বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কি কেবলই 'নাটক'? ফিরে আসছে কি সেই ভয়াবহ দিনগুলো?
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জনপরিসরে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিপজ্জনক বিতর্ককে কৃত্রিমভাবে জিইয়ে রাখা হয়েছে "দেশে কি আসলেই উগ্রবাদী বা জঙ্গি গোষ্ঠী আছে, নাকি এগুলো রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিখুঁত নাটক?" বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা উগ্র ধর্মীয় সংগঠনগুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল, নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক বিশাল অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক নিরন্তর এই প্রচার চালিয়ে আসছে যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। শেখ হাসিনার জঙ্গি দমনকে তারা ‘জঙ্গি নাটক’ বলে প্রচার করতো।

TruthBangla

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জনপরিসরে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিপজ্জনক বিতর্ককে কৃত্রিমভাবে জিইয়ে রাখা হয়েছে "দেশে কি আসলেই উগ্রবাদী বা জঙ্গি গোষ্ঠী আছে, নাকি এগুলো রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিখুঁত নাটক?" বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা উগ্র ধর্মীয় সংগঠনগুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল, নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক বিশাল অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক নিরন্তর এই প্রচার চালিয়ে আসছে যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। শেখ হাসিনার জঙ্গি দমনকে তারা ‘জঙ্গি নাটক’ বলে প্রচার করতো।
তাদের বহুল প্রচারিত ন্যারেটিভ বা দাবি অনুযায়ী, দেশে যখনই কোনো জঙ্গি আস্তানা উন্মোচিত হয় কিংবা কোনো উগ্রপন্থীকে গ্রেফতার করা হয়, তখনই সেটিকে ‘ইসলামি ঘরানার মানুষদের দমন করার হাতিয়ার’ অথবা ‘বিদেশি শক্তিকে খুশি করার স্ক্রিপ্টেড নাটক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাসের একটি অমোঘ নিয়ম হলো, সত্যকে প্রোপাগান্ডার কুয়াশা দিয়ে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা গেলেও, বাস্তবের নির্মম আঘাতের সামনে সেই মিথ্যার দেয়াল ধসে পড়তে বাধ্য।
২০২৫ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ও লোমহর্ষক বিস্ফোরণটি সেই পুরোনো ও জরাজীর্ণ বিতর্ককে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। একই সাথে তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশাকে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যখন একটি আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসার চার দেয়ালের আড়ালে আত্মঘাতী হামলার সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান ‘সুইসাইডাল ভেস্ট’ তৈরির কারখানার সন্ধান মেলে, তখন আর একে কোনোভাবেই ‘রাষ্ট্রীয় নাটক’ বা ‘সাজানো গল্প’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার ন্যূনতম সুযোগ থাকে না। এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক চশমা দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তাকে পরিমাপ করার আত্মঘাতী প্রবণতা আমাদের কত বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আজ আমার পক্ষ থেকে এই পুরো চক্রান্ত, নেপথ্যের কুশীলব এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির এক পুঙ্খানুপুঙ্খ ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণ: হাসনাবাদের সেই ভয়াবহ সকালের ব্যবচ্ছেদ
২০২৫ সালের শেষভাগে এসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ল্যান্ডস্কেপ যখন এক চরম থমথমে ও অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ২৬শে ডিসেম্বর ভোরের আলো ফোটার মুহূর্তে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে এক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। হাসনাবাদের ব্লক-এ এলাকার ‘দক্ষিণ উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে এই ঘটনাটি ঘটে। প্রাথমিক অবস্থায় স্থানীয় মানুষ একে সাধারণ গ্যাস সিলিন্ডার বা এয়ার কন্ডিশনার (AC) বিস্ফোরণ মনে করলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের তদন্তে যে সত্য বেরিয়ে আসে, তা ছিল অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো।

বিস্ফোরণের তীব্রতা ও গাঠনিক ক্ষতি
বিস্ফোরণের ধ্বংসক্ষমতা এতটাই তীব্র ছিল যে, একতলা মাদ্রাসা ভবনটির দুটি বড় কক্ষের ইটের দেয়াল মুহূর্তের মধ্যে উড়ে গিয়ে রাস্তায় আছড়ে পড়ে। ভবনের মূল ছাদ এবং আরসিসি (RCC) বিমে বিশাল ফাটল দেখা দেয়, যা প্রমাণ করে এটি কোনো সাধারণ গ্যাস লাইনের লিকেজ ছিল না। এমনকি তীব্র কম্পনে পাশের বহুতল ভবনের দেয়াল ও জানালার কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।
উদ্ধারকৃত মারাত্মক রাসায়নিক ও ‘মাদার অব শয়তান’
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ল্যাব বিশেষজ্ঞরা যা উদ্ধার করেছেন, তা আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সিগনেচার বিস্ফোরক। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ উচ্চ-ঘনত্বের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড উদ্ধার করা হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক যা পাওয়া গেছে, তা হলো টিএটিপি (TATP - Triacetone Triperoxide) তৈরির কাঁচামাল ও সরঞ্জাম।
আন্তর্জাতিক সামরিক ও নিরাপত্তা পরিভাষায় TATP-কে বলা হয় "Mother of Satan" বা শয়তানের মা। কারণ এই রাসায়নিকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সামান্য তাপ, ঘর্ষণ বা আঘাত পেলেই এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে। বৈশ্বিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস (ISIS) বা আল-কায়েদা বিশ্বজুড়ে যতগুলো আত্মঘাতী হামলা বা সুইসাইডাল ভেস্ট ব্যবহার করেছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই এই TATP ব্যবহার করা হয়েছে। হাসনাবাদের মাদ্রাসায় মূলত এই TATP ল্যাবরেটরি তৈরি করা হয়েছিল এবং অসাবধানতাবশত মিশ্রণ তৈরির সময়ই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে।
আল আমিন শেখ রাজিব: এক পুরোনো জঙ্গিনেতার নতুন ছদ্মবেশ
এই ভয়াবহ বোমার কারখানার নেপথ্যে থাকা মূল হোতার প্রোফাইলটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদের শিকড় কতটা গভীর এবং তারা কীভাবে বারবার খোলস পরিবর্তন করে ফিরে আসে। এই চক্রের মূল মাস্টারমাইন্ডের নাম আল আমিন শেখ রাজিব। সে কোনো সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষক বা নিরীহ আলেম নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রবিরোধী ও উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত একজন দুর্ধর্ষ ও পেশাদার অপরাধী।
২০১৭ সালের অতীত ইতিহাস ও জেএমবি কানেকশন
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আল আমিন শেখ রাজিব আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে, ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে তৎকালীন এলিট ফোর্স র্যাবের হাতে প্রথম গ্রেফতার হয়েছিল। সে সময় তার গোপন আস্তানা থেকে বিদেশি পিস্তল, রিভলবার, বিপুল পরিমাণ গুলি এবং রাষ্ট্রবিরোধী উগ্র জিহাদি বই ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়েছিল। রাজিব ছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির (জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ) কুখ্যাত ‘তামিম-সারোয়ার’ গ্রুপের একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও সক্রিয় ক্যাডার। এই তামিম-সারোয়ার গ্রুপই ২০১৬ সালের ১লা জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিসান বেকারিতে ভয়াবহ হামলার নেপথ্যে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছিল।

ছদ্মবেশে আত্মগোপন ও মাদ্রাসার আস্তানা
কারাগার থেকে কোনো এক ফাঁকফোকরে বের হয়ে এসে গত তিন বছর ধরে রাজিব অত্যন্ত সুকৌশলে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে সপরিবারে বসবাস শুরু করে। নিজের আসল পরিচয় গোপন করে সে ‘দক্ষিণ উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ নামক এই তথাকথিত আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলে।
একটি পবিত্র ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সে যে আসলে একটি পুরোদস্তুর বোমার কারখানা এবং সুইসাইডাল স্কোয়াডের রিক্রুটমেন্ট সেন্টার গড়ে তুলেছিল, তা এই আকস্মিক বিস্ফোরণের আগে স্থানীয় বাসিন্দা বা বাড়িওয়ালার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। এটি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা যে, উগ্রপন্থীরা এখন আর প্রত্যন্ত পাহাড়ে বা বনে জঙ্গলে নয়, বরং আমাদের চেনা সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে সবচেয়ে নিরাপদ ছদ্মবেশ ধারণ করছে।
‘জঙ্গি নাটক’ তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা
বাংলাদেশে উগ্রবাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার এবং সেটিকে ব্যঙ্গচিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার পেছনে একটি সুসংগঠিত, অর্থায়নপুষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নেটওয়ার্ক সবসময় সক্রিয় থেকেছে। এই প্রোপাগান্ডার মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং উগ্রপন্থীদের জন্য একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ‘সুরক্ষা কবচ’ বা ডিফেন্স মেকানিজম তৈরি করা।
স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী ও গণমাধ্যমের ভূমিকা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মূল চেতনার পরিপন্থী রাজনৈতিক দল যেমন জামায়াতে ইসলামী, তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির এবং তাদের ভাবাদর্শে পরিচালিত একসময়ের বহুল আলোচিত ‘আমার দেশ’ পত্রিকার মতো গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন সময় জঙ্গি বিরোধী সফল অভিযানগুলোকে ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে জনগণের সামনে ব্র্যান্ডিং করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
তাদের মূল ন্যারেটিভ ছিল এগুলো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক চাল। আলেম-ওলামা ও ইসলামি চিন্তাবিদদের সমাজ থেকে নির্মূল করার একটি ইসলামবিদ্বেষী কৌশল। পশ্চিমা বা বিদেশি শক্তিগুলোকে খুশি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি ভূ-রাজনৈতিক ফ্রেমিং।
সাইবার স্পেস ও অনলাইন অ্যাক্টিভিজম
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াত-শিবিরপন্থী হাজার হাজার ফেইক আইডি ও পেজ থেকে বছরের পর বছর ধরে জনগণের মগজ ধোলাই করা হয়েছে। যখনই কোনো দুর্গম চরাঞ্চল বা ঢাকার কোনো বহুতল ভবন থেকে বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড, সুইসাইডাল ভেস্ট এবং ভারী অস্ত্রসহ কোনো জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হতো, তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় লাখ লাখ কমেন্ট ও পোস্টের মাধ্যমে রটানো হতো "এগুলো পুলিশ ও র্যাব নিজেরা বস্তায় করে নিয়ে এসে মিডিয়াকে দেখাচ্ছে।"
এই মারাত্মক অপপ্রচারের ফলে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক উদাসীনতা ও সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায়, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Selective Cognitive Dissonance’। কিন্তু কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের ঘটনাটি এই সমস্ত সাজানো তত্ত্বের মুখে এক বিরাট চড় মেরেছে। কারণ এখানে কোনো পুলিশি রেইড বা অভিযান হয়নি। এখানে ঘাতক রাজিবের নিজের তৈরি করা বোমার বিস্ফোরকই তার মাদ্রাসার দেয়াল উড়িয়ে দিয়েছে। যখন প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে বিস্ফোরণ ঘটে দেয়াল-ছাদ ধসে পড়ে, তখন সেই ‘সাজানো নাটক’ তত্ত্বের অসারতা ও কুৎসিত রূপ জনগণের সামনে পুরোপুরি নগ্ন হয়ে যায়।
কারাগার ভাঙার মহোৎসব: ২০২৪-পরবর্তী নিরাপত্তা ভ্যাকুয়াম ও ঝুঁকি
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এবং তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তার পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন ও ক্রান্তিকালীন সময়ে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এক ভয়াবহ ভাঙন বা ‘সিকিউরিটি ভ্যাকুয়াম’ দেখা দেয়। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে।
জেল ভেঙে দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের পলায়ন
২০২৪ সালের আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোতে দেশের একাধিক কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগার (যেমন নরসিংদী ও কাশিমপুর কারাগার) ভেঙে হাজার হাজার কয়েদি পালিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। অত্যন্ত আশঙ্কার বিষয় হলো, এই পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিল দেশের বিভিন্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন থাকা অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও কুখ্যাত জঙ্গি সদস্য।
আইনি মারপ্যাঁচে জামিনের হিড়িক
যারা কারাগার ভাঙার সময় সরাসরি বের হতে পারেনি, তারা পরবর্তী সময়ে দেশের বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের অস্থিতিশীলতা এবং আইনি নথিপত্রের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে জামিন হাসিল করে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এই যে শত শত দুর্ধর্ষ এবং আত্মঘাতী বোমা তৈরিতে দক্ষ অপরাধী এখন বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা এখন কোথায় আছে, কী ছদ্মনাম ধারণ করেছে, কিংবা কোন কোন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে তার কোনো সঠিক ও নিখুঁত ডেটাবেস বা হিসাব বর্তমান নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে নেই। কেরানীগঞ্জের রাজিবের মতো ব্যক্তিরা এই প্রশাসনিক শূন্যতা ও অরাজকতার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছে। তারা এখন সরাসরি রাজনৈতিক লেবাস কিংবা কোনো স্বনামধন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তাদের স্লিপার সেলগুলোকে (Sleeper Cells) পুনরায় সক্রিয় করছে। আজকের এই কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কোনো একটি মেগা প্রজেক্ট বা বড় ধরণের আত্মঘাতী হামলার চূড়ান্ত মহড়া (Rehearsal) ছিল।
জনগণের উদাসীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তার চশমা
বাঙালি জাতির একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হলো যতক্ষণ না বিপদ সরাসরি নিজের ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে, ততক্ষণ আমরা সচেতন হতে চাই না। আমরা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মতো একটি স্পর্শকাতর ও অস্তিত্বের লড়াইকে সবসময় দলীয় বা রাজনৈতিক চশমা দিয়ে পরিমাপ করি।
আমাদের বোঝা উচিত, উগ্রপন্থীদের তৈরি করা বোমা বা বিস্ফোরক কোনো রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা ধর্ম দেখে ফাটে না। বোমা যখন ফাটে, তখন তা প্রগতিশীল, রক্ষণশীল, নাস্তিক কিংবা আস্তিক সবার শরীরকেই সমানভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
হাসনাবাদের ‘দক্ষিণ উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’র এই বিস্ফোরণটি যদি গভীর রাতে বা ভোরে না হয়ে সকাল ১০টায় কিংবা দিনের বেলা হতো, যখন নিষ্পাপ কোমলমতি শিশুরা সেখানে কোরআন বা ধর্মীয় শিক্ষা নিচ্ছিল, তবে আজ আমাদের শত শত লাশের স্তূপ দেখতে হতো। আমাদের অবুঝ শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ নিয়ে স্বজনদের হাহাকারে কেরানীগঞ্জের বাতাস ভারী হয়ে উঠতো। যারা এই উগ্রবাদকে ‘রাজনীতির নাটক’ বলে এড়িয়ে যান, তারা মূলত প্রকারান্তরে এই খুনিদের ও বোমাবাজদের আমাদের সন্তানদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলার লাইসেন্স বা ছাড়পত্র দিচ্ছেন। জঙ্গিবাদ কোনো বিশেষ দলের রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানচিত্র ও সার্বভৌমত্ব টিকে থাকার লড়াই।
কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণ ও বাংলাদেশের উগ্রবাদ
কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ বিস্ফোরণ, নেপথ্যের কুশীলবদের প্রোফাইল, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা এবং এর ফলে সৃষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোকে একনজরে ও সহজভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি বিস্তারিত তথ্যসমৃদ্ধ ছক দেওয়া হলো:
পর্যালোচনার ক্ষেত্র ও উপাদান | হাসনাবাদ বিস্ফোরণের বাস্তব চিত্র ও তথ্য | নেপথ্যের কুশীলব ও প্রোপাগান্ডার রূপ | জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব |
১. ঘটনার স্থান ও সময় | ২৬শে ডিসেম্বর, ২০২৫; ভোরবেলা। দক্ষিণ উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা, হাসনাবাদ, কেরানীগঞ্জ। | একটি আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে বোমার কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল। | ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় উগ্রপন্থীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা সেফ হাউস (Safe House) তৈরির প্রমাণ। |
২. উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক | বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এবং TATP (Triacetone Triperoxide)-এর সরঞ্জাম। | আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস (ISIS) কর্তৃক ব্যবহৃত আত্মঘাতী সুইসাইডাল ভেস্টের মূল কেমিক্যাল (Mother of Satan)। | সামান্য অসাবধানতায় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার ক্ষমতা; যা প্রমাণ করে উগ্রপন্থীরা আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। |
৩. মূল মাস্টারমাইন্ডের প্রোফাইল | আল আমিন শেখ রাজিব; মাদ্রাসার তথাকথিত পরিচালক ও শিক্ষক। | ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে অস্ত্র ও জিহাদি বইসহ র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া নিষিদ্ধ জেএমবি (তামিম-সারোয়ার গ্রুপ)-এর ক্যাডার। | দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা কারাগার থেকে বের হয়ে কীভাবে পুনরায় নাম ও পরিচয় বদলে মূলধারার সমাজে মিশে যাচ্ছে, তার বাস্তব প্রমাণ। |
৪. ‘জঙ্গি নাটক’ ন্যারেটিভ | বিরোধী দল, জামায়াত-শিবির ও ‘আমার দেশ’ পত্রিকার দীর্ঘদিনের অপপ্রচার। | দাবি করা হতো—আলেমদের দমন করতে এবং বিদেশি প্রভুদের খুশি করতে পুলিশ নিজেই নাটক সাজায়। | হাদির মতো উগ্র চরিত্রের মতোই রাজিবের এই বোমার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ প্রোপাগান্ডাকারীদের ‘নাটক’ তত্ত্বকে চিরতরে কবর দিয়েছে। |
৫. ২০২৪-পরবর্তী নিরাপত্তা ঝুঁকি | ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। | দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগার ভেঙে শত শত দণ্ডপ্রাপ্ত ও আন্ডার ট্রায়াল জঙ্গির গণ-পলায়ন ও জামিন লাভ। | আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চেইন অব কমান্ডের দুর্বলতা ও গোয়েন্দা নজরদারির বিশাল শূন্যতার (Security Vacuum) বহিঃপ্রকাশ। |
৬. সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক | জনগণের উদাসীনতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে দলীয় চশমা দিয়ে দেখার প্রবণতা। | ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও মাদ্রাসা ভাড়া নিয়ে স্লিকার সেল পরিচালনা। | উগ্রবাদ প্রতিরোধে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক প্রতিরোধের অভাব; যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক টাইম-বোমা। |
কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ বিস্ফোরণ এবং আল আমিন শেখ রাজিবের মতো পুরোনো খেলোয়াড়দের নতুন ছদ্মবেশে ফিরে আসার ঘটনাটি আসলে হিমশৈলের চূড়ামাত্র (Tip of the iceberg)। বাংলাদেশের উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের গভীরতা, তাদের কৌশলগত রূপান্তর, অর্থায়নের উৎস এবং সাইবার স্পেসকে ব্যবহার করার পদ্ধতি সম্পর্কে আরও অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে হবে।
‘হিল ট্র্যাক্স’ থেকে আরবান স্লিপার সেল
গত এক দশকে বাংলাদেশের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর রণকৌশলে এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে জেএমবি বা হুজি (Huji-B) এর মতো সংগঠনগুলো প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, সুন্দরবন বা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ে ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির নজরদারি ও ড্রোন প্রযুক্তির কারণে এই কৌশল এখন তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মাইক্রো-সেল মডেল (Micro-Cell Model): বর্তমানের উগ্রপন্থীরা ‘ক্ষুদ্র ও স্বাধীন সেল’ নীতিতে বিশ্বাসী। কেরানীগঞ্জের ঘটনাটি এর ক্লাসিক উদাহরণ। এখানে মাত্র ৩ থেকে ৪ জনের একটি সেল পুরো ল্যাবরেটরি পরিচালনা করছিল। এই সেলের সদস্যরা পাশের সেলের সদস্যদের চেনে না। ফলে একজন ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্ক ধসে পড়ে না।
ঘনবসতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার: ঢাকা ও তার আশেপাশের উপশহরগুলোর (যেমন সাভার, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ) ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে তারা সেফ হাউস হিসেবে বেছে নিচ্ছে। লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে দাড়ি-টুপি বা সাধারণ পোশাকের একজন মানুষকে আলাদা করা গোয়েন্দাদের জন্য খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো কঠিন।

‘নব্য জেএমবি’ ও তামিম-সারোয়ার গ্রুপের রাসায়নিক আসক্তি
আল আমিন শেখ রাজিব যে ‘তামিম-সারোয়ার গ্রুপ’-এর সদস্য, তাদের একটি বিশেষ সামরিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথাগত জেএমবি যেখানে দেশীয় প্রযুক্তির সাধারণ আইইডি (IED) বা ককটেল ব্যবহার করত, সেখানে এই নব্য জেএমবি (যা আন্তর্জাতিকভাবে আইএসের ভাবাদর্শী) রাসায়নিক বোমার দিকে বেশি ঝুঁকেছে।
হোলি আর্টিসানের লিগ্যাসি: ২০১৬ সালের গুলশান হামলার পর এই গ্রুপের মূল নেতা তামিম চৌধুরী ও সারোয়ার জাহান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হলেও, তাদের তৈরি করা ‘টেকনিক্যাল উইং’ বা বোমা প্রস্তুতকারক দলটির অনেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়।
TATP-এর সহজলভ্যতা: হাসনাবাদে যে TATP (Triacetone Triperoxide) পাওয়া গেছে, তা তৈরির জন্য কোনো জটিল সামরিক উপাদানের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ ফার্মেসি বা কেমিক্যালের দোকানে পাওয়া যায় এমন কিছু অ্যাসিড এবং হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় মিশ্রণ করে এটি বানানো যায়। রাজিবের মতো প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা ইন্টারনেটের ডার্ক ওয়েব (Dark Web) থেকে ম্যানুয়াল ডাউনলোড করে এই বোমা তৈরির বিদ্যা নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টো-ফিন্যান্সিং
আগে ধারণা করা হতো উগ্রবাদের সমস্ত টাকা মধ্যপ্রাচ্য বা কোনো বিদেশি এনজিও থেকে আসে। কিন্তু বর্তমানের অর্থায়ন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত এবং ডিজিটাল।
ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency): বর্তমান স্লিপার সেলগুলো ট্র্যাকিং এড়ানোর জন্য USDT (Tether) বা Bitcoin-এর মাধ্যমে লেনদেন করে। কেরানীগঞ্জের ল্যাবরেটরি স্থাপনের অর্থায়নও কোনো ব্যাংকিং চ্যানেলে আসেনি, বরং তা এসেছে ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে, যা ব্লকচেইন প্রযুক্তির কারণে সহজে ট্রেস করা যায় না।
অনলাইন জুয়া ও ক্রাউডফান্ডিং: অনেক উগ্রপন্থী সেল বর্তমানে আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়ার সাইট থেকে অর্থ উপার্জন করছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘এতিমখানা নির্মাণ’, ‘অসহায় রোগীদের সাহায্য’ বা ‘ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার’-এর নামে ভুয়া ক্রাউডফান্ডিং (Crowdfunding) ক্যাম্পেইন চালিয়ে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা পরে ডাইভার্ট হয়ে চলে যাচ্ছে এই বোমার কারখানায়।
সাইবার স্পেস: ‘অদৃশ্য’ রিক্রুটমেন্ট ও এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন
উগ্রপন্থীদের বর্তমান রিক্রুটমেন্ট বা সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল। তারা আর সরাসরি মসজিদে বা লাইব্রেরিতে গিয়ে দাওয়াত দেয় না।
এনক্রিপ্টেড অ্যাপস (Encrypted Apps): তারা যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার ব্যবহার করে না। তারা ব্যবহার করে Telegram, TamTam, ChirpWire এবং Threema-এর মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত অ্যাপস। এই অ্যাপগুলোর মেসেজ নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় (Self-destructing messages)।
মনস্তাত্ত্বিক টার্গেটিং: তাদের আইটি উইং ফেসবুক বা ইউটিউবের কমেন্ট সেকশন স্ক্রিন করে। যারা বিভিন্ন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পোস্টে উগ্র বা আবেগপ্রবণ কমেন্ট করে, তাদের টার্গেট করে ইনবক্সে নক করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে ক্লোজড গ্রুপে নিয়ে গিয়ে তাদের মগজ ধোলাই (Brainwash) করা হয় এবং একপর্যায়ে হাসনাবাদের মতো মাদ্রাসায় এনে আত্মঘাতী ভেস্ট পরিয়ে দেওয়া হয়।
রেসিডাভিজম বা অপরাধের পুনরাবৃত্তি
আল আমিন শেখ রাজিবের প্রোফাইল আমাদের বিচার ও কারাব্যবস্থার একটি ভয়াবহ লুপহোল (Loophole) বা ত্রুটি উন্মোচন করে। ২০১৭ সালে গ্রেফতার হওয়ার পরও সে কীভাবে এবং কেন ২০২৫ সালে এসে আবার একই অপরাধে লিপ্ত হলো? একে অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Recidivism’।
জেলে বসে নেটওয়ার্কিং: বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে সাধারণ কয়েদি এবং উগ্রপন্থী কয়েদিদের অনেক সময় একই সাথে রাখা হয়। ফলে জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হওয়ার পরিবর্তে উল্টো উগ্রবাদের ‘ইউনিভার্সিটি’তে পরিণত হয়েছে। ভেতরে বসেই রাজিবের মতো পুরোনো ডনরা নতুন নতুন অনুসারী তৈরি করে এবং জামিনে বের হওয়ার পর তাদের নিয়ে নতুন সেল গঠন করে।
ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন (De-radicalization) প্রোগ্রামের অভাব: উন্নত বিশ্বে উগ্রপন্থীদের মানসিক ও আদর্শিক সংশোধনের জন্য বিশেষ কাউন্সিলিং বা ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন প্রোগ্রাম থাকে। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার চরম ঘাটতি রয়েছে। ফলে একজন জঙ্গি জেল থেকে বের হওয়ার পর সমাজ তাকে গ্রহণ করে না, আর সেও সুযোগ পেয়ে আবার তার পুরোনো অন্ধকার জগতেই ফিরে যায়।
প্রথাগত জেএমবি বনাম নব্য জেএমবি (তামিম-সারোয়ার গ্রুপ)
উগ্রবাদের এই কৌশলগত রূপান্তরকে স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:
সূচক ও বৈশিষ্ট্য | প্রথাগত জেএমবি (শায়খ আবদুর রহমান আমল) | নব্য জেএমবি (তামিম-সারোয়ার গ্রুপ ও বর্তমান রূপ) | নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ |
১. আদর্শিক অনুপ্রেরণা | স্থানীয় উগ্রবাদ এবং কট্টর সালাফি মতবাদ। | আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস (ISIS) ও আল-কায়েদার গ্লোবাল ন্যারেটিভ। | বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির সামান্য পরিবর্তনেও এরা বাংলাদেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে। |
২. সাংগঠনিক কাঠামো | কঠোরভাবে কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত ও অনুক্রমিক (Hierarchical)। | বিকেন্দ্রীভূত, স্বাধীন এবং ক্ষুদ্র ‘স্লিপার সেল’ বা লোন-উলফ মডেল। | একজনকে ধরলে পুরো চেইনের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। |
৩. রিক্রুটমেন্টের মাধ্যম | সরাসরি মাদ্রাসার ছাত্র, প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও অল্পশিক্ষিত তরুণ। | উচ্চশিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং ধর্মীয় ছদ্মবেশী শিক্ষক। | আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ায় এরা গোয়েন্দাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকে। |
৪. অস্ত্র ও বোমার প্রযুক্তি | দেশীয় প্রযুক্তির আইইডি, ককটেল, এবং সাধারণ ডেটোনেটর। | উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাসায়নিক বিস্ফোরক যেমন TATP, সুইসাইডাল ভেস্ট ও ড্রোন প্রযুক্তি। | অল্প পরিমাণ রাসায়নিক দিয়েই বিশাল স্ট্রাকচারাল ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্ভব। |
৫. যোগাযোগের মাধ্যম | হাতে লেখা চিঠি, সরাসরি গোপন বৈঠক এবং সাধারণ মোবাইল ফোন। | এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড অ্যাপস (Telegram, TamTam) এবং ডার্ক ওয়েব। | ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ইন্টারসেপশন (আড়ি পাতা) করা অত্যন্ত কঠিন। |
৬. অর্থায়নের উৎস | স্থানীয় ডাকাতি, জাকাfund এবং হুন্ডির মাধ্যমে আসা ক্যাশ টাকা। | ক্রিপ্টোকারেন্সি (USDT), ভুয়া অনলাইন চ্যারিটি এবং অনলাইন গ্যাম্বলিং। | ব্যাংকিং চ্যানেলে কোনো রেকর্ড না থাকায় মানি লন্ডারিং ধরা দুষ্কর। |
২০২৪-পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতা ও আঞ্চলিক হুমকি
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সমন্বয় সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই সুযোগটি শুধু দেশীয় জঙ্গিরাই নেয়নি, বরং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক খেলোয়াড়রাও সক্রিয় হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতা: কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (KNF) এবং নতুন উগ্রবাদী সংগঠন 'জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া'-এর যে আঁতাত পাহাড়ে গড়ে উঠেছিল, তা সমতলের এই নব্য জেএমবির স্লিপার সেলগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপন করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সীমান্তবর্তী চোরাচালান: রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিস্ফোরকের কাঁচামাল চোরাপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ কেমিক্যালের রুটও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ মাদ্রাসার সেই বিধ্বস্ত দেয়াল আর উড়ে যাওয়া ছাদ আমাদের ফ্যান্টাসি বা প্রোপাগান্ডার জগৎ থেকে টেনে এনে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে আছড়ে ফেলেছে। আমরা যদি এখনও এই ঘটনাগুলোকে "অমুক দলের চাল" বা "তমুক দেশের নাটক" বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রোল বা ব্যঙ্গ করতে থাকি, তবে আমরা মূলত আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেব। উগ্রবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ক্ষতি করে না, এটি পুরো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, দেশের বিনিয়োগ নষ্ট করে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে একটি 'অস্থিতিশীল রাষ্ট্র' হিসেবে চিহ্নিত করে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ এবং আমাদের কৌশলগত রোডম্যাপ
কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি চূড়ান্ত ‘ওয়েক-আপ কল’ (Wake-up Call)। বর্তমান ২০২৬ সালের এই জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের যদি এই অন্ধকার শক্তির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হয়, তবে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
গোয়েন্দা নজরদারি ও ডেটাবেস আধুনিকায়ন
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে যতজন জঙ্গি বা উগ্রপন্থী কয়েদি জেল ভেঙে পালিয়েছে কিংবা জামিনে মুক্ত হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের একটি সুনির্দিষ্ট ও ডিজিটাল বায়োমেট্রিক ট্র্যাকিং ডেটাবেস তৈরি করতে হবে। স্থানীয় থানা এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে প্রতিটি এলাকায় নতুন ভাড়াটেদের ব্যাকগ্রাউন্ড কঠোরভাবে স্ক্রিনিং করতে হবে।
কেমিক্যাল ও বিস্ফোরকের উন্মুক্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, সালফিউরিক অ্যাসিড কিংবা বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল দ্রাবক যা দিয়ে TATP-এর মতো মারাত্মক বিস্ফোরক তৈরি করা যায়, সেগুলোর বাণিজ্যিক ও খুচরা বিক্রয়ের ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কোনো ল্যাব বা প্রতিষ্ঠান এই রাসায়নিকগুলো কিনলে তার সুনির্দিষ্ট অডিট থাকতে হবে।
মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও অডিট
ধর্মীয় শিক্ষার নামে যাতে কোনো উগ্রপন্থী বা নিষিদ্ধ সংগঠনের সাবেক সদস্যরা কোমলমতি শিশুদের মগজ ধোলাই করতে না পারে, সেজন্য দেশের প্রতিটি কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষকদের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক রেকর্ড (Police Verification) বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফান্ডের উৎস এবং তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের ওপর ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও শিক্ষা বোর্ডের নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে।
সাইবার প্রোপাগান্ডা ও ‘ফেক পিআর’ সিন্ডিকেট ধ্বংস
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে কালিমালিপ্ত করতে জঙ্গি অভিযানকে ‘নাটক’ বলে গুজব ছড়ায়, তাদের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। ইন্টারনেটে উগ্রপন্থী কন্টেন্ট ও আইএসের প্রোপাগান্ডা সাইটগুলোকে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ ব্লক করার জন্য ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (NTMC) আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে।
সচেতনতাই আমাদের শেষ রক্ষা
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বা ধর্মীয় উগ্রবাদ কোনোদিন ছিল না, কিংবা বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এগুলো স্রেফ রাজনৈতিক দলের বানানো গল্প এই কথাটি বিশ্বাস করা মানে স্রেফ নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা বা আত্মহননের শামিল। বৈশ্বিক ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক কিংবা পাকিস্তান যেখানেই চরমপন্থা ও উগ্রবাদের প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে রাষ্ট্র ও সমাজ হালকাভাবে নিয়েছে বা রাজনৈতিক ডালপালা হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছে, সেখানেই সাধারণ মানুষকে তার এক ভয়াবহ ও চড়া মাশুল দিতে হয়েছে।
কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের এই জ্বলন্ত মাদ্রাসা ভবন, উড়ে যাওয়া দেয়াল আর উদ্ধারকৃত ‘মাদার অব শয়তান’ রাসায়নিক আমাদের এই কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে যে শত্রু আমাদের ঘরের ভেতরেই আছে। তারা তাদের পরবর্তী ধ্বংসাত্মক ‘অ্যাকশন’ শুরু করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির মানচিত্র এবং আমাদের নিষ্পাপ সন্তানদের জানমাল রক্ষা করতে হলে আমাদের সমস্ত দলীয় বিভেদ, রাজনৈতিক দলাদলি ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী সামাজিক প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে।
মাদ্রাসার আড়ালে বোমা তৈরির কারখানাকে আর ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সময় আমাদের হাতে নেই। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে যেমন তাদের পেশাদারিত্ব ও সততা ফিরিয়ে আনতে হবে, তেমনি দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজের এলাকা, নিজের চারপাশ এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সর্বোচ্চ সচেতন ও জাগ্রত থাকতে হবে। নতুবা, কোনো এক ভয়াবহ সকালে বড় কোনো জাতীয় ট্র্যাজেডি ঘটে যাওয়ার পর আফসোস করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার থাকবে না। সত্যকে জানুন, প্রোপাগান্ডাকে রুখে দিন তবেই সুরক্ষিত থাকবে আমাদের বাংলাদেশ।















