একাত্তরের উত্তাল মার্চ - শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কৌশল বনাম সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র বিপ্লব
১৯৭১ সালের ১ মার্চ। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন এক রেডিও ভাষণে জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন, তখন ঢাকার রাজপথ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাধারণ মানুষের মনে তখন একটিই প্রশ্ন মুক্তির উপায় কী? এই উত্তাল সময়ে রাজনীতির ময়দানে দুটি ভিন্ন ধারা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। সারা দেশে চলছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক অসহযোগ আন্দোলন, অন্য ছোট একটি ধারা ছিল সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি। এদের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি ইতিহাসের এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় পাঠ।

TruthBangla
Jan 3, 2026
১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চ ছিল বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের লড়াই, অন্যদিকে রাজপথে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা - এই দুইয়ের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির। একদিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যদিকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে মুক্তির স্বপ্নে বিভোর বামপন্থী কমিউনিস্ট বিপ্লবী সিরাজ সিকদার। এই দুই মেরুর রাজনীতির মাঝে এক রুদ্ধশ্বাস সময় পার করছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন এক রেডিও ভাষণে জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন, তখন ঢাকার রাজপথ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই ঘোষণা ছিল বাংলার মানুষের পিঠে ছুরিকাঘাতের শামিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা না ছাড়ার এই টালবাহানা মুহূর্তেই ঢাকাকে এক রণক্ষেত্রে পরিণত করে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, স্লোগান ওঠে "বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।"
সাধারণ মানুষের মনে তখন একটিই প্রশ্ন মুক্তির উপায় কী? এই উত্তাল সময়ে রাজনীতির ময়দানে দুটি ভিন্ন ধারা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। সারা দেশে চলছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক অসহযোগ আন্দোলন, অন্য ছোট একটি ধারা ছিল সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি। এদের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি ইতিহাসের এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় পাঠ।
আজকের এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সিরাজ সিকদারের ঐতিহাসিক ইশতেহার, বঙ্গবন্ধুর কমিউনিস্ট ভীতি এবং ভিয়েতনাম স্টাইলে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু অজানা বা স্বল্পালোচিত দিক।
মার্চের উত্তাল দিন এবং সিরাজ সিকদারের রণকৌশল
১ মার্চ যখন পাকিস্তান সরকার আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয়, তখনই পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন (EBWM)-এর নেতা সিরাজ সিকদার বুঝতে পেরেছিলেন যে, আলোচনার মাধ্যমে আর কিছু পাওয়া সম্ভব নয়।
২ মার্চ সিরাজ সিকদার একটি ইশতেহার জারি করেন। এটি ছিল তৎকালীন রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সাহসী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। পল্টন ময়দানের এক জনসভায় সিরাজ সিকদার শেখ মুজিবকে সরাসরি প্রস্তাব দেন - এখন আর আলোচনার সময় নেই, বরং অবিলম্বে একটি 'অস্থায়ী বিপ্লবী জোট সরকার' গঠন করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করতে হবে। সেই ইশতেহারে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখেন:
সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করা: কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে সশস্ত্র যুদ্ধের ডাক দেওয়া।
অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠন: সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সরকার গঠন করা যারা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে।
জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিষদ গঠন: একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করা।
সিরাজ সিকদারের প্রস্তাব ছিল পরিস্থিতির এক চরমপন্থী বিশ্লেষণ। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তানি জান্তা কখনোই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। কিন্তু তখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য ছিল নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ। কারণ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগ নেতারা সশস্ত্র কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে সারা বিশ্বের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা হারাতে চাচ্ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব ছিল এই যে, তিনি সেই যুদ্ধকে কেবল একটি 'গেরিলা বিদ্রোহ' হিসেবে না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ' হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
তবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী (Volunteer Force) এবং পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (EPR)-এর অনেক দেশপ্রেমিক সদস্য গোপনে স্বাধীনতার সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরই কিছু স্থানে পুলিশ বা আনসার সদস্যদের সহায়তায় মৌলিক অস্ত্রচালনা শেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। 'একাত্তরের দিনগুলি' (জাহানারা ইমাম) এবং 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র'-এ এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর রফিকুল ইসলাম, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং অন্য অনেক দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা ২৫ মার্চের আগেই পূর্ববাংলার ইউনিটগুলোকে গোপনে স্বাধীনতার সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য মানসিক ও সামরিকভাবে প্রস্তুত করছিলেন।মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি সেনা ও ইপিআর সদস্যরা গোপনে অস্ত্র ও গুলি নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এই কৌশলগত নিয়ন্ত্রণই ২৫ মার্চের পরে দ্রুততম সময়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈপরীত্য - সিরাজ বনাম তৎকালীন অন্য নেতারা
একাত্তরের সেই সংকটে একটি অদ্ভুত চিত্র লক্ষ্য করা যায়। একদিকে সিরাজ সিকদার যখন সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিচ্ছেন, অন্যদিকে তখনকার রক্ষণশীল এবং পাকিস্তানপন্থী নেতারা (যারা পরবর্তীকালে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হন) ইয়াহিয়া খানকে অনুরোধ করছিলেন যেন তিনি মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন।
সেদিনের সংবাদপত্রগুলোর পাতা উল্টালে দেখা যায়, মুসলিম লীগের সবুর খান থেকে শুরু করে জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম পর্যন্ত প্রায় সব রাজনৈতিক নেতাই ইয়াহিয়াকে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন যেন তিনি শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। অর্থাৎ, অধিকাংশ রাজনৈতিক পক্ষই তখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা করছিল।
গোলাম আযম ও সবুর খান: তৎকালীন নথিপত্র এবং সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, মুসলিম লীগ ও জামায়াত নেতারাও এক পর্যায়ে ইয়াহিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন তারা চেয়েছিলেন অখণ্ড পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে।
সিরাজের ভিন্নতা: সিরাজ সিকদার জানতেন, এই আবেদন-নিবেদনের সময় শেষ হয়ে গেছে। তিনি শেখ মুজিবকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু মুজিব তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ মুজিবের কৌশল ছিল বিশ্ব জনমত গঠন করা এবং রাজনৈতিকভাবে জয়ী হওয়া, যাতে পাকিস্তান বিশ্বদরবারে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়। শেখ মুজিবের এই সিদ্ধান্তের কারণে বাঙালিদের প্রতি সারা বিশ্বের সহানুভূতি বজায় থাকে এবং পাকিস্তান পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে চাপের মধ্যে থাকে।
সিরাজ সিকদার মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী আদর্শের অনুসারী হিসেবে বিশ্বাস করতেন যে, সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছে সামরিক প্রস্তুতির জন্য। তবে শেখ মুজিব তখন সিরাজের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। এর পেছনে কাজ করেছিল তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন এবং তৎকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা।
বঙ্গবন্ধু ও চীনপন্থী কমিউনিস্টদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব
বঙ্গবন্ধুর সাথে সিরাজ সিকদার বা অন্যান্য চীনপন্থী কমিউনিস্টদের দূরত্বের একটি ঐতিহাসিক কারণ ছিল। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের সময় থেকেই আওয়ামী লীগ এবং কমিউনিস্ট কর্মীদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল।
মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে শেখ মুজিব কমিউনিস্টদের প্রতি তাঁর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সত্তরের নির্বাচনে জয়লাভের পরও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ নেতা এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্য চীনপন্থী কমিউনিস্ট উগ্রবাদীদের হাতে নিহত হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মুজিব বলেছিলেন "এরপর আমার একজন লোক মরবে, আমি ওদের তিনজনকে মারব।"
এই ক্ষোভের কারণেই সিরাজ সিকদারের প্রস্তাব গ্রহণ করা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সম্ভব ছিল না। একদিকে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে উগ্র বামপন্থী শক্তির উত্থান এই দুই ফ্রন্টে লড়াই করার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। মুজিব মনে করতেন, বামপন্থীদের হাতে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যাবে।
ভিয়েতনাম স্টাইল গেরিলা যুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সতর্কতা
সিরাজ সিকদার চেয়েছিলেন ভিয়েতনামের স্টাইলে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই 'ভিয়েতনামাইজেশন'-এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৭০-এর জুনে মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো টেলিগ্রাম থেকে জানা যায়, শেখ মুজিব ভিয়েতনামি স্টাইলের দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি জানতেন, ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধে জড়ালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতির ফুটবল হয়ে উঠতে পারে এবং কমিউনিস্টদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
কেন তিনি ভিয়েতনাম মডেল চাননি?
কমিউনিস্ট প্রাধান্য: ভিয়েতনামে গেরিলা যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ছিল কমিউনিস্টরা। মুজিব ভয় পাচ্ছিলেন যে, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব তাঁর হাত থেকে চলে গিয়ে বামপন্থীদের হাতে চলে যাবে।
মানবিক বিপর্যয়: ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং দীর্ঘ সময় (দশকের পর দশক) লড়াই করার মতো ধৈর্য বা সক্ষমতা সাধারণ জনগণের থাকবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন।
আমেরিকান পেপারস (Source: The American Papers, p.367)-এ উল্লিখিত মুজিবের উদ্ধৃতিটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
"যদি সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং স্বার্থান্বেষী মহল এই খেলা চালিয়ে যেতে থাকে, তবে আমি স্বাধীনতার ঘোষণা দেব এবং গেরিলা যুদ্ধের ডাক দেব... মূলত কমিউনিস্টদের হাতে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার ভয়ই আমাকে এতকাল ধৈর্যশীল করে রেখেছে।"
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাবে। তিনি জানতেন, উগ্র বামপন্থা অবলম্বন করলে ভারত বা পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ কি ভিয়েতনাম হতে পারত?
ভিয়েতনামের যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি কাঠামোগত পার্থক্য ছিল। ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের পরিস্থিতির তুলনা করা হতো। কিন্তু ২৭ জুলাই, ১৯৭১-এর দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এ একটি চমৎকার বিশ্লেষণ ছাপা হয়, যেখানে দেখানো হয় কেন বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম এক নয়।
বৈশিষ্ট্য | দক্ষিণ ভিয়েতনাম | পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) |
সৈন্য সংখ্যা | ১০ লাখ স্থানীয় সৈন্য + আমেরিকান বাহিনী | মাত্র ৬০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য |
জনসংখ্যার সমর্থন | ১৭ মিলিয়ন (অনেকে সরকারের সমর্থক ছিল) | ৭৫ মিলিয়ন (পুরো জনপদ শত্রুতাপূর্ণ) |
ভৌগোলিক অবস্থান | সরবরাহ পথ জটিল ছিল | ভারতের তিনদিকে বেষ্টিত (গেরিলাদের জন্য স্বর্গ) |
সরবরাহ রুট | স্থানীয় সরবরাহ ছিল | পাকিস্তান থেকে ১২০০ মাইল দূর (সমুদ্র ও আকাশপথ) |
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সেই প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয় যে, মুক্তি বাহিনী ভিয়েতকং নয়। এর প্রধান কারণ ছিল মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা সবাই কমিউনিস্ট ছিলেন না এবং তাদের লড়াই ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী। তারা মাত্র কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করছিল। ভারতের সরাসরি সহযোগিতা বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল, যা ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ভিন্ন ছিল।
সিরাজ সিকদারের ভূমিকা ও আগস্টের মোড় পরিবর্তন
সিরাজ সিকদার তাঁর নিজস্ব ধারায় সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মজার বিষয় হলো, সিরাজ সিকদার এবং শেখ মুজিবের মধ্যে আদর্শিক ও পদ্ধতিগত আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও, সিরাজ সিকদার এবং তাঁর দল অন্তত ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও মুক্তিবাহিনীর প্রতি একটি সহযোগী মনোভাব পোষণ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চলছে, তাকে একটি সশস্ত্র বিপ্লবী রূপ দিতে। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন মূলধারাটি দিল্লির সহযোগিতায় একটি নিয়মিত যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে, তখন তিনি তাঁর নিজস্ব গেরিলা কৌশলে অগ্রসর হন।
সিরাজ সিকদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সক্রিয় থাকলেও, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল চীনপন্থী কমিউনিজম তথা 'শ্রেণিহীন সমাজ' প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল একটি 'সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র'। এই লক্ষ্যভেদই পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যকার দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
উপসংহার
১৯৭১-এর সেই উত্তাল দিনগুলোতে সিরাজ সিকদারের প্রস্তাব ছিল পরিস্থিতির এক চরমপন্থী বিশ্লেষণ। তাঁর দূরদর্শিতা ছিল এই যে, তিনি যুদ্ধের অনিবার্যতা বুঝতে পেরেছিলেন অনেক আগে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব ছিল এই যে, তিনি সেই যুদ্ধকে কেবল একটি 'গেরিলা বিদ্রোহ' হিসেবে না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ' হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং ভারতের কৌশলগত সমর্থন মাত্র নয় মাসে আমাদের বিজয় এনে দিয়েছিল।
সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র যুদ্ধের আহ্বান এবং বঙ্গবন্ধুর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চরম পরিণতি - এই দুইয়ের সমন্বয়েই শেষ পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তবে এটি স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন উগ্র বামপন্থীদের ফাঁদে পা দিতেন, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ভিয়েতনামের মতো কয়েক দশকের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারত।
বাংলাদেশের ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো আমাদের শেখায় যে, একটি জাতির মুক্তি কোনো একক পথে আসে না; সেখানে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন যেমন প্রয়োজন, তেমনি সশস্ত্র প্রস্তুতিরও আবশ্যকতা থাকে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















