সিপাহী-জনতার বিপ্লব - ইতিহাস ও সংবাদপত্রের পাতায় ৭ই নভেম্বর
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তপিচ্ছিল ইতিহাসের অন্যতম জটিল, নাটকীয় এবং গতিপথ নির্ধারণী একটি দিন। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সংঘটিত কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সামরিক ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির পর এই ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান যাকে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’, ‘জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব’ কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা হত্যা দিবস’ হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাখ্যা করে থাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা, সংবিধানের ধারা এবং পররাষ্ট্রনীতির সমীকরণকে রাতারাতি বদলে দিয়েছিল।

TruthBangla

১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তপিচ্ছিল ইতিহাসের অন্যতম জটিল, নাটকীয় এবং গতিপথ নির্ধারণী একটি দিন। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সংঘটিত কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সামরিক ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির পর এই ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান যাকে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’, ‘জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব’ কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা হত্যা দিবস’ হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাখ্যা করে থাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা, সংবিধানের ধারা এবং পররাষ্ট্রনীতির সমীকরণকে রাতারাতি বদলে দিয়েছিল।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল, ৩রা নভেম্বর এবং পরবর্তীতে ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান তা এক চরম পরিণতিতে নিয়ে যায়। ৭ই নভেম্বরের এই বিপ্লবের মূল নেপথ্য কারিগর ছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) গণবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরের গোপন সংগঠন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এবং তাদের তাত্ত্বিক নেতা কর্নেল (অব.) আবু তাহের (বীর উত্তম)। কিন্তু এই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফল ও রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গিয়ে পৌঁছায় তৎকালীন গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হওয়া সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) হাতে।
ইতিহাসের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তৎকালীন তথ্য নিয়ন্ত্রিত সামরিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ৭ই নভেম্বরের রক্তঝরা রাতের পরদিন, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৮ই নভেম্বর প্রকাশিত প্রধান প্রধান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের পাতায় কীভাবে চিত্রিত হয়েছিল এই ভূ-রাজনৈতিক আলোড়ন? কীভাবে রাজপথের উল্লাস, জেনারেল জিয়ার উত্থান, কিংবা খালেদ মোশাররফের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর স্থান পেয়েছিল বা চেপে যাওয়া হয়েছিল? তৎকালীন ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, রাজনীতির গোপন সমীকরণ এবং ৮ই নভেম্বরের সংবাদপত্রের আর্কাইভ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক সত্যকে বিস্তারিতভাবে উদ্ঘাটন করা হলো।
অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থান: ১৫ই আগস্ট থেকে ৩রা নভেম্বর
৭ই নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে অনুধাবন করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের প্রাক্কালে। ১৫ই আগস্ট একদল সুনির্দিষ্ট জুনিয়র সামরিক কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসায়। তবে বঙ্গভবনে অবস্থানরত ঘাতক জুনিয়র সেনা কর্মকর্তারা (মেজর ফারুক, মেজর রশিদ প্রমুখ) সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করে দেশ চালাতে শুরু করে।
সেনাবাহিনীর এই শৃঙ্খলাহীনতা এবং শাসনব্যবস্থার নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের বীর প্রতীক ও সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) খালেদ মোশাররফ এবং ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার আকবর হোসেন ও শাফায়াত জামিলরা সেনাবাহিনীর সুশৃঙ্খল কাঠামো ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন।
৩রা নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী পাল্টা-অভ্যুত্থান
১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সফল পাল্টা-অভ্যুত্থান (Counter-Coup) সংগঠিত হয়। এই অভ্যুত্থানের প্রথম পদক্ষেপেই তৎকালীন সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর সরকারি বাসভবনে (ক্যান্টনমেন্টের ২৮ নম্বর সড়ক) গৃহবন্দি করা হয়। খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন এবং মোশতাক সরকারকে চাপে ফেলে বঙ্গভবন থেকে ১৫ই আগস্টের ঘাতক চক্রকে দেশত্যাগে বাধ্য করেন। ৩রা নভেম্বর গভীর রাতে ঘাতক চক্রটি বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পালিয়ে যায়।
কিন্তু ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থান যখন সফলতার মুখ দেখছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে এক অভূতপূর্ব নির্মমতার সাক্ষী হয় জাতি। ৩রা নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা স্বাধীন মুজিবনগর সরকারের স্থপতি ও জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে নির্মমভাবে গুলি ও বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ড এবং খালেদ মোশাররফের সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে ঢাকা সেনানিবাসসহ সারাদেশে নানা ধরনের অপপ্রচার ও গুজবের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হতে থাকে।
ক্যান্টনমেন্টে গুজবের দাবানল ও সিপাহী বিদ্রোহের প্রস্তুতি
৩রা নভেম্বর থেকে ৬ই নভেম্বরের মধ্যে ঢাকা সেনানিবাসে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। খালেদ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানটি ছিল মূলত অফিসারদের তৈরি প্রথাগত ক্যু, যার সাথে সাধারণ সৈনিক বা সিপাহীদের কোনো মানসিক সংযোগ ছিল না। খালেদ মোশাররফের মাতা এবং ভাই আওয়ামী লীগের মিছিলে অংশ নেওয়ায় এবং তাঁর এই পদক্ষেপে ভারতের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে এমন এক প্রচারণাকে উসকে দিয়ে ব্যারাকে ব্যারাকে এক ভয়াবহ গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ভারতীয় এজেন্টের তকমা ও জাসদীয় রাজনীতি
সেনানিবাসের ভেতরে পাকিস্তানফেরত ও অসন্তুষ্ট সেনা জওয়ানদের মধ্যে জোর গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে খালেদ মোশাররফ এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের উপ-অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার (বীর উত্তম) নাকি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে সমর্পণ করতে যাচ্ছেন। এই প্রোপাগান্ডা সাধারণ প্রথাগত দেশপ্রেমিক সৈনিকদের চরম উত্তেজিত করে তোলে।
অন্যদিকে, ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া জাসদের নেতা কর্নেল (অব.) আবু তাহের দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীতে একটি বৈপ্লবিক কাঠামো গড়ে তুলছিলেন। তাঁর নিয়ন্ত্রিত ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সাধারণ সৈনিকদের কাছে ১২-দফা দাবি সংবলিত লিফলেট বিতরণ করে। এই দাবিগুলোর মধ্যে ছিল:
শ্রেণিমুক্ত সেনাবাহিনী গঠন এবং অফিসারদের বিশেষ সুবিধা বাতিল করা।
সাধারণ সৈনিকদের মধ্য থেকে অফিসার পদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।
রাজবন্দিদের মুক্তি এবং জিয়াউর রহমানের মতো 'দেশপ্রেমিক' সেনাপতিকে মুক্ত করে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানো।
কর্নেল তাহের এবং জাসদ নেতৃত্বের ধারণা ছিল, তারা সামরিক শৃঙ্খলা ভেঙে একটি প্রসংগঠিত ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ ঘটাবেন এবং জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে মূলত জাসদের বামপন্থী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন।
৭ই নভেম্বর রাতের রক্তক্ষয় ও ঘটনার পট পরিবর্তন
১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর রাত ১২টা বাজার পরপরই (৭ই নভেম্বরের প্রথম প্রহরে) ঢাকা সেনানিবাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে অনবরত গোলাগুলির শব্দে। ব্যারাক থেকে শত শত সৈনিক অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র বের করে রাস্তায় নেমে আসে। সেনানিবাসের ভেতর থেকে স্লোগান ওঠে: "নিল ডাউন, নিল ডাউন! সূবেদার থেকে সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই!" এবং "নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার, সিপাহী-জনতা জিন্দাবাদ!"
জিয়াউর রহমানের মুক্তি ও সাভারের পথে খালেদ মোশাররফ
সিপাহীদের একটি দল দ্রুত গতিতে ২৮ নম্বর সড়কে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের বাসভবনে পৌঁছে যায়। তাঁকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে উল্লাসে মেতে ওঠে সৈনিকেরা। সিপাহীরা জিয়াউর রহমানকে কাঁধে তুলে নিয়ে ফিল্ড আর্টিলারি হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে, অভ্যুত্থানের ভয়াবহতা এবং নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কথা বুঝতে পেরে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের মিত্রদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরায় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার এবং কর্নেল নাজমুল হুদা (বীর বিক্রম) নিজেদের প্রাণরক্ষার্থে ছদ্মবেশে বঙ্গভবন ত্যাগ করে শেরেবাংলা নগরে অবস্থানরত ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তরের দিকে রওনা হন।
১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা ততক্ষণে কর্নেল তাহেরের প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সকালে যখন খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সঙ্গীরা সেখানে পৌঁছান, তখন উত্তেজিত সৈনিকেরা তাঁদের আটক করে। সামরিক চেইন অব কমান্ড ভঙ্গের সেই উত্তাল মুহূর্তে কোনো এক অজ্ঞাত আদেশে কিছু অনিয়ন্ত্রিত সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকের হাতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, লে. কর্নেল এটিএম হায়দার এবং কর্নেল নাজমুল হুদাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের এই তিন প্রখ্যাত বীর সেনানী ও বীর বিক্রমদের মরদেহ শেরেবাংলা নগরের মাটিতে ফেলে রাখা হয়, যা পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার জন্য ছিল এক চরম বিভীষিকাময় দৃশ্য।
৮ই নভেম্বর ১৯৭৫: সংবাদপত্রের পাতায় সিপাহী-জনতার বিপ্লব
৭ই নভেম্বরের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পরদিন, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৮ই নভেম্বর শনিবার সকালে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্রগুলো ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং তথ্যের দিক থেকে চরম নিয়ন্ত্রিত ও একপাক্ষিক। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক সেন্সরশিপ এবং পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের কারণে সেদিন পত্রিকাগুলোর প্রধান পাতায় প্রকাশিত সংবাদের ধরন ও ভাষা ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া।
তৎকালীন সময়ের প্রধান চারটি দেশীয় সংবাদপত্র (দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, দৈনিক সংবাদ, দ্য বাংলাদেশ অবজারভার) এবং ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার (দৈনিক যুগান্তর) ১ম পাতার বিস্তারিত কভারেজ বিশ্লেষণ করা হলো:

দৈনিক ইত্তেফাক: ‘সংশয় ও দুঃস্বপ্ন অতিক্রম করিয়া’
১৯৭৫ সালের ৮ই নভেম্বর শনিবার 'দৈনিক ইত্তেফাক' পত্রিকাটি অত্যন্ত আবেগময় ও রাজনৈতিক রূপকে তাদের প্রধান খবরের শিরোনাম সাজায়। ইত্তেফাকের প্রথম পাতার মূল খবরের শিরোনাম ছিল: ‘নয়া প্রধান বিচারপতির শপথ গ্রহণ’, ‘রব-জলিলসহ পাঁচ জনকে মুক্তির নির্দেশ’, এবং অতি পরিচিত ভাষাতাত্ত্বিক সম্পাদকীয় কলাম: ‘সংশয় ও দুঃস্বপ্ন অতিক্রম করিয়া’।
ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিবেদনে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে লেখা হয়:
"…সকল সংশয় দ্বিধা আর আচ্ছন্নতার মেঘ অতিক্রম করিয়া গত শুক্রবার বাঙালি জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব বিজয় সূচিত হইয়াছে। এই বিজয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল দলিলে জনতার প্রাণের অর্ঘ্য দিয়ে লেখা হইলো বাংলার বীর সেনানীর নাম। আর দলিলের শিরোনামে শোভা পাইল একটি নাম জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম পিএসসি-একটি প্রিয় ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব।…কিন্তু বাংলার দেশপ্রেমিক সিপাহীরা গত শুক্রবার প্রভাতে সকল চক্রান্তের অবসান ঘটাইয়া তাহাদের প্রিয় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন এবং তাহাকে স্বীয় পদে বহাল করেন।"
ইত্তেফাক তৎকালীন সিপাহীদের রাজপথের উল্লাস এবং জিয়াউর রহমানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার দৃশ্যটিকে ‘জাতীয় মুক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
দৈনিক বাংলা: ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার বিপ্লব’
তৎকালীন সরকারি মালিকানাধীন ও বহুল প্রচারিত 'দৈনিক বাংলা' পত্রিকার ৮ই নভেম্বরের প্রথম পাতাটি ছিল সম্পূর্ণভাবে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও সিপাহী জনতার বিপ্লবকে কেন্দ্র করে তৈরি। দৈনিক বাংলার ব্যানার হেডলাইন (প্রধান শিরোনাম) ছিল:
জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার বিপ্লব
শিরোনামের ঠিক নিচেই লেখা হয়েছিল: "মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহী ও জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব সফল হয়েছে।"
দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় যেসব গুরুত্বপূর্ন সংবাদগুলো স্থান পেয়েছিল:
‘আমি জিয়া বলছি’: ৭ই নভেম্বর রেডিওতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক বেতার ভাষণটি হুবহু প্রথম পাতায় ছাপা হয়। সেখানে তিনি জনগণকে শান্ত থাকার এবং স্ব স্ব দায়িত্বে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ (সম্পাদকীয়): প্রথম পাতায় ছাপা এই বিশেষ অনুলিপিতে লেখা হয়- "সশস্ত্রবাহিনী এবং জনগণের ইচ্ছায় সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্বের সঙ্গে সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক শাসনকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন জেনারেল জিয়া।"
অন্যান্য শিরোনাম: ‘রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রধান সামরিক কর্মকর্তা’, ‘উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে’, ‘সম্ভব হলে ৭৭-এর ফেব্রুয়ারির আগে নির্বাচন’, ‘এক্ষণে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্দলীয় ব্যক্তির প্রয়োজন: মোশতাক’।
রাজপথে সাধারণ জনতার সাথে সৈনিকদের ট্যাংক ও জিকে চেপে ‘সিপাহী-জনতা জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়ার রঙিন বিবরণ তুলে ধরেছিল পত্রিকাটির নিজস্ব প্রতিবেদক।

দৈনিক সংবাদ: ‘সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠিত’
বামপন্থী ও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গির সংবাদপত্র ‘দৈনিক সংবাদ’ ৮ই নভেম্বরের সংস্করণে বেশ কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রশাসনিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদের প্রধান শিরোনাম ছিল:
সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠিত
সংবাদের সাব-হেডলাইনে বিস্তারিত লেখা হয় যে নতুন সামরিক কাঠামো অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বয়ং প্রধান সামরিক শাসনকর্তা (CMLA) হবেন, তিন বাহিনীর প্রধানগণ উপ-প্রধান সামরিক শাসনকর্তা (DCMLA) হবেন এবং ৪ জন আঞ্চলিক প্রশাসকের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।
দৈনিক সংবাদে জাতির উদ্দেশ্যে খন্দকার মোশতাক আহমদের বিদায়ি ভাষণকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন “দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমিকে হায়েনার আক্রমণ থেকে প্রতিরক্ষা করতে হবে।” এছাড়া ঢাকার রাজপথে জনতার ফুল ছিটিয়ে সৈনিকদের অভিবাদন জানানোর দৃশ্য সংবাদে চিত্রায়িত করা হয়েছিল।

দ্য বাংলাদেশ অবজারভার (The Bangladesh Observer): 'President Sayem Becomes CMLA'
দেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য বাংলাদেশ অবজারভার’ ৮ই নভেম্বর তাদের প্রথম পাতায় সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রটোকলভিত্তিক শিরোনাম দিয়ে খবর প্রকাশ করে। ইংরেজি ভাষার এই পত্রিকার মূল শিরোনাম ছিল:
PRESIDENT SAYEM BECOMES CMLA
অবজারভারের খবরে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছিল খন্দকার মোশতাকের বঙ্গভবন ত্যাগের ঘটনা এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রধান বিচারপতি এ. এস. এম. সায়েমের শপথ গ্রহণের ওপর। পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকায় সামরিক উল্লাসের মুখে বেশ কিছু বিশৃঙ্খলা ঘটেছিল এবং উল্লাসে অংশ নিতে গিয়ে দুর্ঘটনায় অন্তত ২৭ জন সাধারণ নাগরিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

দৈনিক যুগান্তর (কলকাতা, ভারত): ‘ঢাকার ঘটনায় ইন্দিরা উদ্বিগ্ন’
বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় প্রকাশিত তৎকালীন প্রখ্যাত পত্রিকা ‘দৈনিক যুগান্তর’ ৮ই নভেম্বরের প্রথম পাতায় অত্যন্ত উদ্বেগ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সাথে বাংলাদেশের ঘটনা প্রবাহের খবর প্রকাশ করে। তাদের ব্যানার শিরোনাম ছিল:
বাংলাদেশের ঘটনায় ভারত নির্বিকার থাকতে পারে না - সরকারী মুখপাত্র
যুগান্তরের খবরে স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল যে, ভারত ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যুকে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখেছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এই টালমাটাল পরিস্থিতি ও সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ভারতীয় পত্রিকাটি জোর দিয়ে দাবি করতে চেয়েছিল যে রাষ্ট্রক্ষমতা জেনারেল জিয়ার হাতে নয়, বরং রাষ্ট্রপতি সায়েমের অধীনেই রয়েছে।
পাঁচ প্রধান সংবাদপত্রের কভারেজের তুলনামূলক সারসংক্ষেপ
১৯৭৫ সালের ৮ই নভেম্বর প্রকাশিত দেশি ও বিদেশি প্রধান পাঁচটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতার সংবাদ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক বার্তার একটি সারসংক্ষেপ নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
সংবাদপত্রের নাম | প্রকাশের ধরন ও স্থান | প্রধান শিরোনাম (Headline) | পত্রিকার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও টোন | ৮ই নভেম্বরের খবরে উপেক্ষিত বা গোপন রাখা বিষয় |
দৈনিক ইত্তেফাক | জাতীয় দৈনিক, ঢাকা | সংশয় ও দুঃস্বপ্ন অতিক্রম করিয়া | পূর্ণ জিয়া-বান্ধব; অভ্যুত্থানকে জাতীয় মুক্তি ও স্বস্তির প্রতীক হিসেবে চিত্রায়ন। | খালেদ মোশাররফ ও এটিএম হায়দারের হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি অনুপস্থিত। |
দৈনিক বাংলা | সরকারি দৈনিক, ঢাকা | জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার বিপ্লব | জিয়াউর রহমানকে বিপ্লবের একক নায়ক হিসেবে উপস্থাপন; 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' নীতি গ্রহণ। | অভ্যুত্থানের পেছনের মূল সংগঠক জাসদ বা কর্নেল তাহেরের ভূমিকা গোপন। |
দৈনিক সংবাদ | স্বাধীন/বামপন্থী, ঢাকা | সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠিত | আইনি ও প্রশাসনিক রদবদলকে প্রাধান্য; কিছুটা বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনার চেষ্টা। | সেনাক্যাম্পে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ভয়াবহতা অনুলিখিত। |
দ্য বাংলাদেশ অবজারভার | ইংরেজি দৈনিক, ঢাকা | President Sayem Becomes CMLA | প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মমাফিক ইংরেজি কভারেজ; আইনশৃঙ্খলা ও প্রটোকল কেন্দ্রিক। | ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের বিশৃঙ্খলা ও অফিসারের প্রাণহানির খবর আড়াল। |
দৈনিক যুগান্তর | ভারতীয় দৈনিক, কলকাতা | বাংলাদেশের ঘটনায় ভারত নির্বিকার থাকতে পারে না | গভীর ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ; ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিক্রিয়া এবং জিয়ার ক্ষমতার বিরোধিতা। | সিপাহী-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে 'সংঘর্ষ' হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা। |
৭ নভেম্বর: তিন দৃষ্টিভঙ্গি ও এক রক্তাক্ত বাস্তবতা
প্রতিবছর ৭ই নভেম্বরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয় জাসদের ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’, বিএনপির ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ এবং নিহতদের স্বজনদের দৃষ্টিতে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’। ইতিহাসবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান ছিল, যেখানে ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং ৩ নভেম্বরের জেলহত্যার ধারাবাহিকতায় দেশের সূর্যসন্তান বহু মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন (ইতিহাসবিদ): "ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে ৭ নভেম্বর মানেই 'মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস'। রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই এই ঘটনার মূল পটভূমি তৈরি করেছিল। এটি কোনো বিপ্লব বা সংহতি দিবস নয়।"
মেজর জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রশীদ (সামরিক বিশেষজ্ঞ): "রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্যই এই দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর নাম দেওয়া হয়েছে। মূলত সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করাই ছিল ঘাতক চক্রের লক্ষ্য।"
"জাসদের মতাদর্শী 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' সামরিক বাহিনীর ভেতরে একটি বিভাজন তৈরি করেছিল এবং 'উত্তেজনা ছড়াতে বলা হয়েছিল সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই।' পরবর্তীতে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে কর্নেল তাহেরসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়।"
৪৭ বছরের অবিচার ও স্বজনদের ক্ষোভ
৭ই নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান রাখা বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম কর্নেল নাজমুল হুদা এবং বীর বিক্রম লে. কর্নেল এটিএম হায়দার। খালেদ মোশাররফের কন্যা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহজাবিন খালেদ দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে বিচার না পাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন:
"৪৭ বছর পার হয়ে গেলেও আমরা কোনো বিচার পাইনি। সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার দাবি তোলার পরও কেউ কথা শোনে না। আমার বাবার উদ্দেশ্য ছিল সেনাকল্যাণ ও সৎ, কিন্তু ঘাতকরা আমাদের এক কাপড়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে দিয়েছিল। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছিল, তারা পরবর্তীতে মন্ত্রিত্ব ও রাজনৈতিক পদ পেয়েছে। আমরা এখন কথা বলতে বলতে ক্লান্ত।"
ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও প্রতিবিপ্লবের পটভূমি
লেখক ও গবেষক আনোয়ার কবির এর মতে, ৭ই নভেম্বর একই সাথে তিনটি প্রেক্ষাপট বহন করে:
মুক্তিযোদ্ধা হত্যা: দেশের দুই সেক্টর কমান্ডারসহ অসংখ্য সেনাসদস্যকে প্রথমবার প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়।
ব্যর্থ সিপাহী অভ্যুত্থান: জাসদের নেতৃত্বে কিছু সেনাসদস্য অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলেও সেখানে সাধারণ জনতার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, তাই একে 'জনতার বিপ্লব' বলা চলে না।
১৫ আগস্টের সুফলভোগীদের পুনরুত্থান: খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর ১৫ আগস্টের ঘাতক চক্র কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। জাসদের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সুযোগ নিয়ে ফারুক-রশিদ চক্র অনুগত জওয়ানদের একত্র করে এই প্রতিবিপ্লব ঘটায়, যার মূল সুফলভোগী হয় পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী।
গণমাধ্যমের নীরবতা: উপেক্ষিত নায়ক ও গোপন চালক
৮ই নভেম্বরের সংবাদপত্রের পাতাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কতগুলো ঐতিহাসিক ‘নীরবতা’ বা তথ্য আড়াল করার কৌশল স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
বীর উত্তমদের মর্মান্তিক মৃত্যু গোপনকরণ: মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের কিংবদন্তি অধিনায়ক, কে-ফোর্সের সর্বাধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) এবং ৭ই মার্চের বিখ্যাত ভাষণ ধারণকারী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক লে. কর্নেল এ টি এম হায়দারকে (বীর উত্তম) ৭ই নভেম্বর সকালে শেরেবাংলা নগরে অতি নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু ৮ই নভেম্বরের কোনো বাংলাদেশি পত্রিকার প্রথম পাতায় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের খবর স্থান পায়নি।
সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপের কারণে সংবাদপত্রগুলো নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যেন সিপাহী-জনতার 'বিপ্লবী জয়ের' আবহে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার খবর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে।
মাস্টারমাইন্ড কর্নেল তাহেরের নাম উধাও: ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানটির মূল সামরিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরি করেছিলেন কর্নেল (অব.) আবু তাহের এবং তাঁর সংগঠন জাসদ। জাসদের গোপন ক্যাডার ও সৈনিকদের আন্দোলনের ফলেই সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান মুক্ত হতে পেরেছিলেন। কিন্তু ৮ই নভেম্বরের কোনো সংবাদপত্রের শিরোনামে কর্নেল তাহেরের নাম পর্যন্ত ছিল না।
পত্রিকাগুলোতে এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছিল যেন এটি জেনারেল জিয়াউর রহমানের নিজস্ব নেতৃত্বেই সংগঠিত একটি সুশৃঙ্খল সামরিক-জনপ্রিয় অভ্যুত্থান।
সিপাহী বিপ্লবের পরিণতি: তাহেরের ফাঁসি ও জিয়াউর রহমানের একক ক্ষমতা
৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের পরদিন থেকেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে। জাসদ ও কর্নেল তাহের ভেবেছিলেন তারা জিয়াউর রহমানকে নিজেদের আদর্শিক বিপ্লবের ‘পুতুল সেনাপতি’ হিসেবে ব্যবহার করবেন। কিন্তু বাস্তবমুখী ও দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান দ্রুত অনুধাবন করেন যে সেনাবাহিনীতে বিপ্লবী সিপাহীদের এই নৈরাজ্য ও শৃঙ্খলাহীনতা বজায় থাকলে সেনাবাহিনী হিসেবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে
৭ই নভেম্বরের দ্রুত পথ পরিবর্তন
জিয়া মুক্ত হওয়ার পরদিনই সেনানিবাসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। জাসদের ১২-দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের মঞ্চ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সুশৃঙ্খল প্রতীক।
যখন জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা আবার দ্বিতীয় দফায় জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ ও আন্দোলনের চেষ্টা করে, তখন জিয়াউর রহমান অত্যন্ত কঠোর হস্তে দমননীতি গ্রহণ করেন।
তাহেরের গ্রেপ্তার: ১৯৭৫ সালের ২৪শে নভেম্বর কর্নেল আবু তাহেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গোপন বিচার ও ফাঁসি: ১৯৭৬ সালের জুন মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনালে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের শীর্ষ নেতাদের বিচার করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম বীর উত্তম মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহেরকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থেকে উপ-প্রধান সামরিক শাসনকর্তা, পরবর্তীতে প্রধান সামরিক শাসনকর্তা (CMLA) এবং ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
জাসদ ও 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'র সৃষ্টি: সেনাসাহিত্য ও আদর্শিক ভিত্তি
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ভেঙে বামপন্থী তরুণদের হাত ধরে গঠিত হয় 'জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল' (জাসদ)। তৎকালীন তরুণ সমাজ ও তরুণ সেনাসদস্যদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং রক্ষীবাহিনীর ভূমিকার কারণে ক্ষুব্ধ ছিল।
'জনগণের সেনাবাহিনী' (People's Army) ধারণা
কর্নেল তাহের চীনা বিপ্লব এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের আদলে বাংলাদেশে একটি 'উৎপাদনমুখী জনগণের সেনাবাহিনী' গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, সেনাবাহিনীর কাজ কেবল ব্যারাকে বসে প্রশিক্ষণ নেওয়া হতে পারে না; বরং তাদের উৎপাদনে অংশ নিতে হবে এবং অফিসার-সিপাহীদের মধ্যে কোনো শ্রেণিভেদ থাকা চলবে না। এই ধারণাকে ভিত্তি করেই ১৯৭৪ সাল থেকে সেনানিবাসের সাধারণ জওয়ানদের মধ্যে গোপনে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সংগঠিত করা হতে থাকে।
৭ই নভেম্বরের '১২-দফা দাবি': মূল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপরেখা
৭ই নভেম্বরের প্রথম প্রহরে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনানিবাসের ভেতরে ও বাইরে যে ১২-দফা দাবি সংবলিত লিফলেট বিলি করেছিল, তা তৎকালীন প্রথাগত সামরিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
১২-দফা দাবির মূল বিষয়গুলো:
১. সেনাবাহিনীকে রাজকীয় ও ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে মুক্ত করা: অফিসারদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা (যেমন: ব্যাটম্যান রাখা, অফিসার ক্লাবের বিশেষ বরাদ্দ) বিলুপ্ত করা।
২. সকল রাজবন্দির মুক্তি: জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব, এম এ জলিল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দিদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
৩. জিয়াউর রহমানের পুনর্বাসন: জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে বিপ্লবী সিপাহীদের স্বার্থরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া।
৪. সামরিক ক্ষমতার গণতান্ত্রিকীকরণ: সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের প্রতিনিধি নিয়ে বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
ভূ-রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ: ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন সিআইএ (CIA)
১৯৭৫ সালের পুরো আগস্ট-নভেম্বর জুড়ে ঢাকার রাজপথ ও সেনানিবাসে যে রক্তপাত ও অস্থিরতা চলেছিল, তা কেবল দেশীয় কারণে ঘটেনি। স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণে তৎকালীন বিশ্বের প্রধান প্রধান পরাশক্তিগুলো এতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল।
ভারতের উদ্বেগ ও ইন্দিরা গান্ধীর অবস্থান: খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর ভারতে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, কারণ নতুন দিল্লি ভেবেছিল বাংলাদেশে ভারতের শত্রুভাবাপন্ন সামরিক চক্র (ফারুক-রশীদ) উৎখাত হয়েছে। কিন্তু ৭ই নভেম্বর খালেদ মোশাররফের মর্মান্তিক পতন ও জিয়ার উত্থানের পর ইন্দিরা গান্ধী সরকার চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ভারত মনে করেছিল, জিয়াউর রহমানের পেছনে মার্কিন ও চীনপন্থী জোটের প্রভাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান: মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং সিআইএ (CIA)-এর গোপন ডিক্লাসিফাইড নথি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ৭ই নভেম্বরের সিপাহী আন্দোলনকে কিছুটা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে। তবে যখন তারা দেখল জিয়াউর রহমান জাসদের বামপন্থী আদর্শ বাতিল করে কঠোর হাতে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনছেন এবং সাম্যবাদকে দমন করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র জিয়াউর রহমানকে তাদের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে মেনে নেয়।
৭ই নভেম্বর পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের পদক্ষেপ ও সামরিক ট্রাইব্যুনাল
৭ই নভেম্বর মুক্ত হওয়ার পর জেনারেল জিয়াউর রহমান অতি দ্রুত উপলব্ধি করেন যে, জাসদ ও কর্নেল তাহের যে 'বিপ্লবী সিপাহী আন্দোলন' তৈরি করেছেন, তা চালু থাকলে সেনা শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ চুরমার হয়ে যাবে। ফলে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেন।
গোপন সামরিক বিচার ও কর্নেল তাহেরের আত্মপক্ষ সমর্থন
১৯৭৬ সালের ১৭ই জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে একটি বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল (নম্বর-১) গঠন করা হয়। কর্নেল আবু তাহেরসহ মোট ৩৩ জনকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
বিচারের সময় ট্রাইব্যুনালের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল তাহের এক ঐতিহাসিক ও তেজস্বী বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
"আমি দেশকে ভালোবাসার অপরাধে অভিযুক্ত। যদি ১৯৭১ সালে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা এবং ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা অপরাধ হয়ে থাকে, তবে আমি অপরাধী।"
১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই ভোর ৫টায় বীর উত্তম কর্নেল আবু তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়। (পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২২শে মার্চ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট কর্নেল তাহেরের ওই বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালের বিচারকে 'বেআইনি ও অসংবিধানিক' ঘোষণা করে বাতিল করে)।
১৯৭৫ থেকে ১৯৮১: জিয়ার শাসনামলে সেনা অসন্তোষ ও ক্যু-এর ইতিহাস
৭ই নভেম্বরের পর সেনাবাহিনীতে রাজনীতি ও সিপাহী অসন্তোষের যে বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছিল, তা জিয়াউর রহমানের শাসনামলজুড়ে তাড়া করে বেরিয়েছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে প্রায় ২০টি ছোট-বড় ক্যু ও বিদ্রোহের চেষ্টা হয়েছিল।
১৯৭৭ সালের ভয়াবহ সামরিক অভ্যুত্থান ও ফাঁসি
১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর যখন ঢাকায় জাপানি লাল ফৌজ (Red Army) কর্তৃক ছিনতাইকৃত একটি বিমান নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন ঢাকা বিমানবন্দর ও সেনানিবাসে বিমান বাহিনীর সদস্য ও সেনাবাহিনীর একদল সিপাহী রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ ঘটায়। এতে বিমান বাহিনীর বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন।
জিয়াউর রহমান অত্যন্ত নির্মমভাবে এই ক্যু দমন করেন। সামরিক আদালতের বিচারে ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে প্রায় ১,১০০ থেকে ১,৪০০ জন সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্যকে হত্যা ও ফাঁসি দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়।
ইতিহাসের শিক্ষা ও সিপাহী-জনতার বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব কেবল একটি ক্যু বা ক্ষমতার অদলবদল ছিল না; এটি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল:
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: ৭ই নভেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ' এবং ইসলামিক মূল্যবোধের রাজনৈতিক চর্চা বেগবান হয়।
সেনাবাহিনীর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর ভেতরে রাজনীতির যে বিপজ্জনক অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, ৭ই নভেম্বরের মাধ্যমে তার চরম বিস্ফোরণ ঘটে। যার খেসারত হিসেবে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রায় ২০টিরও বেশি সামরিক ক্যু ও বিদ্রোহের চেষ্টা হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিজেও সপরিবারে নিহত হন।
পররাষ্ট্রনীতির অক্ষ পরিবর্তন: ৭ই নভেম্বরের পর বাংলাদেশ ভারত-সোভিয়েত বলয় থেকে বেরিয়ে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, গণচীন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে নিবিড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
উপসংহার
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই রাতটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের শৈশবকালের সবচেয়ে নাটকীয় মোড়। ৮ই নভেম্বরের প্রকাশিত সংবাদপত্রের পাতায় তৎকালীন সময়ের থমথমে বাস্তবতা, মানুষের স্বস্তি, নতুন রাষ্ট্রনায়কের প্রতি আস্থা এবং একই সাথে কঠোর সামরিক সেন্সরশিপের ছায়া সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ৭ই নভেম্বর একদিকে যেমন জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির মূল অনুঘটক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, অন্যদিকে এটি মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু সেরা সন্তানকে (খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার, নাজমুল হুদা এবং পরবর্তীতে কর্নেল তাহের) চিরতরে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। সংবাদের শিরোনামের পেছনে লুকিয়ে থাকা এই নির্মম সত্যগুলো আজ পাঁচ দশক পর দাঁড়িয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসের আলো-ছায়ায় কোনো ঘটনা কখনোই পুরোপুরি একরৈখিক নয়; বরং বিজয়ের উল্লাসের প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে থাকে অনেক অপ্রকাশিত রক্ত ও ত্যাগের করুণ ইতিহাস।















