মেজর এম এ জলিল – স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী? বিতর্ক ও সত্যের অনুসন্ধান
দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী দাবি করে আসছে যে, মেজর জলিল ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের "প্রথম রাজবন্দী"। তাদের দাবি অনুযায়ী, ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের সম্পদ ও অস্ত্র লুটের প্রতিবাদ করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ দলিলে এই দাবির সত্যতা কতটুকু? এটি কি নিছক একটি রাজনৈতিক বয়ান, নাকি এর পেছনে কোনো অকাট্য দালিলিক প্রমাণ আছে? সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু একটি সদ্য স্বাধীন দেশের অগ্রযাত্রার সূচনাতেই প্রশাসনিক পুনর্বাসন, ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, স্বাধীন দেশের সশস্ত্র বাহিনী গঠন এবং মিত্রবাহিনীর অবস্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছিল নানাবিধ জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জ। এই যুদ্ধোত্তর জটিল ঐতিহাসিক পটভূমিতে যেসব সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও আবেগঘন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট নাম ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ আব্দুল জলিল (মেজর এম এ জলিল)।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী দাবি করে আসছে যে, মেজর এম এ জলিল ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের "প্রথম রাজবন্দী"। তাঁদের প্রচলিত বয়ান অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ ভারতীয় মিত্রবাহিনী কর্তৃক ভারতে পাচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় এবং তীব্র প্রতিবাদ জানানোয় তাঁকে গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী করা হয়।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ দলিলে এই দাবির কতটুকু সত্যতা রয়েছে? এটি কি নিছক একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক বয়ান, নাকি এর পেছনে অকাট্য কোনো সামরিক ও প্রশাসনিক প্রমাণ আছে? ইতিহাস কোনো আবেগের সমাহার নয়; ইতিহাস প্রমাণের সমষ্টি। আজকের এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত পর্যালোচনায় আমরা মেজর এম এ জলিল-এর জীবন, মুক্তিযুদ্ধের অবদান, বিতর্কের উৎস, দালিলিক প্রমাণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করব।
কে ছিলেন মেজর এম এ জলিল?
ঐতিহাসিক বিতর্কের গভীরে প্রবেশের আগে ৯ নম্বর সেক্টরের এই বীর সেনানায়কের জীবন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অমূল্য অবদান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান: মেজর মোহাম্মদ আব্দুল জলিল ১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ওটরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও স্বাধীনচেতা জলিল শিক্ষা জীবনে অনন্য কৃতিত্বের পরিচয় দেন। পড়াশোনা শেষে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৬৬ সালে অফিসার ক্যাডার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। পাকিস্তান আর্মিতে কর্মরত থাকাকালীন তিনি সামরিক কৌশল, নিখুঁত নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতায় নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৭১ সালের সীমান্ত অতিক্রম ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান: ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, তখন মেজর জলিল পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন না; বরং তিনি ছুটি ও বিশেষ সামরিক প্রয়োজনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর তিনি এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে স্বজাতির অধিকার রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন এবং প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন।
৯ নম্বর সেক্টরের নেতৃত্ব ও সুন্দরবনের বীরত্ব
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশকে প্রশাসনিক ও সামরিক কৌশলের সুবিধার্থে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৯ নম্বর সেক্টর ছিল কৌশলগত ও ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল।
ভূখণ্ড ও এলাকা: খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং বিস্তীর্ণ সুন্দরবন এলাকা নিয়ে ৯ নম্বর সেক্টর গঠিত হয়।
গেরিলা যুদ্ধকৌশল: বিস্তীর্ণ নদীপ্রকৃতি ও সুন্দরবনের গহিন জঙ্গলকে কাজে লাগিয়ে সাউথ-ওয়েস্ট ফ্রন্টে গেরিলা যুদ্ধের এক অনন্য রণকৌশল তৈরি করেন মেজর জলিল। তাঁর অধীনস্থ জলনৌকা কমাণ্ডো ও গেরিলা যোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল করে দিয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিজয়: চালনা ও মংলা বন্দর মুক্ত করা, খুলনা অভিমুখে যৌথ বাহিনীর অগ্রযাত্রায় পথ সুগম করা এবং বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করতে মেজর জলিলের সামরিক নেতৃত্ব ছিল অসামান্য। তিনি কেবল একজন সামরিক কমান্ডারই ছিলেন না, একজন প্রখর সুবক্তা ও দূরদর্শী নেতা হিসেবেও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।
বিতর্কের উৎস "স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী"
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যেসব বয়ান রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা ও ঐতিহাসিক বিতর্কের ভিত্তি তৈরি করেছে, তার মধ্যে মেজর জলিলের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অন্যতম। একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রকাশনা এবং দলীয় বক্তৃতায় নিম্নোক্ত বিবরণটি প্রচার করে আসছে:
"স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী মেজর এম এ জলিল। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ মেজর এম এ জলিল ভোগ করতে পারেন নি। কারণ স্বাধীনতার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের সময়ে রেখে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ ভারতীয় সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যাওয়ার সময় বাঁধা প্রদান করলে সেই অপরাধে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ মেজর এম এ জলিলকে গ্রেফতার করা হয়।"
"ভারতীয় সেনাবাহিনী অস্ত্র শস্ত্র গোলা বারুদ লুটপাট ও খুলনা সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশের সম্পদ পাচারের তীব্র প্রতিবাদ করাই ছিল তাঁর অপরাধ ! তাঁকে ধরে প্রথমে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অবস্থিত সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁকে কার্যত নজরবন্দী করে রাখা হয়।"
তাঁদের দাবির মূল পয়েন্টগুলো হলো:
১. ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ ভারতে নিয়ে যাচ্ছিল।
২. মেজর জলিল খুলনা সীমান্ত দিয়ে দেশের সম্পদ পাচারের তীব্র প্রতিবাদ করেন।
৩. এই প্রতিবাদের কারণেই ভারতীয় বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং রেসকোর্স ময়দানের সেনা ক্যাম্পে নজরবন্দী করে।
এই দাবির ঐতিহাসিক অসংগতি
এই দাবিগুলোর বিপরীতে নির্ভরযোগ্য কোনো দালিলিক প্রমাণ (যেমন: সমসাময়িক সংবাদপত্র, সরকারি গেজেট বা আন্তর্জাতিক নথি) পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক তথ্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবির পেছনে অনেকগুলো ফাঁক রয়েছে। প্রথমত, ১৬ ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশে প্রশাসনিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে অস্থায়ী সরকারের হাতে অর্পিত হচ্ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) এবং ভারতীয় বাহিনীর মধ্যে নির্দিষ্ট প্রটোকল ছিল। একজন সেক্টর কমান্ডারকে ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি গ্রেপ্তার করবে এমন ঘটনা প্রশাসনিকভাবে অসম্ভব ছিল। আর এ ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার বা তৎকালীন সেনাপ্রধান নীরব থাকবেন এমনটি হওয়া প্রায় অসম্ভব।
মিত্রবাহিনী হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে ছিল এবং তারা ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ফিরে যায়। এই সময়ের মধ্যে তারা কোনো বাংলাদেশি উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে এমন কোনো রেকর্ড জাতিসংঘ বা রেডক্রসের দলিলেও নেই।
ঐতিহাসিক দালিলিক ব্যবচ্ছেদ: দাবি বনাম প্রশাসনিক ও সামরিক বাস্তবতা
ইতিহাসের ছাত্র ও গবেষকদের জন্য যেকোনো রাজনৈতিক বয়ান গ্রহণের আগে তার সমসাময়িক গেজেট, সরকারি রেকর্ড, চেইন অফ কমান্ড এবং আন্তর্জাতিক আইন যাচাই করা বাধ্যতামূলক। উক্ত দাবিটি বিশ্লেষণ করলে বেশ কয়েকটি মারাত্মক প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক অসংগতি সামনে আসে।
যৌথ কমান্ড ও চেইন অফ কমান্ডের বাস্তবতা: ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর 'বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড' (Joint Command) গঠিত হয়। এই কমান্ডের অধীনেই মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী একযোগে যুদ্ধ পরিচালনা করে।
প্রশাসনিক এখতিয়ার: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও সামরিক কর্তৃত্ব অর্পিত ছিল অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ) হাতে। সেই সঙ্গে মুক্তিসেনাদের সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী।
গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নিয়ম: একজন কর্মরত সেক্টর কমান্ডার বা সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসারকে মিত্রবাহিনীর (ভারতীয় সেনা) কোনো সদস্য বা কমান্ডার সরাসরি গ্রেপ্তার করবে সামরিক আইন ও তৎকালীন প্রশাসনিক প্রটোকল অনুযায়ী তা অসম্ভব। কোনো সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ উঠলে তা মীমাংসা করার এখতিয়ার ছিল কেবল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দফতর এবং প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর।

৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর প্রকৃত ঘটনা
মেজর জলিলকে কেন্দ্র করে ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়, তবে ঘটনাটির রূপায়ণ ও ব্যাখ্যাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূল ঘটনাটি বুঝতে হলে সেই সময়ের খুলনা-বরিশাল অঞ্চলের পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। ইতিহাসের নথিপত্র ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী গবেষকদের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে কিছু অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও সামরিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল।
অস্ত্র সমর্পণ ও সামরিক বিশৃঙ্খলা: ১৬ ডিসেম্বরের পর খুলনার কিছু এলাকায় যুদ্ধ থামতে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণে কয়েকদিন সময় লেগে যায়। খুলনা মুক্ত হওয়ার পর সেখানে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। একই সাথে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অবাঞ্ছিত উপাদান এবং অনিয়মিত বাহিনীর হাতে অস্ত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশ সামরিক সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ ছিল সমস্ত পরিত্যক্ত অস্ত্র ও সামরিক সম্পদ তালিকাভুক্ত করে কেন্দ্রীয় কমান্ডের নিকট হস্তান্তর করা। কিন্তু ৯ নম্বর সেক্টরের স্থানীয় কমান্ড এবং কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশনার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়।
চেইন অফ কমান্ড লঙ্ঘন: সেনাবাহিনী একটি অত্যন্ত কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ বা আবেগ অপেক্ষা "চেইন অব কমান্ড" সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তৎকালীন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, মেজর জলিল স্থানীয়ভাবে কিছু সামরিক সরঞ্জাম আটক ও সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলেন যা সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টারের নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল।
এছাড়া, যুদ্ধোত্তর খুলনা ও বরিশালের স্থানীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সামরিক কমান্ডের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে তৎকালীন বাংলাদেশ বাহিনী প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী সামরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে মেজর জলিলকে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য ঢাকায় তলব করেন।
হেফাজতে নেওয়া বা তলব: কোনো সেনা কর্মকর্তা যদি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করেন বা সামরিক সীমানা অতিক্রম করেন, তবে তাঁকে সামরিক শৃঙ্খলার স্বার্থে আভিযানিক কার্যালয়ে তলব করা বা হেফাজতে নেওয়া সেনাবাহিনীর একটি স্বাভাবিক নিয়ম। এটি ছিল সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও ডিসিপ্লিনারি বিষয়, ভারতের কোনো স্বাধীন স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নয়।
ঢাকায় আসার পর মেজর জলিলকে সামরিক নীতি অনুযায়ী ঢাকা সেনানিবাস/রেসকোর্স সংলগ্ন বাংলাদেশ বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে রাখা হয়। এটি কোনো বেসামরিক রাজনৈতিক গ্রেপ্তার বা "রাজবন্দী" করার ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীন ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিংস বা প্রশাসনিক বিষয়। তাকে কোনো ফৌজদারি মামলায় পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানো হয়নি, কিংবা তৎকালীন আইন অনুযায়ী রাজবন্দী হিসেবে গেজেটভুক্তও করা হয়নি।
মেজর জলিল কি সত্যিই প্রথম 'রাজবন্দী' ছিলেন?
যে শব্দটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি ছড়ানো হয় তা হলো "রাজবন্দী" (Political Prisoner)। একজন নাগরিক বা নেতাকে কখন রাজবন্দী বলা যায়, তার সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি রয়েছে।
রাষ্ট্র যখন কোনো নাগরিককে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে বিনাবিচারে আটকে রাখে, তখন তাকে রাজবন্দী বা রাজনৈতিক বন্দী বলা হয়। কোনো ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রীয় বেসামরিক প্রশাসনিক আইনে (যেমন: বিশেষ ক্ষমতা আইন বা নিরাপত্তা আইন) বিনা বিচারে অবরুদ্ধ থাকেন, তবে তাকে রাজনৈতিক বন্দী বা রাজবন্দী গণ্য করা হয়।
৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে মেজর জলিল কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত সামরিক কর্মকর্তা (Active Military Officer)।
একটি দেশের সামরিক বাহিনীতে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা যদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেন বা সামরিক আইন ভঙ্গ করেন, তবে তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে "সামরিক আইন বা শৃঙ্খলাভঙ্গ" (Breach of Military Discipline) বলা হয়, কখনোই "রাজবন্দীত্ব" বলা যায় না। সামরিক আইনের বিচারে কোনো সেনা কর্মকর্তাকে রাজবন্দী বলার সুযোগ সংবিধানে বা সামরিক আইনে নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যাবর্তন ও মুক্তি
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর রাষ্ট্রীয় সমস্ত কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। মেজর জলিলের সামরিক বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয় এবং তাকে সমস্ত সামরিক সম্মান বজায় রেখে সেনাবাহিনী থেকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অবসরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
যদি তিনি সত্যিই সরকারের দৃষ্টিতে শত্রুভাবাপন্ন বা অপরাধী হতেন, তবে তাকে সেনাবাহিনী থেকে কোর্ট মার্শাল করে শাস্তি দেওয়া হতো অথবা বেসামরিক কারাগারে দীর্ঘকাল আটকে রাখা হতো। কিন্তু তা করা হয়নি। ১৯৭২ সালের মে মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ভারতীয় বাহিনী ও সম্পদ পাচারের অভিযোগের বাস্তবতা কী?
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মিত্রবাহিনী বা ভারতীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা রয়েছে। তবে মেজর জলিলকে আটক করার সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে কোনো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় দলিল "অস্ত্র লুটপাটের প্রতিবাদ" হিসেবে চিহ্নিত করেনি।
মেজর জলিল বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিন্দুতে রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক অস্ত্র ও সম্পদ পাচারের অভিযোগ। এই সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যগুলোর নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।
পাকিস্তান বাহিনীর পরিত্যক্ত অস্ত্র ও প্রটোকল: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিশাল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, ট্যাংক, কামান ও সামরিক যানবাহন যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।
তৎকালীন আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন এবং ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের সমঝোতা অনুযায়ী, পরাজিত শত্রু সৈন্যের পরিত্যক্ত অস্ত্রাগার ও সামরিক সরঞ্জাম যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করার নীতি গৃহীত হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে এবং ভারত সহ মিত্র বাহিনীর উপস্থিতিতে Bangladesh স্বাধীন হয়েছিল। এই সময় পাকিস্তানি বাহিনীর প্রচুর অস্ত্র, গোলাবারুদ, গাড়ি ইত্যাদি ছিল যা মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ সরকার গ্রহণের দায়িত্ব ছিল।
কিছু মুক্তিযোদ্ধা এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন লেখক/স্মৃতিকথায় এটা উল্লেখ আছে যে যুদ্ধের পর কিছু অস্ত্র, গোলাবারুদ, গাড়ি ইত্যাদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিকৃত বা অন্যদিকে চলে গিয়েছিল এবং কিছু অংশ বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা বা সরকার পুনরুদ্ধার করতে পারেছিল।
কিছু মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্মৃতিকথা ও পক্ষপাতদুষ্ট লেখা দাবি করে যে কিছু ভারতীয় সৈন্য বা বাহিনী সদস্য অবশিষ্ট সামরিক সরঞ্জাম নিয়েছিল কিন্তু এইসব দাবির ব্যাপক ঐতিহাসিক প্রমাণ বা বিদেশী/সরকারি নথি দিয়ে প্রমাণিত সত্য হিসেবেও স্বীকৃতি নেই এবং অনেকটাই একাধিক ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামত বা অভিজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাসে ভারতের বাহিনীকে “পাচার” বা “লুটপাট” হিসাবে স্বীকৃতভাবে বর্ণিত করা হয়নি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সূচনা: এই পরিত্যক্ত অস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সশস্ত্র বাহিনী (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী) এবং র রক্ষী বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সাজসজ্জা শুরু করা হয়েছিল।
সংক্ষেপে প্রপাগান্ডা বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা
নিচে প্রচারিত রাজনৈতিক বয়ান এবং দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে বাস্তবতার একটি সুনির্দিষ্ট তুলনামূলক সারণী দেওয়া হলো:
প্রসংগ / সূচক | প্রচারিত রাজনৈতিক বয়ান (গুজব/মিথ) | ঐতিহাসিক দালিলিক বাস্তবতা (প্রমাণিত সত্য) |
গ্রেপ্তারকারী সংস্থা | সরাসরি ভারতীয় সেনাবাহিনী (মিত্রবাহিনী)। | বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অফ কমান্ড ও সেনাসদর। |
গ্রেপ্তারের প্রধান কারণ | ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক অস্ত্র ও সম্পদ পাচারের একক প্রতিবাদ। | যুদ্ধোত্তর খুলনা অঞ্চলে সেনাসদরের আদেশ লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক ডিসিপ্লিনারি ইস্যু। |
আইনি পদবী / স্থিতি | "স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী"। | একজন কর্মরত সামরিক কর্মকর্তার সাময়িক প্রশাসনিক কাস্টডি/নজরবন্দী। |
বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা | ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফিরে তাঁকে মুক্তি দেন। | ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে এসে তাঁকে অব্যাহতি দেন এবং সামরিক বাহিনী থেকে অবসর মঞ্জুর করেন। |
আন্তর্জাতিক ও সরকারি দলিল | ভারতবিরোধী বয়ান হিসেবে জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত। | হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত 'মুক্তিযুদ্ধ দলিলপত্র' বা তৎকালীন গেজেটে কোনো 'রাজবন্দী' রেকর্ড নেই। |
পরবর্তী রাজনৈতিক পরিচয় | আজীবন অবহেলিত ও নিপীড়িত ভিকটিম। | জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষভাগে উত্থান। |
সামরিক পোশাক থেকে রাজপথ: জাসদ গঠন ও প্রকৃত রাজবন্দী অধ্যায়
মেজর জলিলকে কেন "রাজবন্দী" বানানোর রাজনৈতিক চেষ্টা চলে, তা বুঝতে হলে ১৯৭১ পরবর্তী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের রূপান্তর অনুধাবন করা জরুরি। মূলত ১৯৭২ সালের পর থেকে তাঁর যে রাজনৈতিক কারাবরণ শুরু হয়, তাকেই পরে অস্পষ্ট করে ১৯৭১ সালের প্রাক্কালে নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল দেখা যায়।
১৯৭২ সালের মুক্তি ও সেনাবাহিনী থেকে অবসর: ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশের প্রশাসনিক ও সামরিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে মেজর জলিলকে সেনানিবাসের কাস্টডি থেকে মুক্ত করা হয়। তবে তৎকালীন সরকার এবং সেনা সদরদপ্তরের সাথে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের কারণে তিনি সেনাবাহিনীতে আর ফেরত যাননি। ১৯৭২ সালেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন: সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়ার পর মেজর জলিল চরম বামপন্থী ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী যুবনেতাদের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭২ সালের৩১ অক্টোবর সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ প্রমুখের উদ্যোগে গঠিত হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।
মেজর এম এ জলিলকে নবগঠিত জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিবন্ধিত ও সংগঠিত বিরোধী দলের এক নম্বর নেতা হিসেবে রাজনৈতিক মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেন।
সরকারবিরোধী আন্দোলন ও 'প্রকৃত' রাজবন্দিত্ব: ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদ তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র রাজপথের আন্দোলন গড়ে তোলে। জাসদের সশস্ত্র শাখা 'গণবাহিনী' এবং রাজনৈতিক শাখা দেশব্যাপী ব্যাপক অস্থিরতা ও বিপ্লবী বার্তা ছড়াতে শুরু করে। জাসদের একের পর এক সহিংস আন্দোলন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও এবং রাজনৈতিক র্যালির কারণে তৎকালীন সরকার কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এই রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রাজনৈতিক প্রতিরোধ আইনের অধীনে মেজর জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই সময়টিতেই (১৯৭৩-১৯৭৫) তিনি একজন প্রকৃত রাজনৈতিক বন্দী বা 'রাজবন্দী' হিসেবে কারাগারে দিন কাটান। কিন্তু ইতিহাসকে পরবর্তীতে বিকৃত করে ১৯৭৪ সালের রাজনৈতিক গ্রেপ্তারকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সামরিক ঘটনার সাথে মিলিয়ে ফেলা হয়।
১৯৭৫-এর প্রেক্ষাপট ও জিয়াউর রহমান আমল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশে এক চরম অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরের নাটকীয় সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান।
৭ নভেম্বরের তথাকথিত "সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে" জাসদ এবং এর সামরিক শাখা (কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন গণবাহিনী) মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার পর জাসদ নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন।
১. মেজর জলিল ও কর্নেল তাহের সহ জাসদের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
২. ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারকার্য পরিচালনা করা হয়।
৩. এই বিচারে কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং মেজর জলিলকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
৪. পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান সরকারের শেষভাগে বা এর কিছু পর তিনি মুক্তি লাভ করেন।
বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল (১৯৭৬): তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জাসদ নেতাদের বিচার করা হয়। এই বিচারে কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং জাসদ সভাপতি হিসেবে মেজর জলিলকে দেওয়া হয় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড (যা পরবর্তীতে কমিয়ে আনা হয়)।
মুক্তি লাভ: বহু বছর কারাবাসের পর ১৯৮০ সালে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিকট থেকে মার্সি/সাধারণ ক্ষমার অধীনে কারামুক্ত হন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মেজর জলিলের জীবনের দীর্ঘ বন্দিত্ব ও নির্যাতন মূলত জাসদের রাজনীতি এবং পরবর্তী সামরিক সরকারগুলোর সাথেই সম্পর্কিত ছিল, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের তাৎক্ষণিক ফলাফলের অংশ ছিল না।
বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র থেকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’
মেজর এম এ জলিলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো তাঁর ধারণাগত ও আদর্শিক বিবর্তন। একজন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা থেকে মুক্তিসেনানি, সেখান থেকে বামপন্থী বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পতাকাবাহী এবং সর্বশেষে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের অনুসারী তাঁর জীবনের গতিপথ ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনে প্রত্যাবর্তন: ১৯৮০-র দশকে জেল থেকে বের হওয়ার পর মেজর জলিল জাসদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে সম্পূর্ণ সরে আসেন। তিনি অনুভব করেন যে, বাংলাদেশের জনমিতি, সংস্কৃতি ও চেতনার মূল শক্তি নিহিত রয়েছে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূলবোধের সমন্বয়ে।
জাতীয় মুক্তি আন্দোলন গঠন: ১৯৮৪ সালে তিনি 'জাতীয় মুক্তি আন্দোলন' নামে# ইতিহাস, রাজনীতি ও ঐতিহাসিক সত্য: মেজর এম এ জলিল এবং "প্রথম রাজবন্দী" বিতর্কের নির্মোহ বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যেমন শৌর্য ও আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল, তেমনি স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের রাজনীতি বিভিন্ন বিতর্ক, মতামত ও রাজনৈতিক মেরুকরণে মুখরিত। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও অকুতোভয় সেক্টর কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ আব্দুল জলিলকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিতর্কটি এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক আলোচনায় একটি তথ্য বেশ জোর দিয়ে প্রচার করা হয় মেজর এম এ জলিল ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের "প্রথম রাজবন্দী"।
এই দাবিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের সামরিক সম্পদ ও অস্ত্র ভারতে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বাধা প্রদান করেন, যার খেসারত হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ করা হয়।
কিন্তু ইতিহাসের তথ্য প্রমাণ, সামরিক শৃঙ্খলা বিধি, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দালিলিক প্রমাণাদি কী বলে? এটি কি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা ও ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা? নির্মোহ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, নথি যাচাই এবং ঘটনাপরম্পরা পর্যালোচনার মাধ্যমে এই বহুল আলোচিত প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর উন্মোচন করা প্রয়োজন।
'সীমাহীন সময়' থেকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন
মেজর এম এ জলিল কেবল অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করা একজন বীর সৈনিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন চিন্তাচ্ছন্ন লেখক, প্রথাবিরোধী রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দার্শনিক ভাবনায় সমৃদ্ধ একজন দূরদর্শী মানুষ। তার লিখিত বইসমূহ পাঠ করলে তার চিন্তা ও আদর্শিক পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট মানচিত্র পাওয়া যায়।
লেখক মেজর জলিল: তার লেখা অন্যতম বিখ্যাত বই "সীমাহীন সময়"। এই গ্রন্থে তিনি তার যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা, স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে তার স্বপ্ন এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামরিক সংকটের এক বস্তুনিষ্ঠ ও আবেগপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন। এছাড়াও তার লিখিত 'অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা', 'বাংলাদেশ কোন পথে', 'জাতির মূল চেতনা' ইত্যাদি গ্রন্থগুলো তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
বামপন্থী সমাজতন্ত্র থেকে ইসলামী রাজনীতি
মেজর জলিলের রাজনৈতিক জীবনকে দুটি স্পষ্ট অধ্যায়ে ভাগ করা যায়:
জীবনের শেষভাগে এসে মেজর জলিল অনুধাবন করেন যে, বাংলাদেশের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ও ঐতিহ্যমুখী সমাজের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতন্ত্র বা চরম বামপন্থী বিপ্লব উপযোগী নয়। তিনি জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রাজনীতি ত্যাগ করেন এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন।
তিনি গঠন করেন 'জাতীয় মুক্তি আন্দোলন' নামের একটি রাজনৈতিক দল। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী চেতনা ও জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এই সময় তিনি ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেন এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। ১৯৮৯ সালের ১৯ নভেম্বর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এক আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান বীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কেন এই অপপ্রচারের কাল্পনিক বয়ান তৈরি করা হয়?
ইতিহাসের কোনো ঘটনা যখন দালিলিক প্রমাণ ছাড়া ভুলভাবে প্রচারিত হয়, তখন বুঝতে হবে তার পেছনে কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। মেজর জলিলকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বরেই "প্রথম রাজবন্দী" বানানোর অপপ্রচারের পেছনে প্রধান দুটি কৌশলগত উদ্দেশ্য লক্ষ্য করা যায়:
যৌথ বাহিনীর ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত মুক্তিকামী বাঙালি এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টার এক অনন্য বিজয়। কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যারা শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে চিরতরে শত্রুভাবাপন্ন করতে চেয়েছিল, তারা এই "অস্ত্র লুটপাট ও ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক সেক্টর কমান্ডার গ্রেপ্তার"-এর গল্প ফেঁদেছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয় যৌথ বাহিনীর সাহায্যকে "দখলদারিত্ব" হিসেবে উপস্থাপন করা এবং যৌথ বিজয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খর্ব করা।
মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি: এই বয়ানের মাধ্যমে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করা হয় একদিকে "সরকার ও সেনাবাহিনী", অন্যদিকে "জাতীয় বীর ও দেশপ্রেমিক সেক্টর কমান্ডার"। মেজর জলিলের মতো একজন বীর এবং খাঁটি দেশপ্রেমিককে ভিকটিম (Victim) বা বলির পাঠা বানিয়ে তৎকালীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ও যৌথ কমান্ডকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, অভ্যন্তরীণ সামরিক শৃঙ্খলার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক নাটকে রূপান্তর করা হয়েছে।
ইতিহাস চেতনা ও বীরের সঠিক মূল্যায়ন
ইতিহাসের আসল সত্যকে আড়াল করে বা কৃত্রিমভাবে কোনো রাজনৈতিক তকমা পরিয়ে কোনো বীরকে বড় করা যায় না; বরং এতে তার প্রকৃত অবদানই খাটো হয়ে যায়। মেজর মোহাম্মদ আব্দুল জলিল ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন প্রকৃত নায়ক।
কেন মেজর জলিল চিরস্মরণীয়?
মেধা ও সাহসিকতা: পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া তার অনন্য দেশপ্রেমের প্রমাণ।
৯ নম্বর সেক্টরের সফল নেতৃত্ব: সুন্দরবনের নদীঘেরা অববান্ধব পরিবেশে ৯ নম্বর সেক্টরকে সফলভাবে সংগঠিত করা এবং খুলনা-বরিশাল মুক্ত করা তার অসাধারণ সামরিক মেধার পরিচয় দেয়।
সত্যে অটল থাকার সাহস: সামরিক জীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবনে যা সত্য মনে করেছেন, তার জন্য লড়াই করেছেন; তা জাসদ আমলেই হোক কিংবা জীবনের শেষভাগে ইসলামী রাজনীতির সময়ই হোক।
তাকে "স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী" হিসেবে প্রমাণের জন্য ১৯৭১ সালের একটি মিথ্যা ও অপ্রমাণিত কাহিনীর ওপর নির্ভর করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ পরবর্তীতে তিনি স্বৈরাচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই করেই একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। তার এই রাজনৈতিক কারাবাসই তাকে ইতিহাসে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, ১৯৭১ সালের কোনো বানানো গল্পের প্রয়োজন তার নেই।
একটি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে এসে আজ আমাদের আবেগ ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের ঊর্ধ্বে উঠে দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিহাসচর্চা করা আবশ্যক। মেজর এম এ জলিল সম্পর্কে যে তথ্য প্রচার করা হয়, তা নিছকই একটি রাজনৈতিক 'মিথ' বা কাল্পনিক কাহিনী।
৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ যা ঘটেছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ কমান্ড ও শৃঙ্খলার বিষয়, ভারতের কোনো হস্তক্ষেপ বা রাজনৈতিক রাজবন্দী করার ঘটনা নয়।
মেজর জলিলের স্মৃতি, তার রণকৌশল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির উন্মেষ পর্বে তার আপসহীন ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে। একজন সচেতন ও ঐতিহাসিক সত্যে বিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক মূল্যায়ন করা এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের যেকোনো ধরনের বিকৃতিকে নির্মোহভাবে প্রতিরোধ করা।















