মিরপুরের বিহারী ক্যাম্প - মিরপুরের রক্তখেকো বিহারী জল্লাদদের সেকাল ও একাল
মিরপুরের ইতিহাস মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী ভাবধারার সমাহারে গঠিত একদিকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কিছু অবাঙালি সশস্ত্র বিহারী চক্রের পৈশাচিক নৃশংসতা ও রাজাকারি উন্মাদনা; অন্যদিকে স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ দশক ধরে বস্তিসদৃশ ক্যাম্পে 'আটকে পড়া' (Stranded) থেকে ২০০৮ সালের পর পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস ধরে তারা মিরপুর ও মোহাম্মদপুরকে এক অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত করে রেখেছিল। এমনকি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ পুরো দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর অবরুদ্ধ ছিল ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।

TruthBangla

রাজধানী ঢাকার উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত মিরপুর এলাকাটি কেবল এক ঘনবসতিপূর্ণ নগরী নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং রক্তাক্ত অধ্যায়ের ধারক। মিরপুরের ইতিহাস মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী ভাবধারার সমাহারে গঠিত একদিকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কিছু অবাঙালি সশস্ত্র বিহারী চক্রের পৈশাচিক নৃশংসতা ও রাজাকারি উন্মাদনা; অন্যদিকে স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ দশক ধরে বস্তিসদৃশ ক্যাম্পে 'আটকে পড়া' (Stranded) থেকে ২০০৮ সালের পর পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব অর্জনের মাধ্যমে মূলধারার 'বাংলাদেশি উর্দুভাষী' হিসেবে আত্মপ্রকাশের দীর্ঘ সামাজিক অভিযাত্রা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর পাশাপাশি যে স্থানীয় গোষ্ঠীটি সবচেয়ে সংগঠিত ও হিংস্রভাবে বাঙালিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছিল, তারা হলো উর্দূভাষী বিহারী মিলিশিয়া। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস ধরে তারা মিরপুর ও মোহাম্মদপুরকে এক অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত করে রেখেছিল। এমনকি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ পুরো দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর অবরুদ্ধ ছিল ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
কিন্তু ইতিহাস স্থবির নয়। সময় বহমান। বিগত পাঁচ দশকে এই জনগোষ্ঠীর একটি নতুন প্রজন্ম ভূমিষ্ঠ হয়েছে, যারা কখনো পাকিস্তান দেখেনি এবং যাদের নাড়ি পোঁতা আছে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক রায়ের পর এই জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ আজ ভোটাধিকার প্রাপ্ত বাংলাদেশি নাগরিক।
এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত পর্যালোচনা করব কীভাবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মাধ্যমে এই বিহারী জনগোষ্ঠীর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আগমন ঘটল, কেন তারা বাঙালিবিদ্বেষ ও বর্ণবাদী মনস্তত্ত্বে আক্রান্ত হলো, একাত্তরে তারা কী ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেছিল এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ক্যাম্প জীবনের করুণ বাস্তবতা কাটিয়ে কীভাবে তারা আজকের আধুনিক বাংলাদেশে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তুলছে।
বিহারীদের সেকাল: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও পূর্ব পাকিস্তানে বসতি স্থাপন
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ধর্মের ভিত্তিতে অঙ্কিত সীমান্ত রেখা (র্যাডক্লিফ লাইন) তৎকালীন মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও সহিংস বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছিল। এই রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলো থেকে লাখ লাখ মুসলিম নবগঠিত পাকিস্তানে (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) এবং পাকিস্তানের সীমানা থেকে বিপুলসংখ্যক হিন্দু ও শিখ ভারতে পাড়ি জমান। এই বৃহৎ জনসংখ্যা অদলবদলের অংশ হিসেবে ভারতের বিহার অঞ্চল থেকে হাজার হাজার উর্দূভাষী মুসলিম পরিবার তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান) প্রবেশ করে।
১৯৪৬ সালের বিহার দাঙ্গা ও ভারতের অভ্যন্তরীণ শরণার্থী সংকট
১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রাক্কালেই বিহারী মুসলিমদের পূর্ব বাংলায় স্থানান্তরের মূল বীজ রোপিত হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের মধ্যভাগে সংঘটিত রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত বিহার রাজ্যের মুসলিমদের বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করে।
১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতায় সংঘটিত 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' এবং পরবর্তী নোয়াখালী দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ভারতের বিহার রাজ্যে মারাত্মক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। বিহারের পাটনা, মুঙ্গার, ভাগলপুর, গয়া এবং সরন জেলায় সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালানো হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র মতে, এই দাঙ্গায় প্রায় ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ মানুষ নিহত হন এবং শত শত গ্রাম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
দাঙ্গার তীব্রতা থেকে বাঁচতে প্রায় দুই থেকে তিন লাখ বিহারী মুসলিম তাৎক্ষণিকভাবে বাংলা (বিশেষ করে কলকাতা ও পূর্ব বাংলার সীমান্ত জেলাসমূহ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে আশ্রয় নেন। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, যা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠিত হলে তাদের স্থায়ীভাবে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসতে উৎসাহিত করে।
পূর্ব পাকিস্তানে আগমন ও মিরপুরে পুনর্বাসন
পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার ভারতে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত উর্দূভাষী মুসলিমদের পূর্ব পাকিস্তানে পুনর্বাসিত করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা ও নীতি গ্রহণ করে। ব্রিটিশ আমলে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে এবং ভারতের প্রধান প্রধান কারখানাগুলোতে উর্দূভাষী কারিগর ও কারিগরি শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশ নিয়োজিত ছিল।
পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের বিকাশমান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক এবং শিল্প অবকাঠামো পরিচালনার জন্য এদের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর নীতি গ্রহণ করে। ভারত থেকে আসা অভিবাসীদের স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করতে তৎকালীন সরকার দেশত্যাগী অমুসলিমদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি (Evacuee Property) এবং সরকারি খাস জমি বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে।
পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক সহায়তা এবং শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলে বিহারী জনগোষ্ঠীর ঘনীভূত বসতি গড়ে ওঠে।
ঢাকা অঞ্চল (মিরপুর ও মোহাম্মদপুর): তৎকালীন সময়ে ঢাকা মূল শহরের বাইরের নিঝুম ও অনুন্নত উপশহরীয় এলাকাগুলোকে উর্দূভাষী পুনর্বাসনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সরকারি উদ্যোগে মিরপুর সেকশন-১, ২, ৬, ১০, ১১ এবং ১২ নম্বর এলাকায় উর্দূভাষী পরিবারগুলোকে খাস জমি ও প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। সময়ের সাথে সাথে এলাকাটি একটি পূর্ণাঙ্গ উর্দূভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের টাউন হল, জেনেভা ক্যাম্প (তৎকালীন অস্থায়ী ত্রাণ শিবির হিসেবে সূচিত) এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বিপুল সংখ্যক পরিবারকে স্থায়ী ও সাময়িক আবাসন দেওয়া হয়।
উত্তরবঙ্গ (রেলওয়ে কেন্দ্রিক বসতি): উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ও পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম মূল কেন্দ্রগুলোতে বিহারী জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে বসতি স্থাপন করে।
নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে অবস্থিত সুবিশাল রেলওয়ে কারখানাকে কেন্দ্র করে পুরো শহরটি উর্দূভাষীদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়। একপর্যায়ে শহরের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই ছিল উর্দূভাষী। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী ও পাকশী এবং দিনাজপুর/রংপুর অঞ্চলের পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন এলাকাগুলোতে রেলওয়ে কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী বিহারী মহল্লা গড়ে ওঠে।
দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম অঞ্চল (শিল্প ও বন্দরভিত্তিক বসতি): চট্টগ্রাম: বন্দর নগরী চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপ এবং এর আশপাশের পাহাড়ী ও সমতল এলাকায় বিহারীদের জন্য বিশাল আবাসিক কলোনি তৈরি করা হয়।
খুলনার শিল্পাঞ্চল খালিশপুর, দৌলতপুর এবং রূপসায় স্থাপিত নতুন নতুন পাটকল (যেমন- ক্রিসেন্ট জুট মিল) ও কাগজ কলকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার উর্দূভাষী শ্রমিক পরিবারকে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়।
ভাষাগত সুবিধাপ্রাপ্তি ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা
পূর্ব বাংলায় পুনর্বাসিত হলেও বিহারী জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় মূলধারার বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটে ওঠেনি। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেওয়া হলে উর্দূভাষী বিহারীরা প্রশাসনিকভাবে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীতে পরিণত হয়। সরকারি চাকরি, রেলওয়ে প্রশাসন এবং শিল্পকারখানার তদারকি পদে উর্দূভাষীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়।
বিহারী জনগোষ্ঠী নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার বদলে নিজেদের নিজস্ব উর্দূ ভাষা, সামাজিক রীতিনীতি, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক পরিচ্ছদ কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে। তারা স্থানীয় বাংলা ভাষা শেখা বা বাঙালি সংস্কৃতির সাথে নিজেদের সমন্বিত (Integrate) করার প্রয়োজন বোধ করেনি।
বিশেষ বিশেষ এলাকায় বিপুল সংখ্যায় একসাথে বসবাস করার ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের গণ্ডিবদ্ধ সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক গণ্ডির ভেতরে থাকার কারণে তারা নিজেদের পূর্ব পাকিস্তানের স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়ে আলাদা এবং মানসিকভাবে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের বেশি অনুগত মনে করতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।

ক্যাপশন: বামে সশস্ত্র বিহারী মিলিশিয়ারা এবং ডানে মিরপুর মুক্ত করার যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান।
বর্ণবাদী বিহারীরা বাঙালিদের 'ছোটজাতি' ও 'নকল মুসলিম' মনে করত কেন?
একাত্তরে বিহারী মিলিশিয়াদের অমানুষিক নৃশংসতা ও গণহত্যার পেছনে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল না; বরং এর পেছনে ছিল বহু বছর ধরে লালিত গভীর সামাজিক বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক অহংকার এবং একপ্রকার কৃত্রিম বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। কয়েকটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চালকের মাধ্যমে তাদের এই উগ্র বাঙালিবিদ্বেষ গড়ে উঠেছিল:
'মুহাজির' মনস্তত্ত্ব ও কৃত্রিম আভিজাত্যের সূচনা: ১৯৪৬ সালের বিহার দাঙ্গা এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উড়িষ্যা অঞ্চল থেকে লাখ লাখ উর্দূভাষী মুসলিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হিজরত করে। এই জনগোষ্ঠী নিজেদের নতুন প্রতিষ্ঠিত 'ইসলামী রাষ্ট্র' পাকিস্তানের জন্য সর্বস্ব ত্যাগকারী 'মুহাজির' হিসেবে বিবেচনা করত। তাদের ভেতরে এই ধারণাই দৃঢ়মূল ছিল যে, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির সৃষ্টিতে তাদের অবদান এবং ত্যাগ স্থানীয় বাঙালি মুসলিমদের চেয়ে অনেক বেশি।
ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভূমিতে স্থায়ী বসতি স্থাপন করলেও তারা নিজেদের পাকিস্তানের 'আসল রূপকার' এবং 'প্রথম শ্রেণীর নাগরিক' মনে করতে শুরু করে। এই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা থেকে তারা নিজেদের বাঙালিদের চেয়ে সামাজিকভাবে উচ্চমার্গের ভাবত এবং বাঙালিদের প্রতি এক ধরণের কৃত্রিম আভিজাত্য ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত।
ভাষাগত আভিজাত্য ও রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার: ১৯৪৭ পরবর্তী সময় থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দূকে সমগ্র মুসলিম জাহানের সাংস্কৃতিক প্রতীক ও আভিজাত্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক চেষ্টা শুরু করে। এর বিপরীতে, তারা বাংলা ভাষাকে "হিন্দুঘেঁষা", "সংস্কৃতনির্ভর" এবং ইসলামের চেতনা-বিরোধী বলে কুপ্রচার চালাতে থাকে। উর্দূভাষী বিহারীরা জন্মগতভাবে উর্দূভাষী হওয়ায় এই রাষ্ট্রীয় নীতি ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণাকে নিজেদের জন্য এক বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা উর্দূ ভাষাকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের সনদ মনে করতে শুরু করে এবং বাংলাভাষী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী বলে অবজ্ঞা করত। ভাষাগত এই অহংকার তাদের মধ্যে বাঙালির প্রতি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করেছিল।
'খাঁটি মুসলিম' বনাম 'নকল মুসলিম' মনস্তত্ত্ব: পাকিস্তানি রাজনৈতিক এলিট ও সামরিক জেনারেলরা সুপরিকল্পিতভাবে উর্দূভাষী বিহারী জনগোষ্ঠীর মগজে এই উগ্র ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে, পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিমরা আসলে "পূর্ণাঙ্গ বা খাঁটি মুসলিম নয়"।
বাঙালিদের পোশাক (ধুতি ও লুঙ্গি), পহেলা বৈশাখ উদযাপন, রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা এবং লোকজ ঐতিহ্যকে তারা "হিন্দু সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ" হিসেবে চিহ্নিত করত। জেনারেল তিক্কা খান বা ইয়াহিয়া খানের মতো সামরিক শাসকেরা বাঙালিদের বর্ণসংকর ও ধর্মান্তরিত হিন্দু হিসেবে প্রচার করত। এই কৃত্রিম ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে উর্দূভাষী বিহারীরা নিজেদের 'ইসলামের প্রকৃত রক্ষক' এবং বাঙালিদের ধর্মে-সংস্কৃতিতে ভেজাল বা 'নকল মুসলিম' হিসেবে গণ্য করত।
'মার্শাল রেস' (Martial Race) তত্ত্বের ভুল বিস্তার: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সুবিধার্থে ভারতের বিভিন্ন জাতিকে 'মার্শাল রেস' (যুদ্ধপ্রিয় জাতি) এবং 'নন-মার্শাল রেস' (অ-যুদ্ধপ্রিয় জাতি) হিসেবে বিভক্ত করেছিল। পাকিস্তানি সামরিক শাসকশ্রেণি এই বর্ণবাদী ব্রিটিশ নীতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করে। তারা পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি ও পশতুনদের পাশাপাশি উর্দূভাষীদের যোদ্ধা জাতি হিসেবে দাবি করত এবং বাঙালিদের শারীরিকভাবে দুর্বল, ভীরু, কাপুরুষ ও যুদ্ধবিদ্যায় অক্ষম বলে প্রচার করত। বিহারী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই বর্ণবাদী ধারণা গভীরভাবে গেঁথে যায়। তারা মনে করত বাঙালিরা কেবল শাসন ও শোষণের যোগ্য, কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সামর্থ্য তাদের নেই।
অর্থনৈতিক তোষণ ও প্রজা মানসিকতা
পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও শিল্প কাঠামোয় উর্দূভাষী বিহারীদের সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর, নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিল এবং পার্বতীপুর ও সৈয়দপুরের রেলওয়ে ওয়ার্কশপগুলোতে উচ্চ ও মধ্যম স্তরের পদে বিহারীদের একচেটিয়া সুযোগ দেওয়া হতো।
এসব রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানায় বিহারীরা থাকত কর্মকর্তা বা সুপারভাইজর পর্যায়ে, আর স্থানীয় বাঙালিরা ছিল কম বেতনের কায়িক শ্রমিক। দীর্ঘ দিন ধরে এই অর্থনৈতিক তোষণ ও সুবিধাভোগী অবস্থানে থাকার ফলে বিহারীরা স্থানীয় বাঙালি শ্রমজীবী মানুষকে নিজেদের প্রজা বা অনুগত দাস ভাবতে শুরু করে।
স্বাধিকার আন্দোলনের ভয় ও ক্ষমতার আতঙ্ক: ১৯৬০-এর দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি যখন ৬ দফার ভিত্তিতে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যায় এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল জয় লাভ করে, তখন বিহারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ঢাকা (মিরপুর ও মোহাম্মদপুর), নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর ও পার্বতীপুরের মতো বিহারী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে এই ভয় ছড়িয়ে পড়ে যে বাঙালিরা ক্ষমতায় আসলে তাদের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া সুবিধা, তোষণ ও সামাজিক কর্তৃত্ব চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। এই শ্রেণি-আধিপত্য ও সুবিধা হারানোর আতঙ্কই ১৯৭১ সালে তাদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে 'শান্তি কমিটি', 'রাজাকার' ও 'আল-শামস' বাহিনীতে যোগ দিয়ে বাঙালিদের ওপর নির্মম গণহত্যা ও নৃশংসতা চালাতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
১৯৭১ সালের 'জল্লাদখানা' অধ্যায় ও দেশব্যাপী বিহারী তাণ্ডব
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করে বাঙালি নিধনে নামলে, পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত উর্দূভাষী বিহারী জনগোষ্ঠীর এই সশস্ত্র অংশ সরাসরি পাকিস্তানি মিলিটারির অনুচর হিসেবে মাঠে নামে। তারা কেবল পিস কমিটি, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী গঠনেই সহায়তা করেনি, বরং স্থানীয়ভাবে নিজস্ব সশস্ত্র স্কোয়াড গড়ে তোলে। ঢাকাসহ সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুষ্টিয়া ও পাবনার মতো বিহারী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে এসব সশস্ত্র ক্যাডাররা বাঙালি নিধন, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও নারীনির্যাতনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যৌথভাবে অংশ নেয়।
মিরপুর সেকশন-১০ এর 'জল্লাদখানা' ও সেপটিক ট্যাংক
মিরপুর সেকশন-১০ এর ৪ নম্বর সড়কে অবস্থিত ঢাকা ওয়াসা (WASA)-এর ১ নম্বর পাম্প হাউসসংলগ্ন স্থানটি ১৯৭১ সালে রূপ নিয়েছিল এক সাক্ষাৎ নরককুণ্ডে, যার কুখ্যাত নাম হয় ‘জল্লাদখানা বধ্যভূমি’। সশস্ত্র বিহারী ক্যাডাররা ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুক্তিকামী বাঙালি, ছাত্র, শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী ও বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে এনে এই জল্লাদখানার অন্ধকার কক্ষে বন্দি করে রাখত।
সেখানে শত শত মানুষকে চেইন ও মোটা রশি দিয়ে বেঁধে সারি করে দাঁড় করিয়ে তলোয়ার, রামদা, চাপাতি ও বেয়োনেট দিয়ে জবাই করা হতো। পাকিস্তানি সেনা ও বিহারী ঘাতকরা গুলির শব্দ এড়াতে এবং লাশের পরিচয় গোপন করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছিন্নমস্তক আলাদা করে ফেলত। হত্যাকাণ্ডের পর ছিন্নমস্তক ও ক্ষতবিক্ষত দেহাবশেষ ফেলে দেওয়া হতো পাম্প হাউসের বিশাল ও প্রায় ২০ ফুট গভীর সেপটিক ট্যাংক, পয়ঃপ্রণালীর কূপ এবং গভীর নালায়।
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যৌথ উদ্যোগে এই জল্লাদখানায় ব্যাপক খননকাজ চালানো হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় শত শত মানবকঙ্কাল, মাথার খুলি, রানিং শু, পোশাক ও শহীদদের ব্যবহৃত নানাবিধ জিনিসপত্র। ২০০৭ সালে এই স্থানে 'জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ' প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মিরপুর পাম্প হাউস, 'কালাপানি' ও ৩০-৩১ জানুয়ারির ট্র্যাজেডি
মিরপুরের রূপনগর, শিয়ালবাড়ি ও সারেংবাড়ি সংলগ্ন নির্জন প্রান্তর ও জলাভূমি ১৯৭১ সালে ‘কালাপানি’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিদিন নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করে এই জলাভূমিতে ফেলে রাখার ফলে পচা লাশ ও রক্তের মিশ্রণে সেখানকার পানি কুচকুচে কালো রূপ ধারণ করেছিল।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ঢাকাসহ সমগ্র দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর ও মোহাম্মদপুর মুক্ত হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া ভারী অস্ত্র, রকেট লাঞ্চার ও মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে কয়েক হাজার সশস্ত্র বিহারী মিরপুর এলাকা অবরুদ্ধ করে রাখে।
বুদ্ধিজীবী নিধনের সময় অপহৃত নিজের জ্যেষ্ঠ ভাই সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ৩০ জানুয়ারি সকালে অবরুদ্ধ মিরপুরে প্রবেশ করেন। সেখানে সশস্ত্র বিহারীদের অতর্কিত হামলায় তিনি চিরতরে নিখোঁজ (শহীদ) হন।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (২ ইস্ট বেঙ্গল) ও পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে ‘অপারেশন মিরপুর’ শুরু করে। এতে ক্যাপ্টেন হেলাল মুর্শেদ ও লেফট্যানেন্ট সেলিম মো. কামরুল হাসান নেতৃত্ব দেন। সশস্ত্র বিহারীদের কঠোর প্রতিরোধ ও ভারী গুলিবর্ষণে লেফট্যানেন্ট সেলিমসহ অগণিত সেনাসদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তা শহীদ হন। ৩১ জানুয়ারি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে মিরপুর স্বাধীন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন আসে।
সৈয়দপুরের গোলাহাট গণহত্যা (১৩ জুন, ১৯৭১)
নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর ছিল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উর্দূভাষী বিহারী অধ্যুষিত একটি শহর। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন সেখানে মানব ইতিহাসের অন্যতম পৈশাচিক গণহত্যা সংঘটিত হয়।
স্থানীয় পাকিস্তানি সামরিক কমান্ড ও বিহারী নেতারা আশ্বাস দেয় যে বাঙালি হিন্দু পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বিশেষ ট্রেনে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে।এই বিশ্বাসে প্রায় ৪৪৮ জন বাঙালি হিন্দু ও স্বাধীকার সমর্থক নাগরিক একটি বিশেষ ট্রেনে ওঠেন। ট্রেনটি সৈয়দপুর স্টেশন ছেড়ে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে 'গোলাহাট' নামক নির্জন স্থানে পৌঁছামাত্রই থামিয়ে দেওয়া হয়।
ট্রেনের সমস্ত জানালা-কপাট বাইর থেকে আটকে দিয়ে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সশস্ত্র বিহারীরা ট্রেনটি ঘিরে ফেলে। বুলেটের অপচয় না করতে এবং গুলির শব্দ গোপন রাখতে ঘাতকরা রামদা, তলোয়ার, কুড়াল ও রামদা দিয়ে টেনে টেনে বের করে ৪৪৮ জন নিরীহ মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করে। এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লোমহর্ষক ‘ধারালো অস্ত্রের গণহত্যা’ হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বধ্যভূমি ও রেলওয়ে কলোনি
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ঝাউতলা ও ওয়ার্কশপ এলাকা ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের (EBR) কেন্দ্র এবং উর্দূভাষী বিহারী কর্মচারীদের প্রধান আস্তানা। ১৯৭১ সালে এই পাহাড়ি বনাঞ্চল ও কলোনি এলাকাকে বাঙালি নিধনের কসাইখানা বানানো হয়। পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা ও প্যান্টুমা পাহাড়ের পাদদেশে শত শত বাঙালি রেলওয়ে কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হতো।
বাঙালিদের নির্যাতনের পর গলা কেটে পাহাড়ের খাদ, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত গভীরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে শহীদদের দিয়ে নিজেরাই নিজেদের কবর খোঁড়াতে বাধ্য করা হতো। স্বাধীনতার পর পাহাড়তলী এলাকা থেকে হাজার হাজার মানবকঙ্কাল ও পচাগলা মৃতদেহের স্তূপ পাওয়া যায়।
খুলনার খালিশপুর ক্রিসেন্ট জুট মিল গণহত্যা
খুলনার শিল্পাঞ্চল খালিশপুর, দৌলতপুর, পিপলস জুট মিল ও নিউজপ্রিন্ট মিল এলাকায় বহু অবাঙালি উর্দূভাষী কর্মকর্তা ও শ্রমিক কর্মরত ছিল। ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে উর্দূভাষী বিহারী মিলিশিয়ারা পুরো শিল্পাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সশস্ত্র বিহারীরা প্রতিদিন শত শত বাঙালি শ্রমিক, টেকনিশিয়ান ও তাঁদের পরিবারকে ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ভৈরব নদীর তীরে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিত।
এই বধ্যভূমির সবচেয়ে নজিরবিহীন নৃশংসতা ছিল পাটকলের শিল্প বয়লারের (Industrial Boiler) ব্যবহার। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত তথ্য অনুযায়ী, শত শত বাঙালি শ্রমিক ও যুবককে হাত-পা বেঁধে জ্যান্ত অবস্থায় ক্রিসেন্ট জুট মিলের প্রকাণ্ড ও অত্যন্ত উত্তপ্ত বয়লারের ভেতর ছুঁড়ে ফেলে ছাই করে হত্যা করা হয়েছিল।
বিহারীদের একাল: স্বাধীনতার পর ক্যাম্প জীবনের করুণ বাস্তবতা
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকা মুক্ত হওয়ার পর, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে হাজার হাজার বিহারী পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে। তাদের সুরক্ষা প্রদান এবং সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে তৎকালীন আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (ICRC) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে দেশের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে তাদের সংরক্ষিত রাখা হয়।
ঢাকা শহরের পাশাপাশি সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বগুড়াসহ দেশের ১৩টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১১৬টি ক্যাম্পে এসব উর্দূভাষী মানুষদের আশ্রয় দেওয়া হয়। ঢাকার জেনেভা ক্যাম্প, মিল্লাত ক্যাম্প, কুরমিটোলা ক্যাম্প ও সিরামিক ক্যাম্পের মতো স্থানগুলো পরবর্তীতে তাদের প্রধান ঘনীভূত বাসস্থানে পরিণত হয়।

'আটকে পড়া পাকিস্তানি' (Stranded Pakistanis) ও পিপিআরসি জটিলতা
১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে ঐতিহাসিক দিল্লি চুক্তি ও ত্রিপক্ষীয় চুক্তির (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) পর আন্তর্জাতিক রেডক্রসের মধ্যস্থতায় কয়েক দফায় প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার উর্দূভাষী রেজিষ্ট্রেশনের মাধ্যমে পাকিস্তানে ফিরে যান। কিন্তু পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক বোঝা এবং সামাজিক অস্থিরতার অজুহাত দেখিয়ে পাকিস্তান সরকার বাকি উর্দূভাষীদের নিজেদের দেশে ফিরিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকৃতি জানায়।
প্রত্যাবাসন থমকে গেলে নাসিম খানের নেতৃত্বে 'স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানি জেনারেল রিপাট্রিয়েশন কমিটি' (SPGRC) গঠিত হয়। এই সংস্থাটি ক্যাম্পের অধিবাসীদের সংগঠিত করে 'ক্বায়াদ-ই-আযম মেমোরিয়াল কমিটি'-র অধীনে নিজেদের পাকিস্তানি নাগরিক দাবি করে এবং পাকিস্তান সরকারের কাছে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যায়।
পাকিস্তান সরকারের অস্বীকৃতির ফলে তারা আন্তর্জাতিক নথিপত্রে ও মানবাধিকার সংস্থাসমূহের কাছে ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ (Stranded Pakistanis) হিসেবে আখ্যায়িত হন। নিজ ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক তারা রাষ্ট্রহীন (Stateless) জনগোষ্ঠী হিসেবে ক্যাম্পের বন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
২০০৮ সালের হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়: নাগরিকত্বের আইনি স্বস্তি
দীর্ঘদিন নাগরিকত্বহীন থাকার পর, ২০০৩ সালের 'আবিদ খান' সংক্রান্ত এক মামলার ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান এবং বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ক্যাম্পের অধিবাসীদের নাগরিকত্ব বিষয়ে এক যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দেন। হাইকোর্টের রায়ের প্রধান মূলনীতিগুলো হলো:
জন্মসূত্রে অধিকার: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী সব উর্দূভাষী ব্যক্তি আইনত ও সংবিধানগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক।
আনুগত্য ও ভোটাধিকার: যেসকল উর্দূভাষী বাংলাদেশের প্রতি অনুগত এবং এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তারা বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ভোটাধিকার লাভ করবেন।
এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে প্রায় দেড় লক্ষাধিক তরুণ উর্দূভাষীর আইনি পরিচয় নিশ্চিত হয়। তারা 'রাষ্ট্রহীনতার' অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এখনও স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ক্যাম্পের নাম থাকার কারণে পাসপোর্ট গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হন।
নতুন প্রজন্মের আত্মীকরণ ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন
আজকের মিরপুর বা মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পগুলোর সামাজিক বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৯৭১ সালের স্মৃতি বা পাকিস্তানের প্রতি অনুভূতির সাথে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের আর কোনো মানসিক টান নেই; তারা নিজেদের আত্মপরিচয় দেন 'বাংলাদেশি উর্দুভাষী' হিসেবে।
অতীতের কেবল উর্দূ মাদ্রাসা বা ঘরোয়া শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এখন বাংলা মাধ্যমে সাধারণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষ প্রতিষ্ঠানেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী বেনারসি শাড়ি বোনা, কসাইয়ের কাজ, সুস্বাদু খাবার তৈরি বা কারচুপির হাতের কাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই তরুণরা এখন জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। তারা তৈরি পোশাক শিল্প (RMG), তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাত, ব্যাংকিং, শিক্ষকতা ও বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে নিজস্ব দক্ষতায় কাজ করছে।
দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় বাংলা ও উর্দূর মিশ্রণ থাকলেও ক্যাম্পের বাইরে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলায় যোগাযোগ করে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অনুগামী। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ জাতীয় দল জয়লাভ করলে ক্যাম্পের তরুণরা লাল-সবুজ পতাকা হাতে আনন্দ মিছিল ও বিজয় উৎসব উদযাপন করে।
ক্যাম্প জীবনের বর্তমান নিত্যদিনের মানবিক সংকট
আইনিভাবে নাগরিকত্ব ও এনআইডি কার্ড পেলেও ভৌত অবকাঠামো এবং জীবনযাত্রার মানবিক মানদণ্ডে ঢাকার জেনেভা ক্যাম্পসহ অন্যান্য ক্যাম্পগুলোর অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আবাসন ও জনঘনত্ব: মাত্র ৮ বাই ১০ ফুটের একটি ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে ঘরে একটি পরিবারের ৭ থেকে ৮ জন মানুষকে গাদাগাদি করে বাস করতে হয়। একক ঘরের এই সংকটের কারণে নতুন দম্পতি বা বর্ধিত পরিবারের ন্যূনতম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
স্বাস্থ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন: হাজার হাজার মানুষের জন্য ক্যাম্পে হাতে গোনা কয়েকটি গণশৌচাগার রয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত নোংরা ও উন্মুক্ত হওয়ায় ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও চর্মরোগের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি নিত্যদিনের সঙ্গী।
বিদ্যুৎ ও পানির বকেয়া বিল বিতর্ক: অতীতে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিদ্যুৎ ও পানি সুবিধা দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) বা ওয়াসার সাথে বিল পরিশোধ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। বকেয়া বিলের ইস্যুতে প্রায়ই ক্যাম্পের বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, যা পরবর্তীতে স্থানীয় সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পুনর্বাসনের স্থবিরতা: ঘিঞ্জি পরিবেশ ও ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারের কারণে ক্যাম্পগুলোতে ঘন ঘন মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সরকারি পর্যায়ে একাধিকবার ফ্ল্যাট নির্মাণ বা স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও জমির সংকট ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সংক্ষেপে বিহারীদের ইতিহাস ও কর্মকান্ড
মিরপুরের বিহারী জনপদের ঐতিহাসিক সূচনা, একাত্তরের রক্তাক্ত ভূমিকা এবং স্বাধীন বাংলাদেশে নাগরিক রূপান্তরের সারসংক্ষেপ নিচে একটি প্রামাণিক টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:
ইতিহাসের পর্যায় | সময়কাল | প্রধান বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক ঘটনাপঞ্জি | বর্তমান অবস্থান ও সামাজিক প্রভাব |
১. বসতি ও শুভসূচনা | ১৯৪৭–১৯৬০ দশক | ভারত ভাগ ও বিহার দাঙ্গার পর বাস্তুচ্যুত উর্দূভাষীদের মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে পুনর্বাসন। | পূর্ব পাকিস্তানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভাব। |
২. সামাজিক মনস্তত্ত্ব | ১৯৫০–১৯৭০ দশক | উর্দূ ভাষার আভিজাত্য, 'খাঁটি মুসলিম' প্রচার ও 'মার্শাল রেস' তত্ত্বে বিশ্বাস। | বাঙালিদের প্রতি উগ্র সামাজিক বিদ্বেষ ও 'ছোটজাতি' মনে করার মানসিকতা। |
৩. একাত্তরের নরকীয়তা | ১৯৭১ (মার্চ–ডিসেম্বর) | মিরপুর ১০ জল্লাদখানা, সৈয়দপুর গোলাহাট ও পাহাড়তলী গণহত্যায় সক্রিয় ভূমিকা। | রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ। |
৪. অবরুদ্ধ মিরপুর | ১৬ ডিসে ১৯৭১ – ৩১ জানু ১৯৭২ | দেশ স্বাধীন হলেও অস্ত্র হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ অবস্থান। | জহির রায়হানসহ বহু সেনা-পুলিশ শহীদ; ৩১ জানুয়ারি মিরপুর সম্পূর্ণ মুক্ত। |
৫. রাষ্ট্রহীন অধ্যায় | ১৯৭২–২০০৭ | 'আটকে পড়া পাকিস্তানি' হিসেবে অবমানবীয় ক্যাম্পে অবস্থান ও পাকিস্তানের অস্বীকৃতি। | মানবিক সংকট, দারিদ্র্য ও আন্তর্জাতিক পরিচয়ের সংকট। |
৬. নাগরিকত্ব লাভ | ২০০৮–বর্তমান | হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে পূর্ণাঙ্গ এনআইডি, পাসপোর্ট ও ভোটাধিকার লাভ। | 'বাংলাদেশি উর্দুভাষী' হিসেবে মূলধারায় আত্মীকরণ ও স্বাবলম্বী হওয়া। |
কেবল মিরপুর নয়, সারা বাংলাদেশের বিহারী ক্যাম্পের ম্যাপ
ভারত বিভাগের পর ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ ও ওড়িশা থেকে বিপুল সংখ্যক উর্দুভাষী মুসলিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আগমন করে। যদিও ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর বিহারী রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালের আগে ও পরে ঢাকার বাইরেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ঘনীভূত ছিল:
সৈয়দপুর (নীলফামারী): সৈয়দপুরকে বলা হতো উর্দুভাষী বিহারীদের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ও জনসংখ্যার ঘাঁটি। ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকে ঘিরে হাজার হাজার বিহারী পরিবারকে স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের আগে সৈয়দপুর শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীই ছিল উর্দুভাষী।
১৯৭১ সালের ১৩ জুন সৈয়দপুরের গোলাহাটে প্রায় চার শতাধিক বাঙালিকে ট্রেনে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় সৈয়দপুর সেনানিবাস ও এর আশপাশের এলাকা বিহারী প্রতিরোধ ও সামরিক তৎপরতার অন্যতম কেন্দ্র ছিল।
খুলনার খালিশপুর, দৌলতপুর ও ক্রিসেন্ট এলাকা: খুলনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চল বিশেষ করে ক্রিসেন্ট জুট মিল, প্লাটিনাম জুট মিল, পিপলস জুট মিল এবং খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলকে ঘিরে বিশাল সংখ্যক উর্দুভাষী শ্রমিক ও কর্মচারী বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত খালিশপুর ও দৌলতপুর এলাকায় দফায় দফায় চরম রাজনৈতিক ও জাতিগত সহিংসতা ঘটে। ভৈরব নদী ও রূপসা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বয়লার হত্যাকাণ্ড ও ব্যাপক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ঝাউতলা ও খুলশী: চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর ও পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের সদর দফতর হওয়ার কারণে এখানে উর্দুভাষীদের বড় অংশ কর্মরত ছিল।পাহাড়তলী রেলওয়ে কলোনি, ঝাউতলা, খুলশী, ফিরোজ শাহ কলোনি এবং অয়্যারলেস কলোনি এলাকায় বিস্তর উর্দুভাষী জনসংখ্যা গড়ে ওঠে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মালামাল পরিবহন ও রেলওয়ে যোগাযোগের মূল চাবিকাঠি বিহারী শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ১৯৭১ সালের শুরুতে এটি একটি বড় সামরিক স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ঈশ্বরদী (পাবনা) ও পার্বতীপুর (দিনাজপুর): ঈশ্বরদী এবং পার্বতীপুর ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দুটি প্রধান রেলওয়ে জংশন। লোকোশেড, ডেক ও ক্যারেজ বিভাগের অধিকাংশ টেকনিক্যাল পদগুলোতে উর্দুভাষীদের আধিপত্য ছিল। ফলে উভয় শহরের বিরাট অংশজুড়ে বিশাল বিশাল রেল কলোনি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে বিহারী ক্যাম্পে রূপান্তরিত হয়।
নারায়ণগঞ্জ (আদমজী) ও বগুড়া: নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলস তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাটকল হওয়ায় সেখানে হাজার হাজার বিহারী শ্রমিক কর্মরত ছিল। আদমজী কলোনি ছিল ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জের বৃহত্তম বিহারী কেন্দ্র। এছাড়া বগুড়া শহরের কিছু নির্দিষ্ট পকেটে ও রেল স্টেশনের আশপাশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বাস করত।
আটকে পড়া পাকিস্তানি আন্দোলন ও 'এসপিজিআরসি' (SPGRC)-র উত্থান-পতন
১৯৭২ সালের পর থেকে বিহারীদের রাজনীতি ও অধিকার আদায়ের মূল চালিকাশক্তি ছিল SPGRC (Stranded Pakistanis General Repatriation Committee বা আটকে পড়া পাকিস্তানি পুনর্বাসন সংগ্রাম কমিটি)।
নাসিম খানের নেতৃত্ব: নাসিম খানের নেতৃত্বে এসপিজিআরসি দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে দাবি করে আসছিল যে তারা বাংলাদেশের নাগরিকে পরিণত হতে চান না; তারা ‘পাকিস্তানের বিশ্বস্ত নাগরিক’ এবং তাদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিতে হবে।
১৯৭৪ সালের ত্রিদেশীয় দিল্লি চুক্তি: ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তির অধীনে পাকিস্তান সরকার মাত্র ৩টি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে (বিভক্ত পরিবারের সদস্য, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী) প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বিহারীকে ফেরত নেয়। তবে বাকি সাড়ে তিন লাখ বিহারীকে গ্রহণ করতে পাকিস্তান পরবর্তীতে সাফ মানা করে দেয়।
রাবেতা অল-আলম আল-ইসলামী (MWL) ট্রাস্টের ব্যর্থতা: ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক এবং মক্কাভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ‘রাবেতা অল-আলম আল-ইসলামী’-র উদ্যোগে একটি বিশাল ট্রাস্ট গঠিত হয়। পরিকল্পনা ছিল পঞ্জাব ও সিন্ধুতে আবাসন তৈরি করে বাংলাদেশ থেকে বিহারীদের নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু পাকিস্তানের সিন্ধি ও মুহাজিরদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সংঘাত (MQM রাজনীতির উত্থান) শুরু হলে করাচি ও সিন্ধু প্রদেশের রাজনীতিবিদরা অতিরিক্ত বিহারীদের ফেরত নেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন। ফলে এই প্রকল্প চিরতরে হিমাগারে চলে যায়।
অর্থনীতি ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পে বিহারীদের অবদান
মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের ক্যাম্প জীবনের মানবেত্র বাস্তবতার মধ্যেও উর্দূভাষী জনগোষ্ঠীর হাত ধরে বাংলাদেশের বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও রন্ধনশিল্প চরম উচ্চতায় পৌঁছেছে:
মিরপুর বেনারসি পল্লী: ঢাকার বেনারসি শাড়ির যে বিশ্বজোড়া খ্যাতি, তার মূলে রয়েছে বিহারী কারিগরদের অবদান। ১৯৪৭ সালে ভারতের বারাণসী (বেনারস) থেকে আসা তাঁতিরা তাঁদের সাথে করে বেনারসি শাড়ি বোনার আদি কৌশল নিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা মিরপুর ১০ ও ১১ নম্বর সেকশনে 'মিরপুর বেনারসি পল্লী' গড়ে তোলেন, যা আজ বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম অংশ।
কারচুপি ও জারদৌসি (Zardozi) কাজ: লেহেঙ্গা, শাড়ি ও থ্রি-পিসে সোনালী-রূপালী সুতা, পুঁতি ও চুমকির সূক্ষ্ম কারচুপির কাজে বিহারী পুরুষ ও নারী কারিগররা অত্যন্ত দক্ষ।
বিখ্যাত বিরিয়ানি ও কাবাব সংস্কৃতি: ঢাকার রন্ধন সংস্কৃতিতে উর্দূভাষীদের নিজস্ব ছাপ রয়েছে। মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের ক্যাম্পসংলগ্ন মুস্তাকিম কাবাব, সেলিম কাবাব, বোবা বিরিয়ানি ও খাঁটি ক্যাম্প স্টাইলের 'কাচ্চি ও চাপ' ঢাকার খাদ্যরসিকদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত।
আইনি জটিলতা: ক্যাম্পের জমি, বকেয়া বিল ও স্থানীয় সরকারের দ্বন্দ্ব
২০০৮ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র পেলেও ক্যাম্প অধিবাসীদের সাথে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও তিতাস/ডেসকোর সংঘাত এক নতুন আইনি মোড় নিয়েছে:
বকেয়া বিদ্যুৎ ও পানি বিল সংকট: স্বাধীনতার পর থেকে রেডক্রস ও বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ মন্ত্রণালয় ক্যাম্পগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেসকো (DESCO) ও ওয়াসা হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল বকেয়া দেখিয়ে বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিলে ক্যাম্পের অধিবাসীরা রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁদের দাবি স্থায়ীভাবে পুনর্বাসিত না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখতে হবে।
উচ্ছেদ আতঙ্ক ও মাস্টারপ্ল্যান: মিরপুর ১১ নম্বর, মিল্লাত ক্যাম্প এবং কালশী রোডের সম্প্রসারণ ও আধুনিক নগরায়ণের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। অন্যদিকে, পুনর্বাসন ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করে ক্যাম্প অধিবাসীদের সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ও বিহারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ঢাকার মিরপুর এলাকাটি বিহারী ও অবাঙালি সশস্ত্র মিলিশিয়াদের দখলে ছিল ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসজুড়ে এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় পর্যন্ত মিরপুরের সুয়েজ খাল, রাইনখোলা, কল্যাণপুর, জল্লাদখানা এবং মুসলিম বাজার বধ্যভূমিতে হাজার হাজার বাঙালিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
মিরপুর, সৈয়দপুর ও খুলনায় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পরবর্তীতে গঠিত বাংলাদেশের 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' এ একাধিক বিচার পরিচালিত হয়েছে:
জহির রায়হান হত্যা ও মিরপুর গণহত্যা তদন্ত
চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হান তাঁর নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লা কায়সারের সন্ধানে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকেই তিনি চিরতরে অন্তর্ধান হন। পরবর্তীতে সরকারি ও বেসরকারি তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে প্রকাশ পায়, বিহারী মিলিশিয়া ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্রের শক্তিতে বলীয়ান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমন্বিত আক্রমণের শিকার হয়ে তিনি শহীদ হন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) উপস্থাপন করা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য ও দাপ্তরিক নথিপত্র অনুযায়ী, তৎকালীন বিহারী মিলিশিয়া কমান্ডার আব্বাস চেয়ারম্যান, হাসমত আলী এবং কালু খানের মতো স্থানীয় নেতারা এই গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় (বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর ০২/২০১১) প্রমাণিত হয় যে, 'মিরপুরের কসাই' নামে পরিচিত আব্দুল কাদের মোল্লা এবং স্থানীয় বিহারী মিলিশিয়াদের যৌথ নেটওয়ার্ক মিরপুরের বুদ্ধিজীবী নিধন ও সাধারণ গণহত্যা সংগঠিত করে। ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের যুক্তিতে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় প্রদান করে ঐতিহাসিক ও আইনি সত্যতা প্রতিষ্ঠিত করে।
সৈয়দপুর ও গোলাহাট গণহত্যা এবং বোটামিয়া বাহিনীর বিচার
নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাকেন্দ্রীক এলাকা হওয়ায় সেখানে অবাঙালি বিহারীদের ব্যাপক আধিপত্য ছিল। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন সংগঠিত গোলাহাট গণহত্যা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা। ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রায় সাড়ে চারশত বাঙালি ও হিন্দু পরিবারকে সৈয়দপুর স্টেশন থেকে একটি বিশেষ ট্রেনে তোলা হয়। ট্রেনটি শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে গোলাহাট নামক স্থানে পৌঁছালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে থামানো হয়। সেখানে রামদা, তলোয়ার ও খঞ্জর নিয়ে ওত পেতে থাকা অবাঙালি রাজাকার ও মিলিশিয়ারা ৪৩৮ জনেরও বেশি নিরস্ত্র বাঙালিকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।
এই গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী ছিল স্থানীয় অবাঙালি রাজাকার জওয়াহের আলী বোটামিয়া, জকি ফয়সাল, হানিফ এবং কালু। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সৈয়দপুরের মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে পৃথক মামলা পরিচালনা করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে কীভাবে বোটামিয়া ও তার বাহিনী সৈয়দপুর অঞ্চলকে বাঙালি শূন্য করার পরিকল্পনা করেছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল বোটামিয়া ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে চূড়ান্ত রায় প্রদান করে।
খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল গণহত্যা ও শিল্পাঞ্চলের বিহারী অপরাধীদের বিচার
মুক্তিযুদ্ধকালীন খুলনার খালিশপুর, দৌলতপুর এবং রূপসা শিল্পাঞ্চল অবাঙালি বিহারী মিলিশিয়া ও রাজাকার বাহিনীর প্রধান শক্তঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরু থেকেই স্থানীয় শান্তি কমিটি ও বিহারী সশস্ত্র দলগুলো ক্রিসেন্ট জুট মিল, পিপলস জুট মিল এবং চন্দনী মহল এলাকায় বাঙালি শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতন শুরু করে।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের বয়লার রুম এবং ভৈরব নদীর তীরে হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিককে ধরে এনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হতো। লাশগুলো ভৈরব নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো কিংবা মিলে ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করা হতো।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে খুলনা অঞ্চলের একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিহারী ক্যাডার ও স্থানীয় পাকিস্তানি সহযোগীদের যৌথ অপকর্মের নথি উপস্থাপন করা হয়। খানজাহান আলী ও খালিশপুর থানার বিহারী মিলিশিয়া কমান্ডার এবং স্থানীয় রাজাকারদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে চার্জ গঠন করা হয় এবং বহু অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডসহ সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হয়।
সাংস্কৃতিক রূপান্তর 'রেখতা' ভাষা থেকে বাংলা মাধ্যমে একীভূত হওয়া
ভাষাগত রূপান্তর: বয়োবৃদ্ধ বিহারীরা এখনও উত্তর ভারতীয় উর্দূর উপভাষা ‘রেখতা’ বা ‘বিহারী-উর্দূ’তে কথা বলেন। তবে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ঘরের ভেতর উর্দূ বললেও রাজপথে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কর্মক্ষেত্রে অনর্গল ও সাবলীল বাংলায় কথা বলে।
সামাজিক বিবাহ বন্ধন: বিগত দুই দশকে ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকার প্রবণতা ভেঙে গেছে। এখন ক্যাম্পের বাইরের বাঙালি পরিবারের সাথে ক্যাম্পের তরুণ-তরুণীদের ব্যাপকভাবে আন্তঃবিবাহ (Inter-marriage) সম্পন্ন হচ্ছে, যা দুই সংস্কৃতির দূরত্বকে দ্রুত কমিয়ে আনছে।
রূপান্তরের রাজনীতি ও ভবিষ্যতের শিক্ষণীয় দিক
মিরপুরের বিহারী জনপদের ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য একটি বিরাট শিক্ষণীয় দলিল। এই ইতিহাস আমাদের দুটি বড় সত্য শিক্ষা দেয়:
বর্ণবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের ভয়াবহতা: কোনো জনগোষ্ঠী যদি কৃত্রিম সাংস্কৃতিক অহংকার বা রাষ্ট্রীয় তোষণের ওপর ভর করে নিজ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অবমূল্যায়ন করে বা 'ছোটজাতি' মনে করে, তবে তার পরিণতি হয় চরম ভয়াবহ। ১৯৭১ সালে বিহারী মিলিশিয়াদের সেই বর্ণবাদী উন্মাদনা তাদের নিজেদেরকেও ইতিহাসের ট্র্যাজিক নায়কে পরিণত করেছিল।
ক্ষমা, আইনি বিচার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির শক্তি: বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এদেশের জনগণ চরম নিপীড়নের শিকার হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর কোনো অন্ধ প্রতিশোধের পথ বেছে নেয়নি। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের বিচার করা হয়েছে, আর নতুন প্রজন্মকে দেশের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করে বুকে টেনে নেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালের হাইকোর্টের রায় প্রমাণ করে বাংলাদেশ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র।
রক্তের ক্ষত মুছে প্রগতির ধারায় যাত্রা
মিরপুরের বিহারী জনপদ আজ ইতিহাসের এক মহা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একাত্তরের সেই জল্লাদখানা বধ্যভূমি, রূপনগরের কালাপানি আর রক্তভেজা ইতিহাসের দায় তৎকালীন অপরাধী বিহারী ঘাতকদের বহন করতেই হবে। সেই অন্ধকার অধ্যায়কে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ ইতিহাসে নেই।
একই সাথে, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা এক তরুণ উর্দুভাষী নাগরিক, যিনি জন্মসূত্রে বাংলাদেশি, তিনি একাত্তরের ঘাতকদের অপরাধের দায় বহন করবেন না এটাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল নীতি।
মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বা জেনেভা ক্যাম্পের ধুলোবালি মেখে যে শিশুটি আজ বড় হচ্ছে, সে আর অতীতের কোনো ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ নয়; সে স্বাধীন লাল-সবুজের পতাকার একজন নাগরিক। অতীতকে সত্য হিসেবে স্বীকার করে, একাত্তরের রক্তভেজা ইতিহাসকে স্মরণে রেখে এবং নতুন প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই মিরপুরের এই বিহারী জনপদের পূর্ণাঙ্গ সামাজিক উত্তরণ সম্ভব।















