বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ঘৃন্য বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাকের পরিণতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি নাম খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফর আলী খান যে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাক সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটান। তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং তাদের শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ ও লাঞ্ছনাকর।

TruthBangla

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা যেদিন মারা গেলো সবাই কান্নাকাটি শুরু করল। তবে সবচেয়ে বেশি যে কান্নাকাটি করলো সেটা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাই বোনদের কেউ না। তিনি হাউমাউ করে কান্নাকাটি করলেন। মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্নাকাটি করলেন। তার কান্নাকাটি দেখে শেখ মুজিবুর রহমান নিজেদের পিতৃশোক ভুলে তাকে সান্তনা দিতে শুরু করলেন। এমন কি লাশ নামানোর জন্য নিজেই কবরে নামলেন। তারপর শুরু করলেন নতুন নাটক। তিনি কবর থেকে উঠবেন না। সবাইকে অনুরোধ করলেন যেন তাকেসহ কবর দিয়ে দেয়া হয়। শেখ মুজিবের পিতাকে কবরে একা রেখে তিনি উপরে উঠে আসতে পারবেন না। তখন সবাই তাকে বুঝিয়ে কবর থেকে উঠিয়ে দাফন সম্পন্ন করলেন। এই মহান মানুষটি আর কেউ নন, তিনি এই দেশের এক ঘৃন্য বিশ্বাসঘাতক ৮৩ দিনের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি নাম খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফর আলী খান যে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাক সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটান। তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং তাদের শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ ও লাঞ্ছনাকর। আজ আমরা আলোচনা করব খন্দকার মোশতাকের সেই নাটকীয় চাটুকারিতা, বঙ্গবন্ধুর রক্ত মাড়িয়ে ক্ষমতারোহণ এবং পরবর্তী ২১ বছরের দুর্বিষহ ও অবমাননাকর জীবন নিয়ে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ঘৃন্য বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্যানভাসে যেমন ছড়িয়ে রয়েছে বীরত্ব, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও অসীম আত্মত্যাগের রূপকথা, তেমনই এর উল্টো পিঠে এঁকে দেওয়া হয়েছে কিছু নিকষ কালো কলঙ্কচ্ছায়া। রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার আলোচনা উঠলে খ্রিষ্টপূর্ব যুগের ব্রুটাস কিংবা ১৮ শতকের পলাশীর মীর জাফর আলী খানের নাম যেমন প্রথম সারিতে উঠে আসে, ঠিক তেমনি আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটির সবচেয়ে নিরেট ও কুখ্যাত সমার্থক নাম খন্দকার মোশতাক আহমেদ।
রাজনীতিতে আপাতদৃষ্টিতে শত্রু চেনা সহজ হলেও বন্ধুরূপী ছদ্মবেশী শয়তানকে চেনা অত্যন্ত কঠিন। মোশতাক ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ মিত্র। অথচ তাঁর ছদ্মবেশী আনুগত্য, অতি-চাটুকারিতা এবং বানোয়াট কান্নাকাটির অন্তরালে পুষে রাখা হয়েছিল পরম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ঈর্ষার তীব্র বিষ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে মোশতাক তাঁর কুৎসিত রূপটি উন্মোচিত করেন। কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে ইতিহাসে কোনো বিশ্বাসঘাতকের শেষ পরিণতি সম্মানিত বা গৌরবময় হয়নি। আজ আমরা আলোচনা করব খন্দকার মোশতাকের সেই নাটকীয় চাটুকারিতা, রক্ত মাড়িয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা দখল, ৮৩ দিনের কলঙ্কিত শাসন এবং পরবর্তী ২১ বছরের অবমাননাকর নিঃসঙ্গ জীবন থেকে শুরু করে নিথর লাশের ওপর জনতার গণঘৃণার আদ্যোপান্ত।
চাটুকারিতার আড়ালে এক বিষাক্ত মীর জাফরের উপাখ্যান
রাজনীতিতে তোষামোদ বা চাটুকারিতা নতুন কিছু নয়, তবে চাটুকারিতাকে যখন ধূর্ততার সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তা হয়ে ওঠে মারাত্মক এক মারণাস্ত্র। খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই শেখ মুজিবুর রহমানের অতি-আনুগত্য প্রকাশের ভন্ডামি লালন করতেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে থেকেও তিনি ভেতরে ভেতরে নিজস্ব একটা রক্ষণশীল, দক্ষিণপন্থী এবং প্রাক-পাকিস্তানি রাজনৈতিক বলয় তৈরি করে রেখেছিলেন।
খন্দকার মোশতাকের ধূর্ত ও নাটুকে স্বভাবের সবচেয়ে প্রামাণ্য এবং গা-শিউরে উঠা দৃশ্যটি দেখা গিয়েছিল ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে, যখন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ইন্তেকাল করেন।
বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের কেবল দলের সদস্য মনে করতেন না, বরং নিজের পরিবারের অংশ মনে করতেন। শেখ লুৎফর রহমানের মৃত্যুর পর শোকাতুর পরিবেশে সবাই যখন নীরবে অশ্রুপাত করছিলেন, তখন সেখানে এক নজিরবিহীন নাটক মঞ্চস্থ করলেন খন্দকার মোশতাক।
তিনি বঙ্গবন্ধুর নিজ ভাই-বোনদের চেয়েও উচ্চস্বরে হাউমাউ করে বিলাপ করতে শুরু করলেন। বিলাপ করতে করতে তিনি এক পর্যায়ে মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিতে থাকেন। তাঁর কান্নার আওয়াজ ও তীব্রতা এতই অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু নিজের পিতৃশোক সামলে উঠে মোশতাককে ধরে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসেন।
নাটকের চূড়ান্ত পর্ব তখনও বাকি ছিল। দাফনের উদ্দেশ্যে শেখ লুৎফর রহমানের মরদেহ যখন কবরে নামানো হলো, তখন মোশতাক নিজে কবরে নেমে পড়েন। দাফনের কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি কোনোভাবেই কবর থেকে উঠে আসতে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি কবরের ভেতরের মাটিকে আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে বলতে থাকেন:
"আমাকেসহ মাটি দিয়ে দাও! আমি আমার পিতাকে (লুৎফর রহমান) এই অন্ধকার কবরে একা রেখে কিছুতেই উপরে উঠে আসতে পারব না!"
কবরের পাশে থাকা অন্যান্য নেতা ও আত্মীয়স্বজনরা তাঁকে ধরে ধরাধরি করে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে মাটি থেকে টেনে ওপরে তোলেন। সাধারণ মানুষ তখন তাঁর এই কাণ্ড দেখে তাঁকে এক পরম ভক্ত ও দরদী মানুষ বলে মনে করেছিল। অথচ কে জানত, কবরে নেমে নাটক করা এই লোকটাই ঠিক পাঁচ মাস পর এই পরিবারেরই সন্তান, নারী ও শিশুদের রক্তে বাংলার মাটিকে রাঙিয়ে দেওয়ার মূল কারিগর হয়ে উঠবেন!
একাত্তরের মুজিবনগর সরকার ও কনফেডারেশন চক্রান্ত
খন্দকার মোশতাকের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও ট্র্যাজেডি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বুনে যাওয়া এক দীর্ঘ চক্রান্তের ধারাবাহিকতা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মোশতাক ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয় (যেমন জহুরুল হাসান ভূঁইয়া, মাহবুবুল আলম চাষী) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সিআইএ এবং পাকিস্তান সরকারের কূটনৈতিকদের সাথে গোপনে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল শেখ মুজিবকে মুক্ত করার দোহাই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করে দেওয়া এবং ভারতের সাহায্য ব্যতিরেকে পাকিস্তানের সাথে একটি 'কনফেডারেশন' বা শিথিল রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করা।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের গোয়েন্দা শাখা এই দেশবিরোধী চক্রান্তের খবর পেয়ে যান। ফলস্বরূপ, ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে খন্দকার মোশতাকের নিউইয়র্ক যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন এবং তাঁর ওপর কড়া নজরদারি চালু করেন। সেই থেকেই তাজউদ্দীন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল ধারার ওপর মোশতাকের ব্যক্তিগত ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়।
১৫ আগস্টের রক্তরঞ্জিত ক্ষমতা দখল ও ৮৩ দিনের কালখণ্ড
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল, নবপরিণীতা দুই বধূ এবং আত্মীয়স্বজনসহ মোট ১৮ জন সদস্যকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তখন সেই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডির আড়াল থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভূত হন খন্দকার মোশতাক আহমেদ।
রক্তের ওপর রাষ্ট্রপতির শপথ
বঙ্গবন্ধুর তাজা রক্ত তখনও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। রেডিওতে তাঁর ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি ১৫ আগস্টের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে 'ঐতিহাসিক মুহূর্ত' এবং খুনি সামরিক কর্মকর্তাদের 'সূর্যসন্তান' হিসেবে অভিহিত করার দুঃসাহস দেখান।
ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স: আইনি ইতিহাসের কলঙ্ক
মোশতাকের ৮৩ দিনের শাসনকালের সবচেয়ে কুখ্যাত ও নজিরবিহীন কালাকানুন ছিল ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারিকৃত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ (অধ্যাদেশ নং ৫০/১৯৭৫)।
উদ্দেশ্য: ১৫ আগস্টের খুনিদের যেন কোনো আদালতে বিচার করা না যায় এবং তাঁদের যেন সব ধরনের আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
পরিণাম: এই একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার মৌলিক স্তম্ভ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ ২১ বছর বিচারহীনতার এক অন্ধকার যুগ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
৩ নভেম্বরের জেলহত্যা
১৫ আগস্টের পর মোশতাক বুঝতে পেরেছিলেন যে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান বেঁচে থাকলে তাঁর অবৈধ ক্ষমতা যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। তাই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন পাল্টা অভ্যুত্থানের সময়, মোশতাকের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও সান্নিধ্যে ঘাতক চক্র ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে বন্দি অবস্থায় এই চার মহান নেতাকে বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
পতন ও ২১ বছরের অবমাননাকর ‘স্বেচ্ছাবন্দী’ জীবন
অন্যায়ের ভিত্তি দিয়ে গড়ে ওঠা ক্ষমতা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। খন্দকার মোশতাকের ক্ষেত্রেও নিয়তির এই বিধান অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও পাল্টা অভ্যুত্থানের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
পল্টন ময়দানের সেই ঐতিহাসিক 'সাপের আক্রমণ'
১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলবিধি (MPO) শিথিল হওয়ার পর মোশতাক রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার অপচেষ্টা চালান। তিনি 'ডেমোক্রেটিক লীগ' নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং ১৯৭৬ সালের শেষভাগে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পল্টন ময়দানে একটি বিশাল জনসভার আয়োজন করেন। কিন্তু বাংলার মানুষ এই বিশ্বাসঘাতককে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না।
জনসভা শুরু হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় ঘটনার ঘটে। কথিত আছে, জনসভা শুরু হওয়ার আগেই কে বা কারা সভাস্থলে "কয়েক ডজন বিষধর সাপ" ছেড়ে দেয়। উপস্থিত মানুষ সাপের আতংকে দিগবেদিক ছুটাছুটি করে পালিয়ে যায় এবং মোশতাকের সেই তথাকথিত রাজনৈতিক পুনরুত্থানের স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়। সেই ‘সাপের আক্রমণ’ থেকে বাঁচতে তিনি যে ঘরের ভেতর ঢুকেছিলেন, পরবর্তী ২১ বছর তিনি আর স্বাভাবিকভাবে জনগণের সামনে আসার সাহস পাননি। তিনি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং চার দেয়ালের মাঝে একপ্রকার স্বেচ্ছায় বন্দী জীবন কাটাতে বাধ্য হন। সূর্যের আলো যেন তাঁর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
চার দেয়ালের মাঝে ২১ বছরের ‘স্বেচ্ছাবন্দী’
পল্টনের এই ঘটনার পর থেকে মোশতাক বুঝতে পেরেছিলেন যে ঘরের বাইরে বের হওয়া মানেই জনরোষ, পচা ডিম, থুথু এবং গণধোলাইয়ের মুখোমুখি হওয়া। ফলে ঢাকার পুরানা পল্টনের তাঁর নিজ বাসভবনে তিনি এক প্রকার নিজেকে বন্দি করে ফেলেন।
দৈনন্দিন জীবন: সূর্যের আলো তাঁর জন্য যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জানালার পর্দা সার্বক্ষণিক টানা থাকত।
মানসিক অবস্থা: অপরাধবোধ, ভয় ও একাকীত্ব তাঁকে মানসিকভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল। তিনি কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, বিবাহ বা জানাজায় অংশ নেওয়ার সাহস পেতেন না।
জনবিচ্ছিন্নতা: দীর্ঘ ২১ বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি চার দেয়ালের মাঝে তিলে তিলে এক জঘন্য ও লাঞ্ছনাকর 'স্বেচ্ছাবন্দী' জীবন কাটাতে বাধ্য হন।
মৃত্যুর পর চূড়ান্ত লাঞ্ছনা: জানাজা বিড়ম্বনা ও পরিচয়হীন কবর
১৯৯৬ সালের ৫ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় খন্দকার মোশতাক আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর মাধ্যমে তাঁর অপরাধের শাস্তি শেষ হয়নি, বরং মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহের সাথে যা ঘটেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
বায়তুল মোকাররমের জানাজা বিড়ম্বনা: মোশতাকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার ও অনুসারীরা চেয়েছিল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তাঁর বড় আকারের একটি জানাজার আয়োজন করে তাঁর রাজনৈতিক 'মর্যাদা' প্রমাণের চেষ্টা করতে। কিন্তু এই খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক কর্মীরা বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে জড়ো হন।
তারা লাশবাহী গাড়ি ঘেরাও করে তীব্র বিক্ষোভ ও স্লোগান দিতে শুরু করে। ক্ষুব্ধ জনতা লাশের দিকে পচা ডিম ও জুতো নিক্ষেপ করতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে যে, পুলিশ জানাজা না পড়িয়েই লাশবাহী গাড়ি নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। জাতীয় মসজিদে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির জানাজা সাধারণ মানুষের গণঘৃণার কারণে পণ্ড হয়ে যাওয়ার এমন ঘটনা ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
নামফলকহীন অভিশপ্ত কবর: পরবর্তীতে অত্যন্ত গোপনে ও পুলিশি সুরক্ষায় তাঁর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দির দশপাড়া গ্রামে। সেখানেও কোনো প্রকার সাড়ম্বর আয়োজন ছাড়া, সাধারণ মানুষের অগোচরে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণত কোনো মানুষের কবরে তাঁর নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ সংবলিত এপিটাফ বা নামফলক বসানো হয়। কিন্তু জনরোষ ও জুতো মারার আতঙ্কে মোশতাকের কবরে আজও কোনো নামফলক নেই। দাউদকান্দির সেই নির্জন কোণে পড়ে থাকা কবরটি আজ কোনো শ্রদ্ধার স্থান নয়, বরং তা বিশ্বাসঘাতকতার এক ‘অভিশপ্ত ও ধিক্কৃত স্মারক’ হিসেবে টিকে আছে।
উত্তরসূরিদের চিরন্তন অভিশাপ ও পরিচয় গোপনের জীবন
ইতিহাসের আরেকটি নিষ্ঠুর সত্য হলো, কোনো মহা-বিশ্বাসঘাতকের অপরাধের দায়ভার তাঁর প্রজন্মকেও যুগ যুগ ধরে বহন করতে হয়।
খন্দকার মোশতাকের সন্তানরা (পুত্র ও কন্যা) দেশের মাটিতে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করার সাহস পাননি। তাঁরা নিজ দেশের সমাজ থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।
পরিচয় গোপন: বিদেশের মাটিতেও তারা নিজেদের পারিবারিক পরিচয় গোপন রেখে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
গ্রামের বাড়িতে বর্জন: দাউদকান্দির নিজ পৈতৃক ভিটায় বা গ্রামে মোশতাকের বংশধররা বছরের পর বছর ধরে পা রাখার সাহস পান না। গ্রামবাসী এবং স্থানীয় মানুষ তাঁদের পরিবারের নাম উচ্চারণ করাকেও অশুভ বলে মনে করে।
এটিই হলো নিয়তির চূড়ান্ত বিচার যেখানে সন্তানেরা নিজেদের বাবার নাম উচ্চারণ করতে লজ্জিত হয় এবং পরিচয় গোপন করে বেঁচে থাকাকেই একমাত্র আত্মরক্ষা মনে করে।
ঘাতকদের বর্তমান দশা ও বেওয়ারিশ জীবন
খন্দকার মোশতাকের মতো একই করুণ ও যাযাবর পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে এবং হচ্ছে ১৫ আগস্টের অন্যান্য ঘাতকদেরও।
যাযাবর ও ভিখারির মতো জীবনযাপন: যাঁরা বিদেশের মাটিতে ফেরারি বা পলাতক আসামি হিসেবে লুকিয়ে আছেন (যেমন মেজর ডালিম, রশীদ, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী), তাঁদের জীবন কোনো বিলাসবহুল জীবন নয়। তারা প্রতিনিয়ত ইন্টারপোলের রেড নোটিশ, বহিষ্কারের ভয় এবং পরিচয় প্রকাশের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
খুনী মেজর ডালিমের অবস্থা: পাকিস্তানী এজেন্ট সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের এক ভিডিও প্রোগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি মেজর শরিফুল হক ডালিমকে দেখা গেছে। তাঁর জরাজীর্ণ চেহারা এবং মলিন পোশাক দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে তিনি কতটা করুণ অবস্থায় আছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের একজন নিম্নবিত্ত মানুষও কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় কিছুটা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে, কিন্তু ডালিমের গায়ে ছিল জীর্ণ ব্লেজার ও পুরনো শার্ট। এটিই নিয়তির বিচার দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হত্যার পর তারা পৃথিবীতে আজ যাযাবর ও ভিখারির মতো জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামাজিক মাধ্যম ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় খুনিদের যে জরাজীর্ণ ও মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত করুণ। সাবেক সামরিক অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা অত্যন্ত মলিন, জীর্ণ পোশাকে, ছদ্মনামে, তৃতীয় বিশ্বের ভাড়াটে কটেজে যাযাবরের মতো দিন কাটাচ্ছেন। দেশের একজন সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষের পোশাকেও যে স্বস্তি ও সামাজিক সম্মান থাকে, তা-ও এদের ভাগ্যে জোটেনি। স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতিকে হত্যা করে তারা সারা জীবনের জন্য পৃথিবীর বুকে তাড়িত পশুর মতো বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
১৯৭১ সালের পর থেকে যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে, মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করেছে কিংবা বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কটূক্তি করেছে, তাদের প্রত্যেকের পরিণতিই খন্দকার মোশতাকের মতো হয়েছে। রাজাকার, আল-বদর এবং স্বাধীনতা বিরোধীরা সবসময় চোরের মতো লুকিয়ে রাজনীতি করেছে। জনসমক্ষে আসার নৈতিক সাহস তাদের কখনোই ছিল না। আজও তাদের প্রজন্মকে সমাজের মূলধারায় আসতে হলে পরিচয় লুকিয়ে বা গোপন পথে হাঁটতে হয়।
বিশ্বাসঘাতক ও ঘাতক চক্রের ঐতিহাসিক তথ্যচিত্র
নিচে বঙ্গবন্ধুর মূল ঘাতক, চক্রান্তকারী ও তাদের ঐতিহাসিক পরিণতির একটি সংক্ষিপ্ত তথ্যভিত্তিক সারণী দেওয়া হলো:
ব্যক্তি / চক্রান্তকারী | ১৫ আগস্টের ভূমিকা | পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান | ইতিহাস ও নিয়তির চূড়ান্ত পরিণতি |
খন্দকার মোশতাক আহমেদ | মূল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারী ও অবৈধ রাষ্ট্রপতি। | 'ডেমোক্রেটিক লীগ' গঠন ও নীতি নির্ধারণ। | ৮৩ দিনে ক্ষমতাচ্যুত; সাপের ভয়ে ও জনরোষে ২১ বছর গৃহবন্দী; জানাজা পণ্ড ও নামফলকহীন অভিশপ্ত কবর। |
সৈয়দ ফারুক রহমান | প্রধান সামরিক ঘাতক ও ক্যাভিলরি অফিসার। | 'ফ্রিডম পার্টি' গঠন করে রাজনীতিতে নামার চেষ্টা। | ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। |
সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান | ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সক্রিয় ঘাতক। | কূটনীতিবিদ হিসেবে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি লাভ। | ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। |
ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ | ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রাহক। | দীর্ঘ দুই দশক ভারতে ছদ্মনামে পলাতক জীবনযাপন। | ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল গ্রেপ্তার এবং ১২ এপ্রিল ফাঁসি কার্যকর। |
খন্দকার আব্দুর রশীদ | হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান বাস্তবায়নকারী। | বিদেশে পলাতক জীবন ও ব্যবসা পরিচালনা। | দেশে সম্পদ বাজেয়াপ্ত, আন্তর্জাতিকভাবে ফেরারি ও পলাতক আসামি। |
শরীফুল হক ডালিম | রেডিও স্টেশনে গিয়ে সরকার পতনের ঘোষণা প্রদানকারী। | বিভিন্ন দেশে ছদ্মনামে যাযাবর জীবনযাপন। | দেশে ফাঁসির রায় কার্যকর করার অপেক্ষায়; আন্তর্জাতিকভাবে তাড়িত জীবন। |
এ কে এম নূর চৌধুরী | বঙ্গবন্ধুর ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণকারী ঘাতক। | কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টারত ফেরারি। | প্রত্যর্পণের আইনি ঝুঁকিতে সার্বক্ষণিক আতঙ্কের জীবন। |
রাশেদ চৌধুরী | ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সহযোগী। | যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়হীন ও বিচ্যুত জীবনযাপন। | বহিষ্কারের মুখোমুখি ও ফেরারি জীবন। |
রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
১৯১৮ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার দশপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।
১৯৪৯ সালে যখন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) গঠিত হয়, তখন খন্দকার মোশতাক ছিলেন দলটির অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক। অর্থাৎ দলের একদম প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে রাজনীতি করেছেন।
আওয়ামী লীগের মধ্যে মোশতাক সবসময় একটি বিশেষ ডানপন্থী ও রক্ষণশীল উপ-দলের নেতৃত্ব দিতেন। দল যখন ১৯৬০-এর দশকে ধীরে ধীরে ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং স্বাধিকারের দিকে ঝুঁকছিল, তখন মোশতাক মনে-প্রাণে ছিলেন পাকিস্তানপন্থী ও মার্কিন অক্ষের সমর্থক। তিনি শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা ও সাধারণ মানুষের জনসমর্থনকে নিজের রাজনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করতেন, কিন্তু দলের ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিকে কখনোই মেনে নিতে পারেননি।
১৯৭১ সালের ‘কলকাতা চক্রান্ত’ ও জহুরুল হাসান ভূঁইয়া-চাষী নেটওয়ার্ক
মুক্তিযুদ্ধের সময় মোশতাকের ভূমিকা নিয়ে লরেন্স লিফশুলজ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Bangladesh: The Unfinished Revolution' এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর 'Bangladesh: A Legacy of Blood' গ্রন্থে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।
১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মোশতাক ও তাঁর দুই প্রধান সহযোগী পররাষ্ট্র সচিব মাহবুবুল আলম চাষী এবং সাবেক কূটনীতিক জহুরুল হাসান ভূঁইয়া কলকাতা থেকে গোপনে মার্কিন কূটনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
জর্জ গ্রিফিন কানেকশন: তৎকালীন কলকাতায় অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটের পলিটিক্যাল অফিসার জর্জ গ্রিফিনের সাথে মোশতাকের প্রতিনিধি জহুরুল হাসান ভূঁইয়া একাধিক গোপন বৈঠকে মিলিত হন।
কনফেডারেশন প্রস্তাব: মোশতাকের পরিকল্পনা ছিল, পাকিস্তান সরকার যদি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়, তবে বিনিময়ে প্রবাসী সরকার একতরফা স্বাধীনতা থেকে সরে আসবে এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি 'শিথিল কনফেডারেশন' গঠন করবে।
তাজউদ্দীনের কঠোর সিদ্ধান্ত: প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই চক্রান্তের বিষয়টি টের পান। তিনি অবিলম্বে মোশতাককে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করেন এবং আবু সাঈদ চৌধুরীকে প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে পাঠান। এর ফলে ১৯৭১ সালেই মোশতাকের প্রথম বড় ধরনের চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যায়।
১৯৭২–১৯৭৫: বঙ্গভবনের ষড়যন্ত্রের গোপন প্রস্তুতি ও 'বার্ড' বৈঠক
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উদারতাবশত মোশতাককে সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান দেন। প্রথমে তাঁকে বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরবর্তীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একাত্তরের অপমানের শোধ নিতে এবং নিজের ক্ষমতার তৃষ্ণা মেটাতে তিনি ভেতরে ভেতরে একটি ষড়যন্ত্রকারী চক্র গড়ে তোলেন।
কুমিল্লা 'বার্ড'-এর গোপন বৈঠক: ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালের বিভিন্ন সময়ে কুমিল্লা বিএআরডি (BARD - Bangladesh Academy for Rural Development)-এর কার্যালয়ে মোশতাক, মাহবুবুল আলম চাষী এবং চক্রান্তকারী সামরিক অফিসারদের একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাহবুবুল আলম চাষী তখন বার্ড-এর পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। সাধারণ মানুষের আড়ালে বা উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনার নামে সেখানে মূলত বঙ্গবন্ধুর সরকার উৎখাতের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হচ্ছিল।
খুনি মেজরদের সাথে যোগাযোগ: মেজর ফারুক ও মেজর রশীদ ছিলেন খন্দকার মোশতাকের নিকটাত্মীয় (মেজর রশীদের স্ত্রী জোবায়দা রশীদের দিক দিয়ে মোশতাক তাঁদের আত্মীয় হতেন)। এই পারিবারিক সূত্র ধরে মোশতাক দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর অসন্তুষ্ট অফিসারদের উসকানি দিয়ে আসছিলেন। তিনি তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করা হলে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে সব দায়ভার নিজ কাঁধে নেবেন এবং সেনাবাহিনীকে আইনি সুরক্ষা দেবেন।
৮৩ দিনের বঙ্গভবন: কারচুপি ও সেনা অফিসারদের অপশাসন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বঙ্গভবনে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব ও অরাজক শাসন ব্যবস্থা। ৮৩ দিন মোশতাক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আসীন থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল খুনি মেজরদের হাতে।
বঙ্গভবনে খুনিদের ঔদ্ধত্য: ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও জঘন্য অধ্যায় ছিল যে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোশতাক বঙ্গভবনে থাকলেও তাঁর কার্যালয়ের বাইরে সার্বক্ষণিক সাবমেশিন গান ও পিস্তল হাতে টহল দিত মেজর ফারুক, মেজর রশীদ এবং মেজর ডালিম। রাষ্ট্রপতি হলেও মোশতাক ছিলেন মূলত খুনি অফিসারদের হাতের পুতুল। তারা যা বলত, মোশতাক তাতেই স্বাক্ষর করতেন।
ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় পাকিস্তান। ১৫ আগস্ট দুপুরেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো মোশতাকের সরকারকে স্বীকৃতি ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের জন্য ৫০ হাজার টন চাল ও ১৫ মিলিয়ন গজ কাপড় উপহার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সৌদি আরব ও চীনের স্বীকৃতি: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যেসব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, মোশতাক ক্ষমতায় আসার পরপরই তারা বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সৌদি আরব এবং ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ সালে চীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
সেনাপ্রধান পদে পরিবর্তন ও ইনডেমনিটি: মোশতাক ক্ষমতায় বসেই ২৪ আগস্ট জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি জারি করেন কুখ্যাত 'ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স', যা পঁচাত্তরের ঘাতকদের যেকোনো বিচারের হাত থেকে সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষাবলয় এনে দেয়।
চাটুকারিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার চিরন্তন পাঠ
খন্দকার মোশতাক আহমেদের এই কলঙ্কিত জীবনকাহিনী কেবল একটি অতীত রাজনীতির গল্প নয়; এটি যেকোনো দেশ, সমাজ ও রাজনৈতিক দলের জন্য একটি চিরন্তন ও জীবন্ত শিক্ষা।
অতি-চাটুকারিতা ও তোষামোদের বিপদ: রাজনীতি ও প্রশাসনে যারা সত্য কথা বলার চেয়ে অতি-ভক্তি, কৃত্রিম কান্না এবং অস্বাভাবিক আনুগত্য প্রদর্শন করে, তারা প্রায়শই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধু মোশতাকের এই কৃত্রিম তোষামোদকে চিনতে ভুল করেছিলেন, যার খেসারত তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে।
জনতার আদালত ও মহাকালের বিচার: আইনের আদালত অনেক সময় বিলম্বিত হতে পারে, কিংবা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো কালাকানুন দিয়ে সাময়িকভাবে বিচার বন্ধ করা যেতে পারে, কিন্তু 'জনতার আদালত' ও 'মহাকালের বিচার' থেকে কেউ রেহাই পায় না। মোশতাক কোনো আইনি বিচারে ফাঁসি পাননি, কিন্তু জীবনভর জনঘৃণা ও মৃত্যুর পর কবরে লাঞ্ছনা ফাঁসির চেয়েও শতগুণ বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল।
মীর জাফরি মানসিকতার চিরন্তন পরাজয়: ১৭৫৭ সালের পলাশীর মীর জাফর যেমন শেষ বয়সে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে অত্যন্ত জঘন্যভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাঁর নাম বাংলা ভাষায় গালাগালিতে পরিণত হয়েছে, ১৯৭৫ সালের খন্দকার মোশতাকও একই নিয়তির শিকার হয়েছেন।
উপসংহার
খন্দকার মোশতাক আহমেদ আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে এক মহাধিকৃত চরিত্র। তিনি রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেছিলেন, ক্ষমতার মসনদ স্পর্শ করেছিলেন, লাল-সবুজ পতাকা খচিত গাড়িতে চড়েছিলেন; কিন্তু ইতিহাস তাঁকে কোনো মান-সম্মান দেয়নি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত মাড়িয়ে পাওয়া সেই ৮৩ দিনের ক্ষমতা মোশতাককে ইতিহাসের মহানায়ক বানাতে পারেনি, বরং তাঁকে বানিয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘খলনায়ক’ ও ‘মীর জাফর’।
আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম যখন পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় কোটি মানুষের হৃদয়ে উচ্চারিত হয়, ঠিক তখনই খন্দকার মোশতাকের নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণা, ধিক্কার ও অভিশাপের সাথে। চাটুকারিতা, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার শেষ পরিণতি কতটা ভীতিপ্রদ, অবমাননাকর ও অভিশপ্ত হতে পারে খন্দকার মোশতাক আহমেদের পুরো জীবন ও মৃত্যু তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য লিখে দিয়ে গেছে।















