সিরাজ সিকদার - বিপ্লবের আড়ালে চরমপন্থা ও অশান্ত বাংলাদেশের সেই অধ্যায়
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। জাতি যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরে শুরু হয় এক চরম অস্থিরতা। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আদর্শিক রাজনীতির নামে সশস্ত্র পথে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারা। এই অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে যার নাম বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন সিরাজ সিকদার এবং তার নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্রের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাঙালির আত্মপ্রকাশ। কিন্তু স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য উদয়ের পর মুহূর্ত থেকেই নবজাত এই রাষ্ট্রটিকে পড়তে হয়েছিল এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি, পোড়ামাটি নীতিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং শূন্য রাজকোষ; অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আদর্শিক বিপ্লবের নামে উগ্র চরমপন্থা ও সশস্ত্র অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারা। এই অস্থিতিশীলতা, থানা লুট, ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশ হত্যা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কুখ্যাত প্রেক্ষাপটে যার নাম বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন সিরাজ সিকদার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি'।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা বিরোধী এবং একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানের বিশ্বস্ত গোলাম জামায়াতে ইসলামী ও আইএসআই এর মদদপুষ্ট পেইড এজেন্ট কিছু মহল সুপরিকল্পিতভাবে ইতিহাস বিকৃতির খেলায় মেতে উঠেছে। তারা সিরাজ সিকদারকে একজন 'বিপ্লবী মহানায়ক' বা 'ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো' হিসেবে পুনরুত্থাপিত করার চক্রান্ত চালাচ্ছে। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল, তৎকালীন সংবাদপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, বিপ্লবের লাল পতাকা ও মাওবাদী তত্ত্বের মোড়কে সিরাজ সিকদারের কর্মকাণ্ড ছিল মূলত চরমপন্থা, সশস্ত্র ডাকাতি, নিরীহ মানুষ হত্যা এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।
কে এই সিরাজ সিকদার? আদর্শ না কি চরমপন্থা?
উগ্র বামপন্থার পথ বেছে নেওয়ার আগে সিরাজ সিকদার ছিলেন একজন পেশাদার প্রকৌশলী। ১৯৪৪ সালে শরীয়তপুরের জাজিরায় জন্মগ্রহণকারী সিরাজ সিকদার তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বর্তমান বুয়েট) থেকে ১৯৬৭ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে তিনি যোগাযোগ ও ভবন নির্মাণ বিভাগে (CWD) প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও দ্রুতই সে পথ ত্যাগ করে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন।
পড়াশোনা শেষে তিনি বেছে নেন মাওবাদী বামপন্থী রাজনীতি। ১৯৬৮ সালে তিনি 'পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন' গঠন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি প্রচলিত নেতৃত্বের বাইরে থেকে আলাদাভাবে যুদ্ধ করার দাবি করেন। তবে স্বাধীনতার পর তার গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। তিনি সমাজতন্ত্র বা বিপ্লবের দোহাই দিয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
তার আদর্শ ছিল বন্দুকের নলই সকল শক্তির উৎস। আর এই শক্তির দাপট দেখাতে গিয়ে তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের জানমালের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন থেকে সর্বহারা পার্টি
ষাটের দশকে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ৬ দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলছিল, তখন ১৯৬৮ সালের ৮ই জানুয়ারি সিরাজ সিকদার প্রতিষ্ঠা করেন 'পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন'। তিনি ও তাঁর অনুসারীরা মনে করতেন, প্রথাসিদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন দিয়ে মুক্তি আসবে না; চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং মাও সেতুং-এর "বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস" তত্ত্ব অনুসরণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই কেবল পূর্ব বাংলা মুক্ত হতে পারে।
১৯৭০ সালে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচনের উত্তাপ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জোয়ার বইছিল, তখন সিরাজ সিকদারের দল বেছে নেয় নগর-সন্ত্রাসের পথ। ১৯৭০ সালের মে এবং অক্টোবর মাসে তাঁর ক্যাডাররা ঢাকার পাকিস্তান কাউন্সিল, জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো (BNR) ভবন এবং মার্কিন তথ্য কেন্দ্রে গোপন বোমাহামলা চালায়। অনেকেই এটিকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আঘাত হিসেবে বর্ণনা করতে চান; কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, গণতান্ত্রিক জনমত গঠন না করে বিচ্ছিন্ন বোমাহামলা চালিয়ে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা ছিল উগ্র চরমপন্থারই প্রাথমিক মহড়া।
পেয়ারা বাগানের সেই উত্তাল সর্বহারা পার্টির জন্ম
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে সারা দেশ প্রতিরোধ যুদ্ধে ফেটে পড়ে। এ সময় সিরাজ সিকদার বরিশালের দুর্গম পেয়ারা বাগান ও ভিমরুলি অঞ্চলে অবস্থান নেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭১, বরিশালের ভিমরুলি ও পেয়ারা বাগানের গহীন অরণ্যে সিরাজ সিকদার গঠন করেন 'পূর্ব বাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী'। ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরিশালের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সুবিশাল পেয়ারা বাগানটি ছিল খাল-বিল ও গহীন জঙ্গলে ঘেরা এক প্রাকৃতিক দুর্গ, যা গেরিলা কৌশলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল।
১৯৭১ সালের ১ থেকে ৩রা জুন পর্যন্ত পেয়ারা বাগানে একটি গোপন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ৩রা জুন এই সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি' এবং এই রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। চিরাচরিত বামপন্থী দলগুলো 'কমিউনিস্ট পার্টি' নাম ব্যবহার করলেও সিরাজ সিকদার 'সর্বহারা' শব্দটি বেছে নিয়েছিলেন সর্বহারা শ্রেণীকে আকর্ষণ করার জন্য। কিন্তু এই সম্মেলনেই সিরাজ সিকদার এমন একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গ্রহণ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের মূল ধারা থেকে তাঁর দলকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও বিদ্রোহী সংগঠনে পরিণত করে। সেই সম্মেলনে উপস্থিত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফজলুল হক রানার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পেয়ারা বাগানে সেদিন লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।
একাত্তরের ত্রিভুজ লড়াই - পাকিস্তান, ভারত ও আওয়ামী লীগ
মুক্তিযুদ্ধের সময় যেখানে সমগ্র বাঙালি জাতি কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, পুলিশ, বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে ঐক্যবদ্ধভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবনপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, সেখানে সিরাজ সিকদার উদ্ভাবন করেন এক অদ্ভুত ও ক্ষতিকর তত্ত্ব "ত্রিভুজ যুদ্ধ" (Three-Front War)।
সর্বহারা পার্টির যুদ্ধকৌশল ছিল অত্যন্ত জটিল এবং সমকালীন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে ভিন্ন। তারা একই সাথে তিনটি পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছিল:
১. পাকিস্তান বাহিনী: যারা ছিল প্রকাশ্য শোষক ও গণহত্যাকারী।
২. ভারত: সিরাজ সিকদার ভারতকে 'আধিপত্যবাদী' শক্তি হিসেবে গণ্য করতেন এবং মনে করতেন ভারতের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করবে।
৩. আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনী: যাদের তিনি 'ভারতের দালাল' ও 'বুর্জোয়া শ্রেণীশত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
এই 'ত্রিভুজ যুদ্ধ' নীতির ফল হয়েছিল মারাত্মক। সর্বহারা পার্টির সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি অনেক স্থানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মুক্তিবাহিনী ও স্থানীয় স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায় এবং তাঁদের অস্ত্র ছিনতাই করে।
এই কৌশলের কারণে সর্বহারা পার্টির গেরিলাদের শুধু পাকিস্তানি বাহিনীর সাথেই নয়, অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেও সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়েছে। সিরাজ সিকদারের গেরিলা বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি অনেক মুক্তিযোদ্ধাদেরও হত্যা করেছিল। এই 'ত্রিভুজ যুদ্ধ' বা বহুমুখী অবস্থানের কারণে সর্বহারা পার্টিকে অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। পাল্টা জবাবে ১৯৭১ সালের নভেম্বরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আদর্শিক পার্থক্যের কারণে বহু সর্বহারা পার্টির সদস্য আওয়ামী লীগ ঘরানার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রাণ হারান।
প্রথম মুক্তাঞ্চল ও গেরিলা অপারেশন
বরিশালের পেয়ারা বাগানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের 'প্রথম ঘাঁটি ও মুক্তাঞ্চল' হিসেবে দাবি করা হয়। সিরাজ সিকদারকে প্রধান করে একটি সর্বোচ্চ সামরিক পরিচালনামণ্ডলী গঠন করা হয়। তৎকালীন বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক রইসউদ্দিন আরিফ-এর মতে, সর্বহারা পার্টির গেরিলারা পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখত।
তারা বরিশাল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর অঞ্চলে সফল গেরিলা হামলা পরিচালনা করে। বিশেষ করে মানিকগঞ্জ, বিক্রমপুর ও পাবনায় তাদের শক্তিশালী ইউনিট ছিল। "পেয়ারা বাগান ছিল এক মুক্তভূমি, যেখানে পাকিস্তানি সেনারা সহজে ঢোকার সাহস পেত না। এটি ছিল বিপ্লবীদের এক নিরাপদ আশ্রয়।"
আগস্ট ১৯৭১: মুজিববাহিনীর সাথে সর্বহারা পার্টির যুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই সর্বহারা পার্টি অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায় যখন ভারত সরকারের সহায়তায় এবং প্রশিক্ষণে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। চীনপন্থী কমিউনিস্ট সর্বহারা পার্টি মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতাকে ভালভাবে নেয়নি।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সর্বহারা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশের প্রথম পতাকার অন্যতম রূপকার ও বিশিষ্ট বামপন্থী তাত্ত্বিক সাইফুল্লাহ আজমীসহ পাঁচজন কর্মীকে সাভারে পাঠানো হয়েছিল মুজিববাহিনীর (BLF) সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু রাজনৈতিক অবিশ্বাসের পরিবেশে মুজিববাহিনীর সাথে সর্বহারা পার্টির ক্যাডারদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে এবং সাইফুল্লাহ আজমীসহ পাঁচজন নিহত হন।
এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত প্রমাণ করে যে, সিরাজ সিকদারের উগ্র নীতি মুক্তিযুদ্ধের মতো এক মহাকাব্যিক জাতীয় আন্দোলনকে ভেতের থেকে দুর্বল করেছিল। শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের ভেতরের এই রক্তপাত একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক পরম বেদনাদায়ক অধ্যায়।
কেন সর্বহারা পার্টির যোদ্ধারা নিহত হয়?
এই ঘটনাটি ছিল অনাকাঙ্খিত ও বিতর্কিত। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাস্তবতা, দলীয় বিভাজন ও পরবর্তী রাজনৈতিক বর্ণনার কারণে বিষয়টি বিতর্কিত ও বহুস্তরীয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে মুজিববাহিনী (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স – BLF), সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিয়মিত মুক্তিবাহিনী এবং বিভিন্ন স্থানীয় গেরিলা ইউনিট। সবাই একই শত্রু তথা পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকার আলবদরদের বিরুদ্ধে লড়লেও কমান্ড, আদর্শ ও রাজনৈতিক আনুগত্যে পার্থক্য ছিল।
সাইফুল্লাহ আজমীসহ পাঁচজন যোদ্ধা নিহত হওয়ার ঘটনাটি কেন ঘটে, ঐতিহাসিক মূল্যায়নে তার সম্ভাব্য কারণগুলো হলো:
কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণজনিত দ্বন্দ্ব: মুজিববাহিনী ছিল একটি স্বতন্ত্র কমান্ডের অধীনে পরিচালিত বাহিনী, যাদের সঙ্গে অনেক স্থানীয় গেরিলা বা অন্য গ্রুপের সমন্বয় ছিল না। অল্প সময়ে তৈরি হওয়া মুজিব বাহিনীতে কে কোন এলাকার দায়িত্বে এ নিয়ে বিভ্রান্তি ও শৃঙ্খলাবোধের অভাব ছিল।
ভুল পরিচয় বা সন্দেহ: কিছু গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, নিহত যোদ্ধাদের ভুল করে শত্রু তথা রাজাকার আলবদর কিংবা অননুমোদিত গ্রুপের সদস্য মনে করা হয়েছিল, অথবা তাদের ওপর বিশ্বাসঘাতকতা বা গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহ তৈরি হয়। যুদ্ধকালীন পরিবেশে এ ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত বহু জায়গায় ঘটেছে।
এই হত্যাকাণ্ডকে অনেক ইতিহাসবিদ “ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ” হিসেবে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে বা নিরপেক্ষ তদন্তে বিষয়টি কখনোই সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক কারণে অনেক ঘটনা নীরবতার আড়ালে থেকে গেছে।
এই হত্যাকান্ডের ঘটনার পর শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয়তাবাদী শক্তির সাথে চীনপন্থী কমিউনিস্ট সর্বহারা পার্টির সমস্ত ঐক্যের সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়ে যায়।
১৬ই ডিসেম্বর: মহান বিজয় দিবসকে 'কালো দিবস' আখ্যা
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করল এবং সাড়ে সাত কোটি বাঙালি বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হলো, ঠিক তখনই সিরাজ সিকদার ও তাঁর সর্বহারা পার্টি বাঙালির এই পরম অর্জনকে অস্বীকার করে বসে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালির জাতীয় অস্তিত্বের প্রতীক। কিন্তু সিরাজ সিকদার ওই দিনই লিফলেট বিতরণ করে ঘোষণা করেন: "পূর্ব বাংলার বীর জনগণ, আমাদের সংগ্রাম শেষ হয়নি। ১৬ই ডিসেম্বর হলো ভারত কর্তৃক পূর্ব বাংলা দখলের কালো দিবস।"
১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর: যখন সারা দেশ প্রথম বিজয়ের বর্ষপূর্তি উদযাপনে মত্ত, তখন সর্বহারা পার্টি দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়।
১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর: বিজয়ের দিনে টানা দুই দিনের হরতাল আহ্বান করে তারা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করে।
যে স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিল, চার লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারালেন, সেই অর্জিত স্বাধীনতাকে 'পরাধীনতা' বলা এবং জাতীয় বিজয়ের দিনকে 'কালো দিবস' ঘোষণা করা কোনো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা হতে পারে না। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ও লাখো শহীদের রক্তের প্রতি এক চরম অবমাননা।

উগ্র সন্ত্রাসবাদ, থানা লুট ও ব্যাংক ডাকাতি: বিপ্লব নাকি সন্ত্রাস?
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে পুনর্গঠনে দিনরাত পরিশ্রম করছিল, তখন সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি বেছে নেয় ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসী পথ। তারা যুক্তি দিয়েছিল, বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে ফেলতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর হামলা চালাতে হবে।
সিরাজ সিকদারের তথাকথিত বিপ্লবের প্রধান অস্ত্র ছিল সরকারি স্থাপনা লুট করা। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের মধ্যে তার বাহিনী প্রায় ২৪টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং ব্যাংক লুট করে।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ২৪টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং আনসার ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। এসব হামলায় কর্তব্যরত শত শত নিরপরাধ পুলিশ ও আনসার সদস্য নিহত হন।
একজন স্বাধীন দেশের পুলিশ সদস্য যাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিলেন তাঁদের পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা কোনো বিপ্লব নয়, বরং তা পরিষ্কার 'খুন' ও 'সন্ত্রাসবাদ'।
ঘটনার ধরণ | প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি |
থানা লুট | পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দুর্বল করা। |
পুলিশ হত্যা | শত শত পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। |
ব্যাংক ডাকাতি | সাধারণ মানুষের আমানত ও রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠন। |
অবকাঠামো ধ্বংস | মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে তিতাস গ্যাসের সেন্টার মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া। |
একজন মানুষ নিজেকে বিপ্লবী দাবি করে একটি স্বাধীন দেশে পুলিশকে নির্বিচারে হত্যা করছে এটি পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশের ইতিহাস সমর্থন করে না। তার এই কর্মকাণ্ড ছিল মূলত 'চরমপন্থী ডাকাতি'র নামান্তর।

নাশকতার নীল নকশা - রেলস্টেশন ও গ্যাস লাইনে হামলা
১৯৭৪ সালের হরতাল সফল করার নামে সিরাজ সিকদারের বাহিনী যে ধ্বংসাত্মক কাজ করেছিল, তা ছিল ভয়াবহ। নিজের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিতে সিরাজ সিকদার একের পর এক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন:
১. নাখালপাড়া রেললাইনে মাইন বিস্ফোরণ: ঢাকার নাখালপাড়ায় ট্রেনের লাইন মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে মারাত্মক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে এবং সাধারণ যাত্রীদের জীবন বিপন্ন হয়।
২. তিতাস গ্যাস লাইন ধ্বংস: ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে তিতাস গ্যাসের প্রধান সাপ্লাই পাইপলাইনে মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে পুরো রাজধানী দীর্ঘ সময় গ্যাসহীন হয়ে পড়ে এবং শিল্প উৎপাদন স্তব্ধ হয়ে যায়।
৩. নৌপথ অবরোধ ও ফতুল্লায় হামলা: ফতুল্লায় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার মোহনায় লঞ্চ ও পণ্যবাহী স্টিমার আটকে দিয়ে সাধারণ মানুষের খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত করা হয়।
৪. গণমাধ্যমে বোমাহামলা: মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের কথা বললেও সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা তাদের সমালোচনা করে সংবাদ প্রকাশ করায় একাধিক পত্রিকা অফিসে বোমা হামলা চালায়।
এই ধরণের কর্মকাণ্ড কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হতে পারে না; এটি ছিল পরিষ্কার সন্ত্রাসবাদ।
'শ্রেণীশত্রু' খতমের নামে নির্বিচার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড
সিরাজ সিকদারের রাজনীতির অন্যতম কালো দিক ছিল 'শ্রেণীশত্রু খতম'। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের 'নকশালবাড়ী' আন্দোলনের নেতা চারু মজুমদারের উগ্র নীতি অনুসরণ করে সিরাজ সিকদার বাংলাদেশে প্রবর্তন করেন 'শ্রেণীশত্রু খতম' লাইন। এই লাইনের মূল কথা ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তথাকথিত জোতদার, ধনী কৃষক, সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে হবে।
'শ্রেণীশত্রু' তকমা দিয়ে সর্বহারা পার্টি গ্রামের বহু সাধারণ গৃহস্থ, স্কুলের শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নৃশংসভাবে গলা কেটে বা গুলি করে হত্যা করে। কোনো বিচার বা প্রমাণের সুযোগ ছিল না; সিরাজ সিকদার ও তাঁর আঞ্চলিক কমান্ডারদের গোপন নির্দেশে যে কাউকেই 'শ্রেণীশত্রু' ঘোষণা করে হত্যা করা হতো।
এমনকি নিজের দলের ভেতরেও যাদের সাথে তার মতবিরোধ হতো, তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতে তিনি দ্বিধা করতেন না। দলের ভেতরেও যদি কেউ সিরাজ সিকদারের একনায়কত্ব বা সামরিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলত, তাকে 'বিশ্বাসঘাতক' বা 'সংশোধনবাদী' আখ্যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো।
সর্বহারা পার্টির নিজস্ব নথিপত্রেই স্বীকার করা হয়েছে যে, তাদের বহু কর্মী দলের অভ্যন্তরীণ 'শুদ্ধি অভিযানে' প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের অনেক ক্যাডার নিহত হয়েছে। কিন্তু সিরাজের নির্দেশে কতজন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, তার প্রকৃত হিসাব আজও অজানা। এই সংখ্যাটি যে বিশাল, তা তৎকালীন সময়ের সংবাদপত্রগুলো পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়।
বঙ্গবন্ধু বনাম সিরাজ সিকদার
যেকোনো স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষাপটটি বিবেচনা করা যাক:
দেশ তখন সদ্য যুদ্ধ থেকে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খাদ্য সংকট ও ১৯৭৪ সালের বন্যা।
সীমান্তজুড়ে চোরাচালান ও খাদ্যাভাব।
এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে যদি একটি সশস্ত্র গোপন সংগঠন প্রকাশ্যে থানা লুট করে, মাইন দিয়ে ট্রেন ও গ্যাস লাইন উড়িয়ে দেয় এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে, তবে কোনো সার্বভৌম সরকার কি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে?
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ঘৃন্য শক্তিগুলো সিরাজ সিকদারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। তারা সিরাজ সিকদারকে একজন নির্দোষ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, কোনো রাষ্ট্রই তার অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাতকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয় দেয় না।
বঙ্গবন্ধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। সেখানে সিরাজ সিকদারের মতো ব্যক্তিরা থানা লুট করে, মাইন দিয়ে গ্যাস লাইন উড়িয়ে দিয়ে এবং রক্ষীবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে দেশের শান্তি বিনষ্ট করছিল। তৎকালীন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেই সিরাজ সিকদার গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে পলায়নকালে নিহত হন। এটি ছিল একটি বিদ্রোহী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দমনের স্বাভাবিক পরিণতি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার সর্বহারা পার্টিকে দমনে যেসব প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নেওয়া হয়নি; বরং তা ছিল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বাভাবিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা। একটি নতুন রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর হতে হয়েছিল।
সিরাজ সিকদারের গ্রেপ্তার ও মৃত্যু
১৯৭৪ সালের শেষদিকে দেশে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে সিরাজ সিকদার আত্মগোপনে চলে যান। সিরাজ সিকদার তখন ছদ্মবেশে আত্মগোপনে থেকে সারাদেশে নাশকতার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বা ১৯৭৫ সালের ১লা জানুয়ারি সিরাজ সিকদার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। তাঁর গ্রেফতারের স্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সামান্য মতভেদ রয়েছে।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের মতে: ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের টেকনাফ থেকে তিনি ধরা পড়েন।
অন্যান্য তথ্যসূত্র: কেউ বলেন চট্টগ্রামের হালিশহর, আবার কেউ বলেন নিউমার্কেট এলাকা থেকে ১৯৭৫ সালের ১লা জানুয়ারি গোয়েন্দারা তাকে ধরেন।
বলা হয়, গ্রেফতারকারী পুলিশ সদস্যরা প্রথমে জানতেনই না যে এই সাধারণ বেশধারী ব্যক্তিই দুর্ধর্ষ সিরাজ সিকদার। যখন তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়, তাকে দ্রুত বিমানে ঢাকায় আনা হয়।
সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর ঘটনা
১৯৭৫ সালের ২রা জানুয়ারি গভীর রাতে সাভারে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের কাছে অথবা শেরেবাংলা নগর এলাকায় পুলিশের একটি দল যখন সিরাজ সিকদারকে নিয়ে তাঁর গোপন অস্ত্রের ডিপো উদ্ধারে যাচ্ছিল, তখন তিনি গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে পালানোর চেষ্টা করেন।
পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তৎকালীন দৈনিক 'ইত্তেফাক' এবং 'দৈনিক বাংলা' পত্রিকার প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়:
"গ্রেপ্তারের পর পলায়নকালে পুলিশের গুলিতে সিরাজ সিকদার নিহত।"
সিরাজ সিকদারকে সাভারে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পথে বা শেরেবাংলা নগরে 'পালানোর সময়' পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন এমনটিই ছিল সরকারি ভাষ্য। পরবর্তীকালে এই মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হলেও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একজন সশাস্ত্র চরমপন্থী, যিনি ডজন ডজন হত্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার প্রধান আসামী ছিলেন, তাঁর সশস্ত্র পথই তাঁকে এই পরিণতিতে নিয়ে গিয়েছিল।
জাকারিয়া চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় রমনা রেসকোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেখান থেকে গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে তাকে বিচারহীনভাবে হত্যা করা হয়। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস বলেন, সিরাজের ছোট বোন শামীম শিকদার তার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করেছিলেন।
ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় দুই কলামে শিরোনাম, 'গ্রেপ্তারের পর পলায়নকালে পুলিশের গুলিতে সিরাজ সিকদার নিহত'।
দৈনিক বাংলার সংবাদ শিরোনাম ছিল 'সিরাজ সিকদার গ্রেপ্তার: পালাতে গিয়ে নিহত'।

প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে সিরাজ সিকদারের অপরাধ
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকদের মতে পালানোর জন্য গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু এটাই স্বীকৃত। কারণ সিরাজ সিকদারের লম্বা অপরাধের তালিকার কারণে সে মৃত্যুদন্ডই প্রাপ্য ছিল। তার মাওবাদী তত্ত্ব তৎকালীন বুর্জোয়া রাজনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।
বাংলাদেশের আইনের প্রয়োগ ঘটালে দেখা যাবে, সিরাজ সিকদারের কর্মকাণ্ড তৎকালীন ও বর্তমান কোনো আইনি কাঠামোর ভেতরেই বৈধ ছিল না:
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code, 1860):
ধারা ১২১ (রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা): সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির উন্মুক্ত সশস্ত্র বিদ্রোহ ও থানা লুট সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অপরাধ, যার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
ধারা ৩০২ (হত্যা) ও ৩০৭ (হত্যার চেষ্টা): পুলিশ সদস্য, সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে 'খতম'-এর নির্দেশের জন্য তিনি মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে দোষী।
ধারা ৩৯৫ ও ৩৯৭ (ডাকাতি ও খুনসহ ডাকাতি): ব্যাংক ও সরকারি ট্রেজারি লুট ডাকাতির আওতায় পড়ে।
অস্ত্র আইন, ১৮৭৮ (Arms Act, 1878): বেআইনি ভারী অস্ত্র ও বিস্ফোরক রাখা এবং ব্যবহারের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান।
সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির সার্বিক ইতিহাস (১৯৬৮-১৯৭৫)
সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক জীবন, সর্বহারা পার্টির গঠন এবং তাদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের একটি বিস্তারিত কালানুক্রমিক চিত্র নিচে সারণীবদ্ধ করা হলো:
সময়কাল / বছর | মূল ঘটনা ও কর্মসূচি | সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির ভূমিকা | রাষ্ট্র ও জনজীবনে এর ক্ষতিকর প্রভাব |
৮ জানুয়ারি, ১৯৬৮ | পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন গঠন | মাওবাদী আদর্শে উগ্র সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গড়ার গোপন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। | গণতান্ত্রিক রাজপথের আন্দোলনকে পেছনে ফেলে উগ্র পন্থার সূচনা। |
মে & অক্টোবর, ১৯৭০ | ঢাকায় প্রথম বোমাহামলা | পাকিস্তান কাউন্সিল, BNR ও আমেরিকান ইনফরমেশন সেন্টারে বিস্ফোরক হামলা। | সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি ও নগর-সন্ত্রাসের প্রবর্তন। |
৩ জুন, ১৯৭১ | সর্বহারা পার্টির আত্মপ্রকাশ | পেয়ারা বাগানে সম্মেলন করে 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি' নাম গ্রহণ। | মুক্তিসংগ্রামের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা সামরিক অবস্থান। |
আগস্ট, ১৯৭১ | সাভারে সাইফুল্লাহ আজমী হত্যা | 'ত্রিভুজ যুদ্ধ' লাইনের অধীনে মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনীর সাথে সংঘাত। | একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেই চরম ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাত ও বীর যোদ্ধাদের মৃত্যু। |
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | বিজয় দিবসকে 'কালো দিবস' ঘোষণা | অর্জিত স্বাধীনতাকে অস্বীকার এবং বাংলাদেশকে 'ভারতের উপনিবেশ' আখ্যা দান। | ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা। |
১৯৭২ – ১৯৭৪ | ২৪টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি লুট | বরিশাল, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও সাভারে থানা থেকে অস্ত্র লুট ও পুলিশ হত্যা। | আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম অবনতি ও পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভাঙার অপচেষ্টা। |
১৯৭৩ – ১৯৭৪ | জাতীয় অবকাঠামোয় বোমাহামলা | নাখালপাড়ায় রেললাইন বোমায় উড়ানো, মিরপুরে তিতাস গ্যাস লাইন ধ্বংস। | জনভোগান্তি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি। |
১৯৭৪ | 'শ্রেণীশত্রু খতম' কর্মসূচি | গ্রামবাংলায় শিক্ষক, জোতদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা। | গ্রামীণ সমাজে চরম আতঙ্ক ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি। |
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৪ | বিজয় দিবসে ২ দিনের হরতাল | বিজয়ের বর্ষপূর্তির দিন সারাদেশে উগ্র কর্মসূচি পালন ও লিফলেট বিতরণ। | দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার মূল চেতনার ওপর আঘাত। |
২ জানুয়ারি, ১৯৭৫ | সিরাজ সিকদারের গ্রেফতার ও মৃত্যু | টেকনাফ/হালিশহর থেকে গ্রেফতারের পর সাভারে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে নিহত। | বাংলাদেশে উগ্র সশস্ত্র মাওবাদী রাজনীতির প্রথম অধ্যায়ের যবনিকাপাত। |
কেন আজও সিরাজ সিকদারকে নিয়ে 'কুমিরের কান্নাকাটি'?
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও হাস্যকর রাজনৈতিক নাটক দেখা যায় যখন একাত্তরের পরাজিত শক্তি, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র (যেমন জামায়াত-শিবির ও তাদের সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরা) সিরাজ সিকদারকে নিয়ে মায়াকান্না শুরু করে!
সিরাজ সিকদার ছিলেন একজন উগ্র চেতনার নাস্তিকতাবাদী, মাওবাদী এবং ধর্মহীন সমাজতন্ত্রের সমর্থক। জামায়াত-শিবিরের ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনৈতিক দর্শনের সাথে সিরাজ সিকদারের আদর্শের দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না। বরং সিরাজ সিকদার ক্ষমতায় এলে সর্বাগ্রে এই ধর্মীয় মৌলবাদীদের ওপরই আঘাত হানতেন।
কেন এই ভণ্ডামি? তাহলে কেন আজ জামায়াত-শিবির ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী সিরাজ সিকদারকে 'শহীদ' বানাতে চায়? এর উত্তর অত্যন্ত পরিষ্কার:
১. বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার অপচেষ্টা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার কীভাবে একজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও থানা লুটকারীকে দমন করেছিল, সেটাকে 'স্বৈরাচারী পদক্ষেপ' হিসেবে উপস্থাপন করে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা।
২. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ঘোলাটে করা: একাত্তরের পরাজিত শক্তি নিজেদের মানবতাবিরোধী অপরাধের দাগ ঢাকতে সিরাজ সিকদারের মতো উগ্র চরমপন্থীদের 'বলির পাঁঠা' বানিয়ে ইতিহাসকে বিভ্রান্ত করতে চায়।
এটি মূলত তাদের গভীর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি পুরোনো বিদ্বেষেরই এক নতুন রূপ।
সিরাজ সিকদারের মতাদর্শিক ভিত্তি ও বৈপ্লবিক দর্শন
সিরাজ সিকদার বুয়েট (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে পাস করা প্রকৌশলী হলেও ছাত্রজীবন থেকেই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর চিন্তাধারার গভীর সমর্থক ছিলেন।
'নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব' (New Democratic Revolution): তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) একটি অর্ধ-সামন্ততান্ত্রিক ও অর্ধ-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। প্রথাসিদ্ধ সংসদীয় বা গণতান্ত্রিক নির্বাচন দিয়ে এ দেশের কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র কৃষি বিপ্লব এবং গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করার নীতি।
সংশোধনবাদের বিরোধিতা: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মূলধারার কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে (যেমন: মনি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি বা মোজাফফর আহমদের ন্যাপ) সিরাজ সিকদার 'সংশোধনবাদী' (Revisionist) এবং 'বুর্জোয়াদের দালাল' মনে করতেন। তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক বিপ্লব কেবল বন্দুকের নলের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে।
দলীয় প্রকাশনা: সর্বহারা পার্টির নিজস্ব দুটি গোপন মুখপত্র ছিল 'লালে ঝান্ডা' এবং 'স্ফুলিঙ্গ'। এই পত্রিকাগুলোতে সিরাজ সিকদার ছদ্মনামে (যেমন: 'কমরেড চ্যাটার্জী' বা 'ক্যাডার') তাঁর রাজনৈতিক তত্ত্ব, শ্রেণীশত্রু খতমের নির্দেশিকা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কৌশল প্রকাশ করতেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চীনপন্থী বামপন্থীদের বিভ্রান্তি
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণে চীন প্রকাশ্যে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে বাংলাদেশের তৎকালীন মাওবাদী ও চীনপন্থী বাম দলগুলো চরম আদর্শিক ও কৌশলগত সংকটে পড়ে।
অন্যান্য বাম দলের ভূমিকা: আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্শাল-লেলিনিস্ট) মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি 'দুই কুকুরের কামড়াকাড়ি' বা 'ভারতের চক্রান্ত' আখ্যা দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা পালন করে।
সিরাজ সিকদারের একক অবস্থান: সিরাজ সিকদার চীনের অবস্থানকে সরাসরি অন্ধভাবে অনুসরণ না করলেও 'ত্রিভুজ যুদ্ধ' নীতি গ্রহণ করেন। তিনি একদিকে পাকিস্তানি সেনাকে শত্রু মনে করতেন, অন্যদিকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের ভূমিকা গঠনমূলক মনে না করে তাঁদের বিরুদ্ধেও অস্ত্র তুলে নেন। এই চরমপন্থী কৌশলের কারণে সর্বহারা পার্টি তৎকালীন মূলধারার সর্বজনীন মুক্তিযুদ্ধে কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারেনি, বরং অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়িয়ে তুলেছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বহারা পার্টির নাশকতার বিন্যাস
১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ যখন এক কঠিন অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সর্বহারা পার্টি দেশজুড়ে এক সুসংগঠিত সশস্ত্র আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাডার ও গোপন সেল কাঠামো
পার্টি অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে 'কমিউনিটি সেল' এবং 'মিলিটারি স্কোয়াড' গঠন করে। সাধারণ ক্যাডাররা দিনের বেলা ছদ্মবেশে চলাফেরা করত এবং রাতে পরিচালিত হতো অপারেশন। ঢাকা, বরিশাল, ঝালকাঠি, মাদারীপুর, ফরিদপুর, পাবনা এবং মানিকগঞ্জ অঞ্চলে সর্বহারা পার্টির শক্ত সামরিক ঘাঁটি ছিল।
সশস্ত্র হামলা ও জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের তালিকা
থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা: ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে বরিশাল, মাদারীপুর, সাভার এবং পাবনার অন্তত ২৪টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়। এতে বহু পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারান।
অর্থনৈতিক খাত পঙ্গু করার কৌশল: ব্যাংক ডাকাতি, সরকারি তহবিল লুট এবং বিভিন্ন হাটে-বাজারে খাজনা আদায়কারীদের হত্যা করে পার্টির নিজস্ব 'বিপ্লবী তহবিল' গঠন করা হতো।
ভৌত অবকাঠামো বিস্ফোরণ: নাখালপাড়া রেললাইনে মাইন পুতে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত করা এবং মিরপুর ১০ নম্বরে তিতাস গ্যাসের প্রধান পাইপলাইন মাইন দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে রাজধানীতে জ্বালানি সংকট তৈরি করা ছিল তাদের অন্যতম প্রধান নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, রক্ষীবাহিনী ও জরুরি অবস্থা
সশস্ত্র অরাজকতা ও চরমপন্থা যখন জাতীয় নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে, তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার আইন শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা: ১৯৭২ সালে জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB) গঠনের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল যুদ্ধপরবর্তী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা এবং সিরাজ সিকদার ও জাসদ গণবাহিনীর মতো আন্ডারগ্রাউন্ড সশস্ত্র দলগুলোর চরমপন্থা দমন করা। বিশেষ করে বরিশালের পেয়ারা বাগান ও নদীমাতৃক অঞ্চলগুলোতে রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে সর্বহারা পার্টির বহু সশস্ত্র ক্যাডারকে গ্রেফতার ও তাদের আস্তানা ধ্বংস করে।
১৯৭৪ সালের জরুরি অবস্থা: ১৯৭৪ সালের শেষদিকে সারাদেশে চোরাচালান, দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি এবং সিরাজ সিকদারের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চরম আকার ধারণ করলে তৎকালীন সরকার দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। জরুরি ক্ষমতার বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযানে নামে।
সিরাজ সিকদারের গ্রেফতার, জাতীয় সংসদে ভাষণ ও ঐতিহাসিক বিতর্ক
১৯৭৫ সালের ১লা জানুয়ারি সিরাজ সিকদার গ্রেফতার হন। তবে তাঁর গ্রেফতারের পর ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়।
গ্রেফতারের স্থান ও ঢাকা আনয়ন: তৎকালীন বিভিন্ন নথি ও গবেষণা গ্রন্থ (যেমন: অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের 'Bangladesh: A Legacy of Blood') অনুযায়ী, সিরাজ সিকদারকে চট্টগ্রাম (মতান্তরে টেকনাফ) থেকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ প্রথমাংশে তাঁর আসল পরিচয় না জানলেও অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে দ্রুত ফ্লাইটে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকার রমনা পুলিশ কন্ট্রোল রুমে তাঁকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জাতীয় সংসদে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য: সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদে দেওয়া এক ভাষণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান উগ্র চরমপন্থা ও রাষ্ট্রদ্রোহের পরিণতি নির্দেশ করতে গিয়ে একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন "কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?"
এই বাক্যটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নানা বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করলেও, বক্তৃতার মূল বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে ধরা সন্ত্রাসীদের প্রতি একটি কঠোর রাজনৈতিক বার্তা যার অর্থ ছিল, রাষ্ট্রের মূলভিত্তিতে আঘাত হেনে কোনো উগ্র সন্ত্রাসী টিকতে পারে না।
সিরাজ সিকদার-পরবর্তী সর্বহারা পার্টির ভাঙন ও অবক্ষয়
১৯৭৫ সালে সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর সর্বহারা পার্টি চরম নেতৃত্ব সংকটে পড়ে এবং আদর্শিক অবস্থান হারিয়ে বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়ে।
বিপ্লব থেকে অপরাধ জগতে রূপান্তর: ৮০ ও ৯০-এর দশকে সর্বহারা পার্টির অবশিষ্ট দলগুলো বিপ্লবী মাওবাদী আদর্শ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। তারা বরিশাল, রাজবাড়ী, পাবনা, খুলনা ও পিরোজপুর অঞ্চলে কেবল আঞ্চলিক ডাকাত দল, চাঁদাবাজ ও পেশাদার ঘাতক বাহিনীতে রূপ নেয়।
আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া: ১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাবনা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শত শত সর্বহারা ক্যাডার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। পরবর্তীতে ২০১৯ ও ২০২০ সালেও একাধিক দফায় পাবনায় আঞ্চলিক সর্বহারা পার্টির সদস্যরা আলোর পথে ফেরার জন্য আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বন্দুকের নলে গঠিত সিরাজ সিকদারের সেই তথাকথিত 'বিপ্লবী পার্টি' দিনশেষে সাধারণ অপরাধী চক্রে পরিণত হয়ে বিলুপ্তির পথে হেঁটেছে।
সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির সার্বিক মূল্যায়ন
ইতিহাসের নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে সিরাজ সিকদার ও তাঁর সর্বহারা পার্টি সম্পর্কে কয়েকটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসা যায়:
১. উগ্র রাজনৈতিক ভুল কৌশল: সিরাজ সিকদার ব্যক্তিগত জীবনে মেধাবী প্রকৌশলী হলেও তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ছিল চরম বাস্তবতাবর্জিত ও দেশের জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীত। মুক্তিযুদ্ধের মতো এক রক্তক্ষয়ী জাতীয় সংগ্রামকে অস্বীকার করা এবং অর্জিত বিজয় দিবসকে 'কালো দিবস' বলা তাঁর গভীর আদর্শিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে।
২. গণতন্ত্রের বদলে নৈরাজ্যবাদ: স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উপায়ে বা গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতির চর্চা না করে, থানা লুট করা, পুলিশ হত্যা করা এবং মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস করার পথ বেছে নিয়ে তিনি একজন রাজনৈতিক নেতার বদলে চরমপন্থী নাশকতাহারী হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়েছেন।
৩. আইনের দৃষ্টিতে অপরাধের মাত্রা: ফৌজদারি দণ্ডবিধি (Penal Code) এবং অস্ত্র আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশ হত্যা এবং বিস্ফোরক ব্যবহারের দায়ে সিরাজ সিকদার ও তাঁর দলের অপরাধসমূহ ছিল সর্বোচ্চ দণ্ডযোগ্য।
ইতিহাস কারো অনুকম্পা বোঝে না
সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় কোনো বীরত্বের নাম নয়; তিনি উগ্র অ্যাডভেঞ্চারিজম, অদূরদর্শী বিপ্লব এবং স্বজাতিহননের এক করুণ ও অন্ধকার অধ্যায়ের প্রতীক।
একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়া, বিজয়ের দিনকে 'কালো দিবস' বলা, দেশের পুলিশকে হত্যা করা, রেললাইন ও গ্যাস পাইপলাইন উড়িয়ে দেওয়া এবং 'শ্রেণীশত্রু'র নামে নিজের দেশের শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা কখনো বিপ্লব হতে পারে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইনি পরিভাষায় এটি পরিষ্কার 'উগ্র সন্ত্রাসবাদ'।
আজ যারা ইতিহাসকে বিকৃত করে সিরাজ সিকদারের হাতে রক্তের দাগ মুছে তাকে 'নায়ক' বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে, তারা মূলত বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনারই বিরোধিতা করছে। সিরাজ সিকদারের তথাকথিত রোমান্টিক বিপ্লবগাথা আসলে সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এক বিভীষিকা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এই সত্য নির্মোহভাবে তুলে ধরা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব—যাতে আর কোনো উগ্র চরমপন্থা বিপ্লবের নামে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে না পারে।
তথ্যসূত্র:
মহিউদ্দিন আহমদ, লাল সন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি, প্রথমা।
মাওইজম ইন বাংলাদেশ : দ্য কেস অব পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি, মো. নূরুল আমিন
মাস্কারেনহাস, এন্থনি; শাহজাহান, মোহাম্মদ (১৯৮৮)। বাংলাদেশঃ রক্তের ঋণ। হাক্কানি পাবলিশার্স।
মুনীর মোরশেদ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)। সিরাজ সিকদার ও পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি, ১৯৬৭-১৯৯২















