>

>

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

TruthBangla

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বাভাবিক ব্যাকরণ অনুযায়ী প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্র করেই যাবতীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারা, আদর্শ ও শাসনব্যবস্থা আবর্তিত হয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জনমুখী প্রতিশ্রুতি থাকে, যাকে সংক্ষেপে দলের 'মূলনীতি' বা 'রাজনৈতিক আদর্শ' বলা চলে। গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা। জোট রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য মূলত দুটি:

নির্বাচনি ও প্রশাসনিক কৌশল: বিদ্যমান শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করা বা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনে প্রতিপক্ষের ভোট ব্যাংককে বিভক্ত হতে না দিয়ে নিজের অনুকূলে আনা।

আন্দোলনমুখী জাতীয় ঐক্য: শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে গণআন্দোলন গড়ে তোলা এবং একদফা বা ন্যূনতম সামাজিক-রাজনৈতিক দাবির ভিত্তিতে জাতীয় সমঝোতা তৈরি করা।

স্বাধীনতার পূর্ব থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীর রাজনীতিতে জোট রাজনীতির চর্চা কেবল ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করেনি; বরং তা দেশের ইতিহাস, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বারবার নতুন মোড় এনে দিয়েছে।

প্রাক-স্বাধীনতা যুগ: বাঙালির প্রথম রাজনৈতিক জোট 'যুক্তফ্রন্ট' (১৯৫৪)

বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা প্রথম যে রাজনৈতিক জোটের ব্যাপক প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছিল, সেটি ছিল ঐতিহাসিক ‘যুক্তফ্রন্ট’

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই কেন্দ্রভিত্তিক শাসকগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার হরণ করা শুরু করে। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলার ওপর আঘাত হানা হলে ১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন সূচিত হয়। এই আন্দোলন কেবল ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত মজবুত করে এবং পাকিস্তানি শাসকদলের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আপামর জনগণকে একতাবদ্ধ করে।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার বিরোধী দলগুলোকে দমন-পীড়ন করা এবং নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার অপকৌশল গ্রহণ করেছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আদায়, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজপথের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একটি একক মঞ্চ থেকে নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার তাগিদ অনুভব করে। এই পটভূমিতেই মুসলিম লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ও অপশাসনের অবসান ঘটাতে একটি বিশাল মোর্চা তৈরির চিন্তা বাস্তবে রূপ নেয়।

যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রেক্ষাপট ও শরিক দলসমূহ

১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ময়মনসিংহ নগরের আঞ্জুমান রিফাহুল মুসলিমীন হলে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ-এর বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান যুক্তফ্রন্ট গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘যুক্তফ্রন্ট’। জোটের শরিক দলগুলো ও তাদের শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত:

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ: তৎকালীন স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সাংগঠনিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

কৃষক শ্রমিক পার্টি: সাধারণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে জোটের অন্যতম মূল শক্তি ছিল এই দল। এর নেতৃত্ব দেন 'শেরে বাংলা' এ কে ফজলুল হক।

গণতন্ত্রী দল: অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও বামপন্থী ভাবধারার তরুণ-যুবকদের এই রাজনৈতিক সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও মাহমুদ আলী সিলেটী।

নেজামে ইসলাম পার্টি: ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন মধ্যপন্থী এই দলটির প্রধান নেতা ছিলেন মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী।

খিলাফত রব্বানী পার্টি: অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ইসলামি দর্শনে বিশ্বাসী দলটির নেতৃত্বে ছিলেন আবুল হাশিম ও গোলাম আলী চৌধুরী।

যদিও এটি পাঁচ দলের জোট ছিল, তবে জনগণের কাছে এটি মূলত ‘হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট’ নামেই পরিচিত লাভ করে। মতাদর্শগত ফারাক থাকা সত্ত্বেও এই পাঁচ দলের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্টকে সাধারণ জনগণ মূল তিন অভিভাবক শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী এর নেতৃত্বে এক অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে।

ঐতিহাসিক ২১ দফা ইশতেহার ও দাবিসমূহ

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের প্রচারণা চালাতে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক দাবিগুলোকে প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপ দিতে এক যুগান্তকারী কর্মসূচি তৈরি করে, যা ‘২১ দফা ইশতেহার’ নামে পরিচিত। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ প্রধানত এই ইশতেহারের মূল খসড়া তৈরি করেছিলেন। ২১ দফার মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা। ২১ দফার উল্লেখযোগ্য দফাসমূহ:

প্রথম দফা: বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া।
কৃষি ও ভূমি সংস্কার: কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সমস্ত জমিদারি প্রথা ও মধ্যস্বত্বাধিকার উচ্ছেদ করা এবং উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা।
অর্থনৈতিক সুরক্ষা: পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করা, পাটচাষীদের পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং চা শিল্প ও অন্যান্য প্রধান কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
কৃষি উন্নয়ন: সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা চালু করা এবং কুটির শিল্পকে সরকারি সাহায্যে উৎসাহিত করা।
ঐতিহাসিক স্মারক ও শিক্ষা সংস্কার: ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা এবং বর্ধমান হাউসকে (তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা (যা পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে)।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও মানবাধিকার: রাজবন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া, নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইন বাতিল করা, বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করা এবং প্রশাসনকে দুর্নীতি মুক্ত করা।

১৯৫৪ সালের Provincial Election ও ঐতিহাসিক বিজয়

১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এই নির্বাচন আয়োজিত হয়েছিল। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রতীক ছিল জনগণের অতি পরিচিত ‘নৌকা’, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন শাসকদল মুসলিম লীগের প্রতীক ছিল ‘হারিকেন’

প্রাদেশিক পরিষদের মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩০৯টি। এর মধ্যে সাধারণ মুসলিম আসন সংখ্যা ছিল ২৩৭টি। নির্বাচনটি কেবল একটি সাধারণ ভোট ছিল না; এটি ছিল পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির এক প্রকার গণভোট। নির্বাচনের ফলাফল ছিল নজিরবিহীন:

২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট একাই ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্যে এককভাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ লাভ করে ১৪৩টি আসন, কৃষক শ্রমিক পার্টি ৪৮টি, নেজামে ইসলাম ১৯টি এবং গণতন্ত্রী দল ১৩টি আসন পায়।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

অন্যদিকে দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকা প্রতিক্রিয়াশীল শাসকদল মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পেয়ে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ নেতা নূরুল আমিন তাঁর নিজ আসন ময়মনসিংহে যুক্তফ্রন্টের তরুণ ছাত্রনেতা খালেক নওয়াজ খানের কাছে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হন।

এই নির্বাচন প্রমাণ করে দেয় যে, পূর্ব বাংলার মাটিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছেমতো শাসন করতে পারবে না এবং শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতা অত্যন্ত সুদৃঢ়।

নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের পর ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রথম যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে দলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও কাজের পরিধি বিবেচনা করে ১৫ মে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়।

১৮ সদস্যের এই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভায় সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কৃষি, বন, সমবায় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন। আতাউর রহমান খান লাভ করেন সিভিল সাপ্লাই ও অর্থ বিভাগ।

কেন্দ্রভিত্তিক চক্রান্ত ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন

বাঙালিদের এই অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক বিজয়কে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও সিভিল আমলাতন্ত্র মেনে নিতে পারেনি। সরকারকে অস্থিতিশীল করতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে কৃত্রিমভাবে দাঙ্গা উসকে দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ আদমজী জুট মিল এবং চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী পেপার মিলের বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে সহিংস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটানো হয়, যার পেছনে কাজ করেছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ও অবাঙালি মিল কর্তৃপক্ষ। এই দাঙ্গাকে অজুহাত বানিয়ে করাচিতে অবস্থানরত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করে যে, পূর্ব পাকিস্তানে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

পরিশেষে, মাত্র দুই মাস ২৭ দিন ক্ষমতায় থাকার পর, ১৯৫৪ সালের ৩০ মে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ৯২(ক) ধারা (Governor's Rule) জারি করে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করেন। পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন জারি করে করাচি থেকে প্রতিরক্ষা সচিব মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জোট রাজনীতি (১৯৭২-১৯৭৫)

১৯৭১ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশটিতে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিশাল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি মারাত্মক নিরাপত্তার সংকট তৈরি করে। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

তবে নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কারচুপি ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলে। একই সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাসদের গণবাহিনীর সৃষ্টি, সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র হামলা এবং ১৯৭৪ সালের মারাত্মক দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে জাতীয় রাজনৈতিক সংকট তীব্রতর হয়। এই আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো এককভাবে টিকে থাকা বা আন্দোলনের চাপ সামলানো কঠিন বিবেচনা করে নিজ নিজ ভাবধারার মিত্রদের নিয়ে জোট গঠনে তৎপর হয়ে ওঠে।

সরকারবিরোধী জোটের বিকাশ

সরকারের নানা নীতি, রক্ষীবাহিনীর তৎপরতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরোধিতা করে প্রবীণ ও উগ্র-বামপন্থী নেতৃত্ব একাধিক প্রভাবশালী সরকারবিরোধী জোট গড়ে তোলে:

১. সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি (১৯৭২): ১৯৭২ সালের ২৯ ডিসেম্বর মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক জোট হিসেবে 'সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি' আত্মপ্রকাশ করে।

জোটের শরিকসমূহ হলো ন্যাপ (ভাসানী), আতাউর রহমান খানের বাংলাদেশ জাতীয় লীগ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট ইউনিয়ন, বাংলাদেশ সোশ্যালিস্ট পার্টি, সিপিবি (লেনিনবাদী), শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল এবং বাংলা জাতীয় লীগ।

মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য: এই জোটের প্রধান দাবি ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ, গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা, চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তির বাতিল।

২. জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট (১৯৭৩): ১৯৭৩ সালের ২০ এপ্রিল সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি' এবং সমমনা ১১টি গোপন ও ক্ষুদ্র সশস্ত্র সংগঠনকে এক ছাতার নিচে এনে গঠিত হয় 'জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট'। সিরাজ সিকদার এই ফ্রন্টের সভাপতি নির্বাচিত হন। চীনের মাও সে তুং-এর আদর্শে বিশ্বাসী এই ফ্রন্ট বর্তমান সরকারকে "সোভিয়েত-ভারত সম্প্রসারণবাদের দালাল" হিসেবে অভিহিত করে। তারা সংসদীয় ব্যবস্থার বদলে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ঘোষণা দেয়।

তৎপরতা: সারাদেশের গ্রামীণ এলাকায় থানা আক্রমণ, ব্যাংক ডাকাতি, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হত্যার মাধ্যমে তারা সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকে, যা সরকারের প্রশাসনিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চরম চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।

৩. সর্বদলীয় যুক্তফ্রন্ট (১৯৭৪): ১৯৭৪ সালের ১৪ এপ্রিল মওলানা ভাসানীকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় 'সর্বদলীয় যুক্তফ্রন্ট'। ১৯৭২ সালে গঠিত তরুণভিত্তিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ন্যাপ (ভাসানী), বাংলা জাতীয় লীগ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী), শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলসহ বেশ কয়েকটি বামপন্থী দল এই জোটে শামিল হয়।

রাজনৈতিক তাৎপর্য: এটি ছিল স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী ঐক্য। জাসদের বিপুল ছাত্র-যুব সমর্থক ও সশস্ত্র অঙ্গসংগঠন (গণবাহিনী)-এর শক্তি এবং ভাসানীর গণভিত্তির মেলবন্ধনে এই জোট গঠিত হয়। তাদের আন্দোলন মূলত রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার প্রতিরোধ, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় ব্যর্থতার দায়ে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।

সরকারপক্ষীয় জোট: একদলীয় ‘গণঐক্যজোট’

বিরোধী দলগুলোর সমন্বিত আন্দোলন, উগ্র-বামপন্থীদের সশস্ত্র হামলা এবং অর্থনৈতিক মন্দা সামাল দিতে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের বলয় জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাসীন দল।

গণঐক্যজোটের গঠন (১৯৭৩): ১৯৭৩ সালের ১৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ, মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন 'বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি' (সিপিবি) এবং অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' (ন্যাপ-মোজাফ্ফর)-এর সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় 'গণঐক্যজোট' গঠিত হয়।

জোট গঠনের রাজনৈতিক কারণ: একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সোভিয়েত বলয়ের সমর্থন জোরদার করতে এবং ঘরোয়া রাজনীতিতে উগ্র-বাম ও ডানপন্থী শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে প্রগতিশীল ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলোর সাথে এই জোট গঠন করে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং উগ্রপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির চক্রান্ত নস্যাৎ করা।

বাকশালে রূপান্তর ও জোট রাজনীতির পরিণতি

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৩ সালের এই 'গণঐক্যজোট'-ই ছিল পরবর্তীতে প্রবর্তিত একদলীয় শাসন কাঠামোর প্রাথমিক ভিত্তি।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে জাতীয় দল হিসেবে 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠন করা হয়। গণঐক্যজোটের দুই প্রধান শরিক সিপিবি ও ন্যাপ (মোজাফ্ফর) বাকশালে বিলীন হয়ে যায় এবং তাদের অনেক শীর্ষ নেতা বাকশালের নির্বাহী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। এর মাধ্যমে ১৯৭২ থেকে শুরু হওয়া বহুমুখী ও বহুদলীয় জোট রাজনীতির প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং সাময়িকভাবে একদলীয় রাজনীতি শুরু হয়।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

জিয়াউর রহমানের শাসনামল ও জোট রাজনীতি (১৯৭৫-১৯৮১)

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হয়। খোন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলেও প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তীতে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের 'সিপাহী-জনতা বিপ্লব'-এর মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

প্রাথমিকভাবে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA) করা হলেও জিয়াউর রহমান ছিলেন উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ক্ষমতা সুসংহত করার লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৭ সালের ৩০ মে এক বিতর্কিত 'হ্যাঁ-না' ভোটের মাধ্যমে নিজের শাসনের বৈধতা অর্জনের উদ্যোগ নেন।

রাজনৈতিক দল বিধি (PPR) ও বহু রাজনৈতিক আদর্শের পুনর্বাসন

সামরিক শাসন থেকে বেসামরিকীকরণের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই জিয়া সরকার 'রাজনৈতিক দল বিধি' (Political Parties Regulation বা PPR) জারি করে। এর মাধ্যমে ইনডোর রাজনীতির সীমিত অনুমতি দেওয়া হয় এবং স্থগিত হয়ে থাকা রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়।

এই বিধির অধীনেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন বামপন্থী ও ডানপন্থী দলগুলো পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। জিয়াউর রহমান 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ'-এর পরিবর্তে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'-এর নতুন ধারণা প্রবর্তন করেন। একই সাথে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংশোধন করে "সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা" সংযোজন করা হয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের পর নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক দলসমূহ যেমন মুসলিম লীগ, ডেমোক্রেটিক লীগ এবং পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল রাজনীতিতে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে।

১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও দুই মেরুর জোট রাজনীতি

১৯৭৮ সালের ৩ জুন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাজনীতি দুটি স্পষ্ট মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট: জেনারেল জিয়ার ক্ষমতাকে বেসামরিক রূপ দিতে ও নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে ১৯৭৮ সালের ১ মে ৬টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে 'জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট' গঠিত হয়। এই জোটে অন্তর্ভুক্ত দলগুলো ছিল-

১. জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)
২. বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (শাহ আজিজ অংশ)
৩. ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (ভাসানী অংশ, যার নেতৃত্বে ছিলেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া)
৪. ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (ইউপিপি - কাজী জাফর আহমেদ)
৫. বাংলাদেশ লেবার পার্টি
৬. বাংলাদেশ তফসিল জাতি ফেডারেশন

গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট: সামরিক শাসনের বিরোধিতা এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় 'গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট'। এই জোটে অন্তর্ভুক্ত দলগুলো ছিল-

১. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
২. বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
৩. ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (মোজাফফর)
৪. জাতীয় জনতা পার্টি (জেনারেল ওসমানীর নিজস্ব দল)
৫. গণআজাদী লীগ
৬. পিপলস পার্টি

গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট থেকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়। নির্বাচনে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮০৭টি ভোট (৭৬.৬৩%) পেয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল এম এ জি ওসমানী পান ৪৪ লাখ ৫৫ হাজার ২০০টি ভোট (২১.৭%)।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন ও ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের পর জিয়াউর রহমান দলীয় রাজনীতি সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ভেঙে দিয়ে এর শরিক দলগুলোর একাংশকে একত্রিত করে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল' (বিএনপি) গঠন করেন এবং নিজে এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হন।

বিএনপির পতাকাতলে ডানপন্থী, বামপন্থী, মধ্যপন্থী ও আমলাতন্ত্রের এক বিশাল সমাবেশ ঘটে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১৯ দফা কর্মসূচি ও সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান

জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী করতে '১৯ দফা কর্মসূচি' ঘোষণা করেন, যা মূলত গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন, খাল খনন, গণসাক্ষরতা অভিযান এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি ভারত ও সোভিয়েত বলয় থেকে কিছুটা সরে এসে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করেন। এছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার (পরবর্তীতে সার্ক) ধারণাও তিনি প্রথম পেশ করেন।

সিভিলিয়ান পলিটিক্স চালুর চেষ্টা করলেও জিয়াউর রহমানের পুরো শাসনামলই ছিল সেনা অভ্যুত্থানের শঙ্কায় ভরা। তাঁর সাড়ে চার বছরের শাসনামলে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে ছোট-বড় প্রায় ২১টি সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ঘটে। এসব বিদ্রোহ দমনে জিয়া সরকার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং বিশেষ সামরিক আদালতের মাধ্যমে শত শত সেনাসদস্যকে মৃত্যুদণ্ড ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত জোট রাজনীতির প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে, তবে তিনি যে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ' ও বিএনপির রাজনৈতিক ধারা সূচনা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন ও জোট রাজনীতির স্বর্ণযুগ (১৯৮২-১৯৯০)

১৯৮১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালিন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংবিধান স্থগিত করেন, বেসামরিক সরকারকে অপসারিত করেন এবং দেশে সামরিক শাসন (Martial Law) জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।

এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্রসমাজ। ১৯৮২ সালের শেষভাগে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খানের বিতর্কিত ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল এবং সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্রদের সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশ নির্মম গুলি বর্ষণ করে। এতে জাফর, জয়নাল, মোজাম্মেল, আইয়ুব, কাঞ্চনসহ একাধিক ছাত্র শহীদ হন। এই দিনটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পেশাজীবী ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করে। ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫টি রাজনৈতিক দল এবং একই সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে ৭টি রাজনৈতিক দল নিয়ে আলাদা দুটি জোট গঠিত হয়। ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই জোট দুটি যৌথভাবে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, মৌলিক অধিকার পুনর্বহাল এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ঐতিহাসিক ‘৫ দফা দাবি’ ঘোষণা করে।

বিরোধী বলয়ের তিন প্রধান জোট

বিরোধী দলগুলোর জোটবদ্ধ অবস্থান স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কৌশলগত পার্থক্যের কারণে জোটগুলোর ভেতরে নানা সময়ে সমীকরণ পরিবর্তিত হতে থাকে।

১৫ দলীয় জোট (নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ): বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাসদ (রব), বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ (মুজাফফর), সাম্যবাদী দল, গণআজাদী লীগ এবং শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলসহ ১৫টি প্রগতিশীল ও বামপন্থী দল এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন শেখ হাসিনা।

৭ দলীয় জোট (নেতৃত্বে বিএনপি): বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), কাজী জাফর আহমেদের ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ, ন্যাপ (নুরু-জাহিদ) ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগসহ ৭টি ডান ও মধ্যপন্থী দল নিয়ে এই জোট গঠিত হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।

১৯৮৫ সালের হ্যাঁ-না ভোট: স্বৈরাচারী শাসনের বৈধতা তৈরির লক্ষ্যে এরশাদ ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে এক বিতর্কিত ‘হ্যাঁ-না’ গণভোটের আয়োজন করেন, যা প্রধান বিরোধী দলগুলো সম্পূর্ণ বয়কট করে।

১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকার ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলে বিরোধী জোটগুলোর একতায় বড় ধরনের ভাঙন ধরে। ৭ দলীয় জোট এবং ১৫ দলীয় জোটের একটি বড় অংশ নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিলেও, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন অংশ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

এর ফলে ১৫ দলীয় জোট ভেঙে যায় এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সিপিবি, ন্যাপ ও বকশালসহ ৮টি দল নিয়ে গঠিত হয় ‘৮ দলীয় জোট’। অন্যদিকে, নির্বাচন বয়কটকারী বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো যেমন হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করে ‘৫ দলীয় বামজোট’। জামায়াতে ইসলামী কোনো জোটে না থেকেও ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র কৌশলে অংশ নেয়।

১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন এবং 'কপ' (COP)

১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপক কারচুপি ও "মিডিয়া ক্যু"-এর অভিযোগে বিতর্কিত হয়। নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং আওয়ামী লীগ ৭৬টি আসন লাভ করে শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা হন। তবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও রাজপথের তীব্র আন্দোলনের মুখে এই সংসদ বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮৭ সালের শেষদিকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করলে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়।

১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ ৪র্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৮ দল, ৭ দল, ৫ দল এবং জামায়াতে ইসলামীসহ মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলই এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য ও গণতান্ত্রিক দেখানোর জন্য এবং সংসদে কৃত্রিম বিরোধী দল দাঁড় করানোর লক্ষ্যে এরশাদ সরকার আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বাধীন জাসদ (রব)-সহ ১৪০টি ছোট ও নামসর্বস্ব দলের একটি মোর্চা তৈরি করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি’ (Combined Opposition Party) বা ‘কপ’।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমে এই কৃত্রিম বিরোধী দলকে "গৃহপালিত বিরোধী দল" হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং আ স ম আব্দুর রব বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ৪র্থ সংসদেই এরশাদ সরকার ১৯৮৮ সালে সংবিধানের বিতর্কিত ‘অষ্টম সংশোধনী’ পাস করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে এবং হাইকোর্টের ৬টি স্থায়ী বেঞ্চ ঢাকার বাইরে স্থাপন করে (যা পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে)।

রাজপথের গণসংগ্রাম, রক্তঝরা শহীদ ও ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’

১৯৮৭ সাল থেকে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিতে থাকে। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বিরোধী দলগুলোর ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচিতে যুবলীগ নেতা নূর হোসেন বুকে "স্বৈরাচার নিপাত যাক" এবং পিঠে "গণতন্ত্র মুক্তি পাক" স্লোগান লিখে রাজপথে নামেন। জিরো পয়েন্টে (বর্তমান নূর হোসেন স্কয়ার) পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে।

এর আগেও ও পরে আন্দোলনে একে একে প্রাণ দেন শ্রমিক নেতা তাজুল ইসলাম (১৯৮৪), বাস চালক সেলিম ও দেলোয়ার (১৯৮৪), আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিন (১৯৮৪), জাসদ ছাত্রনেতা সাজাহান সিরাজ (১৯৮৬), যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর (১৯৮৭) এবং সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর ছাত্রনেতা নজির হোসেন জেহাদ।

জেহাদের আত্মত্যাগের পর দিন, অর্থাৎ ১৯৯০ সালের ১১ অক্টোবর, দেশের ২২টি ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন একত্রিত হয়ে গঠন করে ঐতিহাসিক ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’। ডাকসু ভিপি আমানউল্লাহ আমান, জিএস খায়রুল কবির খোকন, ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রহমান, ছাত্রদল নেতা কবির হাশিম, ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত এই ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে সমস্ত বিভেদ ভুলে এক মঞ্চে আসতে বাধ্য করে।

১৯৯০-এর ঐতিহাসিক পতন ও তিন জোটের রূপরেখা

১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসে আন্দোলন চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলনের কৌশল ও ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা স্পষ্ট করতে বিরোধী দলগুলো এক যৌথ ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করে।

১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর বিরোধী বলয়ের তিন প্রধান জোট ৮ দল (নেতৃত্বে শেখ হাসিনা), ৭ দল (নেতৃত্বে বেগম খালেদা জিয়া) এবং ৫ দলীয় বামজোট যৌথভাবে ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ঘোষণা করে। এই রূপরেখার প্রধান শর্তগুলো ছিল এরশাদ সরকারের তাত্ক্ষণিক পদত্যাগ এবং একজন নিরপেক্ষ সর্ব গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন (ডা. মিলন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় স্বৈরাচারী সরকারের সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতে শহীদ হলে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশে সান্ধ্য আইন (Curfew) জারি করা হলেও জনতা তা অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে। চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি ও ধর্মঘট পালন শুরু করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে সংবাদ পরিবেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি অচল হয়ে পড়লে এবং সেনাবাহিনীর সমর্থন হারালে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিন জোটের ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে দীর্ঘ ৯ বছরের সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের।

এরশাদ-উত্তর যুগ: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সংসদীয় গণতন্ত্রে জোট (১৯৯১-২০০৬)

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অধীনেই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করে।

এই নির্বাচনে তৎকালীন দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনী ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তবে নির্বাচনী সাফল্যের সুবিধার্থে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে একটি কৌশলগত ও অপ্রকাশ্য নির্বাচনী আসন সমঝোতা গড়ে ওঠে, যেখানে বিএনপি জামায়াতকে ৬৮টি আসনে পরোক্ষ সমর্থন প্রদান করে। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি ১৪০টি আসন এবং জামায়াত ১৮টি আসন লাভ করে। অন্যদিকে, মিডিয়া ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার পূর্বাভাস সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন অর্জন করে।

সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (১৫১ আসন) সংকট দেখা দিলে জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সরকার গঠনের পরপরই ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে ঐতিহাসিক দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে পুনরায় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

কেয়ারটেকার আন্দোলনের নতুন জোট ও ১৯৯৬ এর ট্রানজিট

নতুন গণতান্ত্রিক ধারা শুরু হলেও খুব বেশি দিন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এড়ানো সম্ভব হয়নি। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে মাগুরা-২ আসন উপ-নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও কারচুপির অভিযোগ তোলে বিরোধী দলগুলো। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কাজী জাফর-এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার জন্য সংবিধানে অরাজনৈতিক ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলে। একই সাথে এই আন্দোলনে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

পরবর্তী দুই বছর ধরে চলে সংসদ বয়কট, রাজপথের তীব্র আন্দোলন, টানা হরতাল এবং বিরোধীদলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্যের একযোগে পদত্যাগ। এর ফলে দেশে চরম শাসনতান্ত্রিক জটিলতা দেখা দেয়। বিরোধী দলগুলোর টানা বয়কটের মুখে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। প্রায় সর্বাত্মক বর্জনের কারণে এই নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল অতি সামান্য। ভোটারদের অনীহা এবং রাজনৈতিক বৈধতার অভাবে গঠিত এই ৬ষ্ঠ সংসদটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম সংসদ, যার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১২ দিন।

রাজনৈতিক অচল অবস্থা কাটাতে এবং নতুন সংসদীয় বৈধতা দিতে এই ১২ দিনের মেয়াদেই ২৬ মার্চ সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া হয়। এর পরপরই ৬ষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের প্রথম সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১২০টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তবে তা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি (৩২ আসন) এবং আ স ম আবদুর রবের জাসদের সাথে ঐক্য গড়ে তোলে এবং একটি 'জাতীয় ঐকমত্যের সরকার' গঠন করে। এই জোটে পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং জাসদের আ স ম আবদুর রব মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

‘চার দলীয় ঐক্যজোট’ গঠন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি এবং ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার সমমনা শক্তিগুলো এই চুক্তিগুলোর একাধিক অনুচ্ছেদের তীব্র বিরোধিতা করে রাজপথে আন্দোলন শুরু করে।

বিরোধী রাজপথের এই শক্তিকে একীভূত করতে এবং নির্বাচনী সুবিধা নিশ্চিত করতে ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ‘চার দলীয় ঐক্যজোট’ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এই জোটের মূল শরিক দলগুলো ছিল:

১. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
২. জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ
৩. জাতীয় পার্টি (এইচ এম এরশাদ অংশ)
৪. ইসলামী ঐক্যজোট (মুফতি ফজলুল হক আমিনী অংশ)

তবে ২০০১ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে আইনি চাপ ও অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে এইচ এম এরশাদ মূল জোট ত্যাগ করেন। এর ফলে জাতীয় পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে একটি বড় অংশ ‘বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি’ (বিজেপি) নামে চার দলীয় ঐক্যজোটেই থেকে যায়।

২০০১ সালের জুলাই মাসে আওয়ামী লীগ সরকার তার পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চার দলীয় ঐক্যজোটের ভোট একত্রীকরণ কৌশল (Vote-pooling strategy) অভূতপূর্ব সাফল্য আনে।

দলভিত্তিক ভোটের হারের দিক থেকে আওয়ামী লীগ (প্রায় ৪০%) ও বিএনপি-র (প্রায় ৪১%) মাঝে তেমন পার্থক্য না থাকলেও, চার দলের আসনভিত্তিক সমঝোতার কারণে ঐক্যজোট মোট ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থাৎ ২১৫টিরও বেশি আসনে বিজয়ী হয় (যেখানে বিএনপি এককভাবে পায় ১৯৩টি আসন)। অন্যদিকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেমে আসে মাত্র ৬২টি আসনে।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই জয়ের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চার দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠন করে। এই সরকারে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামীর দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান, যা বাংলাদেশের জোট রাজনীতি এবং সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন মাত্রার সূচনা করে।

'মহাজোট' বনাম '১৮/২০ দলীয় জোট' এবং আধুনিক রাজনীতি (২০০৬-২০২৪)

২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোট সরকারের ক্ষমতার শেষদিকে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার করার কৌশল গ্রহণ করে। এই প্রেক্ষাপটে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সমমনা বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোকে (যার মধ্যে ছিল ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ-ইনু, সাম্যবাদী দল ও গণতন্ত্রী পার্টি) একত্রিত করে গঠিত হয় '১৪ দলীয় জোট'। এই জোট সুশাসন, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ২৩ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে।

পরবর্তীতে ২০০৬ সালের শেষদিকে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া এবং বিশাল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন রাজনৈতিক মেরুকরণে বড় পরিবর্তন আসে। ১৪ দলীয় জোটের সাথে যুক্ত হন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশের একটি অংশ। এই সম্প্রসারিত রূপটিই ‘মহাজোট’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের মুখে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দুই বছরের শাসনকাল শেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মহাজোট একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৬৩টি আসনে (আওয়ামী লীগ ২৩০, জাতীয় পার্টি ২৭ এবং শরিকরা ৬টি) অভূতপূর্ব জয় অর্জন করে। বিপরীতপক্ষে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট মাত্র ৩৩টি আসনে গুটিয়ে যায়। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি - শক্তি প্রদর্শন, ক্ষমতার সমীকরণ ও অর্ধশতাব্দীর ইতিবৃত্ত

১৮ থেকে ২০ দলীয় জোট ও ২০১৪ সালের নির্বাচন

২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়কে কেন্দ্র করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এর ফলে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, যা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে ২০১২ সালের এপ্রিলে বিএনপি তাদের পুরনো চার দলীয় জোটকে সম্প্রসারিত করে ‘১৮ দলীয় জোট’ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশ ন্যাপসহ আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল যুক্ত হলে এটি ‘২০ দলীয় জোটে’ রূপ নেয়। এই জোটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ছিল বিএনপির প্রধানতম মিত্র শরিক।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে না হওয়ার প্রতিবাদে ২০ দলীয় জোটসহ অধিকাংশ নিবন্ধিত বিরোধী দল নির্বাচন বয়কট করে। ফলে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র প্রার্থীরা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং মহাজোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় পার্টিকে একটি নজিরবিহীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সরকারের অংশ করার পাশাপাশি সংসদে "প্রধান বিরোধী দল" হিসেবে বসানো হয়।

২০১৮ সালের 'জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট' ও "রাতের ভোট"

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারারুদ্ধ হন। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশ থেকে দল পরিচালনার দায়িত্ব নেন। এ অবস্থায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে গণফোরাম সভাপতি ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের প্রধান নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’। এতে বিএনপি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি এবং কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ অংশ নেয়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একত্রে ধানের শীষ প্রতীকে অংশগ্রহণ করে। তবে নির্বাচনে বড় ধরনের কারচুপির অভিযোগ ওঠে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, ২৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাতেই (যা পরবর্তীতে "রাতের ভোট" হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি পায়) ব্যালট বাক্সে সিল মেরে রাখা হয় এবং পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। ফলাফলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট যৌথভাবে মাত্র ৮টি আসন পায় (বিএনপি ৬টি, গণফোরাম ২টি), অন্যদিকে ক্ষমতাসীন মহাজোট ২৯৩টি আসনে জয় দাবি করে।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে স্থায়ী জোট রাজনীতির প্রতি বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে স্থায়ী জোটবদ্ধতা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে কৌশলগত চাপের মুখে ২০২২ সালের শেষের দিকে বিএনপি তার বহু বছরের পুরনো '২০ দলীয় জোট' আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। স্থায়ী জোটের স্থলাভিষিক্ত হয় "যুগপৎ আন্দোলন" যেখানে বিএনপি এবং অন্যান্য সমমনা দলগুলো (যেমন গণঅধিকার পরিষদ, গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, সমমনা জাতীয়তাবাদী জোট) নিজ নিজ অবস্থান থেকে একই রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখার ভিত্তিতে রাজপথে আন্দোলন চালাতে শুরু করে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘ডামি’ প্রার্থী ও জোট রাজনীতি

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি এবং তার যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা যথারীতি এই নির্বাচনও বয়কট করে। নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে; দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি দলেরই অন্য নেতাদের ‘স্বতন্ত্র’ বা ‘ডামি’ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হয়।

ফলাফলে আওয়ামী লীগ ২২২টি আসনে বিজয়ী হয় এবং আওয়ামী লীগেরই বিদ্রোহী/ডামি প্রার্থীরা ৬২টি আসনে জয়লাভ করেন। জাতীয় পার্টি মাত্র ১১টি আসনে জয় পেয়ে পুনরায় বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করে।

তবে এই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। টানা তিনটি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, বাকস্বাধীনতা হরণ এবং প্রশাসনিক নিপীড়নের জেরে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুতই এক অভূতপূর্ব সর্বজনীন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর মাধ্যমে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শাসনের অবসান ঘটে এবং ৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

এর পরপরই ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। মহাজোট ব্যবস্থার পতন এবং দীর্ঘদিনের দলীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে যাওয়ার পর ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোট ও মেরুকরণের নতুন সমীকরণ শুরু হয় যেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং উদীয়মান নতুন রাজনৈতিক দলগুলো এক নতুন ধারার রাজনীতি ও সাংবিধানিক পুনর্গঠনের পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছে।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতির মাইলফলক ও বিবর্তন

বাংলাদেশের জোট রাজনীতির সাত দশকের বিবর্তনকে একটি পূর্ণাঙ্গ সারণীতে নিচে উপস্থাপন করা হলো:

জোটের নাম

গঠনের বছর

প্রধান দলসমূহ ও নেতৃত্ব

ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক প্রভাব

যুক্তফ্রন্ট

১৯৫৩

আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল (ভাসানী, হক, সোহরাওয়ার্দী)

১৯৫৪ নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ; পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কবর রচনা।

গণঐক্যজোট

১৯৭৩

আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ন্যাপ-মোজাফফর (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে প্রথম সরকারি জোট; বাকশাল গঠনের পূর্ববর্তী পদক্ষেপ।

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট

১৯৭৮

জাগদল, মুসলিম লীগ, ইউপিপি, ন্যাপ-ভাসানী (জেনারেল জিয়াউর রহমান)

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জয় ও পরবর্তীতে বিএনপি দল গঠনের ভিত্তি।

১৫ দলীয় জোট

১৯৮৩

আওয়ামী লীগ, জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি (শেখ হাসিনা)

এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বড় আন্দোলন; পরবর্তীতে ভাঙন ধরে।

৭ দলীয় জোট

১৯৮৩

বিএনপি, ইউপিপি, ডেমোক্রেটিক পার্টি (বেগম খালেদা জিয়া)

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি; নির্বাচন বয়কটের নীতি।

কম্বাইন্ড অপজিশন (কপ)

১৯৮৮

আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বাধীন ১৪০টি নামসর্বস্ব দল

এরশাদ সরকারের "গৃহপালিত বিরোধী দল"; গণমনে তীব্র ব্যঙ্গ সৃষ্টি।

চার দলীয় ঐক্যজোট

১৯৯৯

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, বিজেপি (খালেদা জিয়া)

২০০১ সালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ ও সরকার গঠন।

১৪ দলীয় জোট / মহাজোট

২০০৪/২০০৬

আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি (শেখ হাসিনা)

২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৬৩টি আসন পেয়ে ভূমিধস জয় ও টানা ক্ষমতার শাসন।

১৮ / ২০ দলীয় জোট

২০১২

বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি, বিজেপি, কল্যাণ পার্টি (খালেদা জিয়া)

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন; ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

২০১৮

গণফোরাম, বিএনপি, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি (ড. কামাল হোসেন)

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন।

ভারতীয় উপমহাদেশের জোট রাজনীতির সাথে তুলনা

বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় জোট রাজনীতি অত্যন্ত প্রভাবশালী। ভারতে বহু-জাতি ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের কারণে একক দলের কেন্দ্র সামলানো কঠিন।

জনতা পার্টি (১৯৭৭): ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার পর ইন্দিরা গান্ধীর একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে চারটি বিরোধী দল মিলে গঠন করেছিল 'জনতা পার্টি' এবং ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হন।

এনডিএ বনাম ইউপিএ (NDA vs UPA/I.N.D.I.A): ভারতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন NDA (National Democratic Alliance) এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন I.N.D.I.A জোটে ডজন ডজন আঞ্চলিক দল যুক্ত রয়েছে।

উপমহাদেশীয় জোট রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হলো এখানে আদর্শিক অমিল থাকা সত্ত্বেও কেবল শাসনক্ষমতা লাভ বা শক্তিশালী শাসককে হটানোর একদফায় বিপরীতমুখী দলগুলো এক টেবিলে বসে যায়।

ইসলামী দলগুলোর জোট রাজনীতি: ধর্মভিত্তিক শক্তির উত্থান ও মেরুকরণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী দলগুলো এককভাবে বড় কোনো ব্যালট বিপ্লব ঘটাতে না পারলেও, প্রধান দুই দল (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি)-এর জন্য তারা সবসময়ই অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করেছে।

'ইসলামী ঐক্যজোট' (১৯৯০) ও চার দলীয় জোটে প্রভাব

প্রতিষ্ঠা: ১৯৯০ সালে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, মুফতি ফজলুল হক আমিনী এবং পীর সাহেব চরমোনাইসহ বেশ কয়েকজন কওমি আলেম মিলে গঠন করেন ইসলামী ঐক্যজোট

রাজনীতিতে প্রভাব: ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচন করে এবং বেশ কয়েকটি আসনে জয়ী হয়ে সরকারে অংশ নেয়। এতে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনীতি প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতার প্রত্যক্ষ অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়।

'হেফাজতে ইসলাম' (২০১৩-পরবর্তী) এবং অরাজনৈতিক জোটের রাজনীতি

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক জোটগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় 'চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী' (Pressure Group) হিসেবে আবির্ভূত হয়।

আওয়ামী লীগের কৌশলগত পরিবর্তন: ২০১৪ সালের পর আওয়ামী লীগ কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটায়। ২০১৭ সালে কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি এবং কওমি আলেমদের সাথে সরকারের সমঝোতা একধরনের 'অদৃশ্য রাজনৈতিক জোট' তৈরি করে, যা ঐতিহ্যগত ইসলামী জোটের সমীকরণকে ভেঙে দেয়।

বামপন্থী রাজনীতি: 'মহাজোট' বনাম 'বাম গণতান্ত্রিক জোট'

বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও সামাজিক ন্যায়বিচারের রাজনীতিতে বামপন্থী দলগুলো সবসময় তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি ছিল। তবে জোট রাজনীতিতে তাদের অবস্থান দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

ক্ষমতাকেন্দ্রীক প্রাকটিক্যাল ধারা: জাসদ (হাসানুল হক ইনু) এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (রাশেদ খান মেনন) বিশ্বাস করত ডানপন্থী ও মৌলবাদী শক্তিকে ঠেকাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রগতিশীল মহাজোট গঠনই বাস্তবসম্মত পথ। এর মাধ্যমে তারা সরকারের অংশ হয়ে মন্ত্রীত্ব ও সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব লাভ করে। তবে বিনিময়ে মূলধারার প্রগতিশীল রাজনীতিতে তাদের স্বাধীন অবস্থান ও নিজস্ব ভোটব্যাংক অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হয়।

নীতিগত স্বতন্ত্র ধারা (বাম গণতান্ত্রিক জোট): সিপিবি (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) এবং বাসদ (খালেকুজ্জামান) মনে করে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই বুর্জোয়া দলের সাথে জোটে যাওয়া মানে বামপন্থার বিলোপ ঘটানো।

তারা পরবর্তীতে গঠন করে 'বাম গণতান্ত্রিক জোট' (Left Democratic Alliance)। এই জোটটি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোনো প্রধান জোটের অংশ না হয়ে 'দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি' গড়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

২০ দলীয় জোট থেকে 'যুগপৎ আন্দোলন'

২০২২ সালে এসে বাংলাদেশের জোট রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়। ১৯৯৯ থেকে চলে আসা ২০ দলীয় জোটকে বিএনপি কৌশলগত কারণে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। কেন 'যুগপৎ আন্দোলন' বা 'Simultaneous Movement' কৌশল?

জামায়াত ট্যাগ এড়ানো: পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতের কাছে বিএনপিকে 'উগ্র ডানপন্থী বা জামায়াত-ঘেঁষা' হিসেবে দেখানোর যে রাজনৈতিক সুযোগ ক্ষমতাসীন দল পেত, তা ভেস্তে দিতে ২০ দল ভেঙে দেওয়া হয়।

বহুমুখী প্ল্যাটফর্ম: বিএনপির সাথে একই মঞ্চে না বসেও যাতে বাম, ডান ও মধ্যপন্থীরা একদফা দাবিতে রাজপথে নামতে পারে, সেজন্য গঠিত হয়:

গণতন্ত্র মঞ্চ (গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি ইত্যাদি)
১২ দলীয় জোট
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট
স্বতন্ত্র হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দল

এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি দল তাদের নিজস্ব ব্যানার থেকে কর্মসূচি দেয়, কিন্তু দাবি থাকে একটিই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন।

'জনতার মঞ্চ' ও 'কিংগস পার্টি' (King's Party)

বাংলাদেশে জোট রাজনীতি কেবল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এতে সিভিল সোসাইটি ও আমলাতন্ত্রেরও প্রত্যক্ষ পরোক্ষ জোট দেখা গেছে।

জনতার মঞ্চ (১৯৯৬): তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মেয়র মোহাম্মদ হানিফের নেতৃত্বে সচিবালয়ের সামনে 'জনতার মঞ্চ' গঠন করে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলনের রাজপথ ত্বরান্বিত করে। এটি ছিল আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক দলের এক অভূতপূর্ব জোট।

কিংগস পার্টি (King's Party) ও ওয়ান-ইলেভেন (২০০৭): সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধান দুটি বড় দলকে মাইনাস করার উদ্দেশ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী (পিডিপি) প্রমুখকে নিয়ে 'কিংগস পার্টি' গড়ার যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তা মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের মদদে গঠিত জোটের এক ব্যর্থ উদাহরণ।

জোট রাজনীতিতে আসন ভাগাভাগি ও 'প্যাডসর্বস্ব পার্টি'র বাণিজ্যিক রূপ

বাংলাদেশে নির্বাচন কেন্দ্রিক জোটের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো আসন সমঝোতা ও মনোনয়ন রাজনীতি।

'প্যাডসর্বস্ব পার্টি'র উত্থান: অনেক ক্ষুদ্র দল রয়েছে যাদের কোনো জেলা কার্যালয় বা ন্যূনতম ১০০টি ভোটও নেই। শুধু জোটের সংবাদ সম্মেলনে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নাম থাকা এবং টকশোতে জোটের পক্ষে কথা বলার বিনিময়ে নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন বা প্রধান বিরোধী দলের কাছ থেকে নিশ্চিত আসন আদায় করে নেওয়াকে বলা হয় 'প্যাডসর্বস্ব দলীয় সুবিধা'।

নমিনেশন বাণিজ্য ও ব্ল্যাকমেইলিং: আসন ভাগাভাগির দরকষাকষিতে মূল দলগুলোকে তাদের নিবেদিতপ্রাণ স্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে ছোট ছোট শরিক দলের নেতাদের আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে, যা বহুবার স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্রোহ ও দলীয় বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও বাংলাদেশের জোটের সমীকরণ

বাংলাদেশের কোনো জোট ক্ষমতায় আসবে বা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার ওপর বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির গভীর প্রভাব রয়েছে:

ভারতের অবস্থান: ভারত ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কারণেই ধর্মনিরপেক্ষ ও তাদের আঞ্চলিক সুরক্ষার অনুকূলে থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।

চীন ও পাকিস্তানের ভারসাম্য: দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় চীন সবসময় ক্ষমতাসীন দলের সাথে কাজের সম্পর্কের পাশাপাশি ডানপন্থী বা জাতীয়তাবাদী ধারার জোটের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করে।

পশ্চিমারা ও যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবসময় বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল ও বহুদলীয় প্রতিযোগিতামূলক জোটের উপস্থিতি দেখতে পছন্দ করে, যা তাদের 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' এবং মানবধিকার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পর্যালোচনা ও জোট রাজনীতির অর্জন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জোট রাজনীতি দেশের জন্য আর্শীবাদ ও অভিশাপ উভয় রূপেই আবির্ভূত হয়েছে। জোট রাজনীতির সুফলগুলো হলো:

ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ: ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মতো জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে রাজপথে স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে জনগণের চূড়ান্ত স্বাধিকার এনে দিয়েছিল এই জোট রাজনীতি।

ক্ষুদ্র দলের প্রতিনিধিত্ব: জাতীয় রাজনীতিতে মূলধারার দলের বাইরে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো (যেমন বামপন্থী বা ইসলামী ধারা) জোটের অংশ হয়ে সংসদে ও জাতীয় নীতিতে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পায়।

জোট রাজনীতির চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত নৈতিকতার সংকটগুলো হলো:

আদর্শহীন ক্ষমতার রাজনীতি: অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নির্বাচনে জেতার জন্য সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুটি দল জোটে একীভূত হয়েছে। আদর্শিক দেউলিয়াত্বের কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি আস্থা হ্রাস পেয়েছে।

ক্ষুদ্র দলের সুবিধাবাদ ও ব্ল্যাকমেইলিং: জোটের সমীকরণে কখনো কখনো মাত্র একটি বা দুটি আসন পাওয়া ক্ষুদ্র দলও সরকার গঠন বা পতনে প্রধান অনুঘটক হয়ে উঠে সরকার প্রধানকে নীতিগত আপস করতে বাধ্য করে।

পরিশেষে বলা যায়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমতের বৈচিত্র্যকে ধারণ করার জন্য জোট রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে তা যদি কেবল ক্ষমতার লোভ কিংবা কোনো একক ব্যক্তি বা দলকে উৎখাতের সংকীর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবে তা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আগামী দিনের বাংলাদেশে যদি কেবল নির্বাচনি লাভ-ক্ষতির উর্ধ্বে উঠে আদর্শভিত্তিক, নীতিবান এবং জবাবদিহিমূলক জোট রাজনীতির চর্চা সম্ভব হয়, তবেই দেশের গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যাদের জীবন ও কীর্তিকে কেবল তাদের জীবদ্দশায় নয়, বরং মৃত্যুর পরও এক সুপরিকল্পিত ও হিংসাত্মক অপপ্রচারের কালো চাদরে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ও নির্মমভাবে অপপ্রচারের শিকার হওয়া এক অবিসংবাদিত যুবনেতার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.