>

>

বিদ্যুৎ জ্বালানি মন্ত্রী শেখ হাসিনা - বাংলাদেশের বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের ১৫ বছরের স্বর্ণযুগ

বিদ্যুৎ জ্বালানি মন্ত্রী শেখ হাসিনা - বাংলাদেশের বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের ১৫ বছরের স্বর্ণযুগ

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

TruthBangla

বিদ্যুৎ জ্বালানি মন্ত্রী শেখ হাসিনা - বাংলাদেশের বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের ১৫ বছরের স্বর্ণযুগ

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন এই প্রশ্নটি বিশ্বের যেকোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষককে করা হলে উত্তর আসবে অত্যন্ত সহজ ও জানা। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, এই দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন?

কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আজকের এই আলোচনাটি রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনাকে নিয়ে নয়, কিংবা সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর সামগ্রিক শাসনকাল নিয়েও নয়। আজকের বিশ্লেষণটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ এবং পরিসংখ্যাননির্ভর আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো ‘বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা’ এবং তাঁর দেড় দশকের দূরদর্শী বিদ্যুৎ নীতি।

একটি রাষ্ট্র যখন বিদ্যুৎহীনতায় স্থবির হয়ে পড়ে, তখন কেবল রাজনীতি বা বক্তৃতায় কলকারখানা চলে না; সেখানে প্রয়োজন হয় কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত, সাহস এবং কার্যকর বাস্তবায়ন ক্ষমতা। ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের সামনে যে ভয়াবহ অন্ধকার ও স্থবিরতা ছিল, সেখান থেকে ২০২৪ সালে এসে দেশের প্রতিটি কোণে শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পেছনের মূল স্থপতি ছিলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০০৯ এর অন্ধকার বাংলাদেশ: 'খাম্বা যুগ' ও করুণ অন্ধকার

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের রূপান্তর বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে পিছন ফিরে তাকাতে হবে ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলোতে। ইতিহাসকে কোনোভাবেই মুছে ফেলা যায় না। তৎকালীন সরকারগুলোর সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত বলতে বোঝানো হতো জীর্ণ-শীর্ণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঘন ঘন জাতীয় গ্রিড বিপর্যয় এবং রাস্তাঘাটে কেবল শূন্য খাম্বা বা পোল পুতে রাখার এক করুণ নাটক।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাইলের পর মাইল কেবল শূন্য বিদ্যুৎ পোল বা খাম্বা বসিয়ে রাখা হয়েছিল, যেগুলোতে কোনো তার ছিল না এবং সংযোগ দেওয়ার মতো কোনো সাব-স্টেশন বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হয়নি। জরাজীর্ণ সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণের অভাবে জাতীয় গ্রিড ট্রিপ করা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দেশের বড় অংশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউটের শিকার হতো।

চুরি, কারিগরি ত্রুটি এবং সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়নের অভাবে বিতরণ ও সঞ্চালন প্রক্রিয়াতেই উৎপন্ন বিদ্যুতের একটি বিশাল অংশ অপচয় হয়ে যেত, যা খাতের আর্থিক লোকসান বাড়িয়েছিল।

৫,০০০ মেগাওয়াটের কাগজ-কলমে সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের ভয়াবহ চিত্র

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন শেখ হাসিনা সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন কাগজে-কলমে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও ভয়াবহ! দাপ্তরিক তথ্যে মোট ইনস্টলড সক্ষমতা প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট দেখানো হলেও অধিকাংশ পাওয়ার প্ল্যান্ট পুরনো ও রক্ষণাবেক্ষণহীন হওয়ায় বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছিল ৩,২০০ থেকে ৩,৮০০ মেগাওয়াটে

সারা দেশে তৎকালীন ন্যূনতম চাহিদা ছিল ৫,০০০ মেগাওয়াটের বেশি, যার ফলে প্রতিদিন গড়ে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকত।

ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ ও সিদ্দিরগঞ্জের মতো প্রধান প্রধান সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সঠিক সংস্কারের অভাবে ক্ষমতার অর্ধেকে চেইন ডাউন হয়ে চলত। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহের অভাবে বহু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস বসে থাকত।

স্থবির অর্থনীতি ও নাগরিক দুর্ভোগ

সেই সময় বাংলাদেশের গ্রামবাংলা তো বটেই, রাজধানী ঢাকা শহরের মানুষকেও দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মধ্যে বসবাস করতে হতো।

শিল্প খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব: বিদ্যুৎ সংকটের প্রত্যক্ষ আঘাত এসে পড়েছিল দেশের উদীয়মান শিল্প খাত ও সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর। বিশ্ববাজারে রপ্তানির অন্যতম হাতিয়ার তৈরি পোশাক শিল্প কারখানাসমূহকে বিদ্যুৎ না থাকায় সার্বক্ষণিক ক্যাপটিভ জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হতো। ফলে ডিজেল খরচ বেড়ে গিয়ে উৎপাদন খরচ ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে থাকে।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ওয়েল্ডিং শপ, রাইস মিল ও অটো-মোবাইল ওয়ার্কশপের মতো ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলো দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। মৌলিক সেবার অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনে চরম অনাগ্রহ প্রকাশ করেন, যার ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে যায়।

কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার সংকট: কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের প্রধান সেচ মৌসুমগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট এক জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিত। বোরো ধান চাষের মূল সময়ে গভীর ও অগভীর নলকূপগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় হাজার হাজার একর ফসলি জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যেত।

সেচ পাম্প চালাতে কৃষকদের বাধ্য হয়ে উচ্চ মূল্যের ডিজেল কিনতে হতো, যার ফলে ফসল উৎপাদনের ব্যয় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায় এবং কৃষক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ে। বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে অনেক সময় সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হতো, যা দেশে রাসায়নিক সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করত।

সামাজিক জীবনযাত্রা ও জনস্বাস্থ্যের করুণ অবস্থা: দৈনন্দিন সাধারণ জীবনযাপন থেকে শুরু করে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত বিদ্যুতের চরম ঘাটতিতে স্থবির হয়ে পড়েছিল।রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে দিনে ৬-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও গ্রাম বাংলায় একটানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। সন্ধ্যা নামলেই দেশের অধিকাংশ অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যেত।

শিক্ষার্থীদের কেরোসিনের বাতি, কুপি বা হারিকেনের আলোতে পড়াশোনা করতে হতো। গরমে ও অপর্যাপ্ত আলোয় শিশুদের পড়ালেখার পরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং গ্রামীণ ক্লিনিকে জরুরি অস্ত্রোপচার, লাইফ সাপোর্ট এবং কোল্ড চেইন বজায় রেখে ভ্যাকসিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা বিদ্যুৎহীনতায় ভেস্তে যেত।

রাতে পর্যাপ্ত আলোর অভাবে সড়কগুলোতে ছিনতাই, চুরি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায় এবং রাতে শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গুটিয়ে ফেলতে হতো।

বিদ্যুৎ তখন কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল গুটিকয়েক উচ্চবিত্ত মানুষের বিলাসিতা। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ মেগাওয়াটের মহাকাব্য: ১৫ বছরের ঐতিহাসিক রূপান্তর

এই ভঙ্গুর ও অবক্ষয়গ্রস্ত বিদ্যুৎ খাতকে টেনে তোলার জন্য শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ খাতকে ‘জরুরি সেবা’ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান (Power System Master Plan - PSMP) প্রণয়ন করেন। জরাজীর্ণ সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে তৎকালীন সময়ে প্রতিদিন ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং সহ্য করতে হতো।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল নীতি

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকার বুঝতে পেরেছিল, বড় বড় বেজলোড পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করতে অন্তত ৫ থেকে ৭ বছর সময়ের প্রয়োজন। তবে দেশের অর্থনীতি এবং তৈরি পোশাক খাতকে অচল অবস্থা থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে বিদ্যুতের বিকল্প ছিল না। সেই তাগিদ থেকে গ্রহণ করা হয় ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ এবং চালু করা হয় কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট (QRPP) নীতি।

ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক এসব ছোট ছোট কেন্দ্র দ্রুত জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে। যদিও উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে এই নীতিটি পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিল, তবে তৎকালীন পরিস্থিতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

কুইক রেন্টালের দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) সহ দেশের শিল্প খাতকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখে। শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের নিশ্চয়তা দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করে।

এটি স্বল্পসময়ে বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করে সরকারকে মেগা ও টেকসই বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরির সুযোগ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে বৃহৎ প্রকল্পগুলো সচল হওয়ার সাথে সাথে অনেকগুলো রেন্টাল প্ল্যান্টের চুক্তি নবায়ন না করে ধাপে ধাপে সেগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে আনা হয়।

মেগা প্রকল্প ও জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ

কুইক রেন্টালের মধ্যবর্তী পর্যায় পার করার পর সরকার দীর্ঘমেয়াদী বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দেয়। শুধু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানির মিশ্রণ (Fuel Mix) তৈরি করতে কয়লা, পারমাণবিক শক্তি এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়:

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব পারমাণবিক শক্তির অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করে।

পায়রা ও মাতাবাড়ী আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রকল্প: পরিবেশগত ক্ষতি সর্বনিম্ন রাখতে সর্বাধুনিক ‘আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পটুয়াখালীর পায়রা এবং কক্সবাজারের মাতাবাড়ীতে বৃহৎ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।

আঞ্চলিক শক্তি সহযোগিতা: ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পাশাপাশি নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির আঞ্চলিক গ্রিড নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ জোরদার করা হয়।

এর ফলে ১৫ বছরের ব্যবধানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫,০০০ মেগাওয়াট থেকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ ৩০,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়

শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও ‘বিদ্যুৎহীন খাম্বা’ থেকে ঘরে ঘরে আলোর বন্যা

২০০৯ সালে দেশের মাত্র ৪৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী ছিল সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন। শেখ হাসিনা কেবল মেগাওয়াট বাড়ানোকে লক্ষ্য বানাননি, বরং উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

অফ-গ্রিড, দুর্গম এলাকা ও সোলার হোম সিস্টেম: ভৌগোলিক জটিলতার কারণে যেসব পাহাড়ি অঞ্চল, হাওর এবং বিচ্ছিন্ন নদীর চরাঞ্চলে মূল বিদ্যুৎ গ্রিড লাইন নেওয়া অসম্ভব ছিল, সেগুলোতে বিকল্প প্রযুক্তির সুষম ব্যবহার করা হয়।

ইডকল (IDCOL)-এর মাধ্যমে অফ-গ্রিড এলাকায় প্রায় ৬০ লাখের বেশি সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়। এটি বিশ্বের বৃহত্তম অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির অন্যতম হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল ও দ্বীপগুলোর বাজার ও ছোট ছোট ব্যবসার জন্য সোলার মিনি-গ্রিড স্থাপন করে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।

সন্দ্বীপের ঐতিহাসিক সাবমেরিন ক্যাবল: চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ উপজেলায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া ছিল এক অলৌকিক প্রকৌশলগত সাফল্য।

বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করে ২০১৮-১৯ সালে সন্দ্বীপকে সরাসরি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সাথে যুক্ত করা হয়। একই প্রযুক্তিতে যমুনা, মেঘনা ও পদ্মার তলদেশ দিয়ে ক্যাবল টেনে হাতিয়া, মনপুরাসহ অসংখ্য চরাঞ্চলকে গ্রিড বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়।

২০২২ সালের ঐতিহাসিক ঘোষণা: ২০২২ সালের ২১ মার্চ পটুয়াখালীর পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনের সময় শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন:

"বাংলাদেশের ১০০% মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।"

এই অর্জন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মতো বড় দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের এক অনন্য ও দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।

আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ও রূপকল্প ২০৪১: বিদ্যুতের এই সার্বজনীন বিস্তারের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের জায়গায় সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক সেচ পাম্প চালুর ফলে কৃষি উৎপাদন খরচ হ্রাস পায়।

গ্রামে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর ফলে দূরবর্তী চরাঞ্চলেও ল্যাপটপ, ইন্টারনেট ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ড্যাশবোর্ড ব্যবহারের সুবিধা চালু হয়, যা নতুন প্রজন্মের ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্সের দুয়ার খুলে দেয়। কেরোসিনের বাতির ধোঁয়া থেকে মুক্তি পেয়ে আলোয় আলোকিত হয়েছে পল্লী অঞ্চলের প্রতিটা বাড়ি। রাত পর্যন্ত গ্রামীণ বাজার সচল থাকা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে কোল্ড-চেইনে প্রতিষেধক ও ওষুধ সংরক্ষণ এবং শিক্ষার পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটে।

গ্রামের যে ঘরে একসময় সন্ধ্যার পর কেরোসিনের ধোঁয়াটে বাতি জ্বলত সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল উজ্জ্বল বিদ্যুৎ। কৃষকের সেচ পাম্পে, গ্রামীণ বাজারের দোকানে, স্কুলে, হাসপাতালে, ফ্রিল্যান্সারের কম্পিউটারে সর্বত্র বিদ্যুতের স্পর্শ বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিল। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬০,০০০ মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছিলেন তিনি।

রূপপুর ও জ্বালানি বৈচিত্র্যায়ন: কৌশলগত মাস্টারপিস

শেখ হাসিনার বিদ্যুৎনীতির অন্যতম প্রধান বৈপ্লবিক দিক ছিল এক একক জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ চাহিদাকে সামনে রেখে এনার্জি মিক্স (Energy Mix) তৈরি করা।

২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ছিল প্রায় পুরোপুরি দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গ্যাসের মজুদ সীমিত হয়ে আসার বিষয়টি টের পেয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: দেশবাসীর প্রতি শেখ হাসিনার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল, সর্বাধুনিক এবং জটিল অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্প হলো পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (2,400 MW Rooppur Nuclear Power Plant)।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে এই প্রকল্পের প্রথম স্থান নির্বাচন ও প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তী প্রায় ৫০ বছর অর্থায়ন, ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা এবং প্রযুক্তির অভাবে প্রকল্পটি কেবল ফাইলেই আটকা পড়ে ছিল।

প্রধানমন্ত্রী ও বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়ার সহায়তায় এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলেন। তাঁর কূটনৈতিক দূরদর্শিতায় ২০১১ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন (Rosatom)-এর সাথে আন্তঃসরকার চুক্তি (IGA) স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পটির বাস্তবিক রূপায়ণ শুরু হয়।

উৎপাদন সক্ষমতা ও জাতীয় গ্রিডে প্রভাব: বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ১২০০ মেগাওয়াটের ২টি ইউনিট মিলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। পূর্ণমাত্রায় চালু হলে এটি এককভাবে জাতীয় গ্রিডের মোট চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেস-লোড (Base-load) হিসেবে সরবরাহ করবে।

প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ‘ভিভিইআর-১২০০’ (VVER-1200) জেনারেশন ৩+ (Gen III+) পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর।

গ্রাহক সুবিধা ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ: রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ টানা ১৮ মাস কোনো বিরতি ছাড়া নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া সম্ভব। এখান থেকে দেশের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ পরিবার পরিবেশবান্ধব, শূন্য-কার্বন নির্গমনের সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে।

মর্যাদা: বাংলাদেশকে বিশ্বের ৩৩তম পরমাণু শক্তি ব্যবহারকারী অভিজাত ক্লাবে (Nuclear Club) অন্তর্ভুক্ত করেছেন শেখ হাসিনা।

প্রকল্প ব্যয় ও পরিচালনা: প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই মেগা প্রকল্পের প্রায় ৯০% অর্থায়ন করেছে রাশিয়া সফট লোন বা ঋণ হিসেবে।

সঞ্চালন পরিকাঠামো: বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নিতে পদ্মা ও যমুনা নদী অতিক্রম করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও পাওয়ার ইভাকুয়েশন নেটওয়ার্ক নির্মাণ করা হয়েছে।

আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র

পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়ে সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল (USC) প্রযুক্তির কয়লাভিত্তিক মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহ গড়ে তোলা হয়।

১. পায়রা ১,৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র: ২০২২ সালে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উদ্বোধনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ সমগ্র দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়েছিল।
২. রামপাল ১,৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট: বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (BIFPCL)-এর অধীনে নির্মিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
৩. মাতারবাড়ী ১,২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্র: কক্সবাজারের মহেশখালীতে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA)-এর প্রায় ৫১,৮৫৪ কোটি টাকা অর্থায়নে নির্মিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি একটি বিশাল এনার্জি হাব। ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ১৪.৫ মিটার গভীরতার ১৪ কিলোমিটার সুদীর্ঘ নৌ-চ্যানেল খনন করা হয়েছে, যা দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিশাল কোল ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনালের ভিত্তি স্থাপন করেছে।

আঞ্চলিক পাওয়ার কো-অপারেশন (Regional Power Trade)

শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ নীতির আরেকটি দূরদর্শী দিক ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা বা 'রিজিওনাল পাওয়ার ট্রেড' শুরু করা। ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ক্রসবর্ডার বিদ্যুৎ আমদানির জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন HVDC সাবস্টেশন ও গ্রিড কানেক্টিভিটি তৈরি করা হয়।

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৫০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট সমন্বিত ১,০০০ মেগাওয়াটের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাক-টু-ব্যাক হাই ভোল্টেজ ডিরেক্ট কারেন্ট (HVDC) সাবস্টেশন নির্মাণ করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানির পাশাপাশি পরবর্তীতে ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় আদানি পাওয়ারের ডেডিকেটেড ১,৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে ভারতের সাথে প্রায় ২,৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিনিময়ের শক্তিশালী জাতীয় অবকাঠামো তৈরি করা হয়।

এটি কেবল বিদ্যুৎ কেনা ছিল না; বরং নেপাল ও ভূটানের জলবিদ্যুৎ শক্তিকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবহারের জন্য যে আঞ্চলিক করিডোর তৈরি হচ্ছিল শেখ হাসিনা ছিলেন তার মূল অগ্রদূত। অথচ এই প্রগতিশীল উদ্যোগকে জড়িয়েই দেশবিরোধী জামায়াত শিবির ও পাকিস্তানি পেইড এজেন্টগুলো দিনের পর দিন অপপ্রচার চালিয়েছিল!

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (REB) ৫ মাসের বাস্তব অভিজ্ঞতা

শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের বিশালতা আমি কেবল খবরের কাগজের পাতায় বা সরকারি পরিসংখ্যানে দেখিনি; এটি আমি নিজের চোখে দেখেছি, নিজের কানে গ্রাহকদের কথা শুনে অনুভব করেছি।

দেশের ৬১টি জেলায় বিদ্যুৎ সেবা প্রদানকারী বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB)-এর হেড অফিসের কল সেন্টারে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ৫ মাস আমি সরাসরি সেখানে কর্মরত ছিলাম।

কল সেন্টারের দিনগুলো এবং সেবার সার্বিক মান

REB হলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সর্ববৃহৎ বিতরণ সংস্থা, যা দেশের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশি গ্রাহককে সংযোগ দিয়ে থাকে। কল সেন্টারে বসে প্রতিদিন দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ৬১টি জেলার সাধারণ মানুষের শত শত ফোনকল রিসিভ করতে হতো আমাকে।

ঝড়-বৃষ্টিতে কোথাও পোল ভেঙে গেলে বা ট্রান্সফরমার ট্রিপ করলে মানুষের যে আকুতি থাকত, সেগুলোকে আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ের অভিযোগ কেন্দ্রে রিলে করতাম। বিদ্যুৎ বিভাগ কতটা তৎপর থাকলে ৬১টি জেলার প্রতিটি টেকনিক্যাল ত্রুটি দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হতো, তা আমি ভেতর থেকে দেখেছি।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের মধ্যেও গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার জন্য সরকারের যে নিরলস ট্র্যাকিং এবং মনিটরিং ছিল, তা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশনার কারণেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকতেন।

আজকের বিপর্যয় ও পুলিশের কাছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীদের আকুতি!

কিন্তু আজ পরিস্থিতি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ছিল সাড়ে তিন কোটি পরিবারের নির্ভরযোগ্য স্থান, সেখানে আজ তীব্র ক্ষোভ, বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক হয়রানি।

সম্প্রতি পত্রিকার পাতায় ও খবরে চোখ রেখে শিউরে উঠতে হয় যেখানে পুলিশ নিজেই দেশের আইনশৃঙ্খলা সামলাতে ব্যর্থ হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, সেখানে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের জীবন ও অফিসের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের দরজায় ধরণা দিচ্ছে! সামান্য একটু বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেই ক্ষুব্ধ জনতা জোনাল অফিসে হামলা চালাচ্ছে, কর্মীদের মারধর করছে। যে প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রতিটি গ্রামে আলো জ্বালিয়েছিল, পরিচালনাগত অদক্ষতার কারণে আজ সেই প্রতিষ্ঠানটিই পক্ষাঘাতগ্রস্ত।

আমার ৫ মাসের কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে বিদ্যুৎ কেবল তার আর পোল ঝুলিয়ে রাখার বিষয় নয়; এর পেছনে লাগে সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক মনিটরিং, ফুয়েল সাপ্লাই চেইন বজায় রাখা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার দৃঢ়তা, যা শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে নিশ্চিত করা হতো।

'প্রতারণার জুলাই' এবং বর্তমান সংকট: খাম্বা যুগে প্রত্যাবর্তন

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের তথাকথিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন অস্থিরতা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে এক ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতারণার জুলাই আন্দোলন ভূ-রাজনৈতিক ছক কিংবা পাকিস্তান আইএসআই ও মার্কিন সিআইএ-র দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হলেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি অন্ধকার ও চরম অনিশ্চয়তার রূপ নিয়ে।

গত দেড় দশকে যেখানে শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে দেশব্যাপী জ্বালানি নিরবচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল, সেখানে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর সেই ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে।

আজকের ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় আসার আগে সুশীল সমাজ ও টিভির পর্দায় বসে বড় বড় কথা বলতেন। তারা বলতেন দেশ নাকি ইউরোপ-আমেরিকা হয়ে যাবে! তথাকথিত ‘টেইক ব্যাক বাংলাদেশ’ স্লোগানের মাধ্যমে দেশকে বাস্তবিক অর্থেই ২০০১-২০০৬ সালের অন্ধকার, দুর্নীতিগ্রস্ত ও মোমবাতি-খাম্বা যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ঢাকার বুকে লোডশেডিংয়ের প্রত্যাবর্তন

বিগত এক দশকে দেশের রাজধানী ঢাকা শহরের বাসিন্দারা ‘লোডশেডিং’ শব্দটির সঙ্গেই কার্যত অপরিচিত হয়ে পড়েছিলেন। অভিজাত অঞ্চল থেকে শুরু করে ঘিঞ্জি এলাকা সবত্রই বিদ্যুতের প্রবাহ ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল। কিন্তু বিগত কিছুদিন ধরে সেই ঢাকা শহরের নাগরিক জীবন লোডশেডিংয়ের তীব্র কষাঘাতে বিপর্যস্ত।

উত্তরা, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে কূটনৈতিক পাড়া গুলশান, বনানী এবং পুরান ঢাকার অলিগলিতে প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েক দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। তীব্র তাপদাহের মধ্যে মাঝরাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসি ও ফ্যান বন্ধ থাকা, সুপেয় পানির সংকট এবং বহুতল ভবনে লিফটে আটকে পড়ার আতঙ্ক নাগরিকদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড ডেভলপমেন্ট বা উৎপাদন ব্যবস্থার সঠিক তদারকি না থাকায় বর্তমানে পিক আওয়ারে দৈনিক কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে কোটি নগরবাসীকে।

শিল্পাঞ্চলের স্থবিরতা ও ধসে পড়া জাতীয় অর্থনীতি

বিগত সরকারগুলোর আমলে পোশাক শিল্প (RMG) সহ দেশের প্রধান অর্থনৈতিক হাবগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই অবকাঠামো পুরোপুরি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

গ্যাসের চাপ (PSI) অস্বাভাবিক কমে যাওয়া এবং ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া এবং চট্টগ্রামের টেক্সটাইল, স্পিনিং ও স্টিল রি-রোলিং মিলগুলোর চাকা থমকে গেছে। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনে ব্যর্থ হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট পাঠাতে পারছেন না মালিকরা। ফলে বিশ্বখ্যাত বায়াররা (Buyers) বাংলাদেশ থেকে বিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ (Export Orders) বাতিল করে ভারত, ভিয়েতনাম ও ক্যাম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে স্থানান্তর করছে।

কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে না পেরে এবং অতিরিক্ত ডিজেল জেনারেটর ব্যবহারের খরচ চালাতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

পল্লী বিদ্যুতের গ্রামের সেই করুণ চিত্র

শহরাঞ্চলের পরিস্থিতি যতটা আশঙ্কাজনক, গ্রামগঞ্জের চিত্র তার চেয়ে শতগুণ বেশি ভয়াবহ। বাংলাদেশের পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সংযোগে থাকা অধিকাংশ গ্রামে দিনে দৈনিক ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। রাত নামলেই পুরো গ্রাম অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।

কৃষি প্রধান এই দেশে সেচ পাম্পগুলো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সময়মতো জমিতে পানি সেচ দেয়া যাচ্ছে না। এর সরাসরি ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বিশেষ করে বোরো ধান ও শীতকালীন ফসল উৎপাদনের ওপর।

গ্রামের আইটি সেন্টার, ডিজিটাল সার্ভিস পয়েন্ট, পোল্ট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম এবং স্থানীয় মেকানিকাল ওয়ার্কশপগুলো বিদ্যুৎহীনতায় প্রতিদিন বিপুল লোকসানের মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পোল্ট্রি ফার্মগুলোতে চরম তাপে হাজার হাজার মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

অসহায় মানুষ যখন প্রশ্ন করে, তখন বর্তমানের এই শাসকগোষ্ঠী অজুহাত দেখায়। তর্কের খাতিরে কেউ কেউ বলেন:

"কেন? লোডশেডিং তো শেখ হাসিনার আমলেও দু-একদিন হতো!"

তাদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সরাসরি উত্তর: আগে হয়ে থাকলে এখনো হবে কেন?

আপনারা তথাকথিত আন্দোলন করে, রক্ত ঝরিয়ে, নির্বাচিত সরকার ফেলে দিয়ে ক্ষমতায় এলেন। বললেন দেশকে ইউরোপ-আমেরিকা বানিয়ে দেবেন, বাক স্বাধীনতা আর স্বস্তি দেবেন! তবে আমরা আজ আগের চেয়ে দশগুণ বেশি ভোগান্তি সহ্য করব কোন যুক্তিতে?

সত্য কথা হলো শেখ হাসিনার শাসনামলে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে নজিরবিহীন বৈশ্বিক করোনা মহামারী কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও এলএনজি (LNG) সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তখনও দেশে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে সচল রাখা হয়েছিল। বর্তমান বিপর্যয় কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বা বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে ঘটেনি; বরং এটি সম্পূর্ণভাবে বর্তমান কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির আগাম পরিকল্পনা না থাকা, পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা এবং অদক্ষ নীতি কাঠামোর ফল।

বিদ্যুৎ খাতের ১৫ বছরের রূপান্তর ও বর্তমানের তুলনা

বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের সাফল্য এবং বর্তমানের ব্যাকস্লাইডিংকে স্পষ্ট ও সংক্ষেপে তুলে ধরার জন্য নিচে একটি মাত্র সারসংক্ষেপ সারণী প্রদান করা হলো:

সূচক / মানদণ্ড

২০০৯ সাল (শেখ হাসিনার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে)

২০২৪ সাল (শেখ হাসিনার দায়িত্ব পালনের শেষে)

২০২৪-উত্তর বর্তমান পরিস্থিতি (বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা)

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা

৫,০০০ মেগাওয়াট (প্রকৃত উৎপাদন: ৩,২০০ MW)

৩০,০০০+ মেগাওয়াট

বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকলেও জ্বালানি সংকটে অনেক ইউনিট বন্ধ

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতায়নের হার

৪৭% শতাংশ মানুষ

১০০% (সর্বজনীন বিদ্যুতায়ন ঘোষণা)

নামকাওয়াস্তে সংযোগ আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই

সুবিধাভোগী মোট জনসংখ্যা

মাত্র ৪.৫ কোটি মানুষ

১৭ কোটি মানুষ (সমগ্র বাংলাদেশ)

চরম লোডশেডিংয়ে অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারচ্ছন্ন

মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পসমূহ

একটিও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত ছিল না

রূপপুর পরমাণু, পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী, আশুগঞ্জ

নতুন গ্রিড সম্প্রসারণ স্থবির, প্রকল্প গতি হারিয়েছে

জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য (Mix)

শতভাগ দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা

গ্যাস, কয়লা, পরমাণু, এলএনজি, সৌর ও আমদানি

জ্বালানি আমদানির বকেয়া বিল ও এলএনজি সরবরাহ সংকট

আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য (Cross Border)

০ মেগাওয়াট (কোনো আঞ্চলিক সংযোগ ছিল না)

২,৬০০ মেগাওয়াট (ভারত থেকে সফল আমদানি)

ভূ-রাজনৈতিক অদূরদর্শিতায় চুক্তি ও সরবরাহ ঝুঁকিতে

দৈনিক লোডশেডিংয়ের মাত্রা

সারা দেশে দৈনিক ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা

শূন্যের কাছাকাছি (বিশেষ জ্বালানি সংকট ব্যতীত)

রাজধানীসহ গ্রামবাংলায় দৈনিক ৪ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং

আইনি ও নীতিগত ভিত্তি: জরুরি আইন ও কৌশলগত মাস্টারপ্ল্যান

২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামোগত অবস্থা ছিল চরমভাবে বিপন্ন। তৎকালীন সময়ে দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪,৯৪২ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে প্রাপ্তি ছিল মাত্র ৩,২০০ থেকে ৩,৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি, যেখানে দৈনিক ঘাটতি ছিল ২,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি। এই তীব্র সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় কেবল স্বল্পমেয়াদী অস্থায়ী পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করেনি; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী, কাঠামোবদ্ধ ও কৌশলগত আইনি ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০

২০০৯ সালের চরম বিদ্যুৎ সংকট দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্থবির করে দিয়েছিল। সাধারণ প্রক্রিয়ায় ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস’ (PPR-2008) বা প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক উন্মুক্ত দরপত্র (Tender) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন ভারী পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করতে গেলে জমি অধিগ্রহণ, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান ও আর্থিক সংস্থানসহ সব মিলিয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর সময় লেগে যেত। বিদ্যুৎ ঘাটতিকে "জাতীয় জরুরি সংকট" ঘোষণা করে জাতীয় সংসদে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ পাস করা হয়।

মূল উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি: এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি আলোচনার (Direct Negotiation) মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে দেশি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা। এর আওতায় রেন্টাল (Rental), কুইক রেন্টাল (Quick Rental) এবং স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (IPP - Independent Power Producer) ব্যবস্থার অধীনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা হয়।

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক: আইনি সুরক্ষা দিতে এই আইনে ৯ নম্বর ধারা (দায়মুক্তি অনুচ্ছেদ) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের আইনি জটিলতা থেকে সুরক্ষা দেয়। এছাড়া, বিদেশি বিনিয়োগ টানতে 'ক্যাপাসিটি চার্জ' (Capacity Charge) বা কেন্দ্র ভাড়া প্রদান এবং মূলধন ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা সম্বলিত পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (PPA) স্বাক্ষর করা হয়।

ফলাফল ও তাৎক্ষণিক প্রভাব: এই আইনের বদৌলতে মাত্র ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হয়। এটি তৎকালীন পক্ষাঘাতগ্রস্ত শিল্পখাত, তৈরি পোশাক কারখানা ও কৃষি সেচ ব্যবস্থাকে তাৎক্ষণিক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটাতে সহায়তা করে। পরবর্তী সময়ে এর সফলতার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আগ পর্যন্ত এই আইনের মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছিল।

পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (PSMP) ও সমন্বিত রূপকল্প

জরুরি আইনি কাঠামোর পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সরকার জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা (JICA)-এর সহযোগিতায় তিনটি প্রধান ধাপে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করে:

PSMP 2010 (Power System Master Plan 2010): এটি ছিল দেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদী ও সুসংহত বিদ্যুৎ অবকাঠামো মাস্টারপ্ল্যান। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি মিশ্রণে (Fuel Mix) বৈচিত্র্য আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১০,০০০ মেগাওয়াটে এবং ২০২১ সালের মধ্যে ২৪,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা। এই প্ল্যানের মাধ্যমেই কয়লা ও আমদানিকৃত প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের দিকে নীতিগত পরিবর্তন শুরু হয়।

PSMP 2016: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ও শিল্পের প্রসারের সাথে সঙ্গতি রেখে তৈরি এই দ্বিতীয় পরিকল্পনায় প্রাথমিক জ্বালানির নিশ্চিত সরবরাহের ওপর জোর দেওয়া হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয় যে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশে প্রস্তাবিত ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ৩৫% আসবে স্থানীয় ও আমদানিকৃত কয়লা থেকে, ৩৫% আসবে আমদানিকৃত এলএনজি (LNG) ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে এবং অবশিষ্টাংশ ৩০% আসবে পারমাণবিক শক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য (ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে আমদানি) থেকে। এর ভিত্তিতেই পায়রা, মাতারবাড়ী ও রূপপুরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নকশা চূড়ান্ত করা হয়।

IEPMP 2023 (Integrated Energy and Power Master Plan): আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি ও ডিকার্বোনাইজেশন (Decarbonization) নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৩ সালে তৈরি করা হয় একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। এতে ঐতিহ্যবাহী জ্বালানির পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন শক্তি (Clean Energy) ব্যবহারের রূপরেখা দেওয়া হয়। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট শক্তি ব্যবহারের ৪০% পরিচ্ছন্ন ও টেকসই উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই পরিকল্পনায় অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং (Ammonia Co-firing), হাইড্রোজেন শক্তি, কার্বন ক্যাপচার ইউটিলাইজেশন অ্যান্ড স্টোরেজ (CCUS) প্রযুক্তি এবং উচ্চক্ষমতার স্মার্ট গ্রিড ও ব্যাটারি শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা (BESS) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মেগা প্রকল্পসমূহের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত গভীরে বিশ্লেষণ

বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে অবকাঠামোগতভাবে মর্যাদাপূর্ণ স্থানে উন্নীত করতে এবং বেস-লোড (Base-load) বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি সুউচ্চ প্রযুক্তির মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও কারিগরিভাবে জটিল অবকাঠামো প্রকল্প।

প্রযুক্তিগত অবকাঠামো: কেন্দ্রটিতে রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা 'রোসাটম' (Rosatom) কর্তৃক সরবরাহকৃত দুটি VVER-1200 (Generation III+) রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে, যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট (প্রতিটি ১,২০০ মেগাওয়াট)। এর আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ বছর, যা উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ৮০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।

নিরাপত্তা বেষ্টনী (Active & Passive Safety Systems): VVER-1200 রিয়্যাক্টরটি ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সর্বশেষ নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী ডিজাইন করা হয়েছে। এতে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী রয়েছে।

ডাবল কন্টেইনমেন্ট: বাইরের ও ভেতরের সুরক্ষার জন্য দ্বি-স্তরবিশিষ্ট শক্তিশালী কন্টেইনমেন্ট ওয়াল রয়েছে। বাইরের কন্টেইনমেন্ট দেয়ালটি ভারী উড়োজাহাজ আছড়ে পড়া (Aircraft Crash), শক্তিশালী ভূকিম্পন বা বাহ্যিক বিস্ফোরণ সহ্য করতে সক্ষম।

কোর ক্যাচার (Core Catcher): কোনো কারণে যদি রিয়্যাক্টরের ভেতরে মারাত্মক দুর্ঘটনাবশত পারমাণবিক জ্বালানি গলে যায় (Core Melt), তবে গলে যাওয়া তেজস্ক্রিয় তরল যেন কোনোভাবেই পরিবেশ বা ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশতে না পারে, সেজন্য রিয়্যাক্টর ভেসেলের ঠিক নিচে একটি বিশেষ 'কোর ক্যাচার' বা মেল্ট ট্র্যাপ স্থাপন করা হয়েছে।

প্যাসিভ হিট রিমুভাল সিস্টেম (PHRS): বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমস্ত বাহ্যিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও এই সিস্টেমটি কোনো প্রকার মানবীয় হস্তক্ষেপ বা বিদ্যুৎ ছাড়াই টানা ৭২ ঘণ্টা রিয়্যাক্টরের অতিরিক্ত তাপ সরিয়ে স্বাভাবিক ঠাণ্ডা বজায় রাখতে পারে।

ঐতিহাসিক মাইলফলক: ২০২৩ সালের অক্টোবরে রূপপুরে পারমাণবিক জ্বালানির (ইউরেনিয়াম-২৩৫) প্রথম চালানের প্রাতিষ্ঠানিক হস্তান্তর ঘটে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ৩৩তম 'নিউক্লিয়ার নেশন' বা পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে পাঠাতে পদ্মা নদী পার হয়ে ৪০০ কেভি উচ্চক্ষমতার স্পেশাল ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে।

পায়রা ১,৩২০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় অবস্থিত পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রযুক্তির আধুনিকীকরণে একটি যুগান্তকারী সংযোজন।

মালিকানা ও অর্থায়ন: এটি বাংলাদেশের নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (NWPGCL) এবং চীনের চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (CMC) ৫০:৫০ যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান 'বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড' (BCPCL) দ্বারা বাস্তবায়িত প্রকল্প।

প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য (Ultra-Supercritical Technology): এটি বাংলাদেশের প্রথম বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেখানে সর্বাধুনিক 'আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল' প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

সাধারণ সাব-ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে এর থার্মাল কর্মদক্ষতা (Thermal Efficiency) অনেক বেশি (প্রায় ৪৩%)।

এখানে বয়লারের ভেতরের পানির চাপ ২৪.১ মেগাপ্যাসকেলের (MPa) ওপরে এবং বাষ্পের তাপমাত্রা ৫৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রাখা হয়। এই উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রার কারণে কম কয়লা পুড়িয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, ফলে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

পরিবেশগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা:

Flue Gas Desulfurization (FGD): বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড (SOx) নির্গমন প্রায় ৯৫% থেকে ৯৮% পর্যন্ত হ্রাস করতে 'ওয়েট এফজিডি' (Wet FGD) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

Low-NOx বার্নার: নাইট্রোজেন অক্সাইডের (NOx) সৃষ্টি রোধ করতে বিশেষভাবে ডিজাইন করা Low-NOx বার্নার ব্যবহার করা হয়েছে।

ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক প্রিসিপিরেটর (ESP): ফ্লাই অ্যাশ বা উড়ন্ত ছাই পরিবেশের সাথে মেশার আগেই ৯৯.৯% ছাই ধরে ফেলার মতো ইএসপি ইউনিট যুক্ত রয়েছে। এছাড়া ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তরে ছড়িয়ে দিতে ২২০ মিটার উঁচু চিমনী ব্যবহার করা হয়েছে।

রেকর্ড ও অবকাঠামো: নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এবং মূল অনুমোদিত বাজেটের চেয়ে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার কম খরচে বিশ্বমানের কাজ সম্পন্ন করে কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। প্রকল্পটির সাথে কয়লা খালাসের জন্য একটি নিজস্ব জেটি এবং সাব-সি ক্যাবলসহ ৪০০ কেভি পায়রা-গোপালগঞ্জ-আমিনবাজার পাওয়ার ট্রান্সমিশন লাইন সংযুক্ত রয়েছে।

মাতারবাড়ী ১,২০০ মেগাওয়াট কোল-টু-পাওয়ার ও ডিপ-সি পোর্ট

কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার নির্জন ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মাতারবাড়ীকে একটি অন্যতম প্রধান এনার্জি হাব ও শিল্প দ্বীপে রূপান্তর করেছে এই সমন্বিত প্রকল্প।

অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন: প্রকল্পটি জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা (JICA)-এর প্রায় ৮৫% নমনীয় ঋণ সহায়তায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান 'কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড' (CPGCBL) বাস্তবায়ন করে।

প্রযুক্তিগত রূপরেখা: প্রকল্পটিতে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বয়লার ও স্টিম টারবাইন রয়েছে, যা সরবরাহ করেছে জাপানের সুমিতোমো, তোশিবা ও আইএইচআই (IHI) কনসোর্টিয়াম। এর বয়লারের উচ্চ কার্যক্ষমতার কারণে কয়লা ব্যবহারের পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।

কৌশলগত গভীর সমুদ্রবন্দর (Deep-Sea Port Channel): মাতারবাড়ী প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত সাফল্য হলো বিদ্যুত কেন্দ্রের পাশাপাশি একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ।

এর জন্য সাগরে ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার চওড়া এবং ১৮.৫ মিটার গভীরতার একটি কৃত্রিম নেভিগেশন চ্যানেল খনন করা হয়েছে।

এই চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ১৪.৫ মিটার ড্রাফটের এবং ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল 'পানাম্যাক্স' ও 'ক্যাপসাইজ' কয়লাবাহী জাহাজ সরাসরি মেগা-জেটিতে ভিড়তে পারে। এই চ্যানেলটি পরবর্তীতে দেশের মূল মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর (Commercial Deep Sea Port) হিসেবে রূপ লাভ করছে, যা সামগ্রিক আঞ্চলিক বাণিজ্যের চিত্র বদলে দিচ্ছে।

পরিবেশগত ও ছাই ব্যবস্থাপনা: কয়লার গুঁড়ো যেন বাতাসে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য পুরোপুরি ঢাকা বা সিভিল-এনক্লোজড কন্টিনুয়াস কনভেয়ার বেল্ট এবং স্পেরিক্যাল কভার্ড কোল ইয়ার্ড ব্যবহার করা হয়েছে। উৎপন্ন ছাই নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প এলাকায় ২৭৫ হেক্টরের একটি সম্পূর্ণ ওয়াটার-প্রুফ অ্যাশ পন্ড (Ash Pond) তৈরি করা হয়েছে।

রামপাল ১,৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট

বাগেরহাট জেলার রামপালে পশুর নদীর তীরে নির্মিত ১,৩২০ মেগাওয়াট (২টি ৬৬০ মেগাওয়াটের ইউনিট) ধারণক্ষমতার এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেস-লোড চাহিদা মেটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

যৌথ উদ্যোগ: এটি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং ভারতের এনটিপিসি লিমিটেড (NTPC Limited)-এর ৫০:৫০ যৌথ অংশীদারিত্বে গঠিত 'বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড' (BIFPCL) দ্বারা বাস্তবায়িত প্রকল্প।

প্রযুক্তি ও দক্ষতা: এতে আধুনিক সুপার-ক্রিটিক্যাল (Supercritical) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সাব-ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির তুলনায় এটি অধিক মাত্রার চাপ ও তাপমাত্রায় চালিত হওয়ায় কম জ্বালানিতে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম, যা পরিবেশগত প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।

সুন্দরবন ও পরিবেশগত সুরক্ষা প্রযুক্তি: বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে প্রকল্পটিতে বেশ কিছু অত্যন্ত উচ্চমানের ও আধুনিক পরিবেশগত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে:

উচ্চক্ষমতার ইএসপি (ESP): চিমনি দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়া থেকে ৯৯.৯% ফ্লাই অ্যাশ বা ছাই আলাদা করার জন্য হাই-ইফিসিয়েন্সি ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রিসিপিরেটর ব্যবহার করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ চিমনীর উচ্চতা: নির্গত গ্যাস যেন নিচের বাতাসের সাথে না মিশে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে নিরাপদে ছড়াতে পারে, সেজন্য এতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ (২৭৫ মিটার) উচ্চতার চিমনী তৈরি করা হয়েছে।

ক্লোজড-লুপ কুলিং সিস্টেম: পশুর নদী থেকে পানি নিয়ে তা ঠাণ্ডা করার পর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পুনর্ব্যবহার করা হয়। ব্যবহৃত গরম পানি কোনো অবস্থাতেই সরাসরি পশুর নদীতে ফেলা হয় না, যার ফলে নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্রের তাপমাত্রায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।

কয়লা পরিবহন ও সংরক্ষণ: নদীপথে কয়লা পরিবহনের জন্য সাইড-কাভার্ড বা ঢাকনাযুক্ত বিশেষ বার্জ (Covered Barges) ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশবান্ধব এবং এতে কোল-ডাস্ট বা শব্দদূষণের সুযোগ নেই। এছাড়া প্ল্যান্টে সার্বক্ষণিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করতে রিয়েল-টাইম অনলাইন অটোমেটিক এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।

প্রাথমিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও এলএনজি অবকাঠামো

বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন দ্রুত শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের পর্যাপ্ত নতুন মজুদ আবিষ্কারের গতি চাহিদার তুলনায় ধীর হয়ে পড়ে। তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদের মতো পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর চাপ বা 'ওয়েলহেড প্রেসার' ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এফএসআরইউ (FSRU) ও এলএনজি আমদানির কৌশলগত অবকাঠামো

সমুদ্রের তলদেশ থেকে দীর্ঘ পাইপলাইন টেনে এনে গভীর সমুদ্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া।

ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন: কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রের তলদেশে গভীর নোঙর পয়েন্ট তৈরি করে দুটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (FSRU) স্থাপন করা হয়। এর একটি আমেরিকার এক্সিলারেট এনার্জি (Excelerate Energy) এবং অপরটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ (Summit LNG) দ্বারা পরিচালিত।

রিগ্যাসিফিকেশন ও সাপ্লাই ক্যাপাসিটি: মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় আনা এলএনজিকে সমুদ্রের স্বাভাবিক পানিতে উত্তপ্ত করে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। এই দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত ক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট (MMCFD)।

জাতীয় গ্রিডে সংযোজন: মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম হয়ে জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে এই উচ্চচাপের রিগ্যাসিফাইড গ্যাস যুক্ত করতে নির্মাণ করা হয় ৩০ ও ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের দীর্ঘ উচ্চচাপের সঞ্চালন পাইপলাইন। এর ফলে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (CUFL), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (KAFCO) সহ পূর্বাঞ্চলের প্রধান বিদ্যুতকেন্দ্র ও পোশাক কারখানাসমূহে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হয়।

নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও বাপেক্স (BAPEX)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি

শুধুমাত্র আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড’ (বাপেক্স)-কে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হয়।

প্রযুক্তি ও রিগ আধুনিকায়ন: বাপেক্সকে আধুনিক ত্রিমাত্রিক (3D) সাইসমিক জরিপ ট্রেইলার, অত্যাধুনিক প্রসেসিং সফটওয়্যার এবং নতুন চার হাজার মিটার গভীর ড্রিলিং ক্ষমতাসম্পন্ন রিগ প্রদান করা হয়।

নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র: ২০০৯ থেকে ২০২৪ মেয়াদে বাপেক্সের ব্যাপক অনুসন্ধান অভিযানে ভোলা উত্তর, জকিগঞ্জ, এবং শাহবাজপুরের মতো স্থানে নতুন উচ্চচাপযুক্ত গ্যাসস্তরের সন্ধান মেলে। পাশাপাশি তিতাস, কৈলাশটিলা ও রশীদপুর গ্যাসক্ষেত্রের গভীরতর স্তরে বাইপাস ওয়েল ড্রিলিং করে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত গ্যাসের মজুদ নিশ্চিত করা হয়।

আধুনিক সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা

বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়েও কঠিন কাজ হলো উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরাপদে হাজার কিলোমিটার দূরে পৌঁছে দেওয়া এবং সিস্টেম লস কমানো।

উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ৪০০ কেভি 'সুপার গ্রিড' নির্মাণ

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার চেয়েও জটিল কাজ হলো উৎপাদিত হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দূরবর্তী শিল্পাঞ্চল ও গ্রাহক পর্যায়ে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ীর মতো উপকূলীয় মেগা পাওয়ার হাবগুলো থেকে কেন্দ্রস্থল ঢাকায় বিদ্যুৎ আনার জন্য বাংলাদেশের সঞ্চালন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো ৪০০ কেভি (400 kV) অতি-উচ্চ ভোল্টেজের 'সুপার গ্রিড' প্রযুক্তির প্রচলন করা হয়।

মেগা সঞ্চালন লাইন: ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনে ব্যবহৃত হয়েছে অ্যালুমিনিয়াম পরিবাহী কনডাক্টরের বিশেষ চার-বান্ডেল ব্যবস্থা, যা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহেও কোনো ধরনের লস বা সিস্টেম ফেইলিয়ার হতে দেয় না।

এশিয়ার অন্যতম উঁচু গ্রিড টাওয়ার: পদ্মা ও ভয়াল মেঘনা নদীর ওপর দিয়ে অতি-উচ্চ ভোল্টেজের সংযোগ নিয়ে যাওয়া প্রকৌশলগতভাবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রাক-প্রকৌশল পর্যালোচনার মাধ্যমে মেঘনা নদী পারাপারের জন্য প্রায় ৩৩০ মিটার (১০৮০ ফুটের বেশি) উঁচু বিশেষ রিইনফোর্সড রিভার ক্রসিং গ্রিড টাওয়ার নির্মাণ করা হয়, যা এশিয়ার অন্যতম উঁচু সঞ্চালন টাওয়ার কাঠামো হিসেবে গণ্য হয়।

স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারিং ও সিস্টেম লস হ্রাস

ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যুৎ খাতে মূল অপচয় হতো বিতরণ ও সঞ্চালন ক্ষতি (Transmission & Distribution Loss) এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে।

অ্যাগ্রিগেট টেকনিক্যাল অ্যান্ড কমার্শিয়াল (ATC) লস নামিয়ে আনা: ২০০৯ সালে যেখানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সিস্টেমে লস ছিল প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ, আধুনিক গ্রিড সাবস্টেশন ও ডিজিটালাইজেশনের ফলে তা ৮.৫ থেকে ৯.৫ শতাংশের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নেমে আসে।

স্মার্ট মিটারের কার্যকারিতা: প্রথাগত ম্যানুয়াল বিলিং ব্যবস্থার পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় প্রি-পেইড এবং স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারিং চালু করা হয়। দেশজুড়ে প্রায় ৫০ লাখের বেশি গ্রাহককে এর আওতায় আনার ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ না করেই লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় ১০০% নিশ্চিত করা এবং ভুতুড়ে বিল সংক্রান্ত গ্রাহক ভোগান্তি দূর করা সম্ভব হয়।

ক্যাপাসিটি চার্জ, অর্থায়ন ও ভর্তুকি কাঠামোর গভীর অর্থনীতি

বিদ্যুৎ খাতের অর্থনীতি না বুঝে অনেকে রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নীতি অনুযায়ী এই খাতের আর্থিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল।

প্রজেক্ট ফাইন্যান্সিং ও 'টেক-অর-পে' (Take-or-Pay) চুক্তির বাস্তবতা

বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

ক্যাপাসিটি পেমেন্টের আন্তর্জাতিক নীতি: বহু কোটি ডলারের অর্থায়নে নির্মিত একটি পাওয়ার প্ল্যান্টের মূলধন খরচ (Capital Expenditure) এবং অপারেশনাল খরচ (Operational Expenditure) আলাদা থাকে। আন্তর্জাতিক ব্যাংক বা গ্লোবাল ফান্ডগুলো তখনই ঋণ প্রদান করে, যখন সরকার বা একক ক্রেতা (Off-taker) দীর্ঘমেয়াদী "টেক-অর-পে" (Take-or-Pay) চুক্তিতে সই করে।

স্থায়ী ব্যয় বনাম পরিবর্তনশীল ব্যয়: চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সচল ও বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রস্তুত (Available) থাকলে সরকার তাকে নির্দিষ্ট 'ফিক্সড ডেট ও ক্যাপিটাল ফি' মেটাতে বাধ্য থাকে যা ক্যাপাসিটি চার্জ নামে পরিচিত। সরকার যদি কোনো কারণে সেই বিদ্যুৎ না-ও গ্রহণ করে, তবুও বিনিয়োগকারীকে ডেবিট সার্ভিসিং (ব্যাংক ঋণের কিস্তি) এবং অবকাঠামোর অবচয় ফি পরিশোধ করতে হয়। তবে বিদ্যুৎ না নিলে সরকার পরিবর্তনশীল খরচ বা জ্বালানি খরচ (Variable Energy Charge) প্রদান করা থেকে বেঁচে যায়। এই গ্যারান্টি না থাকলে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অর্থায়ন করতো না।

সার্বিক ভর্তুকি ও সামাজিক কল্যাণমূলক বিদ্যুৎ নীতি

বিনিয়োগবান্ধব বিদ্যুৎ নীতির পাশাপাশি সাধারণ জনগণ ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে রাষ্ট্র ভর্তুকির ভারসাম্য নীতি গ্রহণ করেছিল।

কৃষি ও সেচ খাতে সহায়তা: বিদ্যুৎ যদি শতভাগ বাণিজ্যিক মূল্যে সাধারণ মানুষকে সরবরাহ করা হতো, তবে কৃষক পর্যায়ে ১ ইউনিট সেচ বিদ্যুতের দাম ৩ থেকে ৪ গুণ বৃদ্ধি পেত। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ত খাদ্যের উৎপাদন খরচ ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।

ক্রস-সাসিডি ও বিপিডিবি'র ভূমিকা: সরকার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (BPDB) রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে ভর্তুকি বা বাজেট সাপোর্ট প্রদান করে। এটি মূলতঃ এক ধরনের 'সামাজিক নিরাপত্তা নেট' হিসেবে কাজ করেছে যেখানে উচ্চ ভোল্টেজের শিল্প গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি ট্যারিফ আদায় করে তা দিয়ে গ্রামীণ ও লাইফলাইন (৫০ ইউনিটের নিচে ব্যবহারকারী) গ্রাহক এবং কৃষকদের সেচ পাম্পে বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় রাখা হয়।

নবায়নযোগ্য শক্তি ও টেকসই পরিবেশ নীতি (SREDA & Green Energy)

শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ নীতিতে কেবল জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লা নয়, পরিবেশবান্ধব সবুজ বিদ্যুতের ওপরও সমান জোর দেওয়া হয়েছিল।

স্রেডা (SREDA) গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো

পরিবেশবান্ধব কার্বন-হ্রাসকারী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে 'সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি' (SREDA) গঠন করা হয়। স্রেডার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল নবায়নযোগ্য শক্তির অবকাঠামো গড়ে তোলা, এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করা এবং সবুজ জ্বালানি ব্যবহারের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন।

সোলার হোম সিস্টেম (SHS)-এর বিশ্বজোড়া সাফল্য

জাতীয় গ্রিডের সংযোগ পৌঁছানো অসম্ভব এমন দ্বীপ, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি দুর্গম জনপদে সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।

ইডকোল (IDCOL)-এর মডেল: 'ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড' (IDCOL)-এর অর্থায়নে এবং স্থানীয় এনজিওগুলোর সহায়তায় প্রায় ৬০ লাখের বেশি সোলার হোম সিস্টেম (SHS) সফলভাবে স্থাপন করা হয়।

সামাজিক প্রভাব: অফ-গ্রিড এলাকার প্রায় ২ কোটি মানুষ কেরোসিনের বাতি মুক্ত হয়ে সৌরবিদ্যুতের আলো ও ডিজিটাল সংযোগের আওতায় আসে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটায়।

গ্রিড-টাইড সোলার পার্ক ও নেট-মিটারিং নীতি

নেট-মিটারিং সিস্টেম: বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানি বজায় রাখতে দেশীয় টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে 'নেট-মিটারিং গাইডলাইন' জারি করা হয়। এর ফলে কারখানার ছাদের নিজস্ব সোলার প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিনের বেলা কারখানায় ব্যবহৃত হয় এবং উদ্বৃত্ত অংশ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে চলে যায়। মাস শেষে গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুতের সাথে এটি সমন্বয় করা হয়।

বৃহৎ সোলার পার্ক: শুধু ছাদে সীমাবদ্ধ না থেকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ২০০ মেগাওয়াটের তিস্তা সোলার পার্ক এবং কক্সবাজারের টেকনাফে ২০ মেগাওয়াটের সোলার পার্কের মাধ্যমে শত শত মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

আঞ্চলিক বিদ্যুৎ কূটনীতি ও দক্ষিণ এশীয় পাওয়ার গ্রিড

শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক মেলবন্ধনের জন্য শক্তি খাতকে প্রধান মাধ্যম করেছিলেন।

উচ্চ ক্ষমতার ব্যাকবোন গ্রিড ও এইচভিডিসি (HVDC) প্রযুক্তি

দুই ভিন্ন দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও ভোল্টেজ প্রোফাইল কখনোই পুরোপুরি এক থাকে না। এই জটিল প্রযুক্তিগত বাধা কাটিয়ে ভারতের সাথে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য স্থাপন করা হয় বিশেষ ব্যাক-টু-ব্যাক এইচভিডিসি (High Voltage Direct Current) সাবস্টেশন।

ভেড়ামারা ও কুমিল্লা স্টেশন: কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এইচভিডিসি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হয়, যা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর থেকে আসা ৫০০ কেভি এসি বিদ্যুৎকে প্রথমে ডিসি (DC) এবং পুনরায় বাংলাদেশের ৪০০ কেভি এসি (AC) গ্রিডে রূপান্তরিত করে।

ত্রিপুরা-কুমিল্লা সংযোগ: ভারতের ত্রিপুরা (সূর্যমণিনগর) থেকে কুমিল্লার দক্ষিণ গ্রিড সাবস্টেশন পর্যন্ত ১৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আলাদা একটি উচ্চ ভোল্টেজের ক্রস-বর্ডার ট্রান্সমিশন লাইন চালু করা হয়। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক জ্বালানি সংযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

ত্রিদেশীয় জলবিদ্যুৎ ও সবুজ জ্বালানি গ্রিড

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক মেলবন্ধনের জন্য শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ত্রিপক্ষীয় গ্রিড কাঠামোর পরিকল্পনা করা হয়।

হিমালয় অঞ্চলের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা: নেপাল ও ভুটানে বর্ষাকালে নদীগুলোতে প্রচুর উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ (Hydropower) উৎপন্ন হয়, যা অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী।

ত্রিদেশীয় কাঠামোর রূপরেখা: নেপাল ও ভুটানে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ ভারতের গ্রিডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে সরাসরি বাংলাদেশে আনার জন্য তিন দেশের মধ্যে যৌথ সমঝোতা ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়। এর লক্ষ্য ছিল গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বাংলাদেশ কর্তৃক নেপালের জলবিদ্যুৎ আমদানি করা এবং শুষ্ক মৌসুমে নিজের উদ্বৃত্ত তাপবিদ্যুৎ রপ্তানি করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ "রিজিওনাল গ্রীন পাওয়ার গ্রিড" গড়ে তোলা।

বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক অর্জন

খাতের বিবরণ

২০০৯ সালের অবস্থা (শেখ হাসিনার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে)

২০২৪ সালের অর্জিত অবস্থা (শেখ হাসিনার দেড় দশক পর)

উৎপাদন সক্ষমতা

৩,২০০ - ৫,০০০ মেগাওয়াট

৩০,০০০+ মেগাওয়াট (ক্যাপাসিটি ও রিজার্ভসহ)

বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী

৪৭% শতাংশ মানুষ

১০০% শতাংশ (জাতীয় গ্রিড ও সোলার)

সঞ্চালন লাইন (PGCB Grid)

৮,০০০ সার্কিট কিলোমিটার

১৫,০০০+ সার্কিট কিলোমিটার

বিতরণ লাইন নেটওয়ার্ক

২,৬০,০০০ কিলোমিটার

৬,৪০০,০০০+ কিলোমিটার

মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার

মাত্র ২২০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh)

৬৮০+ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh)

পারমাণবিক শক্তি প্রযুক্তি

শূন্য (ফাইলে বন্দি ৫০ বছর)

রূপপুর ২,৪০০ MW ভিভিইআর-১২০০ নির্মাণ

সিস্টেম লস (Distribution Loss)

১৮.৫% এর বেশি

৮.৫% - ৯.০%

২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের যাত্রা কেবল সাধারণ সরকারি কর্মকাণ্ডের কোনো দীর্ঘ তালিকা নয়; এটি ছিল একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অর্থনীতিকে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের আসল ইঞ্জিনের গল্প।

নীতিগত পরিচালনা, বিতর্ক ও রাজনৈতিক মেধা: কেন নেতৃত্বের দক্ষতা অপরিহার্য?

দেশ চালানো কিংবা রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাত পরিচালনা করা কোনো আবেগ বা শখের বিষয় নয়। দেশ চালাতে দক্ষতা লাগে, মেধা লাগে, সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক জ্ঞান লাগে এবং একই সাথে কিছু বিশেষ প্রশাসনিক সক্ষমতা থাকা লাগে। কেননা, সঠিক ও কঠোর নেতৃত্ব সবার জন্য নয়।

আপনি যদি বিদ্যুৎমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করেন আপনার কি মনে হয় উনার নেতৃত্বের কোন জায়গায় ঘাটতি ছিল?

'ক্যাপাসিটি চার্জ' (Capacity Charge) বিতর্কের আসল সত্য

শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ নীতি নিয়ে বিরোধীরা সবচেয়ে বড় যে সমালোচনাটি তোলে, তা হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র বসিয়ে রেখে টাকা দেওয়ার বিষয়টি। কিন্তু অর্থনীতি ও পাওয়ার সেক্টরের আন্তর্জাতিক নীতি না বুঝে যারা এই প্রচার চালায়, তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: বিশ্বের যেকোনো দেশে দেশি-বিদেশি বড় বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে (IPP - Independent Power Producer) হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হলে PPA (Power Purchase Agreement) চুক্তি করতে হয়।

কেন প্রয়োজন ক্যাপাসিটি মেকানিজম?: একজন বিনিয়োগকারী যদি ২০ বছর মেয়াদে ৩,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানায়, তবে সরকার যদি তাঁর থেকে কোনো মাসে বিদ্যুৎ না-ও নেয়, তবুও কেন্দ্রের অবচয়, কর্মচারীদের বেতন ও ব্যাংক ঋণের কিস্তি মেটানোর জন্য ন্যূনতম নির্দিষ্ট ফি দিতেই হয়। এটিকে বলা হয় Capacity Payment

প্রবৃদ্ধির ভিত্তি: শেখ হাসিনা জানতেন, বাংলাদেশে যখন ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EZ) তৈরি হবে এবং শিল্পায়ন বাড়বে, তখন বিদ্যুতের চরম চাহিদা তৈরি হবে। সেই চাহিদাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (Reserve Capacity) তৈরি রাখা আবশ্যক ছিল। ক্যাপাসিটি চার্জ না দিলে কোনো দেশি বা বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশে ১ ডলারও বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করত না।

আন্তর্জাতিক সংকট ও শেখ হাসিনার সংকট ব্যবস্থাপনা

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে নেমে এসেছিল কভিড-১৯ এর করাল থাবা। পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর ঠিক পরপরই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি (LNG) এবং কয়লার দাম এক লাফে ৫ থেকে ১০ গুণ বেড়ে যায়!

একটি আমদানি নির্ভর জ্বালানি বাজারের দেশে এই পরিস্থিতি ছিল এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। ইউরোপের ধনী দেশগুলোতেও যেখানে বিদ্যুৎ রেশনিং ও ব্ল্যাকআউট করতে হয়েছিল, সেখানে বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত চতুরতার সাথে জ্বালানি ক্রয় নীতি, দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার করা এবং রেন্টাল প্ল্যান্টগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রেখেছিলেন। তিনি প্রতিটি ক্রাইসিস এলে যেভাবে হোক, যেকোনো উপায়ে ফুয়েল সামাল দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে নিতেন!

অথচ আজ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কেবল অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে গোটা দেশের বিদ্যুৎ খাত ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

ইতিহাস ও রূপান্তরের চিরস্থায়ী স্থপতি

ইতিহাস অত্যন্ত নিষ্ঠুর, কিন্তু ইতিহাস একই সাথে অত্যন্ত সত্যবাদী। কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রচারণায় বা সাময়িক ক্ষমতার রদবদলে ইতিহাসের আসল তথ্যকে মুছে ফেলা যায় না।

একটি সত্যকে কখনোই অস্বীকার করা সম্ভব নয় ২০০৯ সালের বিদ্যুৎ-সংকটে জর্জরিত, অন্ধকারে ডুবে থাকা বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালের প্রায় সর্বজনীন বিদ্যুতায়নের বাংলাদেশে যাত্রাটি কোনো ছোটখাটো পরিবর্তন নয়। এটি ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক রূপান্তর।

ভবিষ্যতে ইতিহাস শেখ হাসিনাকে কীভাবে বিচার করবে রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে কিংবা ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু যখনই কোনো নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনৈতিক রূপান্তর, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এবং ডিজিটালাইজেশনের ইতিহাস লিখতে বসবেন, তখন তাঁকে বিদ্যুৎ খাতের ২০০৯–২০২৪ অধ্যায়টিকে স্বর্ণাক্ষরে লিখতে হবে।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহু অর্জন রেখে গেছেন, কিন্তু ‘বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা’ হিসেবে তিনি বাংলাদেশকে যে আলো দিয়ে গেছেন, তা বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি কারখানা এবং প্রতিটি পরিবারের দেয়ালে দেয়ালে চিরকাল দৃশ্যমান থাকবে। প্রতারণার কালো মেঘ দিয়ে সাময়িকভাবে সূর্যকে ঢেকে রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু আলো দেওয়ার সেই ঐতিহাসিক সত্যকে কখনো মুছে ফেলা যায় না।

লেখক: শিশির ওয়াহিদ

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যাদের জীবন ও কীর্তিকে কেবল তাদের জীবদ্দশায় নয়, বরং মৃত্যুর পরও এক সুপরিকল্পিত ও হিংসাত্মক অপপ্রচারের কালো চাদরে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ও নির্মমভাবে অপপ্রচারের শিকার হওয়া এক অবিসংবাদিত যুবনেতার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.