বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হায়দার - ভারতের দোসর অপবাদে হত্যা করা হয়েছে যাকে
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। চারদিকে বিজয়ের আনন্দ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক আয়োজন। সেই মঞ্চে জ্যাকেট পরা এক সৌম্য যুবককে দেখা যায়, যিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আত্মসমর্পণ মঞ্চে নিয়ে আসছেন। তিনি আর কেউ নন, বাঙালির গর্ব, অকুতোভয় গেরিলা কমান্ডার মেজর এ.টি.এম. হায়দার। যিনি কেবল যুদ্ধই করেননি, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের টেলিভিশন ও রেডিয়োতে যার কণ্ঠস্বর প্রথমবার জীবন্ত হয়ে উঠেছিল বিজয়ের বার্তা নিয়ে।

TruthBangla
Dec 18, 2025
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। চারদিকে বিজয়ের আনন্দ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক আয়োজন। সেই মঞ্চে জ্যাকেট পরা এক সৌম্য যুবককে দেখা যায়, যিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আত্মসমর্পণ মঞ্চে নিয়ে আসছেন। তিনি আর কেউ নন, বাঙালির গর্ব, অকুতোভয় গেরিলা কমান্ডার মেজর এ.টি.এম. হায়দার। যিনি কেবল যুদ্ধই করেননি, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের টেলিভিশন ও রেডিয়োতে যার কণ্ঠস্বর প্রথমবার জীবন্ত হয়ে উঠেছিল বিজয়ের বার্তা নিয়ে। অথচ ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পরিহাস, যে স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের জন্য তিনি একাত্তরে নিজের কেশাগ্র স্পর্শ করতে দেননি পাকিস্তানি বাহিনীকে, সেই স্বাধীন দেশেই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল নিজ দেশেরই কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে।
শৈশব ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা
আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার, যিনি আমাদের কাছে মেজর হায়দার নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতা শহরের ভবানীপুরে তাঁর জন্ম। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর আদিবাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলায়। তাঁর পিতা মো. ইসরাইল মিয়া এবং মাতা হাকিমুন্নেসা।
মেজর হায়দারের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। পাবনা জেলার বীণাপানি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাইস্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ১৯৬১ সালে গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৬৩ সালে লাহোর ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার নেশায় তিনি লাহোরের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে পরিসংখ্যানে এমএসসি প্রথম পর্ব শেষ করেন। ঠিক তখনই সামরিক বাহিনীতে অফিসার পদে মনোনীত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়।
কমান্ডো প্রশিক্ষণ ও কমান্ডিং প্রতিভা
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন হায়দার। তিনি মূলত গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার হলেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল গেরিলা ও কমান্ডো যুদ্ধের প্রতি। চেরাটে স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (SSG) ট্রেনিংয়ে তিনি অসামান্য কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।
কমান্ডো ট্রেনিংয়ে সে সময় ৩৬০ জন অফিসারের মধ্যে মাত্র দুইজন বাঙালি ছিলেন, যার একজন ছিলেন হায়দার। এই বিশেষ প্রশিক্ষণই তাঁকে পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেরা গেরিলা কমান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের মুলতান ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। এরপর ক্যাপ্টেন হিসেবে তাঁকে কুমিল্লা সেনানিবাসে পাঠানো হয় এবং ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে বদলি করা হয় ঢাকায়।
একাত্তরের প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সেক্টর-২ এর নেতৃত্ব
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাসে ছিলেন। ২৭ মার্চ তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে সেনানিবাস ত্যাগ করেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে যুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মুসল্লী রেলওয়ে সেতুটি উড়িয়ে দেন, যা পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তীতে তিনি মেলাঘরে ২ নম্বর সেক্টরের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড নিযুক্ত হন। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি ছাত্রদের নিয়ে একটি দুর্ধর্ষ গেরিলা কোম্পানি গঠন করেন। তাঁর হাতে সরাসরি প্রশিক্ষণ নেওয়া এই গেরিলারা অবরুদ্ধ ঢাকা শহরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বিখ্যাত 'ক্র্যাক প্লাটুন' থেকে শুরু করে ঢাকার ভেতরে পরিচালিত প্রায় প্রতিটি বড় গেরিলা অপারেশনের নেপথ্যে ছিল মেজর হায়দারের সুনিপুণ পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ।
১৬ ডিসেম্বর - বিজয়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময় মেজর হায়দার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। তিনি জানতেন, বিজয়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রচারমাধ্যমের গুরুত্ব কতটুকু।
ভারতীয়দের আগেই রেডিয়ো-টেলিভিশন দখল
মেজর হায়দার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আগেই তাঁর সেক্টরের একদল গেরিলা যোদ্ধাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকা রেডিয়ো ও টেলিভিশন ভবন ঘিরে ফেলার জন্য। তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা যেন কোনো বিদেশি বা ভারতীয় সেনানায়ক না দেন; এই গৌরব যেন কেবল বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদেরই থাকে।
বিশ্ববাসীকে জানালেন স্বাধীন বাংলাদেশের খবর
নিয়াজির স্বাক্ষরের পর বাকি আনুষ্ঠানিকতা ফেলে রেখে হায়দার ছুটে যান রেডিয়ো ও টেলিভিশন ভবনে। তিনিই আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত সংবাদ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রচারমাধ্যমে যাঁর ছবি ও কণ্ঠ প্রথমবার বিশ্ববাসী দেখেছিল, তিনি ছিলেন এই বীর উত্তম মেজর হায়দার। (এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় হাবিবুল আলম বীর প্রতীকের লেখা 'Brave of Heart' বইটিতে)।
১৯৭৫-এর কালো অধ্যায় ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড
১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস। সদ্য স্বাধীন হওয়া চার বছরের কিশোর দেশটির ভাগ্য তখন দোদুল্যমান। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর ভেতরে পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থানের ঘনঘটা। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান সফল হলেও ৭ নভেম্বরের পাল্টা বিদ্রোহ বা তথাকথিত ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বদলে দেয় সব দৃশ্যপট। সেই বিশৃঙ্খল ভোরের আলো ফোটার আগেই বাংলাদেশের আকাশ থেকে খসে পড়ে তিনটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। বীরত্ব যাঁদের ললাটে জয়টিকা পরিয়েছিল, যড়যন্ত্রের বুলেট তাঁদের বুক ঝাঁঝরা করে দিল ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টের চত্বরে।
হায়দারের ঢাকা আগমন
১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর। কর্নেল এ টি এম হায়দার তখন কর্মরত ছিলেন বান্দরবানের রামুতে। পারিবারিক এক জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। হায়দার ছিলেন সেই কিংবদন্তি গেরিলা কমান্ডার, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মেলাঘর ক্যাম্পে হাজার হাজার ক্র্যাক প্লাটুন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
ঢাকায় পৌঁছে হায়দার দুপুরবেলা দেখা করেন তাঁর প্রিয় নেতা জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে। এরপর সেনাবাহিনীর পুরনো বন্ধুদের সাথে কিছু সময় কাটান। তিনি জানতেন না, ঢাকার বাতাস তখন ষড়যন্ত্রের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে।
সন্ধ্যাবেলা তাঁর যোগাযোগ হয় নতুন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের সাথে। খালেদ ছিলেন হায়দারের প্রিয় সেক্টর কমান্ডার। দেশের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে হায়দার চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি বঙ্গভবনে গেলেন খালেদের সাথে, উদ্দেশ্য ছিল চলমান অরাজকতা থামানো এবং একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী ও দেশ নিশ্চিত করা।
৭ নভেম্বরের বিশৃঙ্খলা ও শেরেবাংলা নগরের পথে
৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকেই ঢাকার সেনানিবাসে এক ভয়াবহ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। জাসদ সমর্থিত গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উস্কানিতে সাধারণ সৈনিকদের একটি অংশ বিদ্রোহ করে বসে। তারা ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই’ স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমে আসে এবং কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে খালেদ মোশাররফ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। ৭ নভেম্বর ভোরের দিকে তিনি কর্নেল নাজমুল হুদা এবং কর্নেল হায়দারকে নিয়ে বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। প্রথমে তারা গিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের বাসায়, কিন্তু সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় তারা সিদ্ধান্ত নেন শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টে যাওয়ার জন্য।
১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টে আগমন
ভোর রাত ৩টা নাগাদ তারা ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টে পৌঁছান। এই রেজিমেন্টটি ছিল খালেদ মোশাররফের অত্যন্ত আপন, কারণ এর অফিসার ও সৈনিকদের অনেকের সাথেই তাঁর যুদ্ধের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার কর্নেল নওয়াজিস তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। কিন্তু ততক্ষণে ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প ১০ বেঙ্গলের সাধারণ সিপাহিদের মগজেও ঢুকে পড়েছে।
১০ বেঙ্গলের অফিসার মেসে অবস্থান করছিলেন খালেদ, হুদা ও হায়দার। ভোরের আলো ফুটতেই রেজিমেন্টের ভেতরে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গুজব রটানো হয়েছিল যে, খালেদ মোশাররফ ভারতের দালাল এবং তিনি সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করতে চান।
বিচার চাইল হাবিলদার
একদল উত্তেজিত সৈন্য অস্ত্র হাতে মেসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন একজন হাবিলদার। তারা চিৎকার দিয়ে জেনারেল খালেদকে বলল- "আমরা তোমার বিচার চাই"!
জেনারেল খালেদ শান্তকণ্ঠে জবাব দিলেন," ঠিক আছে , তোমরা আমার বিচার করো। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।"
স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বাগিয়ে হাবিলদার চিৎকার করে বললো-"আমরা এখানেই তোমার বিচার করবো।"
ধীর স্থির জেনারেল খালেদ বললেন, " ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার করো"
খালেদ দু'হাত দিয়ে তার মুখ ঢাকলেন।
একটি ব্রাস ফায়ার।
পরক্ষণেই স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা হয়ে গেল বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমরনায়কের বুক। মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল খালেদ মোশাররফ। যে মাথায় বীর উত্তমের শিরোপা ছিল, যে মাথার বাম পাশে ছিল পাকিস্তানি কামানের গোলার ক্ষতচিহ্ন, সেই ললাট নুয়ে পড়ল ১০ বেঙ্গলের মেঝেতে।
কর্নেল হুদা ও হায়দারের মর্মান্তিক পরিণতি
খালেদ মোশাররফের সাথে সাথেই গুলিতে প্রাণ হারান কর্নেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম। তিনি ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এবং ৮ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। কামরার ভেতরেই নিথর হয়ে পড়ে থাকে তাঁর দেহ।
কর্নেল এ টি এম হায়দার বারান্দা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সিপাহিরা তাঁকে ঘিরে ধরে। উত্তেজিত সিপাহিরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় পৈশাচিক উল্লাস। তাঁকে কিল, ঘুষি ও লাথি মারতে মারতে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে আনা হয়।
যে হায়দার নয় মাস নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন বাঙালির মুক্তির জন্য, সেই হায়দারকে তাঁরই পালিত সৈনিকরা রাস্তার ওপর ফেলে গুলি করে হত্যা করে। বীরত্বের অমর গাথা রক্তে রঞ্জিত হয়ে মাটিতে মিশে যায়।
এই তিন বীরের মৃত্যুর পর ঢাকা শহরের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাঁদের মরদেহগুলো যথাযথ সম্মান তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
কিশোরগঞ্জের সেই সমাধি
মেজর হায়দারের মরদেহ অত্যন্ত গোপনে কঠোর সামরিক পাহারায় তাঁর নিজ শহর কিশোরগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। স্বজনদের আহাজারি করার সুযোগও ছিল সীমিত। চারদিকে তখন এক অজানা আতঙ্ক। কেন তাঁদের হত্যা করা হলো, কার ইশারায় এই রক্তগঙ্গা বইল সেই উত্তর পাওয়ার সাহস তখন কারও ছিল না।
কর্নেল হুদা এবং জেনারেল খালেদের পরিবারও সেদিন নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশের জন্ম যারা দিলেন, সেই স্বাধীন দেশের মাটিতেই তাঁদের কোনো শেষ সম্মান বা রাষ্ট্রীয় বিদায় জোটে নি সেদিন। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালোতম অধ্যায়।
ইতিহাসের ট্র্যাজেডি
৭ নভেম্বরের এই হত্যাকাণ্ড কেবল তিনটি জীবনের বিনাশ ছিল না, বরং এটি ছিল মেধাবী সামরিক নেতৃত্বশূন্য করার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। খালেদ মোশাররফ ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের পথিকৃৎ, হায়দার ছিলেন গেরিলাদের প্রাণপুরুষ আর নাজমুল হুদা ছিলেন রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা।
দীর্ঘদিন এই বীরদের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৭ নভেম্বরকে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করা হলেও পর্দার আড়ালে যে এই তিন বীরের রক্ত লেগে আছে, তা চাপা পড়ে গিয়েছিল। আজ সময় এসেছে এই মহান মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার। ক্ষমতার লড়াইয়ে কে জিতেছিল তা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো দেশপ্রেমিক সৈনিকরা যাতে আর কখনও এমন ষড়যন্ত্রের শিকার না হয়।
অমীমাংসিত বিচারের দায় কার?
মেজর হায়দারকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় তাঁর জন্মভূমি কিশোরগঞ্জে সমাহিত করা হয়। তাঁর স্বজনরা সেদিন টু শব্দ করার সাহস পাননি। যে মানুষটি ঢাকা শহর কাঁপিয়েছিলেন একাত্তরে, যাঁর কণ্ঠস্বরে সারা বিশ্ব জেনেছিল বাংলাদেশের বিজয়ের খবর, তাঁকে কেন মরতে হলো সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
আজও এই বরেণ্য বীরদের হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। ভারতের দোসর বা নানাবিধ রাজনৈতিক অপবাদ দিয়ে এই সূর্যসন্তানদের মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, মেজর হায়দার ছিলেন একজন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক ও বীর যোদ্ধা। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচারের দায়ভার আজও রাষ্ট্রের ওপর অর্পিত।
তথ্যসূত্র:
মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তার বিয়োগান্ত বিদায় - জহিরুল ইসলাম
কর্নেল হুদা ও আমার যুদ্ধ - নিলুফার হুদা
তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা - কর্ণেল এম এ হামিদ
Brave of Heart - হাবিবুল আলম বীর প্রতীক
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















