ওসমান হাদি নাকি প্রজেক্ট হাদি? একটি রাজনৈতিক বলির পাঁঠা
একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার পতনের পর মাঠপর্যায়ের ক্ষমতা কাঠামোতে যে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণের জন্য একদল রাতারাতি গজিয়ে ওঠা উগ্র ও চরমপন্থী চরিত্রের উত্থান আমরা লক্ষ্য করেছি। এদেরই একজন ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের তথাকথিত মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি আসলেই স্বতঃস্ফূর্ত কোনো জননেতা ছিলেন, নাকি একটি সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তৈরি করা কোনো ল্যাবরেটরি প্রজেক্ট? যাকে আমরা বলতে পারি ‘প্রজেক্ট হাদি’।

TruthBangla

Jul 13, 2026
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে এক অভূতপূর্ব শূন্যতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার পতনের পর মাঠপর্যায়ের ক্ষমতা কাঠামোতে যে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণের জন্য একদল রাতারাতি গজিয়ে ওঠা উগ্র ও চরমপন্থী চরিত্রের উত্থান আমরা লক্ষ্য করেছি। এদেরই একজন ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের তথাকথিত মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি আসলেই স্বতঃস্ফূর্ত কোনো জননেতা ছিলেন, নাকি একটি সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তৈরি করা কোনো ল্যাবরেটরি প্রজেক্ট? যাকে আমরা বলতে পারি ‘প্রজেক্ট হাদি’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একটি নির্মম সত্য রয়েছে: যখন কোনো অদৃশ্য শক্তি বা ডিপ স্টেট (Deep State) একটি নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তখন তারা এমন কিছু উগ্র, আবেগপ্রবণ এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসে, যাদের সমাজ বা মূলধারার রাজনীতিতে কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। এই চরিত্রগুলোকে সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা এবং কৃত্রিম পাবলিক রিলেশনস (Fake PR)-এর মাধ্যমে হিরো বা ‘কাল্ট ফিগার’ বানানো হয়, এবং সময় ও প্রয়োজন শেষে তাদেরই আবার বলির পাঁঠা (Sacrificial Lamb) হিসেবে ব্যবহার করে নিজস্ব এজেন্ডা হাসিল করা হয়। ওসমান হাদির জীবন, উগ্র রাজনীতি, ঢাকা-৮ আসনের রহস্যময় পলিটিক্যাল স্টান্ট এবং শেষ পর্যন্ত পবিত্র জুম্মাবারে তাঁর চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড এই ‘প্রজেক্ট হাদি’রই এক একটি নিখুঁত ব্লুপ্রিন্ট। আজ আমরা এই পুরো চক্রান্তের আদ্যোপান্ত এবং পর্দার আড়ালের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করব।
ওসমান গনি থেকে ‘শরীফ ওসমান বিন হাদি’
যেকোনো ছদ্মবেশী রাজনৈতিক এজেন্টের প্রথম কাজই হলো নিজের অতীত ও পরিচয়কে আড়াল করে একটি নতুন ‘সোশ্যাল ইমেজ’ তৈরি করা। শরিফ ওসমান হাদির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
আসল পরিচয় ও ছদ্মনাম: তাঁর আদি বাড়ি ঝালকাঠি জেলায় এবং তাঁর প্রকৃত নাম ছিল অত্যন্ত সাধারণ ওসমান গনি। ঢাকায় আসার পর তিনি নিজেকে একজন বুদ্ধিজীবী ও লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ‘সীমান্ত শরীফ’ ছদ্মনামে একটি বইও লিখেছিলেন, যা পাঠকমহলে সম্পূর্ণ অলক্ষিত থেকে যায়।
বংশীয় পদবির কৃত্রিম সংযোজন: সাধারণ ওসমান গনি থেকে ফেসবুকে এবং নাগরিক সমাজে রাতারাতি প্রভাব বিস্তার করার জন্য তিনি নিজের নামের সাথে বাবার ও বংশের পদবি যোগ করে অত্যন্ত গালভরা নাম ধারণ করেন ‘শরীফ ওসমান বিন হাদি’।
৫ই আগস্টের আগের অদৃশ্য সত্তা: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের আগে বাংলাদেশের মূলধারার ছাত্র রাজনীতি বা জাতীয় আন্দোলনে ওসমান হাদির কোনো নামগন্ধও ছিল না। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত এক চরিত্র। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর যখন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক দোকানটি খোলা হয়, তখন এই জাশির (জামায়াত-শিবির) ফ্রন্ট অর্গানাইজেশনের মূল মুখ বা মুখপাত্র হিসেবে এই ওসমান হাদিকে স্পটলাইটে নিয়ে আসা হয়।
রাজনীতির নামে চরম উগ্রতা ও ধানমন্ডি ৩২
ওসমান হাদিকে যারা প্রগতিশীল বা জুলাই বিপ্লবের আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন, তাদের স্মৃতিশক্তি হয়তো অত্যন্ত দুর্বল, অথবা তারা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদির আসল হিংস্র ও কুরুচিপূর্ণ চেহারাকে আড়াল করতে চান। ৫ই আগস্টের পর ঢাকার রাজপথে হাদির মূল অবদান ছিল অশ্লীল গালিগালাজ, মব জাস্টিসের নেতৃত্ব দেওয়া এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর পৈশাচিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
গোপালগঞ্জের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কুৎসিত উল্লাস
গোপালগঞ্জে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের কবর গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটি উগ্র ন্যারেটিভ ছড়িয়ে কিংস পার্টি এনসিপি (NCP) উস্কানি দিতে যায়, তখন স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিরোধ করে। সেই প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সরাসরি ইশারায় ও নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনী নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালায়। এতে ৭ জন নিরপরাধ মানুষ নিহত হন এবং ৩১ জনেরও বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন।
এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর, সেই নিহত ৭ জন নিরপরাধ মানুষের তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ওসমান হাদি ঢাকার রাজপথে চিৎকার করে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক। তিনি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ভাষায় তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে কুৎসিত স্লোগান দেন, শেখ হাসিনার গোপনাঙ্গ ছিড়ে ফেলার হুমকি দেন এবং পুরো গোপালগঞ্জের মানুষকে অত্যন্ত নোংরা ভাষায় গালি দিয়ে বলেন: "খানকীর পোলাগো শাওয়া মাওয়া ছিঁড়া ফালাইতে হবে।"
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে মায়ের বয়সী নারীর ওপর বর্বরতা
ওসমান হাদিকে প্রথম স্বচক্ষে লাঠি হাতে তাণ্ডব চালাতে দেখা যায় ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে। ১৫ই আগস্টের শোক প্রকাশ করতে আসা একজন ৫০/৬০ বছর বয়সী মায়ের বয়সী সাধারণ নারীকে হাদি এবং তার দলবল হায়েনার মতো ঘিরে ধরে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিল। সেই অসহায় নারীর ওপর যখন মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হচ্ছিল, তখন হাদি নিজে লাঠি উঁচিয়ে স্লোগান দিচ্ছিল:
"দেখতে পাইলে বাকশাল শাওয়া মাওয়া ছিঁড়া ফেল", "একটা একটা লীগ ধর, ধইয়া ধইয়া জবাই কর।"
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, প্রকাশ্য রাজপথে একজন প্রবীণ নারীকে লাঞ্ছিত করা এবং মানুষকে ‘জবাই’ করার এই উগ্র উস্কানিই ছিল ওসমান হাদির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।
ইতিহাস বিকৃতি, মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডার কারখানা
ওসমান হাদি কেবল মাঠপর্যায়ের ক্যাডার ছিলেন না, তাকে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিশাল প্রোপাগান্ডা ও গুজবের নেটওয়ার্ক চালানো হতো। তাঁর বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, মহান স্বাধীনতার স্থপতি এবং জাতীয় নারীদের সম্মানকে প্রতিনিয়ত কালিমালিপ্ত করেছেন।
ওসমান হাদি তাঁর একাধিক বক্তব্যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রচার করতেন যে:
"২০২৪ সালের আন্দোলন বা ২৪ হয়েছে মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে।"
এটি কোনো সাধারণ বক্তব্য ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্মের মূল চেতনা, ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি অস্বীকার করার এক পাকিস্তানি ব্লুপ্রিন্ট।
তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে কুৎসিত মিথ্যাচার
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মহান নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে ওসমান হাদি অত্যন্ত জঘন্য এক গুজব ছড়িয়েছিলেন। তিনি দাবি করতেন, তাজউদ্দীন আহমদ নাকি ভারতের সাথে গোপন চুক্তি করেছিলেন যে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখবে না, পুরো বাংলাদেশ ভারতীয় সেনা দিয়ে পরিচালিত হবে। এই ধরণের ঐতিহাসিক অসত্য ও ডাহা মিথ্যা তথ্য ছড়ানোই ছিল হাদির প্রধান কাজ, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের তরুণ প্রজন্মের মনে ভারত-বিদ্বেষ এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের প্রতি চরম ঘৃণা তৈরি করা।
ঢাকা-৮ আসনের পলিটিক্যাল ব্লুপ্রিন্ট এবং গণপ্রত্যাখ্যান
ওসমান হাদির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও হাস্যকর প্রহসনটি মঞ্চস্থ হয় যখন তাকে ঢাকার অন্যতম হেভিওয়েট ও গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-৮-এ নির্বাচনের জন্য দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। দেশে তখন কোনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, নির্বাচনের কোনো নামগন্ধ ছিল না, অথচ হাদি তাঁর প্রভুদের নির্দেশে আগাম নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।
শাহজাহানপুর ও মাছ বাজারের অপমান
হাদি মনে করেছিলেন রাজপথে গালিগালাজ আর ফেসবুকের ফেক ভিউ দিয়ে নির্বাচন জয় করা যায়। কিন্তু ঢাকা-৮ আসনের সচেতন ভোটাররা তাঁর আসল রূপ চিনতে ভুল করেননি। শাহজাহানপুরে নির্বাচনী প্রচারণায় গেলে স্থানীয় ক্ষুব্ধ মহিলারা হাদির মাথার ওপর ওপর থেকে ময়লা পানি পর্যন্ত ঢেলে দেন। পথেঘাটে সাধারণ মানুষ তাকে দেখলেই অপমান করত, বাজে কথা বলতো।
এমনকি একদিন সাধারণ মাছ বাজারে যখন সে লিফলেট নিয়ে ভোট চাইতে যায়, তখন সাধারণ মাছ বিক্রেতারা ও ক্রেতারা তাকে ‘ধুর ধুর’ করে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়। জুমার নামাজের পর বিভিন্ন মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে যখন সে নির্লজ্জের মতো নির্বাচনী লিফলেট বিতরণ করত, তখন সাধারণ মুসল্লিরা সেই লিফলেট হাতে নেওয়া তো দূরের কথা, মুখ ফিরিয়ে চলে যেতেন।
৫ হাজার ভোট পাওয়ারও যোগ্যতা ছিল না
যে এলাকায় বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা, যাকে ঢাকার রাজনীতির ‘কিং’ বলা হয়, সেই মির্জা আব্বাসের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর ভোটব্যাংক, সেখানে ওসমান হাদির মতো একজন উগ্র ও অখ্যাত ক্যাডারকে দাঁড় করানোর পেছনে একটি গভীর ষড়যন্ত্র ছিল। এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ যারা বোঝেন, তাদের মতে হাদি যদি বেঁচেও থাকতেন, সুষ্ঠু নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ৫ হাজার ভোট পাওয়াও অসম্ভব ছিল। হাদি নিজেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সার্কেলে বহুবার স্বীকার করেছিলেন যে, তাঁর মিনিমাম টার্গেট হলো জাস্ট ৫০০ থেকে ১০০০ ভোট শো করা। তাহলে কেন তাকে এই আসনে প্রার্থী করা হলো? কারণ, তাকে দিয়ে খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমান এবং জুলাই বিপ্লবের পক্ষে ভালো ভালো কথা বলিয়ে বিএনপির ভোটব্যাংকে ফাটল ধরানো এবং একই সাথে ভারতের বিরুদ্ধে উগ্র বক্তব্য দেওয়াই ছিল মূল মাস্টারপ্ল্যান।
রক্তের হোলিখেলা বনাম জামায়াতের নোংরা রাজনীতি
ওসমান হাদি ব্যক্তি হিসেবে যতই খারাপ, উগ্র বা অশ্লীল হোন না কেন, তাঁর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কোনো সচেতন বা বিবেকবান মানুষ সমর্থন করতে পারে না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা কাউকে গুলি করে মেরে ফেলা একটি চরম ও ঘৃণ্যতম অপরাধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশে যে নোংরা রাজনীতির খেলা শুরু হলো, তার নেপথ্যে কী ছিল?
জুলাই-পরবর্তী নিধনযজ্ঞ
ওসমান হাদি যে বছর মারা গেছেন, সেই একই বছর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতায় ৪,৩০০ জনেরও বেশি মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর বিএনপি এবং জামায়াত-শিবির দেশজুড়ে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে সরকারি দলের লোকজনকে নিধনের এক উৎসব শুরু করে। সরকারি হিসাব মতেই, জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১২ জন করে মানুষ খুন হচ্ছিলেন। বেসরকারি বা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে এই তালিকা কয়েক গুণ বেশি দীর্ঘ।
ব্লেম-গেম ও প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার
ওসমান হাদি নিহত হওয়ার সাথে সাথেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডের সমস্ত দোষ চাপানো হলো আওয়ামী লীগের ওপর, ভারতের র (RAW)-এর ওপর এবং স্থানীয় প্রার্থী বিএনপির মির্জা আব্বাসের ওপর। অথচ একটু ঠাণ্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়:
আওয়ামী লীগের কোনো লাভ ছিল না: ওসমান হাদির মতো একজন গালিবাজ ক্যাডার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য কখনোই কোনো থ্রেট বা হুমকি ছিলেন না। বরং হাদির মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে। হাদি হত্যার দোহাই দিয়ে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর চলমান মামলা, গ্রেফতার ও শারীরিক নির্যাতনকে এক ধরণের ‘বৈধতা’ দেওয়া গেছে। হাদির মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ কর্মীদের ওপর হত্যাকাণ্ডের হার কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
মির্জা আব্বাসের ক্ষতি: ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের জয় ছিল শতভাগ নিশ্চিত ও সহজ। কিন্তু ওসমান হাদির এই রহস্যময় মৃত্যুর পর মির্জা আব্বাসের সেই সহজ জয়কে অত্যন্ত কঠিন ও বিতর্কিত করে তোলা হয়েছে। ফলে হাদির মৃত্যুতে আব্বাসের রাজনৈতিক ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি হয়েছে।
আসল বেনিফিশিয়ারি কারা? ইনকিলাব মঞ্চের বিদেশি ফান্ডিং ও ‘ডিপ স্টেট’
তাহলে ওসমান হাদির মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি লাভ কার হলো? অপরাধ বিজ্ঞানের মূল সূত্রই হলো "Cui bono?" অর্থাৎ, এই অপরাধের ফলে কে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী বা বেনিফিশিয়ারি? উত্তরটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হাদির মৃত্যুর একমাত্র বেনিফিশিয়ারি হলো জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের অঙ্গ সংগঠন ও কিংস পার্টি এনসিপি (NCP)।
ফেক পিআর ও কাল্ট ফিগার তৈরি
গুলি খাওয়ার আগে পর্যন্ত যে ওসমান গনির একমাত্র পরিচয় ছিল ‘এক শাওয়া মাওয়া গালি’, তাকে মৃত্যুর পর রাতারাতি মিডিয়া ও ফেসবুক প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে পাকিস্তানপন্থী বলয়ের এক ‘মহান শহীদ’ বা কাল্ট ফিগারে রূপান্তর করা হলো। জামায়াত ও এনসিপি হাদির লাশের ওপর দাঁড়িয়ে সবচেয়ে নোংরা রাজনীতিটি করেছে। সাধারণ মানুষ ও প্রগতিশীল মহলে হাদির অবস্থান অত্যন্ত ঘৃণ্য থাকলেও, উগ্রপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী বলয়ে তাকে এক কৃত্রিম আইকন বানানো হয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের তুর্কি-পাকিস্তানি ফান্ডিং
২০২৪ সালের আগস্টের আগে এই ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক জাশির (জামায়াত-শিবির) দোকানটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এটি সম্পূর্ণ বিদেশি ফান্ডিংয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রজেক্ট। বাংলাদেশে যেখানে তুরস্কের কোনো বড় রাজনৈতিক অ্যালাই বা মিত্র নেই, সেখানে ইনকিলাব মঞ্চই প্রথম তুরস্ক ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার (ISI) এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নামে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও অত্যন্ত ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে দেখা যায় এক রহস্যময় ব্যক্তি ওসমান হাদির পকেটে সরাসরি মোটা টাকার বান্ডিল ঢুকিয়ে দিচ্ছে। হাদি লাইভে এসে দাবি করেছিলেন যে তিনি সেই লোককে চেনেন না। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ওই ব্যক্তি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম প্রধান নিয়মিত ডোনার বা অর্থদাতা। হাদির মৃত্যুর পর এই বিশাল অঙ্কের বিদেশি ফান্ডের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় জাবের নামক আরেক ক্যাডার নেতার হাতে। এই জাবেরই এখন দাতাদের সেই রাষ্ট্রবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। সম্প্রতি হাদির গায়েবানা জানাজায় উগ্র জঙ্গিবাদী সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত কুখ্যাত সামরিক কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান-এর উপস্থিতিই প্রমাণ করে—ইনকিলাব মঞ্চের সাথে আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সংযোগ কতটা গভীর।
ভাই ওমর বিন হাদির ফেসবুক পোস্ট এবং ৪টি জ্বলন্ত প্রশ্ন
ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড যে একটি চরম ইনসাইডার ডিল বা ভেতরের মানুষের কাজ, তা প্রমাণ করেছেন স্বয়ং হাদির আপন বড় ভাই ওমর বিন হাদি। তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে সরাসরি জামায়াতে ইসলামীকে ভাইয়ের খুনের জন্য দায়ী করেছেন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভেতরের কিছু প্রভাবশালী কুশীলবদের এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়েছেন।
আমরা যদি এই পুরো চক্রান্তের ডট বা বিন্দুগুলোকে মেলাতে চাই, তবে নিচের ৪টি জ্বলন্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে:
ফয়সাল কানেকশন: ফয়সাল নামক যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ওসমান গনি ওরফে হাদিকে সরাসরি গুলি করেছিল, সে কার ইশারায় এই অপারেশন চালিয়েছিল?
অস্ত্র মামলার জামিন: হাদির ওপর হামলা করার কিছুদিন আগেও ফয়সাল একটি গুরুতর অস্ত্র মামলায় জেল খাটছিল। সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে জেল থেকে জামিন করিয়ে আনার পেছনে কোন রাজনৈতিক দলের লিগ্যাল প্যানেল কাজ করেছিল?
হাদির কাছে প্রবেশাধিকার: এই ফয়সালকে কে প্রথম ওসমান হাদির ব্যক্তিগত টিমে এবং ইনকিলাব মঞ্চের সুরক্ষিত বলয়ের ভেতরে নিয়ে এসেছিল?
নির্বাচনী প্রচারণার সার্বক্ষণিক সঙ্গী: হাদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হতে এবং ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচনী প্রচারণায় হাদির ঠিক পাশেই সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো লেগে থাকতে ফয়সালকে কে বা কারা সাহায্য করেছিল?
এই ৪টি প্রশ্নের উত্তর যদি আপনি নিবিড়ভাবে খোঁজেন, তবে ইনকিলাব মঞ্চের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান এক শীর্ষ নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ার ও তার অত্যন্ত প্রভাবশালী পুত্রের নাম সরাসরি সামনে চলে আসবে।
প্রজেক্ট হাদি ও সমসাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণ ম্যাট্রিক্স
ওসমান হাদির উত্থান, তাঁর উগ্র রাজনীতি, ঢাকা-৮ আসনের ব্লুপ্রিন্ট এবং এই হত্যাকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারি কারা তা একনজরে বোঝার জন্য নিচে একটি তথ্যসমৃদ্ধ ছক দেওয়া হলো:
‘প্রজেক্ট হাদি’র অপারেশনাল ও রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ
সূচক / ক্ষেত্র | ওসমান হাদির দৃশ্যমান রূপ ও স্টান্ট | পর্দার আড়ালের আসল সত্য ও মেকানিজম | রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য |
আসল পরিচয় | শরীফ ওসমান বিন হাদি, লেখক ও প্রগতিশীল জুলাই আইকন। | আসল নাম ওসমান গনি, বাড়ি ঝালকাঠি। ‘সীমান্ত শরীফ’ ছদ্মনামের ব্যর্থ লেখক। | নিজের অতীত আড়াল করে একটি কৃত্রিম ‘বুদ্ধিজীবী ক্যাডার’ ইমেজ তৈরি করা। |
মাঠপর্যায়ের রাজনীতি | ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, ভারত-বিরোধী বীর সৈনিক। | ধানমন্ডি ৩২-এ প্রবীণ নারী নির্যাতনকারী, গোপালগঞ্জের নিহতের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে অশ্লীল গালিবাজ। | মব জাস্টিস ও উগ্র স্লোগানের মাধ্যমে ঢাকার রাজপথে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা। |
ইতিহাস চেতনা | ২৪-এর বিপ্লবকে একাত্তরের চেয়ে বড় প্রমাণ করার চেষ্টা। | মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভারতের চক্রান্ত’ বলা এবং তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে কুৎসিত প্রোপাগান্ডা ছড়ানো। | তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাই করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করা। |
নির্বাচনী ব্লুপ্রিন্ট | ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়া। | সাধারণ মানুষের কাছে চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত (মাথার ওপর ময়লা পানি ও মাছ বাজারে ধুর ধুর)। | বিএনপির ভোটব্যাংকে ফাটল ধরানো এবং মির্জা আব্বাসের সহজ জয়কে বিতর্কিত করা। |
অর্থায়নের উৎস | সাধারণ মানুষের চাঁদা ও ইনকিলাব মঞ্চের নিজস্ব ফান্ড। | তুরস্ক ও পাকিস্তানের (ISI) গোপন ফান্ডিং। পকেটে টাকার বান্ডিল ঢোকানোর ভিডিও ভাইরাল। | বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট চরমপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক কার্টেল প্রতিষ্ঠা করা। |
হত্যাকাণ্ডের শিকার | আওয়ামী লীগ বা ভারতীয় র (RAW) দ্বারা টার্গেটেড মার্ডার। | ইনসাইডার হিট। অস্ত্র মামলার আসামী ফয়সাল ও জামায়াত নেতার ছেলের মরণফাঁদ। | হাদিকে ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়ে একটি উগ্র কাল্ট ফিগার তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষকে ফ্রেমিং করা। |
চূড়ান্ত বেনিফিশিয়ারি | বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও জুলাই বিপ্লবের কর্মীরা। | জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং হাদির ফান্ডের নতুন ম্যানেজার জাবের। | হাদির লাশের ওপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড বা ফায়দা তোলা এবং পরবর্তী উগ্র এজেন্ডা বাস্তবায়ন। |
‘প্রজেক্ট হাদি’ বা এই ধরনের গভীর রাজনৈতিক ছদ্মবেশের (Deep State Operations) নেপথ্য কৌশলগুলো কেবল মাঠপর্যায়ের অপরাধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এই পুরো পলিটিক্যাল থ্রিলারের পেছনে কাজ করে আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডা মেশিন, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare) এবং সুনির্দিষ্ট কিছু ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম এবং 'ফেক পিআর'
২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর যেকোনো সাধারণ বা উগ্র চরিত্রকে রাতারাতি ‘জাতীয় নায়ক’ বানানোর জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। হাদির ক্ষেত্রেও ঠিক এই ফর্মুলাটি প্রয়োগ করা হয়েছিল:
কো-অর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার (CIB): হাদির অশ্লীল গালিগালাজ বা উগ্র বক্তব্যগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একদল সুসংগঠিত সাইবার সেল বা 'বটনেট' ব্যবহার করা হতো। ইনকিলাব মঞ্চের পেছনের আইটি টিম সুনির্দিষ্ট কিছু কি-ওয়ার্ড (যেমন: ভারত-বিরোধিতা, বর্জন, বিপ্লব) ব্যবহার করে ফেসবুক ও ইউটিউবের অ্যালগরিদমকে হাইজ্যাক করত, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের টাইমলাইনে হাদির ভিডিওগুলো বারবার প্রদর্শিত হয়।
ইকো চেম্বার (Echo Chamber) তৈরি: এই প্রক্রিয়ায় ভিন্নমতাবলম্বী বা প্রগতিশীলদের যেকোনো যৌক্তিক প্রশ্নকে ট্রোলিং এবং গণ-গালাগালির মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়া হতো। এর ফলে একটি কৃত্রিম জনমত তৈরি হয়, যা দেখে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে ভাবত হাদি হয়তো সত্যিই বিশাল কোনো বিপ্লবী নেতা।
ডিপ স্টেটের 'কাল্ট মেকিং' এবং 'ইউটিলাইজেশন' ফর্মুলা
রাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হয় "The Martyrdom Strategy" বা শহীদ বানানোর কৌশল। যখন কোনো উগ্র এজেন্টের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়, বা তাকে জীবিত রাখার চেয়ে তার মৃত লাশ দিয়ে বেশি ফায়দা তোলা সম্ভব হয়, তখন মাস্টারমাইন্ডরা নিচের ৩টি ধাপে কাজ সম্পন্ন করে:
ধাপ ১ (স্পটলাইট): প্রথমে তাকে দিয়ে এমন সব স্পর্শকাতর বিষয়ে উগ্র বক্তব্য দেওয়ানো হয়, যা সমাজের একটি বড় অংশকে ক্ষুব্ধ করে (যেমন: ধানমন্ডি ৩২-এ প্রবীণ নারী নির্যাতন বা তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে মিথ্যাচার)।
ধাপ ২ (প্রতিপক্ষের মুখোমুখি): এরপর তাকে এমন একটি আসনে (যেমন: ঢাকা-৮) বা এমন একজন হেভিওয়েট নেতার (যেমন: মির্জা আব্বাস) মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, যাতে হাদির কোনো ক্ষতি হলে তার দায় সরাসরি ওই প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের ওপর চাপানো সহজ হয়।
ধাপ ৩ (ইনসাইডার হিট): সবশেষে নিজেদেরই কোনো বিশ্বস্ত স্লিপার সেল (যেমন: অস্ত্র মামলার আসামী ফয়সাল) দিয়ে তাকে অত্যন্ত সুরক্ষিত বা পরিচিত পরিবেশের মধ্যে হত্যা করা হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে খুনিদের আড়াল করে পুরো দোষ প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
তুর্কি-পাকিস্তানি অক্ষ ও ফান্ডিং রুট
ইনকিলাব মঞ্চ এবং তার মুখপাত্র হাদির পেছনে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থের প্রবাহ ছিল, তার রুট বা উৎসগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।
এনজিও এবং চ্যারিটি ফান্ডের আড়াল: এই ধরনের চরমপন্থী সংগঠনের কাছে সরাসরি কোনো রাষ্ট্র বা গোয়েন্দা সংস্থা টাকা পাঠায় না। মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক বা পাকিস্তানের কিছু ছদ্মবেশী এনজিও, ধর্মীয় চ্যারিটি ফাউন্ডেশন বা সাংস্কৃতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের আড়ালে এই ফান্ডগুলো বাংলাদেশে আসত। হাদির পকেটে ক্যাশ টাকার বান্ডিল ঢোকানোর যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছিল, তা ছিল এই চেইন বা লাইনের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ মাত্র।
ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে একটি স্থায়ী অস্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে (যেমন: বিএনপি বা আওয়ামী লীগ) সবসময় ব্যাকফুটে রাখা এবং উগ্রবাদী কার্ড খেলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে একটি 'চরমপন্থী রাষ্ট্র' হিসেবে ফ্রেমিং করাই ছিল এই বিদেশী অর্থদাতাদের মূল লক্ষ্য।
পাইপলাইনের নব্য এজেন্ট এবং 'কার্ড রিডিং'
হাদির মৃত্যুর পর এই ফান্ডের নতুন ম্যানেজার হিসেবে জাবের যেভাবে লাইমলাইটে এসেছেন এবং তার সাথে যেভাবে জঙ্গি-সম্পৃক্ততায় বহিষ্কৃত সামরিক কর্মকর্তা হাসিনুরের মতো ব্যক্তিদের যোগাযোগ দেখা যাচ্ছে, তা ইঙ্গিত করে যে এই চক্রান্ত এখানেই থামছে না।
নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী এবং সালাউদ্দিন আম্মারদের ভূমিকা: এই তরুণদের এখন প্রতিনিয়ত জনসমক্ষে উগ্র ও বিভেদমূলক বক্তব্য দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এদেরকে দিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যাতে প্রগতিশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের কাছে এরা চরম ঘৃণিত চরিত্রে পরিণত হয়।
কেন এই উস্কানি? কারণ এই মাস্টারমাইন্ডরা খুব ভালো করেই জানে, এই চরিত্রগুলো যত বেশি বিতর্কিত ও ঘৃণিত হবে, এদেরকে ‘বলি’ দেওয়া তত বেশি সহজ হবে এবং সমাজজুড়ে তত বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবে। এরা মূলত এক একটি টাইম-বোমা, যার রিমোট কন্ট্রোল রয়েছে ডিপ স্টেটের হাতে।
জনমনস্তত্ত্ব ও দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ক্ষতি
‘প্রজেক্ট হাদি’র মতো অপতৎপরতা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দেয়:
আসল বিপ্লবীদের অবমূল্যায়ন: এই ধরনের ফেক পিআর বা কৃত্রিম আইকনদের অতি-মূল্যায়নের ফলে, জুলাই আন্দোলনের আসল ত্যাগী, মেধাবী ও যৌক্তিক ছাত্র-নেতারা আড়ালে চলে যান। আন্দোলনের মূল স্পিরিট বা চেতনা কালিমালিপ্ত হয়।
বিচারহীনতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: হাদির নিজের ভাই যেখানে সরাসরি জামায়াত ও সরকারের ভেতরের লোকদের দিকে আঙুল তোলার পরও তদন্ত থমকে থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার ওপর গভীর অনাস্থা তৈরি হয়। এটি সমাজে মব জাস্টিস ও প্রতিশোধের রাজনীতিকে আরও বেশি উস্কে দেয়।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, ওসমান হাদি কোনো বিচ্ছিন্ন চরিত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি সুগভীর ও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক এক্সপেরিমেন্টের অংশ।
পাইপলাইনের পরবর্তী বলির পাঁঠা ও কার্টেল পলিটিক্স
ওসমান হাদিকে যেভাবে গুলি করে মারা হলো এবং যেভাবে তাঁর লাশ নিয়ে নোংরা পিআর বা প্রোপাগান্ডা চালানো হলো, তা এই চক্রের প্রথম বা শেষ খেলা নয়। বাংলাদেশের নব্য পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক বলয়, ডিপ স্টেট এবং চরমপন্থী কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী যাদের সাথে সরাসরি সংযুক্ত রয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্কের কিছু বিশেষ উইং তারা তাদের ডেস্কে এই ধরণের একাধিক ‘প্রজেক্ট’ রেডি করে রেখেছে।
রাজনৈতিক সিক্সথ সেন্স এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সিন্ডিকেটটি পাইপলাইনে আরও একাধিক বলির পাঁঠা তৈরি করে রেখেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো:
নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী
সালাউদ্দিন আম্মার
জাবের
এই নব্য তরুণদের দিয়ে অনবরত উগ্র, সাম্প্রদায়িক এবং রাষ্ট্রবিরোধী রসদ সরবরাহ করানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদেরকেও কৃত্রিমভাবে হিরো বানানোর প্রক্রিয়া চলমান। ঠিক যেভাবে ওসমান হাদিকে মির্জা আব্বাসের সামনে দাঁড় করিয়ে ফাইনালি এক পবিত্র জুম্মাবারে জুমার নামাযের পর পরই গুলি করে দেওয়া হলো যা একদম কোনো স্পাই সিনেমাকেও হার মানায় ঠিক একইভাবে সময় ও রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী এই নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, আম্মার বা জাবেরদেরও কোনো একদিন কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হবে অথবা রাজপথে বলি দেওয়া হবে। খুনিরা আর কেউ নয়, সবসময় এদের আশেপাশেই ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় এবং কাজ শেষে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হাওয়া হয়ে যায়।
অন্ধকারের চক্রব্যূহ ও নব্য বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
‘প্রজেক্ট হাদি’ বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য এক চরম শিক্ষণীয় ও নির্মম বাস্তবতার দলিল। ২০২৪ সালের আগস্টের আগে যাকে দেশের কোনো মানুষ চিনত না, তাকে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডায় ক্ষমতার একদম কেন্দ্রে নিয়ে আসা হলো, দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হলো, খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে ভালো ভালো কথা বলানো হলো, এবং যখনই দেখা গেল ভারত-বিরোধী ও আওয়ামী-বিরোধী পলিটিক্যাল ডিভিডেন্ড তোলার জন্য তাঁর একটি ‘মৃত লাশ’ বেশি কার্যকরী ঠিক তখনই তাঁর প্রভুরা তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিল।
উগ্রতা, অশ্লীলতা এবং ইতিহাসের বিকৃতি কখনো কোনো ইতিবাচক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বয়ে আনতে পারে না। ওসমান হাদিকে যারা আজ মহান বানানোর চেষ্টা করছেন, তারা মূলত খুনিদেরই আড়াল করছেন। হাদির নিজের ভাই যেখানে জামায়াত ও অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন, সেখানে এই মামলার ফাইল ধামাচাপা দেওয়া প্রমাণ করে ষড়যন্ত্রের শিকড় কত গভীরে।
বাংলার সাধারণ মানুষ ও প্রগতিশীল সমাজ ওসমান হাদির উগ্র ও কুৎসিত রাজনীতিকে যেভাবে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল, আজ তাঁর মৃত্যুর পরও সেই সত্যটি একই রকম ভাস্বর। নব্য বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যদি এই ধরণের ‘ডিপ স্টেট প্রজেক্ট’ এবং লাশের রাজনীতির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে, তবে তা পুরো জাতির সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। পাইপলাইনে থাকা পরবর্তী বলির পাঁঠারা কি হাদির এই পরিণতি দেখে সতর্ক হবে, নাকি ক্ষমতার লোভে নিজেরাও একই মরণফাঁদে পা দেবে তা সময়ই বলে দেবে।
লেখক: বিদ্যুৎ আহমেদ মিহির, কলেজ শিক্ষক














