সিরাজ সিকদার - বিপ্লবের আড়ালে চরমপন্থা ও অশান্ত বাংলাদেশের সেই অধ্যায়
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। জাতি যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরে শুরু হয় এক চরম অস্থিরতা। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আদর্শিক রাজনীতির নামে সশস্ত্র পথে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারা। এই অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে যার নাম বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি।

TruthBangla
Jan 2, 2026
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। জাতি যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরে শুরু হয় এক চরম অস্থিরতা। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আদর্শিক রাজনীতির নামে সশস্ত্র পথে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারা। এই অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে যার নাম বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি।
আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু মহল বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনার বিরোধী, তারা সিরাজ সিকদারকে একজন 'মহান বিপ্লবী' বা 'হিরো' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায় অন্য এক বীভৎস চিত্র। বিপ্লবের বুলি আওড়ালেও সিরাজ সিকদারের কর্মকাণ্ড ছিল মূলত চরমপন্থা, ডাকাতি, হত্যা এবং রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।
কে এই সিরাজ সিকদার? আদর্শ না কি চরমপন্থা?
সিরাজ সিকদার ছিলেন একজন পেশাদার প্রকৌশলী। কিন্তু পড়াশোনা শেষে তিনি বেছে নেন মাওবাদী বামপন্থী রাজনীতি। ১৯৬৮ সালে তিনি 'পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন' গঠন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি প্রচলিত নেতৃত্বের বাইরে থেকে আলাদাভাবে যুদ্ধ করার দাবি করেন। তবে স্বাধীনতার পর তার গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। তিনি সমাজতন্ত্র বা বিপ্লবের দোহাই দিয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
তার আদর্শ ছিল বন্দুকের নলই সকল শক্তির উৎস। আর এই শক্তির দাপট দেখাতে গিয়ে তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের জানমালের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন থেকে সর্বহারা পার্টি
ষাটের দশকের শেষভাগে যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন তুঙ্গে, তখন ১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি সিরাজ সিকদার প্রতিষ্ঠা করেন 'পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন'। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মাও সেতুং-এর বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করা।
১৯৭০ সালের মে এবং অক্টোবর মাসে এই দলের গেরিলারা ঢাকা শহরের পাকিস্তান কাউন্সিল, বিএনআর ভবন এবং মার্কিন তথ্য কেন্দ্রে বোমা হামলা চালায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই ছিল পাকিস্তানি উপনিবেশবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলার মাটিতে প্রথম দিককার কোনো পরিকল্পিত সশস্ত্র হামলা।
পেয়ারা বাগানের সেই উত্তাল সর্বহারা পার্টির জন্ম
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার পর সারা দেশ যখন স্তব্ধ, তখন সিরাজ সিকদার বরিশালের দুর্গম অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭১, বরিশালের ভিমরুলি ও পেয়ারা বাগানের গহীন অরণ্যে সিরাজ সিকদার গঠন করেন 'পূর্ব বাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী'। পেয়ারা বাগানের এই অঞ্চলটি ছিল প্রাকৃতিকভাবেই দুর্ভেদ্য, যা গেরিলা যুদ্ধের জন্য আদর্শ।
১৯৭১ সালের ১ থেকে ৩ জুন পেয়ারা বাগানে অনুষ্ঠিত হয় এক ঐতিহাসিক সম্মেলন। ৩রা জুন এই সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি'। কেন 'সর্বহারা' নাম? এর আগে প্রায় সব বামপন্থী দল 'কমিউনিস্ট পার্টি' শব্দবন্ধটি ব্যবহার করত। কিন্তু সিরাজ সিকদার চাইলেন এ দেশের প্রকৃত বঞ্চিত মানুষের পরিচয়টি সামনে আনতে। সেই সম্মেলনে উপস্থিত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফজলুল হক রানার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পেয়ারা বাগানে সেদিন লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।
একাত্তরের ত্রিভুজ লড়াই - পাকিস্তান, ভারত ও আওয়ামী লীগ
সর্বহারা পার্টির যুদ্ধকৌশল ছিল অত্যন্ত জটিল এবং সমকালীন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে ভিন্ন। তারা একই সাথে তিনটি পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছিল:
পাকিস্তান বাহিনী: যারা ছিল প্রকাশ্য শোষক ও গণহত্যাকারী।
ভারত: সিরাজ সিকদার ভারতকে 'আধিপত্যবাদী' শক্তি হিসেবে গণ্য করতেন এবং মনে করতেন ভারতের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করবে।
আওয়ামী লীগ: তাদের তিনি 'ভারতপন্থী বুর্জোয়া' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
এই কৌশলের কারণে সর্বহারা পার্টির গেরিলাদের শুধু পাকিস্তানি বাহিনীর সাথেই নয়, অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেও সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়েছে। সিরাজ সিকদারের গেরিলা বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি অনেক মুক্তিযোদ্ধাদেরও হত্যা করেছিল। এই 'ত্রিভুজ যুদ্ধ' বা বহুমুখী অবস্থানের কারণে সর্বহারা পার্টিকে অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। পাল্টা জবাবে ১৯৭১ সালের নভেম্বরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আদর্শিক পার্থক্যের কারণে বহু সর্বহারা পার্টির সদস্য আওয়ামী লীগ ঘরানার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রাণ হারান।
প্রথম মুক্তাঞ্চল ও গেরিলা অপারেশন
বরিশালের পেয়ারা বাগানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের 'প্রথম ঘাঁটি ও মুক্তাঞ্চল' হিসেবে দাবি করা হয়। সিরাজ সিকদারকে প্রধান করে একটি সর্বোচ্চ সামরিক পরিচালনামণ্ডলী গঠন করা হয়। তৎকালীন বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক রইসউদ্দিন আরিফ-এর মতে, সর্বহারা পার্টির গেরিলারা পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখত।
তারা বরিশাল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর অঞ্চলে সফল গেরিলা হামলা পরিচালনা করে। বিশেষ করে মানিকগঞ্জ, বিক্রমপুর ও পাবনায় তাদের শক্তিশালী ইউনিট ছিল। "পেয়ারা বাগান ছিল এক মুক্তভূমি, যেখানে পাকিস্তানি সেনারা সহজে ঢোকার সাহস পেত না। এটি ছিল বিপ্লবীদের এক নিরাপদ আশ্রয়।"
১৬ ডিসেম্বর - বিজয় দিবস না কি ‘কালো দিবস’?
একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জনের দিন। কিন্তু সিরাজ সিকদার ও তার সর্বহারা পার্টি এই দিনটিকে মেনে নিতে পারেনি। সিরাজ সিকদার ঘোষণা করেন, "পূর্ব বাংলার বীর জনগণ, আমাদের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি।" তাদের কাছে এটি ছিল 'ভারত কর্তৃক পূর্ব বাংলা দখলের কালো দিবস'।
১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর: যখন সারা দেশ বিজয় উল্লাসে মত্ত, তখন সর্বহারা পার্টি দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়।
১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর: টানা দুই দিনের হরতাল আহ্বান করে তারা বিজয় দিবসকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে।
ভাবা যায়, যে দেশটির স্বাধীনতার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হলো, সেই দেশেই একদল সশস্ত্র লোক বিজয়ের দিনকে 'কালো দিবস' বলছে? এই চরম ধৃষ্টতা প্রমাণ করে তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বেই বিশ্বাসী ছিল না।

থানা লুট ও পুলিশের ওপর হামলা - বিপ্লব না কি ডাকাতি?
সিরাজ সিকদারের তথাকথিত বিপ্লবের প্রধান অস্ত্র ছিল সরকারি স্থাপনা লুট করা। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের মধ্যে তার বাহিনী প্রায় ২৪টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং ব্যাংক লুট করে।
ঘটনার ধরণ | প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি |
থানা লুট | পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দুর্বল করা। |
পুলিশ হত্যা | শত শত পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। |
ব্যাংক ডাকাতি | সাধারণ মানুষের আমানত ও রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠন। |
অবকাঠামো ধ্বংস | মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে তিতাস গ্যাসের সেন্টার মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া। |
একজন মানুষ নিজেকে বিপ্লবী দাবি করে একটি স্বাধীন দেশে পুলিশকে নির্বিচারে হত্যা করছে এটি পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশের ইতিহাস সমর্থন করে না। তার এই কর্মকাণ্ড ছিল মূলত 'চরমপন্থী ডাকাতি'র নামান্তর।

নাশকতার নীল নকশা - রেলস্টেশন ও গ্যাস লাইনে হামলা
১৯৭৪ সালের হরতাল সফল করার নামে সিরাজ সিকদারের বাহিনী যে ধ্বংসাত্মক কাজ করেছিল, তা ছিল ভয়াবহ।
১. নাখালপাড়া রেললাইন ধ্বংস: ঢাকার নাখালপাড়ায় মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে।
২. গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও তারা বেশ কয়েকটি পত্রিকা ও ম্যাগাজিন অফিসে বোমা হামলা চালায়।
৩. নৌপথ অবরোধ: ফতুল্লায় নদীর ত্রিমোহনায় স্টিমার ও লঞ্চ আটকে দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম বিঘ্ন ঘটানো হয়।
এই ধরণের কর্মকাণ্ড কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হতে পারে না; এটি ছিল পরিষ্কার সন্ত্রাসবাদ।
'শ্রেণীশত্রু' খতমের নামে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড
সিরাজ সিকদারের রাজনীতির অন্যতম কালো দিক ছিল 'শ্রেণীশত্রু খতম'। এই স্লোগানের আড়ালে তিনি অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছেন। যারা তার মতাদর্শ মানতেন না, তাদেরকেই 'শ্রেণীশত্রু' তকমা দিয়ে তালিকাভুক্ত করে হত্যা করা হতো। এমনকি নিজের দলের ভেতরেও যাদের সাথে তার মতবিরোধ হতো, তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতে তিনি দ্বিধা করতেন না।
সর্বহারা পার্টির দলিলেই স্বীকার করা হয়েছে যে, তাদের অনেক ক্যাডার নিহত হয়েছে। কিন্তু সিরাজের নির্দেশে কতজন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, তার প্রকৃত হিসাব আজও অজানা। এই সংখ্যাটি যে বিশাল, তা তৎকালীন সময়ের সংবাদপত্রগুলো পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়।
মুজিববাহিনীর সাথে সর্বহারা পার্টির সংঘাত
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই সর্বহারা পার্টি অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায় যখন ভারত সরকারের সহায়তায় এবং প্রশিক্ষণে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। চীনপন্থী কমিউনিস্ট সর্বহারা পার্টি মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতাকে ভালভাবে নেয়নি।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। সর্বহারা পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য এবং বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অন্যতম নকশাকার সাইফুল্লাহ আজমীসহ পাঁচজন যোদ্ধাকে সাভারে পাঠানো হয়েছিল মুজিববাহিনীর সাথে একটি সমঝোতা বৈঠকের জন্য। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মুজিববাহিনী তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে।
কেন সর্বহারা পার্টির যোদ্ধারা নিহত হয়?
এই ঘটনাটি ছিল অনাকাঙ্খিত ও বিতর্কিত। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাস্তবতা, দলীয় বিভাজন ও পরবর্তী রাজনৈতিক বর্ণনার কারণে বিষয়টি বিতর্কিত ও বহুস্তরীয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে মুজিববাহিনী (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স – BLF), সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিয়মিত মুক্তিবাহিনী এবং বিভিন্ন স্থানীয় গেরিলা ইউনিট। সবাই একই শত্রু তথা পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকার আলবদরদের বিরুদ্ধে লড়লেও কমান্ড, আদর্শ ও রাজনৈতিক আনুগত্যে পার্থক্য ছিল।
সাইফুল্লাহ আজমীসহ পাঁচজন যোদ্ধা নিহত হওয়ার ঘটনাটি কেন ঘটে, ঐতিহাসিক মূল্যায়নে তার সম্ভাব্য কারণগুলো হলো:
কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণজনিত দ্বন্দ্ব: মুজিববাহিনী ছিল একটি স্বতন্ত্র কমান্ডের অধীনে পরিচালিত বাহিনী, যাদের সঙ্গে অনেক স্থানীয় গেরিলা বা অন্য গ্রুপের সমন্বয় ছিল না। অল্প সময়ে তৈরি হওয়া মুজিব বাহিনীতে কে কোন এলাকার দায়িত্বে এ নিয়ে বিভ্রান্তি ও শৃঙ্খলাবোধের অভাব ছিল।
ভুল পরিচয় বা সন্দেহ: কিছু গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, নিহত যোদ্ধাদের ভুল করে শত্রু তথা রাজাকার আলবদর কিংবা অননুমোদিত গ্রুপের সদস্য মনে করা হয়েছিল, অথবা তাদের ওপর বিশ্বাসঘাতকতা বা গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহ তৈরি হয়। যুদ্ধকালীন পরিবেশে এ ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত বহু জায়গায় ঘটেছে।
এই হত্যাকাণ্ডকে অনেক ইতিহাসবিদ “ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ” হিসেবে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে বা নিরপেক্ষ তদন্তে বিষয়টি কখনোই সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক কারণে অনেক ঘটনা নীরবতার আড়ালে থেকে গেছে।
এই হত্যাকান্ডের ঘটনার পর শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয়তাবাদী শক্তির সাথে চীনপন্থী কমিউনিস্ট সর্বহারা পার্টির সমস্ত ঐক্যের সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু বনাম সিরাজ সিকদার
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ঘৃন্য শক্তিগুলো সিরাজ সিকদারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। তারা সিরাজ সিকদারকে একজন নির্দোষ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, কোনো রাষ্ট্রই তার অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাতকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয় দেয় না।
বঙ্গবন্ধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। সেখানে সিরাজ সিকদারের মতো ব্যক্তিরা থানা লুট করে, মাইন দিয়ে গ্যাস লাইন উড়িয়ে দিয়ে এবং রক্ষীবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে দেশের শান্তি বিনষ্ট করছিল। তৎকালীন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেই সিরাজ সিকদার গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে পলায়নকালে নিহত হন। এটি ছিল একটি বিদ্রোহী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দমনের স্বাভাবিক পরিণতি।
সিরাজ সিকদারের গ্রেপ্তার ও মৃত্যু
১৯৭৪ সালে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে সিরাজ সিকদার আত্মগোপনে চলে যান। সিরাজ সিকদার তখন ছদ্মবেশে দেশজুড়ে সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সিরাজ সিকদার কোথায় গ্রেফতার হয়েছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসে নানা মত আছে:
অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের মতে: ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের টেকনাফ থেকে তিনি ধরা পড়েন।
অন্যান্য তথ্যসূত্র: কেউ বলেন চট্টগ্রামের হালিশহর, আবার কেউ বলেন নিউমার্কেট এলাকা থেকে ১৯৭৫ সালের ১লা জানুয়ারি গোয়েন্দারা তাকে ধরেন।
বলা হয়, গ্রেফতারকারী পুলিশ সদস্যরা প্রথমে জানতেনই না যে এই সাধারণ বেশধারী ব্যক্তিই দুর্ধর্ষ সিরাজ সিকদার। যখন তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়, তাকে দ্রুত বিমানে ঢাকায় আনা হয়।
১৯৭৫ সালের ২রা জানুয়ারি। সিরাজ সিকদারকে সাভারে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পথে বা শেরেবাংলা নগরে 'পালানোর সময়' পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন এমনটিই ছিল সরকারি ভাষ্য। কিন্তু প্রকৃত সত্য ছিল অন্যরকম।
জাকারিয়া চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় রমনা রেসকোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেখান থেকে গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে তাকে বিচারহীনভাবে হত্যা করা হয়। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস বলেন, সিরাজের ছোট বোন শামীম শিকদার তার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করেছিলেন।
ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় দুই কলামে শিরোনাম, 'গ্রেপ্তারের পর পলায়নকালে পুলিশের গুলিতে সিরাজ সিকদার নিহত'। দৈনিক বাংলার সংবাদ শিরোনাম ছিল 'সিরাজ সিকদার গ্রেপ্তার: পালাতে গিয়ে নিহত'।

তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকদের মতে পালানোর জন্য গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু এটাই স্বীকৃত। কারণ সিরাজ সিকদারের লম্বা অপরাধের তালিকার কারণে সে মৃত্যুদন্ডই প্রাপ্য ছিল। তার মাওবাদী তত্ত্ব তৎকালীন বুর্জোয়া রাজনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সিরাজ সিকদার এবং পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র সংগ্রাম, হত্যার চেষ্টা, অপহরণ এবং সন্ত্রাসবাদের মতো কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তি প্রযোজ্য। "ফৌজদারি দণ্ডবিধি, ১৮৬০" এর অধীনে হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (ধারা ৩০২) এবং হত্যার চেষ্টার জন্য ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড (ধারা ৩০৭) নির্ধারিত হতে পারে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ও রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য "সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯" এর অধীনে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। "অস্ত্র আইন, ১৮৭৮" অনুযায়ী বেআইনি অস্ত্র রাখার জন্য ৭ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অপহরণের জন্য "ফৌজদারি দণ্ডবিধি, ১৮৬০" এর অধীনে ৭ বছর থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে (ধারা ৩৬৩)।
একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী
বিষয় | বিবরণ |
পার্টি গঠন | ৩ জুন, ১৯৭১ |
প্রধান কেন্দ্র | পেয়ারা বাগান, বরিশাল |
প্রধান আদর্শ | মাওবাদ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব |
মৃত্যু তারিখ | ২ জানুয়ারি, ১৯৭৫ |
বিখ্যাত উক্তি | "কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?" (শেখ মুজিবের বিতর্কিত ভাষণ) |
কেন আজ সিরাজ সিকদারকে নিয়ে 'কুমিরের কান্নাকাটি'?
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, জামাত-শিবিরের মতো দলগুলো এখন সিরাজ সিকদারকে নিয়ে মায়াকান্না করে। অথচ সিরাজ সিকদার ছিলেন একজন উগ্র বামপন্থী নাস্তিক্যবাদী চেতনার মানুষ। আদর্শিকভাবে জামাতের সাথে তার কোনো মিল থাকার কথা নয়।
এর পেছনের কারণ মূলত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের অর্জনগুলোকে বিতর্কিত করতেই তারা একজন চরমপন্থী ডাকাতকে 'শহীদ' বানানোর অপচেষ্টা চালায়। এটি মূলত তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
উপসংহার
সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায়ের নাম। বিপ্লবের নামে রক্তপাত, লুণ্ঠন আর অরাজকতাই ছিল তার মূল পরিচিতি। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা কখনোই বীরত্ব হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এই সত্য তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।
সিরাজ সিকদারের তথাকথিত বীরত্বগাথা আসলে সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এক বিভীষিকা। তার কর্মকাণ্ডকে যারা আজ মহিমান্বিত করতে চায়, তারা মূলত বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা এবং স্বাধীনতারই বিরোধিতা করছে।
তথ্যসূত্র:
মহিউদ্দিন আহমদ, লাল সন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি, প্রথমা।
মাওইজম ইন বাংলাদেশ : দ্য কেস অব পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি, মো. নূরুল আমিন
মাস্কারেনহাস, এন্থনি; শাহজাহান, মোহাম্মদ (১৯৮৮)। বাংলাদেশঃ রক্তের ঋণ। হাক্কানি পাবলিশার্স।
মুনীর মোরশেদ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)। সিরাজ সিকদার ও পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি, ১৯৬৭-১৯৯২
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















