খুন হওয়া কবি, প্রেমিক ও সিরাজ সিকদারের লাল বিপ্লবের ক্যাজুয়ালিটি
স্বাধীনতার ভোরের রক্তিম ছায়া ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও শান্তি ফিরে আসেনি সাধারণ মানুষের জীবনে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে উগ্র বামপন্থী রাজনীতির সশস্ত্র তৎপরতা সব মিলিয়ে সত্তরের দশকের শুরুর দিকটা ছিল চরম অস্থির। এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’। যাদের লক্ষ্য ছিল ‘শ্রেণি শত্রু’ খতমের মাধ্যমে এক সশস্ত্র বিপ্লব। কিন্তু সেই বিপ্লবের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, ব্যক্তিগত ইগো আর নিজের কমরেডদের রক্তে হাত রাঙানোর এক লোমহর্ষক ইতিহাস।

TruthBangla

স্বাধীনতার ভোরের রক্তিম ছায়া ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও শান্তি ফিরে আসেনি সাধারণ মানুষের জীবনে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে উগ্র বামপন্থী রাজনীতির সশস্ত্র তৎপরতা সব মিলিয়ে সত্তরের দশকের শুরুর দিকটা ছিল চরম অস্থির। এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’। যাদের লক্ষ্য ছিল ‘শ্রেণি শত্রু’ খতমের মাধ্যমে এক সশস্ত্র বিপ্লব। কিন্তু সেই বিপ্লবের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, ব্যক্তিগত ইগো আর নিজের কমরেডদের রক্তে হাত রাঙানোর এক লোমহর্ষক ইতিহাস।
১৯৭২ সালের মে মাসের শেষদিন । খুলনার টুটপাড়া রোডে একটি বাসায় আত্মগোপনে আছেন সেলিম শাহনেওয়াজ ও তাঁর ভালোবেসে বিয়ে করা স্ত্রী আলমতাজ বেগম ছবি। সেলিম শাহনেওয়াজ পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির বরিশাল-খুলনা এলাকার এরিয়ার কমাণ্ডার, কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য। পার্টিতে তাঁর গোপন নাম ফজলু। আলমতাজ বেগম ছবিও পার্টি সদস্য। গোপন নাম মিনু অথবা দীপা। দুজনের কাছে অস্ত্র বলতে দুটি গুলিভরা রিভলবার এবং ৩টি হ্যান্ড গ্রেনেড। ফজলু সাধারণ কেউ নন, তিনি সর্বহারা পার্টির বরিশাল-খুলনা অঞ্চলের এরিয়া কমান্ডার এবং কেন্দ্রীয় কমিটির প্রভাবশালী সদস্য।
ফজলু ও মিনু আত্মগোপনে-পুলিশের ভয়ে নয়, বরং পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নিজের দলের লোকজনের কাছ থেকে। নিজের দলের প্রধান কমরেড সিরাজ সিকদার তাঁদের মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করেছেন। মুল অপরাধ, সিরাজ সিকদার এই বিয়ে মেনে নেননি। ফজলু ও মিনু পরস্পরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু এক কঠোর সাম্যবাদী দলের কাছে ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে বড় ছিল ‘পার্টি শৃঙ্খলা’।
বছর দশেক পর পার্টির পত্রিকায় আরেক কমরেড স্মৃতিচারনে লিখেন- “ফজলু ও মিনুর মধ্যকার তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক মানের বিরাট ব্যবধানের কারনে কেন্দ্রীয় কমিটি এই বিয়েতে অসম্মতি প্রদান করে। অনুরূপ ঘটনা সুলতানের বেলায়ও ঘটে। সেও চরম নিম্নমান সম্পন্ন প্রেমিকা সালমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় কমিটির নিকট পেশ করে। একই যুক্তিতে তার আবেদনও নাকচ হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমতি না পাওয়ায় পর ফজলু আবোল-তাবোল কাজ কর্ম, পাগলামি শুরু করে, চরম হতাশ হয়। এ অবস্থায় তাকে বুঝানোর জন্য সভাপতি সিরাজ সিকদার খুলনা গিয়েছিলেন। খুলনায় ফজলু ঘর বন্ধ করে নিজের মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে বলে, বিয়ের অনুমতি না দিলে সে আত্মহত্যা করবে। এ অবস্থায় ফজলুসহ সভাপতি ঢাকায় ফেরেন।”
ফজলু ও সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, বিয়ের অনুমতি না পাওয়ায় তারা সিরাজ সিকদারের বিরুদ্ধে চক্র ও উপদলীয় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। অতএব তাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। যদিও সিরাজ সিকদার নিজে দুটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম বিয়ে একজন কৃষক কণ্যাকে- শ্রেণীচ্যুত হবার আকাঙ্খা থেকে। পরে আবার বিয়ে করেন পার্টি কমরেড জাহানারা বেগমকে।
ফজলু ও মিনুর আত্মগোপনের বাসার দরজার কড়া নেড়ে উঠে ১৯৭২ সালের মে মাসের শেষদিন রাত আটটায়। ভাত রান্না করছিলেন মিনু। ফজলু সতর্ক হয়ে উঠেন। মিনু এগিয়ে গিয়ে দরজা একটু ফাঁক করে আগন্তুকদের দেখে নিশ্চিত হন। ফজলুর ছোটবেলার বন্ধু এবং সর্বহারা পার্টির সক্রিয় কর্মী রিজভি এবং নুরু। বন্ধুদের জড়িয়ে ধরলেন ফজলু। দুজনের খাবার চারজন মিলে খেলেন। এরপর রিজভি একটি চিঠি দিলেন ফজলুকে। ঝালকাঠি থেকে শিখা নামের আরেক কমরেড লিখেছেন, এখানে এক বাসায় প্রচুর অস্ত্র লুকানো আছে, তিনি গেলে পাবেন।
প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও অস্ত্রের প্রয়োজন ভেবে রাজী হন ফজলু। মিনুকে তাঁর ভাইয়ের বাসা ঢাকায় চলে যাবার ব্যবস্থা করে দিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে খুলনা ত্যাগ করেন সেলিম শাহনেওয়াজ ওরফে ফজলু। ৩ জুন সকালে দেখা গেলো সুগন্ধা নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছে সেলিম শাহনেওয়াজের লাশ। মারাত্মক সায়ানায়েড ছুরির আঘাতে লাশের শরীর ক্ষতবিক্ষত। মাত্র ৩ ইঞ্চি ফলার এরকম ছুরি খাপে পুরে লকেটের মতো সবসময় গলায় ঝুলিয়ে রাখতো রিজভি, সেলিমের ছোটবেলার বন্ধু ও পার্টি কমরেড!
মিনু এই সংবাদ পাননি ততক্ষনাৎ। তিনি তখন চলে এসেছেন ঢাকায়, তাঁর ভাই হুমায়ুন কবিরের কাছে। হুমায়ূন কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন শিক্ষক, কবি ও বুদ্ধিজীবি। স্ত্রী সুলতানা রেবু, ছেলে সেতু ও মেয়ে খেয়াকে নিয়ে থাকতেন ইন্দিরা রোডের একটি বাড়িতে।তিনি নিজেও সর্বহারা পার্টির সাথে জড়িত কিন্তু সিরাজ সিকদারের সাথে মতবিরোধ চলছে। বোন এবং বোনের স্বামীর বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদন্ডই শুধু নয়, তাঁদের আরেক ভাই ফিরোজ কবিরের মৃত্যুর জন্যও তিনি সিরাজ সিকদারের উপর ক্ষুব্দ ছিলেন। কিশোর ফিরোজ কবির পেয়ারা বাগানে সিরাজ সিকদারের সাথে ছিলেন। যুদ্ধকৌশল নিয়ে মতবিরোধ থেকে তাঁকে বহিস্কার করেন সিকদার। পরে আগস্ট মাসে বরিশালে পাকিস্তান আর্মির হাতে ধরা পড়েন ফিরোজ। ফিরোজ কবিরকে গুলী করে হত্যা করে পাক আর্মি।
১৯৭২ সালের ৬ জুন, সময় রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। হুমায়ুন কবির খুব ব্যস্ত ছিলেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুমিত ইস্পাত’ প্রকাশনা নিয়ে। প্রচণ্ড গরমে ক্লান্তবিধ্বস্ত অবস্থায় হুমায়ুন বাড়ি ফিরে এলে পরিবারের অন্যরা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এসময় খুব পরিচিত কেউ এসে ডাকেন তাঁকে। এতোই পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ যে, ঘর্মাক্ত রাতে খালি গায়ে বের হয়ে আসেন হুমায়ুন কবির। খালি গায়েই তিনি চলে যান তাঁর সঙ্গে সামনের মাঠে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলো অপর আততায়ী। সম্ভবতঃ সেই পেছন থেকে গুলী করে। আততায়ী দুজন সাইকেলে চড়ে চলে যায় নিরাপদে। রক্তাক্ত নিথর কবির মৃতদেহ পড়ে থাকে মাঠে। বাংলার এক প্রতিভাবান কবির জীবন প্রদীপ নিভে যায় নিজ দলেরই বুলেটে।
১৯৭৩ ও ৭৪ সালে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি ২৪টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাংক লুট করতে সক্ষম হয়। ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবসের বদলে ভারত কর্তৃক পূর্ব বাংলা দখলের ‘কালো দিবস’ আখ্যায়িত করে ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর হরতালের ডাক দেয় সর্বহারা পার্টি। ‘৭৪ সালে ১৬ জুন আবার হরতাল ডাকে। হরতাল সফলের কর্মসূচী হিসেবে বোমা হামলা, খতম, রক্ষীবাহিনী-পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, পোস্ট অফিস, রেলস্টেশনে হামলা, রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং সড়কপথ অবরোধের ঘটনা ঘটায়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থিত তিতাস গ্যাসের সেন্টার মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেয়া।

১৬ ডিসেম্বর ‘কালো দিবস’ হিসেবে ১৯৭৪ সালের ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর- দুদিন আবার হরতাল আহ্বান করে সর্বহারা পার্টি। আশ্চর্যজনকভাবে পল্টন ময়দানের জনসভায় এই হরতালকে সমর্থন জানান আরেক চিনপন্থী কমিউনিস্ট নেতা মওলানা ভাসানী। এই হরতালে আলোড়নমুলক ঘটনা ছিলো কয়েকটি পত্রিকা ও ম্যাগাজিন অফিসে বোমা হামলা, ঢাকার নাখালপাড়ায় রেললাইন মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেয়া; ময়মনসিংহ, নারায়নগঞ্জ, কুমিল্লা ও নরসিংদীতে রক্ষীবাহিনীর সাথে ব্যাপক গুলি বিনিময় এবং ফতুল্লায় নদীর ত্রিমোহনায় স্টিমার-লঞ্চ আটকে দেয়া।
সর্বহারা পার্টির দলিলে দাবী করা হয়- ‘৭৩ ও ‘৭৪ সালে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে তাদের ৪৬ জন ক্যাডার নিহত হন। বলাবাহুল্য- কমরেড সিরাজ সিকদারের সাথে মতবিরোধের অপরাধে কয়জন পার্টি সদস্য মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন সেই উল্লেখ দলিলে নেই। পার্টির ভেতরে ‘শোধনবাদী’ বা ‘উপদলীয় ষড়যন্ত্রকারী’ আখ্যা দিয়ে কতজন নিজের কমরেডকে তারা হত্যা করেছে, তার সঠিক হিসেব আজও রহস্যে ঘেরা।
শ্রেনীশত্রু আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী খতম করা পার্টি এজেন্ডা হিসেবেই উল্লেখিত ছিলো। কতজন শ্রেনীশত্রু খতম হয়েছিলো- দালিলিক না থাকলেও সংখ্যাটি একেবারে কম নয়।
১৯৭৪ সালের শেষভাগে সরকার সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে। সিরাজ সিকদারকে ধরার জন্য সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়।চক্র, উপদলীয় ষড়যন্ত্র, শ্রেনীশত্রু ইত্যাদি নানা অভিধায় বহু মানুষ হত্যার পর ১লা জানুয়ারী ১৯৭৫, পুলিশের হাতে ধরা পড়েন সিরাজ সিকদার। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে মধ্যরাতে সাভারে নিয়ে যাবার পথে পুলিশের কাছ থেকে পলায়নের চেষ্টা করলে পুলিশ গুলী করে হত্যা করে তাঁকে।

ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় দুই কলামে শিরোনাম, 'গ্রেপ্তারের পর পলায়নকালে পুলিশের গুলিতে সিরাজ সিকদার নিহত'। দৈনিক বাংলার সংবাদ শিরোনাম ছিল 'সিরাজ সিকদার গ্রেপ্তার: পালাতে গিয়ে নিহত'।
এই হত্যাকান্ডকে বলা হয় বাংলাদেশের প্রথম “বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড”। কমরেড সিরাজ সিকদারের নির্দেশে সংগঠিত অগনিত হত্যাকে অবশ্য কিছু বলা হয়না। এসব হয়তো বিপ্লবের ক্যাজুয়ালিটি মাত্র।
সিরাজ সিকদার একজন দেশপ্রেমিক ছিলেন নাকি একজন নিষ্ঠুর একনায়ক, তা নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। একদিকে তিনি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর নিজ দেশের বুদ্ধিজীবী, আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী ও নিজ দলের কমরেডদের রক্তে হাত রাঙিয়েছেন।
পার্টি সদস্যদের বিয়ের অনুমতি না দেওয়া বা তুচ্ছ কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এই বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে, অতি-বিপ্লবী তত্ত্বে যখন মানবিকতা হারিয়ে যায়, তখন তা দানবীয় রূপ ধারণ করে।
সেলিম শাহনেওয়াজ, হুমায়ুন কবির কিংবা ফিরোজ কবির তাঁরা প্রত্যেকেই একটি সুন্দর দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু রাজনীতির গোলকধাঁধায় পড়ে তাঁরা নিজের বন্ধুর বুলেটের শিকার হয়েছেন। সিরাজ সিকদারের মৃত্যু হয়তো একটি সশস্ত্র অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তার ক্ষত বাংলাদেশ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে।
সৌজন্যে: Preset71















