খালেদা জিয়ার মেকাপ বক্স ও ক্ষমতার দম্ভ
রাজনীতি মানেই কেবল জনসভা, ভাষণ আর রাজপথের লড়াই নয়। রাজনীতির বিশাল ক্যানভাসের পেছনে ঢাকা পড়ে থাকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, আবেগ এবং কখনো কখনো ক্ষমতার চরম দাপটের কিছু ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ গল্প। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কাল ছিল নানা কারণেই ঘটনাবহুল। তবে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে যে 'মেকআপ বক্স' ট্র্যাজেডি ঘটেছিল, তা আজও রাজনৈতিক মহলে এক মুখরোচক আলোচনার বিষয়।

TruthBangla
Jan 8, 2026
ক্ষমতার অলিন্দে তুচ্ছতার জয়গান রাজনীতিতে অনেক সময় বিশাল সব সিদ্ধান্তের চেয়ে অতি তুচ্ছ কোনো ঘটনা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রাজনীতি মানেই কেবল জনসভা, ভাষণ আর রাজপথের লড়াই নয়। রাজনীতির বিশাল ক্যানভাসের পেছনে ঢাকা পড়ে থাকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, আবেগ এবং কখনো কখনো ক্ষমতার চরম দাপটের কিছু ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ গল্প। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কাল ছিল নানা কারণেই ঘটনাবহুল। তবে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে যে 'মেকআপ বক্স' ট্র্যাজেডি ঘটেছিল, তা আজও রাজনৈতিক মহলে এক মুখরোচক আলোচনার বিষয়। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিউইয়র্ক সফরে একটি 'মেকআপ বক্স'কে কেন্দ্র করে যে লঙ্কাকাণ্ড ঘটেছিল, তা আজ অব্দি ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ধ্রুপদী উদাহরণ হয়ে আছে।
সেপ্টেম্বর ২০০৫ - খালেদা জিয়ার সেই নিউইয়র্ক সফর
২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। জাতিসংঘের ৬০তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক বিশাল বহর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাষ্ট্রীয় সফর মানেই কড়া নিরাপত্তা, প্রটোকল আর শত শত ফাইলের ব্যস্ততা। প্রধানমন্ত্রী যখন খালেদা জিয়া, তখন তার সফর মানেই বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। রাষ্ট্রীয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভিভিআইপি ফ্লাইটে কয়েক ডজন সুটকেস, ট্রাঙ্ক এবং ব্যাগ তোলা হচ্ছে। প্রটোকল অনুযায়ী, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF) প্রতিটি ব্যাগে সিকিউরিটি ট্যাগ লাগিয়ে পরীক্ষা করে বিমানে তুলছে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যাগপত্র যখন ভিভিআইপি টার্মিনাল দিয়ে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে তোলা হচ্ছিল, তখন প্রতিটি ব্যাগে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF) এর ট্যাগ লাগানো ছিল। নিরাপত্তার খাতিরে প্রতিটি ব্যাগ স্ক্যানিং এবং ফিজিক্যাল চেকিং করা বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তা তল্লাশির দায়িত্বে ছিলেন এসএসএফ-এর একজন তরুণ ও নিষ্ঠাবান মেজর। তল্লাশি চলাকালীন তিনি লক্ষ্য করলেন, সব ব্যাগে সিকিউরিটি ট্যাগ থাকলেও একটি ছোট কিন্তু দামী হ্যান্ডব্যাগ কোনো ট্যাগ ছাড়াই বিমানে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রটোকল অনুযায়ী, ট্যাগহীন কোনো ব্যাগ ভিভিআইপি ফ্লাইটে উঠানো নিয়মবহির্ভূত। নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে মেজর সাহেব ব্যাগটি সরিয়ে রাখলেন এবং যেহেতু নিয়ম সবার জন্য সমান, তাই তিনি একটি নোট লিখে সেটি এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির কাছে জমা দিয়ে দিলেন। তিনি হয়তো জানতেন না, এই একটি ব্যাগই হতে যাচ্ছে আগামী কয়েক দিনের জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। এমিরেটসের বিমানে চড়ে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর বিশাল বহর নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, কিন্তু সেই অভিশপ্ত ব্যাগটি পড়ে থাকল ঢাকাতেই।
নিউইয়র্কে হুলস্থূল - যখন মেকআপ বক্স নিখোঁজ
এমিরেটসের বিমান যখন জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে অবতরণ করল, তখনো কেউ জানত না কী অপেক্ষা করছে। প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক পৌঁছানোর পর আসল নাটক শুরু হলো। পরদিন সকালেই ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর মেকআপ পারসন যখন ব্যাগ গুছিয়ে ম্যাডামকে সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সব ব্যাগ আছে, কিন্তু সেই বিশেষ ছোট ব্যাগটি নেই যেটা ছিল বেগম জিয়ার অতি প্রয়োজনীয় ‘মেকআপ বক্স’!
কূটনৈতিক বিপর্যয় ও বাতিল হওয়া বৈঠক
একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য বাহ্যিক পরিপাটি থাকাটা যেমন জরুরি, তেমনি সেটা কি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের চেয়েও বড়? সেইদিন অন্তত তাই ঘটেছিল। বিশেষ করে বেগম জিয়ার মতো একজন নেত্রী, যিনি সর্বদা অত্যন্ত পরিপাটি এবং রুচিশীল সাজসজ্জার জন্য পরিচিত ছিলেন, তাঁর পক্ষে মেকআপ ছাড়া আন্তর্জাতিক কোনো বৈঠকে অংশ নেওয়া ছিল অকল্পনীয়।
মেকআপ বক্স না থাকায় প্রধানমন্ত্রী ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বসতে অস্বীকার করলেন। পরিস্থিতি সামলাতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে ঘাম ঝরাতে হলো। একে একে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বাতিল করা হলো। প্রবাসীদের সাথে নির্ধারিত একটি সভাও স্থগিত করা হয়। সরকারিভাবে জানানো হলো, প্রধানমন্ত্রী "অসুস্থ"। অথচ পর্দার আড়ালে তখন মেকআপ বক্সের সন্ধানে ঢাকা-নিউইয়র্ক তোলপাড় চলছে।
নিউইয়র্কের হোটেল রুমে যেন শোকের মাতম শুরু হলো। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব, মুখ্য সচিব এবং এসএসএফ কর্মকর্তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেল। মেকআপ বক্সটি কোথায় গেল?
৬২ হাজার ডলারের সেই মেকআপ শপিং
নিউইয়র্ক আর ঢাকার সময়ের পার্থক্য ১২ ঘণ্টা। দীর্ঘ দুই দিন লেগে গেল ব্যাগটি কোথায় আছে তা নিশ্চিত করতে। জানা গেল, ব্যাগটি ঢাকায় পড়ে আছে। ঢাকা থেকে সেই ব্যাগ নিউইয়র্ক পৌঁছাতে আরও দুই দিন সময় লাগবে। কিন্তু পরদিন জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর। এই অবস্থায় বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া কোনো পথ ছিল না। শেষমেশ উপায় না দেখে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খান নিজেই মেকআপ কিনতে বের হলেন।
তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোর্শেদ খান নিজে দায়িত্ব নিলেন। প্রধানমন্ত্রীর মেকআপ এক্সপার্টকে সাথে নিয়ে তিনি নিউইয়র্কের দামী দামী ব্র্যান্ডের দোকানে (যেমন: শ্যানেল, ডিয়র, ল্যানকম) ঘুরতে শুরু করলেন। লিস্টি ধরে ধরে কেনা হলো লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন, পাউডার আর আইলাইনার। সবই কেনা হলো উচ্চমূল্যে। পরে জানা যায়, সেই কেনাকাটার মোট খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬২ হাজার মার্কিন ডলার (তৎকালীন বিনিময় হারে যা প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার বেশি)।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর একান্ত সচিবকে যখন ঢাকা থেকে টাকা পাঠাতে বললেন, তখন খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখও লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল। সামান্য একটি মেকআপ বক্সের অভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এই বিশাল অপচয় ছিল সত্যিই নজিরবিহীন।
একটি নোট: ভাবুন একবার, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা এই মেকআপ সামগ্রীর দাম দিয়ে সেই সময়ে বাংলাদেশে একটি বড় মাপের ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। অথচ ক্ষমতার দাপটে সেই টাকা ব্যয় হলো কেবল ব্যক্তিগত প্রসাধন সামগ্রী কিনতে।
প্রতিশোধের আগুন এবং এসএসএফ অফিসারের ভাগ্য
অবশেষে মেকআপ হলো। ঝলমলে রূপে বেগম জিয়া বিএনপির প্রবাসীদের অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরে জ্বলছিল রাগের আগুন। বিমানে ওঠার আগে কে ব্যাগটি আটকে দিয়েছিল, তার ওপর চলল খড়গ। তাঁর প্রথম নির্দেশই ছিল যে অফিসার এই মেকআপ বক্সটি এয়ারপোর্টে আটকে দিয়েছিল, তাকে এখনই চাকরিচ্যুত করতে হবে।
সেনাপ্রধান ও তদন্তের জট
ঢাকা থেকে তৎক্ষণাৎ বার্তা পাঠানো হলো। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এসএসএফ প্রধান তাৎক্ষণিকভাবে ওই মেজরকে এসএসএফ থেকে প্রত্যাহার করে সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠান। সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদকে নির্দেশ দেওয়া হলো তাঁকে বরখাস্ত করতে। কিন্তু সেনাপ্রধান একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্তে দেখা যায়, মেজরের কোনো দোষ ছিল না; তিনি কেবল নিরাপত্তার নিয়ম পালন করেছিলেন। ট্যাগ ছাড়া ব্যাগ বিমানে তোলা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হতে পারত।
কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষটি যখন প্রতিহিংসাপরায়ণ হন, তখন যুক্তি কাজ করে না। খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পরও মেকআপ করতে বসলেই সেই হারানোর কথা মনে করে ক্ষিপ্ত হতেন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সেনাপ্রধান তাকে চাকরিচ্যুত না করে পরিস্থিতি শান্ত করতে দ্রুত একটি বিদেশি মিশনে পাঠিয়ে দেন।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস - ২০০৭ এর সেই রাত
সময় দ্রুত বয়ে যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (ওয়ান-ইলেভেন) প্রেক্ষাপট পাল্টে দেয়। ২০০৫ এর সেই দাপুটে প্রধানমন্ত্রী ২০০৭ সালে এসে রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়েন। সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। দুর্নীতির অভিযোগে একের পর এক রাজনৈতিক নেতা গ্রেফতার হতে থাকেন।
ঠিক সেই বছরই, সেই তথাকথিত মেকআপ বক্স আটকে দেওয়া মেজর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। তারিখটি লক্ষ্য করুন, মেকআপ বক্সের ঘটনার ঠিক দুই বছর পর। ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসায় হানা দেয় সেনাবাহিনী। সেই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন সেই লেফট্যানেন্ট কর্নেল।
ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর খেলা! ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যখন বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়, তখন সেই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন সেই একই ব্যক্তি। যাকে এক সময় মেকআপ বক্স হারানোর অপরাধে চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তিনিই হয়ে এলেন তাঁর গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে।
উপসংহার
২০০৫ সালের সেই মেকআপ বক্সটি শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক পৌঁছেছিল কিনা তা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো সেই ঘটনার মাধ্যমে যে বার্তাটি সমাজে গিয়েছিল তা হলো ক্ষমতার অপব্যবহারের নগ্ন রূপ। ‘মেকআপ বক্স’ কাণ্ডটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যারা ছোট মানুষদের অবজ্ঞা করেন, একদিন সেই অবজ্ঞাত মানুষেরাই ইতিহাসের প্রয়োজনে বিচারক হয়ে সামনে দাঁড়ান। ২০০৫ সালের সেই তুচ্ছ মেকআপ বক্স আজ কেবল একটি স্মৃতি নয়, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এক বড় সতর্কবাণী।
এই ঐতিহাসিক এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি নিয়ে আপনার অভিমত কী? আপনি কি মনে করেন সেই মেজর তাঁর কর্তব্যে সঠিক ছিলেন? লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন।
সূত্র: বাংলা ইনসাইডার
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















