বৈষম্যবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে ছিলেন যে সকল তারকা
সর্বাত্মক ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের চরম প্রতিকূলতার মুখে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক ঝাঁক সাহসী তারকা অভিনেতা, নির্দেশক, সংগীতশিল্পী, নাট্যকার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ক্যামেরা, শুটিং সেট এবং ব্যক্তিগত সুবিধার বলয় ফেলে সরাসরি নেমে এসেছিলেন রাজপথে। তারা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং ১ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক বৃষ্টিভেজা দিনে ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমার সামনে 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর ব্যানারে এক হয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন।

TruthBangla

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রৌদ্রকরোজ্জ্বল ও রক্তঝরা দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে সংযোজিত হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া একটি সাধারণ কোটা সংস্কার আন্দোলন অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে এক সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা এক কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটায়।
ইতিহাসের প্রতিটি মহৎ গণঅভ্যুত্থানে যেমন সাধারণ মানুষের পাশে সমাজ ও সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রগতিশীল ও সাহসী মননের মানুষেরা এসে দাঁড়ান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বন্দুকের নল, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান এবং সর্বাত্মক ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের চরম প্রতিকূলতার মুখে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক ঝাঁক সাহসী তারকা অভিনেতা, নির্দেশক, সংগীতশিল্পী, নাট্যকার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ক্যামেরা, শুটিং সেট এবং ব্যক্তিগত সুবিধার বলয় ফেলে সরাসরি নেমে এসেছিলেন রাজপথে।
তারা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং ১ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক বৃষ্টিভেজা দিনে ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমার সামনে 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর ব্যানারে এক হয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন। সরকারের রক্তচক্ষু, পুলিশি হয়রানি এবং ক্যারিয়ার ধ্বংসের চরম হুমকি উপেক্ষা করে তাঁরা শহীদ ছাত্রদের রক্তমাখা রাজপথে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন।
তবে এই অভূতপূর্ব সাহসিকতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের পর আজ যখন অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও ইতিহাস সংরক্ষণের আলোচনা চলছে, তখন এক বেদনাদায়ক সত্য সামনে এসেছে। রাজপথে জীবন ও ক্যারিয়ার বাজি রাখা এই শিল্পী ও তারকাদের কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়নি। একই সাথে, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং তার কালচারাল উইংস (জাসাস)-এর চরম ব্যর্থতা ও স্থবিরতা আবারও উন্মোচিত হয়েছে, যারা দেশের ক্রান্তিলগ্নে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও তরুণ প্রজাতিকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এক সুতোয় গাঁথতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
নিচে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে নামা তারকাদের বীরত্বগাথা, তাঁদের ভূমিকা, অভ্যুত্থান-উত্তর রাষ্ট্রীয় অবহেলা এবং বিরোধী দলের সাংস্কৃতিক দুর্বলতার এক বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামাজিক পটভূমি ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সূচনা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন, তখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেমে আসে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ, পুলিশ ও বিজিবির হামলা, নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং শত শত তাজা প্রাণ ঝরে পড়ার ঘটনা দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়।
নীরবতা ভেঙে রাজপথে শিল্পীরা
স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে বছরের পর বছর ধরে শিল্পাঙ্গন ছিল ভয়, সেন্সরশিপ এবং দলীয় দাসত্বের কবলে। কিন্তু জুলাই মাসে যখন শিশুদের গায়ে গুলি লাগল, আবু সাঈদের বুকের রক্তে রংপুর রাজপথ লাল হলো, এবং মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের মতো তরুণরা পানি দিতে গিয়ে প্রাণ হারাল, তখন দেশের প্রগতিশীল শিল্পীরা আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি।
তারা অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে এমন এক রক্তচক্ষু শাসকের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন সশরীরে রাজপথে নেমে সাধারণ ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের শরীরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা।
আগস্টের ঐতিহাসিক বৃষ্টিভেজা মানববন্ধন
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় একটি দিন ছিল ২০২৪ সালের ১ আগস্ট। স্বৈরাচারী সরকারের কারফিউ, পুলিশি টহল এবং বৈরী আবহাওয়া ও টানা মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঢাকার ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমার সামনে জড়ো হন দেশের প্রবীণ ও তরুণ প্রজন্মের শীর্ষ তারকা ও নির্মাতারা।
'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর ব্যানারে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে শিল্পীরা বৃষ্টির জলে ভিজে, হাতে লাল ফিতা বেঁধে ও ব্যানার নিয়ে রাজপথে অবস্থান নেন। তাঁদের কণ্ঠে ছিল এক স্পষ্ট দাবি "শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও গণহত্যা বন্ধ করো, ইন্টারনেট চালু করো এবং ৯ দফা মেনে নাও।" ১ আগস্টের এই দৃশ্য পুরো দেশের মানুষকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছিল এবং আন্দোলনের গণজোয়ারকে আরও বেগবান করেছিল।
জুলাই আন্দোলনে রাজপথে সোচ্চার যেসকল অকুতোভয় তারকা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যেসকল তারকা নিজেদের জীবন ও ক্যারিয়ারের মায়া ত্যাগ করে সশরীরে রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁদের বীরত্বগাথা বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নিচে তাঁদের ভূমিকার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. আজমেরি হক বাঁধন
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনয়শিল্পী আজমেরি হক বাঁধন ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীদের পক্ষে অত্যন্ত সোচ্চার ও আপসহীন ভূমিকা পালন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি তিনি রাজপথের আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে শরিক হন। ১ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটে 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর ব্যানারে আয়োজিত বৃষ্টিভেজা মানববন্ধনে তিনি সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন। পুলিশের রক্তচক্ষু ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে হাতে মাইক তুলে নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের তীব্র প্রতিবাদ জানান। বাঁধন নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, গণগ্রেপ্তার এবং ছাত্র হত্যার বিচার দাবি করে স্পষ্ট বার্তা দেন। সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যাচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাঁর এই সাহসী অবস্থান সাধারণ মানুষ ও সহশিল্পীদের রাজপথে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল।
২. আশফাক নিপুন
জনপ্রিয় ও প্রগতিশীল নির্মাতা আশফাক নিপুন আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সোচ্চার ছিলেন। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাড়া জাগানো সিরিজ 'মহানগর'-এর এই নির্মাতা ডিজিটাল স্পেসে প্রতিনিয়ত সরকারের একনায়কতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা হরণ, নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন এবং ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের বিরুদ্ধে ধারালো মন্তব্য প্রকাশ করেন। ১ আগস্টের শিল্পী সমাবেশে সশরীরে উপস্থিত হয়ে তিনি বলেন, ভয় দেখিয়ে রাজপথ থেকে তরুণদের হটানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি নিহত প্রতিটি শিক্ষার্থীর হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। তাঁর এই স্পষ্টভাষী বক্তব্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ভেতরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার একটি বড় জোয়ার সৃষ্টি করে।
৩. সালমান মুক্তাদির
সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও অভিনেতা সালমান মুক্তাদির কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই আন্দোলনের শুরুতেই সক্রিয় ভূমিকা নেন। কোটি কোটি অনুসারী থাকা এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি রাজপথে নেমে আসেন। তিনি ফার্মগেটের বিক্ষোভের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিশাল গণজমায়েতেও সশরীরে উপস্থিত হন। তরুণদের ৯ দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সালমান আহত শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা এবং আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত উদ্যোগ নেন। কোনো ধরনের প্রটোকল ছাড়া রাজপথে শিক্ষার্থীদের পাশে সাধারণ মানুষের মতো দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানানোয় তিনি জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের মাঝে বিশেষ উদ্দীপনা তৈরি করেন।
৪. মোশাররফ করিম
বাংলা নাট্যাঙ্গনের শীর্ষ জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম ১ আগস্টের সংহতি সমাবেশে সশরীরে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এর কঠোর প্রতিবাদ জানান। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফার্মগেটের সেই মানববন্ধনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ এবং কোনো অবস্থাতেই নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরানো সমর্থনযোগ্য নয়। অবিলম্বে রক্তপাত বন্ধ করা, আটককৃতদের মুক্তি দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার পক্ষে তাঁর সোচ্চার উপস্থিতি মূলধারার মিডিয়া অঙ্গনে নতুন গতি সঞ্চার করে।
৫. সিয়াম আহমেদ
জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা সিয়াম আহমেদ তাঁর চলমান বাণিজ্যিক সিনেমার কাজ ও পেশাগত শিডিউল স্থগিত রেখে আন্দোলনের পক্ষে রাজপথে নামেন। রাজপথে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার প্রতিবাদে তিনি প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিলেন। ১ আগস্ট ফার্মগেটের মানববন্ধনে প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য সহশিল্পীদের সাথে ব্যানার হাতে অংশ নেন এই তরুণ তারকা। সিয়াম সেখানে দাঁড়িয়ে জানান, যে তরুণ ও সাধারণ দর্শকের ভালোবাসায় আজ তিনি সিয়াম আহমেদ হতে পেরেছেন, তাঁদের এই সংকটকালে চুপ থাকা সম্ভব নয়। আন্দোলনরত তরুণদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথ দুই মাধ্যমেই জোরালো অবদান রাখেন।
৬. রুকাইয়া জাহান চমক
অভিনেত্রী ও চিকিৎসক রুকাইয়া জাহান চমক ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম দিক থেকেই স্পষ্ট ও সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। ১৭ জুলাই মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তিনি রাস্তায় নামার ঘোষণা দেন। কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজপথে আন্দোলনরত তরুণদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিবাদী সমাবেশে যোগ দেন। শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও প্রাণঘাতী বুলেটের ব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নানা প্রতিকূলতা ও হুমকির মুখোমুখি হয়েও তিনি তৎকালীন সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের কড়া সমালোচনা করেন এবং ৫ আগস্ট পতন পর্যন্ত সোচ্চার থেকে রাজপথে ও ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে তরুণদের মনোবল জোগান।
৭. অমিতাভ রেজা চৌধুরী
বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী সংগীতাঙ্গন ও নাটক-চলচ্চিত্রের শিল্পী-কলাকুশলীদের প্রতিবাদের এক ছাতার নিচে এনে রাজপথের রূপরেখা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ’-এর অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। ১ আগস্ট মানিক মিয়া এভিনিউতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পুলিশি বাধার মুখে পড়লে তিনি ও তার সহযোদ্ধারা রাজপথের অবস্থান পরিবর্তন করে ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনের সড়কে নিয়ে যান। টানা বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে দেশের চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের সর্বস্তরের কলাকুশলী ও অভিনেতাদের রাজপথে নিয়ে আসেন তিনি। শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে হত্যা, গণগ্রেপ্তার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রধান সংগঠক ছিলেন অমিতাভ রেজা।
৮. কাজী নওশাবা আহমেদ
সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদের সোচ্চার ভূমিকা দীর্ঘদিনের। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তিনি চরম গ্রেপ্তার ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সেই অতীত নির্যাতনের ট্রমা ও ব্যক্তিগত ভয়কে জয় করে ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তিনি আবার রাজপথে নামেন। নিজের নিরাপত্তাকে তোয়াক্কা না করে রাজপথে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে পুলিশি সহিংসতার প্রতিবাদ জানান। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তিনি জুলাই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ তরুণদের সঙ্গে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ অবলম্বনে ‘আগুনি’ নামক মিউজিক্যাল পাপেট শো তৈরি করেন, যা আন্দোলনকারীদের ত্যাগের স্মৃতিকে থিয়েটারের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার একটি অনন্য প্রয়াস।
৯. জাকিয়া বারী মম
জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী জাকিয়া বারী মম জুলাই আন্দোলনের রাজপথে শিল্পীদের প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে অগ্রভাগে উপস্থিত ছিলেন। ১ আগস্টের তীব্র বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়া যখন রাজধানীর সাধারণ জীবনযাত্রা স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তখনো তিনি পিছপা হননি। ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে ভিজে দাঁড়িয়েই তিনি ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ’-এর মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করেন। কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ছাড়া purely মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি সেখানে অবস্থান নেন এবং গণমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট কণ্ঠে ছাত্র হত্যার বিচার, গণগ্রেপ্তার বন্ধ ও স্বৈরাচারী নিপীড়নের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
১০. আসিফ আকবর
দেশবরেণ্য সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর জুলাই বিপ্লবে সংগীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিশেষ অবদান রাখেন। আন্দোলন শুরুর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে পোস্ট দিয়ে জনমত গঠনে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। এর পাশাপাশি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অন্যান্য শিল্পী ও কলাকুশলীদের একতাবদ্ধ করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন। রাজপথে আয়োজিত সংহতি ও প্রতিবাদী সমাবেশগুলোতে সশরীরে অংশ নিয়ে প্রতিবাদী বক্তব্য রাখেন। তার এই সক্রিয় অংশগ্রহণ সংগীতাঙ্গনের অন্যান্য শিল্পী ও সাধারণ তরুণদের স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
১১. প্রিন্স মাহমুদ
দেশের প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক প্রিন্স মাহমুদ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও দেশের ক্রান্তিলগ্নে রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১ আগস্ট ঢাকার ফার্মগেটে ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ’-এর আয়োজিত প্রতিবাদী মানববন্ধনে তিনি সরাসরি অংশ নেন। প্রতিকূল আবহাওয়া ও বৈরী বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো দমন-পীড়ন, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও গুলিবর্ষণের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংগীতাঙ্গনের অন্যান্য শিল্পীদের সংগঠিত করতে এবং রাজপথে সাধারণ মানুষের দাবির পক্ষে জোরালো বার্তা দিতে তাঁর সশরীরে উপস্থিতি তরুণদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ ও সাহস জুগিয়েছিল।
১২. পারশা মাহজাবীন পূর্ণী
তরুণ প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পারশা মাহজাবীন পূর্ণী রাজপথের প্রতিটি প্রতিবাদী সমাবেশ ও সংহতি কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। নিজের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে তিনি রাজপথে উপস্থিত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল প্রোফাইল ছবি ও প্রতিবাদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তিনি ১ আগস্টের শিল্পী সমাজের মানববন্ধনে যোগ দেন। আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীদের বিচার দাবি এবং রাজপথে গান ও প্রতিবাদের মাধ্যমে তরুণদের সংহতি জানিয়ে আন্দোলনকে গতিশীল করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৩. তাসনিয়া ফারিণ
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত সোচ্চার থাকার পর তরুণ অভিনয়শিল্পী তাসনিয়া ফারিণ ১ আগস্ট ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে আয়োজিত শিল্পী সমাজের মানববন্ধনে সশরীরে যোগ দেন। ভারী বৃষ্টির মধ্যেও রাজপথে অবস্থান নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর চলা সহিংসতার তীব্র প্রতিবাদ জানান। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার সুনিশ্চয়তা এবং নিহত ছাত্র-জনতার সুনির্দিষ্ট বিচারের দাবি জানান। ভয়ভীতি পেছনে ফেলে সাধারণ মানুষের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের পাশে তাঁর এই উপস্থিতি সাধারণ নাগরিকদের অনুপ্রাণিত করে।
১৪. নুসরাত ইমরোজ তিশা
অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা রাজপথের সংহতি কর্মসূচিতে সহশিল্পীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নেন। আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো সহিংসতার বিরুদ্ধে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। ফার্মগেটের প্রতিবাদী মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে তিনি নিহত শিক্ষার্থীদের সঠিক তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। নিজের পেশাগত জায়গা ও সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
১৫. রাফিয়াত রশীদ মিথিলা
আন্তর্জাতিক উন্নয়নকর্মী, অভিনেত্রী ও সংগীতশিল্পী রাফিয়াত রশীদ মিথিলা দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় রাজপথে সশরীরে নেমে আসেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাল রঙের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি তিনি ১ আগস্ট রাজপথের বিভিন্ন নাগরিক সংহতি ও শিল্পী সমাজের কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলন চলাকালে শিশুদের প্রাণহানি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে উন্নয়নকর্মী এবং শিল্পী হিসেবে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান। রাজপথে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে তিনি সব ধরনের নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানান।
১৬. সাবিলা নূর
পেশাগত ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা, বিজ্ঞাপনের শুটিং শিডিউল ও সম্ভাব্য প্রতিকূলতার তোয়াক্কা না করে রাজপথে নেমে আসেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাবিলা নূর। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস গুলিবর্ষণ, অন্যায় গ্রেপ্তার এবং সারাদেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে তথ্য চেপে রাখার চক্রান্তের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট ফার্মগেটে আয়োজিত 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর মানববন্ধনে মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি হাতে ব্যানার নিয়ে অবস্থান নেন। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে একের পর এক পোস্ট দিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছিলেন।
১৭. নাজিয়া হক অর্ষা
১ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক ও বৃষ্টিভেজা রাজপথে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সহশিল্পীদের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়ান অভিনয়শিল্পী নাজিয়া হক অর্ষা। ফার্মগেটের প্রতিবাদী সমাবেশে উপস্থিত হয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন। গণগ্রেপ্তার, শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভাষায় তিনি শিল্পী সমাজের অবস্থান তুলে ধরেন। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুবিধা বা ক্যারিয়ারের ঝুঁকির কথা চিন্তা না করে কেবল নীতি ও মানবিকতার পক্ষে থেকে তিনি এই আন্দোলনকে সমর্থন জানান।
১৮. আজাদ আবুল কালাম
দেশের প্রখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা আজাদ আবুল কালাম প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখেন। ১ আগস্ট ফার্মগেটের মানববন্ধনে উপস্থিত থেকে তিনি তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানান। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ ও অন্যায় হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি প্রবীণ ও নবীনদের সেতু হিসেবে কাজ করেন। রাজপথে তাঁর সরব উপস্থিতি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে সাহস সঞ্চার করে এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু প্রবীণ কর্মীকে রাজপথে নামতে অনুপ্রাণিত করে।
১৯. ইরেশ যাকের
অভিনেতা ও প্রযোজক ইরেশ যাকের 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর ব্যানারে আয়োজিত প্রতিবাদী মিছিলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। ফার্মগেটের আয়োজনে অঝোর ধারায় বৃষ্টির মধ্যেও হাতে স্লোগান লেখা ব্যানার নিয়ে তিনি রাজপথে সোচ্চার ছিলেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের মতামত তুলে ধরেন, তেমনই রাজপথে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ছাত্র হত্যার নিরপেক্ষ বিচার ও নাগরিক অধিকার পুনর্বাহালের দাবি জানান।
২০. সুমন আনোয়ার
নাট্যকার ও নির্মাতা সুমন আনোয়ার রাজপথের বিক্ষোভ ও শিল্পী সমাজের প্রতিবাদী মিছিলে শুরু থেকেই অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজপথে শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া নজিরবিহীন সহিংসতার নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত দাবি করেন তিনি। ১ আগস্ট ফার্মগেটের প্রতিবাদ সমাবেশে হাজির হয়ে তিনি শিল্পীদের ঐক্য ধরে রাখার ওপর জোর দেন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান।
২১. রেদওয়ান রনি
বিশিষ্ট নির্মাতা ও প্রযোজক রেদওয়ান রনি সাধারণ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। পেশাগত নানা সীমাবদ্ধতা দূরে ঠেলে তিনি ১ আগস্ট ফার্মগেটের সংহতি সমাবেশে অংশ নেন। নিরীহ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বেআইনি গ্রেপ্তার বন্ধ এবং সব হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়ার দাবিতে তিনি রাজপথে সোচ্চার হন। আন্দোলন চলাকালীন সাধারণ মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে তিনি নিয়মিত আওয়াজ তোলেন।
২২. তানিম নূর
প্রখ্যাত সিরিজ ও চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বপক্ষে শিল্পীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১ আগস্ট ফার্মগেটের সংহতি সমাবেশে তিনি প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনরত ছাত্রদের রক্ত ঝরার পর ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয় এমন তাগিদ থেকে তিনি দৃশ্যমাধ্যমের কর্মীদের এক ছাতার নিচে আনতে কাজ করেন এবং প্রতিবাদী স্পিরিট বজায় রাখতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান নেন।
২৩. শঙ্খ দাশগুপ্ত
নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত শিল্পী সমাজের বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচি ও রাজপথের মিছিলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। ফার্মগেটের সমাবেশে বৃষ্টিভেজা দিনে রাজপথে দাঁড়িয়ে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো দমন-পীড়নের কড়া সমালোচনা করেন। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে সাধারণ ছাত্র-জনতার প্রতি নিজের সংহতি প্রকাশ করেন তিনি।
২৪. সৈয়দ আহমেদ শাওকী
খ্যাতনামা নির্মাতা সৈয়দ আহমেদ শাওকী রাজপথের সংহতি মিছিলে যোগ দিয়ে ছাত্র গণহত্যার বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানান। ১ আগস্ট ফার্মগেটের মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে তিনি দেশের সকল শিল্পী ও কুশলীদের প্রতি আহ্বান জানান কোনো প্রকার ভীতি বা সুবিধার ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের ওপর গুলি চালায়, তখন শিল্পীদের নীরব থাকার সুযোগ নেই বলে তিনি তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরেন।
অভ্যুত্থান-উত্তর রাষ্ট্র ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিস্মৃতি: তারকারা কেন উপেক্ষিত?
৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে এবং দেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। দেশের প্রতিটি স্তরে যখন সংস্কার ও আন্দোলনকারীদের মূল্যায়নের কাজ শুরু হলো, তখন এক চরম হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠলো শিল্পাঙ্গনের সামনে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংবর্ধনার অভাব
যে তারকারা জীবন ও ক্যারিয়ার বাজি রেখে ১ আগস্টের রক্তচক্ষু ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে এসেছিলেন, অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাঁদের ন্যূনতম একটি আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনাও প্রদান করা হয়নি।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন অংশীজনকে সম্মানিত করা হলেও, রাজপথ কাঁপানো প্রগতিশীল তারকাদের এই অবদানকে যেন এক প্রকার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
সাংস্কৃতিক অবহেলার মাশুল
একটি রাষ্ট্র যখন নতুন করে পথচলা শুরু করে, তখন তার সাংস্কৃতিক ভিতকে মজবুত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আন্দোলন-উত্তর সময়ে সংস্কৃতি অঙ্গনকে চরম অবহেলার চোখে দেখা হয়েছে।
যে তারকারা রাজপথে নেমে আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করেছিলেন, তাঁদের এই অবমূল্যায়ন দেশের উদীয়মান শিল্পীদের ভবিষ্যতে যেকোনো জাতীয় সংকটে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে এক চরম হতাশাজনক বার্তা দেয়।
এক নজরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথের তারকা ও বর্তমান চিত্র
মূল বিষয় / উপাদান | প্রামাণ্য বিবরণ ও ঐতিহাসিক তথ্য |
আন্দোলনের নাম ও সময়কাল | জুলাই গণঅভ্যুত্থান / বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (জুলাই – আগস্ট ২০২৪)। |
শিল্পীদের মূল প্ল্যাটফর্ম | 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ', 'সংগীতাঙ্গন' এবং স্বতন্ত্র নাগরিক উদ্যোগ। |
ঐতিহাসিক ১ আগস্টের ঘটনা | ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমার সামনে বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথের বিশাল মানববন্ধন। |
তারকাদের মূল ভূমিকা | সশরীরে সমাবেশ, মিছিলে নেতৃত্ব, ছাত্র হত্যার বিচার দাবি, ৯ দফার সমর্থন ও গ্লোবাল ক্যাম্পেইন। |
ঝুঁকির ধরন | গ্রেপ্তার, শারীরিক নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারি, ক্যারিয়ার বয়কট ও ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট। |
আন্দোলন-উত্তর বাস্তবতা | অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত তারকাদের সংবর্ধনা না দেওয়া। |
রাজনৈতিক পর্যালোচনার মূলবিন্দু | বিএনপির কালচারাল উইংসের (জাসাস) চরম নীতিগত ও সাংগঠনিক ব্যর্থতা, নেতৃত্বের স্থবিরতা। |
পর্দার পেছনের সংগঠন: হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে রক্তচক্ষুর মুখোমুখি
১ আগস্টের ঐতিহাসিক 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর ব্যানারে ফার্মগেটের কর্মসূচিটি হুট করে একদিনে অনুষ্ঠিত হয়নি। এর পেছনে ছিল কয়েক দিনের তীব্র মানসিক লড়াই, গোপন পরিকল্পনা এবং নানামুখী ঝুঁকি নেওয়ার ইতিহাস।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ
১৮ জুলাই থেকে দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট শুরু হলে দেশের তারকা ও নির্মাতারা মারাত্মক যোগাযোগের সংকটে পড়েন। এ সময় অমিতাভ রেজা চৌধুরী, আশফাক নিপুন, তানিম নূর, সৈয়দ আহমেদ শাওকী এবং শঙ্খ দাশগুপ্তের মতো নির্মাতারা ব্যক্তিগতভাবে একে অপরের বাসায় বা স্টুডিওতে সরাসরি গিয়ে ছোট ছোট গোপন বৈঠক করেন। পরবর্তীতে ইন্টারনেট আংশিক চালু হলে এনক্রিপ্টেড সিগন্যাল ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে শতাধিক শিল্পী ও কলাকুশলীকে এক ছাদের নিচে আনা হয়।
'আলো আসবেই' বনাম 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'
আন্দোলন চলাকালে নাট্যাঙ্গন ও মিডিয়া জগতে দুটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয়ে যায়:
'আলো আসবেই' গ্রুপ: তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত একদল অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা একটি গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সেখানে ছাত্রদের দমন করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়।
'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ': প্রগতিশীল, স্বাধীন ও সাহসী শিল্পীরা আলাদা হয়ে গড়ে তোলেন ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ’। তারা কোনো রাজনৈতিক সুবিধা না নিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ৯ দফা দাবির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
Continental Shift: জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিরোধ শিল্প ও প্রধান মাধ্যমসমূহ
এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্মের নিজস্ব ভাষায় রচিত 'প্রোটেস্ট মিউজিক' বা প্রতিবাদী গান। বিশেষ করে বাংলাদেশি হিপ-হপ ও র্যাপ মিউজিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপ্লবের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল।
র্যাপার হান্নান ও 'আওয়াজ ওঠা' (Awaaz Utha)
কিশোরগঞ্জের তরুণ র্যাপার হান্নানের রচিত ও গাওয়া "আওয়াজ ওঠা" গানটি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় থিম সং হয়ে ওঠে।
"আওয়াজ তোল, আওয়াজ তোল, তোদের অত্যাচারের দিন শেষ..." এই কথাগুলো তরুণদের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
এর খেসারত হিসেবে ২৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জ থেকে হান্নানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর গ্রেপ্তারের খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সোচ্চার হয় এবং শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে তিনি মুক্তি পান।
শেজানের 'কথা ক' (Kotha Ko)
আরেক তরুণ র্যাপার শেজানের "কথা ক" গানটি রাষ্ট্রীয় মাধ্যম এবং সরকারের মূলধারার মিডিয়ার দালালির বিরুদ্ধে এক কড়া চড় ছিল। গানটিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরছে অথচ দেশের মূলধারার টিভি চ্যানেলগুলোতে উৎসবের নাটক দেখানো হচ্ছে। এই গানটি টিকটক, ফেসবুক রিলস ও ইনস্টাগ্রামে কোটি কোটি বার শেয়ার হয়।
প্রীতম হাসান ও অন্যান্য মূলধারার সংগীতশিল্পী
সংগীতশিল্পী ও সুরকার প্রীতম হাসান, মাশা ইসলাম এবং আহমেদ হাসান সানি তাঁদের সমস্ত বাণিজ্যিক প্রজেক্ট বাতিল করে ছাত্রদের পক্ষে গান তৈরি করেন ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। সংগীতাঙ্গনের এই ঐক্য স্বৈরাচারী শাসককে মানসিকভাবে বিপুল চাপের মুখে ফেলে দেয়।
স্ট্রিট আর্ট ও দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি): রাজপথের ক্যানভাসে বিপ্লব
৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর এবং তার পূর্বমুহূর্তেও পুরো দেশের রাজপথ ও দেয়ালগুলো পরিণত হয়েছিল প্রতিবাদী ক্যানভাসে। এই গ্রাফিতি বিপ্লবে চারুকলা ও স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের সাধারণ তরুণরাও অংশ নেয়।
শহীদ আবু সাঈদের ডানা মেলানো ছবি: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুলেটের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যটি সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে এঁকে দেওয়া হয়, যা বীরত্বের নতুন প্রতীকে পরিণত হয়।
'পানি লাগবে কারো?': শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের শেষ মুহূর্তের আকুতি "পানি লাগবে কারো, পানি?" এই বাক্যটি সারা দেশের দেয়ালে আঁকা হয়, যা গণমানুষের হৃদয়কে মারাত্মকভাবে নাড়া দেয়।
'বিকল্প কে? আমি, তুমি, আমরা!': স্বৈরাচারী শাসক যখন বারবার প্রশ্ন করত "আমার বিকল্প কে?", তরুণরা দেয়ালে দেয়ালে লিখে দেয় "বিকল্প কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, বিকল্প এই দেশের ১৬ কোটি জনগণ।"
অভ্যুত্থান-উত্তর সাংস্কৃতিক সংকট: প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়
স্বৈরাচারের পতনের পর আজ যখন বাংলাদেশ এক নতুন ভোরের মুখোমুখি, তখন রাজপথের সেই সাহসী শিল্পীদের অবদানকে জাতীয়ভাবে ধরে রাখার বিষয়ে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সংবর্ধনার অভাব ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলেও, জুলাই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক বীরদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো হয়নি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত কোথাও ১ আগস্টের সাহসী তারকাদের নিয়ে কোনো জাতীয় সংবর্ধনা বা প্রামাণ্যচিত্র তৈরির দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ভবিষ্যৎ পথের রূপরেখা
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নতুন করে গঠন করতে হলে কয়েকটি মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন:
সাংস্কৃতিক কাঠামোর অরাজনৈতিকীকরণ: জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন: শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি) দলীয় রাজনীতির বাইরে এনে স্বাধীন সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিল্পীদের হাতে তুলে দিতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ডকুমেন্টেশন: রাজপথের রক্তঝরা দিনগুলোতে রচিত গান, গ্রাফিতি, আলোকচিত্র এবং শিল্পীদের সাক্ষাৎকারসমূহ সংরক্ষণ করে একটি 'জাতীয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান আর্কাইভ' গড়ে তুলতে হবে।
তরুণ ও প্রগতিশীল শিল্পীদের মূল্যায়ন: প্রথাগত দলীয় জোটের বাইরে গিয়ে যেসব স্বাধীন ও তরুণ শিল্পী জুলাই আন্দোলনে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয় পলিসি মেকিং এবং সাংস্কৃতিক সংস্কার কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিরোধী রাজনীতির সাংস্কৃতিক স্থবিরতা: বিএনপি ও জাসাসের ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষ ও তারকারা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে জীবন উৎসর্গ করছিলেন, তখন দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর ভূমিকা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে।
জাসাসের ঐতিহাসিক স্থবিরতা ও অকার্যকারিতা
বিএনপির কালচারাল উইংস হিসেবে পরিচিত জাসাস (JASAS) একসময় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি বড় শক্তি থাকলেও গত দেড় ডজন বছরে এটি একটি পদ সর্বস্ব, স্থবির ও অকার্যকর সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের মতো এক ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে, যখন সাধারণ তরুণ তারকারা রাজপথে জীবন বাজি রাখছিলেন, তখন জাসাসের কোনো দৃশ্যমান ও সংগঠিত রূপ রাজপথে দেখা যায়নি। তারা প্রগতিশীল ও তরুণ তারকাদের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ তৈরি করতে বা তাঁদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের সাথে সাংস্কৃতিক দূরত্বের প্রমাণ
বিএনপির কালচারাল উইংসের এই দুর্বলতা বার বার প্রমান করেছে যে, তারা আধুনিক বাংলা সংস্কৃতির পরিবর্তন, তরুণদের মনস্তত্ত্ব এবং ডিজিটাল যুগের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধকে অনুধাবন করতে অক্ষম।
তারা কেবল গতানুগতিক দলীয় সভা-সমাবেশ ও বিবৃতিবাজির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের কালচারাল উইংসের মূল কাজই হলো দেশের শীর্ষ তারকা, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের একসাথে এনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বিশাল সাংস্কৃতিক বলয় বা ফ্রন্ট তৈরি করা। জাসাস এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে।
কেন এই সাংস্কৃতিক সমন্বয়হীনতা এবং ভবিষ্যতের শিক্ষা?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, দেশের সাংস্কৃতিক লড়াই রাজনীতিবিদদের দলীয় সীমানার চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু এই লড়াইকে ধরে রাখা এবং এর চেতনাকে রাষ্ট্র নির্মাণে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্র উভয়েই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
দলীয়করণ মুক্ত প্রগতিশীল সংস্কৃতি: রাজপথের তারকারা প্রমাণ করেছেন যে, কোনো দলীয় লেজুড়বৃত্তি ছাড়াও কেবল জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা: অবিলম্বে বৈষম্যবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা প্রতিটি তারকা, নির্মাতা ও কলাকুশলীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংস্কৃতি অঙ্গন প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মোপলব্ধি: বিএনপি সহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুধাবন করতে হবে যে, কেবল জরাজীর্ণ দলীয় উইংস দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃতি ও তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাঁদের কালচারাল ফ্রন্টকে পুনর্গঠন করে আধুনিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে।
রাজপথের বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সেলুট
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক নেতাদের ইতিহাস নয়; এটি ছিল আজমেরি হক বাঁধন, মোশাররফ করিম, আশফাক নিপুন, সিয়াম আহমেদ, সাবিলা নূর কিংবা প্রিন্স মাহমুদের মতো সাহসী তারকাদের রাজপথে নেমে আসার ইতিহাস।
তারা প্রমাণ করেছিলেন যে, শিল্পীরা কেবল বিনোদনের পুতুল নন; দেশের ও জনগণের বিপদে তাঁরাই হয়ে উঠতে পারেন প্রতিরোধের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। রাষ্ট্র আজ তাঁদের সংবর্ধনা দিতে ভুলতে পারে, কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো তাঁদের অবদানকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের ১৬ কোটি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ১ আগস্টের সেই বৃষ্টিভেজা রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা তারকাদের ছবি চিরকাল অমলিন ও ভাস্বর হয়ে থাকবে।















