শেরে বাংলা কন্যা রইসী বেগম বাংলাদেশ বিরোধী ছিলেন? মুক্তিযুদ্ধের অন্ধকার দলিল
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল অস্ত্র হাতে মুখোমুখি যুদ্ধের ময়দান নয়; এটি ছিল একই সাথে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। সামরিক শক্তি দিয়ে বাঙালি জাতিকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল টিক্কা খান ও জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে একটি সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার সেল গঠন করে। একাত্তরের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে শেরে বাংলার নাম ভাঙানো এবং প্রোপাগান্ডার আড়ালে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কন্যা রইসী বেগম।

TruthBangla

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল অস্ত্র হাতে মুখোমুখি যুদ্ধের ময়দান নয়; এটি ছিল একই সাথে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। সামরিক শক্তি দিয়ে বাঙালি জাতিকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল টিক্কা খান ও জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে একটি সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার সেল গঠন করে। একাত্তরের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে শেরে বাংলার নাম ভাঙানো এবং প্রোপাগান্ডার আড়ালে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কন্যা রইসী বেগম।
বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি ও সামাজিক রাজনীতির ইতিহাসে অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এক অবিস্মরণীয় ও প্রাতঃস্মরণীয় নাম। কৃষক-প্রজাদের মুক্তির কাণ্ডারী, প্রজা স্বত্ব আইনের প্রবর্তক এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সিংহপুরুষ হিসেবে তিনি চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে আসীন। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক চরম এবং নির্মম পরিহাস হলো কোনো মহান ব্যক্তিত্বের রক্ত বা রক্তের সম্পর্ক সবসময় তাঁর প্রগতিশীল আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাবাহিকতা বহন করতে পারে না।
এর সবচেয়ে স্পষ্ট ও বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কন্যা রইসী বেগমের রাজনৈতিক ভূমিকা ও বক্তব্য পর্যালোচনায়। যে শেরে বাংলা ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের প্রবর্তক হয়েও পরবর্তীতে বাঙালির স্বতন্ত্র সত্তা, প্রজা অধিকার ও ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূলভিত্তি রচনা করেছিলেন; ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁরই নিজ কন্যা রইসী বেগম সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান গ্রহণ করেন।
রইসী বেগম কেবল তৎকালীন স্বৈরাচারী পাকিস্তান সামরিক জান্তার আনুগত্যই স্বীকার করেননি; বরং তিনি 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম'-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুপরিকল্পিতভাবে স্বাধীনতাকামী বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল জাতীয়তাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক প্রতীকের বিরুদ্ধে জঘন্যতম ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অপপ্রচার চালিয়েছিলেন।
এই নিবন্ধে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মহান রাজনৈতিক আদর্শের সাথে তাঁর কন্যার বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ, ১৯৭১ সালে সামরিক সরকারের পক্ষে রইসী বেগমের দেওয়া সংবাদপত্র ও নথির বিতর্কিত বিবৃতি, ধর্মীয় উগ্রতার অপব্যবহার এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি ঐতিহাসিক অন্ধকারের দলিল বিস্তৃতভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হলো।
শেরে বাংলার প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদ বনাম রইসী বেগমের ধর্মীয় উগ্রতা
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন ছিল গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির প্রধান হিসেবে কৃষক ও মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অগ্রদূত। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য, যেখানে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং স্বাধিকারের আকুতি প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু ১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে তাঁর পরিবারের অন্যতম সদস্য রইসী বেগম পুরোপুরি প্রবেশ করেন পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী এবং ধর্মান্ধ উগ্র রাজনীতির ফাঁদে।
লাহোর প্রস্তাবের সঠিক ব্যাখ্যা বনাম পাকিস্তানি অপব্যাখ্যা
শেরে বাংলা ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে একাধিক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের (States) ধারণার কথা বলেছিলেন, যা পরবর্তীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু রইসী বেগম এবং তাঁর মতো তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী গোষ্ঠী শেরে বাংলার নাম ব্যবহার করে পাকিস্তানি একনায়কতন্ত্র ও ধর্মের নামে শোষণের রাজনীতিকে বৈধতা দিতে চেয়েছিলেন।
'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম' এবং এর রাজনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানে হত্যা, লুণ্ঠন ও নারীন্যায়ে মেতে উঠেছিল, তখন তাদের অনুগত কিছু বেসামরিক ও ধর্মীয় সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল। 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম' ছিল তেমনই একটি চরমপন্থী ও পাকিস্তানঘেঁষা সংগঠন, যার প্রেসিডেন্ট পদে আসীন ছিলেন রইসী বেগম। এই সংগঠনটির মূল কাজ ছিল:
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যাকে "ইসলাম রক্ষা"-র পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে প্রচার করা।
মুক্তিকামী বাঙালি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা দেওয়া যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে।
বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতাকে "দুষ্কৃতকারী" ও "ভারতের দালাল" হিসেবে চিহ্নিত করা।
২৬শে মার্চ ১৯৭১: সামরিক জান্তার 'অপারেশন সার্চলাইট' ও রইসী বেগমের 'বিপদ মুক্তির' বয়ান
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকায় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, তখন পুরো বাঙালি জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। ২৬শে মার্চ তৎকালীন প্রধান সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেন।
ঠিক এই নির্মম সময়ে, যখন ঢাকা শহরের রাজপথে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের লাশ পড়েছিল, তখন শেরে বাংলার কন্যা রইসী বেগম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই বর্বরোচিত আক্রমণকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দেন।
শত্রুপক্ষীয় শক্তি থেকে "মুক্তি"র মিথ্যা বয়ান
সংবাদপত্রে প্রেরিত ও প্রকাশিত এক বিশেষ বিবৃতিতে রইসী বেগম উল্লেখ করেন যে:
"১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ছিল মূলত একটি শত্রুপক্ষীয় ও যুদ্ধংদেহী শক্তির শক্ত থাবা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি শান্তিকামী ও ধর্মপ্রাণ জনগণের বিপদ মুক্তির শুভ দিন।"
এখানে রইসী বেগম "শত্রুপক্ষীয় ও যুদ্ধংদেহী শক্তি" বলতে অন্য কাউকে নয়, বরং জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ, স্বাধিকারকামী বাঙালি ছাত্র-জনতা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই নির্দেশ করেছিলেন। একজন প্রখ্যাত বাঙালি নেতার কন্যা হয়ে নিজ দেশের মুক্তিকামী মানুষের রক্তে ভেজা রাজপথকে তিনি "বিপদ মুক্তির দিন" হিসেবে আখ্যায়িত করে চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর জঘন্য উদাহরণ
উক্ত বিবৃতিতে তিনি সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষুকে ইসলাম রক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করে বলেন, সামরিক জান্তার এই কঠোর পদক্ষেপ ছিল মূলত পাকিস্তানের কোটি কোটি মুসলমানের দীর্ঘদিনের কান্নাকাটি ও দোয়ার ফসল। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালিদের ওপর যে গণহত্যা চালাচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের দোয়ার ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট একটি "রক্ষা অভিযান"!
উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর আঘাত
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের মহান চালিকাশক্তি ছিল বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।
রইসী বেগম এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে আঘাত করতে তৎকালীন পাকিস্তানি সরকারের সাম্প্রদায়িক উস্কানির নীতি পুরোপুরি গ্রহণ করেছিলেন।
"মন্দিরে পরিণত করার ষড়যন্ত্র" বয়ান: রইসী বেগম তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা ও নিবন্ধে দাবি করেছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর অনুসারীরা ইসলামের চরম শত্রু এবং তারা নাকি ভারতের সহচরদের সাথে আঁতাত করে এই অঞ্চলকে ইসলামমুক্ত করতে চায়। তাঁর কুখ্যাত এক উক্তি ছিল:
"শেখ মুজিব ইসলামের জাতশত্রুদের সহায়তায় আমাদের এই পবিত্র সুফিসাধকদের পূর্ব পাকিস্তানকে বিশ্বনাথ, কালী ও দুর্গার মন্দিরে পরিণত করার এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।"
এই বক্তব্যটি ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মারাত্মক সাম্প্রদায়িক। এর মূল লক্ষ্য ছিল দুই বাংলায় বসবাসকারী বা পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে হিন্দুভীতি ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে হাত মেলায়।
'জয় বাংলা' স্লোগানকে 'পৌত্তলিকদের স্লোগান' আখ্যা: বাঙালির লড়াই-সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও ঐক্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক ছিল 'জয় বাংলা' স্লোগান। পঁচিশে মার্চের পর থেকে মুক্তিকামী গেরিলা যোদ্ধারা 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়েই বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতেন।
রইসী বেগম এই প্রাণজাগানো স্লোগানটিকেও ধর্মীয় রোষানলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তাঁর বিবৃতিতে বলেন:
"আল্লাহু আকবরের মতো পবিত্র ইসলামি ধ্বনির বদলে শেখ মুজিব পৌত্তলিকদের যুদ্ধের স্লোগান 'জয় বাংলা' আমাদানি করেছেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের পবিত্র আকাশ-বাতাসকে অপবিত্র করে তুলছে।"
বাঙালির একটি অসাম্প্রদায়িক, ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী স্লোগানকে 'পৌত্তলিক' বা কাফেরী স্লোগান বলে প্রচার করা ছিল মূলতঃ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রপাগান্ডার হুবহু পুনরাবৃত্তি।
২৩শে মার্চের পতাকা উত্তোলন ও রইসী বেগমের তীব্র ক্ষোভ
১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ ছিল তৎকালীন 'পাকিস্তান দিবস'। কিন্তু স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতি তৎকালীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সেদিন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত প্রথম 'স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা' উত্তোলন করে। ধানমন্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে হাতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি পাকিস্তান অখণ্ডতায় বিশ্বাসী রইসী বেগমকে মারাত্মকভাবে ক্রুদ্ধ ও ব্যথিত করেছিল।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে প্রেরিত ক্ষুব্ধ বিবৃতি: ২৩শে মার্চের পরপরই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে প্রদত্ত এক দীর্ঘ রাজনৈতিক বার্তায় রইসী বেগম ২৩শে মার্চের ঘটনাকে "পাকিস্তানের অস্তিত্বে চরম আঘাত" বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:
"২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসে সারা দেশে পাকিস্তানের সবুজ-হেলালী পতাকার বদলে একটি মানচিত্র আঁকা অবমাননাকর পতাকা উত্তোলন করে পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি মুসলমানের আত্মমর্যাদা ও ঐতিহ্যকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।"
'ভাষাগত পরিচয়' বনাম 'এক পাকিস্তান' তত্ত্ব: রইসী বেগম বিশ্বাস করতেন যে, পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ও ভাবাদর্শই পৃথিবীর যেকোনো ভাষার মানুষকে এক সূত্রে গাঁথতে সক্ষম। তাই বাঙালির ভাষাগত স্বকীয়তা বা সার্বভৌম ভূখণ্ডের ধারণাকে তিনি একেবারেই তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন। তাঁর মতে, বাংলা ভাষা বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখা হলো এক ধরনের "ধর্মদ্রোহিতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা"।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় ও রইসী বেগমের নীতিগত পথচ্যুতি
১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগুরুত্ব অর্জন করে। এটি ছিল পুরো পাকিস্তানের শাসনভার বৈধভাবে বাঙালিদের হাতে তুলে দেওয়ার একটি গণতান্ত্রিক রায়।
রইসী বেগম তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে সত্তরের নির্বাচনের ফলাফলের কথা স্বীকার করলেও, বিজয়ের পরবর্তী পরিণতি নিয়ে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক রূপ ফুটে ওঠে।
"ক্ষমতায় যাওয়ার বদলে দেশভাগ" নিয়ে আক্ষেপ: রইসী বেগম মনে করতেন, সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ মুজিবের উচিত ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে পুরো দেশকে ইসলামি ভাবধারায় পরিচালনা করা। কিন্তু যখন বঙ্গবন্ধু বাঙালির ৬ দফা বাস্তবায়ন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবিতে অনড় থাকেন, তখন রইসী বেগম একে বর্ণনা করেন "পাকিস্তানের পিঠে মরণ আঘাত" হিসেবে।
'ভারতীয় চক্রান্ত' জিকির: ত তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সুরেই রইসী বেগমও বারবার দাবি করতে থাকেন যে, ১৯৭১ সালের মার্চের আন্দোলন কোনো বাঙালি আন্দোলন নয়; এটি ভারত সরকারের অর্থ, অস্ত্র ও ষড়যন্ত্রের ফসল।
তিনি এক হুঁশিয়ারি বার্তায় বলেন:
"ভারতের অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ ও আমাদের দেশের যুবসমাজকে ভুল পথে চালিত করার যে ষড়যন্ত্র চলছে, পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী কোটি কোটি জনতা তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে প্রস্তুত।"
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে না, যা হচ্ছে তা হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ।
'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম' ও একাত্তরের রাজাকার-শান্তি কমিটির মনস্তাত্ত্বিক বলয়
১৯৭১ সালের মে ও জুন মাসের পর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন পুরো বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় চাপ অনুভব করছিল, তখন তারা প্রতিটি জেলায় ও মহকুমায় 'শান্তি কমিটি' (Peace Committee) এবং 'রাজাকার', 'আল-বদর', 'আল-শামস' বাহিনী গঠন করতে শুরু করে।
এই সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে কেবল অস্ত্রের জোড়ে নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ইন্ধন জোগানোর জন্য দরকার ছিল কিছু সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন। রইসী বেগমের নেতৃত্বাধীন 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম' তেমনই একটি সংগঠন ছিল।
রাজাকারের আদর্শিক রসদ জোগানো: 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম'-এর মাধ্যমে রইসী বেগম গ্রামে-গঞ্জে ও শহরের রক্ষণশীল নারীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। তারা সভা করে নারীদের বোঝাত যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা মানে ইসলামবিরোধী কাজ করা। রাজাকারে যোগ দেওয়া যুবকদের "গাজী" বা "শহীদ" হিসেবে উপস্থাপন করতে তারা বিভিন্ন লিফলেট প্রকাশ করত।
আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা: এই সংগঠনের অন্যতম কাজ ছিল বাংলাদেশে আসা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও রেডক্রসের প্রতিনিধিদের কাছে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করা। রইসী বেগম নিজে বিভিন্ন সময়ে বিবৃতি দিয়ে দাবি করতেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি "সম্পূর্ণ স্বাভাবিক" এবং এখানে কেবল কিছু "ভারতীয় অনুচর ও দুষ্কৃতকারী" বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মহান আদর্শ কি রইসী বেগম ধারণ করতে পেরেছিলেন?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন হলো শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক যদি ১৯৭১ সালে বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি কি তাঁর কন্যা রইসী বেগমের এই অপতৎপরতা ও অবস্থানকে সমর্থন করতেন?
এর উত্তর এক বাক্যে: কখনই না।
প্রজা স্বাধিকার বনাম সামরিক স্বৈরাচার: শেরে বাংলা ফজলুল হক সারাজীবন লড়াই করেছেন প্রজা ও সাধারণ কৃষকদের অধিকারের জন্য। তিনি কোনোদিন কোনো স্বৈরাচার বা সামরিক শক্তির সামনে মাথা নত করেননি। অন্যদিকে তাঁর কন্যা রইসী বেগম সরাসরি সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের রক্তের হোলিখেলাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
১৯৫৪ এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা বনাম ১৯৭১ এর উগ্রতা: ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও উদীয়মান তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান মিলে যে 'যুক্তফ্রন্ট' গঠন করেছিলেন, তার মূল ভিত্তিই ছিল অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কিন্তু ১৯৭১ সালে এসে রইসী বেগম সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে "মন্দিরের সংস্কৃতি" বলে গালি দিয়েছিলেন, যা তাঁর বাবার সারা জীবনের অর্জন ও আদর্শের প্রতি ছিল চরম এক বিশ্বাসঘাতকতা।
এক নজরে ১৯৭১ রইসী বেগমের বিতর্কিত ভূমিকা
ঐতিহাসিক ঘটনা / বিষয় | রইসী বেগমের অবস্থান ও মন্তব্য | প্রামাণ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব |
২৬শে মার্চের গণহত্যা ও আক্রমণ | ২৫-২৬শে মার্চের সেনা অভিযানকে সাধারণ মানুষের "বিপদ মুক্তির দিন" হিসেবে ঘোষণা। | পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তক্ষয়ী গণহত্যাকে ধর্মীয় ও নৈতিক বৈধতা দেওয়া। |
বঙ্গবন্ধু ও স্বাধিকার আন্দোলন | আন্দোলনকে "বিশ্বনাথ, কালী ও দুর্গার মন্দিরে পরিণত করার ষড়যন্ত্র" আখ্যা প্রদান। | বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে দমন করার অপচেষ্টা। |
'জয় বাংলা' স্লোগান | 'জয় বাংলা'-কে "পৌত্তলিকদের যুদ্ধের স্লোগান" বলে অভিহিত করা। | বাঙালির প্রাণের জাতীয় স্লোগানকে ধর্মবিরোধী ও কাফেরী স্লোগান হিসেবে চিত্রায়ন। |
২৩শে মার্চ পতাকা উত্তোলন | মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকে "সাত কোটি বাঙালির অপমান" বলা। | স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতীক ও স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি অস্বীকার করা। |
ভারতের হস্তক্ষেপের অভিযোগ | স্বাধীনতা আন্দোলনকে সম্পূর্ণরূপে "ভারতীয় চক্রান্ত ও অনুপ্রবেশ" হিসেবে দাবি করা। | আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ছক বাস্তবায়ন। |
সংগঠনের পদবী | 'পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম'-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন। | রাজাকারের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি ও শান্তি কমিটির সহযোগী বলয় তৈরি করা। |
একাত্তরের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের মূল কৌশল ছিল তিনটি: প্রথমত, স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ‘কাফের’ বা ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করা; দ্বিতীয়ত, ইসলাম ধর্মকে ঢাল বানিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নারকীয় গণহত্যাকে ‘ধর্ম রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব’ হিসেবে প্রচার করা; এবং তৃতীয়ত, বাঙালি জাতির শ্রদ্ধেয় ও সর্বজনমান্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের পরিবার বা উত্তরাধিকারীদের দিয়ে পাকিস্তানপন্থার পক্ষে বক্তব্য দেওয়ানো।
এই তৃতীয় কৌশলের সবচেয়ে বড় শিকার ও প্রয়োগক্ষেত্র ছিলেন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কন্যা রইসী বেগম। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত চতুরতার সাথে শেরে বাংলার প্রাতঃস্মরণীয় নাম ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে সাধারণ বাঙালি ও বিশ্ববাসীর মনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে চেয়েছিল। শেরে বাংলার মতো অবিসংবাদিত কৃষক-প্রজা নেতার কন্যা যখন রেডিও পাকিস্তান ও সংবাদপত্রের পাতায় সামরিক জান্তার পক্ষে সাফাই গান, তখন তা মুক্তিকামী বাঙালি জাতির মনস্তত্ত্বে আঘাত হানার একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
একাত্তরের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও 'আইকন ম্যানিপুলেশন' কৌশল
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পর থেকে যখন বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার সংবাদ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বিশ্ব জনমত যখন স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে গড়ে উঠছিল, তখন পাকিস্তানি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সেল (Psychological Warfare Cell) একটি বিশেষ ব্লুপ্ল্যান্ট বাস্তবায়ন করে, যাকে ইতিহাসের ভাষায় বলা হয় ‘আইকন ম্যানিপুলেশন’ (Icon Manipulation) বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের অপব্যবহার।
কেন শেরে বাংলার পরিবারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল?
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন এক হিমালয়সম প্রতিচ্ছবি। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, ১৯৩৭ সালের কৃষক-প্রজা আন্দোলন এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে তিনি সাধারণ বাঙালির হৃদয়ে এক অবিনশ্বর স্থান দখল করে ছিলেন।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী হিসাব করে দেখেছিল যে, সাধারণ গ্রাম্য ও রক্ষণশীল বাঙালি পরিবারকে যদি বোঝানো যায় "শেরে বাংলার পরিবারও পাকিস্তানের পক্ষে আছে" তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থনে চির ধরানো সম্ভব হবে। আর এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই শেরে বাংলার কন্যা রইসী বেগমকে প্রোপাগান্ডার সম্মুখভাগে নিয়ে আসা হয়।
মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির গভীরতা
রইসী বেগমকে দিয়ে বিবৃতি দেওয়ানোর পেছনে মূল মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল দুইমুখী:
অভ্যন্তরীণ বিভ্রান্তি: বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে এটা বিশ্বাস করানো যে, শেখ মুজিবুর রহমান ও স্বাধীনতা সমর্থকেরা মূলত ভুল পথে হাঁটছেন, কারণ শেরে বাংলার মতো মহান নেতার রক্ত ও পরিবার পাকিস্তানের অখণ্ডতাতেই মুক্তি দেখছে।
আন্তর্জাতিক মহলকে বার্তা দেওয়া: বিশ্ববাসীকে দেখানো যে, পূর্ব পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ঐতিহাসিক নেতাদের বংশধরেরাই ভারতীয় চক্রান্তের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে।
পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম: একটি মনস্তাত্ত্বিক মারণাস্ত্র
একাত্তরের মে মাসের দিকে ঢাকা কেন্দ্রিক একটি তথাকথিত সামাজিক ও ধর্মীয় নারী সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম’ (Pakistan Jamiatul Silm)। আরবি ‘সিলম’ শব্দের অর্থ শান্তি। কিন্তু নামের পেছনে শান্তি থাকলেও এটি ছিল মূলত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রেস ও পাবলিসিটি উইংয়ের একটি বেসামরিক সহযোগী সংগঠন।
সংগঠনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও অর্থায়ন
পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম কেবল কোনো দাতব্য বা ধর্মীয় সংগঠন ছিল না। তৎকালীন শান্তি কমিটি (Peace Committee) এবং সেনা সদর দপ্তরের সিভিল অ্যাফেয়ার্স উইংয়ের প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হতো। রইসী বেগম ছিলেন এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বা প্রেসিডেন্ট। এই সংগঠনের মূল কাজগুলো ছিল নিম্নরূপ:
শহরের রক্ষণশীল নারীদের সংগঠিত করা: ঢাকা শহর ও মহকুমা শহরগুলোর রক্ষণশীল পরিবারের নারীদের একত্রিত করে ধর্মীয় আলোচনার নামে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান করা।
মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট: যেসকল পরিবারের সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে গিয়েছিল, সেইসব পরিবারকে সামাজিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।
‘গাজী’ ও ‘শহীদ’ তত্ত্ব তৈরি: রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীতে ভর্তি হওয়া যুবকদের ইসলামি সৈনিক বা ‘গাজী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের মা-বোনদের উৎসাহিত করার জন্য পথসভা পরিচালনা করা।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও সাংবাদিকদের বিভ্রান্তকরণ
একাত্তরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যখন আন্তর্জাতিক রেডক্রস (ICRC) এবং বিদেশী সাংবাদিকদের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসে, তখন ‘পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম’-এর পক্ষ থেকে রইসী বেগম তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছে লিখিত স্মারকলিপি দিয়ে দাবি করেন যে:
"পূর্ব পাকিস্তানে কোনো সেনানিযাতন হচ্ছে না। ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীরা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কেবল শান্তি ও ধর্ম রক্ষা করছে।"
এটি ছিল যুদ্ধের ময়দানে থাকা রক্তঝরা বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত এক জঘন্য প্রোপাগান্ডা।
রেডিও পাকিস্তান ঢাকা ও তৎকালীন গণমাধ্যমে রইসী বেগমের বয়ান প্রচারের কৌশল
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের ঘরে যখন 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' আশা ও স্বাধীনতার আলো ছড়াচ্ছিল, ঠিক তখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী 'রেডিও পাকিস্তান ঢাকা' (যা পরবর্তীতে ঢাকা বেতার কেন্দ্র নামে চালানো হতো) এবং সরকারের অনুগত সংবাদপত্রগুলোকে ব্যবহার করছিল বিষাক্ত প্রচারণার জন্য।
রেডিও পাকিস্তান ঢাকা থেকে বিশেষ মোনাজাত ও সাক্ষাৎকার
১৯৭১ সালের জুন থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা থেকে বারবার রইসী বেগমের সাক্ষাৎকার ও লিখিত বিবৃতি পাঠ করা হতো। বিশেষ করে শুক্রবারে এবং ধর্মীয় উৎসবে তাঁকে দিয়ে বিশেষ বার্তা সম্প্রচার করা হতো।
রেডিওতে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রইসী বেগম বলেছিলেন:
"আমার পিতা শেরে বাংলা ফজলুল হক সারা জীবন মুসলমানদের একতার জন্য লড়াই করেছেন। আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, তবে শেখ মুজিবের এই দেশদ্রোহী আন্দোলন দেখে অশ্রুপাত করতেন। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করাই শেরে বাংলার আত্মার প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন।"
পিতার নাম ব্যবহার করে দেওয়া এই রেডিও বার্তাটি ছিল বাঙালির আত্মসংগ্রামের ওপর চরম এক নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত।
তৎকালীন শীর্ষ সংবাদপত্রসমূহে প্রোপাগান্ডার ধরন
তৎকালীন স্বাধিকারবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী পত্রিকা যেমন দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক পূর্বদেশ, এবং ইংরেজি পত্রিকা দ্য মর্নিং নিউজ (The Morning News) রইসী বেগমের বক্তব্যগুলোকে সংবাদ শিরোনাম বানিয়ে প্রকাশ করত।
পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে ছাপা হতো:
"শেরে বাংলার কন্যার হুংকার: পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না।"
"শেখ মুজিবের আন্দোলন ইসলাম ও শেরে বাংলার আদর্শের পরিপন্থী: রইসী বেগম।"
"জয় বাংলা নয়, আল্লাহু আকবরই বাঙালির মুক্তির পথ।"
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) ও যুক্তফ্রন্ট (১৯৫৪) বনাম একাত্তরের অপব্যাখ্যা
পাকিস্তানি জান্তা এবং রইসী বেগম যে মূল ঐতিহাসিক ভিত্তিটি ব্যবহার করে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাতেন, তা হলো ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’। তারা দাবি করত, যেহেতু শেরে বাংলা লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রকে রক্ষা করা শেরে বাংলার পরিবারের নৈতিক দায়িত্ব।
কিন্তু এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিকৃতি ও অর্ধসত্যের প্রয়োগ।
লাহোর প্রস্তাবের আসল 'States' শব্দ ও শেরে বাংলার অবস্থান
১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোর প্রস্তাবে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক স্পষ্ট ভাষায় "Independent States" (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ) শব্দটি উল্লেখ করেছিলেন। তিনি কখনোই একটি মাত্র কেন্দ্রীভূত পাকিস্তান রাষ্ট্রের কথা বলেননি, যেখানে করাচি বা পিন্ডি থেকে ঢাকা শাসিত হবে।
পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ যখন চতুরতার সাথে 'States' শব্দটির 's' মুছে দিয়ে একটি একক পাকিস্তানের প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তখন শেরে বাংলা ফজলুল হক এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন এবং মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।
সুতরাং, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দেন, তখন তিনি মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মূল চেতনারই (বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ড) চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন। রইসী বেগম ও পাকিস্তানি জান্তা লাহোর প্রস্তাবের এই আসল সত্য গোপন করে ভুয়া অখণ্ডতার বয়ান তৈরি করেছিল।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা
১৯৫৪ সালে শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠিত হয়। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যুক্তফ্রন্ট ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে।
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির মূল ভিত্তি ছিল:
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া।
পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
জমিদার প্রথা উচ্ছেদ ও কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চা করা।
শেরে বাংলা ফজলুল হক ১৯৫৪ সালে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বীজ বপন করেছিলেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তা মহীরুহে পরিণত করেন। রইসী বেগম তাঁর পিতার এই প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে উগ্র ধর্মীয় পাকিস্তানপন্থার অন্ধ গহ্বরে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।
একাত্তরে নারী সমাজকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নারী সমাজের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মা-বোনেরা কেবল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও খাদ্যই দেননি, বরং অনেকে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বাঙালি নারী সমাজের এই অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে ব্যাহত করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা ঢাকা কেন্দ্রিক কিছু উচ্চবিত্ত ও পাকিস্তানঘেঁষা নারীকে সংগঠিত করে একাধিক প্রোপাগান্ডা উইং তৈরি করেছিল। এর মধ্যে ‘পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম’ ছাড়াও আরও কয়েকটি সংগঠন ও তাদের কৌশল নিচে তুলে ধরা হলো:
অপপ্রচারের প্রধান বিষয়বস্তু
এই পাকিস্তানপন্থী নারী সংগঠনগুলো মূলত তিনটি বিষয়ে অপপ্রচার চালাত:
নারীদের শালীনতা ও ধর্মের বয়ান: তারা প্রচার করত যে, মুক্তিসংগ্রামের নামে তরুণীরা ভারতে গিয়ে ‘ধর্মহীন’ হয়ে পড়ছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ হলে নারীদের ইসলামি পর্দার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
ত্রাণ সামগ্রীর নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা: সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সোয়েটার, অর্থ ও শুকনো খাবার তুলে তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজীর হাতে তুলে দিত এবং সেই ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশ করত।
আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বিভ্রান্ত করা: ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি দূতাবাসের নারীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তারা ভুয়া চা-চক্রের আয়োজন করত, যেখানে দেখানো হতো যে পূর্ব পাকিস্তানের নারীরা অত্যন্ত সুখে ও শান্তিতে পাকিস্তানের অধীনে বসবাস করছে!
সাধারণ বাঙালির প্রত্যাখান
পাকিস্তানি জান্তা এবং রইসী বেগমদের এই সুপরিকল্পিত নারী প্রোপাগান্ডা সাধারণ বাঙালি নারী সমাজকে বিন্দুমাত্র বিভ্রান্ত করতে পারেনি। বেগম সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমামের মতো মহান নারীদের নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী নারী সমাজ এই অপপ্রচারের জবাবে গড়ে তুলেছিলেন এক অদম্য প্রতিরোধ। সাধারণ মানুষ রইসী বেগমদের এই মনস্তাত্ত্বিক খেলাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
দালাল আইন ১৯৭২, ইতিহাস থেকে বিলুপ্তি ও বিচারিক বাস্তবতা
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় পরম কাঙ্ক্ষিত বিজয়। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বিজয়ের সাথে সাথেই একাত্তরের ঘাতক, দালাল ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানো প্রোপাগান্ডিস্টদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়।
১৯৭২ সালের দালাল আইন (The Bangladesh Collaborators Special Tribunals Order 1972)
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার 'দালাল আইন' (Collaborators Act) জারি করেন। এই আইনের মূল লক্ষ্য ছিল একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীকে অস্ত্র দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে, পদের প্রভাব দিয়ে বা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যারা গণহত্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহে সহায়তা করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা।
দালাল আইনের নির্দিষ্ট ধারায় বলা হয়েছিল: যারা সংবাদপত্র, রেডিও বা বক্তব্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী প্রচার চালিয়েছে এবং গণহত্যার পক্ষে সমর্থন জোগাতে সহায়তা করেছে, তারাও অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।
রইসী বেগমের পরিণতি ও রাজনৈতিক বিলুপ্তি
১৬ই ডিসেম্বরের পর ‘পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম’ এবং রইসী বেগমের অস্তিত্ব নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে রইসী বেগম এবং তাঁর সহচররা মারাত্মক সামাজিক ধিক্কারের মুখোমুখি হন।
যেহেতু তিনি সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করলেও, প্রোপাগান্ডা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি জান্তার হাতকে শক্তিশালী করেছিলেন, তাই ইতিহাসের বিচারে তিনি একজন চিহ্নিত ‘পাকিস্তানপন্থী দালাল’ হিসেবে নিবন্ধিত হন। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা চিরতরে জনবিচ্ছিন্ন ও নিঃশেষ হয়ে যান। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মহান নামের আড়ালে আশ্রয় নিয়েও তিনি নিজেকে ইতিহাসের কলঙ্ক থেকে রক্ষা করতে পারেননি।
নতুন প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রইসী বেগমের এই অন্ধকার অধ্যায়টি কেবল অতীত ইতিহাসের কোনো ঘটনা নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা।
বংশ পরিচয় নয়, ব্যক্তি মানুষের আদর্শই মুখ্য
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক চিরভাস্বর মহানক্ষত্র। কিন্তু তাঁর কন্যা রইসী বেগমের অবস্থান প্রমাণ করে যে, বংশগত রক্ত কখনো কোনো মানুষের রাজনৈতিক প্রগতিশীলতা বা দেশপ্রেমের সনদ হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারিত হয় একজন মানুষের কাজ, আদর্শ এবং চরম সংকটের সময়ে তিনি নিজের জাতির পাশে দাঁড়িয়েছেন নাকি শত্রুর পাশে দাঁড়িয়েছেন তার ওপর।
ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার চিনতে পারা
একাত্তরে কীভাবে ‘ইসলাম বিপন্ন’, ‘জয় বাংলা কাফেরী স্লোগান’, বা ‘বাংলাদেশ হলে মসজিদ ভেঙে মন্দির হবে’ জাতীয় উগ্র প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে একটি গণহত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, রইসী বেগমের বক্তব্যগুলো তার জ্বলন্ত প্রমাণ। বর্তমান প্রজন্মকে বুঝতে হবে যে, আজও একটি স্বার্থান্বেষী মহল একই কায়দায় ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়।
ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আর্কাইভাল লড়াই
আজ যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক অপশক্তি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয় ইতিহাস নিয়ে নানা ধরনের ধোঁয়াশা ও কুতর্ক তৈরি করতে চায়, তখন রইসী বেগমের মতো চরিত্রদের নথিবদ্ধ ইতিহাস তাদের মুখের ওপর সত্য প্রকাশ করে দেয়। তৎকালীন সংবাদপত্র, রেডিও ব্রডকাস্ট এবং আর্কাইভাল নথিই হলো ইতিহাস বিকৃতি রোধের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
একাত্তরের ইতিহাসে রইসী বেগমের অবস্থান ও ঐতিহাসিকের দায়ভার
ইতিহাস কোনো অন্ধ আবেগ বা বংশানুক্রমিক মর্যাদার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। ইতিহাস নিরপেক্ষ এবং নির্দয়ভাবে সত্যকে ধারণ করে।
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বাঙালি জাতির ইতিহাসে সূর্যসম এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর অবদানের ওপর ভিত্তি করেই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের রোপণ হয়েছিল। কিন্তু রইসী বেগম শেরে বাংলার রক্ত বহন করেও ১৯৭১ সালে ইতিহাস ও নিজ জাতির বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ান।
রইসী বেগমের এই অন্ধকার ভূমিকা আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উন্মোচন করে:
ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: কোনো মহান পিতার সন্তান হলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহান বা প্রগতিশীল হয়ে যায় না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আদর্শিক অবস্থান সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।
একাত্তরের অভ্যন্তরীণ শত্রু: মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির লড়াই কেবল পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ছিল না; দেশের ভেতরের প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগী এক শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধেও ছিল, যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের জাতির সাথে প্রতারণা করেছিল।
দলিলনির্ভর ইতিহাস চর্চা: রইসী বেগমের তৎকালীন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত বিবৃতিগুলো প্রমাণ করে যে, একাত্তরের অপপ্রচার কতটা গভীরে প্রবেশ করেছিল এবং কীভাবে নামীদামী পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার করে সামরিক জান্তা নিজের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করেছিল।
উপসংহার
বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং ২ লাখ মা-বোনের অসীম ত্যাগের বিনিময়ে। এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মতো মহান নেতার আদর্শ, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের জয় এবং বঙ্গবন্ধুর অকম্পিত নেতৃত্ব ছিল বাঙালির মূল প্রেরণা।
শেরে বাংলার কন্যা রইসী বেগম যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল ইতিহাস ও বাঙালি জাতির আকুতির সম্পূর্ণ বিপরীতে এক পথভ্রষ্টতা। তিনি শেরে বাংলার নাম ও রক্ত বহন করেও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঘৃণ্য এজেন্ডার ক্রীড়নক হয়েছিলেন।
আজ এত বছর পর, যখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তখন শেরে বাংলা ফজলুল হককে আমরা আমাদের হৃদয়ের গভীরে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। আর তাঁর কন্যা রইসী বেগমের নাম ইতিহাসের পাতায় সুরক্ষিত থাকে ১৯৭১ সালের সেইসব অন্ধকার চরিত্রের প্রতিনিধি হিসেবে যারা নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জন্মভূমির চেয়েও এক অত্যাচারী সামরিক রাষ্ট্রকে বেশি ভালোবেসেছিল। ইতিহাসের এই অমোঘ শিক্ষা ও দলিলি সত্যকে ধারণ করাই আধুনিক সচেতন বাঙালি জাতির মূল দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র:
দৈনিক আজাদ : ৮ মে ১৯৭১ : ২৪ বৈশাখ ১৩৭৮
দৈনিক আজাদ : ১২ এপ্রিল - ১৯৭১















