে। উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবের রক্তের কোনো পুরুষ উত্তরাধিকার যেন জীবিত না থাকে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা পুত্রদের হত্যা: জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল যারা ছিলেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর সন্তান, তাঁদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

সাদ্দাম হোসেনের পরিবারের রক্তপাত

মোসুলের লড়াই (জুলাই ২০০৩): ২০০৩ সালের ২২ জুলাই মোসুল শহরের একটি বাড়িতে ঘেরাও করে ৪ ঘণ্টার তীব্র বন্দুকযুদ্ধের পর মার্কিন সামরিক বাহিনী সাদ্দামের দুই ছেলে উদাই হোসেন ও কুসাই হোসেনকে হত্যা করে। এই যুদ্ধে কুসাইয়ের ১৪ বছর বয়সী কিশোর পুত্র মুস্তফাও বীরত্বের সাথে লড়াই করে প্রাণ হারায়।

ফাঁসি ও পরিবারের ধ্বংস: ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়। সাদ্দামের দুই কন্যা রাগাদ ও রানা জর্ডানে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন (উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সাদ্দাম নিজেই তাঁর দুই বিদ্রোহী জামাতা হোসেন কামেল ও সাদ্দাম কামেলকে হত্যা করেছিলেন, যা সাদ্দামের নিজ পরিবারের ভেতরেও রক্তক্ষয়ী ফাটল তৈরি করেছিল)।

পতনের পর রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয়

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো কোনো অবিসংবাদিত জাতীয় নেতাকে চক্রান্ত করে উৎখাত করলে সেই রাষ্ট্র কোনোদিন সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারে না; বরং রাষ্ট্র অস্থিতিশীলতার গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।

বাংলাদেশ: ১৯৭৫ পরবর্তী দুই দশকের অন্ধকার

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক সরকার খুনিদের বিচার থেকে রক্ষা করতে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে, যা মানবজাতির আইনি ইতিহাসের অন্যতম কালো দলিল।

ক্যাপ্টেনদের শাসন ও ক্যু সংস্কৃতি: ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বাংলাদেশে ২০টিরও বেশি ছোট-বড় সামরিক অভ্যুত্থান ও ক্যু চেষ্টা ঘটে, જેમાં জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন।

স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনর্বাসন: মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের পুনর্বাসিত করে বাংলাদেশের মূল অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সংবিধানে কাটছাঁট করা হয়।

ইরাক: ২০০৩ পরবর্তী প্রলয়ঙ্করি বিপর্যয়

পল ব্রেমারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত (CPA Order No. 2): বাগদাদ দখলের পর মার্কিন প্রসেসক পল ব্রেমার একটি আদেশ জারি করে ইরাকের ৪ লাখ সদস্যের গোটা সামরিক বাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এর ফলে হাজার হাজার সশস্ত্র সৈনিক চাকরি হারিয়ে রাস্তায় বসে যায়।

আইএসআইএস (ISIS)-এর জন্ম: চাকরিচ্যুত ও অপমানিত বাথিস্ট সামরিক অফিসাররাই পরবর্তীতে সংগঠিত হয়ে চরমপন্থী আল-কায়েদা ও আইএসআইএস-এর মূল সামরিক নেতৃত্ব গঠন করে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে রক্তে ভাসিয়ে দেয়।

সার্বভৌমত্ব হারানো: সাদ্দামের পতনের পর ইরাক মার্কিন ও ইরানি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয় এবং দেশের তেল সম্পদের বড় অংশই বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যায়।

রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিহাসের শিক্ষা

সাদ্দাম হোসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই সমান্তরাল করুণ ট্র্যাজেডি বিশ্ব রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কতগুলো নির্মম সত্য ও অলঙ্ঘনীয় শিক্ষা রেখে গেছে:

অপত্য স্নেহ বনাম পেশাদার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা: একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক তাঁর জনগণকে ভালোবাসবেন, সেনাসদস্যদের স্নেহ করবেন এটি স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা (Statecraft) কেবল আবেগ বা স্নেহ দিয়ে চলে না। ইতালীয় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি থেকে শুরু করে চাণক্য সকলেই সতর্ক করে গেছেন যে শাসকের অতিরিক্ত অন্ধ বিশ্বাস বা আবেগ নিরাপত্তা বলয়কে ধ্বংস করে দেয়। সামরিক বা গোয়েন্দা বাহিনীতে পেশাদার শৃঙ্খলা এবং গোয়েন্দা তথ্য (Intelligence Analysis)-কে আবেগের ওপরে স্থান দিতে হয়। আস্থার পরিধি কখনোই যেন রাষ্ট্রীয় নজরদারির ঊর্ধ্বে না ওঠে।

অভ্যন্তরীণ বিভীষণ চিহ্নিতকরণ: রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের কোনো সশস্ত্র বাহিনী নয়, বরং ঘরের ভেতরের ‘বিভীষণ’ বা দালাল গোষ্ঠী। সাদ্দাম হোসেন ভেবেছিলেন মার্কিন বাহিনীকে তাঁর সৈন্যরা আটকে দেবে, কিন্তু তিনি টের পাননি তাঁর সেনাপতিরাই তথ্য বিক্রি করে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন নিজের বাঙালি সন্তানরা তাঁকে রক্ষা করবে, কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি খন্দকার মোশতাক ও ফারুক-রশিদরা পেছনে ছুরি শানাচ্ছে। সুতরাং, শাসককে সবসময় তাঁর নিজের চারপাশে থাকা চাটুকার ও উচ্চাভিলাষীদের গতিবিধির প্রতি চরম সজাগ থাকতে হয়।

সাম্রাজ্যবাদের শাশ্বত চরিত্র: আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু থাকে না; থাকে কেবল স্বার্থ। সাদ্দাম হোসেন একসময় পশ্চিমা শক্তির সহায়তায় ইরান যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, কিন্তু স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে তাঁকেই উৎখাত করা হয়। বঙ্গবন্ধু জোটনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারসাম্য আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাঁদের অনুগত পুতুল সরকার বসানোর জন্য এই মহান নেতাকে সরিয়ে দেয়।

ইতিহাসের বিচার ও শাশ্বত অমরতা

ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে। বুলেটের আঘাতে, ফাঁসির দড়িতে কিংবা গভীর চক্রান্তের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কোনো রাষ্ট্রনায়ককে হয়তো হত্যা করা যায়, ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা যায় কিন্তু তাঁদের প্রতিষ্ঠিত মূল ভাবাদর্শকে কখনো মাটিচাপা দেওয়া যায় না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাদ্দাম হোসেনের এই প্রামাণ্য ইতিহাস আমাদের সামনে কতগুলো চিরন্তন সত্য ও কঠোর শিক্ষা উপস্থাপন করে:

১. ভালোবাসা বনাম প্রশাসনিক কঠোরতা: জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও সামরিক বাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ‘আবেগের’ স্থান নেই।

২. অন্দরমহলের বিভীষণ চেনা: বাইরের শত্রু যতটাই শক্তিশালী হোক না কেন, ঘরের ভেতরের শত্রু বা দালালদের চিহ্নিত করতে না পারলে পৃথিবীর কোনো পরাক্রমশালী নেতাই টিকতে পারেন না।

৩. আদর্শের অমরত্ব: বুলেটের আঘাত, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা কিংবা ফাসির মঞ্চে একজন মানুষকে হত্যা করা সম্ভব, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া মতাদর্শকে নয়।

সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল পরম অপমানে, কিন্তু যে ইরাককে গণতন্ত্র ও শান্তির লোভ দেখিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল, আজ সাদ্দামের আমলের সেই স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের কথা ইরাকি জনগণ পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। সাদ্দাম আজ মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের এক অমর প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে ঘাতক চক্র ভেবেছিল বাঙালির হৃদয় থেকে তাঁর নাম চিরতরে মুছে ফেলা গেছে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল, রেডিও-টেলিভিশনে তাঁর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনি। খুনিদের ঠাঁই হয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম ডাস্টবিনে, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ কোটি বাঙালির হৃদয়ে, রক্তে ও লাল-সবুজের পতাকায় এক অমর নাম হয়ে বিরাজ করছেন।

সাদ্দাম হোসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উভয়েই নিজেদের সামরিক বাহিনীর প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও পরম বিশ্বাস রেখেছিলেন, তার প্রতিদান তাঁরা পেয়েছিলেন বুলেটের আঘাতে ও ফাঁসির মঞ্চে। এই দুই মহান নেতার রক্তস্নাত ট্র্যাজেডি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে যেখানে পরম স্নেহের প্রতিদান দেওয়া হয়েছিল পরম বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.