সেহরির ওয়াক্তে রক্তে ভেজা জায়নামাজ - বগুড়ার পীর পরিবারের শাহাদাত
যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি জান্তার পক্ষে অনেক পীর-মাশায়েখ বা ধর্মভিত্তিক দল গণহত্যা ও নারী নির্যাতনকে 'গনিমত' সংগ্রহের ফতোয়া দিচ্ছিল, ঠিক সেই অন্ধকার সময়ে বগুড়ার এক পীর পরিবার দেখিয়েছিল প্রকৃত ঈমানদারের রক্ত কোনোদিন জালিমের সঙ্গে আপস করতে পারে না।

TruthBangla
Dec 8, 2025
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কেবল দুই পক্ষের সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাস নয়; এটি ছিল মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ডের পরীক্ষা। যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি জান্তার পক্ষে অনেক পীর-মাশায়েখ বা ধর্মভিত্তিক দল গণহত্যা ও নারী নির্যাতনকে 'গনিমত' সংগ্রহের ফতোয়া দিচ্ছিল, ঠিক সেই অন্ধকার সময়ে বগুড়ার এক পীর পরিবার দেখিয়েছিল প্রকৃত ঈমানদারের রক্ত কোনোদিন জালিমের সঙ্গে আপস করতে পারে না। সেহরির পবিত্র মুহূর্তে, মসজিদে ফজরের আজানের ধ্বনির মধ্যে, রামশহরের মাটিতে যে রক্তঝরা ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা প্রমাণ করে - মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করা ইমানের অঙ্গ।
সাদা-কালো ক্যানভাসের বাইরে রক্তিম অধ্যায়
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়লে আমরা সাধারণত দুই ধরনের চিত্র দেখি। একদলে দেখি অস্ত্র হাতে গর্জে ওঠা মুক্তিযোদ্ধা, আর অন্যদলে দেখি পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দেশীয় দোসরদের। কিন্তু এই সাদা-কালো ক্যানভাসের বাইরেও এমন কিছু ধূসর ও রক্তিম অধ্যায় আছে, যা সচরাচর আমাদের আলোচনার টেবিলে আসে না। রামশহরের পীর পরিবারের আত্মত্যাগ সেই বিরল অধ্যায়গুলোর একটি, যা উল্টো স্রোতে হাঁটার সাহস দেখিয়েছিল। তারা প্রমাণ করেছিলেন, প্রকৃত সুফি সাধকের রক্ত কখনোই জালিমের সঙ্গে আপস করতে পারে না।
রামশহর দরবার শরীফ - জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র
বগুড়া শহর থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার উত্তরে, ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় ও বেহুলা-লখিন্দরের স্মৃতিবিজড়িত গোকুল ইউনিয়নের এক নিভৃত গ্রাম রামশহর। এই গ্রামেই অবস্থান বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিখ্যাত সেই পীর পরিবারের।
দরবারের গোড়াপত্তন ও ঐতিহ্য
সুফি সাধক ডা. কহর উল্লাহ (রহ.): এই দরবারের গোড়াপত্তন করেছিলেন সুফি সাধক ডা. কহর উল্লাহ (রহ.)। তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের জন্য এতটাই সুপরিচিত ছিলেন যে, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তৎকালীন বিদ্বান সমাজও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট ছিল।
জ্ঞানতাপস শহীদুল্লাহর পদধূলি: ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যখন বগুড়া আজীজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন, তখন তিনি নিয়মিত এই দরবারে আসতেন। জ্ঞানতাপস শহীদুল্লাহর পদধূলিধন্য এই বাড়িটি একাত্তরে হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের এক গোপন দুর্গ।
তসবিহ হাতে কেবল বসে থাকা নয়
ডা. কহর উল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেরা দরবারের হাল ধরেন। কিন্তু ১৯৭১ সাল যখন কড়া নাড়ল, তখন তাঁরা তসবিহ হাতে কেবল খানকায় বসে থাকাকেই ধর্ম মনে করেননি। পীর পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁরা বুঝেছিলেন, মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করাও ইমানের অঙ্গ।
পীর পরিবার যখন রণাঙ্গনের যোদ্ধা
পাকিস্তানি জান্তা এবং তাদের দেশীয় দোসররা যখন ধর্মের অপব্যবহার করে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছিল, তখন রামশহরের পীর পরিবারের এই সিদ্ধান্ত ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
পরিবারের চারজন সদস্য সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন:
শহীদ বেলায়েত হোসেনের ছেলে মাকসুদুর রহমান ঠান্ডু
ভাতিজা শহীদ আব্দুস সালাম লালু
জিল্লুর রহমান জলিল
ভাগ্নে তোফাজ্জল হোসেন জিন্নাহ
পীর বাড়ির ছেলেরা ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করছেন এই খবরটি পাকিস্তানি বাহিনী ও স্থানীয় রাজাকারদের জন্য হজম করা কঠিন ছিল। কারণ, তারা চেয়েছিল পীর-মাশায়েখদের ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। কিন্তু রামশহরের পীর পরিবার ওই ছকে পা দেয়নি। বরং তাদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, সুফিবাদের মূলধারা শোষকের সঙ্গে নয়, বরং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পক্ষে ছিল।
১৩ নভেম্বর ১৯৭১ - সেহরির ওয়াক্তে ইবলিসের আগমন
১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর, রমজান মাস। এই রাতটি ছিল পবিত্রতা, আত্মসংযম এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের। কিন্তু সেই পবিত্র রাতেই পীর পরিবারকে ঘিরে ধরেছিল নির্মমতা।
নিস্তব্ধতার মধ্যে বুটের শব্দ
গ্রামের আকাশ তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। চারদিক নিস্তব্ধ। রামশহর পীর বাড়িতে চলছে সেহরির প্রস্তুতি। পীর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা রোজা রাখার নিয়তে সেহরি খেতে বসেছেন। কেউ শেষ করছেন, কেউবা শেষ নলাটি মুখে তুলছেন। পবিত্র রমজানের সেই শেষ রাতে বাড়ির বাতাস ছিল শান্ত, আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্যে পূর্ণ।
হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসে বুটের শব্দ আর চিৎকার।
রাজাকার ও হানাদারদের ঘেরাও
স্থানীয় রাজাকার মওলানা আবু তাহের ও ওসমান গনির নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনা ঘিরে ফেলে পুরো পীর বাড়ি। তথাকথিত 'ইসলামের হেফাজতকারী' পাকিস্তানি বাহিনী পবিত্র রমজান মাসে, সেহরির ওয়াক্তে চড়াও হয় রোজাদারদের ওপর।
বাড়িতে ঢুকেই তারা চিৎকার করে খুঁজতে থাকে, “মুক্তিযোদ্ধারা কোথায়? বন্দুক কোথায়?”
অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া সাক্ষী
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যান সবাই। পীর সাহেবের ছোট ভাই মো. তবিবুর রহমান পরিস্থিতি বুঝে খাবার রেখেই প্রাচীর টপকে পালানোর চেষ্টা করেন। হানাদাররা তাকে লক্ষ্য করে পরপর তিনটি গুলি ছোড়ে। অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে যান এবং অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তিনিই পরবর্তীকালে এই রোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী হন।
নৃশংসতা ও অমানবিকতা - ১১ জনের মৃত্যু
তবিবুর রহমান পালিয়ে গেলেও পরিবারের বাকি সদস্যরা এত ভাগ্যবান ছিলেন না। পাকিস্তানি সেনারা পীর বাড়ির প্রতিটি ঘর তছনছ করে।
একে একে ধরে আনা হয় বাড়ির পুরুষ সদস্যদের। বাদ যায়নি প্রতিবেশীরাও। পীর সাহেব শহীদ বেলায়েত হোসেন, তার ভাই দবির উদ্দীন, হাবিবুর রহমান এবং সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোর জাহিদুর রহমান মুকুলসহ মোট ১১ জনকে পিঠমোড়া করে বেঁধে উঠানে দাঁড় করানো হয়।
তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কিশোর মুকুল, যে হয়তো তখনো জীবনের মানেই ঠিকমতো বোঝেনি, সে তার মাকে বাঁচাতে ঘরের ভেতর থেকে একটি বন্দুক বের করে এনে মায়ের পেছনে দাঁড়াতে চেয়েছিল। মায়ের সম্ভ্রম বাঁচাতে ছোট্ট শিশুর এই অসম সাহসী প্রচেষ্টাও নজর এড়ায়নি জল্লাদদের। কেড়ে নেওয়া হয় বন্দুক, তাকেও ঠেলে দেওয়া হয় মৃত্যুকূপের দিকে।
ততক্ষণে মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজান। "হাইয়্যা আলাল ফালাহ"—কল্যাণের দিকে এসো।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পীর বেলায়েত হোসেন হানাদারদের কাছে শেষ মিনতি করলেন:
“আজান হয়েছে, আমাকে অন্তত দুই রাকাত ফজরের নামাজ পড়ার সুযোগ দাও। আমি আমার রবের পায়ে সিজদা দিয়ে মরতে চাই।”
কিন্তু যারা ধর্মের নামে মানুষ মারে, তাদের কাছে ধর্মের কোনো মূল্য নেই। পাকিস্তানি জল্লাদরা সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। যে বাহিনী নিজেদের 'মুসলিম আর্মি' বলে দাবি করত, তারা একজন রোজাদার পীরকে ফজরের নামাজটুকুও পড়তে দেয়নি।
শাহাদাতের রক্তে ভেজা রামশহরের মাটি
আজান শেষ হওয়ার আগেই পীর বাড়ির পুকুর পাড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয় ১১ জন মানুষকে।
ডা. কহর উল্লাহর তিন ছেলে বেলায়েত, দবির ও হাবিবুর; নাতি সালাম, খলিলুর ও কিশোর মুকুল; এবং প্রতিবেশী আরও চারজন। মুহূর্তের মধ্যে গর্জে ওঠে অটোমেটিক মেশিনগান। ব্রাশফায়ারের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে রামশহরের মাটি। সেহরির পবিত্র মুহূর্তে ১১টি তাজা প্রাণ লুটিয়ে পড়ে পুকুর পাড়ের মাটিতে।
পুকুরের পানি আর ভোরের শিশিরভেজা ঘাস লাল হয়ে যায় শহীদের রক্তে। লাশগুলো ওভাবেই ফেলে রেখে উল্লাস করতে করতে চলে যায় হানাদাররা। তাদের এই জঘন্যতম অপরাধের দলিল হয়ে রইল সেই রক্তস্নাত পুকুরপাড়।
রামশহর গণহত্যার তাৎপর্য - দলিল ও শিক্ষা
রামশহর গণহত্যার এই ঘটনাটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি একটি জীবন্ত দলিল।

ইতিহাসের স্বীকৃতি: দশ খণ্ডের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষের নবম খণ্ডে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে। এটি প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ছিল বহুমুখী এবং পীর-মাশায়েখদের অনেকেই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন স্বাধীনতার জন্য।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, একাত্তরের যুদ্ধটা 'মুসলমান বনাম হিন্দু' বা 'পাকিস্তান বনাম ভারত' ছিল না। এটি ছিল ন্যায় বনাম অন্যায়ের যুদ্ধ, যেখানে জালিমের কোনো ধর্ম ছিল না। রামশহরের পীর পরিবার প্রমাণ করে গেছেন, প্রকৃত সুফি সাধকরা অন্যায়ের সাথে আপস করেন না, এমনকি বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়েও না।
দেওয়ানবাগী হুজুর দেখিয়েছিলেন রণাঙ্গনের বীরত্ব, মাইজভাণ্ডার ও সুরেশ্বর দরবার দেখিয়েছিল আশ্রয় ও লজিস্টিক সাপোর্ট আর রামশহরের পীর পরিবার দেখাল 'শাহাদাত' বা সর্বোচ্চ ত্যাগের চূড়ান্ত নিদর্শন। রোজাদার অবস্থায়, সেহরির দস্তরখান থেকে উঠে গিয়ে বুলেটের আঘাতে শহীদ হওয়া এর চেয়ে বড় আধ্যাত্মিক বিজয় আর কী হতে পারে?
ঋণের ভার ও জাতীয় স্মৃতি
আজকের গোকুল ইউনিয়নের রামশহর গ্রামে গেলে হয়তো সেই পুকুরটি দেখতে পাবেন, দেখতে পাবেন পীর বাড়ির কবরস্থান। প্রতি বছর ১৩ নভেম্বর সেখানে দোয়া মাহফিল হয়। কিন্তু আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ক্যানভাসে এই আত্মত্যাগের গল্পটি কি আমরা যথাযথ মর্যাদায় ঠাঁই দিতে পেরেছি?
শহীদ বেলায়েত হোসেন হয়তো সেদিন ফজরের নামাজ পড়তে পারেননি, কিন্তু তাঁর রক্ত দিয়ে তিনি বাংলার মাটিতে যে স্বাধীনতার জায়নামাজ বিছিয়ে দিয়ে গেছেন, সেই ঋণের ভার আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে অনন্তকাল।
রামশহরের সেই রক্তস্নাত ভোর আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই স্বাধীনতা কোনো আপসের ফসল নয়, এটি অর্জিত হয়েছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে; যে রক্তে মিশে আছে কৃষকের ঘাম, সাধারণ মানুষের অশ্রু আর সুফি সাধকের পবিত্র খুশবু। জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, এই বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কাহিনিগুলোকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রাখা।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















