একাত্তরের ২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধু কেন গ্রেপ্তার হলেন? আত্মত্যাগ নাকি কৌশল?
চারদিকে যখন কান্নার রোল, আগুন আর রক্তের হোলিখেলা, ঠিক সেই মুহূর্তে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাসভবনে শান্ত, অবিচল দাঁড়িয়ে ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই কালরাতে তিনি কোনো আত্মগোপনের পথ বেছে নেননি, কোনো সুরক্ষিত বাঙ্কারে আশ্রয় নেননি, কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাননি। রাত ১২টা ৩০ মিনিটের পর অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার পর তিনি পাকিস্তানি কমান্ডো বাহিনীর হাতে অত্যন্ত সুকৌশলে গ্রেফতার বরণ করেন।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। বসন্তের শেষ লগ্ন হলেও বাংলার আকাশে তখন বারুদের গন্ধ আর আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণের ইতিহাস যখন চূড়ান্ত বিস্ফোরণের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জল্লাদ জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং টিক্কা খানের নির্দেশে মেতে ওঠে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এ। ট্যাংক, মর্টার আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গর্জনে কেঁপে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা আর রাজারবাগ। চারদিকে যখন কান্নার রোল, আগুন আর রক্তের হোলিখেলা, ঠিক সেই মুহূর্তে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাসভবনে শান্ত, অবিচল দাঁড়িয়ে ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সেই কালরাতে তিনি কোনো আত্মগোপনের পথ বেছে নেননি, কোনো সুরক্ষিত বাঙ্কারে আশ্রয় নেননি, কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাননি। রাত ১২টা ৩০ মিনিটের পর অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার পর তিনি পাকিস্তানি কমান্ডো বাহিনীর হাতে অত্যন্ত সুকৌশলে গ্রেফতার বরণ করেন।
রাজনীতির অলিগলিতে কিংবা ইতিহাসের বিকৃতির অপচেষ্টায় প্রায়শই একটি প্রশ্ন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছুড়ে দেওয়া হয় "২৫শে মার্চের কালরাতে বঙ্গবন্ধু কেন আত্মগোপন না করে নিজেকে পাকিস্তানিদের হাতে সঁপে দিলেন? এটি কি তাঁর দুর্বলতা ছিল, নাকি কোনো গোপন সমঝোতা?"
ইতিহাসের সততা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটকৌশল যাঁরা বোঝেন, তাঁদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত পরিষ্কার। বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্ত কোনো আকস্মিক ঘটনা বা দুর্বলতা ছিল না; বরং এটি ছিল এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অদম্য নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে একটি ‘বৈধ রাষ্ট্র কাঠামো’ দেওয়ার চূড়ান্ত মাস্টারস্ট্রোক। বিশ্ব ইতিহাসের মহানায়কদের জীবনের আলোকেই কেবল এই অলৌকিক ও সাহসী সিদ্ধান্তের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব।
বিশ্বরাজনীতির আলোয় কারাগারের দর্শন ও মহানায়কগণ
পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রকৃত এবং দূরদর্শী জননেতারা কখনোই শত্রুর ভয়ে কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাননি। তাঁদের কাছে কারাগার কোনো পরাজয়ের গ্লানি নয়, বরং সংগ্রামের এক অবিনশ্বর হাতিয়ার। তাঁরা জানতেন, স্বশরীরে অবরুদ্ধ থাকলেও তাঁদের আদর্শিক উপস্থিতি বাইরে থাকা কোটি কোটি জনতাকে মুক্তিসংগ্রামে উজ্জীবিত করার জন্য যথেষ্ট। বিশ্বমঞ্চের কয়েকজন শীর্ষ নেতার কারাজীবনের দিকে তাকালে এই দর্শনের সত্যতা মেলে।
"The prison cell is an ideal place to know oneself, to search realistically and regularly the process of one's own mind and feelings." - Nelson Mandela
নেলসন ম্যান্ডেলা: ২৭ বছরের অবিনাশী কারাজীবন
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৯৬২ সালে যখন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, তিনি চাইলে আত্মগোপন করে বা দেশের বাইরে গিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ জারি রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। ১৯৬৪ সালের রিভোনিয়া ট্রায়ালে তিনি সাহসের সাথে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, "আমি এমন এক গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের আদর্শ লালন করি যেখানে সব মানুষ একসঙ্গে সম্প্রীতির সাথে বাস করবে। এটি এমন এক আদর্শ যার জন্য আমি বেঁচে থাকতে চাই, কিন্তু প্রয়োজন হলে এর জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।"
ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর রবেন দ্বীপের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি ছিলেন। এই সুদীর্ঘ কারাবাস ম্যান্ডেলাকে নিঃশেষ তো করেইনি, বরং বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকারের নৈতিক ভিত্তিকে আন্তর্জাতিক মহলে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। ম্যান্ডেলার এই বন্দিত্বই ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাসীকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একাট্টা হতে বাধ্য করেছিল।
মহাত্মা গান্ধী: অহিংসা ও সত্যাগ্রহের কারাদর্শন
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বারবার কারাবরণ করেছেন। ১৯২২ সালের অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন প্রতিটি ক্ষেত্রেই গান্ধীজি জানতেন যে তাঁর কর্মসূচির কারণে ব্রিটিশরা তাঁকে গ্রেফতার করবে। তিনি কখনোই ব্রিটিশ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি।
গান্ধীজির দর্শন ছিল, অত্যাচারী শাসকের আইনকে অমান্য করে বুক ফুলিয়ে কারাগারে যাওয়াটাই হলো শাসকের নৈতিক পরাজয়। তাঁর এই কারাবরণ ভারতীয় জনগণের ভেতর এক অভূতপূর্ব জাতীয়তাবাদী জাগরণ সৃষ্টি করেছিল এবং ব্রিটিশ রাজের ‘ন্যায়পরায়ণতার’ মুখোশ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছিল।
সুকর্ণো: ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার রূপকার
ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি সুকর্ণো ডাচ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেফতার ও নির্বাসনের শিকার হন। ১৯২৯ সালে ডাচরা যখন তাঁকে গ্রেফতার করে, তখন ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্তিমিত হয়নি; বরং সুকর্ণোর ঐতিহাসিক আত্মপক্ষ সমর্থনের ভাষণ ‘ইন্দোনেশিয়া মুগুগাত’ (ইন্দোনেশিয়ার আর্তনাদ) পুরো জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল। সুকর্ণো যদি তখন পালিয়ে যেতেন, তবে ডাচরা তাঁকে একজন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী অপরাধী’ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করার সুযোগ পেত।
বিশ্বনেতাদের সাথে বঙ্গবন্ধুর কারাদর্শনের তুলনামূলক চিত্র
নিচের ছকটির মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসের বিখ্যাত চারজন নেতার কারাবরণ এবং এর রাজনৈতিক গুরুত্ব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
নেতার নাম | দেশ ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট | কারাবাসের সময়কাল | গ্রেফতার/কারাবরণের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য | আন্দোলনের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব |
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান | বাংলাদেশ (পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা) | ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি (এছাড়াও জীবনের বড় অংশ) | আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বৈধতা রক্ষা, গণহত্যার মুখে নিজেকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের তকমা এড়ানো। | অনুপস্থিত থেকেও মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা এবং ৯ মাসে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিশ্চিত করা। |
নেলসন ম্যান্ডেলা | দক্ষিণ আফ্রিকা (শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন) | ১৯৬২ থেকে ১৯৯০ (দীর্ঘ ২৭ বছর) | বর্ণবাদী সরকারের নৈতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে আন্দোলনকে নৈতিক উচ্চতায় নেওয়া। | দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং শেষ পর্যন্ত বর্ণবাদের পতন ঘটিয়ে বহুবর্ণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। |
মহাত্মা গান্ধী | ভারত (ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন) | বিভিন্ন মেয়াদে সর্বমোট প্রায় ৬ বছরেরও বেশি | ব্রিটিশদের তৈরি অন্যায্য আইনের অহিংস প্রতিরোধ এবং নৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে জনগণের আত্মশক্তি জাগানো। | ভারতীয় জনসাধারণের মাঝে অভূতপূর্ব একতা তৈরি এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিদায় ঘণ্টা বাজানো। |
সুকর্ণো | ইন্দোনেশিয়া (ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন) | ১৯২৯-১৯৩১ (কারাগার) এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মেয়াদে নির্বাসন | ঔপনিবেশিক শক্তির অন্যায় ও নির্যাতনের চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা এবং জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সংহত করা। | ইন্দোনেশিয়ার জনগণের মাঝে স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা তৈরি এবং ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা সফল করা। |
২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু কেন পালাননি? পাঁচটি কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
২৫শে মার্চের কালরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সুনির্দিষ্টভাবে কী ঘটছিল এবং কেন বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে যাননি, তা কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক চুলচেরা ও নিখুঁত বিশ্লেষণ। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনে পাঁচটি অকাট্য ও কৌশলগত কারণ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
(১) সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত বৈধ নেতা হিসেবে সাংবিধানিক অবস্থান
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু ছিলেন সমগ্র পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রী এবং জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রনেতা কখনো চোরের মতো পালিয়ে যেতে পারেন না। পালালে তাঁর গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট বা বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতো।
বঙ্গবন্ধু যদি ২৫শে মার্চ রাতে পালিয়ে যেতেন বা আত্মগোপন করতেন, তবে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচার করার সুবর্ণ সুযোগ পেত যে, "শেখ মুজিব পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে ব্যর্থ হয়ে একজন ফেরারি আসামির মতো পালিয়ে গেছেন।"
তিনি পালিয়ে গেলে ইয়াহিয়া খান সহজেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে দাবি করতে পারত যে, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো গণআন্দোলন হচ্ছে না, বরং কিছু দুষ্কৃতকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং তাদের নেতাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। নিজের অবস্থানে অটল থেকে গ্রেফতার বরণ করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন, তিনি কোনো বিদ্রোহী বা বেআইনি সত্তা নন, বরং তিনিই এই অঞ্চলের বৈধ শাসক এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তাই মূলত একটি অবৈধ ও আগ্রাসী শক্তি।
(২) তিনি কোনো গোপন গেরিলা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা ছিলেন না
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুরো রাজনৈতিক জীবনই ছিল উন্মুক্ত, নিয়মতান্ত্রিক এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬-র ছয় দফা এবং ৬৯-র গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে জনগণকে তৈরি করেছিলেন। তাঁর রাজনীতি ছিল রাজপথের রাজনীতি, গোপন সুড়ঙ্গের রাজনীতি নয়।
তিনি চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো বা মাও সে তুং-এর মতো কোনো গোপন গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন না যে তাঁকে পাহাড়ের গুহায় বা জঙ্গলে আত্মগোপন করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হবে। তিনি ছিলেন কোটি কোটি মানুষের প্রকাশ্য নেতা।
গেরিলা নেতাদের ক্ষেত্রে পালিয়ে যাওয়া বা গা ঢাকা দেওয়াটা রণকৌশলের অংশ হতে পারে, কিন্তু একজন গণনেতা যদি সংকটের মুহূর্তে তাঁর জনগণকে ফেলে পালিয়ে যান, তবে জনগণের মনোবল মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু জানতেন, বাঙালি জাতি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি যদি আজ পালিয়ে যান, তবে সাধারণ মানুষ চরমভাবে দিকভ্রান্ত ও হতাশ হয়ে পড়বে। তাই নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি জনগণের সামনে অবিচল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
(৩) আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জীবনরক্ষার এক সুদূরপ্রসারী মাস্টারস্ট্রোক
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকাকে একটি অবরুদ্ধ ডেথ জোনে পরিণত করেছিল। বঙ্গবন্ধু যদি ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করতেন, তবে পাকিস্তানি কমান্ডোরা বা গোয়েন্দারা তাঁকে খুব সহজেই রাস্তায় বা অন্য কোনো গোপন আস্তানায় গুলি করে হত্যা করতে পারত।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বিশ্বমিডিয়ায় খুব সহজেই মিথ্যা প্রচারণা চালাতে পারত যে, "শেখ মুজিব ২৫শে মার্চের রাতে ক্রসফায়ারে বা অন্য কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলায় নিহত হয়েছেন, এর সাথে সেনাবাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই।" অথবা তারা বলতে পারত, "বিচ্ছিন্নতাবাদী মুজিব ভারতের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় অতর্কিত সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন।" এতে করে আন্তর্জাতিক সমাজ কোনো দিনও সত্য জানতে পারত না এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই বাঙালি জাতি সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ত।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাড়িতে অবস্থান করায় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে সকলের সামনে জীবিত গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়। মার্কিন সাংবাদিক আর্নল্ড জেইটিনসহ বহু বিদেশি সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শী তখন ঢাকায় ছিলেন। ফলে, বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের খবরটি মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে সার্টিফাইড হয়ে যায়।
জীবিত অবস্থায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হেফাজতে চলে যাওয়ার কারণে তাঁর সুরক্ষার পুরো দায়ভার আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পাকিস্তানের ওপর বর্তায়। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো (যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত এবং বিশ্ব জনমত) তখন ইয়াহিয়া সরকারের ওপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে যেন শেখ মুজিবের জীবনের কোনো ক্ষতি না হয়। এই আন্তর্জাতিক চাপই ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল।
"যদি তারা আমাকে আমার বাড়ি থেকে না পায়, তবে তারা পুরো ঢাকা শহরকে জ্বালিয়ে খাক করে দেবে এবং আমার খোঁজে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করবে।" - বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে ব্যক্ত করা অভিমত)
(৪) অটল নৈতিক অবস্থান, আপোষহীনতা এবং চূড়ান্ত বার্তা প্রদান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির আত্মার আত্মীয়। তিনি ভালো করেই জানতেন, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। তিনি যদি আত্মগোপনে যেতেন, তবে পাকিস্তানি বাহিনী পুরো ঢাকাকে তন্নতন্ন করে খুঁজত, প্রতিটি বাড়িঘর ধ্বংস করত এবং বঙ্গবন্ধুকে না পাওয়া পর্যন্ত নির্বিচারে লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে হত্যা করত। তিনি নিজের জীবন বাঁচাতে বাংলার সাধারণ মানুষকে এভাবে বলির পাঁঠা বানাতে চাননি। তিনি নিজেকে ‘মানবঢাল’ হিসেবে শত্রুর সামনে সঁপে দিয়েছিলেন যেন তাঁর বিনিময়ে সাধারণ মানুষ অন্তত তাৎক্ষণিক গণহত্যা থেকে কিছুটা রেহাই পায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কিন্তু কর্তব্য সম্পাদন না করে ধরা দেননি। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর বাড়ি ঘেরাও করার আগেই তিনি স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা ওয়ারলেসের (ইপিআর-এর ট্রান্সমিটার) মাধ্যমে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মূল ঘোষণা:
"ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যেখানে যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।"
এই ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি তাঁর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব পূর্ণ করেছিলেন। স্বাধীনতার মন্ত্র বীজ হিসেবে জনগণের বুকে রোপণ করার পরই তিনি শান্ত মাথায় গ্রেফতার বরণ করেন। এই আপোষহীন ও অটল নৈতিক অবস্থানই নয় মাস ধরে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার ধমনীতে রক্তের গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল।
(৫) পাকিস্তানি অপপ্রচারের মুখে সত্যের চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা মেশিনারি এবং তাদের বৈশ্বিক দোসররা এই যুদ্ধকে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ এবং ‘ভারতের অর্থায়নে পরিচালিত একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। তারা শেখ মুজিবকে ‘দেশদ্রোহী’ এবং ‘ভারতের এজেন্ট’ হিসেবে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু যদি ২৫শে মার্চ রাতে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যেতেন, তবে পাকিস্তানের এই মিথ্যা অপপ্রচার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একাংশের কাছে সত্য বলে মনে হতো। ইয়াহিয়া খান খুব সহজেই আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রমাণ দিয়ে বলতে পারত, "দেখো, শেখ মুজিব ভারতের দালালি করতে দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এবং পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে।"
কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভারতের মাটিতে পা না রেখে পাকিস্তানের কারাগারকে বেছে নেওয়ার ফলে পাকিস্তানের সমস্ত প্রোপাগান্ডা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। বিশ্ববাসী পরিষ্কার দেখতে পায় যে, ৭ কোটি মানুষের নির্বাচিত নেতা নিজ দেশের মাটিতে বন্দি এবং একটি বর্বর সামরিক জান্তা জোরপূর্বক বন্দুকের নলের মুখে গণতন্ত্রকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই একটি সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ থেকে মুক্ত করে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম’ (National Liberation Struggle) হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গ্রেফতারের আগ মুহুর্ত
২৫শে মার্চ সন্ধ্যার পর থেকেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করবে, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য একটি নিরাপদ স্থান তৈরি করে রেখেছিলেন এবং একটি গোপন গাড়িরও ব্যবস্থা করেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ যুক্তি দিয়েছিলেন, নেতা বাইরে থাকলে যুদ্ধ পরিচালনা সহজ হবে।
বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী প্রত্যুত্তর
বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাব অত্যন্ত শান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ড. কামাল হোসেন এবং সে রাতে উপস্থিত অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণী অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন:
"তাজউদ্দীন, আমি যদি পালিয়ে যাই, পাকিস্তানিরা ভাববে আমি ভয় পেয়েছি। তারা আমার খোঁজে পুরো ঢাকা শহরকে শ্মশান বানিয়ে দেবে। প্রতিটি বাড়িঘর পুড়িয়ে ছারখার করবে। আমি আমার জনগণকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ফেলে নিজের জীবন বাঁচাতে লুকিয়ে থাকতে পারি না। ওরা আমাকেই খুঁজছে, আমাকেই গ্রেফতার করুক। তাহলে অন্তত আমার সাধারণ মানুষগুলো বড় ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাবে।"
বঙ্গবন্ধু জানতেন, তিনি হলেন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রধান লক্ষ্য (Target)। নিজেকে ‘টোপ’ বা মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল মনোযোগ নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে অন্য শীর্ষ নেতারা নিরাপদে ঢাকা ত্যাগ করে যুদ্ধ সংগঠিত করার সময় পান।
কারাবন্দী মুজিব: প্রেরণার বীজমন্ত্র ও বিজয়ের চালিকাশক্তি
অনেকেই মনে করতে পারেন, নেতা যখন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে বন্দি, তখন কীভাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিলেন? এখানেই শেখ মুজিবুর রহমানের অনন্যতা। তিনি স্বশরীরে অনুপস্থিত থেকেও হয়ে উঠেছিলেন কোটি কোটি বাঙালির অদৃশ্য কমান্ডার-ইন-চিফ।
"ব্যক্তি মুজিবকে বন্দি করা যায়, কিন্তু তাঁর ভেতরের আদর্শ ও চেতনাকে বন্দি করার মতো কোনো দেয়াল বা শিকল আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে তৈরি হয়নি।"
কারাবাস যেখানে সংগ্রামের মূল কেন্দ্র
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা হয়। সেখানে তাঁর সেলটির পাশে তাঁরই কবর খোঁড়া হয়েছিল, তাঁকে সামরিক আদালতে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই চরমতম অন্ধকারও বাংলার মাটিতে জ্বলতে থাকা মুক্তিযুদ্ধের আগুনকে নিভিয়ে দিতে পারেনি।
রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা যখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে পাকিস্তানি বাঙ্কারের দিকে চার্জ করতেন, তখন তাঁদের চোখের সামনে ভেসে উঠত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তর্জনী হেলানো নেতার অবয়ব। মুক্তিযোদ্ধারা জানতেন, তাঁদের নেতা পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করেননি। নেতার এই আপোষহীনতা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলকে ইস্পাত কঠিন করে তুলেছিল। কারাবন্দি মুজিব হয়ে উঠেছিলেন প্রতিটি গেরিলা যোদ্ধার আধ্যাত্মিক শক্তি।
মুজিবনগর সরকার: অনুপস্থিত রাষ্ট্রপতির নামে রাষ্ট্র পরিচালনা
একটি সফল জনযুদ্ধ পরিচালনার জন্য যেমন অস্ত্রের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর। বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাতে যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাকে ভিত্তি করে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম প্রবাসী সরকার, যা ইতিহাসে ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence):
"আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ... সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হইবেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক হইবেন..."
১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে এই সরকার যখন শপথ গ্রহণ করে, তখন অনুপস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপতি’ এবং সশস্ত্র বাহিনীর ‘সর্বাধিনায়ক’ ঘোষণা করা হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এই মুজিবনগর সরকার বিশ্বজুড়ে যত কূটনৈতিক চিঠি পাঠাত, তার প্রতিটিতে লেখা থাকত "অন লিভ অফ আওয়ার প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান"। এই সাংবিধানিক দূরদর্শিতার কারণে বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রই বলতে পারেনি যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি নেতৃত্বহীন বিশৃঙ্খলা। নেতার অনুপস্থিতিতেও তাঁর নামকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনী (মুক্তিবাহিনী) ৯ মাস ধরে অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি: স্বাধীনতার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার
বঙ্গবন্ধুর কারাবরণ এবং পাকিস্তানের কারাগারে তাঁর বন্দিত্বই ছিল একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এটি পাকিস্তানের জন্য একটি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির বৈশ্বিক হাতিয়ার
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান দেশের রাজধানী (লন্ডন, প্যারিস, ওয়াশিংটন, মস্কো) সফর করেন। তাঁর কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ের মূল এজেন্ডা কেবল ১ কোটি শরণার্থীর বোঝা ছিল না; বরং তাঁর প্রধানতম দাবি ছিল "পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বাঙালির নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি এবং তাঁর জীবন রক্ষা করা।"
সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি সরাসরি ইয়াহিয়া খানকে চিঠি দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং শেখ মুজিবের জীবনের কোনো ক্ষতি না করার জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দেন। বিশ্বখ্যাত বুদ্ধিজীবী যেমন আন্দ্রে মারলো, জঁ-পল সার্ত্র, এডওয়ার্ড কেনেডি, এবং জর্জ হ্যারিসনরা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন।
ইয়াহিয়া খান আন্তর্জাতিক আদালতের নিয়ম তোয়াক্কা না করে বঙ্গবন্ধুকে গোপনে ফাঁসি দেওয়ার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বনেতাদের এই তীব্র কূটনৈতিক চাপের কারণে তা কার্যকর করার সাহস পায়নি। বঙ্গবন্ধু যদি বন্দি না থাকতেন, তবে পাকিস্তানের ওপর এই আন্তর্জাতিক নৈতিক চাপ প্রয়োগের কোনো সুযোগই থাকত না।
"Mujib’s Bangladesh" – বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে বাংলাদেশ
একাত্তরের ৯ মাসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো (যেমন The New York Times, The Times, BBC, Newsweek, Time Magazine) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি ভূ-খণ্ডীয় লড়াই হিসেবে দেখেনি। তারা এই সংগ্রামকে আখ্যায়িত করেছিল "Mujib’s Bangladesh" বা "মুজিবের বাংলাদেশ" নামে।
বিশ্বের কাছে তখন ‘বাংলাদেশ’ এবং ‘শেখ মুজিব’ এই দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক ও সমার্থক হয়ে উঠেছিল। একজন বন্দি নেতার নৈতিক মহিমা কীভাবে একটি সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্রের জন্মকে ত্বরান্বিত করতে পারে, আন্তর্জাতিক মিডিয়া তা অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করেছিল। এই আন্তর্জাতিক সহানুভূতির কারণেই ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যখন ভারত-পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়, তখন বিশ্বসমাজ একে কেবল দুটি দেশের যুদ্ধ হিসেবে দেখেনি, বরং একে দেখেছে মুজিবের বাংলাদেশের মুক্তির চূড়ান্ত লগ্ন হিসেবে।
'অপারেশন বিগ গেম': বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের সামরিক অভিযান
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার জন্য যে সামরিক অভিযানটি পরিচালনা করেছিল, সেটির সাংকেতিক নাম ছিল 'অপারেশন বিগ গেম' (Operation Big Game)। এই অভিযানের দায়িত্বে ছিল সেনাবাহিনীর ৩-এসএসজি (Special Services Group) কমান্ডো ব্যাটালিয়ন।
কমান্ডোদের আক্রমণ ও বঙ্গবন্ধুর বীরত্ব
রাত ১২টার পর (২৬শে মার্চের প্রথম প্রহর) কমান্ডোরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি ঘেরাও করে এবং নির্বিচারে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কনস্টেবল এতে শহীদ হন। চারদিকে যখন তীব্র গোলাগুলি, তখন বঙ্গবন্ধু নিজের শয়নকক্ষ থেকে বের হয়ে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ান এবং অত্যন্ত গম্ভীর ও সিংহসুলভ কণ্ঠে চিৎকার করে বলেন:
"স্টপ ফায়ারিং! কেন গুলি করছ? তোমরা যদি আমাকে গ্রেফতার করতে চাও, তবে আমি তো এখানেই আছি। গুলি বন্ধ করো!"
বঙ্গবন্ধুর এই বজ্রকণ্ঠ শুনে পাকিস্তানি কমান্ডোরা স্তব্ধ হয়ে যায়। একজন নির্বাচিত জননেতার এই অদম্য সাহস দেখে স্বয়ং পাকিস্তানি কমান্ডো অফিসাররাও হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। এরপর মেজর বিলালের নেতৃত্বে কমান্ডোরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায়।
পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারে প্রহসনের বিচার ও ‘কবর খনন’
গ্রেফতারের পর বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে করাচি এবং পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুর (বর্তমান ফয়সালাবাদ) ও মিয়ানওয়ালী কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে স্থানান্তর করা হয়। ৯ মাসের সেই বন্দিজীবন ছিল অত্যন্ত অমানবিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
গোপন সামরিক আদালত ও ফাঁসির রায়
১৯৭১ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে লায়ালপুর জেলে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এক গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালের প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার রহিমুদ্দিন খান। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের মোট ১২টি অভিযোগ আনা হয়, যার মধ্যে ৬টি অভিযোগের শাস্তি ছিল বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি)।
পাকিস্তান সরকার প্রখ্যাত আইনজীবী এ. কে. ব্রোহী-কে বঙ্গবন্ধুর ডিফেন্স কাউন্সিল (আইনজীবী) হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই আদালতের বৈধতা অস্বীকার করে কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি আদালতকে বলেছিলেন:
"যেহেতু এই আদালত কোনো গণতান্ত্রিক বা বৈধ আদালত নয়, তাই আমি এই আদালতের কোনো বিচার মানি না। তোমরা যা ইচ্ছা রায় দিতে পারো।"
সেলের সামনে কবর খনন: নভেম্বর মাসের শেষের দিকে যখন যৌথ বাহিনীর (মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী) আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে মিয়ানওয়ালী কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সেলের ঠিক বাইরে একটি কবর খনন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে মানসিক টর্চার করার জন্য এবং যেকোনো মুহূর্তে ফাঁসি কার্যকর করার জন্য এটি করা হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু সেই কবর দেখে ভয় পাননি। তিনি জেলের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে তাঁর জীবনের অন্যতম বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন:
"আমি জানি তোমরা আমাকে হত্যা করবে। কিন্তু তোমাদের কাছে আমার একটি মাত্র অনুরোধ মৃত্যুর পর আমার লাশটি কেটে টুকরো টুকরো করলেও অন্তত আমার বাংলার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিও। বাংলার মাটিতে যেন আমার কবর হয়।"
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নথি ও কূটনীতির নেপথ্য কাহিনী
সম্প্রতি অবমুক্ত হওয়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA (Central Intelligence Agency) এবং ব্রিটিশ MI6-এর গোপন নথি থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের বিষয়টি কীভাবে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছিল।
"The arrest of Mujibur Rahman has transformed a political leader into a martyr for the Bengali cause, making any compromise with Islamabad impossible." - US State Department Memorandum (May, 1971)
নিক্সন-কিসিঞ্জার চক্রের ব্যর্থতা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার চরমভাবে পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। তাঁরা চাইছিলেন যুদ্ধটি যেন পাকিস্তানের ভেতরেই মীমাংসা হয়ে যায় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন না হয়। কিন্তু শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনি অজুহাত পায়নি। কারণ, বিশ্বের বুকে তখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল যে, পাকিস্তান নিজের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচিত নেতাকে বন্দি করে গণহত্যা চালাচ্ছে।
বাঁচিয়ে রেখেছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো? ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজির আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তানের ক্ষমতা চলে যায় জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে। ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করার ঠিক আগের মুহূর্তেও বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য জল্লাদ পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভুট্টো দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে ইয়াহিয়াকে থামিয়ে দেন।
ভুট্টো জানতেন, যদি শেখ মুজিবকে জেলের ভেতর হত্যা করা হয়, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে আটকে পড়া ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে (POW) পিটিয়ে মারা হবে এবং পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়বে। ফলে, বঙ্গবন্ধুর এই বন্দিত্ব ও তাঁর জীবন মূলত ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার জীবন রক্ষার ‘গ্যারান্টি’ বা ‘জিম্মি’ হিসেবে কাজ করেছিল।
হ্যামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টের স্বীকৃতি
যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানের জন্য ‘হ্যামুদুর রহমান কমিশন’ গঠন করেছিল। এই কমিশনের রিপোর্টেও বঙ্গবন্ধুর এই কৌশলী সিদ্ধান্তের পরোক্ষ প্রশংসা এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বোকামির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়:
শেখ মুজিবকে জীবিত গ্রেফতার করা ছিল সামরিক জান্তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল। কারণ, মুজিব জেলের ভেতর থাকায় তাকে কোনো চুক্তিতে বাধ্য করা যায়নি। মুজিবের বন্দিত্ব পুরো বাঙালি জাতিকে একটি একক লক্ষ্যবিন্দুতে (Focal Point) নিয়ে এসেছিল। নেতার অনুপস্থিতি বাঙালির মাঝে কোনো কোন্দল তৈরি করতে দেয়নি, বরং সবাই এক হয়ে লড়াই করেছে।
নৈতিক দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের এক মহাকাব্য
ইতিহাসের নির্মম সত্য এই যে, তলোয়ারের ধার দিয়ে সাময়িকভাবে যুদ্ধ জেতা যেতে পারে, কিন্তু একটি জাতির চিরস্থায়ী মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন হয় সর্বোচ্চ নৈতিক দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের এক কালজয়ী মহাকাব্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫শে মার্চের কালরাতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা ছিল সেই মহাকাব্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।
অনেকেই যুক্তি দিতে পারেন, তিনি যদি ভারতে গিয়ে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করতেন, তবে হয়তো যুদ্ধ আরও আগে শেষ হতো। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, তিনি যদি ভারতে যেতেন, তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ববাসী ‘ভারত-পাকিস্তান ছায়াযুদ্ধ’ (Proxy War) হিসেবে গণ্য করত। তখন আমেরিকা বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলো পাকিস্তানের পক্ষে আরও খোলামেলাভাবে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেত, যা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে দীর্ঘায়িত বা চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পারত।
বঙ্গবন্ধুর বন্দিত্ব ছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পরাজয়ের প্রধান অনুঘটক। তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকে প্রমাণ করেছিলেন যে, স্বৈরাচারী শাসকেরা মানুষের শরীরকে শিকল দিয়ে বাঁধতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কখনো বন্দি করতে পারে না। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজির ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে, তখন মূলত বিজয়ী হয়েছিল পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি সেই নিঃসঙ্গ সিংহপুরুষের অদম্য ইচ্ছা এবং আপোষহীন নেতৃত্ব।
১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি যখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রাখেন, তখন বিশ্ববাসী অবলোকন করেছিল এক অলৌকিক দৃশ্য। লাখ লাখ মানুষের অশ্রুসিক্ত নয়ন আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে তিনি যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন প্রমাণিত হলো ২৫শে মার্চের তাঁর সেই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল না। তিনি সেদিন ধরা দিয়েছিলেন বলেই আজ বাঙালি একটি স্বাধীন মানচিত্র, একটি লাল-সবুজের পতাকা এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র লাভ করেছে।
তাই, ২৫শে মার্চের বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারবরণ কোনো ‘পলায়ন’ বা ‘দুর্বলতা’ ছিল না; এটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে পাকিস্তানি জল্লাদদের বিরুদ্ধে বাংলার এই মহানায়কের জীবনের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সফল ‘কৌশলগত আত্মত্যাগ’। ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকে তাঁর এই দূরদর্শিতা ও বীরত্বের জন্য চিরকাল বাঙালি জাতির পিতা এবং বিশ্ব ইতিহাসের এক অপরাজেয় কিংবদন্তী হিসেবে অমর করে রাখবে।













