একাত্তরের উত্তাল মার্চ - শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কৌশল বনাম সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র বিপ্লব
১৯৭১ সালের ১ মার্চ। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন এক রেডিও ভাষণে জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন, তখন ঢাকার রাজপথ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাধারণ মানুষের মনে তখন একটিই প্রশ্ন মুক্তির উপায় কী? এই উত্তাল সময়ে রাজনীতির ময়দানে দুটি ভিন্ন ধারা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। সারা দেশে চলছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক অসহযোগ আন্দোলন, অন্য ছোট একটি ধারা ছিল সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি। এদের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি ইতিহাসের এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় পাঠ।

TruthBangla

১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চ ছিল বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের লড়াই, অন্যদিকে রাজপথে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা - এই দুইয়ের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির। একদিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যদিকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে মুক্তির স্বপ্নে বিভোর বামপন্থী কমিউনিস্ট বিপ্লবী সিরাজ সিকদার। এই দুই মেরুর রাজনীতির মাঝে এক রুদ্ধশ্বাস সময় পার করছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন এক রেডিও ভাষণে জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন, তখন ঢাকার রাজপথ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই ঘোষণা ছিল বাংলার মানুষের পিঠে ছুরিকাঘাতের শামিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা না ছাড়ার এই টালবাহানা মুহূর্তেই ঢাকাকে এক রণক্ষেত্রে পরিণত করে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, স্লোগান ওঠে "বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।"
সাধারণ মানুষের মনে তখন একটিই প্রশ্ন মুক্তির উপায় কী? এই উত্তাল সময়ে রাজনীতির ময়দানে দুটি ভিন্ন ধারা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। সারা দেশে চলছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক অসহযোগ আন্দোলন, অন্য ছোট একটি ধারা ছিল সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি। এদের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি ইতিহাসের এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় পাঠ।
আজকের এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সিরাজ সিকদারের ঐতিহাসিক ইশতেহার, বঙ্গবন্ধুর কমিউনিস্ট ভীতি এবং ভিয়েতনাম স্টাইলে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু অজানা বা স্বল্পালোচিত দিক।
মার্চের উত্তাল দিন এবং সিরাজ সিকদারের রণকৌশল
১ মার্চ যখন পাকিস্তান সরকার আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয়, তখনই পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন (EBWM)-এর নেতা সিরাজ সিকদার বুঝতে পেরেছিলেন যে, আলোচনার মাধ্যমে আর কিছু পাওয়া সম্ভব নয়।
২ মার্চ সিরাজ সিকদার একটি ইশতেহার জারি করেন। এটি ছিল তৎকালীন রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সাহসী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। পল্টন ময়দানের এক জনসভায় সিরাজ সিকদার শেখ মুজিবকে সরাসরি প্রস্তাব দেন - এখন আর আলোচনার সময় নেই, বরং অবিলম্বে একটি 'অস্থায়ী বিপ্লবী জোট সরকার' গঠন করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করতে হবে। সেই ইশতেহারে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখেন:
সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু করা: কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে সশস্ত্র যুদ্ধের ডাক দেওয়া।
অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠন: সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সরকার গঠন করা যারা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে।
জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিষদ গঠন: একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করা।
সিরাজের চরমপন্থা বনাম বঙ্গবন্ধুর নিয়মতান্ত্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধ
সিরাজ সিকদারের এই প্রস্তাব ছিল পরিস্থিতির এক চরমপন্থী রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষণ। ১৯৬৮ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন' তত্ত্বগতভাবে বিশ্লেষণ করেছিল যে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। তাই তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কখনোই নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না।
সিরাজ সিকদার কেবল প্রস্তাব দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং 'লাল বাহিনী' ও গোপন সেল গঠনের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামীণ মুক্তাঞ্চল ও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার রণকৌশল গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই মতাদর্শিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই ১৯৭১ সালের ৩ জুন বরিশাল অঞ্চলে 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি' গঠিত হয় এবং পিরোজপুরের স্বরূপকাঠীর পেয়ারাবাগানে নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলে তারা একদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং অন্যদিকে স্থানীয় রাজাকার-শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ পরিচালনা করে।
তবে ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ করা। শেখ মুজিবুর রহমান ও তৎকালীন শীর্ষ নেতারা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে উপলব্ধি করেছিলেন যে, আগেভাগে স্বঘোষিত সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আওয়ামী লীগকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী দল' বা উগ্র গেরিলা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকি এড়াতেই বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে সিরাজ সিকদারের প্রস্তাব গ্রহণ না করে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সময় নেন। রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ছিল নিজেদের আন্তর্জাতিকভাবে আগ্রাসনের শিকার হিসেবে তুলে ধরা। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক 'গেরিলা বিদ্রোহে' সীমাবদ্ধ না থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ' হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি
নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগও গোপনে স্বাধীনতার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছিল। ১ মার্চের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে 'স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে পাঠ করা হয় স্বাধীন বাংলা কায়েমের ইশতেহার। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ছাত্রলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী (Volunteer Force) এবং পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (EPR)-এর দেশপ্রেমিক সদস্যরা গোপন প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে "যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো" এবং "প্রতিরোধ গড়ে তোলো" আহ্বানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ ছাত্র-জনতা, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সহায়তায় কাঠের রাইফেল ও মৌলিক অস্ত্রের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সাহিত্যিক জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি' এবং ড. হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র'-এ উল্লেখিত বিবরণ থেকে জানা যায়, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় ব্যারিকেড তৈরি ও প্রতিরোধ অনুশীলনের কাজ গতি পায়।
সামরিক অঙ্গনেও এই গোপন প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি জোয়ানরা স্থানীয় জনতার সহায়তায় পাকিস্তানি সামরিক অফিসারদের নিরস্ত্রীকরণের চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একই সাথে মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর রফিকুল ইসলাম, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং অন্য অনেক দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা ২৫ মার্চের চরম আঘাতের আগেই সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ইস্ট জোনের অধিনায়ক মেজর রফিকুল ইসলাম কৌশলগত পরিকল্পনা ভাগ করে নেন। মেজর রফিকুল ইসলাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও রসদ সুরক্ষার প্রাথমিক ছক করেন এবং মেজর জিয়াউর রহমান ব্যাটালিয়নের অস্ত্রাগার বাঙালি সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণে রাখা নিশ্চিত করেন।
অনুরূপভাবে কুমিল্লা ও সিলেটে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্বে থাকা মেজর খালেদ মোশাররফ, ময়মনসিংহে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের শাফায়াত জামিল এবং কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলে মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন সেকেন্দার সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলার গোপন নির্দেশ দেন। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই বাঙালি সেনা ও ইপিআর সদস্যরা সতর্কতার সাথে নিজেদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মূল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখেন। পাকিস্তানি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্দেহ এড়িয়ে গড়ে তোলা এই কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক প্রস্তুতিই ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে গণহত্যা শুরু করার পরপরই বাঙালি সামরিক ইউনিটগুলোকে দ্রুততম সময়ে একযোগে বিদ্রোহ ও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
সিরাজ সিকদার বনাম তৎকালীন রাজনৈতিক ধারা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাহ্ণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে স্পষ্ট তিনটি পরস্পরবিরোধী ধারা বজায় ছিল। একদিকে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বিপ্লবী ধারা, অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বজনীন গণভিত্তিক ও সাংবিধানিক ধারা, এবং তৃতীয়ত অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষা করতে চাওয়া দক্ষিণপন্থী রক্ষণশীল ধারা।
সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র বিপ্লবের তত্ত্ব ও অবস্থান
১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি সিরাজ সিকদার ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’ গঠন করেন এবং এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলা থেকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের জন্য সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের থিসিস উত্থাপন করেন। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সে তুংয়ের চিন্তাধারা অনুসারী সিরাজ সিকদার বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার অর্জন সম্ভব নয়।
সশস্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত: ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে সিরাজ সিকদার জাতীয় মুক্তি পরিষদ গঠনের আহ্বান জানান। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আলোচনার ছলে মূলত সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সময়ক্ষেপণ করছে।
সংগ্রাম পরিষদ ও প্রস্তাব: সিরাজ সিকদার ও তাঁর সংগঠন ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’ (যা ১৯৭১ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে) শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগকে একটি সর্বদলীয় প্রতিরোধ পরিষদ গঠন এবং যৌথভাবে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেছিল।
শেখ মুজিবুর রহমানের কৌশল ও বৈশ্বিক জনমত গঠনের রাজনীতি
শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন গড়ে উঠেছিল গণআন্দোলন, নির্বাচন এবং সাংবিধানিক বৈধতার ওপর ভিত্তি করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তান শাসনের বৈধ রাজনৈতিক জনাদেশ ছিল।
একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার ঝুঁকি এড়ানো: শেখ মুজিব সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আওয়ামী লীগ ও বাঙালি জাতিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বা ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পেত পাকিস্তান সরকার।
অসহযোগ আন্দোলন ও বিশ্ব সহানুভূতি: ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে মুজিব প্রমাণ করেন যে সমগ্র বাঙালি জাতি তাঁর পেছনে ঐক্যবদ্ধ। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরু হওয়া পর্যন্ত তিনি শান্তি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শেষ সুযোগটি উন্মুক্ত রাখেন। এর ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশ্বদরবারে একক আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং ভারতসহ পশ্চিমের প্রধান শক্তিগুলোর সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়।
দক্ষিণপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী নেতাদের অবস্থান (ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯৭১)
১৯৭১ সালের প্রথম দিকে, বিশেষ করে মার্চ মাসের উত্তাল দিনগুলোতে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং পিডিপির মতো রক্ষণশীল দলগুলোর ভূমিকা ছিল কৌশলগতভাবে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার পক্ষে। তৎকালীন ‘ইত্তেফাক’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ও ‘আজাদ’ পত্রিকার রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব দলের নেতারা জাতীয় সংকট সমাধানের উপায় হিসেবে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানাচ্ছিলেন।
গুলাম আযম ও জামায়াতে ইসলামী: জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন প্রধান গুলাম আযম ইয়াহিয়া খানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের অসন্তোষ প্রশমিত করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামো টিকিয়ে রাখা।
খান এ সবুর ও মুসলিম লীগ: মুসলিম লীগের প্রবীণ নেতা খান এ সবুর এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী মার্চ মাসের শুরুতেও বার্তা দিয়েছিলেন যে, শেখ মুজিবকে এড়িয়ে গৃহযুদ্ধের দিকে যাওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে তাঁদের এই ওকালতি ছিল সম্পূর্ণভাবে অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার তাগিদ থেকে, স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের সমর্থনে নয়।
পরবর্তী রূপান্তর: ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইটের পর এই রক্ষণশীল দলগুলো নিজেদের অবস্থান উন্মোচিত করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যাকে সমর্থন জানায় এবং শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেয়।
তিন ধারার মনস্তাত্ত্বিক ও বৈপ্লবিক বৈপরীত্য
তৎকালীন রাজনীতিতে এই তিন ধারার বৈপরীত্য রাজনৈতিক কৌশলের এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা তৈরি করেছিল। সিরাজ সিকদার চেয়েছিলেন বিদ্যমান বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক-শ্রমিককে সশস্ত্র করার মাধ্যমে একটি সমাজতান্ত্রিক স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে, শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয়তাবাদী গণআন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে শোষণের চিত্র ফুটিয়ে তুলে বিশ্ব জনমতকে সাথে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে একটি সর্বজনীন রূপ দিতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে দক্ষিণপন্থী দলগুলো কেবল ভৌগোলিক অখণ্ডতার দোহাই দিয়ে তৎকালীন সংকটের গতিপথ ভুলিয়ে রাখতে চেয়েছিল, যা ২৫ মার্চের পর চরম ঘৃণ্য স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকায় পর্যবসিত হয়।
বঙ্গবন্ধু ও চীনপন্থী কমিউনিস্টদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব
বঙ্গবন্ধুর সাথে সিরাজ সিকদার বা অন্যান্য চীনপন্থী কমিউনিস্টদের দূরত্বের একটি ঐতিহাসিক কারণ ছিল। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের সময় থেকেই আওয়ামী লীগ এবং কমিউনিস্ট কর্মীদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল।
মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে শেখ মুজিব কমিউনিস্টদের প্রতি তাঁর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সত্তরের নির্বাচনে জয়লাভের পরও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ নেতা এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্য চীনপন্থী কমিউনিস্ট উগ্রবাদীদের হাতে নিহত হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মুজিব বলেছিলেন "এরপর আমার একজন লোক মরবে, আমি ওদের তিনজনকে মারব।"
এই ক্ষোভের কারণেই সিরাজ সিকদারের প্রস্তাব গ্রহণ করা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সম্ভব ছিল না। একদিকে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে উগ্র বামপন্থী শক্তির উত্থান এই দুই ফ্রন্টে লড়াই করার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। মুজিব মনে করতেন, বামপন্থীদের হাতে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যাবে।
ভিয়েতনাম স্টাইল গেরিলা যুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সতর্কতা
সিরাজ সিকদার চেয়েছিলেন ভিয়েতনামের স্টাইলে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই 'ভিয়েতনামাইজেশন' বা সশস্ত্র চরমপন্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৭০-এর জুন মাসে মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো গোপন টেলিগ্রাম (যা পরবর্তীতে The American Papers-এর ৩৬৭ পৃষ্ঠায় সংকলিত হয়) থেকে প্রকাশ পায় যে, শেখ মুজিব অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে বুঝতে পেরেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে দীর্ঘমেয়াদী ভিয়েতনামি ধাঁচের যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বশক্তির কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের প্রক্সি গ্রাউন্ডে পরিণত হবে। ভিয়েতনামে যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত-চীন সরাসরি সামরিক মুখোমুখি হয়েছিল, বাংলায় তেমনটি ঘটলে মূল স্বাধীনতার ইস্যু চাপা পড়ে অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ফুটবলে পরিণত হতো।
সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন 'পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন' (পরবর্তীতে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি) ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট (Viet Cong) এবং চীনের মাও সে তুং-এর 'দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধ' (Protracted People's War) তত্ত্ব অনুসরণ করে। তারা গ্রামীণ এলাকা ঘেরাও করে শহর দখলের মাধ্যমে একটি সশস্ত্র বিপ্লব বা 'ভিয়েতনাম স্টাইল' গেরিলা যুদ্ধের রূপরেখা তৈরি করেছিল। সিরাজ সিকদার মনে করতেন, পাকিস্তানের মত একটি প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেবল দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধই স্বাধীনতার একমাত্র পথ।
কেন তিনি ভিয়েতনাম মডেল চাননি?
কমিউনিস্ট প্রাধান্য ঠেকানো: ভিয়েতনামের গেরিলা লড়াইয়ে মূল চালিকাশক্তি ছিল কমিউনিস্ট দল ও মাওবাদী মতাদর্শ। বঙ্গবন্ধু আশঙ্কা করেছিলেন যে, দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত বা ভিয়েতনামি স্টাইলের গেরিলা যুদ্ধ শুরু হলে আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব মধ্যপন্থী ও জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের হাত থেকে ছুটে উগ্র বামপন্থী বা প্রোপেকিং/প্রোমোস্কো কমিউনিস্টদের হাতে চলে যাবে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে ঐতিহাসিক জনাদেশ পেয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করে শাসনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে স্বাধিকার অর্জনের পথেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, নেতৃত্ব কমিউনিস্টদের হাতে গেলে তা আন্দোলনকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।
নৃশংস মানবিক বিপর্যয়: ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। দশকের পর দশক ধরে চলা বোমা হামলা, ন্যাপাম বোমার প্রয়োগ, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার এবং লাখ লাখ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ফলে ভিয়েতনামের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সমতল ভৌগোলিক গঠন এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ কাঠামোর কারণে দীর্ঘমেয়াদী সশস্ত্র সংঘাত সাধারণ জনগণের ওপর কতটা প্রলয়ংকরী বিপর্যয় ডেকে আনবে তা নিয়ে শেখ মুজিবের তীব্র সংশয় ছিল। সাধারণ জনগণ দশকের পর দশক ধরে এই ধরনের নৃশংস যুদ্ধ সহ্য করার মতো সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ছিল না।
মার্কিন দলিল ও বঙ্গবন্ধুর কৌশল: The American Papers-এ সংকলিত নথিতে তৎকালীন সংকটময় মুহূর্তে শেখ মুজিবের কৌশলগত অবস্থান পরিষ্কার ধরা পড়ে। তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেছিলেন:
"যদি সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং স্বার্থান্বেষী মহল এই খেলা চালিয়ে যেতে থাকে, তবে আমি স্বাধীনতার ঘোষণা দেব এবং গেরিলা যুদ্ধের ডাক দেব... মূলত কমিউনিস্টদের হাতে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার ভয়ই আমাকে এতকাল ধৈর্যশীল করে রেখেছে।"
এই উদ্ধৃতি প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র যুদ্ধকে তাঁর লড়াইয়ের প্রথম নয়, বরং শেষ বিকল্প হিসেবে রেখেছিলেন। তিনি উগ্র বামপন্থীদের উত্থান ঠেকানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই লড়াই 'কমিউনিস্ট বা মাওবাদী গেরিলা আন্দোলন' হিসেবে চিহ্নিত হলে ভারত বা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ত। কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের সেই সময়ে ভারত বা পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের ভৌগোলিক সীমান্তে আরেকটি চরমপন্থী বাম রাষ্ট্র দেখতে চায়নি। আওয়ামী লীগের অধীনে গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হওয়ার কারণেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্বের দরবারে একটি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আন্দোলন ও মানবিক সংকটের লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়েছিল, যা দ্রুত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ কি ভিয়েতনাম হতে পারত?
১৯৭১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো প্রায়ই পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করত। মার্কিন নীতিনির্ধারক ও সাংবাদিকদের একাংশের ভয় ছিল, দক্ষিণ এশিয়ায় হয়তো আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী "ভিয়েতনাম মার্কা সংঘাত" তৈরি হতে যাচ্ছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই বিখ্যাত মার্কিন দৈনিক ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ বিশ্লেষণে দেখানো হয়, কেন এই দুটি সংঘাতের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
বৈশিষ্ট্য | দক্ষিণ ভিয়েতনাম | পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) |
সৈন্য সংখ্যা | ১০ লাখ স্থানীয় সৈন্য + আমেরিকান বাহিনী | মাত্র ৬০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য |
জনসংখ্যার সমর্থন | ১৭ মিলিয়ন (অনেকে সরকারের সমর্থক ছিল) | ৭৫ মিলিয়ন (পুরো জনপদ শত্রুতাপূর্ণ) |
ভৌগোলিক অবস্থান | সরবরাহ পথ জটিল ছিল | ভারতের তিনদিকে বেষ্টিত (গেরিলাদের জন্য স্বর্গ) |
সরবরাহ রুট | স্থানীয় সরবরাহ ছিল | পাকিস্তান থেকে ১২০০ মাইল দূর (সমুদ্র ও আকাশপথ) |
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয় যে, বাংলাদেশের ‘মুক্তি বাহিনী’ এবং ভিয়েতনামের ‘ভিয়েতকং’ এক বস্তু নয়। এর মৌলিক কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
আদর্শিক ভিত্তি: ভিয়েতকং ছিল একটি সুসংগঠিত কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনী, যারা কঠোর মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ক্যাডার কাঠামো ও মতাদর্শে পরিচালিত হতো। বিপরীতে, মুক্তিবাহিনীর মূল রাজনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ ছিলেন ছাত্র, কৃষক, সাধারণ নাগরিক এবং প্রাক্তন বাঙালি সেনা ও পুলিশ সদস্য, যাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়।
যুদ্ধের কৌশল ও স্থায়িত্ব: ভিয়েতনামে কমিউনিস্টরা কয়েক দশক ধরে ক্যাডারভিত্তিক সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সুড়ঙ্গকেন্দ্রিক গেরিলা কৌশলে মার্কিন ও দক্ষিণ ভিয়েতনামী বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী ‘গণযুদ্ধ’ (Protracted People's War) চালিয়েছিল। অন্যদিকে, মুক্তিবাহিনী মাত্র কয়েক মাসের সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে ময়দানে নেমেছিল এবং তাদের লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব ভূখণ্ড মুক্ত করা।
বৈদেশিক সহায়তা ও সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ: ভিয়েতনামের যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনাম, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পরোক্ষ সাহায্য থাকলেও সরাসরি কোনো মিত্র রাষ্ট্রের নিয়মিত সেনাবাহিনী মাটিতে নেমে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করেনি। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান, এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান, মুক্তিবাহিনীকে সরাসরি অস্ত্র ও ট্রেনিং প্রদান এবং ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যৌথ বাহিনীর গঠন যুদ্ধকে মাত্র ৯ মাসে চূড়ান্ত বিজয়ে রূপ দেয়।
সিরাজ সিকদার, আগস্টের মোড় পরিবর্তন ও ভিন্নধারার সশস্ত্র সংগ্রাম
মুক্তিযুদ্ধের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে সিরাজ সিকদার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি' একটি ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছিল। সিরাজ সিকদার শুরু থেকেই সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন এবং ১৯৭১ সালের জুন মাসে বরিশালের পেয়ারা বাগানকে কেন্দ্র করে একটি মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত সিরাজ সিকদার এবং শেখ মুজিবের অনুসারী জাতীয়তাবাদী ধারার মধ্যে একটি অলিখিত কৌশলগত সহাবস্থান বা সহযোগিতার মনোভাব বিদ্যমান ছিল। সিরাজ সিকদার চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত ব্যাপক জনবিক্ষোভকে একটি সশস্ত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপ দিতে। কিন্তু আগস্ট ১৯৭১-এ এসে যুদ্ধ পরিস্থিতির গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হয়:
ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি ও কৌশলগত পরিবর্তন: ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে "শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি" স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট মেরুকরণে রূপ নেয়। মুজিবনগর সরকার ও ভারতীয় সামরিক কাঠামোর সমন্বয় যখন আরও সুসংগঠিত হতে শুরু করে, তখন সিরাজ সিকদার একে ভারতের "সম্প্রসারণবাদী হস্তক্ষেপ" হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
গেরিলা কৌশলের বিচ্ছিন্নতা: মূলধারার মুক্তিবাহিনী যখন ভারতের সহযোগিতায় ক্রমান্বয়ে এক নিয়মিত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন সিরাজ সিকদার ভারতকে 'জাতীয় শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ভারতের সাহায্যপুষ্ট মুক্তি সংগ্রামকে 'বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ' হিসেবে বিবেচনা করে নিজস্ব স্বাধীন গেরিলা কৌশলে সরে যান।
আদর্শিক দ্বিমুখী অবস্থান: শেখ মুজিবুর রহমানের মূল লক্ষ্য ছিল একটি সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ ও সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। পক্ষান্তরে, সিরাজ সিকদারের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং ভারতীয় প্রভাব উভয়কে পরাস্ত করে একটি 'শ্রেণিহীন সমাজ' বা সর্বহারাদের নির্দেশিত বৈপ্লবিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা।
এই চরম রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যভেদ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই দুটি আলাদা ধারার জন্ম দেয়, যা ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে সিরাজ সিকদারের গোপন সশস্ত্র রাজনীতি এবং তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর মুখোমুখি সংঘাতের পটভূমি তৈরি করেছিল।
উপসংহার
১৯৭১-এর সেই উত্তাল দিনগুলোতে সিরাজ সিকদারের প্রস্তাব ছিল পরিস্থিতির এক চরমপন্থী বিশ্লেষণ। তাঁর দূরদর্শিতা ছিল এই যে, তিনি যুদ্ধের অনিবার্যতা বুঝতে পেরেছিলেন অনেক আগে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব ছিল এই যে, তিনি সেই যুদ্ধকে কেবল একটি 'গেরিলা বিদ্রোহ' হিসেবে না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ' হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং ভারতের কৌশলগত সমর্থন মাত্র নয় মাসে আমাদের বিজয় এনে দিয়েছিল।
সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র যুদ্ধের আহ্বান এবং বঙ্গবন্ধুর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চরম পরিণতি - এই দুইয়ের সমন্বয়েই শেষ পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তবে এটি স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন উগ্র বামপন্থীদের ফাঁদে পা দিতেন, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ভিয়েতনামের মতো কয়েক দশকের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারত।
বাংলাদেশের ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো আমাদের শেখায় যে, একটি জাতির মুক্তি কোনো একক পথে আসে না; সেখানে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন যেমন প্রয়োজন, তেমনি সশস্ত্র প্রস্তুতিরও আবশ্যকতা থাকে।















