কেমন ছিল শেখ হাসিনার পৌনে ছয় বছরের দিল্লি জীবন?
বাংলাদেশের ইতিহাসের লাল অক্ষরে রচিত সেই অভিশপ্ত দিনে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা নিজ দেশে ছিলেন না। তাঁরা তখন অবস্থান করছিলেন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে, তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের সরকারি বাসভবনে। সেখানে শেখ হাসিনার সঙ্গে আরও ছিলেন তাঁর স্বামী, বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া এবং তাঁদের দুই শিশুসন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। এই নির্বাসন ও সাময়িক দূরত্বের কারণেই ঘাতকদের বুলেট ছুঁতে পারেনি তাঁদের। কিন্তু এই বেঁচে থাকার সমান্তরালে শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত প্রবাস জীবন, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লি।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শোষণ ও শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেওয়ার মূল স্থপতি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন দেশে তিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন। কিন্তু একটি সদ্য স্বাধীন দেশের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য পর্দার অন্তরালে এক ভয়াবহ চক্রান্ত জাল বোনা হচ্ছিল। স্বাধীনতাসংগ্রামের চার বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ঘটে যায় বাঙালি ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও নৃশংসতম অধ্যায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল বিভ্রান্ত ও উচ্চাভিলাষী সদস্য এক নির্মম সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। তারা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে কাপুরুষোত্তমের মতো আক্রমণ চালিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে।
হত্যাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর রক্ত এবং তাঁর আদর্শকে এ দেশের বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলা। তবে প্রকৃতির এক অমোঘ বিধানে সেই নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের মাত্র দুজন সদস্য তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা এবং কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা।
বাংলাদেশের ইতিহাসের লাল অক্ষরে রচিত সেই অভিশপ্ত দিনে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা নিজ দেশে ছিলেন না। তাঁরা তখন অবস্থান করছিলেন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে, তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের সরকারি বাসভবনে। সেখানে শেখ হাসিনার সঙ্গে আরও ছিলেন তাঁর স্বামী, বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া এবং তাঁদের দুই শিশুসন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। এই নির্বাসন ও সাময়িক দূরত্বের কারণেই ঘাতকদের বুলেট ছুঁতে পারেনি তাঁদের। কিন্তু এই বেঁচে থাকার সমান্তরালে শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত প্রবাস জীবন, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লি। এই প্রবন্ধে আমরা শেখ হাসিনার জীবনের সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, রহস্যময় এবং তাত্ত্বিক দিক থেকে গভীর পৌনে ছয় বছরের (১৯৭৫-১৯৮১) দিল্লি জীবনের প্রতিটি অধ্যায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করব।
বেলজিয়াম থেকে জার্মানি ও দুঃসংবাদের অভিঘাত
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাতে ব্রাসেলসের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসভবনে যখন শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন ঢাকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এক লহমায় বদলে গিয়েছিল তাঁদের চেনা পৃথিবী।
বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার খবরটি শেখ হাসিনার পরিবারের কাছে সরাসরি বাংলাদেশ থেকে আসেনি। এই দুঃসহ সংবাদটি প্রথম আসে পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বনে নিযুক্ত তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর কাছ থেকে। ১৫ আগস্ট সকালে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ব্রাসেলসে সানাউল হকের বাসভবনে ফোন করেন। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে এক রুদ্ধশ্বাস ও কাঁপানো কণ্ঠ। তিনি সানাউল হককে জানান যে ঢাকায় একটি বড় ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে এবং বঙ্গবন্ধু আর বেঁচে নেই।
সানাউল হকের ভোল বদল ও বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা
খবরটি শোনার পর ব্রাসেলসের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের আচরণে এক নাটকীয় ও কুৎসিত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যিনি কয়েক ঘণ্টা আগেও বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত ছিলেন, তিনি রাতারাতি সম্পূর্ণ ভোল পাল্টে ফেলেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কায় তিনি শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারকে দ্রুত তাঁর বাসভবন ছেড়ে চলে যাওয়ার তাগিদ দেন। এমন এক চরম অসহায় পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং ড. ওয়াজেদ মিয়া শিশুদের নিয়ে ব্রাসেলস থেকে পশ্চিম জার্মানির বনের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং সেখানে রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর বাসভবনে আশ্রয় নেন।
ইতিহাসের সাক্ষী: বনে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর বাসায় বসেই শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার বিবিসি (BBC), ভয়েস অব আমেরিকা (VoA) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক রেডিও স্টেশনগুলোর খবরের দিকে কান পেতে রাখতেন। প্রতি মুহূর্তে রেডিওর নথিপত্র ও ধারাভাষ্য বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হচ্ছিলেন যে, ঢাকায় তাদের পরিবারের কেউ আর বেঁচে নেই। চারদিকের অন্ধকার আর অনিশ্চয়তা তখন তাদের গ্রাস করে নিচ্ছিল।
হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর গোপন তৎপরতা
১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট থেকেই রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী নিজের ক্যারিয়ার ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক গোপন ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই দুই অনাথ কন্যার জীবন জার্মানিতেও নিরাপদ নাও হতে পারে। তিনি জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের পাশাপাশি ভারতের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সাথে গোপনে যোগাযোগ শুরু করেন, যেন বঙ্গবন্ধুর এই দুই জীবিত কন্যাকে রাজনৈতিক আশ্রয় (Political Asylum) দেওয়া যায়।
যখন এই বিষয়টি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নয়া দিল্লির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, তখন ভারত সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভারতের ঐতিহাসিক ঋণ এবং মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে ইন্দিরা গান্ধী তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক সাড়া দেন। দুদিন পরই দিল্লির পক্ষ থেকে বার্তা পাঠানো হয় যে, শিগগিরই যেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে সপরিবারে দিল্লিতে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে ভারতীয় কর্মকর্তাদের তরফ থেকে একটি কঠোর শর্তারোপ করা হয় সমগ্র প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তা ও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করতে হবে। কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া, সম্পূর্ণ সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে তাদেরকে 'এয়ার ইন্ডিয়া'র একটি ফ্লাইটে সরাসরি দিল্লিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে দিল্লি: এক অনিশ্চিত ও ছদ্মবেশী যাত্রা
১৭৭৫ সালের ২৪ আগস্ট বিকেলের দিকে শেখ হাসিনা, তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা, স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া এবং দুই সন্তান জয় ও পুতুলকে নিয়ে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দর থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমানে আরোহণ করেন। তাদের এই যাত্রার পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছিল না, ছিল না কোনো লাল গালিচা সংবর্ধনা। তারা ছিলেন স্রেফ পরিচয়হীন একদল শরণার্থী, যাদের ভবিষ্যৎ ছিল সম্পূর্ণ কুয়াশাচ্ছন্ন।
২৫ আগস্ট খুব ভোরে বিমানটি নয়া দিল্লির পালম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দর থেকে তাদের অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বের করে আনা হয়। এর মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় শেখ হাসিনার পৌনে ছয় বছরের এক দীর্ঘ ও মনস্তাত্ত্বিক দিল্লি জীবন। এই সাড়ে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় তারা কাটিয়েছেন ভারতের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং এক প্রকার রাজনৈতিক অন্তরালে।
দিল্লির বাসস্থান ও কঠোর নিরাপত্তা বলয়
নয়া দিল্লিতে পৌঁছানোর পর শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই ছিল ভারত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বাংলাদেশের তৎকালীন ঘাতক সামরিক জান্তা ও তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীরা যেকোনো সময় দিল্লিতেও তাদের ওপর আঘাত হানতে পারত।

সেফ হাউজ ও কঠোর নির্দেশনা
দিল্লিতে পৌঁছানোর পর শেখ হাসিনাদের প্রথমে রাখা হয় ৫৬ নম্বর রিং রোডের একটি সরকারি ‘সেফ হাউজ’-এ। সেখানে কয়েক দিন রাখার পর তাদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে দিল্লির ডিফেন্স কলোনির একটি সুরক্ষিত বাড়িতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বাড়িতে স্থানান্তর করার সময় ভারতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের সুরক্ষার স্বার্থে তিনটি অত্যন্ত কঠোর পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন:
প্রথমত: তারা যেন বিনা প্রয়োজনে বা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে না যান।
দ্বিতীয়ত: তারা যেন স্থানীয় প্রতিবেশী বা অপরিচিত কারো কাছে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় (Identity) প্রকাশ না করেন।
তৃতীয়ত: দিল্লিতে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশী বা অন্য কারো সঙ্গে যেন ভারত সরকারের অজ্ঞাতসারে কোনো প্রকার যোগাযোগ না রাখেন।
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
দিল্লিতে আসার দিন দশেক পর, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভারতের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা শেখ হাসিনা এবং ড. ওয়াজেদ মিয়াকে অত্যন্ত গোপনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারি বাসভবন, ১ নম্বর সফদরজং রোডের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে শেখ হাসিনার এক আবেগঘন ও ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটে। ইন্দিরা গান্ধী শেখ হাসিনাকে বুকে টেনে নেন এবং সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, জীবনের এই কঠিন সময়ে ভারত সবসময় তাদের পাশে থাকবে। তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন যে তাদের নিরাপত্তা এবং দেখভালের সমস্ত দায়িত্ব ভারত সরকারের।
পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাট ও সীমিত জীবনযাত্রা
ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাতের আরও দিন দশেক পর, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শেখ হাসিনার পরিবারকে দিল্লির পান্ডারা পার্কের সি ব্লকের একটি ফ্ল্যাটে স্থানান্তর করা হয়। এই ফ্ল্যাটটিই ছিল তাদের দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছরের মূল আবাসন। ফ্ল্যাটটিতে থাকার জন্য তিনটি শোবার ঘর এবং জীবনধারণের জন্য কিছু অতি সাধারণ আসবাবপত্র ছিল। বাহিরের পৃথিবীর খবর রাখার জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাদের একটি সাধারণ সাদা–কালো টেলিভিশন সেট দেওয়া হয়।
তৎকালীন দিল্লি দূরদর্শন: মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে ভারতের টেলিভিশনের পরিধি আজকের মতো ছিল না। তখন শুধু সন্ধ্যার দিকে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য রাষ্ট্রীয় চ্যানেল 'দূরদর্শন'-এর অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। সেই অনুষ্ঠান দেখেই তারা সময় কাটাতেন। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, নিরাপত্তার কারণে প্রথম দিকে তাদের বাড়িতে কোনো টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয়নি, যেন বাহিরের জগতের সাথে কোনো তথ্য আদান-প্রদান না হতে পারে।
এই কড়া নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে দিন কাটত তাদের। বাড়ির আশপাশে সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকত ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র জোয়ানরা। ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানদের ভয় ছিল যে, ঢাকার ১৫ আগস্টের ঘাতক চক্রের নজর হয়তো দিল্লির এই পান্ডারা পার্কের ওপরও রয়েছে। তাই দৃশ্যমান নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (Intelligence Bureau) এবং 'র' (R&AW)-এর কর্মকর্তারা ছদ্মবেশে ওই এলাকায় কড়া নজরদারি রাখতেন।
ড. ওয়াজেদ মিয়ার কর্মজীবন ও পারিবারিক অর্থনৈতিক সংগ্রাম
অনেকে মনে করতে পারেন যে, ভারত সরকারের আশ্রয়ে থাকার কারণে হয়তো শেখ হাসিনার পরিবারকে কোনো কাজ করতে হয়নি। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, বঙ্গবন্ধুর জামাতা এবং শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন একজন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল এবং প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী। পশ্চিম জার্মানিতে থাকাকালীনই তিনি গবেষণার কাজে যুক্ত ছিলেন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ভারতে নির্বাসনকালেও তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না।
তিনি দিল্লির অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনে (Atomic Energy Commission of India) একজন ফেলো বা গবেষক হিসেবে চাকরি নেন। সেখানে তিনি বিজ্ঞান ও পরমাণু গবেষণায় নিজের মেধা নিয়োগ করেন এবং নিয়মিত বেতন ভাতা পেতেন, যা দিয়ে তাদের দৈনন্দিন পারিবারিক খরচ মেটাতে সুবিধা হতো। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ড. ওয়াজেদ মিয়া এই কমিশনে অত্যন্ত সুনামের সাথে তাঁর চাকরি ও গবেষণা অব্যাহত রাখেন। তাঁর এই কর্মসংস্থান শেখ হাসিনার পরিবারকে দিল্লির কঠিন দিনগুলোতে একটি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও মানসিক স্বস্তি প্রদান করেছিল।
সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ভিত নির্মাণ
দিল্লিতে অবস্থানকালীন সময়ে শেখ হাসিনার অন্যতম প্রধান চিন্তা ছিল তাঁর দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ। কড়া নিরাপত্তার কারণে তারা সাধারণ দিল্লির স্থানীয় স্কুলে সন্তানদের পাঠাতে পারছিলেন না। তাই তাদের ভারতের বিখ্যাত কিছু বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের শিক্ষাজীবন
শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার একটি বড় অংশ ভারতেই সম্পন্ন করেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে দিল্লির বাইরে ভারতের দূরবর্তী অঞ্চলের স্বনামধন্য বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়।
কোদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল: তিনি তামিল নাড়ুর পালানি হিলসে অবস্থিত ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বোর্ডিং স্কুল কোদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে (Kodaikanal International School) পড়াশোনা করেন।
সেইন্ট জোসেফ’স কলেজ: পরবর্তীতে তিনি নৈনিতালের বিখ্যাত বোর্ডিং স্কুল সেইন্ট জোসেফ’স কলেজেও (St. Joseph's College, Nainital) শিক্ষা গ্রহণ করেন।
উচ্চশিক্ষা: স্কুল জীবন শেষ করে সজীব ওয়াজেদ জয় ইউনিভার্সিটি অব ব্যাঙ্গালোরে (University of Bangalore) কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে তাঁর স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ক্রেডিট ট্রান্সফার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্লিংটনে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে চলে যান।
এই বোর্ডিং স্কুলগুলোর কঠোর শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ সজীব ওয়াজেদ জয়কে একজন আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল, যার ভিত রচিত হয়েছিল ভারতের সেই নির্বাসিত দিনগুলোতে।
প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সম্পর্ক: এক আত্মিক অভিভাবকত্ব
শেখ হাসিনার পৌনে ছয় বছরের দিল্লি জীবনের সবচেয়ে মধুর, গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ দিকটি ছিল ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জি এবং তাঁর পরিবারের সাথে গড়ে ওঠা গভীর ও আত্মিক সম্পর্ক।

ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশ ও প্রণব মুখার্জির ভূমিকা
শেখ হাসিনারা যখন প্রথম দিল্লিতে পৌঁছালেন, তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর মন্ত্রিসভার অন্যতম বিশ্বস্ত ও উদীয়মান সদস্য প্রণব মুখার্জিকে ডেকে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন:
“প্রণব, তুমি এখন থেকে দিল্লিতে ওদের (শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা) অভিভাবক। ওদের ভালো-মন্দ, নিরাপত্তা ও সব প্রয়োজনের দিকে তোমাকে খেয়াল রাখতে হবে।”
ইন্দিরা গান্ধীর এই নির্দেশকে প্রণব মুখার্জি কেবল একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে নেননি, বরং তিনি একে নিজের পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বাস্তবিকই, দিল্লির সেই কঠিন নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে শেখ হাসিনাদের সত্যিকারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রণব মুখার্জি।
পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ও শুভ্রা মুখার্জির সঙ্গে বন্ধন
প্রণব মুখার্জি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রিতা হিসেবে দেখতেন না, তিনি তাকে নিজের বড় মেয়ে বলে মনে করতেন। তাদের দুই পরিবারের মধ্যে চমৎকার একটি পারিবারিক রসায়ন গড়ে উঠেছিল:
সন্তানদের বন্ধুত্ব: প্রণব মুখার্জির ছেলে অভিজিৎ মুখার্জির সঙ্গে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের এবং শেখ রেহানার সঙ্গে প্রণব মুখার্জির মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জির অত্যন্ত নিবিড় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
শুভ্রা মুখার্জি ও 'বউদি' ডাক: শেখ হাসিনার সঙ্গে সবচেয়ে প্রগাঢ় ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল প্রণব মুখার্জির স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির। শুভ্রা মুখার্জি ছিলেন বাংলাদেশের নড়াইল জেলার মেয়ে, ফলে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বাঙালিয়ানা ও ভাষার টান ছিল। শেখ হাসিনা তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে ‘বউদি’ বলে ডাকতেন। পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাটে শুভ্রা মুখার্জি প্রায়ই আসতেন, রান্না করতেন এবং শেখ হাসিনার সাথে সুখ-দুঃখের গল্প করে সময় কাটাতেন।
ঐতিহাসিক শ্রদ্ধাবোধ: এই সম্পর্কটি কতটা হৃদ্যতাপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী ছিল তা বোঝা যায় পরবর্তীকালের দুটি ঘটনা থেকে। ২০১৫ সালে যখন শুভ্রা মুখার্জি পরলোকগমন করেন, তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমস্ত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রটোকল ও প্রথা তোয়াক্কা না করে স্রেফ ব্যক্তিগত টানে শেষ দেখা দেখতে নয়া দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর প্রণব মুখার্জি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন, যেখানে শেখ হাসিনা প্রটোকল ভেঙে নিজ হাতে রান্না করে তাকে খাইয়েছিলেন।
১৯৭৭ সালের ভারতের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
১৯৭৫ সালে যখন শেখ হাসিনা দিল্লিতে আসেন, তখন ভারতের ক্ষমতায় ছিলেন তাঁর পরম হিতৈষী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস দল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে 'জনতা পার্টি' ক্ষমতায় আসে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন শেখ হাসিনার পরিবারের জন্য এক চরম সংকট ও অনিশ্চয়তা ডেকে এনেছিল।
সুবিধা ও ভাতা কর্তনের চাপ: জনতা পার্টির অনেক নেতাই ইন্দিরা গান্ধীর নেওয়া পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের বিরোধী ছিলেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক জান্তার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা শুরু করে। ফলে দিল্লির পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাটে শেখ হাসিনাদের দেওয়া সরকারি সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক ভাতা এবং নিরাপত্তা বলয় সংকুচিত করার একটি পরোক্ষ চাপ তৈরি হয়।
ড. ওয়াজেদ মিয়ার ওপর চাপ: এই সময়ে ড. ওয়াজেদ মিয়ার চাকরি ও গবেষণার ওপরও নজরদারি বাড়ে। জনতা সরকারের কিছু আমলা তাঁদের দিল্লি ছাড়ার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী দলে থেকেও প্রণব মুখার্জির মাধ্যমে শেখ হাসিনাদের খোঁজখবর রাখতেন এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঘটলে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন।
অটল বিহারী বাজপেয়ীর মানবিক ভূমিকা: তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী) অটল বিহারী বাজপেয়ী জনতা সরকারের অংশ হওয়া সত্ত্বেও একটি বড় মানবিক ভূমিকা পালন করেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যা-ই হোক না কেন, আশ্রিত দুই কন্যার নিরাপত্তা ও মানবিক আশ্রয়ের ব্যাপারে ভারত সরকার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে না। ফলে চরম রাজনৈতিক বৈরিতার মাঝেও তাঁরা দিল্লিতে টিকে থাকতে পেরেছিলেন।
সীমিত জনসম্পর্ক ও ডি কে বসুর অনন্য উপাখ্যান
দিল্লিতে কাটানো পৌনে ছয় বছরে শেখ হাসিনা খুব বেশি সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পারেননি। এর পেছনে প্রধানতম কারণ ছিল তাঁর জীবনের ওপর থাকা ক্রমাগত নিরাপত্তা ঝুঁকি। ভারত সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল যেন কোনো সাধারণ মানুষ বা বাংলাদেশী নাগরিক তাঁর পান্ডারা পার্কের বাসভবনের ঠিকানা জানতে না পারে। তাই হাতেগোনা কয়েকজন প্রথিতযশা সাংবাদিক, বিশ্বস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং শীর্ষস্থানীয় আমলা ছাড়া খুব বেশি লোকের সঙ্গে তাঁর পক্ষে দেখা করা বা কথা বলা সম্ভব ছিল না।
ডি কে বসু ও বই উপহারের গল্প
সেই অবরুদ্ধ সময়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলেন এবং তাঁর আন্তরিক আতিথেয়তা লাভ করেছিলেন, এমন একজন ব্যতিক্রমী ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হলেন দিল্লি ফুটবল সার্কেলের অত্যন্ত পরিচিত মুখ এবং হিন্দুস্তান ফুটবল ক্লাবের (Hindustan FC) প্রেসিডেন্ট ডি কে বসু। তিনি একাধিকবার কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া স্রেফ মানবিক টানে শেখ হাসিনার পান্ডারা পার্কের বাড়িতে গিয়েছিলেন।
ডি কে বসুর দেওয়া ভাষ্য ও স্মৃতিকথা অনুযায়ী, প্রথমবার তাঁর শেখ হাসিনার বাড়িতে গমনের পেছনে অবদান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদের। তিনি বসুর সাথে শেখ হাসিনার পরিচয় করিয়ে দেন। সেদিন বসার ঘরের আড্ডায় তৎকালীন বাংলাদেশের শোচনীয় রাজনৈতিক অবস্থা এবং বাংলা সাহিত্য নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে দীর্ঘ আলোচনা হয়। শেখ হাসিনা যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার অনেক বড় ভক্ত এবং বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী, তা জানতে পেরে ডি কে বসু পরবর্তীতে শেখ হাসিনাকে বাঙালি সাহিত্যিকদের রচিত অসংখ্য বই উপহার দিয়েছিলেন। নির্বাসনের সেই অন্ধকার দিনগুলোতে বই-ই ছিল শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। বসু তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, শেখ হাসিনার আন্তরিক, নম্র-ভদ্র এবং নিরহংকার ব্যবহারে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তা সারা জীবন তাঁর মনে দাগ কেটে থাকবে।
রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা ও আওয়ামী লীগের হাল ধরা
বিস্ময়কর ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দিল্লি বাসের সিংহভাগ সময়ই শেখ হাসিনা সক্রিয় ও দৃশ্যমান রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলেন।
এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। শেখ হাসিনা যখন দিল্লিতে পৌঁছান, তখন ভারতেও চলছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক ঘোষিত অভ্যন্তরীণ 'জরুরি অবস্থা' (Emergency)। ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিই তখন ছিল চরম উত্তপ্ত ও স্পর্শকাতর। এই অবস্থায় ভারত সরকারের কঠোর নির্দেশ ছিল যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থা যতই শোচনীয় বা স্বৈরাচারী হোক না কেন, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনা কোনো প্রকার প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা, বিবৃতি বা মিডিয়া ইন্টারভিউ দিতে পারবেন না। ভারত চায়নি তাদের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়ুক।
আওয়ামী লীগ নেতাদের গোপন আগমন ও পুনর্গঠন
রাজনীতিতে প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ ও বিশ্বস্ত নেতারা নিয়মিতই নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার বাড়িতে যেতেন। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছিল নেতৃত্বশূন্য, দিশেহারা এবং চরমভাবে নির্যাতিত। দলটিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন আশা সঞ্চার করতে একজন সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল।
বিশেষ করে ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালের দিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা (যেমন আব্দুল মালেক উকিল, জোহরা তাজউদ্দীন প্রমুখ) বারবার দিল্লিতে এসে শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করতে থাকেন এবং তাকে আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেন। তারা চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা যেন অবিলম্বে বাংলাদেশে ফিরে এসে নির্বাচনী প্রচারণা ও দল পুনর্গঠনে সাহায্য করেন।
জিয়াউর রহমানের বাধা ও ১৯৮১ সালের ঐতিহাসিক কাউন্সিল
কিন্তু বাংলাদেশে ফেরার পথটি মোটেই সহজ ছিল না। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের দেশে ফেরার ওপর এক অঘোষিত ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা বাধা জারি ছিল। তাদের পাসপোর্ট নবায়ন করা হচ্ছিল না এবং দেশে ফিরলে জীবনের চরম ঝুঁকি ছিল।
দূরদর্শী নেতৃত্ব: এই সমস্ত বাধা-বিপত্তির মাঝেই ঘটে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই এবং তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও, তাকে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি (President of Bangladesh Awami League) নির্বাচিত করা হয়। এই একটি সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের ভাগ্যলিপি পুনর্নির্ধারণ করে দেয়।
এ এল খতিব ও ‘হু কিল্ড মুজিব?’
দিল্লির সেই কঠিন ও ঐতিহাসিক দিনগুলোতে বিশিষ্ট ভারতীয় সাংবাদিক এ এল খতিব (A.L. Khatib) শেখ হাসিনার সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। তিনি শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ এবং তাত্ত্বিক আলোচনায় সাহায্য করতেন। এই এ এল খতিবই পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত ও কালজয়ী গ্রন্থ ‘হু কিল্ড মুজিব?’ (Who Killed Mujib?) রচনা করেন। এই বইটিকে আজো ১৫ আগস্টের সপরিবারে হত্যাকাণ্ড ও তার পেছনের আন্তর্জাতিক চক্রান্ত বিষয়ক অন্যতম সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার উপাদানগুলোর একটি বড় অংশ সংগৃহীত হয়েছিল দিল্লির সেই পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাটে বসেই।
মানসিক ট্রমা ও শোককে শক্তিতে রূপান্তর
নয়া দিল্লিতে কাটানো পৌনে ছয় বছর মানসিকভাবে শেখ হাসিনার জন্য কোনো স্বাভাবিক জীবন ছিল না। তিনি ছিলেন তীব্র মানসিক ট্রমা (Trauma) এবং গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন নারী। মাত্র কয়েক দিন আগে যে পিতা, মাতা, ভাই ও স্বজনদের রেখে এসেছিলেন, তারা সবাই আজ কবরে শায়িত এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নেওয়া যেকোনো সাধারণ মানুষের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। ১৫ আগস্টের সেই নারকীয় স্মৃতি প্রতি রাতে বিভীষিকার মতো তাড়া করে বেড়াত তাকে ও শেখ রেহানাকে।
ট্রমা ম্যানেজমেন্ট ও ড. ওয়াজেদ মিয়ার ভূমিকা
মানসিকভাবে শেখ হাসিনা এতটাই বিপর্যস্ত ছিলেন যে, ১৫ আগস্টের ঘটনার বিন্দুমাত্র উল্লেখ বা আলোচনা তাঁর জন্য ছিল এক বিরাট মানসিক আঘাত বা 'ট্রিগার' (Trigger)। তিনি সহ্য করতে পারতেন না তাঁর পরিবারের সেই করুণ শেষের বিবরণ। এই পরিস্থিতিতে তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া এক বিশাল ঢাল হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ড. ওয়াজেদ মিয়া পান্ডারা পার্কের বাড়িতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে আসা সমস্ত রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক বা অতিথিদের আগে থেকেই বিশেষভাবে অনুরোধ ও সতর্ক করে দিতেন:
"দয়া করে ওঁর সামনে ১৫ আগস্টের কোনো গল্প তুলবেন না। ওঁর মানসিক অবস্থা ভালো নয়, পুরনো কথা শুনলে ওঁর কষ্ট আরও বেড়ে যায়।"
এই দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর শেখ হাসিনা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন গভীর আত্মচিন্তা, পড়াশোনা এবং নিজের মনকে ইস্পাতকঠিন করার প্রক্রিয়ায়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেঁদে চোখের জল ফেলা তাঁর দায়িত্ব নয়; বরং পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত শোককে এক অপরাজিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার দীক্ষা নিয়েছিলেন এই দিল্লির মাটিতেই।
শেখ হাসিনার পৌনে ছয় বছরের দিল্লি জীবনের ঘটনাক্রম ও ঐতিহাসিক তথ্যের সংক্ষেপিত ছক
নিচের ছকটি পর্যালোচনা করলে শেখ হাসিনার দিল্লি নির্বাসন জীবনের সমগ্র চিত্রটি খুব সহজে এবং স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যাবে:
সুনির্দিষ্ট তারিখ / সময়কাল | ঐতিহাসিক স্থান / আবাসন | যুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ | মূল ঘটনা ও কৌশলগত তাৎপর্য |
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ | ব্রাসেলস, বেলজিয়াম (রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসা) | শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ড. ওয়াজেদ মিয়া, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের খবর লাভ। রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের নেতিবাচক আচরণের কারণে বাসস্থান ত্যাগ। |
১৬-২৩ আগস্ট ১৯৭৫ | বন, পশ্চিম জার্মানি (রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর বাসা) | রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী | আন্তর্জাতিক রেডিওর মাধ্যমে খবরের সত্যতা নিশ্চিতকরণ। ভারতের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা। |
২৫ আগস্ট ১৯৭৫ | পালম বিমানবন্দর ও রিং রোড, নয়া দিল্লি | ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা | ছদ্মবেশে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে নয়া দিল্লিতে আগমন। ৫৬ নম্বর রিং রোডের 'সেফ হাউজ'-এ প্রাথমিক অবস্থান। |
সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ (শুরু) | ডিফেন্স কলোনি, নয়া দিল্লি | ভারতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা দল | কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশাবলী লাভ (বাইরে না যাওয়া, পরিচয় গোপন রাখা, বাঙালিদের সাথে যোগাযোগ না রাখা)। |
৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ | ১ নম্বর সফদরজং রোড (প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) | ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী | ইন্দিরা গান্ধীর সাথে শেখ হাসিনার প্রথম গোপন ও আবেগঘন সাক্ষাৎ। ভারতের পক্ষ থেকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও অভিভাবকত্বের আশ্বাস। |
সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ – মে ১৯৮১ | সি ব্লক ফ্ল্যাট, পান্ডারা পার্ক, নয়া দিল্লি | প্রণব মুখার্জি, শুভ্রা মুখার্জি, ডি কে বসু, এ এল খতিব | দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসন জীবন। টেলিভিশন ও টেলিফোনহীন আদিম ও অবরুদ্ধ দিনলিপি। ড. ওয়াজেদ মিয়ার পরমাণু শক্তি কমিশনে চাকরি। |
১৯৭৬ – ১৯৮০ (মধ্যবর্তী সময়) | কোদাইকানাল ও নৈনিলতালের বোর্ডিং স্কুল | সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল | সন্তানদের নিরাপত্তার স্বার্থে দিল্লির বাইরে বিখ্যাত বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ভিত নির্মাণ। |
১৯৭৯ – ১৯৮০ | পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাট, দিল্লি | আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ (আব্দুল মালেক উকিল প্রমুখ) | আওয়ামী লীগ নেতাদের গোপন বৈঠক এবং শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার ও নেতৃত্ব নেওয়ার অনুরোধ। |
১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ | ঢাকা, বাংলাদেশ (অনুপস্থিতিতেই) | বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও নেতা-কর্মী | শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এবং জিয়াউর রহমানের বাধা সত্ত্বেও তাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিতকরণ। |
১৭ মে ১৯৮১ | ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দর, বাংলাদেশ | লাখো জনতা ও আওয়ামী লীগ কর্মী | দীর্ঘ পৌনে ছয় বছরের দিল্লি নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। |
শেখ রেহানার বিয়ে ও লন্ডনে স্থানান্তর
দিল্লির এই সাড়ে পাঁচ বছরের জীবনেই বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
লন্ডনে বিয়ে (১৯৭৭): ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে লন্ডনের কিলবার্নে ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকের সাথে শেখ রেহানার বিয়ে সম্পন্ন হয়। দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা এবং ড. ওয়াজেদ মিয়া এই বিয়ের প্রাথমিক কথাবার্তা ও সম্মতি দিয়েছিলেন।
লন্ডন-দিল্লি যোগাযোগ: বিয়ের পর শেখ রেহানা লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এর ফলে দিল্লির পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাটে শেখ হাসিনা আরও বেশি একাকী ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। তবে এই সময় থেকেই লন্ডনের সাথে শেখ হাসিনার একটি রাজনৈতিক ও পারিবারিক যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত হয়। শেখ রেহানা লন্ডন থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রবাসী বাঙালিদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন, যা পরবর্তীতে শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে সাহায্য করেছিল।

দিল্লির দিনগুলোতে সাহিত্যচর্চা ও মানসিক রূপান্তর
তীব্র একাকীত্ব এবং কড়া নিরাপত্তার কারণে বাইরে বের হতে না পারার দিনগুলোকে শেখ হাসিনা মূলত জ্ঞানার্জন ও লেখার কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
গ্রন্থাগার ও বইয়ের জগৎ: প্রণব মুখার্জি এবং ডি কে বসুর মতো শুভাকাঙ্ক্ষীরা নিয়মিত শেখ হাসিনাকে সমকালীন রাজনীতি, ইতিহাস এবং সাহিত্যের বই এনে দিতেন। তিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU) এবং ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারের বিভিন্ন দুর্লভ বই ও নথিপত্র ড. ওয়াজেদ মিয়ার মাধ্যমে আনিয়ে পড়তেন।
ডায়েরি ও স্মৃতিকথা লিখন: এই সময়েই শেখ হাসিনা তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর অনুভূতি ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর লেখা বিভিন্ন বই ও স্মৃতিকথায় (যেমন: 'শেখ মুজিব আমার পিতা', 'ওরা টোকাই কেন') দিল্লির এই নির্বাসিত জীবনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিফলন ও চিন্তাভাবনার স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হাসিনাকে ফিরিয়ে নেওয়া
১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মূলত কয়েকটি উপদলে (Factions) বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন 'আওয়ামী লীগ (মিজান)' এবং আব্দুল মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন 'আওয়ামী লীগ (মালেক)' দলের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে দিয়েছিল।
দিল্লিগামী নেতাদের ভিড়: ১৯৮০ সালের শেষভাগ এবং ১৯৮১ সালের শুরুর দিকে দিল্লির পান্ডারা পার্কের সি ব্লকের ফ্ল্যাটটি কার্যত বাংলাদেশের রাজনীতির অলিখিত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, সাজেদা চৌধুরী এবং জোহরা তাজউদ্দীনের মতো শীর্ষ নেতারা প্রায়ই ছদ্মবেশে বা গোপনে দিল্লি যেতেন।
ঐক্যমতের প্রতীক: দলীয় নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও উত্তরাধিকার ছাড়া এই দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা অসম্ভব। শেখ হাসিনা প্রথমে দলের শীর্ষ পদ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি বারবার বলতেন, তিনি একজন সাধারণ কর্মী হিসেবেই দেশে ফিরতে চান। কিন্তু নেতাদের কান্না এবং দলের ভাঙনোম্মুখ অবস্থা দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি সভাপতি পদ গ্রহণে সম্মতি দেন।
মে ১৯৮১: বিদায়বেলার অশ্রুসজল মুহূর্ত
১৯৮১ সালের মে মাসে যখন শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়, তখন দিল্লির রাজনৈতিক মহলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
ইন্দিরা গান্ধীর শেষ উপদেশ: দেশ ছাড়ার আগে শেখ হাসিনা তাঁর সন্তানদের নিয়ে ১ নম্বর সফদরজং রোডে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। তখন ইন্দিরা গান্ধী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, "তুমি এক বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দেশে ফিরছ। মনে রাখবে, পথটি মসৃণ নয়, পদে পদে বিপদ আসবে। কিন্তু তোমার পিতার মতো সাহসী হতে হবে।"
প্রণব মুখার্জির পরিবারের বিদায় সংবর্ধনা: শুভ্রা মুখার্জি এবং প্রণব মুখার্জি তাঁদের বাড়িতে শেখ হাসিনার প্রিয় সব বাঙালি খাবার রান্না করে বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। ড. ওয়াজেদ মিয়াকে দিল্লিতে রেখেই (যেহেতু তাঁর চাকরির মেয়াদ ছিল ১৯৮২ পর্যন্ত) শেখ হাসিনা দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
নির্বাসন জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ও প্রভাবক
প্রভাবক/ব্যক্তিত্ব | ভূমিকা ও অবদান | দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব |
ইন্দিরা গান্ধী | রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও আশ্রয় প্রদান। | শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। |
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া | পরমাণু শক্তি কমিশনে চাকরি ও পরিবারের হাল ধরা। | নির্বাসিত জীবনে আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বজায় রাখা। |
প্রণব ও শুভ্রা মুখার্জি | পারিবারিক ও মানসিক অভিভাবকত্ব। | শেখ হাসিনার মধ্যে ভারতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের প্রতি স্থায়ী আস্থা তৈরি। |
এ এল খতিব | 'হু কিল্ড মুজিব?' গ্রন্থ রচনা ও তথ্য সহায়তা। | ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক নথিবদ্ধকরণ। |
আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ | রাজনৈতিক সংযোগ ও সভাপতি পদের প্রস্তাব। | শেখ হাসিনাকে নির্বাসন থেকে সরাসরি মূলধারার রাজনীতিতে নিয়ে আসা। |
শেখ হাসিনার এই পৌনে ছয় বছরের দিল্লি জীবন ছিল মূলত এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতো, যেখানে তিনি হারিয়েছেন তাঁর পরিবারকে, কিন্তু অর্জন করেছেন রাষ্ট্র পরিচালনার এক অদৃশ্য ও সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতা।
দিল্লি জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
শেখ হাসিনার নয়া দিল্লিতে কাটানো পৌনে ছয় বছরের এই নির্বাসিত জীবনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই সময়কালটি কেবল একজন নারীর প্রবাসে টিকে থাকার গল্প নয়; বরং এটি ছিল একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো একটি রাজনৈতিক দলের এবং একজন হবু রাষ্ট্রনায়কের পুনর্জন্মের প্রস্তুতিপর্ব।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিজের পরিবারের প্রায় সবাইকে হারানোর পর যদি শেখ হাসিনা তাৎক্ষণিকভাবে আবেগের বশে বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারতেন, তবে তৎকালীন খুনি সামরিক জান্তা তাকে বেঁচে থাকতে দিত না। আর যদি তিনি বেঁচেও থাকতেন, তবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তিনি রাজনৈতিকভাবে কী করতে পারতেন, তা ইতিহাস কোনোদিনও জানতে পারত না।
তাই দিল্লির এই পৌনে Axel বছরের অবরুদ্ধ ও সুরক্ষিত জীবন তাকে তিনটি বড় জিনিস উপহার দিয়েছিল। প্রথমত জীবনের পরম নিরাপত্তা, যা তাঁর পিতার রক্তের ধারাকে টিকিয়ে রেখেছে। প্রণব মুখার্জি এবং ইন্দিরা গান্ধীর মতো বিশ্বমানের রাজনীতিবিদদের সান্নিধ্যে থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক পাঠ গ্রহণ। নিজের ব্যক্তিগত শোক ও ট্রমাকে দমন করে দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
১৯৮১ সালের ১৭ মে যখন তিনি সমস্ত ভয়, নিষেধাজ্ঞা আর ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে পা রেখেছিলেন, তখন তিনি আর ১৯৭৫ সালের সেই ব্রাসেলসে কান্নারত অসহায় তরুণী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানসিকভাবে শক্তিশালী, সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী এবং পিতার আদর্শে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সভাপতি। ১৭ মে'র সেই ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন ও গণতান্ত্রিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার মূল ভিত ও রূপরেখাটি অত্যন্ত নীরবে ও নিভৃতে রচিত হয়েছিল দিল্লির সেই পান্ডারা পার্কের সি ব্লকের তিন কামরার সাধারণ ফ্ল্যাটটিতেই। ইতিহাসের আবর্তে তাই শেখ হাসিনার দিল্লি জীবন বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য বাঁক।














