>

>

পাকিস্তানে ৭টি ও বাংলাদেশ ২২টি সেনা অভ্যুত্থান - কোন সেনাবাহিনী বেশি দেশপ্রেমিক?

পাকিস্তানে ৭টি ও বাংলাদেশ ২২টি সেনা অভ্যুত্থান - কোন সেনাবাহিনী বেশি দেশপ্রেমিক?

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

TruthBangla

পাকিস্তানে ৭টি ও বাংলাদেশ ২২টি সেনা অভ্যুত্থান - কোন সেনাবাহিনী বেশি দেশপ্রেমিক?

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল বিষয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর প্রভাব গভীরভাবে বিস্তৃত হয়েছে। সাধারণ নাগরিক সমাজে প্রায়ই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক কাঠামোর তুলনা করা হয়। প্রচলিত ধারণায় পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের অনেক বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা।

পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস, ক্ষমতার বিস্তার এবং সহিংস রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সামরিক দখলে যাওয়ার টাইমলাইন

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বেসামরিক রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে সামরিক বাহিনীর সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় হস্তক্ষেপের ইতিহাস বেশ পুরনো। তবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের কালপঞ্জিতে এক সুস্পষ্ট বৈপরীত্য দৃষ্টিগোচর হয়। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত হয়ে পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর সামরিক বাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে সময় নিয়েছিল প্রায় ১১ বছর।

অন্যদিকে, ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে মাত্র সাড়ে চার বছরের (৫৪ মাস) মাথায় সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করে ক্ষমতার গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্থায়িত্ব এবং স্বাধীনতাত্তোর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের পার্থক্যের কারণেই এই দুই দেশে সামরিক শাসনের সূচনাপর্বে বড় ধরনের ভিন্নতা তৈরি হয়েছিল।

পাকিস্তান: জন্মের ১১ বছরেই সামরিক শাসনের দখলে

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১১ বছর পর্যন্ত দেশটিতে বেসামরিক সরকার বিদ্যমান থাকলেও পেছনের সারিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই দীর্ঘ সময় পর সামরিক হস্তক্ষেপের পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ কাজ করেছিল:

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের শূন্যতা: ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু এবং ১৯৫১ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে সাতজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হন। খাজা নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী বগুড়া, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্রিগর ও ফিরোজ খান নুন কারো সরকারই স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি।

সংবিধান প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা: একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংবিধান তৈরিতে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় ৯ বছর সময় নেয়। ১৯৫৬ সালে প্রথম সংবিধান গৃহীত হলেও কেন্দ্র ও অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে রাজনৈতিক সংকটের নিরসন ঘটেনি।

আমলাতান্ত্রিক-সামরিক চক্র বা "এস্টাবলিশমেন্ট": শুরু থেকেই পাকিস্তানের অসামরিক আমলাতন্ত্র সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একটি অলিখিত ক্ষমতার অক্ষ গড়ে তোলে। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জার মতো আমলারা নিজেদের স্বার্থে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীকে টেনে আনেন। ১৯৫১ সালের প্রারম্ভিক 'রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলা' থেকে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল (১৯৫৮): ১৯৫৯ সালের প্রস্তাবিত সাধারণ নির্বাচনকে নস্যাৎ করতে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা সংবিধান স্থগিত করে সামরিক আইন জারি করেন। তিনি জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ দেন। কিন্তু মাত্র ২০ দিনের মাথায়, ২৭ অক্টোবর, আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট মির্জাকে সরিয়ে নিজেই ক্ষমতার শীর্ষ আসন দখল করেন এবং দীর্ঘ ১১ বছরের অসামরিক শাসনের অবসান ঘটান।

বাংলাদেশ: মাত্র সাড়ে চার বছরেই সামরিক শাসনের দখলে

পাকিস্তানের দীর্ঘ ১১ বছরের বিপরীতে স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানে অত্যন্ত দ্রততম সময়ে মাত্র ৫৪ মাসের মাথায়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ভঙ্গুর পরিস্থিতি ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এই ত্বরান্বিত উত্থানে ভূমিকা রাখে:

ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে সম্পদের তীব্র সীমাবদ্ধতা, ১৯৭৪ সালের মারাত্মক দুর্ভিক্ষ, চোরাচালান, এবং চরমপন্থী দলগুলোর জাসদ ও সর্বহারা দলের রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে দেশে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সামরিক কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা (প্রত্যাবাসিত) সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি, আধা-সামরিক বাহিনী 'জাতীয় রক্ষী বাহিনী' গঠন ও উন্নয়ন নিয়মিত সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ ও হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন: ১৯৭৫ সালের শুরুতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতি পরিবর্তন করে একদলীয় 'বাকশাল' (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, যা প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত হলেও কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে বৈরিতা তৈরি করে।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর ঘটনা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর কয়েকজন মাঝারি ও নিম্নমানের বিদ্রোহী কর্মকর্তা ধানমন্ডির বাসভবনে নৃশংস হামলা চালিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যসহ হত্যা করে।

দ্রুততম উত্থান ও পরবর্তী প্রভাব: একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক কাঠামোর শীর্ষবিন্দু ধ্বংস করে সামরিক নেতৃত্ব ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে নেওয়ার ঘটনা বৈশ্বিক ইতিহাসে বিরল। ১৫ আগস্টের পর খোন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার গঠিত হলেও মূল নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্যু-র নেতৃত্ব দেওয়া মেজরদের হাতে। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান এবং ১৯৮২ সালের সেনাশাসনের পথ সুগম হয়।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: সামরিক অভিযান ও নেতৃত্বের বিলোপ

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দুই দেশের রাজনীতিতেই রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানদের পদচ্যুত ও নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ধরন ও কৌশল দুই দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ধরণ

পাকিস্তান সেনাবাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করলেও, কোনো সামরিক প্রধান বা সেনাদল সরাসরি অস্ত্রহাতে রাষ্ট্রভবনে বা বাসভবনে গিয়ে তাদের দেশের কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত বা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টকে গুলি করে হত্যা করেনি। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ধরন মূলত আততায়ীর জনসমক্ষে অতর্কিত হামলা, বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক গলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আক্রমণের ওপর নির্ভরশীল।

লিয়াকত আলী খান (১৯৫১): পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানি বাগে (যা পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে লিয়াকত বাগ নামে পরিচিত হয়) এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। হামলাকারী ছিল সাঈদ আকবর নামের এক আফগান নাগরিক, যাকে ঘটনাস্থলেই পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। এর ফলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ষড়যন্ত্রের মূল হোতাদের উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা পরবর্তীতে এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ায় ঘটনাটি রহস্যে আবৃত থেকে যায়। এটি কোনো সামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য বা প্রাতিষ্ঠানিক হামলা ছিল না।

জুলফিকার আলী ভুট্টো (১৯৭৯): ১৯৭৭ সালে 'অপারেশন ফেয়ার প্লে'-এর মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হক এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তবে জিয়াউল হক বা তাঁর সেনাদল ভুট্টোকে বাসভবনে বা বন্দিদশায় সরাসরি গুলি করে হত্যা করেনি। বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নওয়াব মোহাম্মদ আহমেদ খান কাসুরি হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। অত্যন্ত বিতর্কিত এক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে (যাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণ ‘Judicial Killing’ বা বিচারিক হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেন) ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল রাওয়ালপিন্ডি কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

বেনজীর ভুট্টো (২০০৭): ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির ঐতিহাসিক লিয়াকত বাগে এক নির্বাচনী জনসভা শেষে গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে আততায়ীর গুলিবর্ষণ ও পরপরই ঘটা আত্মঘাতী বোমা হামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডে তালেবান ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয় এবং তৎকালীন সামরিক সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা গাফিলতির অভিযোগ উঠলেও এটি সেনাকমান্ডের সরাসরি কোনো প্রকাশ্য সামরিক অভিযান ছিল না।

বাংলাদেশের রক্তাক্ত ইতিহাস: ৫ জন শীর্ষ নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সামরিক অভ্যুত্থানের প্রকৃতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ডে রঞ্জিত। এখানে সেনাবাহিনী ও সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশ সরাসরি কমান্ড পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে, বাসভবনে কিংবা কারাফাটকের ভেতরে প্রবেশ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সাবেক মিলে মোট পাঁচজন শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে হত্যা করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি): ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী জুনিয়র কর্মকর্তা (মেজর ডালিম, মেজর নূর, মেজর রাশেদ চৌধুরী, রিসালদার মোসলেমউদ্দিন প্রমুখ) ট্যাঙ্ক ও সামরিক সাঁজোয়া যান নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর নিজ বাসভবনে অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই সামরিক অভিযানে তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল, দুই নবপরিণীতা বধূ, ভাই শেখ নাসেরসহ স্বপরিবারে ১৮ জন সদস্য নিহত হন।

এম মনসুর আলী (দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী): ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সংরক্ষিত ও নিরাপদ হেফাজতে প্রবেশ করে একদল সেনাসদস্য। ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে জড়িত সেনাসদস্যদের নির্দেশে ও সরাসরি গুলিবর্ষণে স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলীকে কারাকক্ষের ভেতরেই হত্যা করা হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ (সাবেক প্রধানমন্ত্রী): বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের মূল রাজনৈতিক পরিচালক তাজউদ্দীন আহমদকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশে গুলি ও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও কোনো বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়াই সেনাসদস্যরা সরাসরি গিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করে।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম (সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি): ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকেও একই রাতে (৩ নভেম্বর) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে অন্য জাতীয় নেতাদের সঙ্গে হত্যা করা হয়। কারাফাটক খুলে সেনাসদস্যদের ভেতরে ঢুকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা শীর্ষ নেতাদের হত্যা করার এই ঘটনা ইতিহাসে 'জেল হত্যা' নামে চিহ্নিত।

জিয়াউর রহমান (দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি): ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের শিকার হন। মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের অনুসারী সেনাসদস্যদের একটি দল রকেট লাঞ্চার ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে সার্কিট হাউসে প্রকাণ্ড হামলা চালায়। এতে বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত সাবেক সেনাপ্রধান ও তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ বাহিনীরই একটি অংশের সরাসরি সামরিক অভিযানে নিহত হন।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, দেশের স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মূল চার জাতীয় নেতা এবং একজন বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান তথা রাষ্ট্রপতি সকলেই নিজ দেশের সেনাবাহিনীর হাতে বা সামরিক অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় প্রাণ হারিয়েছেন।

সফল ও ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের তুলনামূলক পরিসংখ্যান

সামরিক ক্ষমতার অপব্যবহার, সেনানিবাসে শৃঙ্খলাহানি এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিচারে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাসকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা যায়।

সফল সামরিক অভ্যুত্থান: পাকিস্তান (৪ বার)

১. ১৯৫৮ (জেনারেল আইয়ুব খান): ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা প্রথম সামরিক শাসন জারি করে ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করেন। এর ঠিক ২০ দিন পর, ২৭ অক্টোবর সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেন এবং নিজে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এর মাধ্যমে পাকিস্তানে দীর্ঘ ১০ বছরের সামরিক শাসনের সূচনা হয়।

২. ১৯৬৯ (জেনারেল ইয়াহিয়া খান): ১৯৬৯ সালের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বাধীন ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে টিকতে না পেরে ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় সংবিধান লঙ্ঘন করে তিনি ক্ষমতা তুলে দেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হাতে। ইয়াহিয়া খান পুনরায় সামরিক আইন জারি করেন এবং সেনাপ্রধান হিসেবে দেশের শাসনভার নেন, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রাম ও পাকিস্তান বিভাজনের মূল প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

৩. ১৯৭৭ (জেনারেল জিয়াউল হক): ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই 'অপারেশন ফেয়ার প্লে' নামের এক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হক তৎকালীন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সংবিধান স্থগিত করে সামরিক আইন জারি করা হয় এবং ১৯৭৯ সালে এক বিতর্কিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। জিয়াউল হক ১৯৮৮ সালে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ১১ বছর ক্ষমতা ধরে রাখেন।

৪. ১৯৯৯ (জেনারেল পারভেজ মোশাররফ): ১২ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে বরখাস্ত করে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগের চেষ্টা করেন। শ্রীলঙ্কা থেকে মোশাররফকে বহনকারী বাণিজ্যিক বিমান করাচি বিমানবন্দরে অবতরণে বাধা দিলে সেনাবাহিনী দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। সেনাসদস্বর অনুগত কর্মকর্তারা পিটিভি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখল করে নওয়াজ শরীফকে গ্রেপ্তার করেন। মোশাররফ 'চিফ এক্সিকিউটিভ' পদে নিজেকে আসীন করে সামরিক শাসন কায়েম করেন।

সফল সামরিক অভ্যুত্থান: বাংলাদেশ (৫ বার)

১. ১৫ আগস্ট ১৯৭৫: জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা ও কিছু বরখাস্তকৃত কর্মকর্তার (যেমন মেজর শরীফুল হক ডালিম, মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ও মেজর রশিদ) নেতৃত্বে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে এক নারকীয় আক্রমণ চালিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। অভ্যুত্থানকারীরা রাজনৈতিক নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসায় এবং দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়।

২. ৩ নভেম্বর ১৯৭৫: ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারীদের অরাজকতা বন্ধ ও সেনাশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। খন্দকার মোশতাক পদত্যাগে বাধ্য হন এবং বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মোশতাকপন্থী জুনিয়র অফিসারদের ব্যাংককে পাঠাতে বাধ্য করা হয়।

৩. ৭ নভেম্বর ১৯৭৫: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর জাসদ সমর্থিত 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' ও কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের নামে একটি রক্তক্ষয়ী পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। এই ঘটনায় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও লেফট্যানেন্ট কর্নেল হায়দার নিহত হন। গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যিনি পরবর্তীতে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পরে রাষ্ট্রপতি হন।

৪. ২৪ মার্চ ১৯৮২: তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সংবিধান স্থগিত ঘোষণা করে এরশাদ নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA) হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রপতি পদ দখল করেন এবং দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচারী শাসন পরিচালনা করেন।

৫. ১১ জানুয়ারি ২০০৭ (১/১১): প্রধান বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন ও ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতার মুখে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের প্রধান ভূমিকার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয়। ইয়াজউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ ত্যাগ করেন এবং সেনাসমর্থিত অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ফখরুদ্দীন আহমদ দায়িত্ব নেন। পরবর্তী দুই বছর সেনা নিয়ন্ত্রণে দেশ পরিচালিত হয়।

ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান: পাকিস্তান (৩ বার)

১. ১৯৫১ (রাওয়ালপিন্ডি কনস্পিরেসি): ৯ মার্চ ১৯৫১ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানের আমলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে প্রথম অসামরিক সরকার উৎখাতের চেষ্টা প্রকাশ পায়। মেজর জেনারেল আকবর খানের নেতৃত্বে সামরিক কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী (যেমন কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ) প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বেসামরিক সরকার উৎখাতের চক্রান্ত করেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা তথ্যে চক্রান্ত ফাঁস হলে আকবর খানসহ সবাইকে গ্রেপ্তার করে বিশেষ আদালতে বিচার করা হয়।

২. ১৯৮০ (তাজম্মুল হুসাইন মালিকের প্রচেষ্টা): জিয়াউল হকের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। ১৯৮০ সালে মেজর জেনারেল তাজম্মুল হুসাইন মালিক ও তাঁর অনুসারী কিছু কর্মকর্তা জিয়াউল হককে ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসের কুচকাওয়াজে হত্যা করে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেন। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই সামরিক গোয়েন্দারা তা ধরে ফেলে এবং বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।

৩. ১৯৯৫ (অপারেশন ফক্স-হান্ট): ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে কঠোর ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল জহিরুল ইসলাম আব্বাসি ও ব্রিগেড কমান্ডার মুস্তাফিজুর রহমান। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল ওয়াহিদ কাকার ও মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (MI) যৌথভাবে এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে চক্রান্তকারী কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করে।

ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান: বাংলাদেশ (কমপক্ষে ১৭টি)

১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২০টির মতো সামরিক বিদ্রোহ ও সশস্ত্র অভ্যুত্থান চেষ্টা ঘটে। এর মধ্যে ১৭টি প্রধান ব্যর্থ ক্যু দাপ্তরিক ও ঐতিহাসিক নথিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

১. ১৯৭৭ সালের বগুড়া ও ঢাকা বিমানবন্দর বিদ্রোহ: ১৯৭৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বগুড়া সেনানিবাসে বিদ্রোহ ঘটে। এর পরদিনই, ২ অক্টোবর গভীর রাতে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাহিনীর সদস্যরা রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ ঘটায়, যখন বিমান বাহিনীর উপ-প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ অপহৃত জাপানি রেড আর্মি বিমানের সংকট নিরসনে কথা বলছিলেন। বিদ্রোহী সিপাহী ও বিমান সেনারা একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হত্যা করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান অত্যন্ত কঠোরভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেন এবং পরবর্তীতে গঠিত সামরিক আদালতে শত শত সামরিক সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২. ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড ও মঞ্জুরের বিদ্রোহ: ৩০ মে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে একদল সেনাসদস্যের হামলায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন এবং রেডিওতে ঘোষণা দিয়ে সরকার গঠনের দাবি করেন। তবে ঢাকার সেনাসদর সেনাপ্রধান এরশাদের অধীনে রাষ্ট্রীয় অনুগত থাকে এবং চট্টগ্রাম অভিযান শুরু করে। অভ্যুত্থানটি মাত্র ৩ দিনের মাথায় ব্যর্থ হয় এবং মঞ্জুরকে আটক করার পর রহস্যজনকভাবে হত্যা করা হয়।

৩. ১৯৯৬ সালে জেনারেল নাসিমের অভ্যুত্থান চেষ্টা: ২০ মে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের আদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপতি দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর আদেশ দিলে নাসিম তা প্রত্যাখ্যান করে ঢাকামুখী সেনা ইউনিট পাঠাতে নির্দেশ দেন। তবে সাভার, বগুড়া ও টাঙ্গাইল এলাকার অনুগত সেনাদল ঢাকার প্রবেশমুখ বন্ধ করে দেয় এবং বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্যাঙ্ক মোতায়েন করে নাসিমপন্থী সেনাদের গতি রোধ করে। ফলে নাসিমের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার ও বরখাস্ত করা হয়।

৪. ২০১১ সালে হিযবুত তাহরীর ও চরমপন্থী অফিসারদের ক্যু চক্রান্ত: ডিসেম্বর ২০১১-তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, সেনাবাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কিছু চরমপন্থী কর্মকর্তা (যেমন বহিষ্কৃত মেজর জিয়াউল হক) নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর সাথে হাত মিলিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত ও সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত করেছিল। গোয়েন্দা বিভাগের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় এই চক্রান্তের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে চক্রান্তকারী অফিসারদের গ্রেপ্তার ও বরখাস্ত করা হয়।

পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: সামরিক রাজনীতি সংক্রান্ত তথ্যচিত্র

নিচে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল, রক্তপাত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতির পরিসংখ্যানগত তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো:

সূচক ও বিশ্লেষণাত্মক বিষয়

পাকিস্তান সেনাবাহিনী

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

প্রথম সফল অভ্যুত্থানের সময়কাল

দেশের জন্মের ১১ বছর পর (১৯৫৮)

দেশের জন্মের ৪.৫ বছর পর (১৯৭৫)

সফল সামরিক অভ্যুত্থানের সংখ্যা

৪ বার (১৯৫৮, ১৯৬৯, ১৯৭৭, ১৯৯৯)

৫ বার (আগস্ট ৭৫, ৩ নভে ৭৫, ৭ নভে ৭৫, ১৯৮২, ২০০৭)

ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান/বিদ্রোহের সংখ্যা

প্রধানত ৩টি ঘটনা

কমপক্ষে ১৭টি নথিভুক্ত ঘটনা

সামরিক অভিযানে নিহত রাষ্ট্র/সরকারপ্রধান

০ জন (সরাসরি সামরিক গুলিবর্ষণে নিহত হননি)

৫ জন (শেখ মুজিব, মনসুর আলী, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, জিয়াউর রহমান)

সামরিক শাসনের ধরন

প্রাতিষ্ঠানিক "Deep State" বা কর্পোরেট আধিপত্য

শৃঙ্খলাহীন বিশৃঙ্খলা, রক্তক্ষয়ী ক্যু ও রাজনৈতিক শূন্যতা

সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মৃত্যুদণ্ড

তুলনামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিচার

চরম গণহত্যা (১৯৭৭-৮১ মেয়াদের সামরিক আদালতে শত শত সদস্যের মৃত্যুদণ্ড)

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ: কোন দেশের সেনাবাহিনী বেশি দেশপ্রেমিক বা উশৃঙ্খল?

সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা ও কঠোর চেইন অফ কমান্ড। ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থান যখন বারংবার ঘটতে থাকে, তখন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে এবং পেশাদারিত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি সশস্ত্র বাহিনীর অতিরিক্ত লোভ কিংবা অভ্যন্তরীণ দলাদলি মূলত সামরিক কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে তোলে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী: প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অফ কমান্ড ও শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ

পাকিস্তানের ইতিহাসে সফল ক্যু-এর সংখ্যা ৪টি (১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান, ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান, ১৯৭৭ সালে জিয়াউল হক এবং ১৯৯৯ সালে পারভেজ মোশাররফ)। কিন্তু সেখানে শীর্ষ সেনাপ্রধানের নির্দেশ ছাড়া অধস্তন কর্মকর্তা বা জুনিয়র অফিসারদের দ্বারা পরিচালিত ক্যু-এর ঘটনা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। পাকিস্তানে মাত্র তিনটি উল্লেখযোগ্য ব্যর্থ ক্যু-এর নজির পাওয়া যায়:

১৯৫১ সালের রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র: মেজর জেনারেল আকবর খানের নেতৃত্বে কম্যুনিস্ট ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের (যেমন কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ) সহযোগিতায় প্রথম ব্যর্থ ক্যু-এর চেষ্টা চালানো হয়।

১৯৭৩ সালের অ্যাটক ষড়যন্ত্র: জুলফিকার আলী ভুট্টোর বেসামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার আলী এল-ইদ্রুস ও মেজর ফারুক আদমের নেতৃত্বে নিম্ন ও মধ্যম সারির কয়েকজন কর্মকর্তা সরকার পতনের পরিকল্পনা করেন, যা সেনাপ্রধানের সময়োপযোগী পদক্ষেপে ব্যর্থ হয়।

১৯৯৫ সালের 'অপারেশন খিলাফত': প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর মেয়াদে মেজর জেনারেল জহিরুল ইসলাম আব্বাসীর নেতৃত্বে একদল চরমপন্থী ইসলামপন্থী জুনিয়র কর্মকর্তা সেনাবাহিনীতে অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইসলামী শাসন কায়েমের চেষ্টা করে।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর এই ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে ক্ষমতার রাজনৈতিক লোভ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অফ কমান্ড ও জ্যেষ্ঠতার ক্রম অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। সেনা সদর দপ্তর (GHQ) বা সেনাপ্রধানের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জুনিয়র অফিসারদের বিদ্রোহ করার ক্ষমতা সেখানে একেবারেই সীমিত ছিল। অর্থাৎ পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করলেও নিজেদের ভেতরের চেইন অফ কমান্ড ভেঙে চরম বিশৃঙ্খলা বা গণ-বিদ্রোহ সৃষ্টি হতে দেয়নি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: স্বাধীনতা পরবর্তী কোন্দল, লোভ-লালসা ও ধারাবাহিক অভ্যুত্থান

অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সামরিক বাহিনীর ভেতরের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও জটিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর সেনাবাহিনী গঠনের শুরুতেই একটি গভীর আদর্শিক ও মানসিক বিভাজন তৈরি হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া 'মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা' এবং পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা 'প্রত্যাবাসিত কর্মকর্তা'দের (Returned Officers) মধ্যে। এছাড়া জাসদ ও জাসদের অঙ্গসংগঠন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'র চরমপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হয়।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অন্তত ১৭টি (মতান্তরে ২১টি) ছোট-বড় ব্যর্থ ও সফল সেনাদলীয় অভ্যুত্থান ঘটে:

১৯৭৫ সালের ঘটনাবলী: ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কতিপয় বিদ্রোহী জুনিয়র সেনাকর্মকর্তা নির্মমভাবে হত্যা করে। এর পর ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের নামে চেইন অফ কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এই সময়ে বহু মেধা সম্পন্ন কর্মকর্তা নিহত হন।

১৯৭৭ সালের বিমানবাহিনীর বিদ্রোহ: ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর জাপানি রেড আর্মির একটি বিমান ঢাকা বিমানবন্দরে ছিনতাই হয়ে অবতরণ করে। সেই সংকট চলাকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর একটি ভয়াবহ বিদ্রোহ ঘটে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার অত্যন্ত কঠোর হস্তে এই বিদ্রোহ দমন করে এবং পরবর্তীতে সামরিক আদালতের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে ১,০০০-এর বেশি সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয় বা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়।

১৯৮১ সালের চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান: ৩০ মে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পরিচালিত ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদের অধীনে সেনাবাহিনী পুনরায় সংগঠিত হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ঘটে যাওয়া এই ধারাবাহিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ফলে হাজার হাজার যোগ্য, প্রশিক্ষিত ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিক জীবন হারান। এতে শুধু সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও অবকাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত ভঙ্গুর করে তোলা হয়েছিল।

পেশাদারিত্ব, ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ উশৃঙ্খলতার মূল্যায়ন

কোন দেশের সেনাবাহিনী বেশি 'দেশপ্রেমিক' বা 'উশৃঙ্খল' তা কেবল ক্যু-এর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না, বরং তা নির্ভর করে বাহিনীর কাঠামোগত আচরণ ও রাজনীতিকরণের ওপর।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে: পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের রাষ্ট্রের 'রক্ষক' মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের কর্পোরেট স্বার্থ এবং ক্ষমতার মোহ তাদের বারবার রাজনীতিতে টেনে এনেছে। তবে তাদের শৃঙ্খলা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ও উপর থেকে নিচমুখী (Top-down)। তারা দেশের রাজনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অফ কমান্ড ধরে রাখতে পেরেছিল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব এবং অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দলের কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সংকটে ভুগেছে। এটি ছিল নিচ থেকে ওপরমুখী (Bottom-up) উশৃঙ্খলতা, যেখানে জুনিয়র অফিসার বা সাধারণ সিপাহীরাও চেইন অফ কমান্ড ভেঙে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের হত্যা ও তক্তাপল্টে মেতে উঠেছিল।

সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেকোনো দেশের জন্য আত্মঘাতী। পাকিস্তান যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সেনা-শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, বাংলাদেশ সেখানে অভ্যন্তরীণ ক্যু ও অরাজকতার মাধ্যমে নিজেদের বহু দক্ষ সামরিক সম্পদ হারিয়ে সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। সেনাশৃঙ্খলার এই অবক্ষয় প্রমাণ করে যে, সশস্ত্র বাহিনী যখনই পেশাদার সীমান্তরক্ষার ভূমিকা ছেড়ে রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে হাত বাড়ায়, তখনই তার খেসারত দিতে হয় দেশ ও বাহিনী উভয়কেই।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, মনস্তত্ত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার গতিপথ এবং কাঠামোগত আচরণের মধ্যে মৌলিক কিছু বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান, যার শিকড় প্রোথিত রয়েছে তাদের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তত্ত্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীরে।

পাকিস্তানের "আমলাতান্ত্রিক-সামরিক" কাঠামো ও ভূ-রাজনীতি

পাকিস্তান সেনাবাহিনী মূলত ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক এবং আধা-সামন্তবাদী প্রশাসনিক কাঠামো সরাসরি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই দেশটির প্রতিরক্ষা নীতি পরিচালিত হয়েছে "ভারত-ভীতি" বা অ্যান্টি-ইন্ডিয়া সেন্টিমেন্টকে কেন্দ্র করে। এই কাঠামোর মূল মনস্তত্ত্ব ছিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভারতের সামরিক হুমকির ধোঁয়াশা তুলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ অংশ, বাজেট ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

কর্পোরেট স্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা: পাকিস্তান সামরিক বাহিনী কেবল একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। 'ফৌজি ফাউন্ডেশন', 'আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট', 'শাহীন ফাউন্ডেশন' এবং 'আসকারি ব্যাংক'-এর মাধ্যমে তারা ব্যাংকিং, রিয়েল এস্টেট, রাসায়নিক সার, টেলিকম ও পরিবহন খাতের মতো বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের দরুন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসার থেকে শুরু করে সাধারণ জওয়ানদের নিজস্ব সুনির্দিষ্ট সুবিধা ও স্বার্থ সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে চেইন অফ কমান্ড ভেঙে সামরিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুনিয়র অফিসারদের হঠাৎ বিদ্রোহ করার কোনো সুযোগ বা রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা তৈরি হয় না।

নিয়ন্ত্রিত ও প্রাসাদসম ক্যু: ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান, ১৯৭৭ সালে জিয়াউল হক এবং ১৯৯৯ সালে পারভেজ মোশাররফের ক্ষমতা দখল ছিল শতভাগ সুসংগঠিত এবং রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স (GHQ) ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত। এসব ক্যুতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কোনো দলীয় রক্তপাত হয়নি; বরং রাজনৈতিক নেতাদের বন্দি করা, সাজানো আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া কিংবা ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বেসামরিক ক্ষমতা স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা: স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সেটো (SEATO) ও সেন্টো (CENTO) সামরিক জোট গঠন এবং পরবর্তীতে ৮০-এর দশকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় মার্কিন ও সৌদি অর্থায়ন এবং উন্নত অস্ত্রের প্রবাহ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত করে, যা তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সংকট ও লোভী মানসিকতা

পাকিস্তানের বিপরীতে, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের এক রক্তক্ষয়ী ও প্রথাভাঙ্গা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই বাহিনীর ভিত্তি ঐতিহ্যবাহী কোনো ব্যাক-ব্যারাক সামরিক মতাদর্শের ওপর গড়ে ওঠেনি; বরং এখানে পেশাদার সামরিক সদস্যদের সাথে সাধারণ আমজনতা, ছাত্র এবং তীব্র রাজনৈতিক মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ যুবসমাজ একত্রিত হয়েছিল।

চেইন অফ কমান্ডের বৈচিত্র্য ও দ্বিধা-বিভক্তি: স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গভীর আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ফাটল দেখা দেয়। একদিকে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া 'মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ান', অন্যদিকে ছিলেন পাকিস্তান থেকে পরবর্তীতে ফেরত আসা 'পাকিস্তান-ফেরত' (Repatriated) সামরিক কর্মকর্তা। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, সমকালীন দ্রুত রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB) গঠনের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষোভ সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলার দিক থেকে দুর্বল করে তোলে।

বামপন্থী রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ: স্বাধীনতাত্তোর সামরিক বাহিনীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও তাদের সশস্ত্র অঙ্গসংগঠন "গণবাহিনী"-র মতো বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গভীর সাময়িক ও রাজনৈতিক প্রভাব পড়ে। জাসদের 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' সাধারণ জওয়ানদের মধ্যে 'অফিসার-মুক্ত শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী' গড়ার বিপ্লবী ধারণা ছড়ায়, যা অফিশিয়াল চেইন অফ কমান্ডের ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়।

জুনিয়র অফিসারদের দুঃসাহস ও রক্তক্ষয়: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মেজর ও ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার কতিপয় জুনিয়র কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এটি ছিল একটি অনাধিকার ও গুরুতর শৃংখলাভঙ্গকারী সামরিক পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসেও বিরল।

কমান্ড লাইনের চূর্ণবিচূর্ণ রূপ (১৯৭৫-১৯৮১): ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের ক্যু এবং ৭ নভেম্বরের তথাকথিত 'সিপাহী-জনতা বিপ্লব'-এর পর সেনাসদস্যদের নিজেদের মধ্যে ব্যাপক রক্তপাত ঘটে। এই সময় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, কর্নেল হায়দারসহ বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়।

পরবর্তীতে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আনুমানিক ২০টিরও বেশি ছোট-বড় অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়, যার ফলে বিতর্কিত সামরিক আদালত (কোর্ট-মার্শাল)-এর মাধ্যমে শত শত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়। অবশেষে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের অনুসারীদের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজেই প্রাণ হারান।

"পাকি চেতনা" ও সিভিল-সামরিক মিথস্ক্রিয়া

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় প্রায়ই একটি বক্তব্য শোনা যায়: "আমাদের সেনাবাহিনী যেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মতো হয়ে না যায়" কিংবা "বাংলাদেশকে পাকিস্তান হতে দেওয়া যাবে না।" ঐতিহাসিক কষ্টিপাথরে এই বক্তব্যের গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি এক ধরণের অন্ধ জাতীয়তাবাদী অহংকার এবং ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা। বাস্তব সত্য হলো, রাজনৈতিক হত্যা, অসংগঠিত ক্যু এবং বিশৃঙ্খল সামরিক হস্তক্ষেপের দিক থেকে বাংলাদেশ বহু আগেই পাকিস্তানের রেকর্ড স্পর্শ করেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে অতিক্রমও করেছে।

সিভিল-সামরিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক অভিঘাত

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ক্ষমতার বলয় (Establishment) তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র শাসন করেছে। আইয়ুব খান, জিয়াউল হক কিংবা পারভেজ মোশাররফের আমলে আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে সামরিক শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের সিভিল-সামরিক ইতিহাস অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী, বিশৃঙ্খল এবং উপদলীয় সংঘাতপূর্ণ।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও ট্র্যাজেডি: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, একই বছরের ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা এবং ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানকে হত্যার মতো ঘটনাগুলোর মাধ্যমে সেনানিবাস সরাসরি জাতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

অভ্যন্তরীণ রক্তপাত ও গণফাঁসি: ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় দুই ডজন ছোট-বড় সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। এর ফলশ্রুতিতে সামরিক আদালতের বিচারে তড়িঘড়ি করে সহস্রাধিক সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার বদলে চরম ভয় ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি তৈরি করে।

ছায়া-নিয়ন্ত্রণ ও ১/১১: প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলেও ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (১/১১) প্রমাণ করে যে, সিভিল প্রশাসনের ব্যর্থতায় সামরিক বাহিনীর ছায়া-নিয়ন্ত্রণ বারবার ফিরে এসেছে।

রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতা ও সেনানিবাস নির্ভরতা

সামরিক বাহিনী স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনীতিতে আসে না; বেসামরিক রাজনীতির চরম দেউলিয়াত্ব ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সুযোগেই তারা রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত মীমাংসায় ব্যর্থ হয়, নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকার জন্য সেনানিবাসকে রাজনৈতিক ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তখন তারা মূলত সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিতে ডেকে আনে।

পেশাদারিত্বের অবক্ষয়: সামরিক বাহিনীকে যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন বাহিনীর নিজস্ব পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও জনবিচ্ছিন্নতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।

বেসামরিক কর্তৃত্বের অনুপস্থিতি: একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী থাকে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধীনে। কিন্তু যখন বেসামরিক দলগুলো নিজেদের বৈধতা হারানোর ভয়ে বলপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন বেসামরিক কর্তৃত্ব (Civilian Supremacy) কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।

ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তান একটি "গ্যারিসন রাষ্ট্র" (Garrison State) হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে তাদের ভৌগোলিক সীমানা ও অস্তিত্বের সংকট প্রধান ভূমিকা রেখেছে।

সীমান্ত বিরোধ ও সামরিক প্রাধান্য: পাকিস্তানের সাথে ভারতের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এবং আফগান সীমান্তের কৌশলগত অস্থিরতা তাদের সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রায় তিন দিক থেকে একটিমাত্র প্রতিবেশী দেশ (ভারত) এবং দক্ষিণ-পূর্বে মায়ানমার দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভৌগোলিক সীমানায় কোনো প্রত্যক্ষ অস্তিত্বগত বা আদর্শিক শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র না থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল দেশীয় সামরিক বলয়কে শক্তিশালী করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও ফিলিস্তিনের শিক্ষা: ফিলিস্তিন বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দুর্বল হলে এবং সামরিক বাহিনী রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপকারী ভূমিকায় থাকলে তা বহিরাগত শক্তির ছায়াযুদ্ধে (Proxy War) পরিণত হয়। বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতো জটিল ভৌগোলিক সামরিক হুমকি না থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সার্বক্ষণিক ঝুঁকিতে রাখে।

পেশাদারিত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

যে সামরিক বাহিনী নিজ দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে সপরিবারে হত্যা করতে পারে, রাজনৈতিক বন্দীদের জেলে হত্যা করতে পারে এবং নিজস্ব সহকর্মীদের হাজার হাজার সংখ্যায় ফাঁসি দিতে পারে সেই সামরিক শক্তির ভেতরে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর "পেশাদারিত্ব" নিশ্চিত না করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন অসম্ভব।

রাজনীতিকে সামরিক প্রভাবমুক্ত করা: রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব দূর করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংকট সমাধানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেন সেনানিবাসকে ক্ষমতার হাতিয়ার বানানোর সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা: প্রতিরক্ষা নীতি গঠন, সামরিক বাজেট এবং প্রশাসনের ওপর জাতীয় সংসদ ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কার্যকর আইনগত নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

দলীয়করণ রোধ: সামরিক কর্মকর্তাদের পেশাগত পদোন্নতি, পদায়ন ও সুযোগ-সুবিধা রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে শতভাগ যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

সার্বভৌমত্ব ও পেশাদার সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো সম্ভাব্য বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিভিত্তিক ও পেশাদার সেনাবাহিনী অপরিহার্য। তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনীর সর্বপ্রধান শক্তির উৎস কেবল অস্ত্র কিংবা সদস্যসংখ্যা নয়, বরং সংবিধান ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বৈশ্বিক ইতিহাস এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা কেবল গণতন্ত্রের বিকাশই নিশ্চিত করে না, বরং সেনাবাহিনীর নিজস্ব শৃঙ্খলা, ঐক্য ও পেশাদারি মর্যাদা বজায় রাখারও প্রধান পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত রাখা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

সংবিধানের অবাধ্যতা রোধ ও কঠোর আইনি আইনি কাঠামো: সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে সংবিধানের চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব পুনপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি। যেকোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ, ক্ষমতা দখল বা পরোক্ষ রাজনৈতিক কলকাঠি নাড়ানোর প্রচেষ্টাকে সংবিধান লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোরতম আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণে বেসামরিক কর্তৃত্বের তদারকি বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে কার্যকরভাবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রাখা আবশ্যক, যাতে কোনো পর্যায়ে সেনা নেতৃত্ব একক সিদ্ধান্তের এখতিয়ার না পায়।

পেশাদারিত্ব, সামরিক আধুনিকায়ন ও কৌশলগত অগ্রাধিকার পরিবর্তন: অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা বেসামরিক প্রশাসনিক কাজে সেনাবাহিনীকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করলে তাদের পেশাদারি ফোকাস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনগণের সাথে বৈরী সম্পর্কের ঝুঁকি তৈরি হয়। সামরিক বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে দূরে রেখে সীমান্ত প্রতিরক্ষা, আকাশ ও সামুদ্রিক সীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার প্রাক-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির দিকে মনোযোগী করতে হবে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদারি দক্ষতা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সামরিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্রের সংস্থান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

সামরিক শিক্ষাক্রমে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তকরণ: জাতীয় ইতিহাসের সংবেদনশীল ও জটিল অধ্যায়গুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণ কাঠামোর ভেতরে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (BMA) এবং ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের (DSCSC) পাঠ্যক্রমে ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ও পরবর্তী রক্তক্ষয়ী সেনাকু, বিডিআর বিদ্রোহ এবং সামরিক শাসনের নেতিবাচক প্রভাবসমূহ নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণা নিশ্চিত করা উচিত। ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ পঠন সামরিক কর্মকর্তাদের এটি অনুধাবন করতে সাহায্য করে যে, সাংবিধানিক সীমা অতিক্রমের ফলে বাহিনী কীভাবে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও পেশাদারি সংকটের মুখে পড়ে।

বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ও জবাবদিহিতা: প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক শূন্যতাই মূলত সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে। সে কারণে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং বেসামরিক প্রশাসনিক সংস্থাসমূহকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা অপরিহার্য। পাশাপাশি জাতীয় সংসদের 'প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি'কে কার্যকর করে প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়া এবং পদোন্নতির নীতিমালায় বেসামরিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা স্থাপন করা প্রয়োজন।

পেশাদারি সীমানা ও বেসামরিক কর্তৃত্বের নীতি: সেনাবাহিনীর গৌরব কেবল আবেগীয় প্রচার বা 'সর্বোচ্চ দেশপ্রেমিক' তকমায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং সংবিধানের প্রতি তাদের বাস্তব আনুগত্যের মাধ্যমেই প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষিত হয়। বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে সুশৃঙ্খল থেকে নিজের পেশাদারি সীমানার মধ্যে অবস্থান করাই যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সামরিক শক্তির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করে।

যে সেনাবাহিনী তার নিজস্ব শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারে না এবং দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সে সেনাবাহিনীকে কেবল আবেগ দিয়ে 'সর্বোচ্চ দেশপ্রেমিক' হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই। প্রকৃত দেশপ্রেম প্রতিফলিত হয় সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা, জনগণের অধিকারকে শ্রদ্ধা করা এবং নিজের পেশাদার সীমানার ভেতরে অবস্থান করার মাধ্যমে। বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে সামরিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনস্থ রাখতে হবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার চালক হিসেবে নয়।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যাদের জীবন ও কীর্তিকে কেবল তাদের জীবদ্দশায় নয়, বরং মৃত্যুর পরও এক সুপরিকল্পিত ও হিংসাত্মক অপপ্রচারের কালো চাদরে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ও নির্মমভাবে অপপ্রচারের শিকার হওয়া এক অবিসংবাদিত যুবনেতার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.