কবি নজরুলের পাশে ওসমান হাদি কবর - আদর্শিক সংঘাত ও নিয়তির পরিহাস
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে জুলাই বিপ্লবের আলোচিত ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান বিন হাদির প্রয়াণ এবং তাঁর সমাধি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কটি তেমনই এক অমীমাংসিত সমীকরণ। আমৃত্যু যিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং ”১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভারতের ষড়যন্ত্র” হিসেবে বলে এসেছেন, তার শেষ শয্যাটি রচিত হয়েছে এমন এক কবির পাশে, যাঁর অস্তিত্ব, সাহিত্য এবং জীবনবোধ ছিল অবিভক্ত ভারত এবং কলকাতার মায়ার শিকড়ে গাঁথা।

TruthBangla
Dec 24, 2025
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, কখনও কখনও মানুষের মৃত্যু এবং শেষ পরিণতির দৃশ্যপট তার জীবদ্দশার আদর্শিক অবস্থানের চেয়েও বেশি নাটকীয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে জুলাই বিপ্লবের আলোচিত ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান বিন হাদির প্রয়াণ এবং তাঁর সমাধি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কটি তেমনই এক অমীমাংসিত সমীকরণ। আমৃত্যু যিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং ”১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভারতের ষড়যন্ত্র” হিসেবে বলে এসেছেন, তার শেষ শয্যাটি রচিত হয়েছে এমন এক কবির পাশে, যাঁর অস্তিত্ব, সাহিত্য এবং জীবনবোধ ছিল অবিভক্ত ভারত এবং কলকাতার মায়ার শিকড়ে গাঁথা। এই নিবন্ধে আমরা ওসমান হাদির আদর্শিক অবস্থান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনদর্শন এবং এই দুই বিপরীতধর্মী সত্তার সহাবস্থান নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করব।
ওসমান হাদি - এক বিপ্লবী ও তাঁর ভারত-বিদ্বেষী দর্শন
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম মুখ এবং ছাত্রনেতা ওসমান হাদি সমকালীন রাজনীতিতে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। তার রাজনৈতিক জীবনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি কঠোর প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা। ওসমান হাদি মনে করতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের ভূমিকা ছিল নিছক একটি ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং দীর্ঘমেয়াদী ভারতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের একটি ভিন্ন রূপ। ওসমান হাদির এই চিন্তা তাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন জনপ্রিয় করেছিল, তেমনি তীব্র সমালোচনার মুখেও ফেলেছিল। তাঁর শেষ মুহূর্তগুলোও ছিল রহস্য এবং উত্তেজনায় ঘেরা। ওসমান হাদির অস্ত্রপচারটি সফল হলে অথবা তিনি বেঁচে ফিরলে তখন ওসমান হাদি আসলে কি বলতেন বা কি হতো তা নিয়ে তর্ক করা যায়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু সব মিলিয়ে ওসমান হাদি ছিলেন এক বিয়োগান্তক বিপ্লবী। নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাস এই যে, তিনি যে দেশের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, জীবনের শেষ বেলায় তাকে সেই সিঙ্গাপুরেই এক ভারতীয় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়েছিল।
কাজী নজরুল ইসলাম - অবিভক্ত ভারতের মাটি ও মানুষের কবি
ওসমান হাদীর কবরটি যার পাশে অবস্থিত সেই মানুষটি হলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কবি কাজী নজরুলের জন্ম। তাঁর জীবনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাজী নজরুল ছিলেন ভৌগোলিক সীমানা ছাপিয়ে এক চিরন্তন অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার সত্তা। তাঁর সাহিত্য যেমন শোষিতের গান গেয়েছে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত ভারত-কেন্দ্রিক।
ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহ
নজরুলের জীবনের শুরুর অধ্যায়টি ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। ১৯১৭ সালে তিনি ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে করাচি গিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা এবং বিদ্রোহের সুর ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অবিভক্ত ভারতের অধিকার আদায়ের লড়াই। ১৯২২ সালে যখন তাঁকে রাজদ্রোহিতার অপরাধে কারাবন্দী করা হয়, তখন তিনি কেবল বাংলার নন, বরং পুরো ভারতবর্ষের 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
কলকাতার প্রতি আমৃত্যু টান
নজরুলের শিল্প-সত্তা ছিল কলকাতার জল-হাওয়ায় প্রাণবন্ত। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় এবং অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে কলকাতায়। কুমিল্লার নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলেও সেই দাম্পত্য এক দিনের বেশি টিকেনি। এর মূল কারণ ছিল ভৌগোলিক অবস্থান। নার্গিসের পরিবার চেয়েছিলেন নজরুল যেন কুমিল্লায় থিতু হন, কিন্তু নজরুল সগর্বে জানিয়েছিলেন—তাঁর জীবন, শিল্প এবং সত্তা সবই কলকাতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। তিনি কলকাতা ছেড়ে কোথাও স্থায়ী হতে রাজি হননি।
ঢাকার আমন্ত্রণ বনাম কবির কলকাতা-প্রীতি
নজরুল গবেষকদের মতে, নজরুলকে বহুবার ঢাকা বা শান্তিনিকেতনে স্থায়ী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক কাজী মোতাহার হোসেন তাঁকে অনেকবার ঢাকায় থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। নজরুল ঢাকায় আসতেন, সপ্তাহখানেক বা মাসখানেক থাকতেন, কিন্তু প্রাণের টানে পুনরায় সেই কলকাতায় ফিরে যেতেন।
এমনকি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে বাংলার রত্নদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, নজরুল অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। নজরুল কবিগুরুকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন, তিনি কলকাতায় থেকেই তাঁর গান ও সাহিত্য রচনা করে যেতে চান। রবীন্দ্রনাথও এটি বুঝতে পেরেছিলেন যে, নজরুলের কর্মক্ষেত্র আসলেই মহানগরী কলকাতা। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত নজরুলের যে সক্রিয় জীবন, তার পুরোটাই ছিল ভারতকেন্দ্রিক এবং অবিভক্ত বাংলার মাটিকে ঘিরে।
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও শেষ বিদায়
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে ১৯৭২ সালে কবিকে সপরিবারে কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন বাংলার এই বিদ্রোহী কবি যেন স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করেন। ১৯৭৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় এবং সে বছরই ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নজরুলের সমাধি নিয়ে আজও একটি সূক্ষ্ম হাহাকার রয়ে গেছে। নজরুল শেষ জীবনে তাঁর স্ত্রী প্রমীলা দেবীর পাশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু প্রমীলা দেবীর সমাধি ভারতের চুরুলিয়ায় আর নজরুলের সমাধি বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। কবির সেই বিখ্যাত গান "মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই" অনুসরণ করেই এখানে তাঁকে রাখা হয়েছে, যদিও প্রমীলা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদটি ছিল ভৌগোলিক সীমানার কারণে স্থায়ী।
নজরুলের পাশে ওসমান হাদি - কবরের সহাবস্থান কি অবিচার?
এখন প্রশ্ন ওঠে ওসমান হাদির সমর্থকদের পক্ষ থেকে যিনি আমৃত্যু ভারতীয় আগ্রাসন এবং ভারতীয় সংযোগের ঘোর বিরোধী ছিলেন, তাঁকে কেন একজন 'ভারত-প্রেমী' কবির পাশে সমাহিত করা হলো?
ওসমান হাদির কাছে ভারত ছিল একটি ভীতি এবং আধিপত্যের নাম। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধকে সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলে আসছিলেন। অন্যদিকে নজরুলের কাছে ভারত বা কলকাতা ছিল তাঁর শৈশব, তাঁর প্রেম, তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর শিল্পের জন্মভূমি। ওসমান হাদি যে ব্যবস্থাকে ষড়যন্ত্র বলতেন, নজরুল সেই ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করতেন।
অনেকে মনে করেন, ওসমান হাদিকে নজরুলের পাশে সমাহিত করা হাদির ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং আদর্শের প্রতি এক ধরণের অসম্মান। কারণ হাদি তাঁর জীবদ্দশায় কখনও নজরুলের মতো অসাম্প্রদায়িক ভারত-কেন্দ্রিক চিন্তাকে গ্রহণ করেননি। একজন কঠোর জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীর পাশে একজন বিশ্বজনীন কবির সমাধি কি তবে ইতিহাসের এক ধরণের জোরপূর্বক মেলবন্ধন?
নিয়তির পরিহাস ও ইতিহাসের শিক্ষা
ওসমান হাদির অস্ত্রপচারের ঘটনাটি যদি সফল হতো, অথবা তিনি যদি জীবিত ফিরতেন, তবে হয়তো আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতো। কিন্তু নিয়তি তাঁকে এমন এক স্থানে নিয়ে এসেছে যেখানে তাঁর আজীবনের প্রতিপক্ষীয় আদর্শের মানুষের সঙ্গেই তাঁকে থাকতে হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের যে ভারতীয় চিকিৎসক তার সেবা করেছেন এবং ঢাকার যে চত্বরে তিনি কবির পাশে শায়িত আছেন উভয়ই প্রমাণ করে যে, মানুষের রাজনৈতিক শত্রুতা মৃত্যুর দুয়ারে এসে ফিকে হয়ে যায়। তবে আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সহাবস্থানকে অনেকে 'অবিচার' হিসেবেই দেখছেন। একজন ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী যোদ্ধার সমাধি যখন একজন ঘোরতর ভারত-কেন্দ্রিক কবির পাশে হয়, তখন তা কেবল একটি ভৌগোলিক বিষয় থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক অমীমাংসিত বৈপরীত্য।
উপসংহার
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি, তাঁর মর্যাদা প্রশ্নাতীত। অন্যদিকে ওসমান হাদী একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়ের সাহসী নাম। তবে এই দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের সমাধি যখন পাশাপাশি হয়, তখন সেখানে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। নজরুলের ভারত-প্রীতি ছিল সাংস্কৃতিক ও আত্মিক, আর ওসমান হাদীর ভারত-বিদ্বেষ ছিল রাজনৈতিক ও কৌশলগত।
ইতিহাস হয়তো তাঁদের এই পাশাপাশি অবস্থানকে এভাবেই মনে রাখবে যেখানে এক জন সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসাকে স্থান দিয়েছেন, আর অন্যজন দেশপ্রেমের নামে লড়াই করেছেন এক অদৃশ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে। এখন আপনারাই বিচার করুন, আদর্শিক এই দ্বন্দ্বের পর তাঁদের পাশাপাশি চিরনিদ্রা কি কেবলি এক সংযোগ, নাকি এক পক্ষ বা অন্য পক্ষের প্রতি ইতিহাসের নীরব অবিচার?
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















