পদ্মা সেতু মেট্রোরেল শেখ হাসিনা কি তার বাপের টাকায় করেছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ চর্চিত হচ্ছে "পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল কি শেখ হাসিনা নিজের পকেটের টাকায় করেছেন?" এই প্রশ্নটির মাঝেই লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিভ্রম। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই তার ব্যক্তিগত অর্থে উন্নয়ন করেন না; উন্নয়ন হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই টাকা সঠিক পথে খরচ করার 'সাহস', 'ভিশন' এবং 'আন্তর্জাতিক চাপ' উপেক্ষা করার সক্ষমতা সবার থাকে কি না।

TruthBangla

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের আড্ডায় একটি প্রশ্ন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে "পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কি শেখ হাসিনা নিজের পকেটের টাকায় করেছেন?" আপাতদৃষ্টে সরল মনে হওয়া এই প্রশ্নটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, ঐতিহাসিক অজ্ঞতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক নিয়মের চরম অবমাননা।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং পাবলিক ফিন্যান্সের (Public Finance) প্রাথমিক পাঠ নেওয়া যেকোনো ব্যক্তিই জানেন যে, পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানই তাঁর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক তহবিল থেকে রাষ্ট্রের উন্নয়ন করেন না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ কিংবা মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ কেউই নিজেদের পকেটের টাকায় নিজ দেশের মেগাপ্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করেননি। রাষ্ট্রের প্রতিটি ইট, বালু আর কংক্রিটের কাঠামো গড়ে ওঠে এ দেশের খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায়।
কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আসল সমীকরণটি এখানে শেষ হয় না; বরং এখান থেকে শুরু হয়। প্রশ্নটি এটি নয় যে টাকা কার ছিল; প্রশ্ন হলো সেই জনগণের টাকা সঠিক পথে, সঠিক সময়ে খরচ করার রাজনৈতিক ‘সাহস’, দূরদর্শী ‘ভিশন’ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করার সক্ষমতা কার ছিল?
আজকের ‘জেন-জি’ (Generation Z) বা নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ, যারা একটি তৈরি করা সুউচ্চ অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল বা উপহাস করছে, তাদের ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা প্রয়োজন। একটি দেশের অবকাঠামোগত এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ভিত্তি কোনো আলাদিনের চেরাগ বা জাদুমন্ত্রে তৈরি হয় না। এটি গড়ে ওঠে বছরের পর বছর ধরে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং যুগান্তকারী কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে। এই দীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশের ডিজিটাল বিপ্লব, পদ্মা সেতুর নেপথ্যের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, খাম্বা রাজনীতির অন্ধকার যুগ এবং উগ্রবাদ দমনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করব, যা নতুন প্রজন্মকে হুজুগের বাইরে গিয়ে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে সাহায্য করবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ: বিলাসিতা থেকে মৌলিক অধিকার
আজকের ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যে তরুণ প্রজন্ম ফাইভ-জি (5G) ইন্টারনেট, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স এবং স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে সমালোচনা করছে, তাদের কাছে এই ডিজিটাল লাইফস্টাইলটি অত্যন্ত সাধারণ বা স্বাভাবিক মনে হতেই পারে। কিন্তু আজ থেকে মাত্র তিন দশক আগের বাংলাদেশের টেলিকম খাতের বাস্তবচিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ভয়াবহ রকমের বৈষম্যমূলক।
সিটিসেলের একচেটিয়া আধিপত্য ও ‘খাম্বা মোর্শেদ’ সিন্ডিকেট
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে মোবাইল ফোন বা সাধারণ একটি টেলিফোন সংযোগ ছিল সমাজের উচ্চবিত্ত এবং অতি-ধনীদের একচেটিয়া বিলাসিতার বস্তু। তৎকালীন সময়ে বাজারে একমাত্র অপারেটর ছিল সিটিসেল (Citycell), যার সিংহভাগ মালিকানা ছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী মোর্শেদ খানের হাতে।
তখন একটি মোবাইল হ্যান্ডসেট এবং সংযোগের মূল্য ছিল ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। প্রতি মিনিট ইনকামিং এবং আউটগোয়িং কলের রেট ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যও মোবাইল ফোন ছিল এক দূরবর্তী স্বপ্ন। এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা একটি একচেটিয়া পুঁজিবাদী বাজার (Monopoly Market)।
১৯৯৬ সালের বাজার উন্মুক্তকরণ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর এই টেলিকম সিন্ডিকেট ভাঙার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দলমত নির্বিশেষে বাজার উন্মুক্ত করে দেন এবং গ্রামীণফোন, একটেল (বর্তমান রবি) এবং পরবর্তীতে বাংলালিংককে লাইসেন্স প্রদান করেন।
মজার বিষয় হলো, তৎকালীন একটেলের মালিকানার পেছনে ছিলেন বিএনপিরই আরেক সাবেক মন্ত্রী, কিন্তু শেখ হাসিনা রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে লাইসেন্স দিয়েছিলেন কেবলই প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করার জন্য। এর ফলেই কলরেট সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নেমে আসে এবং আজ দেশের আনাচে-কানাচে ১৬ কোটিরও বেশি সচল সিম কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে।
তথ্যের ‘পাচার’ আতঙ্ক বনাম গ্লোবাল কানেক্টিভিটি
বাংলাদেশের ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার গল্পটি আরও বেশি আত্মঘাতী এবং রাজনৈতিক পশ্চাৎপদতার উদাহরণ। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে যখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গ্লোবাল সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের কাছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগে যুক্ত হওয়ার একটি আন্তর্জাতিক প্রস্তাব এসেছিল।
কিন্তু তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এই অদ্ভুত এবং হাস্যকর অজুহাতে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে "সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সমস্ত গোপন তথ্য বিদেশে পাচার হয়ে যাবে!"
এই একক মূর্খতাসুলভ সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বমঞ্চ থেকে অন্তত এক দশক পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বাংলাদেশকে গ্লোবাল ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে (SEA-ME-WE 4) যুক্ত করেন। আজ জেন-জি যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বসে বাকস্বাধীনতার চর্চা করছে, তার অবকাঠামোগত মহাসড়কটি তৈরি হয়েছিল শেখ হাসিনার সেই সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর ভর করেই।
পদ্মা সেতু: কংক্রিটের কাঠামো থেকে জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক
পদ্মা সেতু নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে হিসাব কষা সবচেয়ে সহজ কাজ হতে পারে, কিন্তু এর নেপথ্যে যে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা ছিল, তা নতুন প্রজন্ম প্রায়ই ভুলে যায়। পদ্মা সেতু কেবল একটি সেতু নয়, এটি ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্বব্যাংক এবং দেশীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার এক মহাকাব্য।
বিশ্বব্যাংকের কাল্পনিক দুর্নীতি ও ড. ইউনূস ফ্যাক্টর
পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ যখন শুরু হওয়ার মুখে, ঠিক তখনই বিশ্বব্যাংক কোনো প্রকার বাস্তব প্রমাণ ছাড়াই, কেবল ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের’ এক কাল্পনিক অভিযোগে তাদের ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি বাতিল করে দেয়। এর নেপথ্যে ছিল এক গভীর আন্তর্জাতিক ল্যাবিং। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ খোয়ানোর ব্যক্তিগত ক্ষোভকে পুঁজি করে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ও হিলারি ক্লিনটনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংককে চাপ দেওয়া হয়েছিল যাতে বাংলাদেশ এই ঋণ না পায় এবং শেখ হাসিনা সরকারকে বিশ্বমঞ্চে দুর্নীতিবাজ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা যায়।
কানাডার আদালতের ঐতিহাসিক রায় ও ষড়যন্ত্রের অপমৃত্যু
বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো শেখ হাসিনা সরকারের ওপর একযোগে চড়াও হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা মাথা নত করেননি। পরবর্তীতে কানাডার অন্টারিওর একটি সুপিরিয়র কোর্টে (Superior Court of Justice) দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালত স্পষ্ট রায় দেয় যে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ মেলেনি এবং বিশ্বব্যাংকের আনা সমস্ত অভিযোগ ছিল স্রেফ ‘গুজব ও কাল্পনিক গালগল্প’ (Gossip and Rumor)।
নিজস্ব অর্থায়নের সিদ্ধান্ত
যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদেরা এবং দেশীয় তথাকথিত ‘সুশীল সমাজ’ ডিক্লেয়ার করেছিলেন যে, "নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করা বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হবে এবং দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে", তখন শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন "আমরা কারও দয়ায় নয়, নিজেদের জনগণের টাকায় পদ্মা সেতু করব।"
সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, সেটি ছিল বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শক্তির এক চাক্ষুষ প্রদর্শন। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে যুক্ত করে দেশের সামগ্রিক জিডিপিতে প্রতি বছর ১.২% অবদান রাখছে। এটি সত্যিই শেখ হাসিনার বাপের পকেটের টাকা ছিল না, কিন্তু এই সেতুটি করার জন্য যে হিমালয়সম রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করার মেদহীন মেরুদণ্ড এবং দেশের জনগণের ওপর অগাধ বিশ্বাস প্রয়োজন ছিল তা কেবল শেখ হাসিনারই ছিল।
খাম্বা রাজনীতি বনাম নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অবকাঠামো
নতুন প্রজন্ম যারা আজ লোডশেডিংয়ের সামান্য তারতম্য হলেই ইন্টারনেটে ট্রল মেতে ওঠে, তারা হয়তো ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্ধকার ইতিহাসের কথা কল্পনাও করতে পারবে না। সেই সময়টি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘খাম্বা রাজনীতি’ বা বিদ্যুতের খুঁটি বাণিজ্যের কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
বিদ্যুৎবিহীন খাম্বা বাণিজ্যের মহোৎসব
তৎকালীন সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন হাওয়া ভবনের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশজুড়ে এক অদ্ভুত ব্যবসা শুরু হয়েছিল। গ্রামের পর গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি (খাম্বা) বসিয়ে দেওয়া হতো, কিন্তু সেই খুঁটির তারে কোনোদিন বিদ্যুৎ আসত না। কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে কোনো মনোযোগ ছিল না, মূল মনোযোগ ছিল খুঁটি বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুণ্ঠন করা।
দেশের দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে এসেছিল মাত্র ৩০০০ থেকে ৩২০০ মেগাওয়াটে। রাজধানী ঢাকাতেই দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল এক স্বাভাবিক নিয়ম।
সারের দাবিতে আন্দোলন ও কানসাটের রক্তপাত
বিদ্যুতের অভাবে সেচ কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যখন দেশের কৃষকেরা সারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, তখন তৎকালীন সরকার কৃষকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল। কানসাট ও বিভিন্ন এলাকায় ১৮ জন নিরীহ কৃষককে সারের দাবিতে জীবন দিতে হয়েছিল।
শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ পাস করে কুইক রেন্টাল এবং বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে ২৫,০০০ মেগাওয়াটের ওপরে নিয়ে যান এবং শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেন। মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৈপ্লবিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা কোনো সাধারণ বা দুর্বল নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
নিরাপত্তা প্যারাডাইম: উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’
একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, যদি তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে, তবে সেই রাষ্ট্র কোনোদিন বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অগ্রযাত্রায় অন্যতম প্রধান ও অন্ধকার চ্যালেঞ্জ ছিল ধর্মীয় উগ্রবাদ ও আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের আকস্মিক উত্থান।
২০০১-২০০৬: উগ্রবাদ ও ৬৪ জেলায় বোমা হামলা
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জেএমবি (জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ) এবং হরকাতুল জিহাদের (হুজি) মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র তৈরি করার মতো বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের মতো কুখ্যাত উগ্রবাদীরা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ও জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক আশ্রয়ে দেশজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছিল।
এর সবচেয়ে ভয়াবহ ও আন্তর্জাতিক রূপ দেখা যায় ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট। সেদিন মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ৬৪টি জেলার প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে এই উগ্রপন্থীরা প্রমাণ করেছিল যে, তারা কতটা সুসংগঠিত এবং তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কতটা অকার্যকর ছিল।
হলি আর্টিসান ট্র্যাজেডি এবং শেখ হাসিনার কাউন্টার-টেররিজম মডেল
২০১৬ সালের ১লা জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তখন প্রচার করতে শুরু করেছিল যে, বাংলাদেশ পরবর্তী সিরিয়া বা আফগানিস্তান হতে চলেছে এবং এখানে আইএসের (ISIS) স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি হয়েছে।
এই চরম আন্তর্জাতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখে শেখ হাসিনা যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে কাউন্টার-টেররিজম বিশেষজ্ঞদের কাছে এক গবেষণার বিষয়। তিনি কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ (অপারেশন থান্ডারবোল্ট) করে জিম্মি সংকটের অবসানই করেননি, বরং পরবর্তী কয়েক বছর ধরে পুলিশের ‘কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম’ (CTTC) ইউনিট এবং র্যাবের মাধ্যমে দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মতো সংগঠনগুলোর মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেন।
ডি-র্যাডিকালাইজেশন ও আদর্শিক লড়াই
উগ্রবাদ দমনে শেখ হাসিনা কেবল বন্দুকের নলের ওপর ভরসা করেননি। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, এটি একটি আদর্শিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই।
দেশের আলেম-ওলামা ও মাসায়েকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পৃক্ত করে মসজিদের খুতবায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির ব্যবস্থা করা হয়। যারা ভুল পথে পা বাড়িয়েছিল, তাদের জন্য 'ডি-র্যাডিকালাইজেশন' (De-radicalization) এবং আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার মানবিক সুযোগ দেওয়া হয়।
এই কঠোর ও নরম কৌশলের (Hard and Soft Power) সমন্বয়ের কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে একটি নিরাপদ ও বিনিয়োগ-বান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিল।
ভারত ইস্যু এবং ‘দেশ বিক্রি’ প্রোপাগাণ্ডার অসারতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে সস্তা এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আবেগীয় অস্ত্র হলো ‘ভারত জুজু’ বা দেশ বিক্রির চুক্তি। জেন-জি’র একটি বড় অংশের কানে প্রতিনিয়ত এই বয়ান ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, "শেখ হাসিনা ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন" এবং "বাংলাদেশে লাখ লাখ ভারতীয় অবৈধভাবে চাকরি করে দেশের টাকা নিয়ে যাচ্ছে।"
ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও চুক্তির বাস্তবায়ন
বাস্তবতা এবং দালিলিক নথির দিকে তাকালে এই প্রোপাগান্ডার বেলুন মুহূর্তেই ফেটে যায়। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের নজিরবিহীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও ভারতের সাথে করা শেখ হাসিনা সরকারের একটি চুক্তিও কি বাতিল করা হয়েছে?
ভারতের সাথে আমদানি-রপ্তানি, ট্রানজিট সুবিধা, বিদ্যুৎ আমদানি (যেমন আদানি গ্রুপের সাথে চুক্তি) কিংবা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রম সবকিছুই কিন্তু আজ ২০২৬ সালেও আগের নিয়মেই চলমান রয়েছে। যদি চুক্তিগুলো সত্যিই দেশবিরোধী বা দাসত্বমূলক হতো, তবে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন সেগুলো সবার আগে বাতিল করত।
সীমান্ত ও সমুদ্রসীমা জয়ের বাস্তব ইতিহাস
প্রকৃত সত্য হলো, শেখ হাসিনাই একমাত্র নেতা যিনি ভারতের সাথে দীর্ঘ ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় চুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশের মানচিত্রে ১০,০৫৮ একর নতুন ভূমি যুক্ত করেছিলেন। কোনো যুদ্ধ বা রক্তপাত ছাড়াই আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করে বঙ্গোপসাগরে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বিশাল সমুদ্রসীমা (Maritime Boundary) জয় করেছিলেন শেখ হাসিনা। যিনি দেশের সীমানা বৃদ্ধি করেন, তাকে আর যাই হোক ‘দেশ বিক্রেতা’ বলা স্রেফ রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা মডেলের ঐতিহাসিক তুলনামূলক ম্যাট্রিক্স
গত দুই দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা খাতের রূপান্তরকে সহজ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি তথ্যসমৃদ্ধ ছক দেওয়া হলো:
পর্যালোচনার ক্ষেত্র | ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বাস্তব চিত্র (অন্ধকার যুগ) | ২০০৯-২০২৪ মেয়াদের রূপান্তর (শেখ হাসিনা মডেল) | ২০২৬ সালের বর্তমান ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব |
১. তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট | সাবমেরিন ক্যাবল প্রত্যাখ্যান (তথ্য পাচারের অদ্ভুত অজুহাতে)। | ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা; গ্লোবাল সাবমেরিন ক্যাবল ও ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক স্থাপন। | জেন-জি’র ফ্রিল্যান্সিং, থ্রিজি/ফোরজি/ফাইভজি ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি। |
২. টেলিকম খাত | সিটিসেলের মনোপলি; ১ লাখ টাকার সিম এবং ১০ টাকা প্রতি মিনিট কলরেট। | বাজার উন্মুক্তকরণ; গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংককে লাইসেন্স ও সুস্থ প্রতিযোগিতা। | দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের হাতে স্মার্টফোন ও মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ)। |
৩. বিদ্যুৎ খাত ও উৎপাদন | ৩০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন; খাম্বা (খুঁটি) বাণিজ্যের মহোৎসব এবং কানসাটে কৃষক হত্যা। | ২৫,০০০+ মেগাওয়াট উৎপাদন; রূপপুর পারমাণবিক ও পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগাপ্রকল্প। | শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং ভারী শিল্প-কারখানা সচল রাখার প্রধান জ্বালানি নিরাপত্তা। |
৪. মেগাপ্রকল্প ও অর্থায়ন | সম্পূর্ণ বিদেশি অনুদান ও দাতাগোষ্ঠীর ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা। | নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু; মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। | দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার অর্থনৈতিক সংযোগ ও জিডিপিতে ধারাবাহিক ১.২% প্রবৃদ্ধি। |
৫. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা | ১৭ই আগস্ট ৬৪ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা; জেএমবি ও বাংলা ভাইয়ের রাষ্ট্রীয় আশ্রয়। | জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স'; CTTC গঠন এবং হলি আর্টিসান পরবর্তী সফল অপারেশন। | আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নিরাপদ রাষ্ট্র ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) গ্যারান্টি। |
৬. ভূ-রাজনীতি ও চুক্তি | ভারতের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সীমান্ত ও সমুদ্রসীমা বিরোধ ঝুলিয়ে রাখা। | ছিটমহল বিনিময় (১০,০৫৮ একর ভূমি লাভ) এবং আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা জয়। | ব্লু-ইকোনমি (Blue Economy) বা সমুদ্র সম্পদের ওপর বাংলাদেশের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা। |
মেগাপ্রকল্পে গ্লোবাল পার্টনারশিপের সমীকরণ
একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য মেগাপ্রকল্পের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা একটি বিশাল ভূ-রাজনৈতিক জুয়া। শেখ হাসিনা কোনো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির ওপর নির্ভর না করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য (Geopolitical Balancing) বজায় রেখেছিলেন:
জাপান (JICA) ফ্যাক্টর: ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার লাইফলাইন মেট্রোরেল (MRT Line-6) এবং দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর মাতারবাড়ী পোর্ট-এর সিংহভাগ অর্থায়ন ও কারিগরি ডিজাইন জাপানের। জাপানকে যুক্ত করার মাধ্যমে পশ্চিমা ব্লকের সাথে একটি অর্থনৈতিক সমঝোতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল।
চীন বনাম ভারত সমীকরণ: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে চীন ও ভারতের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। শেখ হাসিনা একদিকে চীনের ঋণে এবং চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে পদ্মা সেতু ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্ডারওয়াটার টানেল বঙ্গবন্ধু টানেল (কর্ণফুলী টানেল) নির্মাণ করিয়েছেন; ঠিক একই সময়ে ভারতের সাথে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি এবং রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে দিল্লির কৌশলগত ক্ষোভ প্রশমিত করেছেন।
রাশিয়া কানেকশন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল নিষেধাজ্ঞা ও আপত্তি উপেক্ষা করে পাবনার ঈশ্বরদীতে ১২,৬৫৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘রসাটম’-এর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী ব্যাকবোন।
ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক রূপান্তর: এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণ
শেখ হাসিনা মডেলের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হলো জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে Least Developed Country (LDC) বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে সরাসরি Developing Country বা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ (যা ২০২৬ সালের মধ্যে কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে)।
জিডিপি (GDP) ও মাথাপিছু আয়ের লাফ: ২০০৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছর নাগাদ প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। একই সাথে মাথাপিছু আয় ৫৪৩ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২,৭০০ ডলারের ওপরে পৌঁছায়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের রেকর্ড: এক সময় বাংলাদেশ ৩ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ে চিন্তিত থাকত। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক (RMG) খাতের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ রেকর্ড করা হয়েছিল, যা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতার অন্যতম বড় চালিকাশক্তি ছিল।
বাদ পড়ে যাওয়া মেগাপ্রকল্পগুলো
পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল ছাড়াও এমন কিছু ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইনকে চিরতরে বদলে দিয়েছে:
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল (কর্ণফুলী টানেল)
এটি কেবল একটি টানেল নয়, এটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপারকে চীনের সাংহাই শহরের মতো "One City, Two Towns" মডেলে রূপান্তর করার একটি মাস্টারপ্ল্যান। ৩.৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ পথটি চট্টগ্রাম বন্দর ও আনোয়ারা উপজেলাকে যুক্ত করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে কাজ করছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর
কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত এই গভীর সমুদ্র বন্দরটি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’। বর্তমানে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা মংলা বন্দরে বড় মাদার ভেসেল (बड़ো জাহাজ) ভিড়তে পারে না, সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরে গিয়ে মালামাল খালাস করতে হয়। মাতারবাড়ী চালু হওয়ার পর সরাসরি গভীর সমুদ্রের জাহাজ বাংলাদেশে ভিড়তে পারবে, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০% কমিয়ে আনবে।
‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ (Development vs. Democracy)
শেখ হাসিনার শাসনকালকে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়শই "Development vs. Democracy" বা "উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র"-এর থিওরি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। এই ন্যারেটিভের দুটি পিঠ রয়েছে:
উন্নয়নবাদী রাষ্ট্র (Developmental State): দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং-হি বা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ যেভাবে কিছুটা কঠোর শাসন বা কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত খোলনলচে বদলে দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার মডেলটিকেও অনেকে সেই ধারার সাথে তুলনা করেন। তাদের যুক্তি উগ্রবাদ এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে এত বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অসম্ভব ছিল।
ঋণের বোঝা ও দুর্নীতির বিতর্ক: এই মডেলের প্রধান সমালোচনা হলো মেগাপ্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয় এবং সময় বারবার বৃদ্ধি পাওয়া, যার ফলে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগও সমান্তরালভাবে এই ন্যারেটিভের অংশ হিসেবে জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা, আশ্রয়ন প্রকল্প ও প্রান্তিক উন্নয়ন
উন্নয়ন কেবল বড় বড় শহরে ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেল নির্মাণের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনে আশ্রয়ণ প্রকল্প (Asrayan Project) ছিল শেখ হাসিনার একটি সিগনেচার প্রোগ্রাম।
ভূমিহীনদের অধিকার: "বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না" এই স্লোগানকে সামনে রেখে সরকারি খাস জমিতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রায় ৯ লাখেরও বেশি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে সেমিপাকা ঘর এবং জমির মালিকানা দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: ঘরের পাশাপাশি তাদের বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি এবং ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এনে মূলধারার অর্থনীতির সাথে যুক্ত করা হয়েছিল, যা গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে সাহায্য করে।
অন্যান্য প্রজেক্টের কারিগরি ও অর্থনৈতিক প্রোফাইল ছক
নিবন্ধে বিস্তারিত আলোচনার বাইরে থাকা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্পগুলোর বাজেট ও কৌশলগত গুরুত্ব নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
মেগাপ্রকল্পের নাম | আনুমানিক বাজেট (টাকায়) | প্রধান অর্থায়নকারী সংস্থা/দেশ | কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব |
১. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র | প্রায় ১,১৩,০০০ কোটি টাকা | রাশিয়া (Rosatom) এবং বাংলাদেশ সরকার | ২৪০০ মেগাওয়াট অবিরত গ্রিন ও কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ নিশ্চিতকরণ। |
২. মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর | প্রায় ১৭,৭৭৫ কোটি টাকা | জাপান (JICA) | গভীর সমুদ্রের ‘মাদার ভেসেল’ সরাসরি খালাসের মাধ্যমে ট্রানজিট খরচ হ্রাস। |
৩. বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলী টানেল | প্রায় ১০,৬৮৯ কোটি টাকা | চীন (Exim Bank) | দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীর তলদেশের টানেল; চট্টগ্রামকে সাংহাই মডেলে রূপান্তর। |
৪. হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর (টার্মিনাল ৩) | প্রায় ২১,৩৯৯ কোটি টাকা | জাপান (JICA) | বার্ষিক যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৮ মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি করে ২০ মিলিয়নে উন্নীতকরণ। |
৫. ঢাকা-কক্সবাজার রেল সংযোগ | প্রায় ১৮,০৩৪ কোটি টাকা | এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) | পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে সরাসরি রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা। |
জেন-জি’র সচেতনতা বনাম উগ্রবাদের নতুন ফাঁদ
আজকে নতুন প্রজন্মের একটি অংশকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা খুব সহজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কৃত্রিম প্রোপাগান্ডার শিকার হচ্ছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো (যেমন নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন বা তাদের রাজনৈতিক উইং) ইন্টারনেটে অত্যন্ত সুকৌশলে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এই তরুণদের মগজ ধোলাই করছে।
তারা তরুণদের বোঝাচ্ছে যে, বিগত দেড় দশকের উন্নয়ন ছিল কেবলই এক বিভ্রম। কিন্তু এই তরুণরা এটা বোঝে না যে, একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি নষ্ট হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হয় এই তরুণ প্রজন্মকেই। শ্রীলঙ্কা বা লিবিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, হুজুগে মেতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করার পর আজ সেসব দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কীভাবে অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে।
দক্ষ এবং দূরদর্শী মাঝি ছাড়া যেমন উত্তাল সমুদ্রে কোনো বিশাল জাহাজ টিকতে পারে না, তেমনি বিশ্বব্যাংক, ভূ-রাজনৈতিক পরাশক্তি এবং অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদের ত্রিমুখী ঝড় মোকাবেলা করার মতো জাদরেল নেতৃত্ব ছাড়া বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তরী কোনোদিন তীরের দেখা পেত না।
ইতিহাসের কাঠগড়ায় বোধোদয়ের আহ্বান
ইতিহাস কোনো আবেগ বা ফেইসবুকের লাইক-কমেন্ট দিয়ে লেখা হয় না; ইতিহাস লেখা হয় পাথরের মতো শক্ত বাস্তব তথ্য আর নথিপত্র দিয়ে। আজ বাজারে হয়তো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রয়েছে, প্রশাসনিক কিছু বিশৃঙ্খলা রয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভের অজুহাতে একটি দেশের সামষ্টিক উন্নয়নের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা চরম অকৃতজ্ঞতা এবং আত্মহননের শামিল।
শেখ হাসিনা তাঁর বাপের পকেটের ব্যক্তিগত টাকায় পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল করেননি এটি যেমন এক গাণিতিক সত্য, তেমনি শেখ হাসিনার মতো অকুতোভয়, দূরদর্শী এবং দেশপ্রেমিক নেতা না থাকলে জনগণের সেই ট্যাক্সের টাকা যে আবারও হাওয়া ভবনের খাম্বা বাণিজ্যে কিংবা সুইস ব্যাংকের গোপন অ্যাকাউন্টে পাচার হয়ে যেত সেটিও এক নির্মম ঐতিহাসিক সত্য।
উন্নয়ন কারো পকেট থেকে আসে না, উন্নয়ন আসে রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক সততা ও মাস্টারপ্ল্যান থেকে। অতএব, জেন-জি’র উচিত হবে সস্তা ট্রল আর হুজুগে না মেতে প্রকৃত ইতিহাস পড়া। দেশপ্রেম মানে কেবল মাঠে দাঁড়িয়ে আবেগী স্লোগান দেওয়া নয়; দেশপ্রেম মানে হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি মেগাপ্রকল্প, প্রতিটি সাবমেরিন ক্যাবলের ফাইবার আর প্রতিটি শান্তিময় নিরাপদ দিনের নেপথ্যের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াইকে সম্মান জানানো। নতুন প্রজন্মের এই বোধোদয় যত দ্রুত হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তত বেশি নিরাপদ হবে।















