রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস - এদের সংখ্যা কত ছিল?
১৯৭১ সালে যখন বাঙালি জাতি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন একটি কুখ্যাত চক্র পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রধান সহযোগী হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ও বহুল ব্যবহৃত নাম হলো 'রাজাকার'। irony হলো, আরবি 'رزاق' (রিজকদাতা, অর্থাৎ আল্লাহ্)-এর মতো একটি পবিত্র শব্দ থেকে আসা 'রাজাকার' পরিচয়টি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ছোঁয়ায় কলঙ্কিত হয়ে ওঠে।

TruthBangla
Dec 8, 2025
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল বীরত্ব ও বিজয়ের গল্প নয়; এটি একইসঙ্গে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার কালো দলিল। ১৯৭১ সালে যখন বাঙালি জাতি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন একটি কুখ্যাত চক্র পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রধান সহযোগী হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ও বহুল ব্যবহৃত নাম হলো 'রাজাকার'। irony হলো, আরবি 'رزاق' (রিজকদাতা, অর্থাৎ আল্লাহ্)-এর মতো একটি পবিত্র শব্দ থেকে আসা 'রাজাকার' পরিচয়টি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ছোঁয়ায় কলঙ্কিত হয়ে ওঠে, যা আজকের বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে সবচেয়ে বড় ঘৃণিত গালিতে। রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস - এই তিনটি বাহিনীর নাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে আছে। কীভাবে একটি ধর্মীয় শব্দ চরম বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা ও ধর্ষণের প্রতীক হয়ে উঠল - এই প্রবন্ধে আমরা সেই অন্ধকার অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করব।
'রাজাকার' শব্দের অপব্যবহার ও কলঙ্কিত পরিচয়
একটি জনযুদ্ধের সময় যখন দখলদার বাহিনী স্থানীয় সহযোগী খুঁজে নেয়, তখন সেই সহযোগীদের নাম ইতিহাসে চিরতরে ঘৃণার প্রতীক হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালে 'রাজাকার' ছিল সেই ঘৃণার প্রতীক। কিন্তু এই নামের উৎপত্তি ইতিহাসকে আরও জটিল করে তোলে।
নামের উৎপত্তি: 'রাজাকার’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘رزاق’ (রিজকদাতা) থেকে, যা আল্লাহর ৯৯টি নামের মধ্যে অন্যতম। পাকিস্তান আমলে ১৯৫০-এর দশকে 'আনসার' বাহিনীর একটি শাখাকে 'রাজাকার' বলা হতো, যা ছিল দেশপ্রেমিক ও স্থানীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট।
কলঙ্কিত রূপান্তর: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই পুরোনো নামটিকে নতুন করে ব্যবহার করে একটি বিশাল আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও মুসলিম লীগের কর্মীরা এই বাহিনীর প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ায়, পবিত্র উৎস থেকে আসা 'রাজাকার' শব্দটি মানবতাবিরোধী অপরাধের সমার্থক হয়ে ওঠে।
রাজাকার বাহিনী - জন্ম, উদ্দেশ্য ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পারে, বাঙালি গেরিলা যোদ্ধাদের মোকাবিলা করার জন্য স্থানীয় সহযোগিতা প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় 'রাজাকার' বাহিনী।
আনুষ্ঠানিক জন্ম ও কাঠামো
১৯৭১ সালের ৭ জুন, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জে. টিক্কা খানের আদেশে রাজাকার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও এর আগে থেকেই স্থানীয়ভাবে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন এই ধরনের মিলিশিয়া দল গঠন শুরু করেছিল।
রাজাকার ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে বড় সশস্ত্র আধা-সামরিক বাহিনী। পরবর্তীতে তাদের সশস্ত্র সামরিক বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়। এদের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল 'আনসার' (Auxiliary Forces), কিন্তু সাধারণত এরা 'রাজাকার' নামেই পরিচিত ছিল।

নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ
সদস্য সংখ্যা: সরকারি হিসাবে এই বাহিনীর মোট সদস্য ছিল প্রায় ৫৪,০০০ জন, তবে বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০-এর মধ্যে ছিল বলে ধারণা করা হয়।
নিয়োগের উৎস: গ্রামের বেকার যুবকদের অর্থ ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিয়োগ করা হতো। জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগের কর্মী ও সমর্থকরা এই বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি ছিল। বিহারি (অ-বাঙালি) সম্প্রদায়ের একটি অংশও এই বাহিনীতে যোগ দেয়, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে হুমকি মনে করত।
প্রশিক্ষণ ও বেতন: এদের মাত্র ১৫-২০ দিনের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সাধারণত এরা .৩০৩ রাইফেল বা হালকা অস্ত্র ব্যবহার করত। এদের মাসে ৯০-১৫০ টাকা বেতন দেওয়া হতো, যা সেই সময়ে একটি বড় প্রলোভন ছিল। তবে তাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল স্থানীয় লুটপাটের অংশ।
নেতৃত্ব - কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কাঠামো
রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল মূলত সেই সব রাজনৈতিক নেতারা, যারা পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং সামরিক জান্তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় পরিচালক: নুরুল আমিন (পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট হন)।
প্রাদেশিক পরিচালক: ফজলুল কাদের চৌধুরী (বিখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর বাবা)।
অন্যান্য নেতা: খান এ সবুর, আব্বাস আলী খান, শাহ আজিজুর রহমান (পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী হন) প্রমুখ।
আল-বদর ও আল-শামস - বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা
রাজাকার বাহিনী সংখ্যায় বড় হলেও, আদর্শগতভাবে ও নৃশংসতার দিক থেকে আরও ভয়ংকর দুটি সংগঠন ছিল আল-বদর ও আল-শামস। এই দুটি বাহিনী মূলত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল।
আদর্শ ও নিয়োগের ভিন্নতা
বাহিনীর নাম | নিয়োগের প্রধান উৎস | আদর্শিক অবস্থান | প্রধান কাজ |
রাজাকার | কনভেনশনাল মুসলিম লীগ, গ্রামের দুষ্ট লোক, বিহারি, সাধারণ যুবক | স্থানীয় সহযোগিতা, লুটপাট | গ্রামীণ অত্যাচার, সেনাবাহিনীর গাইড |
আল-বদর | জামায়াতে ইসলামী + ছাত্রসংঘ, মাদ্রাসা ছাত্র | উগ্র ধর্মীয় আদর্শ, মেধাবী ও বিপ্লবী হত্যা | বুদ্ধিজীবী হত্যা, সুসংগঠিত গুপ্তহত্যা |
আল-শামস | জামায়াতে ইসলামী + ছাত্রসংঘ | সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া | সশস্ত্র হামলা ও আক্রমণ, ক্যাম্প পাহারা |
আল-বদরের বিশেষ নৃশংসতা
আল-বদর ছিল সবচেয়ে সুসংগঠিত ও জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে দীক্ষিত ঘাতক বাহিনী।
লক্ষ্যবস্তু: তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং শিল্পীদের নির্মূল করা।
চূড়ান্ত হত্যাযজ্ঞ: বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ, আল-বদর বাহিনীই বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করে, যা ছিল জাতিকে মেধা ও মননশূন্য করার এক জঘন্যতম নীলনকশা।
গ্রামীণ বাংলাদেশে রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতা
রাজাকার বাহিনীর প্রধান শক্তি ছিল তাদের স্থানীয় নেটওয়ার্ক। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলার ভূখণ্ড, ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় রাজাকাররা। তারা হয়ে ওঠে পাকিস্তানিদের 'চোখ ও কান'। গ্রামের প্রতিটি অলিগলি, ঝোপঝাড় এবং কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে স্বাধীনতার সমর্থক সব তথ্যই ছিল তাদের নখদর্পণে।
শুরুতে আনসার বাহিনীকে ভেঙে এবং শান্তি কমিটির প্রশ্রয়ে এই বাহিনীর লোকবল বাড়ানো হয়। আগস্ট মাসে পাকিস্তান সরকার 'রাজাকার অধ্যাদেশ' জারির মাধ্যমে এদের সরকারি স্বীকৃতি ও মাসিক বেতন-ভাতা প্রদান শুরু করে। এই আইনি স্বীকৃতি রাজাকারদের আরও বেপরোয়া করে তোলে, যার ফলে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতা কেবল সম্মুখ যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ বেসামরিক জনগোষ্ঠী। তাদের কর্মকাণ্ড ছিল সুপরিকল্পিত।
গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ও গাইডের ভূমিকা
রাজাকারদের প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল মুক্তিবাহিনীর অবস্থান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে চিহ্নিত করা। পাকিস্তানি সেনারা যখন কোনো গ্রামে অপারেশনে যেত, তখন রাজাকাররা গাইডের ভূমিকা পালন করত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাতের অন্ধকারে রাজাকাররাই পাকিস্তানি সৈন্যদের পথ দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে নিয়ে যেত এবং পুরো পরিবারকে পৈশাচিক হত্যার শিকার হতে হতো।
সাম্প্রদায়িক নিধন ও অগ্নিসংযোগ
পাকিস্তানি জান্তার আদর্শিক মিত্র হিসেবে রাজাকাররা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালিদের প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করত। গ্রামের পর গ্রাম হিন্দু পাড়া জ্বালিয়ে দেওয়া ছিল তাদের নিত্যদিনের কাজ। অমর্ত্য সেন থেকে শুরু করে অনেক গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, একাত্তরের গণহত্যার একটি বড় অংশ ছিল সুনির্দিষ্টভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিধন, যেখানে রাজাকারদের ভূমিকা ছিল সম্মুখসারির ঘাতকের মতো।
লুটপাট ও যুদ্ধের অর্থনীতি
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নিজের দেশের মানুষের ওপর এত নিষ্ঠুরতা চালানোর প্রেরণা তারা কোথা থেকে পেত? এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল 'লুটপাটের অর্থনীতি'।
রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের বড় একটি অংশ ছিল সমাজের নিচুতলার অপরাধপ্রবণ মানুষ এবং ধর্মীয় উন্মাদনায় অন্ধ উগ্রপন্থীরা। পাকিস্তানি সেনাদের প্রশ্রয়ে তারা মুক্তিবাহিনীর সমর্থকদের বাড়িঘর দখল করত। ধান-চাল, গবাদিপশু থেকে শুরু করে নারীদের স্বর্ণালঙ্কার পর্যন্ত তারা লুট করত। যুদ্ধের নয় মাসে বহু রাজাকার সাধারণ মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে ওঠে। এই অবৈধ সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তাদের আরও বেশি নৃশংস হতে উৎসাহিত করত।
নারী নির্যাতন - একাত্তরের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো আমাদের মা-বোনদের ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতন। আর এই কলঙ্কিত অধ্যায়ে রাজাকারদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে জঘন্য। তারা কেবল নিজেরা এই অপকর্মে লিপ্ত ছিল না, বরং তারা হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি বাঙ্কারের জন্য নারী সরবরাহকারী।
রাজাকাররা গ্রামের সুন্দরী নারীদের তালিকা করত। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে বা পরিবারকে বাঁচানোর নাম করে নারীদের তুলে নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পগুলোতে পৌঁছে দিত। ঐতিহাসিক তথ্য ও বীরাঙ্গনাদের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, রাজাকাররাই বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে নারীদের চিহ্নিত করত, যা পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে একা করা সম্ভব ছিল না।
'যুদ্ধের পুরস্কার' ও সামরিক জান্তার মানসিকতা
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই নারী নির্যাতনকে সরাসরি উৎসাহ দিত। তারা একে 'গনিমতের মাল' বা 'যুদ্ধের পুরস্কার' হিসেবে প্রচার করত। এই বিকৃত মানসিকতার দালালি করতে গিয়ে রাজাকাররা নিজ দেশের মা-বোনদের সম্ভ্রমকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিল। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে নারীদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার প্রতিটি ধাপে রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল।
যুদ্ধোত্তর পরিণতি - বিচার ও পুনর্বাসন
ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায় বা গ্রামে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বঙ্গবন্ধু সরকারের পদক্ষেপ (১৯৭২-৭৫)
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ‘সহযোগী আইন’ (Collaborators Order) জারি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। এই আইনের আওতায় প্রায় ৩৭,০০০ রাজাকার ও সহযোগী গ্রেপ্তার হয়।
সাধারণ ক্ষমা: ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬,০০০ জনকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, যারা হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিল না। কিন্তু গুরুতর অপরাধে জড়িত ১১,০০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলতে থাকে।
জিয়াউর রহমানের পুনর্বাসন (১৯৭৫-৮১)
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং সহযোগী আইনটি বাতিল করে দেন।
এর ফলস্বরূপ, বিচারের অপেক্ষায় থাকা অনেক রাজাকারকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়। এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি এক চরম আঘাত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার (২০১০-২০১৫)
দীর্ঘ অপেক্ষার পর, ২০১০ সালে শেখ হাসিনা সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal - ICT) গঠন করে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। এই বিচার ছিল জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক নৈতিক বিজয়।
গোলাম আযম: জামায়াত আমীর এবং রাজাকার বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমকে ৯০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আব্দুল কাদের মোল্লা: 'কসাই কাদের' নামে পরিচিত কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয় (২০১৩)।
দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী: পিরোজপুরের রাজাকার কমান্ডার ও জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কামারুজ্জামান: আল-বদর বাহিনীর অন্যতম সংগঠক কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
এই বিচারগুলো প্রমাণ করে, যদিও রাজনৈতিকভাবে তাদের পুনর্বাসন হয়েছিল, কিন্তু ইতিহাসে এবং আইনের দৃষ্টিতে তাদের অপরাধ কখনই মুছে যায়নি।
সরকারি তালিকায় বেতনভুক্ত ১০,৭৮৯ জন রাজাকার
রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস - এই তিনটি বাহিনীর নাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত একটি তালিকায় ১০,৭৮৯ জন বেতনভুক্ত সদস্যের নাম রয়েছে, যারা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসসহ স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল।
এই তালিকাটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল, যা প্রমাণ করে যে এই বাহিনীগুলো কেবল স্থানীয়ভাবে সক্রিয় ছিল না, বরং তারা পাকিস্তান সরকার এবং সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে বেতন-ভাতাও পেত। তবে, এই সংখ্যাটি মোট সদস্য সংখ্যার একটি আংশিক চিত্র মাত্র। কারণ, তালিকাভুক্ত সদস্যদের বাইরেও অনেক রাজাকার, আলবদর ও আলশামস ছিল, যারা কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বেতনভোগী ছিল।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা একমত যে, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর প্রকৃত সদস্য সংখ্যা সরকারি তালিকার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এই বাহিনীগুলো ছিল মূলত স্থানীয়ভাবে গঠিত এবং পরিচালিত। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং পাকিস্তানপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তিরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে লোক সংগ্রহ করতেন। এই ব্যাপক পরিসরের সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি।
আল-বদর এবং আল-শামস ছিল মূলত ছাত্র সংগঠনভিত্তিক আধা-সামরিক বাহিনী। তাই তারা এই তালিকার বাইরে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
'রাজাকার' একটি জাতীয় গালি
মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরও 'রাজাকার' শব্দটি বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে তার তীব্রতা হারায়নি।
ঘৃণার প্রতীক: 'রাজাকার' শব্দটি এখন আর কেবল একটি আধা-সামরিক বাহিনীর নাম নয়; এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই শব্দের মাধ্যমে বাঙালি জাতি একাত্তরের বিশ্বাসঘাতকতা, নৃশংসতা, এবং জাতিসত্তার বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধকে নির্দেশ করে।
রাজনৈতিক অভিধা: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর, 'রাজাকার' অভিধাটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন এটি কেবল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের জন্য নয়, বরং যারা জাতীয় স্বার্থের বিরোধী, দুর্নীতিবাজ, এবং জনগণের অধিকার হরণকারী—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, বাঙালির মনস্তত্ত্বে 'রাজাকার' = 'বিশ্বাসঘাতক' এই সমীকরণটি স্থায়ীভাবে গেঁথে গেছে।
হীরা কেন কয়লা হলো?
'রাজাকার' নামের অপব্যবহার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে আদর্শের অপব্যবহার একটি পবিত্র শব্দকে ঘৃণার প্রতীকে পরিণত করতে পারে। জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিল, যার ফলে আরবি 'রিজকদাতা' শব্দটি আজ বাংলার মাটিতে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর নাম বহন করে।
রাজাকার বাহিনী ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে বড় এবং গ্রামীণ বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার চালিয়েছিল। ১৯৭১-এর কালো অধ্যায়ের একটি বড় অংশের নামই 'রাজাকার'। আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে: স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং মানবতা—এগুলোই একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যার বিপরীতে দাঁড়ানো যেকোনো নাম, তা যত পবিত্র উৎস থেকেই আসুক না কেন, তা একসময় ঘৃণার কালিতে মুছে যায়।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















