ফ্রীডম পার্টি থেকে এনসিপি – ১৫ আগস্টের খুনীচক্র ও নব্য বিশ্বাসঘাতক চক্র
১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

TruthBangla

স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্মগাথা যেমন বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর লাখো শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা, তেমনি এর বিপরীত পিঠে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া গভীর বিশ্বাসঘাতকতা, নৃশংসতা আর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের এক অন্তহীন আখ্যান। কোনো জাতির ইতিহাসই সরলরেখায় চলে না, তবে যখন ইতিহাসের বিশ্বাসঘাতকেরা নতুন অবয়বে, নতুন স্লোগান আর নতুন রাজনৈতিক মোড়কে পুনরুজ্জীবিত হতে চায়, তখন তা পুরো জাতির জন্য এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেবল এ দেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়নি; বরং সেটি ছিল একটি সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের মূলস্তম্ভকে উপড়ে ফেলে তার মৌলিক চেতনাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক আন্তর্জাতিক নীলনকশা। ইতিহাসের সেই ঘৃণ্যতম খুনীরা হত্যাকাণ্ডের পর কেবল পার পেয়েই যায়নি, বরং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে, রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং পবিত্র সংসদকে কলঙ্কিত করে রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদও আস্বাদন করেছে।
১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত এজেন্ট কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল।
২০২৪ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই “দিল্লি না ঢাকা”, “গোলামি না আজাদি” স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগে আশির দশকের সেই কুখ্যাত ‘ফ্রীডম পার্টি’ কি আসলেই ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে, নাকি নতুন কোনো নামে, নতুন কোনো প্রগতিশীল বা নাগরিক অবয়বে তারা আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে? আশির দশকের খুনিদের ‘ফ্রীডম পার্টি’ আর বর্তমানের ‘নব্য রাজনৈতিক শক্তি’ বা এনসিপি-র মধ্যে কি কোনো অদৃশ্য সুতোর টান রয়েছে?
ফ্রীডম পার্টির জন্মকথা: বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর, খুনি চক্রটি কিন্তু খুব বেশিদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে সরাসরি থাকতে পারেনি। ৩ নভেম্বরের খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের মুখে খুনিরা একটি বিশেষ বিমানযোগে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তাদের এই পলায়ন পর্বের রুটটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা প্রথমে ইয়াঙ্গুন (তৎকালীন রেঙ্গুন) হয়ে ব্যাংকক যান। সেখান থেকে তাদের মূল আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র পাকিস্তান হয়ে তারা লিবিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় দশক ধরে লিবিয়াকেই নিরাপদ ও মূল কৌশলগত আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শেখ মুজিবের আত্মস্বীকৃত হত্যাকারীরা।
হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে পালিয়ে থাকলেও, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক দৃশ্যপট তাদের অনুকূলে চলে যায়। তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনের রূপ দিয়ে খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তীতে তাদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনে মর্যাদাপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন। জিয়াউর রহমানের পর আরেক সেনাশাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে এই খুনিরা সরাসরি দেশে ফেরার এবং প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে রাজনীতি করার ঐতিহাসিক সুযোগ পায়।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ এবং মেজর বজলুল হুদা মিলে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। লিবিয়ার তৎকালীন স্বৈরাচারী নেতা মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির সরাসরি আর্থিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তারা ঢাকার বিলাসবহুল হোটেল শেরাটনে ১৯৮৭ সালের ৩ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ফ্রীডম পার্টি’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
এই দলটির মূল লক্ষ্য কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা ছিল না; তাদের মূল এজেন্ডা ছিল তিনটি। ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে একটি 'ঐতিহাসিক বিপ্লব' হিসেবে দেশের মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠিত করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে মুছে ফেলা। দেশে একটি স্থায়ী পাকিস্তানপন্থী ও ভারত-বিদ্বেষী রাজনৈতিক ধারা তৈরি করা।
১৯৮৬ সালের বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনে এই খুনিদের দলকে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এমনকি খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করে। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের প্রত্যক্ষ মদত ও ভোট কারচুপির মাধ্যমে খুনি বজলুল হুদারা তখন পবিত্র জাতীয় সংসদে বসার সুযোগ পায়। এটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ অবমাননা এবং উগ্রবাদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রথম সোপান।
মুয়াম্মার গাদ্দাফির লিবীয় কানেকশন ও এরশাদের স্বর্ণযুগ
স্বৈরাচারী এরশাদের আমল ছিল এই খুনিদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক স্বর্ণযুগ। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনিক মদতে তারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এক সশস্ত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৯৮৮ সালের ভোটারবিহীন ও প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে খুনি বজলুল হুদা জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন, যা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের একটি অন্যতম কালো অধ্যায়।
তবে ফ্রীডম পার্টির এই বিশাল সাংগঠনিক ও সামরিক ব্যয়ভার কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসত না; এটি পুরোপুরি পরিচালিত হতো লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির বিপুল তেলের টাকায়। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি এবং বাণিজ্যিক শহর বেনগাজিতে কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশিদ দুজনেই রাষ্ট্রীয় ভিআইপি অতিথির মর্যাদা পেতেন। লিবিয়া সরকার তাদের সুরক্ষার পাশাপাশি সেখানে বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুযোগ করে দেয়। বেনগাজিতে মুজিবের হত্যাকারীদের একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অফিস ছিল, যা মূলত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য খুনিদের (যেমন শরীফুল হক ডালিম বা রাশেদ চৌধুরী) সাথে যোগাযোগের গোপন সমন্বয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
খন্দকার আবদুর রশিদ ত্রিপোলিতে গাদ্দাফির দেওয়া পুঁজিতে একটি বিশাল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি গড়ে তোলেন। অন্যদিকে, সৈয়দ ফারুক রহমান লিবিয়ায় জনশক্তি রফতানির একচেটিয়া লাইসেন্স পান। এই কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিক লিবিয়ায় পাঠানো হতো, এবং সেইসব শ্রমিকদের বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি ফ্রীডম পার্টির দলীয় তহবিলের লেভি হিসেবে কেটে নেওয়া হতো।
এই অর্থ ও লজিস্টিক সহায়তার বিনিময়ে বাংলাদেশে লিবিয়ার রাজনৈতিক ও আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। ফারুক ও রশিদ মিলে ঢাকায় গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ-লিবিয়া ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি’। ঢাকার কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্রাদার গাদ্দাফি কিন্ডারগার্টেন স্কুল’। শুধু তাই নয়, মুয়াম্মার গাদ্দাফির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন বা সমাজতন্ত্র-বিরোধী তত্ত্বের সংকলন ‘গ্রিন বুক’ (Green Book) বাংলায় অনুবাদ করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করার ব্যবস্থা করে এই দুই খুনি। লিবিয়া থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা এই ফ্রীডম পার্টির ক্যাডাররা (যাদের ‘লিবিয়া ফেরত ক্যাডার’ বলা হতো) ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে প্রকাশ্যে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর ওপর নৃশংস হামলা চালাত।
সিআইএ ও আইএসআই-এর নীলনকশা
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে ফ্রীডম পার্টির উত্থান কেবল কোনো অভ্যন্তরীণ সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না, এর পেছনে ছিল অত্যন্ত গভীর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ‘দৈনিক খবর’ পত্রিকায় দেওয়া এক বিস্ফোরক ও ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারে কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক গোপন সত্যকে উন্মোচিত করে দেয়। ফারুক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছিলেন যে, ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার ঠিক আগে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ‘সবুজ সংকেত’ বা গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছিলেন।
সেই সাক্ষাৎকারে এবং পরবর্তী সময়ের তদন্তে আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। খুনিরা কেবল ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে মেরেই ক্ষান্ত হতে চায়নি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দি অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান) নির্মমভাবে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা এসেছিল সরাসরি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর প্রত্যক্ষ ইশারায়।
আইএসআই এবং সিআইএ-র এই যৌথ নীলনকশার উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও স্পষ্ট:
"আওয়ামী লীগ তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মূল চালিকাশক্তিকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন ও রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করে দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন কেউ স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়িয়ে এই অঞ্চলে পাকিস্তান ও তার পশ্চিমা মিত্রদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে আঘাত করতে না পারে।"
ফ্রীডম পার্টি ছিল মূলত এই দুটি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার দীর্ঘমেয়াদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক ফ্রন্ট মাত্র।
‘দিল্লি না ঢাকা?’ স্লোগানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্য
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং রাজপথে কিছু স্লোগান অত্যন্ত জাদুকরী ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এবং বর্তমান ২০২৫-২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজপথে তরুণ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে খুব জোরেশোরে একটি স্লোগান দিতে দেখা যায় "দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা"। এর পাশাপাশি "ইনকিলাব" (বিপ্লব) ও "আজাদি" (মুক্তি)-র মতো শব্দগুলো প্রতিনিয়ত দেয়াল লিখন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং রাজনৈতিক সমাবেশে বারংবার ধ্বনিত হচ্ছে।
সাধারণ ও রাজনীতি-অচেতন শিক্ষার্থীদের মুখে এই স্লোগানটি প্রথম দেখায় অত্যন্ত দেশপ্রেমমূলক, সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী এবং আবেগপ্রসূত মনে হলেও, এর রাজনৈতিক ইতিহাস ও আদি উৎস অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বিতর্কিত। আমরা যদি একটু পিছন ফিরে তাকাই এবং আশির দশকের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভিডিও ফুটেজ, গোয়েন্দা নথিপত্র ও দলীয় দলিলাদি বিশ্লেষণ করি, তবে এক চমকপ্রদ ও শিউরে ওঠার মতো তথ্য বেরিয়ে আসে।
১৯৮০-এর দশকে ফ্রীডম পার্টি এবং তাদের সহযোগী আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন ‘প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি’ (প্রগশ) প্রথম এই স্লোগানটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছিল। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার এক বিশাল জনসভায় ফ্রীডম পার্টির মঞ্চ থেকে ঠিক এই স্লোগানটিই প্রথম দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম আত্মস্বীকৃত খুনি মেজর শাহরিয়ার রশিদ খান। তিনি মাইক্রোফোনের সামনে অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে হাত উঁচিয়ে জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, "দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা।"
যাঁরা আজ এই স্লোগানকে নতুন প্রজন্মের একবিংশ শতাব্দীর 'বিপ্লবী ও সার্বভৌম স্লোগান' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করছেন, তাঁরা কি আসলে জানেন এর পেছনে রয়েছে ১৫ আগস্টের খুনিদের ঠান্ডা মাথার মস্তিষ্ক? ফ্রীডম পার্টির মূল রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে এমন একটি উগ্র মোড় দেওয়া, যা মুক্তিযুদ্ধের পরম বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে চিরতরে দূরত্ব তৈরি করবে এবং পরোক্ষভাবে দেশকে আবার সেই ১৯৭১ পূর্ববর্তী পাকিস্তানি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত তিনটি: তীব্র ভারত-বিদ্বেষ ও ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের মন জয় করা এবং জনসমর্থন আদায় করা। বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারাকে একাত্তরের চেতনার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে ‘জাতীয় মুক্তি বা বিপ্লব’ হিসেবে জায়েজ করা।
ফ্রীডম পার্টির পাশাপাশি তৎকালীন সময়ে সক্রিয় থাকা 'প্রগশ' (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি)-র মূল উদ্দেশ্যই ছিল '১৫ আগস্টের বিপ্লবের আদর্শ বাস্তবায়ন করা'। এই সংগঠনগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের মানুষের মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী মনোভাব গেঁথে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল। আজকের দিনে এসে যখন হুবহু একই স্লোগান ও বয়ান আমরা নতুন মোড়কে দেখতে পাই, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে ইতিহাসের সেই পুরনো খেলোয়াড়েরাই নতুন জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সশস্ত্র হামলা (১৯৮৯): ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাস
ফ্রীডম পার্টি যে কেবল একটি রাজনৈতিক দল ছিল না, বরং একটি সুপ্রশিক্ষিত ও খুনিদের দ্বারা পরিচালিত জঙ্গি সদৃশ সংগঠন ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্টের হামলা।
তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে সপরিবারে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ফ্রীডম পার্টির শীর্ষ নেতাদের নির্দেশে তাদের সশস্ত্র ক্যাডাররা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করে। এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল ফ্রীডম পার্টির কুখ্যাত ক্যাডার কাজল ও হুদা। শেখ হাসিনার নিরাপত্তা রক্ষীদের প্রতিরোধের কারণে সে যাত্রা তিনি বেঁচে যান।
এই হামলাটি প্রমাণ করে যে, ফ্রীডম পার্টির মূল কৌশলই ছিল প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করা এবং দেশে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক শূন্যতা ও ত্রাস তৈরি করা যা বর্তমানের ‘মব জাস্টিস’ বা বিচারহীনতার সংস্কৃতির আদি রূপ।
‘ফ্রীডম ছাত্র পার্টি’ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উগ্রবাদের বিস্তার
আশির দশকের শেষভাগে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফ্রীডম পার্টি তাদের ছাত্র সংগঠন ‘ফ্রীডম छात्र পার্টি’-র মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে এক নতুন ও হিংস্র ধারা তৈরি করেছিল।
ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট: তারা মূলত ডানপন্থী ও চরমপন্থী ভাবধারার সাধারণ ছাত্রদের টার্গেট করত।
অস্ত্রের রাজনীতি: লিবিয়া থেকে চোরাপথে আসা আধুনিক সাব-মেশিনগান ও চাইনিজ রাইফেল প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রদর্শন করেছিল এই ফ্রীডম ছাত্র পার্টির ক্যাডাররা।
বর্তমান সমীকরণ: বর্তমান ২০২৪-২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও রাজপথে যেসব নব্য নাগরিক বা উগ্রপন্থী ছাত্র প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে, তাদের কথা ও কাজের ধরন হুবহু ফ্রীডম ছাত্র পার্টির মতোই উগ্র, ডমিনেটিং এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চড়াও হওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন।
লিবিয়ার মরুভূমির গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প
গাদ্দাফির লিবিয়ায় ফ্রীডম পার্টির ক্যাডারদের কেবল সাধারণ চাকরিই দেওয়া হয়নি, বরং তাদের জন্য ত্রিপোলি ও বেনগাজির অদূরে লিবিয়ান সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিশেষ ‘গোপন কমান্ডো ট্রেনিং ক্যাম্প’ স্থাপন করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ থেকে যেসকল যুবকদের জনশক্তি রপ্তানির নামে লিবিয়ায় পাঠানো হতো, তাদের মধ্য থেকে শারীরিকভাবে দক্ষ ও উগ্র মনস্তত্ত্বের যুবকদের বাছাই করে এই ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের ভারী অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরক তৈরি (যা আজকের আইইডি বা হাতবোমার আদি রূপ) এবং গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এই লিবিয়া ফেরত ক্যাডাররাই পরবর্তীতে বাংলাদেশে এসে ফ্রীডম পার্টির ‘অ্যাকশন স্কোয়াড’ হিসেবে কাজ শুরু করে।

ফ্রীডম পার্টির প্রেতাত্মা নব্য বিশ্বাসঘাতক চক্র এনসিপি ও মব সন্ত্রাস
কাগজে-কলমে বা নির্বাচন কমিশনের খাতায় ‘ফ্রীডম পার্টি’ আজ হয়তো একটি বিলুপ্ত বা মৃত সংগঠন, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় কোনো উগ্রবাদী আদর্শ বা তাদের 'লং-টার্ম এসাইনমেন্ট' এত সহজে শেষ হয়ে যায় না। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বর্তমানের এনসিপি (National Civic Party / নব্য রাজনৈতিক শক্তি) বা এই জাতীয় প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে আশির দশকের ফ্রীডম পার্টিরই একটি আধুনিক এক্সটেনশন, ডিজিটাল সংস্করণ বা বর্ধিত রূপ।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে ফ্রীডম পার্টির ক্যাডাররা যেভাবে রাজপথে ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে আগ্নেয়াস্ত্র ও পেশিশক্তি প্রদর্শন করে রাজনৈতিক আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করত, বর্তমানের কিছু সংগঠনের কর্মকাণ্ডে তার হুবহু প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আশির দশকে ফ্রীডম পার্টি যে ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’র বুলি আওড়াত, বর্তমানের এনসিপির রাজনৈতিক শক্তির ভাষা ও শব্দচয়ন হুবহু এক।
আমরা যদি ফ্রীডম পার্টি এবং বর্তমানের এই নব্য শক্তির মধ্যে একটি নিবিড় তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি, তবে কয়েকটি প্রধান মিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
আদর্শিক মিল: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি এবং স্বাধীনতার স্থপতির ওপর সর্বাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ও গাঠনিক আঘাত হানাই ছিল ফ্রীডম পার্টির মূল লক্ষ্য। বর্তমানেও আমরা দেখছি একদল মানুষ সুকৌশলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ইতিহাসকে বিকৃত করার এবং মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক বিশাল মিশনে নেমেছে।
নেতৃত্বের মিল: ইতিহাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুনি ফারুক-রশিদরা যেভাবে নিজেদের দেশের 'ত্রাতা' বা 'বিপ্লবী' হিসেবে আমজনতার সামনে তুলে ধরত, বর্তমানের কিছু তরুণ ও উগ্র নেতাও ঠিক একই ধরনের স্বৈরাচার-বিরোধী বয়ান তৈরি করে নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরের বিপ্লবী হিসেবে জাহির করছে।
ক্যাডার ও মব কালচার: ফ্রীডম পার্টির মূল শক্তি ছিল তাদের লিবিয়া ফেরত ক্যাডারদের জঙ্গল আইন। আজ যখন দেখা যায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট কিছু নব্য সংগঠনের ক্যাডাররা সারা দেশে 'মব জাস্টিস' বা মব সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বেড়াচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত, বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে, তখন সেই আশির দশকের ফ্রীডম পার্টির বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথাই মনে পড়ে যায়। এই তথাকথিত 'নাগরিক পার্টি' বা এনসিপি-র ভেতরের কাঠামোটি যদি আমরা গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে সেখানে সেই পুরনো খুনিদের আদর্শিক উত্তরাধিকারই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়।
ফ্রীডম পার্টি বনাম নব্য রাজনৈতিক শক্তি (এনসিপি)
ইতিহাসের এই দুই ধারার মধ্যকার মিল ও কৌশলগত সাদৃশ্যগুলোকে সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমৃদ্ধ ও বিশ্লেষণী ছক দেওয়া হলো:
সূচক / বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র | আশির দশকের ফ্রীডম পার্টি (Freedom Party) | বর্তমানের নব্য রাজনৈতিক শক্তি / এনসিপি (NCP) |
মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য | ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলা। | জাতীয় শোক দিবস বাতিল, বঙ্গবন্ধুর ছবি ও ভাস্কর্য অবমাননা এবং স্বাধীনতার ইতিহাস পুনর্লিখন। |
প্রধান স্লোগান ও ভাষা | "দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা", "ইনকিলাব", "আজাদি"। | "দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা", "ইনকিলাব", "আজাদি" (হুবহু একই স্লোগানের পুনরুজ্জীবন)। |
বিদেশি পৃষ্ঠপোষক ও অর্থায়ন | লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি (সরাসরি ফান্ড), পাকিস্তান (ISI) ও সিআইএ-র সবুজ সংকেত। | পাকিস্তানের আইএসআই (ISI), পশ্চিমা কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো ফান্ডিং। |
মাঠপর্যায়ের রণকৌশল | লিবিয়া ফেরত সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী দ্বারা বোমাবাজি ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। | 'মব জাস্টিস'-এর নামে উন্মত্ত জনতা তৈরি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুলিং ও সাইবার সন্ত্রাস। |
মূল শত্রু / টার্গেট | আওয়ামী লীগ, একাত্তরের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী সমাজ। | বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল ইতিহাস, সেক্যুলার রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ঐতিহাসিক মিত্র রাষ্ট্রসমূহ। |
নেতৃত্বের মনস্তত্ত্ব | নিজেদের 'জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মহান বিপ্লবী' হিসেবে প্রচার করা। | নিজেদের 'একমাত্র খাঁটি দেশপ্রেমিক ও নতুন স্বাধীনতার ঘোষক' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। |
ঐতিহাসিক বিচার ও খুনিদের চূড়ান্ত পরিণতি
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ফ্রীডম পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, মেজর বজলুল হুদা এবং অন্যতম প্রধান কুশলী সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানসহ ৫ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। তবে কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদসহ কয়েকজন খুনি এখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে (ধারণা করা হয় লিবিয়া, পাকিস্তান অথবা কোনো আফ্রিকান রাষ্ট্রে) পলাতক অবস্থায় রয়েছে।
ফ্রীডম পার্টির মূল কুশীলব ও তাদের ঐতিহাসিক পরিণতি
ফ্রীডম পার্টির ভেতরের প্রধান চরিত্রগুলো এবং তাদের চূড়ান্ত আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতি একনজরে দেখার জন্য নিচের ছকটি অত্যন্ত সহায়ক:
নেতার নাম ও সামরিক পদবি | ফ্রীডম পার্টিতে ভূমিকা | চূড়ান্ত আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতি |
কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান | দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। ১৯৮৬ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। | ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। |
কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ | সহ-প্রতিষ্ঠাতা, লিবিয়া ও আন্তর্জাতিক ফান্ডের মূল সমন্বয়ক। | মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। বর্তমানে পাকিস্তান বা লিবিয়ায় আত্মগোপনে রয়েছে বলে ধারণা। |
মেজর বজলুল হুদা | দলের প্রধান সামরিক কমান্ডার এবং ১৯৮৮ সালের এরশাদ আমলের এমপি। | থাইল্যান্ড থেকে প্রত্যর্পণ করার পর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। |
মেজর শাহরিয়ার রশিদ খান | দলের তাত্ত্বিক নেতা এবং ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগানের মূল প্রবক্তা। | ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। |
লিবিয়া ফেরত অ্যাকশন স্কোয়াড | মাঠপর্যায়ে বোমাবাজি, মব সন্ত্রাস ও ব্যাংক ডাকাতির মূল কারিগর। | নব্বইয়ের দশকের পর আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়; বর্তমানে এদের অনেকে নব্য উগ্রপন্থী দলগুলোর উপদেষ্টা বা অর্থদাতা। |
২০২৪-২০২৬: ছদ্মবেশী নব্য শক্তির ‘ডিজিটাল ফ্রীডম পার্টি’
আজকের দিনে এসে যখন আমরা এনসিপি (NCP) বা এই জাতীয় ছদ্মবেশী নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে তাকাই, তখন দেখা যায় তারা ফ্রীডম পার্টির পুরনো কৌশলগুলোকে ‘ডিজিটাল ও হাইব্রিড’ মডেলে রূপান্তর করেছে।
সাইবার স্পেসে ইতিহাস বিকৃতি: ফ্রীডম পার্টি যা করত লিফলেট আর গাদ্দাফির 'গ্রিন বুক' দিয়ে, বর্তমানের নব্য শক্তিরা তা করছে ফেসবুক, টিকটক এবং ইউটিউবের প্রোপাগান্ডা ভিডিওর মাধ্যমে। তারা এমন একটি কৃত্রিম ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করছে যেখানে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে একটি ‘সাধারণ ঘটনা’ এবং ১৫ আগস্টের খুনিদের ‘মুক্তিকামী’ হিসেবে উপস্থাপন করার সূক্ষ্ম চেষ্টা থাকে।
প্রতিষ্ঠানিক অবক্ষয়: বর্তমানের এই নব্য শক্তিগুলো দেশের বিচার বিভাগ, সিভিল প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের স্লিপার সেল (Sleeper Cell) ঢুকিয়ে দিচ্ছে, ঠিক যেভাবে ফারুক-রশিদরা আশি ও নব্বইয়ের দশকে এরশাদ সরকারের প্রশাসনের ভেতরে নিজেদের লোক বসিয়েছিল।
২০২৪-এর পটপরিবর্তন ও নব্য সমন্বয়কদের ‘অ্যাসাইনমেন্ট’
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের নেপথ্যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে খোদ আন্দোলনকারীদের ও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও আজ নানা ধরনের গুরুতর প্রশ্ন ও ভিন্ন ভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম (যেমন ভারতের কিছু মিডিয়া, ব্লুমবার্গ, রয়টার্স) এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের এই আকস্মিক ও তীব্র আন্দোলনের পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর্দার আড়ালের এক গভীর কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সমর্থন ছিল।
বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে দেওয়া কিছু রহস্যময় বক্তব্য এবং এনসিপি নেতাদের অতি-বিপ্লবী কর্মকাণ্ড এই সন্দেহকে আরও বেশি ঘনীভূত করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খুনি ফারুক-রশিদরা যেমন ১৯৭৫ সালে সিআইএ-র কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট সবুজ সংকেত পেয়ে দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করেছিল, বর্তমানের প্রেক্ষাপটও কি তেমনই কোনো বিশ্বজনীন জিও-পলিটিক্যাল চালের অংশ?
এই আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম কিংবা পর্দার আড়ালের কুশীলব মাহফুজ আলমদের বর্তমান ভূমিকা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কি কেবলই একটি স্বতঃস্ফূর্ত আবেগপ্রসূত ছাত্র আন্দোলনের ফসল, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক ‘অ্যাসাইনমেন্ট’? এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে কারণ তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে আশির দশকের ফ্রীডম পার্টির এজেন্ডার এক অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
ফ্রীডম পার্টির মূল লক্ষ্য ছিল একাত্তরকে অস্বীকার করা। আর বর্তমান এই নব্য শক্তির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় শোক দিবস (১৫ আগস্ট) রাষ্ট্রীয়ভাবে বাতিল করা, জাতির পিতার ঐতিহাসিক ছবি ও ভাস্কর্যগুলো হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে চুরমার করা, এবং পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে জাতীয় জাদুঘর পর্যন্ত সর্বত্র স্বাধীনতার ইতিহাস নতুন করে লিখে একাত্তরের ভূমিকাকে খাটো করা। এই মিলগুলো কখনোই কাকতালীয় হতে পারে না। এটি মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। খুনি ফারুক-রশিদরা যে ‘অসমাপ্ত কাজ’ বা বাংলাদেশকে একটি মিনি-পাকিস্তানে রূপান্তরের যে স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছিল, সেই কাজটি সম্পন্ন করতেই কি এই নব্য শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে?
কেন ব্যর্থ হবে এই পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ইতিহাসকে সাময়িকভাবে ক্ষমতার জোরে বা অস্ত্রের মুখে বিকৃত করা গেলেও, কোনো জাতির যৌথ স্মৃতি (Collective Memory) থেকে তাকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বারবার চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তারা ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
খুনিদের দল ফ্রীডম পার্টি আশির দশকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রত্যক্ষ মদত পেয়ে, লিবিয়ার কোটি কোটি ডলার এবং অস্ত্রের জোর দেখিয়েও কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতে টিকে থাকতে পারেনি। বাংলার সাধারণ মানুষ, এ দেশের প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক নাগরিক সমাজ তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ঠিক তেমনিভাবে, বর্তমানের যেকোনো পাকিস্তানপন্থী, উগ্রবাদী কিংবা বিদেশি শক্তির লেজুড়বৃত্তি করা ছদ্মবেশী গোষ্ঠীও এ দেশের মাটিতে বেশিদিন রাজত্ব করতে পারবে না।
"জয় বাংলা" স্লোগানটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের বা গোষ্ঠীর স্লোগান নয়; এটি সাড়ে সাত কোটি মানুষের একাত্তরের অস্তিত্বের প্রতীক, এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের মূল সুর। ফ্রীডম পার্টির আধুনিক অনুসারীরা যতই 'আজাদি' বা 'ইনকিলাব' স্লোগান দিয়ে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করুক না কেন, বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার মূলে থাকা 'জয় বাংলা' ও একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাসকে তারা কখনোই পরাজিত করতে পারবে না।
আজকের তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ ফেসবুক, ইউটিউব ও ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন অত্যন্ত সচেতন। তারা খুব দ্রুতই ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে প্রকৃত ইতিহাস ও স্লোগানের আদি উৎস জানতে পারছে। খুনিদের স্লোগান ধার করে যে ছদ্মবেশী বিপ্লব সাজানো হয়, তার স্থায়িত্ব ও নৈতিক ভিত্তি যে অত্যন্ত ভঙ্গুর, তা দেশের মানুষ ইতিমধ্যেই বুঝতে শুরু করেছে। মব সন্ত্রাস ও উগ্রতা দিয়ে সাময়িকভাবে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের হৃদপিন্ড জয় করা যায় না।
ইতিহাসের আয়নায় আমাদের করণীয়
ফ্রীডম পার্টির সেই অসমাপ্ত এসাইনমেন্ট অর্থাৎ বাংলাদেশকে একটি ধর্মীয় উগ্রবাদী মিনি-পাকিস্তানে পরিণত করা কিংবা বাংলাদেশের বুক থেকে মুক্তিযুদ্ধের নাম-নিশানা চিরতরে মুছে ফেলা তা কখনোই সফল হবে না। খুনি ফারুক-রশিদের রাজনৈতিক সূর্য যেমন একসময় বাংলার আকাশে চিরতরে অস্তমিত হয়েছে এবং তাদের শেষ পরিণতি হয়েছে ফাঁসির দড়িতে, তাদের বর্তমান সময়ের ডিজিটাল লেজুড় ও নব্য অবতারদের পরিণতিও ইতিহাসের নিয়মেই একই হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখনই কোনো অশুভ শক্তি 'নাগরিক অধিকার', 'ইনকিলাব' বা 'আজাদি'র ছদ্মবেশে ১৫ আগস্টের খুনিদের স্লোগান ও এজেন্ডাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইবে, তখনই আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের সেই নির্মম ও সত্য আয়নায়। ১৬ কোটি মানুষের এই বীরত্বপূর্ণ বাংলাদেশে পাকিস্তানি প্রেতাত্মা ও উগ্রবাদের কোনো স্থায়ী স্থান নেই। পরিশেষে, সচেতন নাগরিক সমাজ ও দেশপ্রেমিক মেহনতি মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন বাংলার মানুষ এই ছদ্মবেশী অপশক্তিকে চিনে নিয়ে ইতিহাসের আর্বজনায় চিরতরে ছুড়ে ফেলবে। আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং একাত্তরের চেতনা অক্ষুণ্ন থাকবেই।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড (Bangladesh: A Legacy of Blood) - অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, খুনিদের লিবিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ এবং তৎকালীন সামরিক শাসকদের ভূমিকা সম্পর্কিত বিবরণ)।
২. বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভোলিউশন (Bangladesh: The Unfinished Revolution) - লরেন্স লিফশুলজ (১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও ভূ-রাজনীতির ভূমিকা বিশ্লেষণ)।
৩. বাংলাদেশ: ফ্রম মুজিব টু এরশাদ (Bangladesh: From Mujib to Ershad) - লরেন্স জিরিং (এরশাদ ও জিয়া শাসনামলে রাজনীতিতে খুনিদের পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা)।
৪. অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও জেলখানার সম্বল - শেখ মুজিবুর রহমান সংক্রান্ত ঐতিহাসিক গবেষণা ও নথি।
৫. দৈনিক খবর (১৯৮১): কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকার আর্কাইভ (যেখানে সিআইএ-র কাছ থেকে 'সবুজ সংকেত' পাওয়ার দাবি করা হয়েছিল)।
৬. দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ ও দ্য বাংলাদেশ অবজারভার (আগস্ট ১৯৮৭): ৩ আগস্ট ১৯৮৭ সালে ঢাকা হোটেল শেরাটনে ফ্রিডম পার্টি গঠনের সংবাদ সম্মেলন ও গাদ্দাফির অর্থায়নের তথ্য সংবলিত প্রতিবেদন।
৭. বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় (সুপ্রিম কোর্ট, ২০০৯-২০১০): আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সাজা পরোয়ানা এবং ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি কার্যকর হওয়া ফাঁসির আইনি নথি।
৮. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আর্কাইভ (১৯৮৬ ও ১৯৮৮): ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৮৮ সালের বিতর্কিত ৪থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টির অংশগ্রহণ ও দলীয় প্র প্রার্থীদের জয়ের গ্যাজেট।















