জঘন্যতম খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন - বঙ্গবন্ধুর বুকে সরাসরি গুলি চালিয়েছিল যে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িটি তখন নিস্তব্ধতায় ঘেরা। হঠাৎ বুলেটের শব্দে প্রকম্পিত হলো আকাশ-বাতাস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত এই অধ্যায়ে যারা সরাসরি ট্রিগার চেপেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম নিঠুর ও নৃশংস ব্যক্তিটি ছিল রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন। কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যা নয়, জেলহত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনার সাথেও এই খুনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও তার পলায়ন জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় গল্প।

TruthBangla
Jan 17, 2026
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িটি তখন নিস্তব্ধতায় ঘেরা। হঠাৎ বুলেটের শব্দে প্রকম্পিত হলো আকাশ-বাতাস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত এই অধ্যায়ে যারা সরাসরি ট্রিগার চেপেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম নিঠুর ও নৃশংস ব্যক্তিটি ছিল রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন। কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যা নয়, জেলহত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনার সাথেও এই খুনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও তার পলায়ন জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় গল্প। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা উন্মোচন করব এই খুনির ছদ্মবেশে বেঁচে থাকার কাহিনি এবং বর্তমান অবস্থা।
বঙ্গবন্ধুর বুকে সরাসরি গুলি চালিয়েছিল যে
ঘাতক দল যখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আক্রমণ চালায়, বঙ্গবন্ধু তখন আতঙ্কিত না হয়ে অত্যন্ত সাহসের সাথে নিচে নেমে আসছিলেন। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তিনি যখন গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন "তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?", ঠিক সেই মুহূর্তে গর্জে ওঠে খুনি মোসলেহ উদ্দীনের অস্ত্র।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সেই সিঁড়িতেই নিথর হয়ে পড়ে থাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক। কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই শান্ত হয়নি এই ঘাতক, সে ৩২ নম্বরের অন্যান্য সদস্যদের ওপরও নারকীয় তান্ডব চালিয়েছিল।
জেলহত্যা ও পরবর্তী ‘পুরস্কার’
বঙ্গবন্ধু হত্যার আড়াই মাস পর, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান) অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই জেলহত্যা মিশনেও মোসলেহ উদ্দীন সরাসরি অংশ নিয়েছিল।
দেশদ্রোহী ও খুনি হওয়া সত্ত্বেও মোসলেহ উদ্দীনকে পরবর্তী সরকারগুলো পুরস্কৃত করেছিল। জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে তাকে বিচার থেকে রেহাই দেওয়া হয় এবং তাকে বিদেশে কূটনৈতিক মিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় সে:
তেহরান (ইরান) দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। পরবর্তীতে জেদ্দা (সৌদি আরব) দূতাবাসে উচ্চপদে আসীন হয়। এই কূটনৈতিক নিয়োগগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছিল।
রিসালদার থেকে ‘ডাক্তার রফিকুল ইসলাম’
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যখন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন মোসলেহ উদ্দীন বুঝতে পারে তার দিন ঘনিয়ে এসেছে। সে কৌশলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তার পলায়ন জীবনের ধাপগুলো ছিল নিম্নরূপ:
থাইল্যান্ড ও পাকিস্তান: প্রথমে থাইল্যান্ড হয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়।
জার্মানি: সেখান থেকে জার্মানিতে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে।
ভারত: জার্মানিতে বেশিদিন স্থায়ী হতে না পেরে সে প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রবেশ করে এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
ইউনানী ফার্মেসি ও ‘ডাক্তার’ পরিচয়
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগর এলাকায় সে নিজের পরিচয় বদলে ফেলে। সেখানে তার নতুন নাম হয় রফিকুল ইসলাম খান। স্থানীয়দের কাছে সে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘ডাক্তার দত্ত’ নামে। সে একটি ‘ইউনানী ফার্মেসি’ খুলে আয়ুর্বেদ ও হোমিও চিকিৎসা শুরু করে। পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের জনক এই খুনি দীর্ঘ কয়েক দশক সেখানে সাধারণ মানুষের মতোই জীবন যাপন করছিল, কেউ টেরও পায়নি যে এই শান্ত ভদ্রলোকটিই একদিন ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল।
ক্যাপ্টেন মাজেদের গ্রেফতার ও মোসলেহ উদ্দীনের খোঁজ
২০২০ সালের এপ্রিল মাসে দীর্ঘ ২৫ বছর পলাতক থাকার পর বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। মাজেদকে জিজ্ঞাসাবাদের পরই মোসলেহ উদ্দীনের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পায় বাংলাদেশের গোয়েন্দারা।
মাজেদ স্বীকার করে যে, ভারতে থাকাকালীন তার সাথে মোসলেহ উদ্দীনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, মোসলেহ উদ্দীন ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগর রেলস্টেশন এলাকায় বসবাস করছে। তবে মাজেদ গ্রেফতার হওয়ার খবর পাওয়ার পর পরই মোসলেহ উদ্দীন সেই এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়।
একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য: ২০১৮ সালে মোসলেহ উদ্দীন অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে এসে নরসিংদীর শিবপুরে তার পরিবারের সাথে কয়েকদিন সময় কাটিয়ে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
পুরো পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্রে জালিয়াতি
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, কেবল মোসলেহ উদ্দীন একা নয়, তার স্ত্রী ও সন্তানরাও এই পরিচয় জালিয়াতির সাথে যুক্ত। তার ছেলে-মেয়ে ও পুত্রবধূরা জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতার নামের স্থানে ‘রফিকুল ইসলাম খান’ ব্যবহার করেছেন। এমনকি তার পৈতৃক এলাকা নরসিংদীতেও তারা এই ভুয়া নামেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। ১৯৯৬ সালে তার কিছু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হলেও বাকি অংশ তারা ভোগদখল করে আসছিল।
বর্তমানে বাকি খুনিরা কোথায়?
বঙ্গবন্ধু হত্যার ১২ জন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বাকি ৫ জন এখনো পলাতক (একজনের মৃত্যু হয়েছে বিদেশে)। নিচে তাদের বর্তমান অবস্থান তুলে ধরা হলো:
ক) দণ্ড কার্যকর হওয়া ৫ জন (২০১০)
১. সৈয়দ ফারুক রহমান
২. সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান
৩. মুহিউদ্দিন আহমেদ
৪. বজলুল হুদা
৫. এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ
খ) আব্দুল মাজেদ (২০২০)
ভারতের কোলকাতা থেকে ফেরার পর তাকে মিরপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১১ এপ্রিল ২০২০-এ তার ফাঁসি কার্যকর হয়।
গ) পলাতক বাকি ৫ জন
খুনির নাম | সর্বশেষ সম্ভাব্য অবস্থান |
খন্দকার আব্দুর রশিদ | লিবিয়া বা বেলজিয়ামে ব্যবসা করছেন বলে ধারণা করা হয়। |
শরীফুল হক ডালিম | পাকিস্তানের করাচি বা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন। |
রাশেদ চৌধুরী | যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। |
নূর চৌধুরী | কানাডায় আছেন। আইনি জটিলতায় তাকে ফেরত আনা যাচ্ছে না। |
মোসলেহ উদ্দীন | সর্বশেষ ভারতে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, বর্তমানে নিখোঁজ। |
দ্রষ্টব্য: আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে পলাতক অবস্থায় মারা যান।
কেন ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না এই খুনিদের?
বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন।
কানাডা: সে দেশের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো হয় না যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র: রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের মামলাটি বর্তমানে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
তবে রিসালদার মোসলেহ উদ্দীনের ক্ষেত্রে ভারত সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সমন্বয় চলছে। ধারণা করা হয়, তাকে ফিরিয়ে এনে বিচার সম্পন্ন করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইতিহাসের দায়মুক্তি
একটি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে হলে খুনিদের বিচার সম্পন্ন করা অপরিহার্য। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি ছিল বাংলাদেশের অস্তিত্বের লড়াই। রিসালদার মোসলেহ উদ্দীনের মতো ঘাতকরা নাম বদলে, ছদ্মবেশ ধারণ করে হয়তো পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পালিয়ে বেড়াতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের অভিশাপ থেকে তাদের মুক্তি নেই।
বাংলার মাটিতে প্রতিটি খুনির ফাঁসি কার্যকর করা এবং তাদের উত্তরসূরিদের জালিয়াতি রুখে দেওয়াই হোক আজকের শপথ। যতক্ষণ পর্যন্ত শেষ ঘাতকটির বিচার সম্পন্ন না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত জাতির এই দায়মুক্তি ঘটবে না।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















