বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ঘৃন্য বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাকের পরিণতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি নাম খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফর আলী খান যে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাক সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটান। তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং তাদের শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ ও লাঞ্ছনাকর।

TruthBangla
Dec 21, 2025
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা যেদিন মারা গেলো সবাই কান্নাকাটি শুরু করল। তবে সবচেয়ে বেশি যে কান্নাকাটি করলো সেটা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাই বোনদের কেউ না। তিনি হাউমাউ করে কান্নাকাটি করলেন। মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্নাকাটি করলেন। তার কান্নাকাটি দেখে শেখ মুজিবুর রহমান নিজেদের পিতৃশোক ভুলে তাকে সান্তনা দিতে শুরু করলেন। এমন কি লাশ নামানোর জন্য নিজেই কবরে নামলেন। তারপর শুরু করলেন নতুন নাটক। তিনি কবর থেকে উঠবেন না। সবাইকে অনুরোধ করলেন যেন তাকেসহ কবর দিয়ে দেয়া হয়। শেখ মুজিবের পিতাকে কবরে একা রেখে তিনি উপরে উঠে আসতে পারবেন না। তখন সবাই তাকে বুঝিয়ে কবর থেকে উঠিয়ে দাফন সম্পন্ন করলেন। এই মহান মানুষটি আর কেউ নন, তিনি এই দেশের এক ঘৃন্য বিশ্বাসঘাতক ৮৩ দিনের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি নাম খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফর আলী খান যে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাক সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটান। তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং তাদের শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ ও লাঞ্ছনাকর। আজ আমরা আলোচনা করব খন্দকার মোশতাকের সেই নাটকীয় চাটুকারিতা, বঙ্গবন্ধুর রক্ত মাড়িয়ে ক্ষমতারোহণ এবং পরবর্তী ২১ বছরের দুর্বিষহ ও অবমাননাকর জীবন নিয়ে।
চাটুকারিতার আড়ালে এক বিষাক্ত মীর জাফরের উপাখ্যান
ইতিহাসে অনেক সময় চরম শত্রুকে চেনা সহজ হয়, কিন্তু বন্ধুরূপী শত্রুকে চেনা হয়ে ওঠে দায়। খন্দকার মোশতাক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, কিন্তু তাঁর মনের গহীনে পুষে রাখা উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও হিংসা শেষ পর্যন্ত তাঁকে পরিণত করেছিল এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রকারীতে। তাঁর এই বিশ্বাসঘাতকতার গল্প শুরু হয়েছিল প্রবল চাটুকারিতা ও ভণ্ডামির মধ্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধুর পিতার মৃত্যু ও মোশতাকের নাটক
খন্দকার মোশতাকের ধূর্ত চরিত্রের একটি বড় প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমানের মৃত্যুর সময়। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের পরিবারের সদস্য মনে করতেন। শেখ লুৎফর রহমান যেদিন মারা গেলেন, তখন শোকাতুর পরিবেশে সবাই যখন কান্নাকাটি করছিলেন, মোশতাক সেখানে এমন এক নাটক মঞ্চস্থ করলেন যা দেখে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাই-বোনদের চেয়েও উচ্চস্বরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করলেন। এক পর্যায়ে তিনি মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করতে থাকেন। তাঁর কান্নার তীব্রতা দেখে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু নিজের শোক ভুলে মোশতাককে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসেন। নাটকটি এখানেই শেষ হয়নি; যখন লাশ দাফনের জন্য কবরে নামানো হলো, মোশতাক নিজেই কবরে নেমে পড়লেন। দাফন শেষে তিনি আর কবর থেকে উঠতে চান না। তিনি সবাইকে অনুরোধ করতে লাগলেন, "আমাকেসহ কবর দিয়ে দাও, আমি আমার পিতাকে (লুৎফর রহমান) কবরে একা রেখে উপরে উঠে আসতে পারব না।" উপস্থিত মানুষ অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাঁকে কবর থেকে তুলে আনেন। তখন কে জানত, এই শোকাতুর মানুষটিই মাত্র কিছুকাল পরে এই পরিবারেরই রক্ত ঝরানোর নীলনকশা তৈরি করবেন!
বিশ্বাসঘাতকতা - ১৫ আগস্টের রক্তরঞ্জিত ক্ষমতা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে যখন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন সেই ষড়যন্ত্রের মূল কারিগর হিসেবে পর্দার আড়াল থেকে সামনে আসেন খন্দকার মোশতাক। বঙ্গবন্ধুর রক্ত তখনও শুকায়নি, অথচ সেই রক্তের ওপর দিয়েই তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ৮৩ দিনের সেই শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত সময়। তাঁর শাসনামলেই জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয় এবং খুনিদের রক্ষা করতে কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ জারি করা হয়।
পতনের শুরু ও ২১ বছরের ‘বন্দী’ জীবন
ক্ষমতা হারানোর পর মোশতাকের জীবনের আসল ট্র্যাজেডি শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হন। এরপর ১৯৭৬ সালে তিনি ‘ডেমোক্রেটিক লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাংলার মাটি ও মানুষ এই ঘাতককে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।
কথিত আছে, ১৯৭৬ সালে মোশতাক যখন তাঁর দলের একটি জনসভা ডাকেন ঢাকার পল্টন ময়দানে, তখন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। জনসভা শুরু হওয়ার আগেই কে বা কারা সভাস্থলে "কয়েক ডজন বিষধর সাপ" ছেড়ে দেয়। উপস্থিত মানুষ সাপের ভয়ে দিগিবিদিক জ্ঞান হারিয়ে পালিয়ে যায় এবং মোশতাকের সেই তথাকথিত রাজনৈতিক পুনরুত্থানের স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়। সেই ‘সাপের আক্রমণ’ থেকে বাঁচতে তিনি যে ঘরের ভেতর ঢুকেছিলেন, পরবর্তী ২১ বছর তিনি আর স্বাভাবিকভাবে জনগণের সামনে আসার সাহস পাননি। তিনি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং চার দেয়ালের মাঝে একপ্রকার স্বেচ্ছায় বন্দী জীবন কাটাতে বাধ্য হন। সূর্যের আলো যেন তাঁর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মৃত্যুর পর লাঞ্ছনা - জানাজা বিড়ম্বনা ও পরিচয়হীন কবর
১৯৯৬ সালের ৫ মার্চ খন্দকার মোশতাকের মৃত্যু হয়। ২১ বছর পর তাঁর লাশ যখন ঘর থেকে বের করা হয়, তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত। তাঁর লাশ নিয়ে আসা হয়েছিল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জানাজার জন্য। কিন্তু সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পুলিশ জানাজা পড়াতে ব্যর্থ হয়। জনগণের তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদে পুলিশ লাশ নিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে কুমিল্লার দাউদকান্দির দশপাড়া গ্রামে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে অত্যন্ত গোপনে তাঁকে দাফন করা হয়। সাধারণত প্রতিটি মানুষের কবরের গায়ে একটি এপিটাফ বা নামফলক থাকে, কিন্তু মোশতাকের কবরে কোনো নামফলক নেই। আজও তাঁর কবরটি একটি ‘অভিশপ্ত’ চিহ্ন হিসেবে পড়ে আছে।
পরিবারের বিচ্ছেদ ও ঘৃণা
মোশতাকের উত্তরসূরিদের জীবনও সুখকর হয়নি। তাঁর ছেলে-মেয়েরা বিদেশের মাটিতে পরিচয় লুকিয়ে জীবনযাপন করে। জনরোষের ভয়ে তারা কখনও তাঁদের গ্রামের বাড়িতে আসার সাহস পায় না। শোনা যায়, বিদেশের মাটিতেও তারা নিজেদের বাবার পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। এটিই হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শাস্তি যেখানে উত্তরসূরিরা পূর্বসূরির পরিচয় মুছে ফেলতে চায়।
ঘাতকদের বর্তমান দশা - বেওয়ারিশ জীবন
খন্দকার মোশতাকের ভাগ্য শুধু তাঁর একার নয়, বঙ্গবন্ধুর সকল হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীর ভাগ্য একই সূত্রে গাঁথা। যারা এখনও বিদেশের মাটিতে পালিয়ে আছে, তাদের জীবন অত্যন্ত শোচনীয়। তাদের না আছে সম্মান, না আছে শান্তি।
সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রোগ্রামে বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিমকে দেখা গেছে। তাঁর জরাজীর্ণ চেহারা এবং মলিন পোশাক দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে তিনি কতটা করুণ অবস্থায় আছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের একজন নিম্নবিত্ত মানুষও কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় কিছুটা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে, কিন্তু ডালিমের গায়ে ছিল জীর্ণ ব্লেজার ও পুরনো শার্ট। এটিই নিয়তির বিচার দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হত্যার পর তারা পৃথিবীতে আজ যাযাবর ও ভিখারির মতো জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।
ষড়যন্ত্রকারীদের ঐতিহাসিক পরিণতি
১৯৭১ সালের পর থেকে যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে, মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করেছে কিংবা বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কটূক্তি করেছে, তাদের প্রত্যেকের পরিণতিই খন্দকার মোশতাকের মতো হয়েছে। রাজাকার, আল-বদর এবং স্বাধীনতা বিরোধীরা সবসময় চোরের মতো লুকিয়ে রাজনীতি করেছে। জনসমক্ষে আসার নৈতিক সাহস তাদের কখনোই ছিল না। আজও তাদের প্রজন্মকে সমাজের মূলধারায় আসতে হলে পরিচয় লুকিয়ে বা গোপন পথে হাঁটতে হয়।
উপসংহার
খন্দকার মোশতাক আহমেদ আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘ঘৃণার’ এক জীবন্ত দলিল। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো অনেক কিছু রয়েছে। চাটুকারিতা দিয়ে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও, সত্য ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে চূড়ান্ত পরিণতি হয় অবমাননাকর। বঙ্গবন্ধুর রক্ত মাড়িয়ে গড়া সেই ক্ষমতা তাঁকে কেবল ধ্বংসই করেনি, বরং ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। বিশ্বাসঘাতকদের বিচার কেবল আদালতেই হয় না, জনতার আদালতে এবং সময়ের বিচারে তারা চিরকাল মীর জাফর হয়েই বেঁচে থাকে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















