শেরে বাংলা কন্যা রইসী বেগম বাংলাদেশ বিরোধী ছিলেন?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এক অবিস্মরণীয় নাম। কৃষক-প্রজাদের মুক্তিদাতা এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের অগ্রদূত হিসেবে তিনি চিরকাল শ্রদ্ধার আসনে আসীন। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস এই যে, তাঁর পরিবারের সব সদস্য একই আদর্শ ধারণ করতে পারেননি। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর কন্যা রইসী বেগমের রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সম্পূর্ণ বিপরীতে ছিল।

TruthBangla
Dec 18, 2025
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এক অবিস্মরণীয় নাম। কৃষক-প্রজাদের মুক্তিদাতা এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের অগ্রদূত হিসেবে তিনি চিরকাল শ্রদ্ধার আসনে আসীন। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস এই যে, তাঁর পরিবারের সব সদস্য একই আদর্শ ধারণ করতে পারেননি। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর কন্যা রইসী বেগমের রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সম্পূর্ণ বিপরীতে ছিল। তাঁর দেওয়া বিবৃতিগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি কেবল পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসীই ছিলেন না, বরং তিনি সক্রিয়ভাবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এই প্রবন্ধে আমরা রইসী বেগমের সেই বিতর্কিত বিবৃতিসমূহ এবং তাঁর তৎকালীন রাজনৈতিক ভূমিকার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করব।
শেরে বাংলার উত্তরাধিকার ও বৈপরীত্য
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক আজীবন লড়াই করেছেন শোষণের বিরুদ্ধে। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের প্রবর্তক হিসেবে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতিতে থাকলেও বাঙালির স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। তবে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরদের মধ্যে কেউ কেউ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। রইসী বেগম ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালে যখন সমগ্র বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত, তখন রইসী বেগম ‘পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম’-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন।
২৬শে মার্চ ও ‘বিপদ মুক্তির’ বয়ান
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাঙালির ইতিহাসে সশস্ত্র প্রতিরোধের দিন। কিন্তু রইসী বেগমের কাছে এই দিনটির সংজ্ঞা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সামরিক জান্তার পক্ষাবলম্বন
সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে রইসী বেগম উল্লেখ করেন যে, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ছিল একটি ‘শত্রুপক্ষীয় ও যুদ্ধংদেহী শক্তির’ কবল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি জনগণের ‘বিপদ মুক্তির দিন’। উল্লেখ্য যে, এই ‘শত্রুপক্ষীয় শক্তি’ বলতে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতাকামী জনতাকেই বুঝিয়েছিলেন। যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তিনি একে বর্ণনা করেছিলেন মুসলমানদের প্রার্থনা কবুল হওয়ার মুহূর্ত হিসেবে।
ধর্মীয় উন্মাদনা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন
রইসী বেগমের বক্তব্যে উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। তিনি দাবি করেছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামের ‘জাতশত্রুদের’ সহায়তায় এই অঞ্চলকে ‘বিশ্বনাথ, কালী ও দুর্গার মন্দিরে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে’ লিপ্ত ছিলেন। তাঁর এই বক্তব্যটি ছিল সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক এবং তৎকালীন পাকিস্তানি প্রোপাগাণ্ডার অংশ। তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানেই হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতির বিনাশ।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান বনাম রইসী বেগমের প্রতিক্রিয়া
বাঙালির প্রাণের স্লোগান ‘জয় বাংলা’র বিপরীতে রইসী বেগমের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি একে পৌত্তলিকদের শ্লোগান হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
রইসী বেগম তাঁর বিবৃতিতে বলেছিলেন, “আল্লাহু আকবরের” স্থলে শেখ মুজিব পৌত্তলিকদের যুদ্ধের শ্লোগান “জয় বাংলা” আমদানি করেছিলেন। তিনি পাকিস্তানি ইসলামী জাতীয়তাবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর মতে, জয় বাংলা স্লোগানটি পাকিস্তানের পবিত্রতা নষ্ট করছিল।
ভারতের হস্তক্ষেপের অভিযোগ
তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মতো রইসী বেগমও বিশ্বাস করতেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের অসন্তোষের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে। তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেন এবং হুঁশিয়ারি দেন যে, পাকিস্তানের জনগণ এর ‘দাঁতভাঙ্গা জবাব’ দিতে জানে। এই বক্তব্যটি ছিল মূলত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মনোবল বাড়ানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল।
বাংলাদেশের পতাকা ও রইসী বেগমের ‘ক্ষোভ’
১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ ছাত্ররা যখন দেশব্যাপী বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেছিল, তখন তা পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী রইসী বেগমকে ক্ষুব্ধ করেছিল।
২৩শে মার্চের প্রতিক্রিয়া
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন যে, ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে সাত কোটি পূর্ব পাকিস্তানীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র বিশ্বের সকল ভাষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পারে, তাই বাঙালি জাতির জন্য আলাদা কোনো সার্বভৌম পরিচয়ের প্রয়োজন নেই।
আওয়ামী লীগের বিজয় ও প্রত্যাশা ভঙ্গ
রইসী বেগম স্বীকার করেছিলেন যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল একক বিজয়। তবে তিনি মনে করেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রেখেই ক্ষমতায় যাবেন। যখন আন্দোলনের মোড় স্বাধীনতার দিকে ঘুরে যায়, তখন তিনি একে ‘মরণ আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
রইসী বেগমের রাজনৈতিক পরিচয় - পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম
রইসী বেগম কেবল শেরে বাংলার কন্যা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না, তিনি ‘পাকিস্তান জমিয়তুল সিলম’ নামক একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এই সংগঠনটি মূলত পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা এবং ইসলামী জাতীয়তাবাদের প্রচারে কাজ করত। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ধরনের সংগঠনগুলো শান্তি কমিটির সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজাকারদের আদর্শিক ভিত্তি প্রদান করেছিল।
শেরে বাংলা কি রইসী বেগমের সাথে একমত হতেন?
শেরে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি সর্বদা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলতেন। অন্যদিকে রইসী বেগম সামরিক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খানের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। শেরে বাংলা ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা করেছিলেন, রইসী বেগম ১৯৭১ সালে এসে সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই ‘মন্দিরের সংস্কৃতি’ বলে গালি দিয়েছিলেন। এটি শেরে বাংলার আদর্শের প্রতি এক চরম বৈপরীত্য।
ইতিহাসের দায়মুক্তি নেই
ইতিহাস নির্মম। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মতো মহান নেতার রক্ত তাঁর শরীরে থাকলেও, ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে রইসী বেগমের ভূমিকা ছিল একজন আদর্শিক পাকিস্তানপন্থীর। তাঁর বিবৃতিগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন। আজ যখন আমরা শেরে বাংলাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি, তখন তাঁর কন্যার এই নেতিবাচক ভূমিকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের ভেতরেও একটি শক্তিশালী পক্ষ শত্রুসেনাদের সমর্থন যুগিয়েছিল। রইসী বেগম সেই অন্ধকার অধ্যায়েরই একজন সাক্ষী ও সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
তথ্যসূত্র:
দৈনিক আজাদ : ৮ মে ১৯৭১ : ২৪ বৈশাখ ১৩৭৮
দৈনিক আজাদ : ১২ এপ্রিল - ১৯৭১
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















