যে পাঁচটি সেনা অভ্যুত্থান বদলে দেয় বাংলাদেশের রাজনীতি - স্বাধীনতার ৫০ বছর
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

TruthBangla

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল মুক্তির সংগ্রাম ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের ইতিহাস নয়; বরং এটি স্বাধীনতাত্তোর রাষ্ট্রগঠনে সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, রক্তাক্ত অভ্যুত্থান (military coup), পাল্টা-অভ্যুত্থান এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের এক জটিল উপাখ্যান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত।
স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত বিভীষিকা থেকে শুরু করে ১৯৮২-এর এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং ২০০৭-এর সেনাসমর্থিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ পর্যন্ত যে পাঁচটি বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ ও ক্যু বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন গতিপথে ঠেলে দিয়েছিল এই প্রবন্ধে সেই পাঁচ ঐতিহাসিক অধ্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ ও সুগভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালে একটি সফল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের জন্ম হলেও, স্বাধীন বাংলাদেশে একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই সামরিক অসন্তোষই পরবর্তীতে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে মিলে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
'প্রত্যাগত' বনাম 'মুক্তিযোদ্ধা' সেনা অফিসারদের দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব: স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে দুটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয় একদিকে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী অফিসার ও জোয়ানরা (যাঁদের সামরিক মেজাজ ছিল কিছুটা রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক), অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা সেনা কর্মকর্তারা (যাঁরা প্রথাগত ও ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ধারার কঠোর সামরিক কাঠামোতে অভ্যস্ত ছিলেন)। পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণে এই দুটি শিবিরের মধ্যে চরম মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব ও জুনিয়র অফিসারদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা: মুক্তিযুদ্ধের সময় কমান্ডারদের সাথে জুনিয়র অফিসারদের সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সামরিক চেইন অব কমান্ড বা অনুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীর একটি অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকট, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ এবং সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে 'বাকশাল' (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) গঠনকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি।
'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' গঠন ও সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সারির অবস্থান: তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' (JRB) নামক একটি বিশেষ আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। সেনাবাহিনীতে সাধারণ ধারণা তৈরি হয় যে, সরকার সেনাবাহিনীকে অবহেলা করে রক্ষীবাহিনীকে বেশি বাজেট, উন্নত অস্ত্র ও মর্যাদা দিচ্ছে। এই অসন্তোষই পরবর্তীতে তরুণ ও বিক্ষুব্ধ সেনা কর্মকর্তাদের বিদ্রোহী করে তোলে।
১ম অভ্যুত্থান: ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ - ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তন
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের প্রাক্কালটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্তক ও মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে একদল জুনিয়র সেনা কর্মকর্তার বিশেষ করে মেজর ফারুক রহমান, মেজর খন্দকার আবদুর রশীদ, মেজর শরিফুল হক ডালিম ও মেজর শাহরিয়ার রশীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই নৃশংস অভিযানে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবার ও স্বজনসহ হত্যা করা হয়। এই হামলায় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল, দুই নতুন পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও পারভীন জামাল রোজি ছাড়াও শেখ মুজিবুর রহমানের ভাই শেখ নাসের নিহত হন।
একই রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের পাশাপাশি মিন্টো রোডে তৎকালীন মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং আরকে মিশন রোডে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসভবনেও পৃথক দল পাঠিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। ভাগ্যক্রমে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণরক্ষা পান। এটি কেবল কোনো সামরিক ক্যু ছিল না; এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক আদর্শিক ভিত্তি চূর্ণ করে রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ধারায় পরিচালিত করার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয়।
ঢাকা সেনানিবাসের থমথমে পরিবেশ ও জিয়াউর রহমানের প্রতিক্রিয়া
তৎকালীন ঢাকা সেনানিবাসে কর্মরত স্টেশন অফিসার কর্নেল (পরবর্তীতে লে. কর্নেল) এম এ হামিদ-এর বই 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা' এবং তৎকালীন লে. কর্নেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর ঐতিহাসিক বিবরণী থেকে জানা যায়, ১৫ই আগস্টের বহু আগে থেকেই পদাতিক বাহিনী ও আর্মার্ড কোর-এর কতিপয় অসন্তুষ্ট ও শৃঙ্খলাভঙ্গকারী মেজর প্রকাশ্যে সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছিলেন। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ এবং সেনাসদরের চেইন অব কমান্ড এই অসন্তোষ দমনে কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারি বা শৃঙ্খলাজনিত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন।
১৫ই আগস্টের ভোরে যখন শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারকে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন বিদ্রোহী ইউনিটগুলো ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান কৌশলগত স্থান এবং ধানমণ্ডির 'রেডিও বাংলাদেশ' ভবন নিয়ন্ত্রণ নেয়। মেজর ডালিম রেডিওতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা এবং সরকার উৎখাতের ঘোষণা দেন। এর পরপরই মেজর রশিদের নেতৃত্বে একদল সেনা সদস্য লে. কর্নেল আমিন আহমেদ চৌধুরী এবং ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিলকে সাথে নিয়ে সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যান।
আমিন আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনামতে, জিয়াউর রহমান তখন একগাল শেভ করা অবস্থায় নাইট গাউন পরে বের হয়ে আসেন। শাফায়াত জামিল যখন জানান যে আর্মার্ড ও আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন ক্যু করেছে এবং রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন, তখন জিয়াউর রহমান অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে তাঁর ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া জানান:
"সো হোয়াট? লেট দ্য ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার। উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স।" (তাতে কী হয়েছে? ভাইস প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব নিতে দাও। রাজনীতির সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।)
পরবর্তীকালে এই বক্তব্য এবং সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে তাৎক্ষণিক কোনো সেনা আদেশ না দেওয়া বা প্রতিরোধ না গড়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিকদের মাঝে নানা বিশ্লেষণ তৈরি হয়। অন্যদিকে সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহর নির্লিপ্ততা এবং রক্ষীবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো পাল্টা আক্রমণ না আসায় পুরো সামরিক বাহিনী মুহূর্তের মধ্যে বিদ্রোহী অফিসারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
খন্দকার মোশতাক সরকার ও সামরিক ইনডেমনিটি
শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরই সরকার ও মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। খন্দকার মোশতাক ছিলেন আওয়ামী লীগের ভেতরে দক্ষিণপন্থী ও পাকিস্তানঘেঁষা উপদলীয় ধারার প্রধান মুখ। মোশতাক ক্ষমতায় বসেই দেশে সামরিক শাসন (Martial Law) বলবৎ ঘোষণা করেন এবং খুনি চক্রকে আইনি সুরক্ষা দিতে ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ সালে কুখ্যাত 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' (Indemnity Ordinance 1975) জারি করেন।
এই অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সেনা কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যেকোনো আদালতে বিচার বা আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দেওয়া। পরবর্তীকালে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ২য় জাতীয় সংসদে পাস করা সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে স্থায়ী বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
মোশতাক সরকার ক্ষমতার লাগাম পেয়েই মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় স্লোগান 'জয় বাংলা' পরিবর্তন করে পাকিস্তানি ভাবধারার 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' চালুর নির্দেশনা দেয়। পাশাপাশি 'রেডিও বাংলাদেশ'-এর নাম পরিবর্তন করে 'রেডিও পাকিস্তান'-এর আদলে 'বাংলাদেশ রেডিও' করার প্রশাসনিক প্রয়াস চালানো হয়। মোশতাক ২৪শে আগস্ট সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে অপসারণ করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন এবং বিদ্রোহী মেজরদের বঙ্গভবনে অবস্থান নিশ্চিত করে সমান্তরাল ক্ষমতা কেন্দ্র তৈরি করেন।
মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর মতানুসারে, মোশতাকের এই ৮৩ দিনের অঘোষিত ও অসাংবিধানিক শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, সাম্প্রদায়িক ও সুবিধাবাদী চক্র রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে পুনরায় শক্ত অবস্থান তৈরি করে। একই সাথে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের মেরুকরণ ঘটে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও চীন দ্রুত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে, যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকের পররাষ্ট্রনীতিতে এক বড় ধরনের বিপর্যয় ও মোড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।
২য় অভ্যুত্থান: ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ - খালেদ মোশারফের পাল্টা-অভ্যুত্থান ও কারাগারের রক্তপাত
১৫ই আগস্ট ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির পদে বসলেও প্রকৃত রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল বঙ্গভবনে অবস্থানরত জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের হাতে। মেজর ফারুক রহমান ও মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে ঘাতক দলটি সাঁজোয়া যান (ট্যাংক) ও আর্টিনারি বহর নিয়ে বঙ্গভবনে অবস্থান নেয় এবং একটি সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলে। তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আদেশ পুরোপুরি অমান্য করছিল। এর ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে শতবছরের প্রতিষ্ঠিত 'চেইন অব কমান্ড' বা সামরিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
জিয়াকে বন্দি করা ও খালেদ মোশারফের পদক্ষেপ
সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার ও বঙ্গভবনের জুনিয়র অফিসারদের অবৈধ প্রভাব দূর করতে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ (তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ বা CGS) এবং ঢাকা ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার বীর বিক্রম কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে পাল্টা-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্ব: ৩রা নভেম্বর ভোরে অনুগত সেনাসদস্যরা সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর সরকারি বাসভবনে বন্দি করে এবং তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
নেতৃত্ব গ্রহণ: ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করেন এবং সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মূল উদ্দেশ্য: বঙ্গভবন থেকে ঘাতক জুনিয়র অফিসারদের উচ্ছেদ করা, সেনাবাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত করে ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে আনা এবং চেইন অব কমান্ড পুনর্বহাল করা।
বঙ্গভবন-ক্যান্টনমেন্ট মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও ঘাতকদের পলায়ন
৩রা নভেম্বর সারাদিন ঢাকা শহর এক অভূতপূর্ব সামরিক উত্তেজনার মুখোমুখি হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রণে ছিল খালেদ-শাফায়াতের পদাতিক বাহিনী, আর বঙ্গভবন ঘিরে ছিল ফারুক-রশিদের ট্যাংক ও কামানের ব্যাটালিয়ন। মাথার ওপর চক্কর কাটছিল বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান।
রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে বঙ্গভবনে অবস্থানরত খন্দকার মোশতাক এবং সেনা নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষি চলে। সমঝোতা অনুযায়ী, ৩রা নভেম্বর মধ্যরাতে মেজর ফারুক, মেজর রশিদসহ ১৭ জন ঘাতক সেনা কর্মকর্তা এবং তাঁদের পরিবারকে একটি বিশেষ বিমানে নিরাপদে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যা
খালেদ মোশারফের পাল্টা-অভ্যুত্থান যখন সফলতা পাচ্ছিল, ঠিক সেই চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তে ৩রা নভেম্বর গভীর রাতে (৪ঠা নভেম্বরের প্রথম প্রহরে) ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়টি ঘটে। বঙ্গভবনের নির্দেশে রিসালদার মুসলেহউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র ঘাতক দল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অবৈধভাবে প্রবেশ করে।
শহীদ জাতীয় চার নেতা: মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান কারাগারে বন্দি ছিলেন।
বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড: ঘাতকরা কারাকক্ষের ভেতরে চার নেতাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। কেবল গুলিতেই ক্ষান্ত না হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁদের ওপর নির্মমভাবে বেয়োনেট চার্জ করা হয়।
রাজনৈতিক শূন্যতা: এই পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধগামী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে দেশে এক অপূরণীয় নেতৃত্ব শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
স্বল্পমেয়াদী ক্ষমতা পুনর্গঠন
কারাগারের এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের খবর শুরুতে সাধারণ মানুষ বা সেনাসদরের কাছে গোপন ছিল। পরিস্থিতি আপাত নিয়ন্ত্রণে আসার পর ৫ই নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ৬ই নভেম্বর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম নতুন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। তবে এই পাল্টা-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট স্থায়িত্ব ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, যা পরবর্তীতে ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের দিকে মোড় নেয়।
৩য় অভ্যুত্থান: ৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ - সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের উত্থান
১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর বীর উত্তম মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে একটি রক্তপাতহীন পাল্টা ক্যু সংঘটিত হয়। এর ফলে তত্কালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ধানমন্ডির বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয় এবং দেশের শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে আসেন খালেদ মোশারফ। কিন্তু একই দিনে (৩রা নভেম্বর ভোররাতে) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং এম মনসুর আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ৪ঠা নভেম্বর খালেদ মোশারফের মা ও ভাইয়ের নেতৃত্বে বের হওয়া একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে সেনানিবাসে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে এই ক্যু ভারত সমর্থিত। এই রাজনীতি ও গুজব সাধারণ সিপাহীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেয়।
১২-দফা দাবি ও 'অফিসারদের রক্ত চাই' লিফলেট
সাধারণ সৈনিকদের এই অসন্তোষকে সংগঠিত রূপ দেয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং সেনাদলের ভেতরে থাকা তাদের গোপন সংগঠন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'। এই সামরিক-রাজনৈতিক তৎপরতার নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেন সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বীর উত্তম কর্নেল আবু তাহের। ৬ই নভেম্বর রাতে ঢাকা সেনানিবাসে জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উদ্যোগে হাজার হাজার লিফলেট ছড়িয়ে দেয়া হয়। লিফলেটে অফিসার প্রথা বিলোপ, 'শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী' গঠন, সামরিক ভাতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিসহ ১২-দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। তৎকালীন মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিমের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, লিফলেটগুলোতে অত্যন্ত উসকানিমূলক বাক্য লেখা ছিল, যেমন "সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই"।
৭ই নভেম্বরের সিপাহী অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের মুক্তি
৬ই নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা বাজতেই (৭ই নভেম্বরের প্রথম প্রহরে) ঢাকা সেনানিবাসে একযোগে ফাঁকা গুলি ছুড়ে সিপাহীরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সাধারণ সৈনিকেরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসে 'সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই' এবং 'জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ' স্লোগানে চারপাশ মুখরিত করে তোলে। দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির সৈনিকেরা সুবেদার প্রধানদের নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানের বাসভবনে গিয়ে তাঁকে গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্ত করে। জিয়াউর রহমানকে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে কাঁধে তুলে নিয়ে ফিল্ড আর্টিলারি হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসা হয়, যা সামরিক বাহিনীর সাধারণ সিপাহী ও সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তাঁর অসামান্য গ্রহণযোগ্যতার সূচনা করে।
খালেদ মোশারফ হত্যা ও সামরিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা
বিদ্রোহ শুরু হলে খালেদ মোশারফ, কর্নেল নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার আত্মরক্ষার্থে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু জাসদের বিপ্লবে উস্কানিকৃত ও অনিয়ন্ত্রিত সৈনিকেরা ৭ই নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে এই তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়ে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি কর্নেল তাহের ও জাসদের 'শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী'র সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে কঠোর শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।
দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রভাব ও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
৭ই নভেম্বরের এই সামরিক অস্থিতিশীলতা ও সিপাহী-জনতার ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। ক্ষমতার কেন্দ্রে জিয়াউর রহমানের উত্থানের মাধ্যমে পরবর্তী সামরিক শাসন ও নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের পথ সুগম হয়। তবে দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান দলগুলোর মাঝে এখনো সুস্পষ্ট আদর্শিক বিভাজন রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এটিকে 'সিপাহী-জনতার সংহতি ও বিপ্লব দিবস' হিসেবে পালন করে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ দিনটিকে 'মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তা হত্যা দিবস' এবং জাসদ 'সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস' হিসেবে বিবেচনা করে।
৪র্থ অভ্যুত্থান: ২৪শে মার্চ ১৯৮২ - জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসন
১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশে এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। তৎক্ষণাৎ তৎকালীন ৮০ বছর বয়সী উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আবদুস সাত্তার বিপুল ভোটে জয়ী হন। তবে নির্বাচিত হলেও তাঁর সরকার শুরু থেকেই চরম রাজনৈতিক দুর্বলতা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখলের তীব্র চাপের মুখে পড়ে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়, খাদ্য সংকট তৈরি হয় এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে জনমনে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়।
সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরাসরি রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব স্থায়ী করার নীল নকশা তৈরি করেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে, ১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা ব্যারাকে সাংবাদিকদের ডেকে এরশাদ প্রথম প্রকাশ্যে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর স্থায়ী অংশের 'সাংবিধানিক ভূমিকা' (Constitutional Role) দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল কেবল সীমান্ত রক্ষাই নয়, দেশের নীতি-নির্ধারণ, দুর্নীতি দমন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিধানে সেনাবাহিনীর অংশীদারিত্ব আইনিভাবে নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার সেনাপ্রধানের এই চাপের মুখে নতি স্বীকার করে ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে 'জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ' (National Security Council) গঠন করতে বাধ্য হন, যেখানে সেনাপ্রধানকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ক্ষমতা দেওয়া হয়।
ধাপে ধাপে ক্যু-এর প্রস্তুতি ও ২৪শে মার্চের রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান
জেনারেল এরশাদ রাতারাতি একদিনে ক্যু করেননি; বরং তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, সময় হিসেব করে এবং বেসামরিক শাসনকে দুর্বল করে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছিলেন। ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে বঙ্গভবনে ডেকে পাঠান এবং প্রকাশ্যে সরকারের দুর্নীতি দমনের নামে মন্ত্রিসভা ছোট করা, দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রীদের বরখাস্ত করা ও সেনাবাহিনীর পছন্দমতো ব্যক্তিদের প্রশাসনে বসানোর প্রস্তাব দেন। আবদুস সাত্তার তাঁর মন্ত্রিসভার আকার অর্ধেক করলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের ক্ষুধা তাতে শান্ত হয়নি।
অবশেষে ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ ভোরে সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ কোনো রক্তপাত ছাড়াই রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেন। ভোরে রেডিও এবং টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিশেষ বার্তায় এরশাদ ঘোষণা করেন যে, দেশকে "অর্থনৈতিক বিপর্যয়, চরম দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা" থেকে রক্ষা করতে সামরিক বাহিনী বাধ্য হয়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
সামরিক শাসন জারি ও ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
ক্ষমতা দখল করে এরশাদ তাৎক্ষণিকভাবে দেশে সামরিক আইন (Martial Law) জারি করেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান স্থগিত করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA) ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন। সংবিধান স্থগিতের পাশাপাশি জনগণের মৌলিক অধিকার রহিত করা হয় এবং সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সামরিক আদালতের বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও আদালতের ওপর সামরিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ক্ষমতা গ্রহণের পর এরশাদ নিজেকে বেসামরিক চেহারা দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে পুতুল রাষ্ট্রপতি বানিয়ে বসান। তবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একমাত্র চাবিকাঠি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এরশাদের হাতেই ন্যস্ত থাকে। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি
তৎকালীন আন্তর্জাতিক নথিপত্র, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কেবল্স এবং নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোনাল্ড রেগান প্রশাসন এরশাদের এই ক্ষমতা দখলকে নীরব সমর্থন দিয়েছিল। শীতল যুদ্ধের (Cold War) প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় বামপন্থি প্রভাব ঠেকানো এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক উপস্থিতির পর অঞ্চলে মার্কিন অনুগত ও সমাজতন্ত্র-বিরোধী শাসন বজায় রাখা ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকার ছিল। মার্কিন সরকার দ্রুতই এরশাদ সরকারকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে মেনে নেয় এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান বহাল রাখে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সহ পশ্চিমা সাহায্যদাতা সংস্থাগুলো এরশাদের বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি ও রাষ্ট্রীয় শিল্প বেসরকারীকরণের আশ্বাসে ঋণ ছাড় অব্যাহত রাখে।
রাজনৈতিক দল গঠন, স্থানীয় শাসন সংস্কার ও ৯ বছরের স্বৈরশাসন
নিজের স্বৈরাচারী শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং বেসামরিক রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে জেনারেল এরশাদ প্রথমে 'জনদল' এবং পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে 'জাতীয় পার্টি' গঠন করেন। গ্রামীণ এলিট ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিজের ক্ষমতার অধীনে আনার লক্ষ্যে তিনি ১৯৮৪ সালে 'উপজেলা পরিষদ' ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা তাঁর ক্ষমতার অন্যতম আঞ্চলিক সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে বিরোধী দল ও ধর্মীয় অনুভূতির সমর্থন পেতে তিনি সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন।
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এরশাদ ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে ব্যাপক কারচুপি ও প্রহসনমূলক বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন, যা বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করে। দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলে ছাত্র আন্দোলন দমন, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন ও রাজনৈতিক কারচুপির মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখেন। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ৮ দল, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ দল এবং বামপন্থি ৫ দলীয় জোটের সমন্বিত আন্দোলন ও ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক অল-পার্টি স্টুডেন্টস ইউনিটি (সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য)-র তীব্র গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
৫ম অভ্যুত্থান: ১১ই জানুয়ারি ২০০৭ - 'ওয়ান-ইলেভেন' ও সুশীল সংস্কারের ছদ্মবেশ
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সময় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। ২০০৬ সালের মেয়াদের শেষে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের সম্ভাব্য নিয়োগ, যাঁকে আওয়ামী লীগ বিএনপি-ঘেঁষা বলে অভিযোগ তোলে। পাশাপাশি, তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ আজিজের অধীনে ১ কোটি ৩০ লাখ ভুয়া ভোটার সম্বলিত একটি তালিকা তৈরির অভিযোগ এনে বিরোধী দল রাজপথে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেয়।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনে লগি-বৈঠার সহিংস সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত হয় এবং দেশজুড়ে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির জেরে বিচারপতি কে এম হাসান দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালে, রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। তবে এই পদক্ষেপ সংঘাত না কমিয়ে আরও বাড়ায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোট ২২ জানুয়ারি ২০০৭-এর একতরফা নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয় এবং লাগাতার অবরোধ ও ধর্মঘটে দেশের আইনশৃঙ্খলা এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।
সেনা হস্তক্ষেপ, ‘ওয়ান-ইলেভেন’ ও বঙ্গভবনে জেনারেলদের প্রবেশ
উত্তাল পরিস্থিতির মুখে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ বাড়তে থাকে। জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট বার্তা দেন যে, একটি একতরফা নির্বাচন এবং রাজপথে সহিংসতা বজায় থাকলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই আশঙ্কার ওপর ভর করে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি (যা পরবর্তীতে 'ওয়ান-ইলেভেন' নামে পরিচিতি পায়) তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল এস এ নিজামী, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল এস ইউ আহমেদ এবং ডিজিএফআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন।
জেনারেল মইন তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই 'শান্তির স্বপ্নে'-তে উল্লেখ করেন, গৃহযুদ্ধ ও জাতিসংঘের লালকার্ড থেকে দেশকে রক্ষা করতেই তারা বঙ্গভবনে যান। জেনারেলদের চাপে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। দেশের প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং বাতিল করা হয় ২২শে জানুয়ারির নির্ধারিত একতরফা নির্বাচন।
ফখরুদ্দীন সরকার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান ও ‘মাইনাস-টু ফরমুলা’
বিশ্ববাসীকে সন্তুষ্ট রাখতে সেনাপ্রধান সরাসরি ক্ষমতা দখল না করে ১২ই জানুয়ারি সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি সুশীল বা টেকনোক্র্যাট 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার' গঠন করেন। এই সরকার দুই বছরের জন্য ক্ষমতা ধরে রাখে, যার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল সেনাসদর। তৎকালীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে পুনর্গঠন করে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু হয়।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকারের প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়ায় ‘মাইনাস-টু ফরমুলা’ বা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে চূড়ান্তভাবে অপসারণ করা। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনা এবং সেপ্টেম্বর মাসে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে কারারুদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি, বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি দাঁড় করানোর জন্য কিংস পার্টি (যেমন ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর ডিপিডি) গঠন এবং বিদ্যমান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে ‘সংস্কারপন্থী’ গোষ্ঠী তৈরিতে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রভূত সহায়তা প্রদান করে।
জনরোষ ও গণ-প্রতিরোধ
জরুরি অবস্থা জারি করে সুশীল সংস্কারের নামে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলেও সরকারের অর্থনীতি পরিচালনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ২০০৭ সালের ভয়াবহ বন্যা ও প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ সামাল দিতে ফখরুদ্দীন সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
২০০৭ সালের আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে ছাত্র ও সেনাসদস্যদের বাগবিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে পুরো দেশে ছাত্র-শিক্ষকদের বিশাল গণ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরকার কঠোর হাতে এই আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে শিক্ষক ও ছাত্রদের গ্রেপ্তার করে, যা সেনাসমর্থিত সরকারের অবস্থানকে চরম নড়বড়ে করে তোলে। অন্যদিকে আইনজীবী, পেশাজীবী ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনমনীয় অবস্থানের কারণে ‘মাইনাস-টু ফরমুলা’ এবং তথাকথিত সুশীল সংস্কার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
চরম রাজনৈতিক প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরতে বাধ্য হয়। সামরিক সমর্থিত সরকার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ সংলাপ শেষে ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে এবং এর মাধ্যমে দু’বছরের ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।
এক নজরে বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান সামরিক হস্তক্ষেপ ও ক্যু-এর ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়া এই পাঁচটি প্রধান সামরিক ক্যু ও হস্তক্ষেপের সারসংক্ষেপ নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
অভ্যুত্থান / হস্তক্ষেপের তারিখ | মূল নায়ক / নেতৃত্ব দানকারী | তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান / সরকারপ্রধান | ক্যু-এর মূল কারণ ও প্রেক্ষাপট | স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক প্রভাব |
১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ | মেজর রশিদ, মেজর ফারুক ও একদল জুনিয়র অফিসার | রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান | রাজনৈতিক অসন্তোষ, রক্ষীবাহিনীর বিতর্ক এবং সেনাপ্রধানদের দুর্বলতা। | বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত; সংবিধানের চার নীতি পরিবর্তন ও ইনডেমনিটি জারি। |
৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ | মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ ও শাফায়াত জামিল | রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ | চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধার এবং বঙ্গভবন থেকে ঘাতক জুনিয়র অফিসারদের উৎখাত। | ৪ দিন স্থায়ী ক্যু; ঢাকা জেলে জাতীয় চার নেতা হত্যা ও জেনারেল জিয়া বন্দি। |
৭ই নভেম্বর ১৯৭৫ | কর্নেল আবু তাহের ও জাসদ (বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা) | সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান (মুক্ত হন) | সৈনিকদের ১২-দফা দাবি আদায় এবং খালেদ মোশারফের অনুগতদের উৎখাত। | খালেদ মোশারফ নিহত; জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে উত্থান। |
২৪শে মার্চ ১৯৮২ | লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ | রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার | প্রশাসনিক দুর্নীতি, রাষ্ট্রপতির দুর্বলতা এবং এরশাদের ক্ষমতালিপ্সা। | সংবিধান স্থগিত; দীর্ঘ ৯ বছরের সামরিক স্বৈরাচারী শাসনের সূচনা। |
১১ই জানুয়ারি ২০০৭ (১/১১) | জেনারেল মইন ইউ আহমেদ (সেনাপ্রধান) | রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমদ | একতরফা নির্বাচন, সহিংস রাজনৈতিক সংঘাত এবং জাতিসংঘের হুমকি। | জরুরি অবস্থা জারি; ফখরুদ্দীন সরকারের ২ বছরের সংস্কার ও রাজনীতি পুনর্গঠন। |
জিয়াউর রহমানের শাসনকাল (১৯৭৫-১৯৮১): ব্যর্থ ক্যু, বিদ্রোহ ও সামরিক ট্রাইব্যুনাল
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান সশস্ত্র বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার কঠোর পদক্ষেপ নেন। তবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালে তাঁর নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে প্রায় ২১ থেকে ২২টি ছোট-বড় ক্যু ও সামরিক বিদ্রোহের চেষ্টা সংঘটিত হয়। এই সময়কালটি ছিল বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও অস্থিতিশীল।
১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে সবচেয়ে সংকটময় সামরিক বিদ্রোহ দুটি ঘটে:
বগুড়া বিদ্রোহ (২২-২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭): ২২শে অশ্বারোহী রেজিমেন্টের জোয়ানরা জাসদপন্থী গোপন সংগঠনের উসকানিতে বিদ্রোহ করে এবং বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে জিম্মি ও হত্যা করে।
ঢাকা বিমানবন্দর বিদ্রোহ (২ অক্টোবর ১৯৭৭): জাপানি রেড আর্মি কর্তৃক অপহৃত বিমান (JAL Flight 472) নিয়ে যখন ঢাকা বিমানবন্দরে আলোচনা চলছিল, তখন সিগন্যাল কোর ও বিমানবাহিনীর একদল সৈনিক ও কর্মকর্তা অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা বেশ কয়েকজন প্রবীণ বিমানবাহিনী কর্মকর্তাকে (যেমন: এয়ার কমোডর আনোয়ার বাশার) নির্মমভাবে হত্যা করে এবং ঢাকা বেতার কেন্দ্র দখলের চেষ্টা চালায়।
সামরিক ট্রাইব্যুনাল ও ফাঁসির রেকর্ড: এই বিদ্রোহগুলো দমনের পর জিয়াউর রহমান অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেন। বিশেষ সামরিক অধ্যাদেশ জারি করে সামারি কোর্ট মার্শালের (Summary Court-Martial) মাধ্যমে কয়েক হাজার সেনাসদস্য ও বিমানবাহিনীর জোয়ানকে বিচারে মুখোমুখি করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে আনুমানিক ১,১০০ থেকে ১,৫০০ জন সামরিক সদস্যকে গোপন বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করে।
৩০শে মে ১৯৮১-চট্টগ্রাম ক্যু ও জিয়াউর রহমান হত্যা: ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি (GOC) মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর।
মঞ্জুরের সাথে জিয়াউর রহমানের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি ও বদলিজনিত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল। তবে এই ক্যু-টি ঢাকার প্রধান সেনা সদর দপ্তরের সমর্থন পায়নি। তত্কালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ ঢাকার নিয়ন্ত্রণে থাকেন এবং চট্টগ্রাম অভিমুখে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠান। বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে জেনারেল মঞ্জুর পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়েন এবং রহস্যজনকভাবে সেনা হেফাজতে নিহত হন। পরবর্তীতে সামরিক আদালতে বিচারের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান: জেনারেল নাসিমের বিদ্রোহ
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ধারণা করা হয়েছিল যে রাজনীতিতে সেনাপ্রধানদের প্রভাব চিরতরে শেষ হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতির মধ্যে এক নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাত সামরিক অভ্যুত্থানের মুখোমুখি দাঁড় করায় দেশকে।
প্রেক্ষাপট ও সেনাপ্রধানের অসন্তোষ: ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর তৎকালীন বিএনপি সরকারের পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে দেশে নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। রাষ্ট্রপতি সংবাদ পান যে সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে তিনি তৎকালীন দুই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ খান এবং মেজর জেনারেল আবু এন এম আমীন আহমেদকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেন।
তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম রাষ্ট্রপতির এই আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
সাভার ও বগুড়া ট্রুপসের ঢাকা মার্চ এবং ক্যু ব্যর্থ হওয়া: মেজর জেনারেল নাসিম সাভার (৯ম পদাতিক ডিভিশন) এবং বগুড়া (১১শ পদাতিক ডিভিশন) থেকে সৈন্য ও ট্যাংক বহরকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তৎকালীন সাভারের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান রাষ্ট্রপতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন।
ইমামুজ্জামান সাভারের ৯ পদাতিক ডিভিশনের সৈন্যদের ব্যারিকেড দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং গাবতলী সেতু ও আরিচা ফেরিঘাটে অবস্থান নিয়ে বগুড়া থেকে আসা সাঁজোয়া বহরকে ঢাকার ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। একই সাথে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে ডিজিএফআই ও বাংলাদেশ ব্যাংক সংলগ্ন এলাকা রক্ষা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ক্যু ব্যর্থ হয় এবং জেনারেল নাসিমকে গ্রেপ্তার করে বরখাস্ত করা হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছিল যে চেইন অব কমান্ড রক্ষা করে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব।
২০০৯ সালের পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহ
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ‘বাংলাদেশ রাইফেলস’ (BDR, বর্তমান BGB)-এর সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস সামরিক ট্র্যাজেডি।
দরবার হল থেকে রক্তক্ষয়ী সূচনা: ২৫শে ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানার দরবার হলে বিডিআর সপ্তাহ উদযাপন চলাকালে কিছু বিদ্রোহী জোয়ান অফিসারদের ওপর চড়াও হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা পুরো পিলখানায় ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা বিডিআর ডিজি (মহাপরিচালক) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ দরবার হলে উপস্থিত সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর অতর্কিত গুলি চালায়।
৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা হত্যা: দীর্ঘ ৩৩ ঘণ্টার এই বিদ্রোহে প্রেষণে নিয়োজিত ৫৭ জন পেশাদার সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসেও এত বিপুল সংখ্যক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা হারানোর নজির ছিল না। কর্মকর্তাদের পরিবার ও নারী সদস্যদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পিলখানার ভেতরে গণকবর দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক সমাধান ও বিডিআর পুনর্গঠন: তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সামরিক অভিযান না চালিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দরকষাকষি করে আত্মসমর্পণ করানোর পথ বেছে নেয়। বিদ্রোহ দমনের পর পুরো বাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। 'বাংলাদেশ রাইফেলস' (BDR)-এর নাম পরিবর্তন করে 'বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ' (BGB) করা হয় এবং পোশাক ও লোগো বদলে ফেলা হয়। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিডিআর বিদ্রোহের বিচারে শত শত জওয়ানের সাজা হয় এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
২০১১ সালের হিযবুত তাহরীরপন্থী ব্যর্থ ক্যু চক্রান্ত
২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একটি মধ্যম সারির সেনা কর্মকর্তাদের অভ্যুত্থান চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয় সেনা গোয়েন্দা সংস্থা (DGFI)।
চক্রান্তের ধরণ: নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত মধ্যম সারির কর্মকর্তা (যেমন: মেজর সৈয়দ মো. জিয়াউল হক) সেনা সদর দপ্তর ও সরকারকে উৎখাত করার নীল নকশা তৈরি করেছিল।
যেভাবে উন্মোচিত হয়: ধৃত ও নজরদারিতে থাকা কর্মকর্তাদের কল রেকর্ড ও গোপন বার্তার মাধ্যমে ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়েই এই চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। এটিই ছিল সেনাপ্রধান বা ডিভিশন কমান্ডার স্তরের বাইরে কোনো ধর্মীয় চরমপন্থী মতাদর্শভিত্তিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা।
কেন সেনাতে বারবার ক্যু হয়েছে এবং কীভাবে তা বন্ধ হলো?
স্বাধীনতার পর থেকে প্রথম চার দশকে বাংলাদেশে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহ ঘটার পেছনে তিনটি প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক কারণ কাজ করেছে:
১. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর সেনা বাহিনীর ভেতরে রাজনৈতিক মতাদর্শ ঢুকে পড়েছিল। যখনই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি সংঘাত বা অচলাবস্থায় পড়েছে, তখনই সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মকর্তারা সুযোগ গ্রহণ করেছেন।
২. বিচারের সংস্কৃতি না থাকা: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারে বাধা দেওয়া হয়েছিল। ফলে ক্যু করলে শাস্তি পেতে হয় না এমন ধারণা কয়েক দশকের জন্য সেনানিবাসে তৈরি হয়েছিল।
৩. সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিকিকরণ: ১৯৯০-এর দশকের পর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping Mission) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্তি তাদের পেশাদারিত্ব বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী অগণতান্ত্রিক ক্যু বা সামরিক শাসনে যুক্ত বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে। ফলে আধুনিক সেনাসদস্যরা রাজনৈতিক চক্রান্ত ছেড়ে নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক সুনামের দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছেন।
সামরিক হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক ও সামরিক মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন
স্বাধীনতার ৫০ বছরে এই পাঁচটি বড় বড় সামরিক ক্যু ও হস্তক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
চেইন অব কমান্ড ধ্বংসের খেসারত: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানে যখন জুনিয়র মেজররা একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করতে পেরেছিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে উচ্চপদস্থ জেনারেলরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তখন সেনা বাহিনীর শৃঙ্খলা চিরতরে ভেঙে পড়েছিল। এর খেসারত হিসেবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২০টিরও বেশি ছোট-বড় ক্যু ও বিদ্রোহের চেষ্টা হয়, যাতে প্রাণ হারান শত শত বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক।
রাজনৈতিক দলগুলোর অসচেতনতা ও সেনানির্ভরতা: বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যখনই কোনো সংকটে পড়েছে, তখন তারা রাজনৈতিকভাবে সমঝোতায় না গিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে অগণতান্ত্রিক পথ বেছে নিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই চরম পারস্পরিক অবিশ্বাসই সেনাপ্রধানদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অনুঘটক ভূমিকা: ১৯৭৫-এর ক্যু-তে যেমন মার্কিন ও পাকিস্তান বলয়ের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ছিল, তেমনি ১৯৮২ ও ২০০৭ সালের হস্তক্ষেপেও পশ্চিমা দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক সম্মতি বা নীরব সমর্থন কাজ করেছিল।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের প্রথম সাড়ে তিন দশক ছিল সামরিক বাহিনীর ছায়া এবং ক্ষমতার রাজনীতির এক চরম সংঘর্ষের ইতিহাস। ১৮ বছরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসন রাষ্ট্রকে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি থেকে বিচ্যুত করে এক ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ১৫ই আগস্টের রক্তাক্ত ক্যু থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের ১/১১ পর্যন্ত প্রতিটি ক্যু বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক চরম মেরুকরণের দিকে নিয়ে গেছে, যার রাজনৈতিক ক্ষতচিহ্ন আজও আমাদের জাতীয় জীবনে দৃশ্যমান।
তবে আশার কথা হলো, ২০০৮ সালের গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের পর এবং আধুনিক পেশাদার সামরিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতার কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার অতীতের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ক্যু-এর অধ্যায় পেছনে ফেলে আজ একটি আন্তর্জাতিকমানের, পেশাদার ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বিশ্বজয়ী বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে গণতন্ত্রের ত্রুটি কেবল আরও উন্নত গণতন্ত্র দিয়েই সংশোধন করা সম্ভব; কোনো সামরিক ক্যু বা অনির্বাচিত হস্তক্ষেপ কখনোই কোনো জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা















