শেখ মুজিব কি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব চেয়েছিলেন নাকি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?
একটি গুরুত্বপূর্ণ (যদিও বিতর্কিত) দলিল হলো পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের জবানবন্দি। হামুদুর রহমান কমিশনের সামনে দেওয়া এই জবানবন্দিতে ইয়াহিয়া খান তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা এবং নিজের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর একটি আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। শেখ মুজিব কি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব চেয়েছিলেন নাকি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?

TruthBangla

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল এক অগ্নিগর্ভ ও প্রলয়ঙ্করী সময়। এক পিনাকপ্রতীম পর্বসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল পুরো বাঙালি জাতি। একদিকে সাড়ে সাত কোটি মানুষের দীর্ঘ দুই দশকের পুঞ্জীভূত শোষণ মুক্তির সনদ স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা; অন্যদিকে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও কায়েমী স্বার্থবাদী শাসকচক্রের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। সেই টালমাটাল ও রক্তাক্ত দিনগুলোতে পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক ক্ষমতার যে জটিল দাবার চাল খেলা হচ্ছিল, তার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যদিও চরম বিতর্কিত ও আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক দলিল হলো পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA) জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের জবানবন্দি।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চরম অপমানজনক ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বিপর্যয় ও অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। পরাজয়ের গ্লানি, কারণ অনুসন্ধান এবং অনুচ্ছাদীয় দায়ভার নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের সামনে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাঁর দীর্ঘ জবানবন্দি প্রদান করেন। এই জবানবন্দিতে তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা এবং স্বীয় সিদ্ধান্তসমূহের এক দীর্ঘ সাফাই গান।
ইয়াহিয়া খানের এই ঐতিহাসিক বয়ানে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে উঠে আসে, তা হলো:
শেখ মুজিব কি কেবল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব চেয়েছিলেন, নাকি তিনি শুরু থেকেই অখণ্ড পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্যেই অবিচল ছিলেন?
আজকের এই বিস্তারিত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আমরা হামুদুর রহমান কমিশনের সামনে দেওয়া জেনারেল ইয়াহিয়ার সেই জবানবন্দি পাঠ করব, সেখানে উপস্থাপিত দাবিগুলোর সত্যতা ও অসত্যতা ব্যবচ্ছেদ করব এবং অনুধাবন করার চেষ্টা করব কেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বোচ্চ পদ ও প্রলোভনসমূহকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দেওয়াকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

হামুদুর রহমান কমিশন ও ইয়াহিয়ার জবানবন্দি
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে পরাজয়ের পর সামরিক জান্তা ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরাজয়ের ভয়াবহ গ্লানিতে উন্মত্ত পাকিস্তানি জনগণ ও কনিষ্ঠ সামরিক অফিসারদের তীব্র চাপের মুখে ১৯৭১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ভুট্টো পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (যিনি বংশসূত্রে একজন বাঙালি ছিলেন) হামুদুর রহমান-এর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন ‘হামুদুর রহমান কমিশন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পরাজয়ের সামরিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক কারণসমূহ চিহ্নিত করা। এই কমিশনের সামনেই জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সাক্ষী হিসেবে হাজির হন এবং একটি লিখিত ও মৌখিক জবানবন্দি পেশ করেন।
পরাজিতের সাফাই গাথা: জেনারেল ইয়াহিয়ার জবানবন্দিটি ছিল মূলত একজন পরাজিত, কোণঠাসা এবং বিভ্রান্ত সামরিক শাসকের নিজেকে বাঁচানোর চরম আকুতি। জবানবন্দিতে ইয়াহিয়া নিজেকে তুলে ধরেছিলেন একজন "অসহায়, সরল ও সংহতিপ্রেমী কমান্ডার" হিসেবে, যিনি নাকি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও রক্ষা নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন একজন "অনমনীয়, অতি-জাতীয়তাবাদী ও রাষ্ট্রদ্রোহী" নেতা হিসেবে, যিনি নাকি শুরু থেকেই পাকিস্তান ভেঙে ফেলার একটি সূক্ষ্ম ছক এঁকেছিলেন। ইয়াহিয়া দাবি করেন যে, তিনি রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেখ মুজিবের অবাস্তব শর্ত ও একগুঁয়েমি তাকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছিল।
তবে ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ দলিল, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথিপত্র এবং তৎকালীন পাকিস্তানি শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্মারকগ্রন্থ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইয়াহিয়ার এই জবানবন্দি ছিল মূলত নিজের সামরিক অজ্ঞতা, রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও ২৫শে মার্চের গণহত্যার পরিকল্পনাকে ঢাকার এক চতুর মনস্তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা।
প্রলোভন বনাম নীতি: বঙ্গবন্ধুর আপসহীন অবস্থান
জেনারেল ইয়াহিয়ার জবানবন্দির অন্যতম প্রধান ও রোমাঞ্চকর দাবি ছিল যে, তিনি শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার বিনিময়ে ক্ষমতা ও পদের নানা প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় এসে ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে প্রকাশ্যে "পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রী" হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রলোভন: ইয়াহিয়ার ভাষ্যমতে, তিনি শেখ মুজিবকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পাকিস্তান শাসনের আইনি ও নৈতিক অধিকার আওয়ামী লীগেরই। তিনি মুজিবকে বলেছিলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা ও ৬-দফার অনমনীয় ধারা ত্যাগ করে মূলধারার রাজনীতিতে এসে সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে।
কিন্তু ইয়াহিয়া খেয়াল করেননি বা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন ক্ষমতার লোভী রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি নিপীড়িত জাতির অবিসংবাদিত মহাকাব্যিক নেতা। বঙ্গবন্ধু খুব ভালো করেই জানতেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সিভিল-সামরিক আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রকাঠামোয় বাঙালি প্রধানমন্ত্রী কেবলই একজন ঠুঁটো জগন্নাথ বা পুতুল শাসক বৈ অন্য কিছু হবেন না।
এর আগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বা খাজা নাজিমুদ্দিনদের মতো প্রথীতযশা বাঙালি নেতারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব করেছিলেন, কিন্তু সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণি তাঁদের মুহূর্তের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। তাই বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন:
"আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি এদেশের মানুষের অধিকার চাই।"

উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের (DCMLA) কুটিল প্রস্তাব
জবানবন্দিতে ইয়াহিয়া আরও উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক সংকটকালীন সময়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার জন্য তিনি শেখ মুজিবকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার পূর্বেই ‘ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ বা উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
ইয়াহিয়ার মতে, এটি ছিল সামরিক শাসক ও নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির এক অভূতপূর্ব ও উদার সুযোগ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই প্রস্তাবকে তাৎক্ষণিকভাবে এবং চরম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, এটি ছিল সামরিক জান্তার পাতা এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিষাক্ত ফাঁদ। সামরিক শাসনের অংশীদার হলে একদিকে যেমন তিনি সাধারণ বাঙালির চোখে স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত হবেন, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর অপকর্ম ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের দায়ভারও আওয়ামী লীগের ওপর এসে পড়বে। ফলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সামরিক আইনের অধীনে কোনো পদ গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়; ক্ষমতা হস্তান্তর হতে হবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।
১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে উত্তাল মার্চ
১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনই মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রের কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। এই নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের মোট ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে (সংরক্ষিত নারী আসনসহ ১৬৭টি) একক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP) লাভ করে মাত্র ৮১টি আসন।
নির্বাচনের পর স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নিয়ম ছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকার গঠন করতে দেওয়া এবং ৬-দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকচক্র যার মধ্যে ছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বাঙালিদের এই বিজয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি।
'আইনি কাঠামো আদেশ' (LFO): নির্বাচনের পূর্বে জেনালের ইয়াহিয়া খান 'লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার' বা LFO জারি করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় সংসদে তৈরি যেকোনো সংবিধানকে ভিটো দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে রাখা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আশা করেছিল যে নির্বাচনে কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং উপদলীয় কোন্দল সৃষ্টি করে তারা ক্ষমতার চাবিকাঠি নিজেদের হাতে রাখতে পারবে। কিন্তু ৬-দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের এই নিরঙ্কুশ বিজয় সামরিক জান্তার সমস্ত সমীকরণ উল্টে দেয়।
উত্তাল ফেব্রুয়ারি, অধিবেশন স্থগিতকরণ ও ভুট্টোর ষড়যন্ত্র
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তীব্র সংকটময় রূপ ধারণ করে। ৩রা মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন রাষ্ট্রপতি প্রতিক্রিয়াশীল গণচাপের মুখে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের একক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করেন।
ভুট্টোর হুমকি: ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ তারিখে লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো হুমকি দিয়ে ঘোষণা করেন যে, তাঁর দল পিপিপি ৩রা মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবে না। তিনি অত্যন্ত উসকানিমূলক ভাষায় বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো সদস্য যদি ঢাকায় অধিবেশনে যোগ দিতে যায়, তবে Peshawar to Karachi পর্যন্ত আগুন জ্বলবে এবং তাদের লাঞ্ছিত করা হয় পা ভেঙে দেওয়া হবে। ভুট্টো দাবি তোলেন, জাতীয় পরিষদে আলোচনার পূর্বেই ৬-দফার বিষয়ে বোঝাপড়া বা ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি হতে হবে।
ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্ত: ভুট্টোর এই উসকানিমূলক হুমকিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ দুপুর ১টায় জেনারেল ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ৩রা মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
এই সিদ্ধান্তটি ছিল বাংলা ও বাঙালির পিঠে এক চূড়ান্ত ছুরি মারা। ১লা মার্চের এই ঘোষণার সাথে সাথেই ঢাকার রাজপথ উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। স্টেডিয়ামে চলতে থাকা ক্রিকেট খেলা ভেঙে দর্শকরা রাস্তায় নেমে আসে। সাধারণ জনগণ পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্লোগান দিতে শুরু করে।
ভুট্টোর প্রতিক্রিয়া: হামুদুর রহমান কমিশনের জবানবন্দিতে তৎকালীন ঘটনাবলীর বিবরণে উঠে আসে যে, অধিবেশন স্থগিত করার পর ২রা ও ৩রা মার্চ করাচিতে ভুট্টোর সাথে যখন ইয়াহিয়ার গোপন বৈঠক হয়, তখন অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে ভুট্টো ইয়াহিয়াকে বলেছিলেন:
"জেনারেল, আপনি পাকিস্তানকে বাঁচালেন।"
বাস্তবে, অধিবেশন স্থগিতের ওই একটি মাত্র সিদ্ধান্তই অখণ্ড পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল এবং বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
ঢাকার রাজপথে বিদ্রোহ: পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারানো
১লা মার্চের পর থেকে ২৫শে মার্চ রাত পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবে জেনারেল ইয়াহিয়ার সিভিল প্রশাসনের হাতছাড়া হয়ে যায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবন থেকে শেখ মুজিবুর রহমান যে নির্দেশ জারি করতেন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি সরকারি, আধা-সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, আদালত এবং পুলিশ প্রশাসন হুবহু তা পালন করত।
অসহযোগ আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্য: বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২রা মার্চ থেকে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পূর্ব পাকিস্তানের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি. এ. সিদ্দিকী তৎকালীন নবনিযুক্ত সামরিক গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে শপথ পাঠ করাতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানান।
সচিবালয়ের পিয়ন থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ সচিব, পুলিশ বাহিনী এবং রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীরা পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে চলতে শুরু করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব কেবল সেনানিবাস বা ক্যান্টনমেন্টের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
৭ই মার্চের মহাকাব্যিক ঘোষণা: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি একাধারে রক্তপাত এড়িয়ে রাজনৈতিক সমাধানের চার শর্ত (সামরিক শাসন প্রত্যাহার, সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, গণহত্যার তদন্ত ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর) দেন, অন্যদিকে জাতিকে চূড়ান্ত সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন:
"রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব-এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"
ইয়াহিয়া খান তাঁর জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন যে, ৭ই মার্চের পর পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের সার্বভৌমত্ব ও শাসনব্যবস্থা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না; সেখানে কার্যত শেখ মুজিবের একচ্ছত্র দে-ফ্যাক্টো শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
মুজিব-ইয়াহিয়া চূড়ান্ত বৈঠক
১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যবর্তী সময়ে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে (বর্তমান সুগন্ধা) পাকিস্তান সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে কয়েক দফা উচ্চপর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গড়িমসি এবং ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রেক্ষাপটে এই আলোচনার সূচনা ঘটে।
পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত জবানবন্দি ও নথিপত্রে ইয়াহিয়া এই বৈঠকগুলোর বিবরণ তুলে ধরেন অত্যন্ত নাটকীয় ও নেতিবাচকভাবে। তিনি দাবি করেন, আলোচনায় শেখ মুজিব তাঁর রাজনৈতিক দাবি ও শর্তগুলো অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল স্পষ্ট ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাওয়া জনগণের রায় ও ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা এবং অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। সামরিক জান্তা এই আলোচনাকে মূলতঃ কালক্ষেপণ এবং পূর্ব পাকিস্তানে সেনা মোতায়েন জোরদার করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
পৃথক অধিবেশনের দাবি
আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত মোড় ছিল জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান সংক্রান্ত প্রস্তাব। মুজিব দাবি করেছিলেন যে, জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন দুটি পৃথকভাগে বসতে হবে। প্রথম অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা ঢাকায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদ বা রাওয়ালপিন্ডিতে পৃথকভাবে বসে স্ব-স্ব অঞ্চলের জন্য খসড়া শাসনতন্ত্র ও প্রস্তাবনা তৈরি করবেন। পরবর্তীতে উভয় অংশের প্রতিনিধিরা একত্রে বসে মূল সংবিধান চূড়ান্ত করবেন।
ইয়াহিয়ার দৃষ্টিতে এই দাবিটি ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের অবসান, কার্যত দুটি পৃথক রাষ্ট্রের রূপরেখা অথবা একটি কনফেডারেশনের সূচনা। কিন্তু বাঙালি নেতৃত্ব ও শেখ মুজিবের জন্য এটি ছিল দীর্ঘকালের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তি পেয়ে স্বায়ত্তশাসন অর্জনের শেষ কূটনৈতিক সুযোগ। পাকিস্তানি কেন্দ্রমুখী শাসন ব্যবস্থার অধীনতা মেনে না নেওয়ার এই কৌশলই দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যবধান পরিষ্কার করে দেয়।
কনফেডারেশন প্রস্তাব
আলোচনা যত অগ্রসর হচ্ছিল, সংকট সমাধানের পথ তত জটিল হয়ে উঠছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে মুজিব প্রস্তাব দেন যে, একক কেন্দ্রশাসিত ‘ফেডারেশন’-এর পরিবর্তে পাকিস্তান একটি ‘কনফেডারেশন’ হতে পারে। এই কাঠামোর মূল কথা ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দুটি আলাদা স্বাধীন প্রশাসনিক ও সার্বভৌম সত্তা হিসেবে থাকবে, তবে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং মুদ্রানীতির মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি সীমিত বিষয়ে তাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি থাকবে।
ইয়াহিয়ার মতে, এই প্রস্তাবটি ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা, কারণ এটি ছিল একটি রাষ্ট্রের জায়গায় দুটি আলাদা রাষ্ট্রের কাঠামোগত রূপান্তর। শেখ মুজিব তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করে স্পষ্ট ভাষায় ইয়াহিয়াকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, গত ২৪ বছরের শোষণ ও বৈষম্যের পর বাঙালিরা আর কোনোভাবেই আগের মতো পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও সিভিল আমলাতন্ত্রের অধীনে থাকতে প্রস্তুত নয়। মুজিব স্পষ্ট ভাষায় ইয়াহিয়াকে বলেছিলেন,
"বাঙালিরা আগের মতো পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে পারবে না।"
সেনাবাহিনী বিলুপ্তির হুমকি
পরবর্তী সময়ে নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে দেওয়া জবানবন্দিতে জেনারেল ইয়াহিয়া একটি চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, শেখ মুজিব তাঁকে বলেছিলেন যে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান হলেও তাঁর সরকারের প্রাথমিক কাজগুলোর একটি হবে দেশের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট মারাত্মকভাবে কাটছাঁট করা এবং ক্রমান্বয়ে বর্তমান সেনাবাহিনী কাঠামোকে বিলুপ্ত বা পুনর্গঠিত করা।
ইয়াহিয়ার মতে, প্রতিরক্ষা খাতের এই বাজেট সংকোচন ছিল পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক শক্তি ও অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি। তবে প্রকৃতপক্ষে, বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব চেয়েছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সামরিক জান্তার প্রভাবমুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ বেসামরিক ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে।
সামরিক বাজেটের একটি বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব থেকে নেওয়া হলেও বাঙালিদের সেনাবাহিনীতে প্রতিনিধিত্ব ছিল নগন্য। তাই বিশাল সামরিক ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা, কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেই বাজেট বরাদ্দের যে দর্শন বঙ্গবন্ধুর ছিল, তা পাকিস্তানি সামরিক কর্তাদের কাছে সেনাশক্তি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলে মনে হয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে সামরিক আক্রমণ চালিয়ে আলোচনার সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
২৫শে মার্চ: আলোচনার টেবিলে ষড়যন্ত্র ও 'অপারেশন সার্চলাইট'
১৪ই মার্চ থেকে ২৪শে মার্চ পর্যন্ত ঢাকার বঙ্গভবনে যখন আলোচনার নাটক চলছিল, তখন বঙ্গভবনের বাইরে সামরিক শাসকচক্র তৈরি করছিল এক ভয়াবহ গণহত্যার নীল নকশা। আলোচনার নামে ইয়াহিয়ার প্রধান কৌশল ছিল সময়ক্ষেপণ করা।
ইয়াহিয়া খান তাঁর জবানবন্দিতে দাবি করেছেন যে, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছিলেন। কিন্তু ২৫শে মার্চ রাতে তিনি যখন গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন তিনি সেনাবাহিনীকে "ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগের" মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ দিয়ে যান।
ইয়াহিয়ার এই "ন্যূনতম শক্তি" ছিল ইতিহাসে অন্যতম নিকৃষ্টতম গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’। তাঁর জবানবন্দিতে তিনি নির্লজ্জভাবে দাবি করেছেন যে, তিনি মুজিবের কোনো শারীরিক ক্ষতি না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রাতেই হাজার হাজার নিরপরাধ বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।
সময়ক্ষেপণের কারণ: পাকিস্তান সেনাবাহিনী তখন পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র একটি পদাতিক ডিভিশন (১৪তম ডিভিশন) নিয়ে অবস্থান করছিল। এত অল্প সৈন্য দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে দমন করা অসম্ভব ছিল। তাই আলোচনার টেবিল সচল রেখে ইয়াহিয়া খান সমুদ্রপথে 'এমভি সোয়াত' জাহাজে করে অস্ত্র এবং বিমানযোগে (শ্রীলঙ্কা ঘুরে) পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৯ম ও ১৭তম পদাতিক ডিভিশনের হাজার হাজার সৈন্য ও গোলাবারুদ ঢাকায় নিয়ে আসেন।
পৈশাচিক গণহত্যার সূচনা: ২৪শে মার্চ রাতের মধ্যেই সামরিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়। ২৫শে মার্চ বিকেলে রাজনৈতিক আলোচনার কোনো আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি না টেনে, কাউকে কিছু না জানিয়ে প্রেসিডেন্ট জেনালের জিয়াউর রহমান বা সংহতির কোনো বার্তা না দিয়ে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে বোয়িং বিমানে করাচির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
উড্ডয়নের পূর্বে তিনি জেনারেল তিক্কা খানকে রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান শুরু করার সবুজ সংকেত দিয়ে যান।
রাত ১১টা ৩০ মিনিটে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যারাকে থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ইডিআর সদর দপ্তর ও ধানমন্ডি সহ পুরো ঢাকায় একযোগে পৈশাচিক হামলা চালায়। শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম বর্বরতম গণহত্যা 'অপারেশন সার্চলাইট'।
২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে (২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে) পাক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়ারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন:
"দিস মে বি মাই লাস্ট মেসেজ, ফ্রম টুডে বাংলাদেশ ইজ ইন্ডিপেন্ডেন্ট..." (এটিই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন...)
ইয়াহিয়ার জবানবন্দির ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদ
হামুদুর রহমান কমিশনের সামনে দেওয়া জেনারেল ইয়াহিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক দাবিগুলো এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও দলিলভিত্তিক বাস্তবতার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান ছিল, তা নিচের তুলনামূলক সারণিতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো:
বিষয়ে পর্যালোচনা | জেনারেল ইয়াহিয়ার জবানবন্দির দাবি | ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিলভিত্তিক বাস্তবতা |
নিজের ভূমিকা ও রাজনৈতিক মনোভাব | তিনি একজন সরল বিশ্বাসী ও অসহায় কমান্ডার ছিলেন, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছিলেন। | আলোচনার নামে তিনি মূলত সময়ক্ষেপণ করছিলেন, যাতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনা ও গোলাবারুদ এনে ২৫শে মার্চের গণহত্যা চালানো যায়। |
বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব | তিনি শেখ মুজিবকে অখণ্ড পাকিস্তানের 'প্রধানমন্ত্রী' হওয়ার উদার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু মুজিব তা প্রত্যাখ্যান করেন। | বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন পরাধীন সামরিক কাঠামোর অধীনে প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানে জনগণের সাথে প্রতারণা ও পুতুল শাসকে পরিণত হওয়া। |
উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (DCMLA) পদ | তিনি ক্ষমতা ভাগাভাগির জন্য শেখ মুজিবকে DCMLA পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা দেশ গঠনে সহায়ক হতো। | সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধ্বংস করার জন্য এটি ছিল সামরিক জান্তার পাতা এক বিষাক্ত ফাঁদ। |
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতকরণ | ৩রা মার্চের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছিল প্রধান বিরোধী দল পিপিপির সাথে আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য। | এটি ছিল ভুট্টোর চক্রান্ত ও সামরিক বাহিনীর বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কৌশলগত চক্রান্তের ফসল, যা আন্দোলন উসকে দেয়। |
কনফেডারেশন ও দুই কমিটির প্রস্তাব | শেখ মুজিব দুই কমিটির মাধ্যমে মূলত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান ভেঙে 'কনফেডারেশন' বা স্বাধীন বাংলা গঠন করতে চেয়েছিলেন। | আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত 'কনফেডারেশন' ছিল গৃহযুদ্ধ ও রক্তপাত এড়িয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে আইনি ক্ষমতা হস্তান্তরের শেষ সুযোগ। |
প্রতিরক্ষা বাজেট ও সেনাবাহিনী বিলুপ্তি | মুজিব অখণ্ড পাকিস্তানের ক্ষমতা পেলে সেনা বাজেট কাটছাঁট ও প্রতিরক্ষা বাহিনী বিলুপ্ত করার হুমকি দিয়েছিলেন। | আওয়ামী লীগ মূলত সামরিক খাতের শোষণের অবসান ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সিভিল প্রশাসনে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে চেয়েছিল। |
২৫শে মার্চের সামরিক পদক্ষেপ | তিনি দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে বাঁচাতে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে "ন্যূনতম শক্তি" (Minimum Force) প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। | 'ন্যূনতম শক্তি' প্রয়োগের নামে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম ও পরিকল্পিত 'গণহত্যা' (Genocide) চালানো হয়েছিল। |
কেন শেখ মুজিব পাকিস্তানি প্রস্তাব ও ক্ষমতার প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?
ইতিহাসের এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর অনেক নেতাই হয়তো অখণ্ড দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর পদের মোহ সংবরণ করতে পারতেন না। কিন্তু শেখ মুজিব কেন তা করেছিলেন? এর পেছনে তিনটি মূল মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণ বিদ্যমান ছিল:
গভীর আস্থার সংকট ও ইতিহাস থেকে পাঠ: শেখ মুজিব পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৩ বছরের ইতিহাস খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান সবক্ষেত্রেই পাকিস্তানি আমলাতন্ত্র বাঙালি নেতৃত্বকে বারবার প্রতারিত করেছিল।
বঙ্গবন্ধু জানতেন যে, সামরিক বাহিনীর অধীনে প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানে কেবল নামমাত্র খেতাব পাওয়া। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থাকবে মূলত রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলদের হাতে। ফলে এই ধরনের ক্ষমতা গ্রহণ বাঙালির মুক্তির স্থায়ী সমাধান হতে পারত না।
৬-দফার নির্বাচনী ম্যান্ডেটের পবিত্রতা: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একলা চলো নীতিতে ৬-দফার ওপর ভিত্তি করে ভোট চেয়েছিল। বাংলার জনগণ আওয়ামী লীগকে যে নিরঙ্কুশ ভোট দিয়েছিল, তা ছিল মূলত ৬-দফার পক্ষে এক ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট।
প্রধানমন্ত্রিত্বের মোহে পড়ে ৬-দফার কাটছাঁট করা বা সামরিক জান্তার সাথে আপস করার অর্থ হতো সাড়ে সাত কোটি বাঙালির রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। শেখ মুজিব ছিলেন নীতিতে অটল এক অনন্য রাষ্ট্রনায়ক; তিনি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে জনগণের দেওয়া আমানতকে বড় মনে করেছিলেন।
সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা: মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে আন্দোলন আর কেবল বঙ্গবন্ধুর একক নিয়ন্ত্রণে ছিল না; এটি সাধারণ মানুষের গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। ১লা মার্চের পর থেকে ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বাঙালির ঘরে ঘরে স্বাধীনতার লালিত স্বপ্ন এক পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করেছিল।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলা এমন এক মানসিক বিন্দুতে পৌঁছেছিল, যেখান থেকে পিছিয়ে এসে অখণ্ড পাকিস্তানের অধীনে থাকা যেকোনো স্বায়ত্তশাসন বা পদবী সাধারণ মানুষ মেনে নিত না। শেখ মুজিব জনগণের সেই স্পন্দন পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
বিশ্লেষণের দর্পণে ইয়াহিয়ার জবানবন্দি
ইয়াহিয়া খানের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল পরাজয়ের পর নিজের পিঠ বাঁচানোর একটি দলিল। তিনি দায় চাপাতে চেয়েছেন শেখ মুজিবের ওপর এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর ষড়যন্ত্রের ওপর। অথচ তিনি নিজেই ছিলেন এই পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক।
অসহায়ত্বের অভিনয়: ইয়াহিয়া নিজেকে অসহায় দেখিয়েছেন, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ২৫শে মার্চের গণহত্যার নীল নকশা তাঁর নেতৃত্বেই তৈরি হয়েছিল।
মুজিবের দূরদর্শিতা: ইয়াহিয়ার দেওয়া তথাকথিত প্রলোভনগুলো যে আসলে ফাঁদ ছিল, তা বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বের চেয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন।
ঐতিহাসিক অনিবার্যতা: ইয়াহিয়া দাবি করেছেন যে মুজিব "মুখ ফসকে" স্বাধীনতার কথা বলে ফেলেছিলেন। আসলে সেটি মুখ ফসকে বলা ছিল না, সেটি ছিল সাত কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ।
একটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়
জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হামুদুর রহমান কমিশনের জবানবন্দি পাঠ করলে একটি সত্য অতি পরিষ্কার হয়ে ওঠে: একাত্তরের সেই সংকটময় দিনগুলোতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও রাজনৈতিক অভিজাতরা বাঙালি জাতির রাজনৈতিক চেতনা ও আত্মত্যাগের মানসিকতাকে বিন্দুমাত্র পরিমাপ করতে পারেনি। তারা মনে করেছিল, ক্ষমতার লোভ, প্রধানমন্ত্রীর পদের টোপ অথবা সামরিক বুটের ভয় দেখিয়ে বাঙালিকে দমন করে রাখা যাবে।
কিন্তু তাঁদের সেই হিসাব নিকাশ ভুল প্রমাণিত করে দিয়েছিলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি অখণ্ড পাকিস্তানের ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে বেছে নিয়েছিলেন কণ্টকাকীর্ণ স্বাধীনতার পথ। ইয়াহিয়ার জবানবন্দিতে শেখ মুজিবকে যেভাবে "একগুঁয়ে, অনমনীয় ও কৌশলবিদ" হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, তা মূলত একটি পরাজিত শাসকের চোখে বিজয়ী রাষ্ট্রনায়কের অটল হিমাদ্রি সদৃশ ব্যক্তিত্বেরই অসংকোচ স্বীকৃতি।
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত সেই স্বাধীনতা সংগ্রাম নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের রূপ নেয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং ২ লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় লাল-সবুজের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল এ. কে. নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছিলেন, তখন হামুদুর রহমান কমিশনের সামনে দেওয়া জেনারেল ইয়াহিয়ার সেই "অসহায়ত্ব" ও অপকৌশল ইতিহাসের আণবিক ছাইয়ে পরিণত হয়েছিল। আর অন্যদিকে, ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনা শেখ মুজিবুর রহমান স্থান করে নিয়েছিলেন বিশ্ব ইতিহাসের অমর নায়কদের সারিতে।















