>

>

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাসদ-সর্বহারা তান্ডব কোথায় হারিয়ে গেলো?

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাসদ-সর্বহারা তান্ডব কোথায় হারিয়ে গেলো?

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট এই সাড়ে তিন বছর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির এবং অগ্নিগর্ভ সময়। এই চরম অস্থিতিশীলতার প্রকাশ্য কারিগর হিসেবে তৎকালীন সময়ে মাঠে নেমেছিল নবগঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং চীনপন্থী চরম বামপন্থী নেতা সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’। এদের তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ কর্মকাণ্ডে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছিল।

TruthBangla

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাসদ-সর্বহারা তান্ডব কোথায় হারিয়ে গেলো?

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক মহাসংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন। একদিকে ছিল ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এক ভূখণ্ড, শূন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিকভাবে এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের পর্বতসম চ্যালেঞ্জ; অন্যদিকে ছিল পাকিস্তানের কারাগার থেকে বেঁচে ফেরা মহানায়কের প্রতি সাড়ে সাত কোটি মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধু যখন মাটি ও মানুষ নিয়ে শূন্য থেকে এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পর্দার অন্তরালে বিস্তার লাভ করছিল দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্রের এক জটিল ও কুৎসিত জাল।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট এই সাড়ে তিন বছর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির এবং অগ্নিগর্ভ সময়। এই চরম অস্থিতিশীলতার প্রকাশ্য কারিগর হিসেবে তৎকালীন সময়ে মাঠে নেমেছিল নবগঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং চীনপন্থী চরম বামপন্থী নেতা সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’। এদের তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ কর্মকাণ্ডে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং রহস্যময় প্রশ্নটি এখানেই: বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকা অবস্থায় যে শক্তিগুলো পুরো দেশকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তারা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল? কেন খুনি মোশতাক বা পরবর্তী সামরিক জান্তাদের দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাদের সেই ‘বৈপ্লবিক তেজ’ আর দেখা গেল না? কেন তারা কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই উন্মোচিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট।

১৯৭২-৭৫: জাসদ ও সর্বহারা পার্টির তাণ্ডবের স্বরূপ

বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্ত হয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের হাল ধরলেন, তখন একদল তরুণের মনে সুকৌশলে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ এক অবাস্তব ও রোমান্টিক মোহ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই, মূলত ১৯৭২ সালের অক্টোবরে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ ভেঙে গিয়ে ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ বা জাসদ গঠন করে। তাদের তাত্ত্বিক গুরু সিরাজুল আলম খান এবং তরুণ নেতৃত্ব আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজদের স্লোগান ছিল ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’।

কিন্তু প্রশ্ন হলো একটি সদ্য স্বাধীন, প্রায় দেউলিয়া রাষ্ট্র, যেখানে মানুষের ঘরে অন্ন নেই, পরনে বস্ত্র নেই, সে সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে ‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার নামে দেশজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা কতটা যৌক্তিক বা দেশপ্রেমের লক্ষণ ছিল? জাসদ কেবল একটি প্রথাগত রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করেনি; তারা অতি দ্রুত রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র শাখা গড়ে তোলে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘গণবাহিনী’। এই গণবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (অব:) আবু তাহের।

গণবাহিনীর সশস্ত্র উত্থান ও অর্থনৈতিক নাশকতা

গণবাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এবং জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ সরকারকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা যে পথ বেছে নিয়েছিল, তা কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ হতে পারে না, তা ছিল স্রেফ দস্যুতা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ধ্বংসের উন্মাদনা:

থানা ও ব্যাংক লুট: স্বাধীনতার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসন ছিল পুনর্গঠন পর্যায়ে। তাদের হাতে আধুনিক অস্ত্র বা পর্যাপ্ত লজিস্টিকস ছিল না। এই দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে গণবাহিনী একের পর এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের থানা আক্রমণ করতে শুরু করে। তারা সরকারি অস্ত্রাগার ভেঙে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। একই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক লুট করে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করার খেলায় মেতে ওঠে।

অর্থনৈতিক নাশকতায় আঘাত (পাটের গুদামে আগুন): তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান এবং একমাত্র উৎস ছিল ‘সোনালী আঁশ’ খ্যাত পাট। জাসদের সশস্ত্র ক্যাডাররা ও সর্বহারা পার্টির সদস্যরা একের পর এক রাষ্ট্রীয় পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ করতে শুরু করে। খুলনার খালিশপুর থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের আদমজী সব জায়গার গুদামে আগুন দিয়ে কোটি কোটি টাকার পাট পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়, যেন বাংলাদেশ কোনোভাবেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে।

যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাত ধ্বংস: তারা বিভিন্ন স্থানে রেললাইন উপড়ে ফেলে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটাত এবং পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দিত। বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও ট্রান্সফর্মারে বোমা হামলা চালিয়ে দেশের শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

জাসদের 'সশস্ত্র অভ্যুত্থান' ও ঢাকায় কমান্ডো স্টাইলের হামলা

জাসদের গণবাহিনী কেবল প্রত্যন্ত অঞ্চলের থানা লুটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা সরাসরি রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নাশকতার ছক কষেছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাও (১৯৭৪): ১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ জাসদের একটি বিশাল মিছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর রমনাদিকের সরকারি বাসভবন ঘেরাও করে। একপর্যায়ে জাসদের সশস্ত্র ক্যাডাররা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে দায়িত্বরত রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এই ঘটনাটি ছিল প্রকাশ্য রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের প্রথম বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের মহড়া।

ভারতীয় হাইকমিশনার অপহরণচেষ্টা (১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে (বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক মাস পর) জাসদের গণবাহিনীর একটি সুনির্দিষ্ট সেল ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনকে অপহরণের চেষ্টা করে। ভারতীয় হাইকমিশনে ঢুকে তারা এই কমান্ডো স্টাইলের হামলা চালায়। উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক একটি সংকট তৈরি করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলা এবং বন্দি কর্নেল তাহেরের মুক্তি নিশ্চিত করা। যদিও পুলিশের তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং কয়েকজন হামলাকারী নিহত হয়।

সিরাজ শিকদার ও ‘শ্রেণীশত্রু খতমের’ নৃশংস রাজনীতি

একই সময়ে, অন্য প্রান্তে চীনপন্থী কমিউনিস্ট লাইনের দাবিদার সিরাজ শিকদার শুরু করেন তার ‘পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি’র নামে চরমপন্থী ও গোপন সশস্ত্র লড়াই। সিরাজ শিকদারের দর্শন ছিল আরও ভয়ঙ্কর এবং মানবতাবিরোধী। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের এক বিকৃত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তার অনুসারীরা গ্রামীণ জনপদে শুরু করে ‘শ্রেণীশত্রু খতমের’ এক নৃশংস উৎসব।

গ্রামের মাঝারি বা অবস্থাপন্ন কৃষক, স্থানীয় জোতদার, কিংবা গ্রামীণ শালিস-বিচারের প্রধান যাঁদেরই সর্বহারা পার্টি ‘শ্রেণীশত্রু’ বা শোষক মনে করত, গভীর রাতে তাদের ঘর থেকে ডেকে এনে পরিবারের সামনে জবাই করা হতো। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ আতঙ্ক ও স্থবিরতা ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কৃষক বা ব্যবসায়ী আতঙ্কে বিনিয়োগ করতে পারতেন না, ফলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাদের আক্রমণের শিকার কেবল তথাকথিত জোতদাররাই ছিলেন না, বরং অসংখ্য সাধারণ মানুষ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও এই তথাকথিত বিপ্লবের বলি হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাসদ-সর্বহারা তান্ডব কোথায় হারিয়ে গেলো?

তৃণমূল আওয়ামী লীগ ও জনপ্রতিনিধিদের ওপর হামলা

আজ যাঁরা এসি রুমে বসে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা দেন এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘স্বৈরাচার’ বলে গালি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন, তাঁরা কি জানেন সেই সাড়ে তিন বছরে আওয়ামী লীগের কতজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীকে জীবন দিতে হয়েছিল? জাসদ ও সর্বহারা পার্টির এই পরিকল্পিত সহিংসতার মূল লক্ষ্যই ছিল আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতৃত্বকে শূন্য করে দেওয়া, যাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে।

হাজার হাজার তৃণমূল কর্মী হত্যা

বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্র, তৎকালীন সংবাদপত্র (যেমন: দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা) এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গ্রামীণ জনপদে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অর্থই ছিল জাসদের গণবাহিনী বা সর্বহারা পার্টির হিটলিস্টে নাম লেখানো।

সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তা ও ঈদের নামাজে ব্রাশফায়ার

একটি স্বাধীন দেশের সংসদ সদস্যরা কতটা অনিরাপদ ছিলেন, তা ভাবলে আজও গা শিউরে ওঠে। তৎকালীন সময়ে গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদের অন্তত ৫ জন নির্বাচিত সদস্য (MP) আততায়ীর হাতে নিহত হন। এর মধ্যে সবচেয়ে বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৪ সালের ঈদের দিনে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কিবরিয়াকে ঈদের নামাজ পড়া অবস্থায় মসজিদের ভেতরে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে জাসদের চরমপন্থীরা।

নামাজের পাটিতে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার এই জঘন্য রাজনীতি যারা করত, তাদের হাত থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা কি কোনো নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব ছিল না? এছাড়া এমপি আব্দুল গফুর, গাজী ফজলুর রহমান, এবং নূরুল হক ইমনের মতো জনপ্রিয় জাতীয় নেতাদেরও একইভাবে হত্যা করা হয়। একটি নবজাত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যখন এভাবে পাইকারি হারে হত্যা করা হয়, তখন রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আর কী পথ খোলা থাকতে পারে?

জাসদের মুখপত্র 'দৈনিক গণকণ্ঠ' এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

রাজনীতিতে কেবল অস্ত্র নয়, প্রচারণাও একটি বড় হাতিয়ার। জাসদ তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনমত খেপিয়ে তুলতে 'দৈনিক গণকণ্ঠ' নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করত, যার সম্পাদক ছিলেন কবি আল মাহমুদ।

এই পত্রিকাটিতে নিয়মিতভাবে রক্ষীবাহিনী ও সরকারের বিরুদ্ধে অতিরঞ্জিত ও বানোয়াট খবর প্রকাশ করা হতো। দেশের অর্থনৈতিক সংকট, বন্যা বা লঙ্গরখানার দুর্দশাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো যাতে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র সরকার-বিদ্বেষ তৈরি হয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় ছিল, এই পত্রিকার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনী ও সাধারণ জোয়ানদের উসকানি দেওয়া হতো সরকারের আদেশ অমান্য করার জন্য, যা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ ছিল।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী: মিথ বনাম বাস্তবতার নির্মোহ বিশ্লেষণ

বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলের সমালোচনা করতে গিয়ে দেশি-বিদেশি একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও গবেষক সবসময় ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ (Jatiya Rakkhi Bahini - JRB)-কে একটি দানবীয় ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ক বাহিনী হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেন। প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয় যে, জাসদ ও সর্বহারা পার্টিকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দমন করতেই এই প্যারা-মিলিশিয়া বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এর পেছনের প্রকৃত রাজনৈতিক ও আইনগত প্রেক্ষাপটটি সুকৌশলে চেপে যাওয়া হয়।

কেন তৈরি হয়েছিল রক্ষীবাহিনী?

১৯৭২ সালের মার্চ মাসে একটি লজিস্টিক্যালি দুর্বল দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ (order)’ জারি করা হয়। এর পেছনে তিনটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও জরুরি কারণ ছিল:

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার: ৯ মাসের যুদ্ধের পর সারা দেশে কোটি কোটি টাকার আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় অবৈধ অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠীর কাছে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষায়িত এবং দ্রুত অ্যাকশন নিতে সক্ষম বাহিনীর প্রয়োজন ছিল।

সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন ও দুর্বলতা: সে সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং মাত্র পুনর্গঠন পর্যায়ে। পাকিস্তান থেকে তখনো বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা ফিরে আসেননি। ফলে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ব্যাপক চোরাচালান রোধ এবং সীমান্ত পাহারায় নিয়মিত সেনাবাহিনীর ওপর চাপ কমানোর জন্য পুলিশের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সহযোগী কাঠামোর অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল।

জাসদের প্রকাশ্য হুমকি মোকাবিলা: জাসদ যখন পল্টন ময়দানে লাখো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে ‘চামড়া তুলে নেওয়ার’ হুমকি দিচ্ছিল এবং দেশের ভেতরে সমান্তরাল সরকার বা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ঘোষণা দিচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের জানমাল রক্ষায় বঙ্গবন্ধু এই বাহিনী গঠন করতে আইনগতভাবে বাধ্য হন।

মিথ বনাম বাস্তবতার সত্য

রক্ষীবাহিনীর কোনো কোনো জুনিয়র সদস্যের অতি-উৎসাহী কর্মকাণ্ড, ফিল্ড পর্যায়ের কিছু বিচ্যুতি বা ব্যক্তিগত ক্ষমতার অপব্যবহারকে পরবর্তী সময়ে ডানপন্থী ও চরম বামপন্থী মিডিয়াগুলো তিলকে তাল করে প্রচার করেছে। পুরো বাহিনীকে একটি ‘খুনি বাহিনী’ হিসেবে মিথ বা অবাস্তব কাহিনির রূপ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো—সেই চরম অরাজক ও নৈরাজ্যবাদী পরিস্থিতিতে যদি রক্ষীবাহিনী মাঠ পর্যায়ে শক্ত অবস্থান না নিত, তবে বাংলাদেশ ১৯৭৩-৭৪ সালের মধ্যেই একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের (Civil War) দিকে চলে যেত, যা দেশের স্বাধীনতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিত।

সিরাজ শিকদারের 'গোপন রেডিও' ও পাকিস্তানি যোগসূত্র

সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি কেবল পোস্টার বা লিফলেটের মাধ্যমে রাজনীতি করত না, তারা তৎকালীন সময়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল।

স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের আশ্রয়: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী বা আল-বদর, আল-শামসের যেসব ক্যাডার বা রাজাকার আত্মগোপন করেছিল, তাদের একটি বড় অংশ নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর প্রতিশোধ নিতে সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টিতে যোগ দেয়। চীনপন্থী লাইনের আড়ালে তারা আসলে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছিল।

বেতার প্রচার: তৎকালীন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সর্বহারা পার্টি একটি গোপন রেডিও বা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাত। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এই ধরনের ভারী কারিগরি লজিস্টিকস এবং বেতার তরঙ্গের যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করার পেছনে যে আন্তর্জাতিক কোনো কালো হাত বা গোয়েন্দা সংস্থার (যেমন পাকিস্তানের ISI) প্রত্যক্ষ মদদ ছিল, তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ: চক্রান্তের একটি সফল অস্ত্র

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে প্রায়শই বঙ্গবন্ধুর সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এর নেপথ্যের অর্থনৈতিক নাশকতার রাজনীতিটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।

খাদ্যবাহী জাহাজে নাশকতা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: বাংলাদেশ যখন তীব্র খাদ্য সংকটে, তখন কিউবার কাছে সামান্য চট বা পাট বিক্রি করার অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র 'পিএল-৪৮০' (PL-480) আইনের অধীনে বাংলাদেশে গম ও খাদ্যবাহী জাহাজ পাঠানো মাঝপথ থেকে বাতিল করে দেয়।

অভ্যন্তরীণ মজুতদারি ও গুদামে আগুন: আন্তর্জাতিক এই চাপের সাথে দেশে জাসদ ও সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা যোগ দেয়। তারা দেশের বিভিন্ন খাদ্যগুদাম ও চালের আড়ত লুট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। যমুনা ও পদ্মা নদীতে খাদ্যবাহী কার্গো বা নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও তারা ঘটিয়েছিল, যেন খাদ্য সঠিক সময়ে লঙ্গরখানাগুলোতে পৌঁছাতে না পারে। মানুষের ক্ষুধা ও লাশকে তারা জঘন্যভাবে ব্যবহার করেছিল বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তায় ধস নামানোর জন্য।

অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভাঙার ষড়যন্ত্র ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

বঙ্গবন্ধু যখন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, ওআইসি সম্মেলনে বিদেশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য অনুদান, ঋণ এবং মানবিক সাহায্য নিয়ে আসছিলেন, তখন দেশের ভেতরে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ব্যস্ত ছিল সেই অর্জিত সম্পদ নষ্ট করতে।

সরকার যখন লঙ্গরখানা খুলে ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করছে, তখন জাসদের গণবাহিনী ও কিছু অতি-বামপন্থী ছদ্মবেশী গোষ্ঠী সেই খাদ্য গুদামে হামলা চালিয়ে খাদ্যশস্য লুট করে নিত বা পুড়িয়ে দিত। তাদের লক্ষ্য ছিল কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা।

জাসদ ও সর্বহারা পার্টির এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল। বিশেষ করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং পাকিস্তানের আইএসআই (ISI), যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি, তারা এই সুযোগটি লুফে নেয়। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে 'বাস্কেট কেস' (Bottomless Basket - তলাবিহীন ঝুড়ি) বা একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। জাসদের তাণ্ডব কিসিঞ্জারের সেই কুৎসিত তত্ত্বকেই সত্য প্রমাণ করার মাঠ পর্যায়ের রসদ জুগিয়েছিল।

'বাকশাল' (BAKSAL): একটি জরুরি রক্ষাকবচ, স্বৈরাচার নয়

১৯৭৫ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধু যখন দেখলেন চারদিক থেকে সশস্ত্র চরমপন্থীরা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অর্থনীতি পঙ্গু করে দিচ্ছে এবং বিদেশি শক্তিগুলো সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়ার উপক্রম করেছে, তখন তিনি বাধ্য হয়ে 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) বা দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন।

এটিকে প্রায়শই 'একদলীয় স্বৈরাচার' বলে গালি দেওয়া হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি জাতীয় ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম। বঙ্গবন্ধু এর মাধ্যমে দেশের সকল রাজনৈতিক দল, সামরিক-বেসামরিক আমলা, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীদের এক ছাতার নিচে এনে এই অভ্যন্তরীণ অন্তর্ঘাত ও দস্যুতা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।

বাকশাল গঠনের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে উন্নত হতে শুরু করে, পাটের গুদামে আগুন দেওয়া বন্ধ হয়, চোরাচালান শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

ঠিক যখন এই জাতীয় ঐক্যের ফলে দেশ স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছিল এবং চক্রান্তকারীদের সব চাল ভেস্তে যাচ্ছিল, তখনই খুনিরা বুঝতে পারে যে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা ছাড়া এই রাষ্ট্রকে আর থামানো সম্ভব নয়। আর সেই ধারাবাহিকতাতেই ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই নির্মম ট্র্যাজেডি।

কেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাসদ ও সর্বহারা পার্টি 'ঠান্ডা' হয়ে গেল?

এই প্রবন্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন এটিই। জাসদ ও সর্বহারা পার্টির কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য যদি হতো ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা বা ‘শোষিতের রাজ’ কায়েম করা, তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর তাদের সেই বৈপ্লবিক তেজ কর্পূরের মতো কেন উড়ে গেল? বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাসদের তথাকথিত বৈপ্লবিক রাজনীতি কেন আর এক কদমও এগোলো না? কেন তারা পরবর্তী সেনাশাসকদের বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলল না? এই রহস্যের ব্যবচ্ছেদ করলে তিনটি মূল কারণ বেরিয়ে আসে:

জাসদের শীর্ষ নেতৃত্বের উচ্চাভিলাষ ও সেনাশাসক যোগসূত্র

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাসদের ভূমিকা ও আচরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, তাদের আসল লক্ষ্য কখনোই কোনো ‘সমাজতন্ত্র’ ছিল না, বরং সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আরোহণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

১৫ই আগস্টের সেই কালরাত্রির পর জাসদ নেতাদের মধ্যে কোনো শোক, ক্ষোভ বা প্রতিведений চিহ্ন দেখা যায়নি। বরং খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদের সাথে জাসদের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকের গোপন আঁতাত ছিল বলে অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের তথাকথিত ‘সিপাহী-জনতা বিপ্লব’-এর মূল চালিকাশক্তি ছিলেন জাসদ নেতা কর্নেল তাহের।

তাহেরের নেতৃত্বে জাসদের গণবাহিনী যখন ঢাকা সেনানিবাসে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বন্দী জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে, তখন তারা ভেবেছিল ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি জাসদের হাতে চলে আসবে এবং জিয়া হবেন তাদের হাতের পুতুল। কিন্তু সুচতুর, উচ্চাভিলাষী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক আমলাতন্ত্র জাসদকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা হাতে নিয়েই জাসদের এই সশস্ত্র শক্তিকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেন এবং কর্নেল তাহেরকে সামরিক আদালতে ফাঁসি দেন। জাসদের এই চরম ক্ষমতা-লোভী ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতিই তাদের আদর্শিক পতনের মূল কারণ।

লক্ষ্য পূরণ ও 'অ্যাসাইনমেন্ট' তত্ত্ব

অনেক প্রখ্যাত রাজনীতি বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদের মতে, জাসদ এবং চরমপন্থী দলগুলোর সৃষ্টিই হয়েছিল একটি বিশেষ ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ বা সুনির্দিষ্ট মিশন নিয়ে। সেই মিশনটি ছিল বঙ্গবন্ধুকে জনগণের সামনে বিতর্কিত করা, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে এমন এক ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাতে একটি বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বা সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য ক্ষেত্র তৈরি হয়।

যখন ১৫ই আগস্টের খুনি মেজরদের বুলেটে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে ধরণী থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তখন এই অদৃশ্য মাস্টারমাইন্ডদের প্রাথমিক ও মূল লক্ষ্য পূরণ হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান চালু করা হলো, রাষ্ট্রকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়া শুরু হলো, তখন জাসদের আর ‘তাণ্ডব’ করার বা পাটের গুদামে আগুন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন রইল না। কারণ যে বিশাল বটবৃক্ষকে উপড়ে ফেলার জন্য তাদের মাঠে নামানো হয়েছিল, সেই গাছটিই তখন আর নেই। পেছনের অদৃশ্য চালকেরা তখন তাদের মিশন ক্লোজ বা ‘শান্ত’ থাকার অলিখিত নির্দেশ দেয়।

নেতৃত্বের বিভাজন ও আদর্শিক দেউলিয়াত্ব

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাসদের তথাকথিত ‘আদর্শের বেলুন’ এক ফুঁৎকারে ফেটে যায়। দলটি অতি দ্রুত কয়েক টুকরো হয়ে যায়। আদর্শের বুলি উড়ানো এই দলটির অভ্যন্তরে শুরু হয় তীব্র কামড়াকামড়ি, কোন্দল এবং ক্ষমতার ভাগাভাগির বিভাজন।

যে নেতারা রাজপথে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতেন "শোষিত মানুষের রাজ কায়েম করো", তারা তখন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়ার মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান। জাসদের অনেক জাঁদরেল নেতা জিয়াউর রহমানের দল বিএনপিতে (BNP) যোগ দিয়ে মন্ত্রী, এমপি বা উপদেষ্টা হন। কেউবা সরাসরি সামরিক শাসনের প্রকাশ্য সহযোগী বা চাটুকারে পরিণত হন। রাজপথের বিপ্লবী স্লোগান বাদ দিয়ে তারা তখন ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ও প্লট-ফ্ল্যাটের বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা ও ক্ষুব্ধ, তখন জাসদ নেতাদের এই নির্লজ্জ আদর্শিক দেউলিয়াত্ব ও সামরিক জান্তার পদলেহন দেখে মাঠ পর্যায়ের সৎ কর্মী ও সমর্থকেরা চরমভাবে হতাশ ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ফলে দলটির রাজনীতি সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং একসময় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

কেন এই প্রশ্নগুলো সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়?

বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনাকারীরা বর্তমান সময়েও সবসময় রক্ষীবাহিনী, বাকশাল (BAKSAL) বা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে বলেন। কিন্তু তাঁরা অত্যন্ত সুকৌশলে ও চতুরতার সাথে নিচের মৌলিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান:

বিদেশি মদদ ও আধুনিক অস্ত্রের উৎস: একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, চারদিকে অভাব-অনটনে জর্জরিত দেশে জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির ক্যাডারদের হাতে সেই সময়ে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র (যেমন SMG, SLR) এবং বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন আসছিল কোত্থেকে? তথ্য-প্রমাণ ও আন্তর্জাতিক দলিল বলে, একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানপন্থী এবং চীনপন্থী ভূ-রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে এই চরমপন্থী দলগুলোকে পর্দার আড়াল থেকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করত।

হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী কারা?: বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর যাঁরা ক্ষমতার কেন্দ্রে এলেন যেমন খন্দকার মোশতাক, পরবর্তীকালে জেনারেল জিয়া তাঁদের সাথে জাসদ নেতাদের এত চমৎকার সখ্যতা তৈরি হলো কীভাবে? জাসদ যদি সত্যিই শোষিতের পক্ষে বিপ্লবী হতো, তবে খুনি মোশতাক বা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তাদের প্রথম প্রতিরোধ গড়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা তা না করে খুনিদের দেওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে মেনে নিয়ে ক্ষমতার অংশীদার হতে ব্যস্ত ছিল।

দীর্ঘ ১৬ বছরের সামরিক স্বৈরাচারের সময় কেন তারা নিস্তব্ধ ছিল?: বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে যাঁরা সামান্য কারণেই হরতাল, ধর্মঘট, থানা ঘেরাও আর ব্যাংক লুট করতেন, তাঁরা জিয়াউর রহমান বা জেনারেল এরশাদের দীর্ঘ ১৬ বছরের সামরিক স্বৈরাচারের সময় কেন এমন ‘সাধু’ ও ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলেন? কেন তখন তাদের সেই তথাকথিত সমাজতন্ত্র বা শোষিত মানুষের জন্য প্রেম জাগেনি? কেন সামরিক ফরমানের বিরুদ্ধে তারা গণবাহিনীর মতো সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ল না? এই দীর্ঘ নীরবতাই প্রমাণ করে যে, তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য দেশ গঠন বা সমাজতন্ত্র ছিল না, লক্ষ্য ছিল কেবল বঙ্গবন্ধুকে ধ্বংস করা এবং নতুন বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা।

১৯৭২-১৯৭৫ সালের প্রধান রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও সহিংসতার তুলনামূলক চিত্র

নিচে একটি ঐতিহাসিক ছক বা টেবিলের মাধ্যমে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে জাসদ, সর্বহারা পার্টি এবং এর নেপথ্য শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ড, তার প্রভাব এবং বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সময়ে তাদের অবস্থানের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

বিষয়/ক্ষেত্র

বঙ্গবন্ধু আমল (১৯৭২-১৯৭৫)

জাসদ ও সর্বহারা পার্টির ভূমিকা

বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী অবস্থান (১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর পর)

নেপথ্যের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সুবিধাভোগী

আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ড

দেশ পুনর্গঠন ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

থানা আক্রমণ, অস্ত্র লুট, ব্যাংক ডাকাতি এবং পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ।

সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা, কোনো ক্যু বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অবসান।

রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল প্রমাণ করে সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করা।

জনপ্রতিনিধি ও কর্মী হত্যা

আওয়ামী লীগের ৪,০০০-৫,০০০ কর্মী এবং ৫ জন সংসদ সদস্য খুন।

এই হত্যাকাণ্ডের সিংহভাগ জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি দ্বারা সংগঠিত।

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে উল্টো তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন শুরু।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দেওয়া। সুবিধাভোগী: খন্দকার মোশতাক ও পরবর্তী সামরিক জান্তা।

অর্থনৈতিক নাশকতার মাত্রা

খাদ্য গুদাম রক্ষা ও চোরাচালান রোধে রক্ষীবাহিনী নিয়োগ।

কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য খাদ্য গুদাম লুট, রেললাইন উপড়ে ফেলা, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনে হামলা।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈপ্লবিক বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ।

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে 'তলাবিহীন ঝুড়ি' প্রমাণ করার এজেন্ডা বাস্তবায়ন।

আদর্শিক অবস্থান ও স্লোগান

অসাম্প্রদায়িকতা, চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও শোষিত মানুষের গণতন্ত্র (বাকশাল)।

'বৈঞ্চানিক সমাজতন্ত্র' ও 'শ্রেণীশত্রু খতমের' অবাস্তব ও রোমান্টিক স্লোগান।

সমাজতন্ত্রের স্লোগান বিসর্জন দিয়ে সামরিক সরকারের অনুগত অংশীদারে রূপান্তর।

তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া।

নেতৃত্বের পরিণতি ও বিভাজন

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং ৩রা নভেম্বর জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যা।

সমাজতন্ত্রের স্লোগান দেওয়া দলটির দ্রুত কয়েক টুকরো হয়ে যাওয়া ও আদর্শিক দেউলিয়াত্ব।

শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় এবং বিএনপিতে যোগদান।

ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করা এবং কর্নেল তাহেরকে ব্যবহারের পর জিয়া কর্তৃক ফাঁসি কার্যকর।

আধুনিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিত ও দীর্ঘমেয়াদী চক্রান্ত

আজকের ২১ শতকের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি আমরা পেছনের দিকে তাকাই এবং সেই সময়কার দলিলপত্র ও মার্কিন ডি-ক্লাসিফাইড (Declassified) ফাইলগুলো বিশ্লেষণ করি, তবে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড কেবল কয়েকজন বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী, গভীর ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের চূড়ান্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক ফল।

আর জাসদের তাণ্ডব ও সর্বহারা পার্টির নৃশংসতা ছিল সেই চক্রান্তকে সফল করার জন্য মাঠ পর্যায়ের অনুকূল ক্ষেত্র বা ‘গ্রাউন্ড প্রিপারেশন’ তৈরি করা। তারা দেশের ভেতরে এমন এক কৃত্রিম অরাজকতা তৈরি করেছিল, যাতে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম হয় এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যায়। যখন মূল চক্রান্ত সফল হলো এবং প্রধান বাধা বাঙালি জাতির রক্ষাকবচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তখন দাবা খেলার সেই ঘুঁটিগুলোকেও (জাসদ ও সর্বহারা পার্টি) বোর্ড থেকে সরিয়ে বা গুটিয়ে নেওয়া হলো।

বঙ্গবন্ধু কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বের মূল স্তম্ভ। সেই স্তম্ভটিকে ভাঙার জন্য এই অতি-বামপন্থী দলগুলোকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ‘আইডিওলজিক্যাল প্রক্সি’ বা ছদ্মবেশী শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইতিহাসের অমোঘ বিচার

ইতিহাসের একটি অমোঘ ও নির্মম নিয়ম রয়েছে যারা কোনো মহৎ, মানবিক ও দেশপ্রেমের উদ্দেশ্যে রাজনীতি করে না, বরং কেবল ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, অন্ধ হঠকারিতা বা অন্যের এজেন্ডা ও অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়নে কাজ করে, কালের গর্ভে তারা একদিন ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হয়। জাসদ আজ তার জীবদ্দশাতেই শতধা বিভক্ত, ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে তারা আজ অস্তিত্ব রক্ষার সামান্য লড়াই করছে, তাদের কোনো গণভিত্তি নেই। আর সিরাজ শিকদারের ‘শ্রেণীশত্রু খতমের’ রক্তক্ষয়ী রাজনীতি কেবল ইতিহাসের অন্ধকার পাতার এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ অর্ধশতক পরেও সমানে প্রাসঙ্গিক, বরং সময়ের সাথে সাথে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ও দীপ্তি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭২-৭৫ সালের সেই অস্থিতিশীলতা ও সংকট বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল না; বরং তা ছিল একটি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী হতে চাওয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ও আন্তর্জাতিক অন্তর্ঘাত (Sabotage)।

আজকের তরুণ ও নতুন প্রজন্মের সামনে সেই সাড়ে তিন বছরের সত্য ইতিহাস, নথিপত্র এবং এই ছদ্মবেশী তাণ্ডবকারীদের আসল পরিচয় নির্মোহভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। তবেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ এই ধরনের কুৎসিত রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল ও অন্তর্ঘাত থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারবে এবং চক্রান্তকারীদের আসল চেহারা চিনে নিতে সক্ষম হবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.