রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস – এদের সংখ্যা কত ছিল?
১৯৭১ সালে যখন বাঙালি জাতি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন একটি কুখ্যাত চক্র পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রধান সহযোগী হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ও বহুল ব্যবহৃত নাম হলো 'রাজাকার'। irony হলো, আরবি 'رزاق' (রিজকদাতা, অর্থাৎ আল্লাহ্)-এর মতো একটি পবিত্র শব্দ থেকে আসা 'রাজাকার' পরিচয়টি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ছোঁয়ায় কলঙ্কিত হয়ে ওঠে।

TruthBangla

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল বীরত্ব ও বিজয়ের গল্প নয়; এটি একইসঙ্গে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার কালো দলিল। ১৯৭১ সালে যখন বাঙালি জাতি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন পাকিস্তানি দখলদার সামরিক জান্তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল দেশীয় কিছু কুলাঙ্গার রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত, সংগঠিত এবং বহুল ব্যবহৃত ঘৃন্য পরিচিতিটি হলো ‘রাজাকার’।
Irony হলো, আরবি 'رزاق' (রাজ্জাক - রিজিকদাতা, যা মহান আল্লাহর অন্যতম পবিত্র গুণবাচক নাম) এর মতো একটি পবিত্র শব্দ থেকে আসা 'রাজাকার' পরিচয়টি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ধর্মান্ধ উগ্রপন্থী দলগুলোর ছোঁয়ায় কলঙ্কিত হয়ে ওঠে, যা আজকের বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে সবচেয়ে বড় ঘৃণিত গালিতে। জামায়াতে ইসলামীর কারণে এই নামটি এখন নরহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও দেশদ্রোহিতার সমার্থক হয়ে উঠল। রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস এই তিনটি বাহিনীর নাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে আছে।
১৯৭২ সালে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় দালাল ও রাজাকারদের ভূমিকা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "পাকিস্তানি সৈন্যরা তো বাইরের লোক ছিল, তারা তো জানত না কে কোন ঘরে থাকে। কিন্তু আমার দেশের কিছু কুলাঙ্গার তাদের পথ দেখিয়ে আমার ভাইদের হত্যা করিয়েছে, মা-বোনদের তুলে দিয়েছে। বিদেশি শত্রুর চেয়েও ঘরের এই শত্রুগুলো বেশি ভয়ংকর।"
কীভাবে একটি ধর্মীয় শব্দ চরম বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা ও ধর্ষণের প্রতীক হয়ে উঠল এই প্রবন্ধে আমরা সেই অন্ধকার অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করব।
'রাজাকার' শব্দের অপব্যবহার ও কলঙ্কিত পরিচয়
একটি জনযুদ্ধের সময় যখন কোনো বহিঃশত্রু বা দখলদার বাহিনী একটি ভূখণ্ড আক্রমণ করে, তখন জয়লাভের জন্য তারা স্থানীয় সুবিধাভোগী ও দেশদ্রোহী জনগোষ্ঠীকে নিজেদের সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করে। ইতিহাসে এরাই চিরতরে ঘৃণার প্রতীক হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে 'রাজাকার' ছিল সেই ঘৃণার প্রতীক। কিন্তু এই নামের উৎপত্তি ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে।
নামের উৎপত্তি: ‘রাজাকার’ শব্দটি মূলত ফার্সি ও আরবি ভাষার যৌথ সান্নিধ্যে গঠিত। 'রাজাকার’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘رزاق’ (রাজ্জাক-রিজকদাতা) থেকে, যা আল্লাহর ৯৯টি নামের মধ্যে অন্যতম। ১৯৫০-এর দশকে অবিভক্ত ভারতের হায়দরাবাদে এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে আনসার বাহিনীর একটি অরাজনৈতিক ও সহযোগী সেবামূলক শাখাকে ‘রাজাকার’ বলা হতো, যা ছিল দেশপ্রেমিক ও স্থানীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট।
কলঙ্কিত রূপান্তর: ১৯৭১ সালের মে মাসে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন দেখতে পেল যে বাঙালি জনগোষ্ঠী সর্বাত্মকভাবে মুক্তি সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং পাকিস্তানি সৈন্যরা স্থানীয় ভূগোল, নদীনালা ও বাংলা ভাষা না জানার কারণে মুক্তিকামী বাঙালিদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না, তখন তারা স্থানীয় দালালদের সংগঠিত করার কৌশল নেয়।
তারা এই পুরোনো নামটিকে নতুন করে ব্যবহার করে একটি বিশাল সশস্ত্র আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও মুসলিম লীগের কর্মীরা এই বাহিনীর প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ায়, পবিত্র উৎস থেকে আসা 'রাজাকার' শব্দটি মানবতাবিরোধী অপরাধের সমার্থক হয়ে ওঠে।
জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা এ কে এম ইউসুফ ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনার আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াত কর্মীকে একত্রিত করে প্রথম একটি স্বেচ্ছাসেবী আধা-সামরিক দল গঠন করেন এবং এর নাম দেন ‘রাজাকার’। পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ (কনভেনশনাল ও কাইউম গ্রুপ), নেজামে ইসলামী এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি এই নামটিকে পুরো প্রদেশ জুড়ে রাষ্ট্রীয় আধা-সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক নাম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে একটি পবিত্র ও সেবামূলক শব্দ রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও নিজ মাতৃভূমির সাথে গাদ্দারি ও চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক রূপে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী, পরবর্তীতে আত্মজীবনী 'The Betrayal of East Pakistan'-এ স্বীকৃত: "পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল অন্ধ, আর রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা ছিল তাদের চোখ ও কান। তারা না থাকলে বাঙালি গেরিলা যোদ্ধাদের চিহ্নিত করা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল।"
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বিভিন্ন জনসভায় দালালদের উদ্দেশ্যে বলেন, "এ দেশের মাটিতে জন্ম নিয়ে যারা এ দেশের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, বাংলার ইতিহাস তাদের কখনো ক্ষমা করবে না।"
রাজাকার বাহিনী: জন্ম, উদ্দেশ্য ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পারে, বাঙালি গেরিলা যোদ্ধাদের মোকাবিলা করার জন্য তাদের স্থানীয় সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী প্রয়োজন। কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে গ্রামগঞ্জের মুক্তিকামী জনগণ ও প্রতিরোধ আন্দোলন দমন করা অসম্ভব ভেবে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সশস্ত্র অনুগত বাহিনী গড়ে তোলার কৌশল গ্রহণ করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় 'রাজাকার' বাহিনী।
আনুষ্ঠানিক জন্ম ও কাঠামো
রাজাকার বাহিনীর কার্যকারিতা দেখে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এটিকে সরকারি সামরিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফট্যানেন্ট জেনারেল টিক্কা খান ‘ইস্ট পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স’ (East Pakistan Razakar Ordinance) জারি করেন। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমেই রাজাকার বাহিনীকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ‘সহযোগী সিভিল ফোর্স’ (Auxiliary Armed Force) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আধা-সামরিক এ বাহিনীর পরিচালনার জন্য পৃথক ‘রাজাকার পরিদপ্তর’ (Directorate of Razakars) গঠন করে এর প্রধান হিসেবে মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাজাকার ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে বড় সশস্ত্র আধা-সামরিক বাহিনী। পরবর্তীতে তাদের সশস্ত্র সামরিক বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়। এদের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল 'আনসার' (Auxiliary Forces), কিন্তু সাধারণত এরা 'রাজাকার' নামেই পরিচিত ছিল।

নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ
সদস্য সংখ্যা: পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের সরকারি নথিপত্রে এই বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫৪,০০০ জন উল্লেখ থাকলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০-এর মধ্যে।
নিয়োগের উৎস: গ্রামে-গঞ্জের বেকার যুবকদের অস্ত্র, ক্ষমতা ও অর্থ উপার্জনের লোভ দেখিয়ে এ বাহিনীতে যুক্ত করা হতো। রাজনৈতিকভাবে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী এবং পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) সমর্থক ও কর্মীদের মধ্য থেকেই বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি গড়ে ওঠে। পাশাপাশি অ-বাঙালি বিহারি সম্প্রদায়ের একাংশ, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি মনে করত, তারাও এ বাহিনীতে ব্যাপকভাবে যোগ দেয়।
সরকারি বেতন: সরকারি খাতায় রেজিস্ট্রিকৃত একজন রাজাকারকে প্রতি মাসে ৯০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হতো, যা ১৯৭১ সালের অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে একজন সাধারণ গ্রামীণ তরুণের জন্য বিশাল অংকের টাকা ছিল। পাশাপাশি তাদের নিয়মিত চাল, ডাল ও তেলের রেশন দেওয়া হতো।
অস্ত্রের শক্তি: ১৫ থেকে ২০ দিনের অতি সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো .৩০৩ রাইফেল, যা তাদের গ্রামীণ সমাজে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী করে তুলত।
সম্পত্তি দখলের অবাধ স্বাধীনতা: রাজাকারদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল 'যুদ্ধের অর্থনীতি' বা লুটপাট। পাকিস্তানি সেনারা যখন কোনো গ্রামে অভিযান চালাত, তখন রাজাকাররা আগে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি চিহ্নিত করত। সেনাবাহিনী অভিযান শেষ করে চলে যাওয়ার পর রাজাকাররা সেইসব বাড়িঘর থেকে ধান-চাল, গরু-ছাগল, মূল্যবান আসবাবপত্র এবং নারীদের স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিত। বহু রাজাকার যুদ্ধের ৯ মাসে সাধারণ মানুষের রক্তচুষে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে উঠেছিল। এই অবৈধ অর্থনৈতিক লাভ তাদের দিন দিন আরও বেশি নৃশংস ও বেপরোয়া করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধে বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশন হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে: "রাজাকার ও শান্তি কমিটি গঠনের নামে স্থানীয় অযোগ্য ও দুষ্কৃতকারীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। এরা শৃঙ্খলা মানেনি, বরং ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে, ধনসম্পদ লুট করতে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করে অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত করেছে।"
নেতৃত্ব: কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কাঠামো
রাজাকার বাহিনীর সর্বোচ্চ ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে ছিল সেইসব রাজনীতিবীদ, যারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক: পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী ও কট্টর পাকিস্তানপন্থী নেতা নুরুল আমিন (তিনি পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হন)।
প্রাদেশিক পরিচালক: মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী (চট্টগ্রামের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পিতা), যিনি রাজাকার ও শান্তি কমিটির সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন।
অন্যান্য প্রভাবশালী নেতা: খান এ সবুর (মুসলিম লীগ নেতা), আব্বাস আলী খান (জামায়াতে ইসলামী), গোলাম আযম এবং শাহ আজিজুর রহমান (যিনি পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন)। এরা সমন্বিতভাবে রাজাকারের অস্ত্রায়ন, রাজনৈতিক আইনি সুরক্ষা এবং রাজাকার রিক্রুটমেন্টে ভূমিকা রাখেন।
এই নেতারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জেনারেলদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করতেন, বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় সফর করে রাজাকারদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতেন এবং তরুণদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন।
অপারেশনাল ভূমিকা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ
রাজাকার বাহিনীর মূল দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পথঘাট চেনানো, গ্রামে গ্রামে টহল দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং সন্দেহভাজন স্বাধীনতাকামী নাগরিকদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা। তবে বাস্তবে এ বাহিনী পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে নির্বিচারে হত্যা, গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো নৃশংস কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। চুকনগর ও ডাকরা গণহত্যা সহ মুক্তিযুদ্ধের বহু গ্রামীণ হত্যাকাণ্ডে রাজাকারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল।
১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, যার টেবিলে লেখা ডায়েরি থেকে এই উক্তিটি উদ্ধার করা হয়: "পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূখণ্ডকে লাল রক্তে রাঙিয়ে দেওয়া হবে।" (The green of East Pakistan will be painted red)
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১১ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রদত্ত ভাষণ থেকে: "পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে যারা হাত মিলিয়ে নিজ জাতির পিঠে ছুরি মারছে, ইতিহাস তাদের নাম কোনোদিন ক্ষমার তালিকায় রাখবে না। তারা কেবল ইতিহাসের ডাস্টবিনে স্থান পাবে।"
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথেই এই অনানুষ্ঠানিক ও আধা-সামরিক কাঠামোর বিলুপ্তি ঘটে।
আল-বদর ও আল-শামস: উগ্র খুনি স্কোয়াড ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী
রাজাকার বাহিনী যখন গ্রামগঞ্জে গণলুটপাট ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছিল, তখন শহরের শিক্ষিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কাঠামোর দুটি পরম উগ্রবাদী হিংস্র কুখ্যাত বাহিনী গড়ে তোলা হয় 'আল-বদর' ও 'আল-শামস'।
আল-বদর বাহিনীর গঠন ও নাৎসি এসএস (SS) স্টাইল
'আল-বদর' নামটি নেওয়া হয়েছিল হিজরী দ্বিতীয় সনে সংঘটিত ঐতিহাসিক 'বদর যুদ্ধ' থেকে। ইসলামের এই পবিত্র নামটিকে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) তাদের ঘাতক দলের নাম হিসেবে ব্যবহার করে।
আল-বদর বাহিনী ছিল মূলত জামায়াতের ক্যাডারভিত্তিক একটি ডেথ স্কোয়াড। এদের আদর্শিক অন্ধত্ব ও নিষ্ঠুরতা ছিল জার্মানির হিটলারের কুখ্যাত ‘এসএস’ (Schutzstaffel) বাহিনীর মতো।
তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্ব: আল-বদরের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও অল-পাকিস্তান ছাত্রসংঘের শীর্ষ নেতারা। এদের মধ্যে মতিউর রহমান নিজামী (ছাত্রসংঘের তৎকালীন সর্বপাকিস্তান সভাপতি), আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতি), আশরাফুজ্জামান খান এবং চৌধুরী মঈন উদ্দীন ছিলেন আল-বদরের প্রধান পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী।
প্রশিক্ষণ: আল-বদর সদস্যদের সাধারণ রাজাকারদের মতো কেবল রাইফেল চালানো শেখানো হতো না; তাদের বিশেষ গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিং, নির্যাতন করা এবং চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
আল-শামস - চট্টগ্রামের সন্ত্রাস ও লুটপাট
আল-বদরের পাশাপাশি গঠিত হয় আরেকটি আধা-সামরিক সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী, আল-শামস। এটিও মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণের জন্য তৈরি হয়েছিল। আল-শামস (আল-শামস অর্থ: সূর্য বা The Sun) ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সরাসরি সশস্ত্র ও আদর্শিকভাবে সহায়তা করার জন্য গঠিত একটি বাহিনী।
আল-বদর বাহিনীর মতোই একই সময়ে এই সংগঠনটি গঠিত হয় এবং বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর নৃশংসতা ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। এরা মূলত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করা, গুরুত্বপূর্ণ ব্রীজ ও পাওয়ার স্টেশন পাহারা দেওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ চলাচলের পথ বন্ধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল।
বুদ্ধিজীবী হত্যার চূড়ান্ত নীলনকশা
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে যখন পাকিস্তানি জান্তা বুঝে যায় যে ভারতের মিত্রবাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমণের মুখে তাদের পরাজয় সুনির্দিষ্ট, তখন তারা বাঙালি জাতিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার এক জঘন্য কৌশল গ্রহণ করে। এই নীলনকশার নাম ছিল "বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযান"।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম 'একাত্তরের দিনগুলি' গ্রন্থে লিখেছেন, "১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল আল-বদর ও জামায়াতে ইসলামীর সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান। তালিকা তৈরি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া সবই করেছিল আমাদের চেনা মুখগুলো।"
তালিকা প্রস্তুতকরণ: আল-বদর প্রধান আশরাফুজ্জামান খান এবং চৌধুরী মঈন উদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিচারক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করেন।
কালো কাদা মাখা গাড়ি ও অপহরণ: ১০ই ডিসেম্বর থেকে ১৪ই ডিসেম্বরের মধ্যে আল-বদর কর্মীরা কাদা মাখা মাইক্রোবাসে করে রাতের অন্ধকারে কারফিউর সুযোগে বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি বাড়ি হানা দেয়।
নির্যাতন কেন্দ্র: অপহৃতদের নিয়ে যাওয়া হতো মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে (তৎকালীন আল-বদরের প্রধান টর্চার সেল)। সেখানে ড. জি সি দেব, মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীন, ডা. ফজলে রাব্বী এবং ডা. আলিম চৌধুরীর মতো আলোকিত মানুষদের ওপর মধ্যযুগীয় বর্বর নির্যাতন চালানো হয়।
রায়েরবাজার বধ্যভূমি: নির্যাতন শেষে তাঁদের চোখ ও হাত পেছনে বেঁধে রায়েরবাজার ও মিরপুরের ইটখোলায় নিয়ে গিয়ে বেয়নোট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে কাদামাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও সুপরিকল্পিত মেধা হত্যাকাণ্ড।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ভাষণে: "আমার বুদ্ধিজীবীদের তারা হত্যা করেছে এই উদ্দেশ্যে যে, বাংলাদেশ যদি স্বাধীনও হয়, তবে যেন কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। তারা বাংলাদেশকে মেধা ও মননশূন্য করতে চেয়েছিল।"
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালে ঘাতক দালালদের উদ্দেশ্যে: "আল-বদর ছিল পাকিস্তান সামরিক জান্তার সবচেয়ে আদর্শিক ও সুসংগঠিত ঘাতক দল। এদের নৃশংসতার ধরণ ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার এবং সুনির্দিষ্ট।"
দ্য কলাবোরেটর ফোর্স মেট্রিক্স: দালাল বাহিনীগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী প্রধান চারটি রাজনৈতিক ও আধা-সামরিক সংগঠনের গঠন ও কাজের পরিধি একক নজরে বোঝার জন্য নিচে একটি বিস্তারিত তুলনামূলক তথ্য-সারণী (Table) প্রদান করা হলো:
বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র | শান্তি কমিটি (Peace Committee) | রাজাকার বাহিনী (Razakar Force) | আল-বদর (Al-Badr) | আল-শামস (Al-Shams) |
গঠনকাল ও উৎস | এপ্রিল ১৯৭১; জামায়াত, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামী নেতাদের নিয়ে গঠিত। | মে ১৯৭১; এ কে এম ইউসুফ কর্তৃক খুলনায় প্রথম সূচনা, ৩ আগস্ট আইনি অধ্যাদেশ। | সেপ্টেম্বর ১৯৭১; মূলত ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ (জামায়াতের ছাত্র সংগঠন)-এর সদস্য। | আগস্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৭১; ধর্মভিত্তিক ছাত্র সংগঠন ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশ। |
মূল লোকবল ও প্রকৃতি | বয়স্ক রাজনৈতিক নেতা, চেয়ারম্যান, মাতব্বর ও নীতি-নর্ধারক। | সাধারণ গ্রাম্য অপরাধী, বিহারি, সুযোগসন্ধানী যুবক ও রাজনৈতিক কর্মীরা। | ক্যাডারভিত্তিক উগ্র আদর্শিক তরুণ, মাদ্রাসার উচ্চশিক্ষিত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। | অস্ত্রধারী স্ট্রাইকিং ফোর্সের তরুণ ক্যাডার ও পাকিস্তানি সেনার সহযোগী কর্মী। |
প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা | রাজনৈতিক পরামর্শক ও অ্যাডভাইজরি বেসামরিক কমিটি। | পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধীনস্থ বেতনভুক্ত সিভিল সশস্ত্র আনুষঙ্গিক বাহিনী। | জামায়াতের আধা-সামরিক এলিট ডেথ স্কোয়াড (Nazi SS-style)। | পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ফ্রন্টলাইন সাহায্যকারী সশস্ত্র কমান্ডো ইউনিট। |
প্রধান অস্ত্রসমূহ | অস্ত্র রাখত না, তবে রাইফেল লাইসেন্স প্রদান ও অনুমোদন করত। | .৩০৩ রাইফেল, পুরাতন গাদাগাদা বন্দুক, বেয়োনেট ও হালকা অস্ত্র। | আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, রিভলবার, খঞ্জর, দড়ি ও বিশেষ টর্চার কিট। | ভারী সামরিক রাইফেল, হালকা মেশিনগান (LMG) ও গ্রেনেড। |
প্রধান কাজ ও ভূমিকা | মিলিটারির সাথে মিটিং, তালিকা তৈরি ও পাকিস্তানি সেনার অনুকূল্য লাভ। | মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য প্রদান, গাইড হওয়া, গ্রাম পোড়ানো ও লুটপাট। | বুদ্ধিজীবী হত্যা, সুনির্দিষ্ট টার্গেট কিলিং, ব্ল্যাকমেইল ও গোপন নজরদারি। | সামরিক ক্যাম্প পাহারা দেওয়া, সীমান্ত রক্ষা ও সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া। |
নৃশংসতার ধরণ | পরোক্ষ (নির্দেশনা ও রাজনৈতিক ইন্ধনদাতার ভূমিকা পালন)। | প্রত্যক্ষ গ্রামীণ অনাচার, নারী অপহরণ, গণধর্ষণ ও ব্যাপক অগ্নিসংযোগ। | পৈশাচিক বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা, টর্চার সেলে নির্যাতন ও চোখ বেঁধে হত্যা। | সামরিক উপায়ে আক্রমণ, গেরিলা প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়া ও সরাসরি গুলি চালানো। |
প্রধান শীর্ষ নেতৃত্ব | গোলাম আযম, খাজা খায়েরউদ্দিন, শফিকুজ্জামান, ফরিদ আহমদ। | নুরুল আমিন (কেন্দ্রীয়), ফজলুল কাদের চৌধুরী (প্রাদেশিক), খান এ সবুর। | মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, আশরাফুজ্জামান, মঈন উদ্দীন। | জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক ও জেলা পর্যায়ের ক্যাডাররা। |

এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে বক্তব্য রাখছেন এক রাজাকার নেতা।
গ্রামীণ বাংলাদেশে রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতা
পাকিস্তানের ৯৩,০০০ সশস্ত্র সৈন্যের পক্ষে বাংলাদেশের ৬৮,০০০ গ্রাম জুড়ে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব ছিল না। নদী-নালা, শস্যক্ষেত ও বর্ষাকালের কাদা-পানিতে ভরা বাংলার ভূখণ্ড ছিল তাদের জন্য এক অজানা বিষাক্ত ফাঁদ। এই অচেনা ভূখণ্ডে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘চোখ ও কান’ হিসেবে কাজ করেছিল রাজাকাররা।
শুরুতে আনসার বাহিনীকে ভেঙে এবং শান্তি কমিটির প্রশ্রয়ে এই বাহিনীর লোকবল বাড়ানো হয়। আগস্ট মাসে পাকিস্তান সরকার 'রাজাকার অধ্যাদেশ' জারির মাধ্যমে এদের সরকারি স্বীকৃতি ও মাসিক বেতন-ভাতা প্রদান শুরু করে। এই আইনি স্বীকৃতি রাজাকারদের আরও বেপরোয়া করে তোলে, যার ফলে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতা কেবল সম্মুখ যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ বেসামরিক জনগোষ্ঠী। তাদের কর্মকাণ্ড ছিল সুপরিকল্পিত।
গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ও গাইডের ভূমিকা
রাজাকারদের প্রধানতম কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় এবং তাঁদের পরিবারের ওপর নজর রাখা। গ্রামের কোনো তরুণ মুক্তিযুদ্ধে গেছে কি না, কার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা রাতের বেলায় খাওয়া-দাওয়া করে, অথবা কোথায় তাদের অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে এই সমস্ত অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্য রাজাকাররা তুলে দিত স্থানীয় পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পের মেজরের হাতে।
যখন পাকিস্তানি বাহিনী কোনো গ্রামে ‘সার্চ অপারেশন’ বা অভিযান চালাত, তখন রাজাকাররা আগে আগে গিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত। তাদের নির্দেশেই রাতারাতি অসংখ্য হাসিখুশি গ্রাম ধ্বংসস্তূপ ও শ্মশানে পরিণত হয়েছিল।
সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস 'দ্য সানডে টাইমস'-এ প্রকাশিত ঐতিহাসিক 'Genocide' প্রতিবেদন থেকে: "পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক নৃশংসতার চেয়েও ভীতিপ্রদ ছিল তাদের স্থানীয় সহযোগীদের পরিচিতি। এরা কেবল শত্রু ছিল না, এরা ছিল প্রতিবেশী, যারা রাতের আঁধারে সহকর্মীদের বাড়ি চিনিয়ে দিতে দ্বিধা করেনি।"
কবি সুফিয়া কামাল ১৯৭১-এর স্মৃতিচারণে বলেন, "আমরা ধরে নিয়েছিলাম আঘাত আসবে কেবল সীমান্ত পেরিয়ে আসা শত্রুর কাছ থেকে। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমরা দেখলাম, সবচেয়ে বড় ও বিষাক্ত আঘাতটি এলো আমাদের পাশাপাশি বসবাসকারী চেনা মানুষদের হাত ধরে যারা 'রাজাকার' ও 'আল-বদর' নাম ধারণ করেছিল।"
সাম্প্রদায়িক নিধন ও অগ্নিসংযোগ
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মতো রাজাকারদের প্রধান শত্রুই ছিল হিন্দু সম্প্রদায় এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবধারার বাঙালি মুসলমানরা। আন্তর্জাতিক গবেষক ও অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত ইতিহাসবিদদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ১৯৭১ সালের গণহত্যার একটি বড় অংশ ছিল সুনির্দিষ্টভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু (হিন্দু) নিধন।
রাজাকাররা ধরে নিয়েছিল হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করা ‘গনিমতের মাল’ এবং তাদের হত্যা করা ধর্মীয় পুণ্য। গ্রামের পর গ্রাম হিন্দু অধ্যুষিত পাড়ায় আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া, তাদের ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা এবং নারীদের ধরে তুলে দেওয়ার কাজে রাজাকাররা ছিল অগ্রগামী সৈনিক।
এপ্রিল ১৯৭১ ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড বিখ্যাত 'ব্লাড টেলিগ্রাম' এ বলেন, "আমাদের সরকার এখানে গণতন্ত্রের পতন ঠেকানো তো দূরের কথা, প্রত্যক্ষ গণহত্যার মুখে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে... এখানে নিজের জনগণের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হচ্ছে তা মানব ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়।"
লুটপাট ও যুদ্ধের অর্থনীতি
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নিজের দেশের মানুষের ওপর এত নিষ্ঠুরতা চালানোর প্রেরণা তারা কোথা থেকে পেত? এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল 'লুটপাটের অর্থনীতি'।
রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের বড় একটি অংশ ছিল সমাজের নিচুতলার অপরাধপ্রবণ মানুষ এবং ধর্মীয় উন্মাদনায় অন্ধ উগ্রপন্থীরা। পাকিস্তানি সেনাদের প্রশ্রয়ে তারা মুক্তিবাহিনীর সমর্থকদের বাড়িঘর দখল করত। ধান-চাল, গবাদিপশু থেকে শুরু করে নারীদের স্বর্ণালঙ্কার পর্যন্ত তারা লুট করত। যুদ্ধের নয় মাসে বহু রাজাকার সাধারণ মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে ওঠে। এই অবৈধ সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তাদের আরও বেশি নৃশংস হতে উৎসাহিত করত।
নারী নির্যাতন ও বাঙ্কারে নারী সরবরাহ: একাত্তরের কলঙ্কতম ইতিহাস
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে বেদনাদায়ক, হৃদয়বিদারক ও কলঙ্কিত অধ্যায়টি হলো আমাদের মা-বোনদের ওপর চালানো সুপরিকল্পিত ও পাশবিক নারী নির্যাতন। একাত্তরে প্রায় ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ বাঙালি নারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দেশীয় দালালদের হাতে নিগৃহীত ও ধর্ষিত হয়েছিলেন। আর এই বিভীষিকাময় অপরাধটি বাস্তবায়নের মূল অনুঘটক ছিল রাজাকার বাহিনী।
বাঙ্কারে নারী সরবরাহকারী রাজাকার
পাকিস্তানি সৈন্যরা শহর বা সেনানিবাস ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের বাড়ি বাড়ি চেনে না। কোন বাড়িতে তরুণী বা সুন্দরী নারী রয়েছে, তার তালিকা তৈরি করত স্থানীয় রাজাকাররা।
ঐতিহাসিক দলিল ও বীরাঙ্গনাদের দেওয়া সরাসরি সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, রাজাকাররা বিয়ের প্রলোভন দিয়ে, পরিবারকে বাঁচানোর নাম করে অথবা সরাসরি বন্দুকের মুখে নারীদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙ্কার ও টর্চার সেলে পৌঁছে দিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাজাকাররা নিজেরাই শত শত নারীকে তুলে এনে তাদের নিজেদের আস্তানায় রেখে দীর্ঘ দিন ধরে নির্যাতন চালিয়েছে এবং পরবর্তীতে সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছে।
'গনিমতের মাল' ধারণা ও ধর্মীয় অবমাননা
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের দোসর জামায়াত ও রাজাকাররা এই অমানবিক নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য বিকৃত ধর্মীয় বয়ান তৈরি করেছিল। তারা প্রচার করত যে, মুক্তিকামী বাঙালিরা ‘কাফের’ বা ‘ইসলামবিরোধী’, তাই তাদের ধন-সম্পদ ও নারীরা হলো ‘গনিমতের মাল’ (যুদ্ধে বিজিতদের সম্পদ)।
এই বিকৃত মানসিকতা থেকে রাজাকাররা নিজ দেশের মা-বোনদের সম্ভ্রমকে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে বিলিয়ে দিয়েছিল। কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও বাঙ্কারগুলোতে আটকে রাখা হাজার হাজার বীরাঙ্গনার ওপর যে অমানুষিক যন্ত্রণা চালানো হয়েছিল, তার প্রতিটি ধাপে রাজাকারদের এই দালালি ছিল মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৈতিক পতন।
১৯৭২ সালে বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি দেওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, "যে মা- বোনেরা তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন, তারা আমাদের জাতীয় বীর। তাদের ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা এই স্বাধীন দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।"
আমেরিকান গবেষক ও লেখক সুসান ব্রাউনমিলার 'Against Our Will: Men, Women and Rape' প্রবন্ধে লিখেছেন, "১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে নারীদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন কেবল সামরিক অপরাধ ছিল না; তা ছিল একটি সমাজকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পিত অস্ত্র। আর স্থানীয় সহযোগীরা এই ঘৃণ্য কাজে মূল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল।"
সরকারি তালিকায় বেতনভুক্ত ১০,৭৮৯ জন রাজাকার
স্বাধীনতার দীর্ঘ চার দশক পর, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১০,৭৮৯ জন রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস সদস্যের প্রথম একটি সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই তালিকাটি ছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত সংরক্ষিত নথিপত্র এবং জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া বেতনভুক্ত দালালদের তালিকার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
১০,৭৮৯ জনের এই তালিকাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও ঐতিহাসিক দলিল। এটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, রাজাকার বাহিনী কোনো মনগড়া কল্পকাহিনী ছিল না; বরং তারা সরাসরি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কোষাগার থেকে নিয়মিত টাকা ও ভাতা পেত।
তবে ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির গবেষকরা একমত যে, এই ১০,৭৮৯ সংখ্যাটি রাজাকারের প্রকৃত সংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র (Tip of the Iceberg)। কারণ, তালিকাভুক্ত সদস্যদের বাইরেও অনেক রাজাকার, আলবদর ও আলশামস ছিল, যারা কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বেতনভোগী ছিল।
প্রকৃত সদস্য সংখ্যা কত ছিল?
বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্র, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল এবং গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটির মোট সশস্ত্র সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০-এর মধ্যে।
সরকারি তালিকায় সবার নাম না থাকার মূল কারণগুলো হলো:
আন-রেজিস্টার্ড রাজাকার: বহু গ্রামে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানরা নিজস্ব অর্থায়নে ও স্থানীয় লুটের টাকায় রাজাকার গড়ে তুলেছিল, যাদের নাম কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা বা লাহোরের সরকারি খাতায় নথিভুক্ত হয়নি।
নথি ধ্বংস: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের ঠিক পূর্বে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা তাদের প্রধান প্রধান দপ্তর থেকে রাজাকার ও আল-বদর নিয়োগের বহু ফাইল পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়।
আল-বদর ও আল-শামসের ভিন্ন তালিকা: আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী পরিচালিত হতো মূলত 'ইসলামী ছাত্রসংঘ'-এর নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো থেকে। তাই তাদের তালিকা সেনাদপ্তরের সাধারণ আনসার রেজিস্টারে ছিল না।
যুদ্ধোত্তর বিচার, রাজনৈতিক পুনর্বাসন ও জাতীয় ট্র্যাজেডি
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে, তখন তাদের সাথে সাথে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্র ফেলে দিয়ে গ্রামের ভেতরে পালিয়ে যায়, দাড়ি-গোঁফ কেটে ছদ্মবেশ ধারণ করে অথবা আত্মগোপনে চলে যায়।
বঙ্গবন্ধু সরকারের বিচার প্রক্রিয়া ও 'দালাল আইন ১৯৭২'
স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি "বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ-১৯৭২" (The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972) জারি করেন। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও সংগঠনগুলোর বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস করা হয় “আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩” ”International Crimes (Tribunals) Act, 1973”।
তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনসহ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের প্রণীত এই আইনটি বিশ্ব আইনি ইতিহাসে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ ছিল। এটি ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'নুরেমবার্গ ট্রায়াল' ও 'টোকিও ট্রায়াল' এর মূলনীতির সামঞ্জস্যে তৈরি করা হয়।
১৯৭৩ সালে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে গুরুতর অপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, "যাদের হাত আমার মানুষের রক্তে রঞ্জিত, যারা হত্যা, rape, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে লিপ্ত ছিল তাদের কোনো ক্ষমা নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।"
গ্রেপ্তার: এই আইনের অধীনে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে প্রায় ৩৭,০০০ দালাল ও রাজাকারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল: সারা দেশে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার কাজ শুরু হয় এবং বহু রাজাকারের ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৯৭৩ সালের আংশিক সাধারণ ক্ষমা: ১৯৭৩ সালের ৩০শে নভেম্বর বঙ্গবন্ধু সরকার একটি আংশিক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। তবে এটি ছিল কেবল তাদের জন্য, যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা ধর্ষণের কোনো নির্দিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগ ছিল না (যাঁরা কেবল বাধ্য হয়ে বা সাধারণ যোগ দিয়েছিল)। কিন্তু খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে অভিযুক্ত ১১,০০০ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার ট্রাইব্যুনালে অব্যাহত ছিল।
জিয়াউর রহমানের পুনর্বাসন (১৯৭৫-৮১)
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে যায়। ক্ষমতায় আসা সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের পরাজিত অপশক্তি ও রাজাকারদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার এক আত্মঘাতী উদ্যোগ নেন।
দালাল আইন বাতিল: ১৯৭৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বিতর্কিত এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘দালাল আইন-১৯৭২’ সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। ফলে কারাগারে আটক ও বিচারাধীন ১১,০০০ চিহ্নিত খুনী, ধর্ষক ও শীর্ষ রাজাকার রাতারাতি মুক্ত হয়ে যায়।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু: সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে পুনরায় রাজনীতি করার বৈধতা দেওয়া হয়।
শীর্ষ রাজাকারদের ক্ষমতায়ন: আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক শাহ আজিজুর রহমান-কে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়। পাসপোর্ট বাতিল হওয়া জামায়াতের আমির গোলাম আযম-কে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে আসার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
আল-বদর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে (২০০১-২০০৬) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সুযোগ পায়। এটি ছিল বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মুখে এক চরম ও নজিরবিহীন থাপ্পড়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার (২০১০-২০১৫)
দীর্ঘ চার দশকের ক্ষোভ, বেদনা ও আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০১০ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭৩ সালের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’-এর অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal - ICT) গঠন করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে।
এই ট্রাইব্যুনালের রায়ে একাত্তরের শীর্ষ রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস প্রধানদের অপরাধ আদালতের কাঠগড়ায় প্রমানিত হয় এবং তাদের চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর করা হয়:
গোলাম আযম: শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর সর্বোচ্চ তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় (পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেলহাজতে মারা যান)।
মতিউর রহমান নিজামী: আল-বদর বাহিনীর শীর্ষ প্রধান ও বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয় (২০১৬)।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ: আল-বদরের পূর্ব পাকিস্তান প্রধান, বুদ্ধিজীবী নিধনের সরাসরি কারিগর হিসেবে তার ফাঁসি কার্যকর হয় (২০১৫)।
আব্দুল কাদের মোল্লা: মিরপুরের কুখ্যাত 'কসাই কাদের', যিনি একাই শত শত মানুষকে জবাই করেছিলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।
দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী: পিরোজপুরের চিহ্নিত রাজাকার কমান্ডার, তার বিরুদ্ধে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্মান্তরিত করার অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ কামারুজ্জামান: শেরপুরের আল-বদর প্রধান ও সোহাগপুর বিধবা গ্রামের গণহত্যা নায়ক, তার ফাঁসি কার্যকর হয় (২০১৫)।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী: চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরীর পুত্র ও গুডসহিল টর্চার সেলের নায়ক, ট্রাইব্যুনালে তার ফাঁসি কার্যকর হয় (২০১৫)।
এই বিচারের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যুদ্ধাপরাধীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ইতিহাসের বিচার এড়ানো যায় না এবং অপরাধীদের গায়ে লেগে থাকা রক্তের দাগ কখনো মুছে যায় না।
'রাজাকার' একটি জাতীয় গালিতে রূপ নিল?
আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ শব্দটি আর কেবল ১৯৭১ সালের একটি সুনির্দিষ্ট আধা-সামরিক বাহিনীর নাম নয়; এটি বাঙালি জাতির মনস্তাত্ত্বিক সংবিধানে পরিণত হয়েছে সবচেয়ে অপমানজনক, ঘৃণিত ও সার্বভৌম গালিতে।
ঘৃণার প্রতীক: পৃথিবীর কোনো দেশেই নিজ মাতৃভূমির সাথে যারা বেঈমানি করে, তাদের ইতিহাস ক্ষমা করে না। ফরাসিরা যেমন ‘কুইজলিং’ বা ‘ভিসি ফরাসি’দের ঘৃণা করে, আমেরিকানরা যেমন ‘বেনেডিক্ট আরনল্ড’ নামটি শুনে ধিক্কার দেয়, ঠিক তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদে ‘রাজাকার’ শব্দের সমীকরণ দাঁড়িয়ে গেছে:
রাজাকার = বিশ্বাসঘাতক + নরঘাতক + পরজীবিতা
এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে একাত্তরের সেই অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। একজন রাজাকার কেবল শত্রুকে সাহায্য করেনি; সে নিজ প্রতিবেশীকে ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করিয়েছে, নিজের পরিচিত নারীর সম্ভ্রম লুটে নিতে সাহায্য করেছে এবং নিজের দেশের মেধা শূন্য করতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধই শব্দটিকে চিরতরে এক অভিশপ্ত শব্দে পরিণত করেছে।
রাজনৈতিক অভিধা: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর, 'রাজাকার' অভিধাটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশের যেকোনো আন্দোলন, সংগ্রাম ও জাতীয় বিতর্কে ‘রাজাকার’ শব্দটি জাতীয় ঘৃনার প্রতীক হিসেবে ফিরে আসে। যখনই কেউ দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, দেশ ও জাতির সাথে গাদ্দারি করে, জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিতে চায় বা দুর্নীতি ও অন্যায়ের মাধ্যমে সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে, তখনই বাঙালি সমাজ তাকে ‘রাজাকার’ বা ‘রাজাকারের প্রেতাত্মা’ অভিধায় চিহ্নিত করে।
এটি প্রমাণ করে যে, বাঙালির হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দেশদ্রোহীদের প্রতি ঘৃণা কতটা গভীরে গেঁথে রয়েছে।
পাকিস্তানি নথিপত্র ও হামুদুর রহমান কমিশনের স্বীকারোক্তি
পরাজয়ের পর পাকিস্তান সরকার তাদের সামরিক পরাজয়ের কারণ, যুদ্ধাপরাধ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে 'হামুদুর রহমান কমিশন' (Hamoodur Rahman Commission) গঠন করে।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে কমিশন ১৯৭৪ সালে তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। বহু বছর গোপন রাখার পর leaked হওয়া এই প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয় যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের গঠিত কুলাঙ্গার দালাল বাহিনী (রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস) পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা, অবাধ্যতা, অনৈতিক সম্পত্তি দখল ও নারী নির্যাতনের সাথে জড়িত ছিল।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, কোনো রকম উপযুক্ত ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা যাচাই-বাছাই ছাড়া ঢালাওভাবে বেসামরিক লোকজনকে অস্ত্র সরবরাহ করে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। রাজনৈতিক স্বার্থে গঠিত এই আধা-সামরিক বাহিনীর ওপর সামরিক হাইকমান্ডের কোনো কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ফলে তারা নিজস্ব শত্রুতা উদ্ধার, নির্বিচারে সম্পদ লুটপাট ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল, যা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের স্পষ্ট লঙ্ঘন ছিল।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের উক্তি
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সাইমন ড্রিং 'দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ' এ প্রকাশিত 'Tanks Crush Revolt in Pakistan' প্রতিবেদন থেকে: "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলে যা দেখেছি, তা দুই সামরিক বাহিনীর লড়াই ছিল না সেটি ছিল একটি সশস্ত্র বাহিনীর দ্বারা নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর ওপর সুপরিকল্পিত গণহত্যা। আর সেই রক্তপাত সহজ করতে পাকিস্তানি সেনাদের পথপ্রদর্শক হয়েছিল স্থানীয় কিছু দালাল।"
মার্কিন সিনেটর সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, আগস্ট ১৯৭১ এ সীমান্ত শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে: "ভারতে আশ্রয় নেওয়া কোটি শরণার্থীর ভিড় এবং ক্যাম্পগুলোর অবস্থা দেখে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ও নজিরবিহীন মানবসৃষ্ট দূর্যোগগুলোর একটি।"
১৯৭১ সালে 'দ্য সানডে টাইমস' সাংবাদিক নিকোলাস টোমালিন: "এটি সাধারণ কোনো গৃহযুদ্ধ নয়, এটি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে ধরণীর বুক থেকে মুছে ফেলার পৈশাচিক চেষ্টা।"
কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি: দালাল বাহিনীর রাজনৈতিক চালিকাশক্তি
রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীকে সশস্ত্র ও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় করার নেপথ্যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ছাতা হিসেবে কাজ করেছিল ‘কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি’ (Central Peace Committee)।
সূচনা: ১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল খাজা খায়েরউদ্দিনের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানি সামরিক গভর্নর ও খ-অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল প্রীতম সিং / টিক্কা খানের সাথে বৈঠক করে। এই বৈঠকে তারা দখলদার পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে সমর্থন জানায়।
গঠন: ৯ই এপ্রিল ১৪০ জন সদস্য নিয়ে 'নাগরিক শান্তি কমিটি' গঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে 'কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি' নামে পরিচিতি পায়।
ভূমিকা: এই কমিটির মূল নেতৃত্বে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রধান গোলাম আযম, নেজামে ইসলামীর মৌলভী ফরিদ আহমদ, পিডিপির এ.এস.এম সুলাইমান এবং মুসলিম লীগের খান এ সবুর ও খাজা খায়েরউদ্দিনের মতো ডানপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকরা। কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা, মহকুমা, থানা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত তারা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
মাঠে সক্রিয় থাকা রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠন ও সদস্য সংগ্রহের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিত এই কমিটি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের বাড়িঘরের তথ্য প্রদান, স্বাধীনতাপন্থী বাঙালিদের তালিকা প্রস্তুত করা, অস্ত্র ও রসদ বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া এবং লুটপাটকৃত ধনসম্পদ বণ্টনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখত শান্তি কমিটির শাখাগুলো। তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া ছাড়াও রাজাকারদের জন্য সদস্য সংগ্রহ ও অস্ত্র বরাদ্দের তদারকি করত।
প্রচারযন্ত্রের অপব্যবহার ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
পাকিস্তানি দখলদার জান্তা এবং তাদের দেশীয় দোসররা কেবল আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েই গণহত্যা চালায়নি, বরং তথ্য মাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও অপপ্রচার চালিয়েছিল। বাঙালি জাতির স্বাধিকার সংগ্রামকে 'ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র' ও 'ভারতের উস্কানি' হিসেবে চিহ্নিত করাই ছিল তাদের প্রচারণার মূল কৌশল।
দৈনিক সংগ্রাম-এর ভূমিকা: জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র 'দৈনিক সংগ্রাম' পত্রিকা একাত্তরে আল-বদর ও রাজাকারদের কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয়ভাবে বৈধতা দেওয়ার মূল হাতিয়ার ছিল। পত্রিকাটিতে মুক্তিকামী বাঙালি, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতাপন্থী শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত উসকানিমূলক নিবন্ধ, বিশেষ রিপোর্ট ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হতো।
বিশেষ করে ১৪ই ডিসেম্বরের পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের আগের দিনগুলোতে এই পত্রিকায় শিক্ষক, চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের তালিকা ও পরিচয় তুলে ধরে তাদের ‘ভারতের দালাল’ ও ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা ঘাতক আল-বদর বাহিনীকে নিধনযজ্ঞ চালাতে সরাসরি প্ররোচিত করেছিল।
রেডিও পাকিস্তান ঢাকা: একইভাবে 'রেডিও পাকিস্তান ঢাকা' কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে দিনরাত বিভ্রান্তিকর ও বিদ্বেষমূলক বেতার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো। স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে প্রতিনিয়ত ‘ভারতের দালাল’, ‘কাফের’, ‘আনাড়ী’ এবং ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রচার চালানো হতো। যাতে সাধারণ রাজাকাররা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উগ্রতায় অন্ধ হয়ে নির্মম নির্যাতন চালাতে দ্বিধা না করে।
সুনির্দিষ্ট কিছু নৃশংসতা ও কুখ্যাত টর্চার সেল
রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর বর্বরতা পুরো পূর্ব পাকিস্তানে বিস্তৃত হলেও কয়েকটি কেন্দ্র ও গণহত্যা তাদের নির্মমতার ভয়াবহ প্রতীক হয়ে ওঠে:
মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ঢাকা): এটি ছিল আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর প্রধান কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং সর্ববৃহৎ টর্চার সেল। চৌধুরী মুঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান খান ও আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই স্থানে বন্দীদের ওপর অমানুষিক শারীরিক নিপীড়ন চালানো হতো। ধরে আনা মুক্তিকামী মানুষ ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর মাসের পর মাস বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, নখ উপড়ে ফেলা, গরম পানি ঢালা এবং অঙ্গচ্ছেদের মতো মধ্যযুগীয় অত্যাচার করা হতো। বুদ্ধিজীবী নিধনের পূর্বে অপহৃতদের বড় অংশকে এখানে এনে চূড়ান্ত নির্যাতনের পর রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়।
সোহাগপুর বিধবা গ্রাম (শেরপুর): ১৯৭১ সালের ২৫শে জুলাই শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে আল-বদর কমান্ডার মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নির্দেশে রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনী যৌথ তাণ্ডব চালায়। পুরো গ্রাম ঘেরাও করে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে ও বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর পুরো গ্রামে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো পুরুষ জীবিত না থাকায় গ্রামটির নাম হয়ে যায় ‘বিধবা গ্রাম’।
চুকনগর গণহত্যা (খুলনা): ১৯৭১ সালের ২০শে মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে ঘটে যায় যুদ্ধের অন্যতম বৃহৎ একক গণহত্যা। ভারতে আশ্রয় নিতে আসা হাজার হাজার শরণার্থী চুকনগর বাজারে সমবেত হলে স্থানীয় দালাল ও রাজাকারদের পথপ্রদর্শনায় পাকিস্তানি বাহিনী ভারী অস্ত্র নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আনুমানিক ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের দেহ পাশের ভদ্রা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইতিহাসের শিক্ষণীয় অধ্যায়
রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর উত্থান ও পতন আমাদের জন্য এক মহান ঐতিহাসিক শিক্ষা। এই অন্ধকার অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় কীভাবে ধর্মের পবিত্রতা ও আদর্শিক বিভ্রান্তিকে ব্যবহার করে মানুষকে নিজ জাতি ও মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়।
আরবি ‘রাজ্জাক’ বা রিজিকদাতা নাম থেকে আগত একটি শব্দ কীভাবে অপব্যবহারের কারণে নরহত্যার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, তা আমাদের শেখায় ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
লেখক ও চিন্তাবিদ আহমদ ছফা বলেন, "একটি পবিত্র আরবি শব্দ (রিজকদাতা থেকে উদ্ভূত) কীভাবে এ দেশের মানুষের মনস্তত্ত্বে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘৃণার গালিতে পরিণত হলো, তার পেছনে রয়েছে ধর্মকে রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে ব্যবহারের এক বীভৎস ইতিহাস।"
একাত্তরের রাজাকারদের ইতিহাস কেবল অতীতের কোনো গল্প নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এক চিরন্তন স সতর্কবার্তা। কোনো নাম, কোনো ধর্মীয় পোশাক বা কোনো বাহ্যিক পবিত্রতার আড়ালেই দেশদ্রোহিতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ ঢেকে রাখা যায় না। রক্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ যতদিন মানচিত্রে বেঁচে থাকবে, ততদিন রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের বিশ্বাসঘাতকতা ঘৃণার কালিতে লেখা থাকবে এবং এ দেশের প্রতিটি প্রজন্ম তাদের শিখবে চিরন্তন ধিক্কার জানাতে।
তথ্যসূত্র:
১. Niazi, A. A. K. (1998). The Betrayal of East Pakistan. Oxford University Press
২. ইমাম, জাহানারা (১৯৮৬)। একাত্তরের দিনগুলি। সন্ধানী প্রকাশনী, ঢাকা
৩. Brownmiller, Susan (1975). Against Our Will: Men, Women and Rape. Simon & Schuster
৪. কামাল, সুফিয়া। একাত্তরের ডায়েরি ও স্মৃতিকথা।
৫. Hamoodur Rahman Commission Report (1974/2000)। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশনের চড়ান্ত প্রতিবেদন।
৬. The Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972 (বাংলাদেশ দালাল আইন অধ্যাদেশ, ১৯৭২)।
৭. রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস সদস্যদের তালিকা (ডিসেম্বর ২০১৯)। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।















