>
>
কেন 'ইস্ট পাকিস্তান' এর স্বাধীনতা অনিবার্য ছিল? জিন্নাহ পর্যন্ত বঙ্গদেশকে উপেক্ষা করেছিল
কেন 'ইস্ট পাকিস্তান' এর স্বাধীনতা অনিবার্য ছিল? জিন্নাহ পর্যন্ত বঙ্গদেশকে উপেক্ষা করেছিল
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের মাধ্যমে যখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি জন্ম নেয়, তখন থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, কেন 'ইস্ট পাকিস্তান'-এর স্বাধীনতা অনিবার্য ছিল? কেন স্বয়ং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পর্যন্ত শুরুতে এই বঙ্গদেশকে পাকিস্তানের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন? ইতিহাসের ধুলো জমা পাতাগুলো ওল্টালে দেখা যায়, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি ছিল এক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বৈসাদৃশ্য।

TruthBangla
Dec 19, 2025
বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটির জন্মের পেছনে কোনো আকস্মিক কারণ ছিল না। বরং দুই অঞ্চলের মধ্যে সৃষ্ট বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবধানই বাঙালিদের স্বাধীনতার পথে ধাবিত করেছিল। বাংলাদেশে আজ যে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছে, তার বীজ রোপিত হয়েছিল আজ থেকে বহু বছর আগে।
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের মাধ্যমে যখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি জন্ম নেয়, তখন থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, কেন 'ইস্ট পাকিস্তান'-এর স্বাধীনতা অনিবার্য ছিল? কেন স্বয়ং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পর্যন্ত শুরুতে এই বঙ্গদেশকে পাকিস্তানের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন? ইতিহাসের ধুলো জমা পাতাগুলো ওল্টালে দেখা যায়, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি ছিল এক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বৈসাদৃশ্য। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত করেছিল। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল সময়ের দাবি এবং কীভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য একটি অনিবার্য যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছিল।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমরা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম জানি। কিন্তু ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর সত্য হলো, ১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে যখন মুসলিমদের জন্য পৃথক আবাসভূমির স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, তখন তাতে বাংলার স্থান ছিল নগণ্য।
আল্লামা ইকবাল ও চৌধুরী রহমত আলীর 'পাকিস্তান'
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক এলাহাবাদ অধিবেশনে মহাকবি আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের জন্য যে স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের প্রস্তাব করেন, তাতে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের প্রদেশগুলোর কথাই মূলত বলা হয়েছিল; সেখানে বাংলার কোনো উল্লেখ ছিল না। আরও স্পষ্টভাবে বললে, চৌধুরী রহমত আলী যখন পাঞ্জাবের 'P', আফগানিস্তানের 'A', কাশ্মীরের 'K', সিন্ধু প্রদেশের 'I' এবং বেলুচিস্থানের 'STAN' নিয়ে 'PAKISTAN' শব্দটি গঠন করেন, সেখানেও বাংলার বিষয়টি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। মূলত উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোই ছিল প্রাথমিক পাকিস্তান ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।
লাহোর প্রস্তাব এবং 'States' বিতর্ক
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়েছিল যে, ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ (States) গঠিত হবে। এখানে বহুবচন শব্দটির ব্যবহার ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, বাংলা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে ‘States’ শব্দটিকে একবচন করে একটি একক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করা হয়, যা ছিল দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মূল কারণ।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রান্তিকতার সংকট
প্রাচীনকাল থেকেই ভারতের ভাগ্যাকাশে যারা আধিপত্য বিস্তার করেছে, তাদের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান ছিল প্রবেশের সিংহদ্বার। খাইবার পাস দিয়ে আসা বিজয়ী বীরদের কাছে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া ছিল নিকটবর্তী। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলা সবসময়ই ছিল কেন্দ্রীয় শাসনকেন্দ্র থেকে দূরবর্তী এক প্রান্তভূমি।
কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অভাব
দূরবর্তী অবস্থান হওয়ায় দিল্লি বা করাচির কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী কখনোই পূর্ব বাংলাকে তাদের আত্মার অংশ মনে করতে পারেনি। মুঘল শাসনামলে দীর্ঘ সময় এই অঞ্চল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, বাংলার মানুষের বিদ্রোহী সত্তা সবসময়ই স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। ১৯৪৭ সালের পর ১৩০০ মাইলের ব্যবধান এবং মাঝখানে শত্রুভাবাপন্ন ভারত এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই প্রমাণ করেছিল যে, পাকিস্তান কোনো টেকসই রাষ্ট্রকাঠামো নয়।
দেশভাগের ক্ষত - সম্পদ ও মেধার স্থানান্তরণ
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ ছিল এক রক্তক্ষয়ী এবং বিশৃঙ্খল প্রক্রিয়া। ব্রিটিশ প্রশাসকদের তড়িঘড়ি ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, তাতে পূর্ব বাংলা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জনসংখ্যা ও সম্পদের বৈষম্য: রাষ্ট্র গঠনের সময় পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫% পূর্ব বাংলায় থাকলেও, সম্পদের মাত্র ১৫% ছিল এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে।
মেধাপাচার ও হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রস্থান: পূর্ব বাংলার অর্থনীতির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন হিন্দু শিক্ষিত ও ব্যবসায়ী শ্রেণি। দেশভাগের ফলে তাদের এক বিশাল অংশ ভারতে চলে যাওয়ায় এই অঞ্চলে হঠাৎ করেই এক অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ শূন্যতা তৈরি হয়। যার সুযোগ নেয় পশ্চিম পাকিস্তানের উদীয়মান পুঁজিপতিরা।
অর্থনৈতিক বৈষম্য - শোষণের পরিসংখ্যান
পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে একটি কলোনি বা উপনিবেশ হিসেবে বিবেচনা করত। পূর্ব বাংলার উর্বর কৃষিজমি, নদীমাতৃক সম্ভাবনা এবং পাটের বৈশ্বিক চাহিদাকে ব্যবহার করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের রুক্ষ ভূমিকে শিল্পায়িত করার জন্য।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের ফারাক
দেশবিভাগের পরপরই দুই অংশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিপথ ভিন্ন হয়ে যায়। ১৯৪৭-৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জিডিপি পূর্বের চেয়ে মাত্র ৮% বেশি ছিল। কিন্তু ১৯৫৪-৫৫ সালে এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০%। ১৯৫৯-৬০ সালের হিসাবে দেখা যায়, পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পায়নের হার এবং মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় দ্রুতগতিতে বাড়ছিল। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক চার্লস স্মিথ যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন-
“পূর্ব বাংলা যদি বিশ্বের দরিদ্রতম আটটি দেশের একটি হয়ে থাকে, তবে তার কারণ এটি পাকিস্তানের অংশ।”
উন্নয়ন বাজেট ও বৈষম্য
জনসংখ্যার বড় অংশ হওয়া সত্ত্বেও উন্নয়ন বাজেটে পূর্ব পাকিস্তানের বরাদ্দ ছিল নগণ্য। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন বাজেটে পূর্ব পাকিস্তান পেয়েছিল মাত্র ২০% বরাদ্দ। ১৯৬৫-৭০ মেয়াদে তা কিছুটা বাড়লেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ এবং কলকারখানার অভাবে পূর্ব বাংলা এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করছিল।
সম্পদ স্থানান্তরের তিন কৌশল
পশ্চিম পাকিস্তান তিনটি সুনির্ধারিত উপায়ে পূর্ব বাংলার সম্পদ শুষে নিয়েছিল:
আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্য: পূর্ব পাকিস্তান তার কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা পেত, তা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি কেনা হতো। আবার পশ্চিমের নিম্নমানের পণ্য চড়া দামে পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো।
বৈদেশিক সাহায্যের বণ্টন: পাকিস্তান যত আন্তর্জাতিক সাহায্য বা ঋণ পেয়েছে, তার সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে সিন্ধু নদ উপত্যকা বা পাঞ্জাবের সেচ ও শিল্প প্রকল্পে। পূর্বের বন্যার্ত মানুষের কান্নায় করাচির কর্ণকুহর সিক্ত হয়নি।
কর ব্যবস্থা ও পাটের টাকা: তৎকালীন বিশ্বের ‘গোল্ডেন ফাইবার’ বা সোনালী আঁশ পাটের আয়ের প্রায় সবটুকু দিয়ে করাচি ও ইসলামাবাদ শহরকে তিলোত্তমা করে সাজানো হয়েছিল। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রায় ২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সম্পদ এই সময়কালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে পাচার হয়েছিল।
অর্থনৈতিক শোষণ - রপ্তানি ও আমদানির বৈষম্যমূলক নীতি
পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ আসত পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত পণ্য থেকে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে।
রপ্তানি ও আমদানি: ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অবদান ছিল গড়ে ৫৪.৭ শতাংশ। অথচ সেই আয়ের বিনিময়ে আমদানির ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩১.১ শতাংশ। অর্থাৎ, পূর্বের উপার্জিত অর্থ পশ্চিমে পাচার হতো।
কাঁচামাল বনাম শিল্পায়ন: পূর্ব পাকিস্তান ছিল মূলত কৃষিপ্রধান এবং এখানে সস্তায় কাঁচামাল উৎপাদিত হতো। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি অনুযায়ী শিল্প কারখানাগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সস্তায় কাঁচামাল (যেমন: পাট) পশ্চিমে যেত এবং সেখান থেকে উৎপাদিত পণ্য চড়া দামে বাঙালিদের কিনতে হতো। এটি ছিল এক ধরনের ক্লাসিক্যাল ঔপনিবেশিক শোষণ।
শিল্প ও মালিকানা - ২২ পরিবারের শাসন
পাকিস্তানের অর্থনীতি ছিল মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতির কবজায়। ১৯৬২ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাকিস্তানের ব্যক্তিমালিকানাধীন অর্থনীতির ৭৩ শতাংশ ছিল মাত্র ৪৩টি পরিবারের হাতে।
বাঙালির নগণ্য মালিকানা: এই ৪৩টি পরিবারের মধ্যে ২২টি পরিবার ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই পরিবারগুলোর মধ্যে মাত্র একটি ছিল বাঙালি পরিবার।
ব্যাংক ও সম্পদ: ব্যাংক জামানতের ৬০ শতাংশই ছিল ৭ জন পশ্চিম পাকিস্তানি ধনকুবেরের নিয়ন্ত্রণে। মোট শিল্প সম্পদের মধ্যে বাঙালিদের অংশ ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ছিল ৪৭ শতাংশ এবং বাকি ৩৫ শতাংশ ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত। এই অর্থনৈতিক একচেটিয়াপনা বাঙালিদের নিঃস্ব করে দিয়েছিল।
প্রশাসনিক ও সরকারি চাকরিতে বৈষম্য
একটি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু পাকিস্তান সরকার সুকৌশলে বাঙালিদের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, ফলে বাঙালি ছাত্রদের পক্ষে সেখানে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া বা চাকরিতে যোগ দেওয়া ছিল দুরূহ।
সচিবালয়ে অবস্থা (১৯৫৫ সাল): সে সময় পাকিস্তানে ১৯ জন সচিবের মধ্যে একজনও বাঙালি ছিলেন না। ৪১ জন যুগ্মসচিবের মধ্যে মাত্র ৩ জন ছিলেন বাঙালি।
নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়: ১৩৩ জন উপসচিবের মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র ১০ জন এবং ৫৪৮ জন কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৮ জন। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় বাঙালিদের কোনো কার্যকর কণ্ঠস্বর ছিল না।
সামরিক খাতের বৈষম্য - একটি অরক্ষিত জনপদ
সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল নামমাত্র। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা প্রথা থাকলেও বাঙালির জন্য তা ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা প্রচার করত যে, বাঙালিরা ‘যোদ্ধা জাতি’ (Martial Race) নয়।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (১৯৫৭ সাল): মেজরের উপরের পদে ৮৯৭ জন কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র ১৩ জন। কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার, মেজর জেনারেল বা জেনারেল পদে সে সময় একজন বাঙালি কর্মকর্তাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল।
বাজেট বরাদ্দ: পাকিস্তানের জাতীয় বাজেটের ৬০ শতাংশের বেশি ব্যয় করা হতো সামরিক খাতে। যেহেতু সামরিক সদর দপ্তর, ক্যান্টনমেন্ট এবং সমরাস্ত্র কারখানা পশ্চিমে ছিল, তাই এই বিশাল অর্থের প্রায় সবটাই পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিতে আবর্তিত হতো। পূর্ব পাকিস্তান সামরিক দিক থেকেও ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত, যা ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছিল।
জীবনযাত্রার মান ও নিত্যপণ্যের দামের পার্থক্য
মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান যখন রাষ্ট্রীয় সহায়তায় শিল্পায়িত হচ্ছিল, পূর্ব পাকিস্তান তখন দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল।
মাথাপিছু GNP: ১৯৫৯–৬০ অর্থবছরে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু জিএনপি ছিল ৩৫৫ টাকা, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে তা ছিল মাত্র ২৬৯ টাকা। ১৯৬০–৬৫ সালে প্রবৃদ্ধির হারও ছিল অসম। পশ্চিমে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৪%, আর পূর্বে মাত্র ২.৬%।
নিত্যপণ্যের মূল্য: অবাক করার বিষয় হলো, চাল ও গমের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম উৎপাদনকারী অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে ছিল বেশি। পশ্চিমে চালের দাম যখন মণপ্রতি ১৮ রুপি, তখন পূর্বে তা ছিল ৫০ রুপি। গমের দাম পশ্চিমে ১০ রুপি হলে পূর্বে ছিল ৩৫ রুপি।
সম্পদ পাচার: স্বর্ণ ও অর্থ পশ্চিমে সহজে নেওয়া যেত কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে আনা কঠিন ছিল। ফলে দুই অঞ্চলে স্বর্ণের দামেও ব্যাপক পার্থক্য দেখা দিত।
শিক্ষাক্ষেত্রে পরিকল্পিত অবহেলা
শিক্ষা ছিল বাঙালির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সব আয়োজন পাকিস্তান সরকার করেছিল। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি শিক্ষার্থীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো।
বাজেট বরাদ্দ: ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষা খাতে পশ্চিম পাকিস্তানকে দেওয়া হয় ১,৫৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তান পায় মাত্র ২৪০ কোটি টাকা (অর্থাৎ মাত্র ১৩.৫ শতাংশ)।
বিদেশি বৃত্তি: কলম্বো প্ল্যান, ফোর্ড ফাউন্ডেশন বা কমনওয়েলথ বৃত্তির মতো বিদেশি সুযোগগুলোর সিংহভাগ (৩৫টির মধ্যে ৩০টি) ভোগ করত পশ্চিম পাকিস্তানিরা। অনেক সময় পূর্ব পাকিস্তানের যোগ্য প্রার্থীরা এসব বৃত্তির খবরই জানত না।
মাথাপিছু ব্যয়: ১৯৫১-৬১ দশকে শিক্ষা খাতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য মাথাপিছু বার্ষিক বরাদ্দ ছিল ৮.৬৩ টাকা, আর পূর্ব পাকিস্তানিদের জন্য মাত্র ৫.৬৩ টাকা।
কৃষি খাতে অবহেলা - পাটের সোনালি আঁশ ও কৃষকের রক্ত
পূর্ব পাকিস্তান কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও এখানকার কৃষির উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়নি। অথচ বাঙালির ঘামঝরা পাট দিয়েই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজকোষ সমৃদ্ধ হতো।
পাটের উৎপাদন: ১৯৪৭-৪৮ সালে বিশ্বের মোট পাটের ৮১ শতাংশ উৎপাদিত হতো পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু সঠিক গবেষণা, সার ও বীজের অভাব এবং সরকারের উদাসীনতায় ১৯৬৪-৬৫ সালে তা কমে ৩৫ শতাংশে নেমে আসে। কৃষকের রক্ত জল করা পয়সা দিয়ে করাচিতে আধুনিক অট্টালিকা তৈরি করা হতো।
রাজনৈতিক বৈষম্য ও গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ
জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি যখনই তোলা হতো, তখনই তাকে ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে আখ্যা দেওয়া হতো।
গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ: ১৯৫৪ সালে বিপুল ভোটে জয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে জনগণের সব রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'ছয় দফা' ছিল এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খল মুক্তির সনদ, যার কারণে তাঁকে বারবার কারাগারে বন্দী করা হয়।
অনিবার্য অভ্যুদয়
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য পাকিস্তান ছিল একটি ‘ভুল রাষ্ট্র’। যে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হয়েছিল, সেই ধর্মও শেষ পর্যন্ত দুই অংশের মধ্যকার ভাষাগত, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবধান ঘুচাতে পারেনি। বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ছিল মূলত টিকে থাকার লড়াই। অর্থনৈতিক শোষণ যখন চরম সীমায় পৌঁছায় এবং রাজনৈতিকভাবে যখন বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়, তখন স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল কয়েক দশকের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির এই জাগরণ প্রমাণ করেছিল যে, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে উপেক্ষা করে কোনো কৃত্রিম রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।
তথ্যসূত্র:
পাকিস্তানের তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা; চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরামর্শক প্যানেলের রিপোর্ট (১৯৭০)
Mohammad Niaz Asadullah, “Educational Disparity in East and West Pakistan, 1947–71”
Charles Smith, Financial Times (1971) — বিবেচ্য মন্তব্য
Rahman (1968) বিবরণ (পূর্ব থেকে পশ্চিমে সম্পদ স্থানান্তর)
Mahbubur Rahman; Abdur Rauf Chowdhury, ১৯৭১ প্রথম পর্ব; Daily Times (Naseer Memon column); genocidebangladesh.org;
Government of Pakistan, Report of the Advisory Council of Islamic Ideology (Economic data)
Amartya Sen, Identity and Violence
Rounaq Jahan, Pakistan: Failure in National Integration
S. Akbar Zaidi, Issues in Pakistan’s Economy
Willem van Schendel, A History of Bangladesh
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















