>
>
‘জাতির পিতা’ ইব্রাহিম (আ) নাকি শেখ মুজিব? রাষ্ট্রীয় জাতির পিতা ও ঈমানী মিল্লাতের পিতা
‘জাতির পিতা’ ইব্রাহিম (আ) নাকি শেখ মুজিব? রাষ্ট্রীয় জাতির পিতা ও ঈমানী মিল্লাতের পিতা
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

TruthBangla

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়।
তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়। একটি বিশেষ মহল থেকে ফতোয়া জারি করে বা আবেগপ্রবণ বয়ান তৈরি করে বলা হয়:
“মুসলিমদের জাতির পিতা একমাত্র হযরত ইব্রাহিম (আ.), তাই বাঙালি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ বলা যাবে না বা মানা যাবে না।”
এই জাতীয় বয়ানের মূলে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ভাষাগত বিভ্রান্তি, পরিভাষাগত অস্পষ্টতা এবং ধর্মীয় ‘উম্মাহ’ বা ‘মিল্লাত’ এর সাথে আধুনিক ‘জাতীয়তাবাদ’ (Nationalism) বা ‘জাতিসত্তা’ (Nationhood)-র সংমিশ্রণ। এই মহলটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ‘জাতি’ (Nation) এবং ধর্মীয় বিশ্বাসভিত্তিক আকিদা বা ‘দ্বীন’ (Religion/Faith)-এর সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতে ব্যর্থ হয় অথবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক অবদানকে অস্বীকার করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে থাকে।
অথচ বিশ্বজুড়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, এমনকি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মতো শতভাগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও তাঁদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় জাতির পিতাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হয় এবং সেখানে ধর্মীয় আকিদার সাথে এর কোনো সংঘাত তৈরি করা হয় না।
এই দীর্ঘ নিবন্ধে আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামী আকিদা, কুরআনী পরিভাষা, ভাষাতত্ত্ব এবং বিশ্ব রাজনীতির আলোকে পর্যালোচনা করব যে কেন আধুনিক রাষ্ট্রীয় ‘জাতির পিতা’ এবং কুরআনে বর্ণিত হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ‘মিল্লাতের পিতা’ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার পরিভাষা, এবং কেন এই দুটির মাঝে কোনো দ্বিমুখিতা বা সাংঘর্ষিকতা নেই।
ভৌগোলিক জাতিসত্তা বনাম ধর্মীয় বিশ্বজনীনতা: মৌলিক পার্থক্য
রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের মূলনীতি অনুযায়ী ‘জাতি’ (Nation) এবং ‘উম্মাহ’ বা ‘ধর্মীয় পরিচয়’ (Religious Identity) সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি স্বতন্ত্র সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো। এই দুটি ধারণার উৎপত্তি, সীমানা এবং ভিত্তি আলাদা হওয়ায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত আত্মপরিচয়ে এদের ভূমিকাও ভিন্ন।
ভৌগোলিক ও ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা
‘Nation’ শব্দটি লাতিন ‘Natio’ এবং ‘Natus’ থেকে এসেছে, যার অর্থ জন্ম বা বংশোদ্ভূত হওয়া। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির পর থেকে সার্বভৌম ‘জাতিরাষ্ট্র’ (Nation-State)-এর ধারণার বিকাশ ঘটে। জাতি গঠনের মৌলিক উপাদানসমূহ:
নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও ভাষাগত সাংস্কৃতিক ঐক্য: একটি জনসমষ্টি সুনির্দিষ্ট নদী, পাহাড় বা ঐতিহাসিক সীমানায় আবদ্ধ ভৌগোলিক অঞ্চলে বাস করার মাধ্যমে ভূমির সাথে আত্মিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভাষার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের রূপকথা, সাহিত্য, মূল্যবোধ ও ইতিহাস পরিবাহিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ভাষায়, জাতি হলো একটি "কল্পিত সম্প্রদায়" (Imagined Community), যা যৌথ স্মৃতি ও ভাষার বন্ধনে টেকসই হয়।
শেয়ার করা আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম এবং আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের রাজনৈতিক লক্ষ্য জনসমাজকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতিতে রূপান্তরিত করে।
নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক বাস্তবতা (অপরিবর্তনীয় সত্তা): ভাষা ও নৃগোষ্ঠীগত পরিচয় জন্মসূত্রেই নির্ধারিত হয়। একজন মানুষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর বিশ্বাস বা মতামত পরিবর্তন করতে পারলেও তাঁর শারীরিক নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, পিতৃপুরুষের জন্মভূমি এবং মাতৃভাষার যোগসূত্র রাতারাতি বদলাতে পারেন না। ‘বাঙালি’ জাতিসত্তার প্রধান স্তম্ভ হলো বাংলা ভাষা, হাজার বছরের ইতিহাস ও বঙ্গীয় ভূখণ্ড। ফলে একজন বাঙালি ব্যক্তি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা কোনো ধর্মে বিশ্বাসী না হলেও নৃগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় তিনি ‘বাঙালি’ জাতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে আরবিভাষী আরব জাতিসত্তার মধ্যে মুসলিমের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক খ্রিষ্টান ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষ অবস্থান করছেন।
ধর্মীয় পরিচিতি বা ‘উম্মাহ’ ধারণা
‘মুসলিম’ (مسلم) একটি আরবি কৃদন্ত পদ, যার অর্থ আত্মসমর্পণকারী বা শান্তিকামী। ইসলামী আকিদায় ‘উম্মাহ’ শব্দটি এসেছে মূলশব্দ ‘আম্ম্’ (أم) থেকে, যার শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য, গন্তব্য বা এমন এক জনসমাজ যা একই আদর্শের পেছনে ঐক্যবদ্ধ।
‘মুসলিম’ (مسلم) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো যিনি এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কাছে নিজের ইচ্ছাকে সম্পূর্ণ সোপর্দ করেছেন এবং শান্তি ও আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিয়েছেন।
বিশ্বজনীনতা ও সীমানাহীন সীমানা: ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী, গোত্র বা ভাষাভাষীদের একচেটিয়া ধর্ম নয়। বিশ্বজনীন একত্ববাদী জীবনব্যবস্থা হিসেবে এতে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
"হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো" (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)
এখানে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক 'জাতি' ও 'গোত্র' (شعوباً وقبائل) গঠনের প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড রাখা হয়েছে আত্মসংযম ও নৈতিকতাকে (তাকওয়া)।
বর্ণবাদ ও জাতীয় অন্ধত্বের নিরসন: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন,
"কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের, কিংবা কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; একইভাবে কোনো সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।"
একজন সাদা চামড়ার আমেরিকান মুসলিম এবং একজন কালো চামড়ার আফ্রিকান মুসলিম বা একজন বাঙালি মুসলিম ধর্মীয় ভাই-বোনের আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সত্তা, জাতীয়তা (Nationality) এবং আনুগত্যের রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড সম্পূর্ণ আলাদা।
অতএব, ‘মুসলিম’ শব্দটিকে কোনো একক নৃতাত্ত্বিক বা ভৌগোলিক ‘জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান এবং স্বয়ং ইসলামী আকিদার মূল চেতনার পরিপন্থী।
রাজনৈতিক আনুগত্য বনাম বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব: একজন আমেরিকান মুসলিম, আফ্রিকান মুসলিম বা বাঙালি মুসলিম ধর্মীয় আকিদার বিচারে এক 'উম্মাহ' বা বৈশ্বিক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত। তারা একই কাবলার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন এবং একই ধরনের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন।
আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্ব বিদ্যমান থাকলেও তাদের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতাভুক্ত সার্বভৌম ভৌগোলিক পরিচয় সম্পূর্ণ আলাদা। মদিনা সনদেও (Mithaq al-Madina) মদিনায় বসবাসকারী বিভিন্ন গোত্র ও অমুসলিম সম্প্রদায়কে একটি রাজনৈতিক 'উম্মাহ' বা সাংবিধানিক নাগরিক সমাজ হিসেবে গণ্য করার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিভ্রান্তির নিরসন
'জাতি' (Nation) হলো একটি রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক, ভৌগোলিক ও ভাষাভিত্তিক পরিচয়; আর 'উম্মাহ' (Believers' Community) হলো একটি ধর্মীয়, নৈতিক ও বিশ্বাসভিত্তিক বৈশ্বিক সমাজ।
জাতিসত্তার বিকল্প নয় ধর্ম: 'মুসলিম' শব্দটিকে কোনো একক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা ভৌগোলিক জাতি হিসেবে প্রয়োগ করা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যেমন ভুল, তেমনি ইসলামী শাস্ত্রীয় নীতির বিচারেও একটি বিভ্রান্তি। কারণ কোনো বিশ্বাসী ব্যক্তি যদি তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে একমাত্র 'জাতিসত্তা' মনে করেন, তবে তিনি তাঁর নিজস্ব মাতৃভাষা, ভৌগোলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করার ঝুঁকিতে পড়েন।

বিশ্বজুড়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহে ‘জাতির পিতা’র ইতিহাস
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক মানচিত্র, সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন জাতীয় সত্তা প্রতিষ্ঠাতাদের দাপ্তরিকভাবে ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) হিসেবে পরম শ্রদ্ধায় ভূষিত করেছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশের রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হলো:
সৌদি আরব: শাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ
পবিত্র হারামাইন শরিফাইনের দেশ আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম বাদশাহ হলেন শাহ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুর রহমান আল সৌদ (ইবনে সৌদ)। ১৯০২ সালে মাত্র কয়েকটি অনুসারী নিয়ে রিয়াদ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে তাঁর রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক মিশন শুরু হয়। পরবর্তী তিন দশকে তিনি নজদ, হিজাজ, আসির ও আল-আহসা অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রগুলোকে একটি একক প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন। ১৯২৭ সালে যুক্তরাজ্য ‘জেদ্দা চুক্তি’ (Treaty of Jeddah)-র মাধ্যমে তাঁর শাসিত ভূখণ্ডের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়। অবশেষে ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ সালে এক রাজকীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে সমন্বিত এলাকাগুলোকে ‘কিংডম অব সৌদি আরব’ (المملكة العربية السعودية) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রীয় ও দাপ্তরিকভাবে তাঁকে 'প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ' (الملك المؤسس - আল-মালিক আল-মুয়াসসিস) এবং আধুনিক সৌদি রাষ্ট্র কাঠামোর 'জাতির পিতা' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সৌদি আরবের শীর্ষ ইসলামী আলেম ও উলামা পরিষদ রাষ্ট্রীয় এই উপাধিকে কখনোই ইসলামী আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেননি। তাঁদের মতে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) হলেন মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক ও ঈমানী পিতা, আর শাহ আব্দুল আজিজ হলেন আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক সৌদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বা রাজনৈতিক পিতা। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং একটির সাথে অন্যটির কোনো ধর্মীয় বা আকিদাগত বৈপরীত্য নেই।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান
১৯৭১ সালে পারস্য উপসাগরীয় সাতটি বিচ্ছিন্ন আমীরশাহী (আবু ধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, উম আল-কুওয়াইন, রাস আল-খাইমাহ ও ফুজাইরাহ) একত্রিত করে 'সংযুক্ত আরব আমিরাত' নামক আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার মূল রূপকার ছিলেন শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান। ১৯৬৬ সালে তিনি আবু ধাবির শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সুয়েজ খালের পূর্বাঞ্চল থেকে তাদের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলে শেখ জায়েদ আঞ্চলিক স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে পার্শ্ববর্তী আমীরশাহীর শাসকদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা শুরু করেন।
তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে ২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনি খনিজ তেলের রাজস্বকে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং মরুভূমিকে সবুজায়নের কাজে সুপরিকল্পিতভাবে প্রয়োগ করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন তাঁকে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ‘বাবা জায়েদ’ (Father of the Nation) হিসেবে ভূষিত করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ২০১৮ সালকে 'ইয়ার অব জায়েদ' ঘোষণা করে তাঁর রাষ্ট্রদর্শন ও মানবিক অবদান উদযাপন করা হয়।
মালয়েশিয়া: তুংকু আবদুল রহমান
১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মালয়েশিয়ার (তৎকালীন মালয়া) স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেন তুংকু আবদুল রহমান পুত্রা আল-হাজ। তিনি ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (UMNO) এবং পরবর্তীতে তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর (মালয়, চীনা ও ভারতীয়) সমন্বয়ে গঠিত 'অ্যালায়েন্স পার্টি'র প্রধান হিসেবে বহুজাতিক মালয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি লন্ডনে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক সম্মেলনে মালয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি আদায় করেন।
৩১ আগস্ট ১৯৫৭ তারিখে কুয়ালালামপুরের মারদেকা স্টেডিয়ামে তিনি হাজার হাজার জনতার সামনে সাতবার 'মেরদেকা' (freedom) ধ্বনি উচ্চারণ করে 'ফেডারেশন অব মালয়া'র স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩ সালে তাঁর উদ্যোগেই মালয়া, সাবাহ, সারাওয়াক ও সিঙ্গাপুরের (১৯ ১৯৬৫ সালে পৃথক হয়ে যায়) সংমিশ্রণে আধুনিক 'মালয়েশিয়া' গঠিত হয়। মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট, সরকার ও সর্বস্তরের জনগণ তাঁকে দাপ্তরিকভাবে ‘বাপা ক্যমরদেকান’ (Bapa Kemerdekaan - স্বাধীনতার পিতা) এবং ‘বাপা মালয়েশিয়া’ (Bapa Malaysia - মালয়েশীয় জাতির পিতা) হিসেবে সম্মান জানায়।
ইন্দোনেশিয়া: সুকর্ণ (Sukarno)
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন সুকর্ণ। তিনি ১৯২৭ সালে 'পারতাই নাসিওনাল ইন্দোনেশিয়া' (PNI) গঠন করে প্রায় ৩০০ বছরের ডাচ্ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি দখলাদারের পতনের পর, ১৭ আগস্ট ১৯৪৫ সালে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা মোহাম্মদ হাত্তাকে সঙ্গে নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা (Proklamasi Kemerdekaan Indonesia) পাঠ করেন।
সুকর্ণ কেবল স্বাধীনতার ঘোষণাই দেননি, তিনি বহুজাতি ও বহুদ্বীপে বিভক্ত ইন্দোনেশিয়াকে এক সুতায় বাঁধতে 'পঞ্চশীলা' (Pancasila) নামক রাষ্ট্রীয় দার্শনিক ভিত্তি রচনা করেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ডাচদের পুনরায় উপনিবেশ স্থাপনের সামরিক প্রচেষ্টাকে তিনি চার বছরের জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে নস্যাৎ করে দেন। ১৯৫৫ সালে ঐতিহাসিক বান্দুং সম্মেলন আয়োজন করে তিনি বিশ্বব্যাপী জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) সূচনা করেন। ইন্দোনেশীয় রাষ্ট্র ও সংবিধানে তাঁকে 'জাতির পিতা' হিসেবে শ্রদ্ধা জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাপাক ব্যাংসা’ (Bapak Bangsa) এবং ‘প্রোক্লামাতোর’ (Proklamator - স্বাধীনতার ঘোষক) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
তুরস্ক: মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয় এবং মিত্রশক্তির মাধ্যমে তুর্কি ভূখণ্ড বিভাজনের রূপরেখা (সেভ্র চুক্তি) চূড়ান্ত হলে তার বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন সামরিক অধিনায়ক মুস্তাফা কামাল। ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সালের জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধে (Turkish War of Independence) নেতৃত্ব দিয়ে তিনি গ্রিক, ফরাসি ও ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাস্ত করেন এবং ১৯২৩ সালের লোজান চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক তুরস্কের সীমানা সুনির্দিষ্ট করেন।
২৩ এপ্রিল ১৯২০ সালে আঙ্কারায় 'তুর্কি গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি' প্রতিষ্ঠা করে তিনি নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেন এবং ২৯ অক্টোবর ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি খিলাফত বিলুপ্তকরণ, ল্যাটিন বর্ণমালার প্রবর্তন, সিভিল কোড চালুকরণ এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটান। ২৪ নভেম্বর ১৯৩৪ সালে তুর্কি গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি একটি বিশেষ আইন (আইন নং ২৫৯৬) পাস করে মুস্তাফা কামালকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আতাতুর্ক’ (Atatürk) উপাধিতে ভূষিত করে, যার শাব্দিক অর্থ ‘তুর্কিদের পিতা’ বা 'তুর্কি জাতির পিতা'। আইন অনুযায়ী এই বিশেষ পদবিটি অন্য কোনো নাগরিকের ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
পাকিস্তান: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড নিয়ে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান' রাষ্ট্র গঠনের প্রধান রাজনৈতিক রূপকার ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ১৯৩০-এর দশক থেকে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' (Two-Nation Theory)-কে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
তাঁর নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক Struggles-এর ফলে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীন সার্বভৌম 'ডমিনিয়ন অব পাকিস্তান' প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১১ আগস্ট ১৯৪৭ তারিখে পাকিস্তানের সংবিধান সভায় প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি সকল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র, সংবিধান ও প্রশাসনিক ধারায় তাঁকে দাপ্তরিকভাবে ‘বাবা-ই-কওম’ (بابائے قوم - জাতির পিতা) এবং ‘কায়েদে আজম’ (قائد اعظم - মহান নেতা) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের সরকারি ভবন, মুদ্রা (রুপি) ও রাষ্ট্রীয় সনদে তাঁর প্রতিকৃতি মর্যাদার সাথে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
একই ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায়, হাজার বছরের বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার, সার্বভৌমত্ব ও স্বতন্ত্র জাতীয় সত্তা প্রতিষ্ঠার একক রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি (বাঙালির মুক্তির সনদ) এবং ১৯৬৯-এর রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলধারাকে গঠন করেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি স্বাধীনতার পরোক্ষ ডাক দেন এবং ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার মুখে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। তাঁর পরিচালনায় ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক-তে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'জাতির পিতা' (Father of the Nation) হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
আন্তর্জাতিক মুসলিম বিশ্বের 'জাতির পিতা'দের সারণী
বিশ্বজুড়ে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহে রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক 'জাতির পিতা' হিসেবে স্বীকৃত ব্যক্তিত্বদের তথ্য নিচে প্রদান করা হলো:
রাষ্ট্র / দেশ | স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব | রাষ্ট্রীয়/দাপ্তরিক উপাধি | উপাধির শাব্দিক অর্থ & তাৎপর্য |
বাংলাদেশ | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান | জাতির পিতা (Father of the Nation) | স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপকার ও স্থপতি। |
পাকিস্তান | মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ | বাবা-ই-কওম (بابائے قوم) | পাকিস্তানের 'জাতীয় পিতা' বা 'জাতির পিতা'। |
সৌদি আরব | শাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ | ওয়ালিয়ুল আমদ ওয়া মুয়াসসিস (المؤسس) | আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের স্থপতি ও পিতা। |
সংযুক্ত আরব আমিরাত | শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান | ওয়ালিয়া আল-উম্মাহ / বাবা জায়েদ | আরব আমিরাত রাষ্ট্রসংঘের প্রতিষ্ঠাতা পিতা। |
তুরস্ক | মুস্তাফা কামাল | আতাতুর্ক (Atatürk) | 'তুর্কি জাতির পিতা' (Father of the Turks)। |
মালয়েশিয়া | তুংকু আবদুল রহমান | বাপা ক্যমরদেকান (Bapa Kemerdekaan) | মালয়েশিয়ার 'স্বাধীনতার পিতা' বা স্থপতি। |
ইন্দোনেশিয়া | সুকর্ণ (Sukarno) | বাপাক বাংসা (Bapak Bangsa) | ইন্দোনেশীয় রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদের পিতা। |
ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও কুরআনী শব্দ চয়ন: ‘মিল্লাত’ বনাম ‘কওম’ ও ‘জাতি’
ইসলামের মূল উৎস পবিত্র কুরআনুল কারীম এবং হাদীস শরীফের পরিভাষা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আধুনিক ‘জাতির পিতা’ এবং কুরআনে বর্ণিত হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সম্পর্কের মধ্যে কোনো বিপরীতমুখীতা নেই। এখানে মূল বিষয়টি হলো কুরআনের রূপক ভাষা ও আভিধানিক তাৎপর্য।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) কেন ‘মিল্লাতের পিতা’?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাজ্জ-এর ৭৮ নম্বর আয়াতে এরশাদ হয়েছে:
“ওয়াজাহিদু ফিল্লাহি হাক্কা জিহাদিহি... মিল্লাতা আবীকুম ইব্রাহীম, হুয়া সাম্মাকুমুল মুসলিমীনা মিন কাবলু...” (অর্থ: “এবং তোমরা আল্লাহর পথে যথাযথ প্রচেষ্টা চালাও... এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের আকিদা বা আদর্শ। তিনিই পূর্বে তোমাদের নাম রেখেছেন ‘মুসলিম’...”)।
তাফসিরবিদ ইমাম ইবনে কাসীর ও আল-কুরতুবীর বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে 'পিতা' শব্দটি দৈহিক বা বংশগত পিতা অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং তা শ্রদ্ধেয়, আত্মিক ও আদর্শিক পিতা অর্থে প্রযোজ্য হয়েছে।
‘মিল্লাত’ শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ: প্রখ্যাত আরবি অভিধানবিদ আল-রাগেব আল-ইসফাহানী তাঁর ‘মুফরাদাতুল কুরআন’ এ উল্লেখ করেছেন যে, ‘মিল্লাত’ (مِلَّة) হলো একটি বিশেষ দ্বীন বা শরিয়ত, যা কোনো নবীর মাধ্যমে প্রচারিত একত্ববাদী আদর্শিক পথকে নির্দেশ করে। 'মিল্লাত' কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা কিংবা বংশীয় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ নয়; এটি সম্পূর্ণভাবে 'তাওহীদ' (একত্ববাদ) এবং ঈমানভিত্তিক আকিদার প্রতীক।
পবিত্র কুরআনে একাধিক জায়গায় (যেমন: সূরা আল-বাকারা: ১৩০, সূরা আলে ইমরান: ৯৫, সূরা আন-নিসা: ১২৫) ‘মিল্লাতে ইব্রাহিম’-কে অনুসরণ করার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন একনিষ্ঠ একত্ববাদী বা ‘হানিফ’। তিনি কোনো নির্দিষ্ট মেসোপটেমীয় বা কেনানীয় গোত্রীয় সীমানায় আবদ্ধ ধর্ম প্রচার করেননি, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য বিশুদ্ধ তাওহীদের মূলভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
আত্মিক ও আদর্শিক পিতা (Spiritual & Ideological Father)
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে 'আবুল আম্বিয়া' বা নবীদের পিতা বলা হয়। তাঁর দুই পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) ও হযরত ইসহাক (আ.)-এর মাধ্যমে পরবর্তীতে সমস্ত নবুওয়াতের ধারা প্রবাহিত হয়েছে। বনী ইসরাঈলের সমস্ত নবী (হযরত ইয়াকুব, হযরত মূসা, হযরত ঈসা আ. সহ) এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁরই সরাসরি বংশধারায় আগমন করেছেন।
বিশ্বজনীন মুসলিম পরিচয়: সূরা আল-হাজ্জ-এর ৭৮ নম্বর আয়াত অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সকল যুগের ঈমানদার জনগোষ্ঠীকে 'মুসলিম' হিসেবে নামকরণের আদর্শিক যোগসূত্র হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রার্থনার সাথে যুক্ত (সূরা আল-বাকারা: ১২৮)। ফলে তিনি কেবল একটি নির্দিষ্ট যুগের বা ভূখণ্ডের মানুষের পিতা নন, বরং বিশ্বজনীন একত্ববাদী উম্মাহর ‘আদর্শিক ও আত্মিক পিতা’।
পবিত্র কুরআনে ‘কওম’ (Qawm) ও ‘উম্মাহ’ (Ummah)-র ব্যবহার ও পার্থক্য
কুরআনে 'কওম' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠী, সমাজ বা ভৌগোলিক অধিবাসীদের বোঝাতে। যেমন: 'কওমে নূহ', 'কওমে আদ', 'কওমে সামুদ' কিংবা 'কওমে মূসা'। কুরআনিক ব্যবহারে দেখা যায়, 'কওম'-এর ভিত্তি হলো স্থান, কাল, বংশ বা ভাষা। এমনকি একজন নবীও তাঁর দাওয়াতী কাজের খাতিরে কাফের বা অবিশ্বাসী প্রতিবেশীদের 'হে আমার কওম' (যেমন: সূরা হুদ-এ হযরত হুদ ও সালেহ আ.-এর ভাষণ) বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ কওম মূলত সমাজ বা ভৌগোলিক সংহতির ওপর নির্ভর করে, আকিদার ওপর নয়।
‘উম্মাহ’ (أُمَّة)-এর আদর্শিক বন্ধন: অন্যদিকে, 'উম্মাহ' বলতে বোঝায় একটি বিশ্বজনীন সমাজ, যা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ ও আকিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
“তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে” (সূরা আলে ইমরান: ১১০)
'উম্মাহ'-র পরিধি ভৌগোলিক সীমান্ত বা বর্ণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং এর মূল ভিত্তি হলো ঈমান ও তাওহীদ।
নবী করিম (সা.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি: রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা সনদ গঠনের মাধ্যমে মদিনার সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় অঞ্চলভিত্তিক সামাজিক ও গোত্রীয় পরিচয়কে ইতিবাচক হিসেবেই রেখেছিলেন, কিন্তু মুসলিমদের আকিদাগত একক পরিচয়কে 'উম্মাহ' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিদায় হজ্জের ভাষণে ঘোষণা করেন,
‘কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা কোনো অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া’।
আধুনিক রাজনৈতিক ‘জাতি’ (Nation/State) ও কুরআনী ‘মিল্লাত’-এর মৌলিক পার্থক্য
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে 'জাতির পিতা' (Father of the Nation) বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট আধুনিক সার্বভৌম ভূখণ্ড বা রাষ্ট্র গঠনে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যক্তিত্ব। এটি সম্পূর্ণরূপেই একটি ভৌগোলিক, অরাজনৈতিক বা রাজনৈতিক আধুনিক রাষ্ট্রীয় ধারণা, যার সাথে ব্যক্তির শরিয়তি আকিদা বা ধর্মীয় অনুশাসনের সরাসরি বাধ্যবাধকতা যুক্ত নয়।
পরিভাষাগত পার্থক্য: কুরআনে বর্ণিত হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে যখন 'মিল্লাতের পিতা' বলা হয়, তখন এর পরিধি বিশ্বজনীন ও আকিদাগত (Father of the Faith/Creed)। অপরদিকে আধুনিক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে যে 'জাতি' (Nation) বোঝানো হয়, তা রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে নির্ধারিত থাকে।
সাংঘর্ষিকতাহীন অবস্থান: ইসলামী ফিকহ ও আভিধানিক বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডভিত্তিক ‘জাতীয়তা’ (Nationality) এবং ইসলামিক আকিদাভিত্তিক ‘মিল্লাত’ (Creed/Faith) এই দুটি ভিন্ন স্তরের রূপক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়। ফলে আকিদাগতভাবে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে মুসলিম উম্মাহর মিল্লাতের পিতা হিসেবে মানার পাশাপাশি পার্থিব-ভৌগোলিক সীমানায় নিজস্ব রাজনৈতিক রাষ্ট্রের নাগরিক বা জাতীয় পরিচয় বহন করার মধ্যে ভাষাগত বা ধর্মীয় কোনো বিপরীতমুখীতা বিদ্যমান নেই।
বিভ্রান্তির নেপথ্যে: ভাষাগত ভুল ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক মতলব
যেসব গোষ্ঠী ‘হযরত ইব্রাহিম (আ.) মুসলিম জাতির পিতা, তাই শেখ মুজিব বা জিন্নাহ বা আতাতুর্ককে জাতির পিতা বলা যাবে না’ বলে অপপ্রচার চালায়, তাদের মূল উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করলে ভাষাগত ও পরিভাষাগত মৌলিক অজ্ঞতা, ইতিহাস বিকৃতি এবং রাজনৈতিক স্বার্থলিপ্সার তিনটি স্তর স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়:
‘মিল্লাত’ ও ‘Nation’-এর পরিভাষাগত ও ভাষাগত ভুল ব্যাখ্যা
শব্দার্থবিজ্ঞান (Semantics) ও ভাষার প্রয়োগিক দিক থেকে ‘জাতি’ শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। কট্টরপন্থীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভাষা ও কুরআনিক পরিভাষার মধ্যে জেনেশুনে মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
কুরআনিক পরিভাষা (মিল্লাত বা আকিদার পিতা): পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাজ্জ-এর ৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে "মিল্লাতা আবিকুম ইবরাহীম" (مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ)। এখানে ‘মিল্লাত’ (Millat) শব্দের অর্থ আকিদা, ঈমানী পথ, একত্ববাদী ধর্মীয় ঐতিহ্য বা রুহানি আদর্শ। তাফসিরে কুরতুবী ও তাফসিরে ইবনে কাছীরসহ প্রখ্যাত তাফসিরগ্রন্থসমূহে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে মুসলিম উম্মাহর ‘পিতা’ বলা হয়েছে আদর্শিক, সম্মানজনক ও একত্ববাদের (হানিফিয়্যাত) মূল ধারার প্রবর্তক অর্থে, কারণ তিনি সর্বমাতা ও সর্বপিতা হিসেবে একত্ববাদী বিশ্বাসের ভিত নির্মাণ করেছিলেন এবং মুমিনদের নাম দিয়েছিলেন ‘মুসলিম’।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৃতাত্ত্বিক পরিভাষা (Nation বা রাজনৈতিক জাতির পিতা): আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘Nation’ বা ‘রাষ্ট্রীয় জাতি’ বলতে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। এই প্রেক্ষিতে ‘Father of the Nation’ একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় উপাধি, যার অর্থ কোনো স্বাধীন আধুনিক রাষ্ট্র ও জাতীয় অস্তিত্বের প্রধান স্থপতি বা প্রতিষ্ঠাতা।
অনুবাদগত বিভ্রান্তি: ইংরেজি ‘Nation’ শব্দের প্রচলিত বাংলা অনুবাদ করা হয় ‘জাতি’, আবার কুরআনের ‘মিল্লাত’ শব্দেরও আক্ষরিক অনুবাদ বাংলায় করা হয় ‘জাতি’। এই দুটি ভিন্ন শব্দ ও ভিন্ন কাঠামোর পরিভাষাকে জোরপূর্বক একাকার করার ফলেই বিভ্রান্তিটি তৈরি করা হয়। হযরত ইব্রাহিম (আ.) হলেন ঈমান ও মিল্লাতের রুহানি পিতা, হযরত আদম (আ.) হলেন সমগ্র মানবজাতির বংশগত বা জৈবিক পিতা (আবুল বাশার), আর আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন বাঙালি নামক রাষ্ট্রীয় ও ভাষাভিত্তিক জাতির পিতা। এই তিনটি ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং একটির সঙ্গে অপরটির কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাস বিকৃতি ও 'ধর্ম কার্ড' ব্যবহার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ফতোয়াবাজি ও ধর্মাশ্রয়ী বিতর্কের প্রধান নেপথ্য কারণ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসর এবং পরবর্তীকালে উত্থান ঘটা জাসদ ও চরমপন্থী-ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি ও শেখ মুজিবুর রহমানের একক সর্বজনীন অবস্থানকে দুর্বল করতে ধর্মীয় আবেগ বা ‘ধর্ম কার্ড’ ব্যবহার শুরু করে।
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ (৮০-৯০%) অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। এই ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে যে, রাষ্ট্রীয় জাতির পিতাকে স্বীকার করা নাকি ধর্মীয় আকিদা বা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রতি ঈমানী অবমাননার শামিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক এজেন্ডা পুনর্বাসন করা।
তুরস্কের আধুনিক রাষ্ট্রগঠনে মোস্তফা কামাল ‘আতাতুর্ক’ (তুর্কিদের পিতা), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটন ‘ফাদার অব হিস কান্ট্রি’ কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় নে hisন ম্যান্ডেলা জাতির পিতা হিসেবে সমাদৃত। পৃথিবীর কোনো মুসলিম প্রধান দেশে বা বিজ্ঞ কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর কাছে এই রাষ্ট্রীয় উপাধিগুলো ধর্মীয় আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচিত হয়নি, একমাত্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক জলঘোলা করতেই এই অসৎ বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের না বুঝে আক্ষরিক অনুসরণ ও মানসিক ভয়
সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী, যাঁদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব কিংবা কুরআনিক তাফসিরশাস্ত্রের গভীর চর্চা নেই, তারা এই আক্ষরিক ফতোয়ার বিভ্রান্তিতে সহজেই নিপতিত হন। অধিকাংশ মানুষ জৈবিক পিতা, রুহানি পিতা এবং রাজনৈতিক/রাষ্ট্রীয় পিতার মধ্যকার সূক্ষ্ম ও বাস্তব পার্থক্য অনুধাবন করতে পারেন না। তারা মনে করেন 'পিতা' শব্দটি কেবলমাত্র বংশগত বা একমাত্র ধর্মীয় অর্থেই প্রযোজ্য।
ওয়াজ মাহফিল ও সামাজিক মাধ্যমে আংশিক ও ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের ধর্মীয় ভয় বা পাপবোধ তৈরি করা হয়। তাদের বোঝানো হয় যে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিলে তাদের পরকালীন ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইসলামি শারীয়াহ অনুযায়ী, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কেও মুমিনদের জন্য পিতা সমতুল্য (নাসাঈ, হাদিস: ৪০) এবং তাঁর স্ত্রীদের 'উম্মাহর মাতা' (সূরা আহজাব: ৬) হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর মানে এই নয় যে কেউ নিজ জন্মদাতা পিতা বা মাতাকে অস্বীকার করছে। একইভাবে রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে জাতির পিতা বলা কোনো অবস্থাতেই পরকালীন আকিদা বা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রতি সম্মানের বিন্দুমাত্র হানি ঘটায় না। এটি সম্পূর্ণ অমূলক, অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক অজ্ঞতার ফসল।
শেখ মুজিবুর রহমান কেন ‘বাঙালি জাতির পিতা’?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক রূপরেখা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড এবং মানচিত্র অর্জনে যে নেতা একক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন, তাঁকেই সেই রাষ্ট্রের ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, তুরস্কের মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতোই বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রীয় রূপকারের পর্যায়ে।
হাজার বছরের অনৈক্য ভেঙে একক রূপ দান
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলাদেশ অঞ্চল ভৌগোলিক ও প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন স্বাধীন জনপদে (যেমন গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, বরেন্দ্র) বিভক্ত ছিল। পাল, সেন, সুলতানি, মুঘল এবং ব্রিটিশ শাসনামলে বাঙালি সর্বদা হয় রাজন্যবর্গ অথবা বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তির শাসনে থেকেছে। প্রাচীনকাল থেকেই ভাষার ভিত্তিতে বাঙালি একটি একক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের জন্য একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।
বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ধর্মভিত্তিক ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’-এর ওপর ভর করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও ভাষার স্বকীয়তাকে বিপন্ন করে তোলে। শেখ মুজিবুর রহমানই ইতিহাসের প্রথম রাজনৈতিক নেতা, যিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় একটি জনগোষ্ঠীর স্থায়ী রাষ্ট্রীয় ভিত্তির জন্য প্রধান নিয়ামক। তিনি ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে অতিক্রম করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাঙালিকে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর অসাম্প্রদায়িক আদর্শে ঐক্যবদ্ধ করেন।
আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার আন্দোলন
শেখ মুজিবুর রহমানের একক নেতা হিসেবে উত্থান ও জাতির পিতা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা ধারাবাহিক সংগ্রামের ফল:
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৪৮–১৯৫২): ১৯৪৮ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করেন। ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে গঠিত 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ' এবং ১৯৪৯ সালে গঠিত 'আওয়ামী মুসলিম লীগ'-এর প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন ও কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন (১৯৬৬): ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক মুক্তির সনদে রূপান্তরকারী ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি পেশ করেন। এটি ছিল বাঙালির স্বায়ত্বশাসনের দাবির 'ম্যাগনা কার্টা' (Magna Carta)।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯): ৬-দফার গণজোয়ার স্তব্ধ করতে ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা'র অভিযোগে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য) দায়ের করে। এই বিচারকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো বাংলা। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন: ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগুরুত্ব অর্জন করে। এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির একমাত্র বৈধ ও গণতান্ত্রিক মুখপাত্রের স্বীকৃতি লাভ করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম
১৯৭০ সালের গণতান্ত্রিক রায়কে নস্যাৎ করতে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক জান্তা যখন ষড়যন্ত্র শুরু করে, তখন বঙ্গবন্ধু আপসহীন প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ১৮ মিনিটের ভাষণে তিনি পুরো জাতিকে যুদ্ধের কৌশলগত নির্দেশনা প্রদান করেন। ইউনেস্কো (UNESCO) ২০১৭ সালে এই কালজয়ী ভাষণকে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে 'মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার'-এ অন্তর্ভুক্ত করে।
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিচালিত 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া গণহত্যার মুখে, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে (রাত ১২:২০ মিনিটে) গ্রেপ্তার হওয়ার মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নামেই গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার (মুজিবনগর সরকার) এবং পরিচালিত হয় মুক্তিবাহিনী। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি মুক্ত বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি মাত্র এক বছরের মধ্যে জাতিকে উপহার দেন একটি লিখিত আধুনিক সংবিধান, যা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। একই সাথে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ব দরবারে এবং জাতিসংঘে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি অর্জন করে।
কুরআনিক ভাষাতত্ত্ব 'কওম', 'শূ'উব', 'উম্মাহ' ও 'মিল্লাত' এর পার্থক্য
ইসলামী শরীয়াহ ও কুরআনের পরিভাষা গভীরভাবে অনুধাবন না করে আক্ষরিক অর্থ প্রয়োগ করতে গেলেই এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। পবিত্র কুরআনে মানবজাতির সামাজিক, ভৌগোলিক ও আকিদাগত শ্রেণীবিন্যাস বোঝাতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে:
শূ'উব (شعوب) ও ক্ববাইলি (قبائل) – জাতীয় ও গোত্রীয় পরিচয়: পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন:
“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন ‘শূ'উব’ (জাতীয় সত্তা/বৃহৎ জনগোষ্ঠী) ও ‘ক্ববাইলি’ (গোত্র)-তে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো...”
এখানে 'শূ'উব' (شعوب) শব্দটির আধুনিক অর্থ হলো নেশন বা ভৌগোলিক/ভাষাভিত্তিক জাতি। আল্লাহ তাআলা নিজেই মানুষের মধ্যে ভাষা, বর্ণ ও ভূখণ্ডভিত্তিক এই বৈচিত্র্য তৈরি করেছেন।
কওম (قوم) – ভাষাগত ও নৃতাত্ত্বিক সমাজ: কুরআনে 'কওম' শব্দটি ৩১৮ বার এসেছে। এটি নির্দিষ্ট ভাষার বা ভূখণ্ডের জনগণকে নির্দেশ করে (যেমন: কওমে মূসা, কওমে নূহ)। নূহ (আ.) বা মূসা (আ.) তাঁদের অবাধ্য কওমকেও "হে আমার কওম" (ইয়া কওমি) বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ ঈমান না আনলেও ভৌগোলিক ও বংশীয় বিচারে কওমের সম্পর্ক ছিন্ন হয় না।
উম্মাহ (أمة) – বিশ্বজনীন ধর্মীয় গোষ্ঠী: 'উম্মাহ' হলো একটি একত্ববাদী বিশ্বাসভিত্তিক বৈশ্বিক সমাজ, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা, রঙ বা ভাষা নেই।
মিল্লাত (ملة) – আদর্শিক ও বিশ্বাসগত পথ: কুরআনে যেখানেই হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রসঙ্গ এসেছে, সেখানেই 'মিল্লাত' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন: মিল্লাতা আবীকুম ইব্রাহীম)। এর অর্থ দ্বীন, আকিদা বা তাওহীদী আদর্শের উত্তরাধিকার।
দেশপ্রেম ও স্বজাতির প্রতি টান: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
নিজের ভূখণ্ড ও নিজের ভাষাভাষী মানুষের স্বাধীনতা ও সুরক্ষার জন্য লড়া ইসলামে প্রশংসনীয় কাজ। মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) কাতরাচ্ছিল এবং মক্কার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন:
“আল্লাহর কসম! তুমি আল্লাহর জমিনের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম এবং আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় শহর। আমাকে যদি তোমার কোল থেকে বের করে না দেওয়া হতো, তবে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” (জামে তিরমিযী)
প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাঙালি মুসলিমের দ্বৈত সত্তার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন:
“আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য। প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিয়াত্ত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে তা মালা-তিলক বা টুপি-লুঙ্গিতে ঢাকার উপায় নেই।”
‘পিতা’ ধারণার রূপক বনাম আক্ষরিক রূপ
শব্দবিজ্ঞানের নীতি ও সামাজিক ব্যবহার অনুযায়ী ‘পিতা’ শব্দটি কেবল আক্ষরিক ও জৈবিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্মান, সম্মানীয় অবস্থান, কোনো তত্ত্ব বা ধারণার আবিষ্কারক কিংবা কোনো কাঠামোর প্রতিষ্ঠাতা বোঝাতে সমাজে ও বিভিন্ন বিজ্ঞানে ‘পিতা’ রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ঔরসজাত পিতা (Biological Father): যিনি সন্তানকে জন্ম দেন এবং যাঁর সাথে সন্তানের রক্ত, ডিএনএ ও বংশগত সম্পর্ক বিদ্যমান। পরিবার গঠন ও ইসলামী শরীয়াহর উত্তরাধিকার আইন (মিরাস) কেবল এই জৈবিক পিতার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক একটি কাঠামো।
আত্মিক ও ঈমানী পিতা (Spiritual & Ideological Father): ধর্মীয় বা আকিদাগত ক্ষেত্রে আদর্শিক নেতৃত্বকে রূপক অর্থে ‘পিতা’ বলা হয়। যেমন ইসলাম ধর্মে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে মুসলিম জাতির একত্ববাদী আকিদার পিতা বা প্রতিষ্ঠাতা রূপক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি আত্মিক বিশ্বাস ও দ্বীনি ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত।
জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রবর্তক বা ‘পিতা’: জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান ও গবেষণার বিভিন্ন শাখায় যাঁদের অবদান প্রাথমিক বা মৌলিক ভূমিকা রেখেছে, তাঁদের সম্মানার্থে সেই বিষয়ের ‘পিতা’ বলা হয়:
রসায়নের পিতা: জাবের ইবনে হাইয়ান
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পিতা: ইবনে সিনা
সমাজবিজ্ঞানের পিতা: ইবনে খালদুন
ইতিহাসের পিতা: হেলেডোটাস
ভূ-রাজনৈতিক ও আধুনিক রাষ্ট্রীয় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation): আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞানুযায়ী, যিনি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন, জনগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত করা এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে কেন্দ্রীয় রূপকারের ভূমিকা পালন করেন, তাঁকে সেই রাষ্ট্রের ‘জাতির পিতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিশ্বের প্রায় সকল প্রধান স্বাধীন রাষ্ট্রেই এই রূপক ও রাষ্ট্রীয় উপাধির স্বীকৃতি রয়েছে:
যুক্তরাষ্ট্র: জর্জ ওয়াশিংটন
তুরস্ক: মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক
ভারত: মহাত্মা গান্ধী
দক্ষিণ আফ্রিকা: নেলসন ম্যান্ডেলা
সিঙ্গাপুর: লি কুয়ান ইউ
ইসলামি শরীয়াহ ও রাষ্ট্রদর্শনের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ: ইসলাম বা আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনে রাজনৈতিক বা জাতীয় রূপকারকে ‘জাতির পিতা’ বলায় আকিদাগত কোনো জটিলতা নেই, কারণ এটি কোনো অলৌকিক বা ধর্মীয় উপাসনার বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্মানসূচক একটি পরিভাষা। রূপক হিসেবে রাজনৈতিক স্বাধীনতার রূপকারকে ‘জাতির পিতা’ বলা রাষ্ট্রীয় সত্তাকে রূপদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই একটি অংশ।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক রাষ্ট্রীয় ‘জাতির পিতা’ এবং ইসলামী আকিদার ‘মিল্লাতের পিতা’ দুটি ভিন্ন পরিমণ্ডলের, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন তত্ত্বের বিষয়। একটি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সীমানার ইতিহাস, অন্যটি ধর্মীয় আকিদা ও আত্মিক বিশ্বাসের বন্ধন।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) হলেন বিশ্বজুড়ে সমস্ত তাওহীদবাদী মুসলিমের আত্মিক ও ঈমানী ‘মিল্লাতের পিতা’। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন আধুনিক ভৌগোলিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের এবং বাঙালি ভাষাভাষী স্বাধীন জনগোষ্ঠীর ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation)।
পাকিস্তানে জিন্নাহকে ‘বাবা-ই-কওম’ বললে যদি পাকিস্তানবাসীর ঈমান নষ্ট না হয়, সৌদি আরবে ইবনে সৌদকে প্রতিষ্ঠাতা বললে যদি তাদের তাওহীদের ঘাটতি না হয়, তবে স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক মর্যাদা ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকার করলে কোনো বাঙালি মুসলিমের ঈমানী আকিদার ক্ষতি হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবে এবং দ্বীনকে দ্বীন হিসেবে বোঝা ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই একটি সচেতন, শিক্ষিত ও সংহতিবদ্ধ জাতি গড়ে তোলা সম্ভব। অপপ্রচার ও কৃত্রিম বিতর্ক দূরে ঠেলে আমাদের উচিত সঠিক তথ্য ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সত্যকে ধারণ করা।
তথ্যসূত্র:
১. সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:১৩): মানবজাতির বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্তি এবং তাকওয়ার পরিচয় সংক্রান্ত আয়াত।
২. সূরা আল-হাজ্জ (২২:৭৮): হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে মুসলিমদের 'আদর্শিক পিতা' (মিল্লাতা আবীকুম) হিসেবে উল্লেখ।
৩. সূরা আল-বাকারা (২:১২৮, ১৩০), সূরা আলে ইমরান (৩:৯৫, ১১০) এবং সূরা আন-নিসা (৪:১২৫): 'মিল্লাতে ইব্রাহিম' ও 'শ্রেষ্ঠ উম্মাহ' সংক্রান্ত আয়াতসমূহ।
৪. সূরা আল-আহজাব (৩৩:৬): মহানবী (সা.)-এর স্ত্রীদের 'উম্মাহর মাতা' হিসেবে স্বীকৃতি।
৫. তাফসিরে ইবনে কাসীর (Tafsir Ibn Kathir): ইমাম ইবনে কাসীর কর্তৃক সূরা আল-হাজ্জ-এর ৭৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা।
৬. তাফসিরে কুরতুবী (Tafsir al-Qurtubi): ইমাম আল-কুরতুবী কর্তৃক কুরআনের 'মিল্লাত' ও 'পিতা' ধারণার ব্যাখ্যা।
৭. সুনান আন-নাসায়ী (Sunan an-Nasa'i): হাদিস নং ৪০ (বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা.-এর মুমিনদের জন্য পিতা সমতুল্য অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত হাদিস)।
৮. ইমাজিন্ড কমিউনিটিজ (Imagined Communities, 1983): বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson) রচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জাতীয়তাবাদ বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থ।
৯. ওয়েস্টফালিয়া চুক্তি (Peace of Westphalia, 1648): আধুনিক সার্বভৌম 'জাতিরাষ্ট্র' (Nation-State) ধারণার ঐতিহাসিক উৎস।















