বিএনপির গ্রুপিং রাজনীতির বলি মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন একজন সফল রাজনীতিবিদ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে। কিন্তু রাজনীতির নির্মম পরিহাস এই যে, যে ব্যক্তি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, শেষ জীবনে তাকে নিজ দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। সাদেক হোসেন খোকা মূলত বিএনপির তারেক রহমান কেন্দ্রিক উগ্র রাজনীতির বিরোধিতা করে নিজ দলের ভেতরেই একঘরে হয়ে পড়েছিলেন।

TruthBangla
Dec 18, 2025
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সাদেক হোসেন খোকা এক অনন্য নাম। তিনি কেবল একজন সফল রাজনীতিবিদ বা ঢাকার সাবেক মেয়রই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে। কিন্তু রাজনীতির নির্মম পরিহাস এই যে, যে ব্যক্তি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, শেষ জীবনে তাকে নিজ দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। বর্তমানে একটি মহল খোকা সাহেবের মৃত্যু বা রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে একপাক্ষিক বয়ান প্রচারের চেষ্টা করলেও, ইতিহাসের গভীর সত্য বলছে ভিন্ন কথা। সাদেক হোসেন খোকা মূলত বিএনপির তারেক রহমান কেন্দ্রিক উগ্র রাজনীতির বিরোধিতা করে নিজ দলের ভেতরেই একঘরে হয়ে পড়েছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকা বামপন্থী রাজনীতি থেকে উঠে আসলেও তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনার মূলে ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে ঢাকার রাজপথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া এই বীর যোদ্ধা সবসময়ই সুস্থ ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। স্বাধীনতার পর তিনি বিএনপিতে যোগ দিলেও তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ছিল দলমতের ঊর্ধ্বে। এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীণ নেতাও তাঁর বীরত্ব ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কারণে তাঁকে সম্মান করতেন। কিন্তু এই 'মুক্তিযোদ্ধা ইমেজ' বা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মূল্যবোধই পরবর্তী সময়ে তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, যখন দলের নিয়ন্ত্রণ তথাকথিত 'হাওয়া ভবন' বা উগ্রপন্থীদের হাতে চলে যায়।
২১ আগস্টের বিভীষিকা এবং খোকার ঐতিহাসিক অবস্থান
সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট ও বাঁকবদল তৈরি হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পর। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার যে নীল নকশা করা হয়েছিল, খোকা সাহেব তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।
তারেক রহমানের প্রতি সরাসরি ক্ষোভ
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এবং পরবর্তী সময়ে নিকটজনদের কাছে খোকা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে ২১ আগস্টের ঘটনার পেছনের কুশীলবদের নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, এই হামলার পুরো নকশাটি তৈরি হয়েছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বে, যেখানে বিএনপির প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। হামলার খবর শোনার পরপরই খোকা সাহেব নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে ছুটে যান এবং প্রকাশ্যে তারেক রহমানের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, "তারেক রহমানের এই আত্মঘাতী রাজনীতির কারণে বিএনপির সর্বনাশ হচ্ছে।"
বেগম জিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার অনুরোধ
রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতা হিসেবে সাদেক হোসেন খোকা বুঝতে পেরেছিলেন, ২১ আগস্টের এই কলঙ্কিত অধ্যায় দেশের রাজনীতিতে যে বিভাজন রেখা তৈরি করল, তার ফল হবে ভয়াবহ। তিনি ওইদিন সন্ধ্যায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য সরকারিভাবে দুঃখ প্রকাশ ও জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এর ফলে দেশে প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু হবে যা দীর্ঘমেয়াদে বিএনপিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দলীয় প্রধান খোকার সেই গঠনমূলক ও মানবিক প্রস্তাব শোনেননি, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দেয়।
ঢাকা প্রেসক্লাবের সাংবাদিককে যা বলেছিলেন খোকা
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের উপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ঢাকা প্রেসক্লাবের এক উর্ধতন সাংবাদিককে তিনি বলেন:
"২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকিত এবং বর্বরোচিত ঘটনাগুলোর একটি। এই পুরো ঘটনার নীল নকশা তৈরি করেছিলেন তারেক রহমান। বিএনপির সিনিয়র নেতাদেরকে এ ব্যাপারে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরপরেই আমি (সাদেক হোসেন খোকা) ছুটে যাই বিএনপির কার্যালয়ে, সেখানে আমি প্রকাশ্যে তারেক রহমানকে গালাগাল করেছিলাম। তারেক রহমানের কারণে বিএনপির সর্বনাশ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছিলাম।
এরপর আমি বেগম জিয়ার সঙ্গে সন্ধ্যায় সাক্ষাৎ করি। এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষমা চাওয়ার জন্য আমি অনুরোধও করি। আমি আরো বলেছিলাম, এর মাধ্যমে রাজনীতিতে যে বিভাজনরেখা তৈরি হলো, তা প্রতিশোধের রাজনীতিকে উসকে দেবে, এর ফলে বিএনপিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু বেগম জিয়া ঐ দুঃখ প্রকাশের ঘটনা শোনেননি।"
দলের অভ্যন্তরে কোণঠাসা হওয়া এবং গ্রুপিং রাজনীতির শিকার
২১ আগস্টের ঘটনার পর যখন সাদেক হোসেন খোকা সত্য কথাটি উচ্চস্বরে বলতে শুরু করলেন, তখন থেকেই দলের ভেতরে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে। মূলত তারেক রহমানের গুডবুকে থাকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত নেতারা খোকাকে 'আওয়ামী লীগের দালাল' বা 'সন্দেহভাজন' হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেন।
ঢাকার অবিসংবাদিত নেতা হওয়ার সত্ত্বেও তাঁকে কৌশলে ঢাকার রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়। বিএনপির অভ্যন্তরীণ এই গ্রুপিং রাজনীতির কারণেই তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তিনি বারবার অবহেলিত হয়েছেন। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টিও দলের একাংশের কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তাঁর উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ তারেক রহমানের উগ্র রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না।
আওয়ামী লীগ বনাম সাদেক হোসেন খোকা
বর্তমানে অনেকে দাবি করার চেষ্টা করেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারই খোকাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজনৈতিক লড়াই থাকলেও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে খোকার এক ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল।
২০১১ সালে হরতাল চলাকালীন সময়ে যখন সাদেক হোসেন খোকার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা হয়, তখন আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে গিয়ে সেই হামলার নিন্দা জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খোকা সাহেব যে সম্মানটুকু পেতেন, তা বিএনপির ভেতরের ষড়যন্ত্রকারীরা কখনও সহজভাবে নিতে পারেনি। মূলত আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপিয়ে বিএনপি তাদের নিজেদের ব্যর্থতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
সুবিধাবাদী অপশক্তির অপতৎপরতা - শিবির ও বিভ্রান্তিকর রাজনীতি
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, বর্তমানে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্তরসূরিরা বা শিবিরের ক্যাডাররা সাদেক হোসেন খোকার নাম ভাঙিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। এটি ইতিহাসের এক করুণ পরিহাস। যে আদর্শের বিরুদ্ধে খোকা সাহেব ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, আজ সেই অপশক্তিই খোকাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়।
মুক্তিযুদ্ধকে যারা ধারণ করে না, তারা কেবল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে খোকা সাহেবের মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে 'টিস্যু পেপারের' মতো ব্যবহার করতে চায়। সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান থাকবে এই সুবিধাবাদী চক্র থেকে সাবধান থাকতে হবে। সাদেক হোসেন খোকা কখনও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমর্থক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা।
ইতিহাসের বিচারে সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকা আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং ২১ আগস্ট নিয়ে তাঁর সেই সত্য ভাষণ আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো নিজ মুখেই বর্ণনা করতেন কীভাবে নিজ দলের তথাকথিত নেতাদের ষড়যন্ত্রে তাঁকে নিঃস্ব হতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার অপরাধে এবং তারেক রহমানের ভুল রাজনীতির প্রতিবাদ করার কারণে তাঁকে যে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে, তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল লেখা থাকবে।
আমরা সাদেক হোসেন খোকার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং আশা করি আগামীর রাজনীতিতে গ্রুপিং ও উগ্রতা নয়, বরং খোকা সাহেবের মতো ত্যাগী ও উদারনৈতিক দেশপ্রেমের চর্চা হবে।
লেখক: ড. জামিল আহমেদ, প্রবীণ শিক্ষক
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















