জঘন্যতম খুনি রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন - বঙ্গবন্ধুর বুকে সরাসরি গুলি চালিয়েছিল যে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িটি তখন নিস্তব্ধতায় ঘেরা। হঠাৎ বুলেটের শব্দে প্রকম্পিত হলো আকাশ-বাতাস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত এই অধ্যায়ে যারা সরাসরি ট্রিগার চেপেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম নিঠুর ও নৃশংস ব্যক্তিটি ছিল রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন। কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যা নয়, জেলহত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনার সাথেও এই খুনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও তার পলায়ন জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় গল্প।

TruthBangla

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি তখন নিস্তব্ধতায় ঘেরা। ঘড়ির কাঁটায় শেষ রাত, চারিদিকে এক অজানা গুমোট নীরবতা। হঠাৎ করে আধুনিক সাঁজোয়া যান, ট্যাংক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বুলেটের গর্জনে কেঁপে উঠল পুরো ধানমন্ডি ও ঢাকার আকাশ-বাতাস। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার মাধ্যমে তৎকালীন সামরিক চক্র ও কুচক্রী মহল বাঙালি জাতীয়তাবাদের বুকে এক চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছিল। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সেই সিঁড়িতে যারা সরাসরি বন্দুকের ট্রিগার চেপেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম নির্দয়, হিংস্র ও পৈশাচিক চরিত্রটি ছিল রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন (বরখাস্তকৃত)।
কেবল ধানমণ্ডির রক্তগঙ্গা নয়, এর ঠিক আড়াই মাস পর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপদ প্রকোষ্ঠে বন্দি মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার মিশনেও এই খুনি সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিল। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের তোষণ, ভুয়া পাসপোর্ট এবং রূপকথার গল্পকেও হার মানানো ছদ্মবেশ ধারণ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পলাতক জীবনের কাটিয়েছে এই অভিশপ্ত ঘাতক। কীভাবে একজন সেনাসদস্য থেকে সে ঘাতকে রূপ নিল? কীভাবে থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, জার্মানি হয়ে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগরে 'ডাক্তার দত্ত' সেজে আয়ুর্বেদ ও ইউনানী চিকিৎসক হিসেবে কাটাল কয়েক দশক? এবং কিভাবে আরেক ঘাতক ক্যাপ্টেন মাজেদের গ্রেফতারের পর প্রকাশ পেল মোসলেহ উদ্দীনের রহস্যময় আন্তর্জাতিক চক্রান্ত?
আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব রিসালদার মোসলেহ উদ্দীনের পলায়ন জীবনের প্রতিটি রহস্যময় ধাপে ঘটা ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক চিত্রনাট্য।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে রক্তগঙ্গা: বঙ্গবন্ধুর বুকে সরাসরি গুলি চালিয়েছিল যে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে যখন তৎকালীন সেনাবাহিনীর জুনিয়র কিছু ঘাতক কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যরা ৩টি দলে বিভক্ত হয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর, সুফিয়া কামাল-মনি ভবন এবং সেরনিয়াবাতের বাসভবনে আক্রমণ চালায়, তখন ৩২ নম্বরের আক্রমণকারী দলের সামনের সারিতে ছিল রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গুলির শব্দ শুনে ভয় না পেয়ে অত্যন্ত সাহসিকতা ও গাম্ভীর্যের সাথে ওপর থেকে নিচে নেমে আসছিলেন। সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে যখন তিনি বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করেছিলেন:
"তোরা কী চাস? আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি?"
ঠিক সেই মুহূর্তে কোনো কথা না বলে মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, মেজর বজলুল হুদা এবং রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন স্টেনগান ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল উঁচিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আদালতের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ কামালকে আগেই নিচতলায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর গম্ভীর প্রশ্নের মুখে মহিউদ্দিন কিছুটা পিছু হটলেও মেজর বজলুল হুদা এবং রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন তাদের অস্ত্রের ট্রিগার চেপে ধরে। মোসলেহ উদ্দীনের হাতের অস্ত্র থেকে বের হওয়া বুলেট সরাসরি আঘাত করে স্বাধীনতার মহানায়কের বুকে ও পেটে। সিঁড়ির রক্তস্নাত ধাপে নিথর হয়ে ঢলে পড়েন জাতির পিতা।
এখানেই শেষ নয়, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নিশ্চিত করার পর মোসলেহ উদ্দীন অন্য ঘাতকদের সাথে নিয়ে দোতলায় ও অন্যান্য কক্ষে প্রবেশ করে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেলের ওপর নরকীয় তাণ্ডব চালায়। ঘাতক দলের অন্যতম হিংস্র সদস্য হিসেবে মোসলেহ উদ্দীন সেদিন রক্তে হোলি খেলেছিল।
৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলহত্যা
১৫ আগস্টের পৈশাচিক অভ্যুত্থানের পর ঘাতকচক্র ও তাদের মদদদাতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ বুঝতে পেরেছিল যে, দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক সমাজ এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয় চার নেতা (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান) জীবিত থাকলে যেকোনো মুহূর্তে তাদের অবৈধ ক্ষমতার মসনদ উল্টে যেতে পারে। তাই ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা করা হয়।
৩রা নভেম্বর গভীর রাতে বঙ্গভবন থেকে টেলিফোন বার্তার মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন আইজি প্রিজনকে নির্দেশ দেওয়া হয় বিশেষ একটি সেনাদলকে কারাগারে ঢুকতে দেওয়ার জন্য। সেই ঘাতক দলের সরাসরি নেতৃত্বে ছিল রিসালদার মোসলেহ উদ্দীন।
কারাগারের ১ নম্বর সেলে বন্দি জাতীয় চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করা হয়। মোসলেহ উদ্দীন এবং তার সাথে থাকা চার-পাঁচজন ঘাতক সেনাসদস্য কোনো কথা না বলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে তাঁদের ওপর অন্ধের মতো ব্রাশফায়ার করে। রক্তাক্ত হয়ে ছটফট করতে থাকা জাতীয় নেতাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে মোসলেহ উদ্দীন পরবর্তীতে রাইফেলের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চরম অমানবিকতা প্রদর্শন করে। ১৫ আগস্টের মতো ৩ নভেম্বরের এই বর্বরোচিত হাসপাতাল ও জেলখানায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞেও মোসলেহ উদ্দীন ছিল প্রধান কিলারদের অন্যতম।
ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা ও 'পুরস্কার': ইনডেমনিটি থেকে কূটনৈতিক পদ
যে অপরাধীদের স্থান হওয়া উচিত ছিল ফাঁসির কাষ্ঠে, স্বাধীন বাংলাদেশের পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করেছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ কুখ্যাত 'ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স' (দায়মুক্তি অধ্যাদেশ) জারি করে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার এবং জাতীয় চার নেতাদের খুনিদের বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে এই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে খুনিদের আইনি সুরক্ষাকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
খুনিদের কেবল বিচার থেকেই রেহাই দেওয়া হয়নি, বরং বেসামরিক ও সামরিক সার্ভিসে তাদেরকে পদোন্নতি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রাক-কূটনৈতিক ও কূটনৈতিক পদে চাকরি দেওয়া হয়। রিসালদার মোসলেহ উদ্দীনকে তার 'সেবা'র পুরস্কারস্বরূপ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে বিদেশে পাঠানো হয়:
১. ইরান (তেহরান) বাংলাদেশ দূতাবাস: সেখানে তাকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদমর্যাদায় দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২. সৌদি আরব (জেদ্দা) বাংলাদেশ দূতাবাস: পরবর্তীতে সেখান থেকে জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব ও উচ্চতর পদে আসীন করা হয়।
রাষ্ট্রীয় খরচে কূটনৈতিক পাসপোর্ট বহন করে মোসলেহ উদ্দীন এবং অন্যান্য খুনিরা দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করেছিল। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট রাজনৈতিক তোষণের দৃষ্টান্ত।
১৯৯৬ সালের মোড় পরিবর্তন: মোসলেহ উদ্দীনের আন্তর্জাতিক পলায়ন রুট
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করা হয়। একই বছর ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক মামলা ও তদন্ত শুরু হয়। বিচারে সাজা ও ফাঁসির কাষ্ঠ নিশ্চিত জেনে মোসলেহ উদ্দীনসহ বাকি সব খুনিরা চতুরতার সাথে আত্মগোপনে চলে যায়।
মোসলেহ উদ্দীনের আন্তর্জাতিক পলায়নের রুটটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী:
ধাপ ১ (পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড): ১৯৯৬ সালে মামলা শুরুর পরপরই জেদ্দা থেকে মোসলেহ উদ্দীন পালিয়ে প্রথমে পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে থাইল্যান্ডে গিয়ে কয়েক মাস নিজের পরিচয় লুকিয়ে বাস করে।
ধাপ ২ (জার্মানি): ইউরোপে নিজেদের নিরাপদ মনে করে মোসলেহ উদ্দীন জার্মানিতে প্রবেশ করে এবং ভুয়া নথিপত্র দেখিয়ে 'রাজনৈতিক আশ্রয়' (Political Asylum) প্রার্থনা করে। কিন্তু ইউরোপীয় গোয়েন্দা নজরদারি এবং পাসপোর্টের জালিয়াতি ধরা পড়ার আশঙ্কায় সেখানে সে স্থায়ী হতে পারেনি।
ধাপ ৩ (ভারত ও উত্তর চব্বিশ পরগনা): ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে অত্যন্ত গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে মোসলেহ উদ্দীন। সে উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ ও ঠাকুরনগর এলাকাকে তার প্রধান আস্তানা হিসেবে বেছে নেয়। সেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সাথে মিশে যাওয়ার জন্য একাধিক নাম ও পরিচয় ব্যবহার করা শুরু করে।
ঠাকুরনগরের 'ডাক্তার দত্ত': নাম পরিবর্তন, ইউনানী ফার্মেসি ও ছদ্মবেশী জীবন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ঠাকুরনগর রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকাটি ছিল বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অনেক শরণার্থীর চেনা জায়গা। মোসলেহ উদ্দীন এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নিজের পুরো অতীত ধুয়ে-মুছে ফেলে।
ভুয়া নাম ও পরিচয়পত্র: মোসলেহ উদ্দীন ভারতের স্থানীয় দালাল চক্রের সহায়তায় ভুয়া ভারতীয় আধার কার্ড, ভোটাধিকার এবং রেশন কার্ড তৈরি করে। ভারতীয় নথিতে তার নতুন নাম হয় 'রফিকুল ইসলাম খান'। আবার ঠাকুরনগরের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় স্থানীয়দের সহানুভূতি ও সন্দেহ এড়াতে সে নিজেকে পরিচয় দিত 'ডাক্তার দত্ত' বা 'ডাক্তার রফিকুল' হিসেবে।
ইউনানী ফার্মেসি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক: ঠাকুরনগর স্টেশন রোডের কাছে সে একটি ছোট ইউনানী ও আয়ুর্বেদ ওষুধের ফার্মেসি খোলে। দীর্ঘ দিন কবিরাজি ও ভেষজ চিকিৎসার ওপর প্রাথমিক ধারণা নিয়ে সে সেখানে রোগী দেখা শুরু করে। স্থায়ীদের কাছে সে ছিল একজন বিনয়ী, ধার্মিক এবং মৃদুভাষী বয়োবৃদ্ধ মানুষ। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে প্রতিদিন সকালে যাকে শান্ত মনে ভেষজ ওষুধ বিক্রি করতে দেখা যায়, তিনি মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর বুকে সরাসরি গুলি চালানো এক অমানবিক ঘাতক।
পারিবারিক জীবন ও যোগাযোগ: ভারতে অবস্থানকালেও মোসলেহ উদ্দীন তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করেনি। সেখানে তার পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের যাতায়াত ছিল। ঠাকুরনগরে একটি স্থায়ী বাড়ি বানিয়ে সে কয়েক দশক পার করে দেয়।
২০২০ সালের এপ্রিলে ঘাতক মাজেদের গ্রেফতার ও মোসলেহ উদ্দীনের অন্তর্ধাণ
দীর্ঘ ২৫ বছর ভারতের কলকাতায় ভুয়া পরিচয় (আলী আহমেদ সেজে) থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় ভারতের সীমানা হয়ে অনুপ্রবেশের সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে বঙ্গবন্ধুর আরেক দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদ। মাজেদের এই নাটকীয় পতনই উন্মোচন করে মোসলেহ উদ্দীনের দীর্ঘদিনের আস্তানা।
মাজেদের স্বীকারোক্তি: গ্রেফতারের পর বাংলাদেশ পুলিশের সিটিটিসি (CTTC) এবং গোয়েন্দা বিভাগের জিজ্ঞাসাবাদে মাজেদ স্বীকার করে যে, ভারতে অবস্থানকালে তার সাথে রিসালদার মোসলেহ উদ্দীনের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। মাজেদ জানায়, মোসলেহ উদ্দীন উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠাকুরনগরে 'রফিকুল ইসলাম' নামে দিব্যি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে।
মোসলেহ উদ্দীনের তড়িঘড়ি পলায়ন: ২০২০ সালের ১১ই এপ্রিল মধ্যরাতে ক্যাপ্টেন মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়। মাজেদের গ্রেফতার হওয়ার সংবাদ ভারত ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হওয়ার সাথে সাথে ঠাকুরনগরে মোসলেহ উদ্দীনের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়।
ঠাকুরনগরের স্থানীয় বাসিন্দারা পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের জানান, ২০২০ সালের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে হঠাৎ করেই 'ডাক্তার দত্ত' তাঁর ফার্মেসি বন্ধ করে এক রাতে পরিবারসহ উধাও হয়ে যান। ভারতীয় আনন্দবাজার পত্রিকা ও স্থানীয় মিডিয়ার খবরে দাবি করা হয়, মোসলেহ উদ্দীনকে ভারতীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা আটক করে বাংলাদেশের সীমান্ত কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের পক্ষ থেকে এ তথ্যের কোনো চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা তখন আসেনি। ফলে মোসলেহ উদ্দীনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আজ অব্দি একটি কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্য রয়ে গেছে।
অতি গোপনে দেশে আগমন ও নরসিংদীতে পারিবারিক জালিয়াতির জাল
মোসলেহ উদ্দীনের কেবল বিদেশে পলায়নই চাঞ্চল্যকর ছিল না, বরং বাংলাদেশের ভেতরে তার পরিবারের অপকর্ম ও জালিয়াতির নেটওয়ার্ক ছিল সমানভাবে বিস্তৃত।
২০১৮ সালের গোপন বাংলাদেশ সফর: বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের (যেমন: প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ) অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর সত্য ২০১৮ সালে মোসলেহ উদ্দীন অত্যন্ত গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। সে নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার দত্তেরগাঁও এলাকায় তার পৈতৃক ভিটায় কয়েক দিন অবস্থান করে এবং তার সন্তানদের সাথে গোপন বৈঠক ও সম্পত্তির বিষয়াদি বণ্টন সম্পন্ন করে আবার ভারতে ফিরে যায়। একজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দেশে এসে কিছুদিন অবস্থান করে নিরাপদে চলে যাওয়া ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক চ্যালাঞ্জ।
জাতীয় পরিচয়পত্রে (NID) মারাত্মক জালিয়াতি: তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, মোসলেহ উদ্দীনের সন্তানরা বাপের আসল পরিচয় আড়াল করতে এবং সরকারি সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এড়াতে এক নজিরবিহীন জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিল:
১. পিতার নাম পরিবর্তন: মোসলেহ উদ্দীনের ছেলে-মেয়ে এবং পুত্রবধূরা তাঁদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতার নামের জায়গায় 'মোসলেহ উদ্দীন' বাদ দিয়ে ভারতের ভুয়া নাম 'রফিকুল ইসলাম খান' ব্যবহার করেছিল।
২. সম্পত্তি ভোগদখল: ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর বিচার কাজ শুরু হলে আদালত মোসলেহ উদ্দীনের কিছু স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু নাম পরিবর্তনের এই জালিয়াতির কারণে নরসিংদীতে তার পরিবারের বাকি কোটি টাকার জমি ও বাজার বহাল তবিয়তে তার সন্তানরা ভোগদখল করে আসছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন পরবর্তীতে এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বঙ্গবন্ধুর ১২ দণ্ডপ্রাপ্ত ঘাতকের বর্তমান ও চূড়ান্ত পরিণতি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সদস্য হত্যার দায়ে ১৯৯৮ সালে নিম্ন আদালত ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১২ জন ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। এই ১২ জন অভিশাপ্ত আসামির বর্তমান ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
যাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে (৬ জন)
১. সৈয়দ ফারুক রহমান: (২৮ জানুয়ারি ২০১০-এ ফাঁসি কার্যকর)
২. সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান: (২৮ জানুয়ারি ২০১০-এ ফাঁসি কার্যকর)
৩. এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ: (২৮ জানুয়ারি ২০১০-এ ফাঁসি কার্যকর)
৪. বজলুল হুদা: (২৮ জানুয়ারি ২০১০-এ ফাঁসি কার্যকর)
৫. মহিউদ্দিন আহমেদ: (২৮ জানুয়ারি ২০১০-এ ফাঁসি কার্যকর)
৬. আব্দুল মাজেদ: (২০২০ সালের এপ্রিলে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের পর আটক ও ১১ই এপ্রিল ২০২০ ফাঁসি কার্যকর)
পলাতক অবস্থায় স্বাভাবিক বা অসুস্থতায় মৃত্যু (১ জন)
আজিজ পাশা: জিম্বাবুয়েতে কূটনৈতিক সুবিধা ভোগ করা অবস্থায় ২০০১ সালের জুন মাসে পলাতক জীবনের শেষভাগে মারা যায়।
বর্তমানে বিদেশে চিহ্নিত ও পলাতক আসামিরা (৫ জন)
ঘাতকের নাম ও পদবী | সামরিক বাহিনীতে পদবী | সর্বশেষ নিশ্চিত/সম্ভাব্য অবস্থান | ফিরিয়ে আনার প্রধান আইনি ও কূটনৈতিক বাধা |
খন্দকার আব্দুর রশিদ | লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) | লিবিয়া, পাকিস্তান বা বেলজিয়াম | একাধিক দেশে ঘনঘন স্থান পরিবর্তন ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক পরিচালনা। |
শরীফুল হক ডালিম | মেজর (বরখাস্ত) | পাকিস্তান (করাচি) বা মধ্যপ্রাচ্য | পাকিস্তান সরকারের নীরব আশ্রয় ও কূটনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। |
রাশেদ চৌধুরী | লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (লস অ্যাঞ্জেলেস) | যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের (Asylum) আইনি আপিল প্রক্রিয়া ঝুলে থাকা। |
নূর চৌধুরী | অব. নম্বরবিহীন কর্মকর্তা | কানাডা | কানাডিয়ান আইনি বাধা; যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড আছে সেখানে আসামি হস্তান্তর না করার নীতি। |
মোসলেহ উদ্দীন | রিসালদার (বরখাস্ত) | ভারত (উত্তর চব্বিশ পরগনা, ২০২০ পর্যন্ত) | ২০২০ সালের পর নিখোঁজ; কূটনৈতিক গোয়েন্দা স্তরে প্রত্যর্পণ আলোচনাাধীন। |
আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা: নূর ও রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত আনার ক্ষেত্রে বাধা
পলাতক ঘাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা এবং সম্পর্কিত দেশগুলোর ঘরোয়া আইনের কারণে নূর চৌধুরী এবং রাশেদ চৌধুরীকে দীর্ঘদিনেও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
কানাডার চরম আইনি শর্ত ও নূর চৌধুরী: কানাডার অভিবাসন ও প্রত্যর্পণ আইন (Canadian Extradition Act) অনুযায়ী, কানাডা সরকার এমন কোনো দেশে কোনো অপরাধীকে হস্তান্তর করবে না, যে দেশে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আইনি বিধান রয়েছে। নূর চৌধুরী এই আইনের সুযোগ নিয়ে কানাডায় বহাল তবিয়তে বসবাস করছে। বাংলাদেশ সরকার থেকে বারংবার কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়ে এবং বিকল্প আইনি পথ (যেমন: তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে আমৃত্যু কারাদণ্ডের শর্ত) খোঁজা হলেও কানাডিয়ান সুপ্রিম কোর্টের কঠোর নীতির কারণে নূর চৌধুরীকে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও রাশেদ চৌধুরী: লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) রাশেদ চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে (Political Asylum) রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ দিকে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক আবেদনের প্রেক্ষিতে রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের নথি পুনর্মূল্যায়নের (Review) ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক আপিল প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখনও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কাছে সোপর্দ করা সম্ভব হয়নি।
ঐতিহাসিক দায়মুক্তি ও অপরাধ বিজ্ঞান
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির বিচারিক অখণ্ডতা ও নৈতিক চরিত্র টিকিয়ে রাখার জন্য ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধের বিচার সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেবল একটি পরিবারের ওপর আক্রমণ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, পতাকা এবং জাতীয় চেতনার ওপর আঘাত।
রিসালদার মোসলেহ উদ্দীনের মতো ধূর্ত ও অমানবিক খুনিরা ভুয়া পরিচয়পত্র বানিয়ে, নাম বদলে 'ডাক্তার দত্ত' সেজে কিংবা পৃথিবীর কোনো সুদূর কোণে আত্মগোপন করে সাময়িকভাবে বিচার থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু অপরাধ বিজ্ঞানের নীতি বলে "No crime is foolproof, and history never forgives the assassin" (কোনো অপরাধই নিখুঁত নয় এবং ইতিহাস কখনো ঘাতককে ক্ষমা করে না)।
রিসালদার মোসলেহ উদ্দীনসহ বাকি পলাতক আসামিদের যে স্থানেই তারা থাকুক না কেন, আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করাই হলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রধানতম আইনি ও ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। তবেই কেবল দীর্ঘ পাঁচ দশকের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ এবং শত শহীদের আত্মত্যাগের রক্তে অর্জিত স্বাধীন পতাকার সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকবে।















